Skip to main content

Full text of "Dushprapya Bangla Sahitya"

See other formats


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সম্পাদনা 


অর্ণব সাহা 


সপ্তর্ষধি প্রকাশন 


প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯ 


সপ্তর্ধি প্রকাশন-এর পক্ষে স্বাতী রায়চৌধুরী কর্তৃক 
8৪এ, চক্রবত্তী লেন, শ্রীরামপুর, হুগলি থেকে প্রকাশিত 
এবং গ্যালবাটট্রস ৩১১এ বি বি চ্যাটার্জি রোড কলকাতা ৪২ ,থেকে মুদ্রিত 


প্রধান বিক্রয়কেন্দ্ 
৬৯ সীতারাম ঘোষ স্ট্রিট কলকাতা ০৯ চলভাষ ৯৮৩০৩ ৭১৪৬৭ 


সপ্তর্ষির বই পাবেন 
দে'জ, দে বুক স্টোর, বুক ফেন্ড, চক্রবর্তী আ্যান্ড চ্যাটার্জি (কলেজটি) 
বুক ওয়ার্ম (উত্তরপাড়া, ৪১ নি টি রোড), বুকস্‌ (শিলিগুড়ি), 
(ভুবনডাঙা, শান্তিনিকেতন) 


সংকলন প্রসঙ্গে 


উনিশ শতকের সাহিত্য ও সামাজিক ইতিহাসের আলোচনায় আজ সুপরিচিত 
'এলিট্ট সাহিত্যের পাশাপাশি বিপুলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তথাকথিত “বটতলা 
থেকে ছাপা, ততটা পরিচিত নয় এমন লেখক অথবা অজ্ঞাতনামা লেখক 
রচিত অসংখ্য বইপত্র, যেগুলি প্রথাগত বিদ্যায়তনিক পাঠ্যক্রমের কাছে 
এতদিন ব্রাত্য বলে বিবেচিত ছিল। অথচ এইসব বই সে যুগের জনসমাচে 
প্রচলিত সাহিত্য হিসেবে আমপাঠকের চাহিদা পূরণে সহায়তা করেছিল। 
এলিট সাহিত্য তথাকথিত শিষ্ট রুচি ও এনলাইটেন্ড দৃষ্টিকোণের সাপেক্ষে 
যে সব সামাজিক সমস্যার ততটা গভীরে প্রবেশ করতে চায়নি, এইসব বই 
অনায়াসেই ঢুকে পড়েছে সেইসব সমস্যার অন্দরমহলে। অথচ অধিকাংশ 
ক্ষেত্রেই এইসব লেখকরাও যেহেতু উচ্চবর্ণীয়, কম-বেশি ইংরেনীশিক্ষিত 
সম্প্রদায়েরই কিছুটা পিছিয়েথাকা অংশ, তাই উচ্চবগীয় সামাজিক 
ডিসকোর্সেরই সম্প্রসারণ বা ভিন্নমাত্রিক উপস্থাপনা এইসব বইতেও লভ্য! 
সাম্প্রতিক গবেষণায় এইসব বই যথেষ্টই ব্যবহৃত হচ্ছে, অথচ সাধারণ 
পাঠকের হাতের নাগালে অনেক ক্ষেত্রেই এই বইগুলি সহজলভ্য নয়। সেই 
প্রয়োজন কিছুটা মেটানোর তাগিদেই এই সংকলন, যেখানে গ্রহণ করা হয়েছে 
১৮২৫ থেকে ১৮৮৬-র ভিতর প্রকাশিত এরকম পীচটি বই, যেগুলি ভিন্ন 
যেখানে একই ডিসকোর্সের ভিতর ঢুকে পড়েছে বহুমাত্রিক স্বর, যেগুলি 
কখনো পরস্পরবিরোধী, কখনো পারস্পারিক আপসনির্ভর। 

সুদীর্ঘ ভূমিকাসহ, আলোচ্য পাঁচটি টেক্স্ট সংকলন ও সম্পাদনার কাজটি 
করেছেন তরুণ গবেষক অর্ণব সাহা। আশীকরি সাধারণ পাঠকের চাহিদা 
কিছুটা হলেও পুরণ করবে এই সংকলন। 


বিষয় সুচি 


ডমিকা . ৭ 

দুতাবিলা . ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় . ৩৩ 
কলিকুতৃহল . নারায়ণ চট্টরাজ .. ১৫৩ 

সপত্বী নাটক .. ভারকচন্দ্র চড়'মণি .. ২৪৯ 

হ্যালারে মোর বাপ... ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় , ৩৩৯ 


কিরাণী পুরাণ. অজ্ঞাত .. ৩৭৫ 


এঁতিহ্য, ধারাবাহিকতা, “ছেদ' 


“কতকগুলি অপর কদলী?, 

“সাহিত্যের বাজার দেখিলাম। দেখিলাম, বাল্মীকি প্রভৃতি খষিগণ 
অমৃত ফল বেচিতেছেন; বুঝিলাম, ইহা সংস্কৃত সাহিত্য। দেখিলাম, 
আর কতকগুলি মনুষ্য নিচু পীচ পেয়ারা আনারস আঙ্গুর প্রভৃতি 
সুস্বাদু ফল বিক্রয় করিতেছেন- _বুঝিলাম, এ পাশ্চাত্য সাহিত্য। 
আরও একখানি দোকান দেখিলাম-_-অসংখ্য শিশুগণ এবং অবলাগণ 
তাহাতে ক্রয়বিক্রয় করিতেছে-_ভিড়ের জন্য তন্মধ্যে প্রবেশ করিতে 
পারিলাম না- জিজ্ঞাসা করিলাম, “এ কিসের দোকান £” 
বালকেরা বলিল “বাঙ্গালা সাহিত্য । 


বিক্রেয় পদার্থ দেখিবার বাসনা ইইল। দেখিলাম-_খবরের কাগজ 
জড়ান কতকগুলি অপর কদলী।, 


আফিমখোর কমলাকাস্তের দিব্যদর্শনে উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের বাজার 
মূলত বালক ও মহিলাপাঠ্য অসার, অত্যন্ত নিচুমানের বইপত্রের জঞ্জাল। এই 
কঠস্বরের নেপথ্যে “সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের এলিট উন্নাসিকতা ক্রিয়াশীল। 
রামমোহন-বিদ্যাসাগর-মাইকেল-রঙ্গলাল-এর ধারাবাহিকতায় যে উন্নত উঁচু দরের 
সাহিত্যিক উৎকর্ষের সাধনা বঙ্কিমের, উনিশ শতকের গোড়া থেকেই মুদ্রণপুঁজির 
বিস্তার তার পাশাপাশি অন্য এক বিপুল সাহিত্যসম্তারের জন্ম দেয়। গদ্য-পদ্যে 
রচিত কাহিনিধর্মী বই থেকে শুরু করে, ধর্মীয় বিনোদন-মূলক, তথাকথিত 
“আদিরসাত্মক', পোলেমিক্যাল- বিচিত্র জাতের এইসব সাহিত্যিক নিদর্শন আজ 
আমাদের সামাজিক ইতিহাসের অতাস্ত গুরুত্পূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত 
হচ্ছে। প্রথাগত সংজ্ঞায় এদের 'বটতলার বই" অথবা ৭০৮ 116 ০ 
|10519076, বলা হলেও এইসব বইপত্র উনিশ শতকীয় সমাজের বহুবিচিত্র 
ঘাতপ্রতিঘাত, লক্ষণ এবং দিকৃনির্দেশেকে আমাদের সামনে হাজির করে আরো 
সঠিকভাবে বললে, এই বইপত্রগুলিকে 'নিন্নব্গীয় জনসমাজে প্রচলিত সাহিত্য: 
হিসেবেও আখ্যাত করা যায়। যদিও দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই বইপত্রগুলি দীর্ঘদিন 
যাবৎ আমাদের সাহিত্য ও সামাজিক ইতিহাসে ছিল উপেক্ষিত। 

এই উপেক্ষার একটি অন্যতম কারণ, উনিশ শতকের গোড়া থেকেই 
পাশ্চাত্যবাহিত জ্ঞান-যুক্তি-আলোকায়ন জীবনযাপন, সাহিত্য-সংস্কৃতির সর্বত্রই এক 
বিশেষ ধরনের এনলাইটেন্ড মান নির্ধারণের ব্যাকুল প্রচেষ্টা চালায় এবং 
পাশ্চাত্যশিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি "ভদ্রলোক সংস্কৃতি সেই 'স্ট্যান্ডার্ডাইজড্‌ 
প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাওয়া সব ধরনের সাংস্কৃতিক উপাদানকেই “অপরায়িত' 
করতে শুরু করে। অথচ ছাপাখানার প্রসার বাংলা মুদ্রিত অক্ষরের 'গণতস্ত্রীকরণ' 


দৃ্প্রালা প্রা পালে সাহ্িত 


ঘটানোর ফলে, মুষ্টিমেয় ইংরেজিশিক্ষিত বাঙালির নব্য 'পরিশীলিত রুচির 
পাঠকগোষ্ঠী, মুসলমান সম্প্রদায়--_অর্থাৎ বাঙালি পুরুষ ভদ্রলোক সংস্কৃতির 
যারা চিহিতত "অপর", এমনকি শিক্ষিত “ভদ্রলোক শ্রেণিরও এক বিরাট অংশ, 
যারা চাকবি বা অন্যানা সামাজিক প্রতিষ্ঠার দিক থেকে ততটা হয়জে সফল 
নন, যাদের সামাজিক ইতিহাসের ভাষায় 1655গা 1১1১9019121 বা [১20 
91373191ং বলা হয়েছে, তারাও ছিলেন এই সব বইপত্রের সম্ভাব্য পাঠক।ৎ 
দেশীয় উচ্চবর্গীয় “ভদ্রলোক', বিদেশি প্রশাসন, নৈতিক কর্তৃত্বেব চোখে অবজ্ঞা- 
উাদ্রেককারী এই ভিন্ন সাহিত্যিক ধার! এক পৃথক সাংস্কৃতিক 'আত্মপরিচয়*এর 
হদিশ দেয়। যদিও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যান্ত্রিক উচ্চ/নিন্নবগীয় বিভাজন সর্বত্র 
খাটেনা' ববং বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় একই “ডিসকার্সিভ প্রাকটিসে'র ভিতরেই 
পরস্পরবিরোধ; সামাজিক বর্গের অধিষ্ঠান, একই ধরনের “ডিসকার্সিভ ন্যারেটিভ 
বা “সন্দর্ভ বয়ান" উচ্চবর্গীয় শ্রেষ্ঠ সাহিত্য থেকে শুরু করে নিতান্ত অদক্ষ, 
ততটা পরিশীলিত নয় অথচ জনসমাজে প্রচলিত বিপুল বইপত্রের ভিতরেও ঠাই 
পেয়েছে। এই সংকলনে আমরা তেমনই পাঁচটি টেকস্ট গ্রহণ করেছি, যেগুলি 
তথাকথিত শ্িষ্ট সাহিত্যের কৃৎকৌশলগত বিচাল্র হয়তো ততটা উৎকৃষ্ট নয়, 
ততটা পরিচিতও নয়। অথচ বিদ্যমান সামাজিক "ডিসকোর্সের' “রিপ্রেজেন্টেশন' 
হিসেবে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ । কয়েকটি বিশেষ সাংস্কৃতিক চিহ এত প্রকটভাবে 
এদের ভিতব ধরা পড়েছে যে এগুলি ইতিহাসগতভাবে আজ যথেষ্ট অর্থবহ 
উপাদান হিসেবে পরিগণিত হতে পাবে! 
গন্যেক হানস্‌ হার্ডার উচ্চকোটির সাহিতোের বাইরে এধরনের জনসমাজে 
জা 1বপুল লেখালেখিকে কয়েকটি নির্দিষ্ সূত্র ধরতে চেয়েছেন।& এই 
ত্রা়ণ-প্রাক্রয়া কতমান সংকলনেব টিকস্টগুলির ক্ষেত্রেও অনেকাংশেই 
গুহলাহোগা | তার হতে এই টিকস্টগুলিকে নিছক 'প্রত্ুআধুনিক (৩৪0 
1111১001180, শি ৯ কাম্য মানকে 'পরশ্শকরতেচাওয়া অথচ ব্যথ, 
"ভূপনিশ্ালিত ব্রচনা হিসেনে দেখলে এদের নিজস্গত। অনেকাবাশে ক্ষু্ন হয়। এই 
[0পসট এলির একটি প্রধান লঙ্ষদ 'আগ্বাক্ণ (501 005055001))1 উপযুপরি 
সপ্মাভিক সংঘ, শতনপুরোনোর ছন্দ সদ্য গড়েউদতে থাকা বাঙালি 
ভদ্রলেোল্আ্োণব অ-স্থিতিশাল, ভুল, অন্তর্থত্তা চারএটিকে প্রকট করেছিল। নতন- 
পলোনের সহরিস্তানের ফলে উদ্ভুত শাত্মপবিচয়ের সংকটহ একধরনে 
বিভুপাজক্, খুতবা দুর্গিকোনণের জন্ম শিখেছে এই সাহিভেো। তবে সবচেয়ে বেশি 
ওকতৃপূর্ণ এই টেকস্টগুলির দেশভা অন-ধনুকরণযুলক (11012671008) 06911- 
৫15014751৮5 01701500) চারত্র। প্রাব্‌ ৮৩ গপানিবেশিক বাংল! ও সংস্কৃত সাহিত্যের 
ধারাবাহিকতা ও  প্রতিসবণ এধনবনেব টেকস্টে গভীরভাবে এ | 
অধিকাংশক্ষেত্রেহ প্রাক-আধুনিক সমাজে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক নরেটিভ্' 
প্রাক-ঘুদ্রণযুঃগর হুবন্থ উপাদান স্মেত বজায় থেকেছে ওইসব টেক্সটে। আসল, 
ছাপা বইয়ের প্রচলন বাংলার সমাজে দৃঢ়মুল হবার পরও এমন অনেব 
এ 


ভূমিকা 

পাঠকগোষ্ঠী রয়ে যায়, যারা পূর্বতন মৌখিক সাহিত্য, এবং পরবর্তী লিখিত 
সাহিত্য-__দুইয়ের মাঝামাঝি স্তরে অবস্থান করছে; কুমকুম সাংগারি এই এঁতিহ্যের 
সঙ্গে একাত্ম, নতুন পাঠাভ্যাসের সঙ্গে ততটা মানিয়ে নিতে না-পারা অংশটিকে 
11015105012 018110র মানুষজন হিসেবে চিহিতি করেছেন। এই 
পাঠকগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তরা সমাজের একাধিক স্তরে ছড়িয়ে ছিলেন- এদের সকলেই 
অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত, এমনটা ভাবা ভূল। 'দুতীবিলাস+, “কলিকুতৃহল”, 
“সপত্বী নাটক-_তিনটি বইতেই প্রাক-ও্পনিবেশিক ন্যারেটিভের ধারাবাহিকতা 
“ছেদ'-এর সম্মুখীন হচ্ছে। মোটের উপর ওঁপনিবেশিক পর্যায়ে, উচ্চবর্ণীয়, 
কমবেশি ইংরেজিশিক্ষিত অথবা ইংরেজি না-জানা লেখকদের রচিত এই বইগুলি 
এক সম্পূর্ণ নতুন ঘরানার ন্যারেটিভের সাক্ষ্য দেয়, যেখানে অতীত এবং 
বর্তমান একই শরীরে মিলেমিশে যাচ্ছে। এই বইগুলির অপর বৈশিষ্ট্য, সামাজিক 
অন্যায়-অব্যবস্থার বিরুদ্ধে একধরনের নৈতিক অবস্থান গ্রহণ-_-এই সংকলনের 
সবকটি টেকস্টই যেন সমাজসংস্কারমূলক উদ্দেশ্যে রচিত। সর্বোপরি ভাষাগত 
বৈশিষ্ঠ্য। মধ্য উনিশ শতক থেকেই যে মান্য, পরিশীলিত বাংলা গদ্য ও পদ্যের 
ভাষা গড়ে উঠতে থাকে শ্রেষ্ঠ লেখকদের কলমে, এই টেকস্টগুলির ভাষা তার 
নিজ্ব লক্ষণ। কিন্তু কোনও প্রাক্‌-নির্ধারিত ভাষাগত স্ট্যান্ডার্ড-এর সাপেক্ষে এই 
বইগুলিকে পড়তে চাওয়া ভুল হবে। কারণ বাস্তবতার যেসব মাত্রা তথাকথিত 
'উচ্চকোটির” সাহিত্যে উপেক্ষিত, এই টেকস্টগুলি সেইসব অপেক্ষাকৃত 
অবহেলিত অংশে আলো ফেলেছে। ফলত এদের ভাষাগত বহিঃপ্রকাশ 
অনেকাংশে সেই বাস্তবতার সাপেক্ষে নিযস্ত্িত. এই বইগুলির লেখকপাঠক 
উপভোক্তাদের চেতনার নিজস্বতাও এই ভাষা ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ধর! পল্ড 
অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে এই সংকলনের অন্তর্ভূক্ত টেকস্টগুলির বিষয়বস্তুর 
স্পর্শ করন আমরা। 


'দুতী বিলাসাখ্য এই পুথি' 

ভবাণীচরণ বন্দোপাধ্যায-এর ঘওঠাবলাস প্রকাশ তয় ১০৮২ সালে তত 
গুঁপনিবেশিক কামসাহিত্যের উনিশ শতকায়। প্রতিসবদগা একটি শ্রেস উদ 
এই বই। ন সংস্কৃত সাতিত' আিমসূত্র কোনশীদি জাতী বই, জয়দে 
গাতগোবিন্দ থেকে ওরু কবে » বিকেল 7 ? পালি চি আঠারো এতে 
ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর পর্ধন্ত একট স্প্রচলিত তলত করুণ কেহ এ 
ওপনিবেশিক শন কলকাতি' সমীলীন গছ নিত শ্রী দিও পপ এত 
ভবানীচরণ এই বহাটিতে ! রে “একের প্রথদা দি কলকাভাক এক ধনী ঘযবকে। 
লাম্পট্য, পরস্ত্রীস্তো” ৩ বছনালাশনের বিপুল এই বৃহ যেখানে অথ্বান 
পুরুষের অবাধ কিট: প্রধানতম অনঘতব সহায় তিসেবে বিবিধ তায 
চমকপ্রদ রোমাঞ্চকর ভামিকা বণিত হয়েছে টিস্তারে। কিগু এই দৃতী' সংস্কৃত 
রসশান্ত্র প্রকরণের খ্টাটেগরি অনুযায়ী গে ওঠেনি। বরং সমকালীন বাস্তবতাব 


টি এ 


নি স্ব 
ডন 


৫ 


*খু 


রি 


৮ 


নে 


এ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সঙ্গে এর যোগাযোগ অনেক বেশি। বাৎসায়নের কামসূত্রএও (তৃতীয় শতাব্দী) 
অপ্রাপণীয় নায়িকার সঙ্গে মিলন ঘটিয়ে নায়কের অচরিতার্থ বাসনা পূরণের 
দায়িত্ব 'দৃতী”র। সেখানে দৃতী তিন প্রকার-_নিসৃষ্টার্থা'+, যে দৃতী উত্তাবনী 
শক্তির সাহায্যে কার্যসিদ্ধিতে সক্ষম; “পরিমিতার্থা,, যে দূৃতী নায়ক-নায়িকার 
পারস্পরিক বার্তাটুকুই কেবল বহন করতে পারে চতুরতার সঙ্গে, এবং তৃতীয় 
দূতী-__“পত্রহারিণী”র কাজ অপেক্ষাকৃত গৌণ।৬ বৈষ্ঞবীয় রসশান্ত্রেও রাধা-কৃষ্ণের 
প্রণয়লীলার অনুঘটক দৃতী। রূপ গোস্বামীর উজ্জ্বলনীলমণি গ্রন্থে দূতী দুই 
প্রকার-ন্বয়ংদূতী” এবং “আপ্তদৃতী+। বীরা, বৃন্দা প্রভৃতি ব্রজাঙ্গনাগণ শ্রীকৃষ্ণের 
'আপ্তদৃতী”। বীরার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, নিত্যনতুন প্রস্তাব রচনার শক্তি শ্রীকৃষ্ণের 
প্রণয় বিষয়ে বিশেষ সহায়ক। বৃন্দার মনোজ্ঞ চাটুবাচন নায়িকাদের মনে আনন্দ 
সঞ্চার করে ও শ্রীকৃষ্ণের প্রতি- তাদের অনুরাগবর্ধন করে। বীরা প্রগলভ-বচনা, 
বৃন্দা চাটুক্তিকুশলা। 

ভবানীচরণ দৃতীপ্রকরণের এই এঁতিহ্য থেকে সরে এসেছেন নতুন নতুন 
দূতী”র সমকালীনতায়। তার উদ্দেশ্য: “গোপনে কেমনে দূতী করয়ে মিলন। / 
যুবক যুবতী পেয়ে কি করে আচার। / এসব বর্ণন করি করিয়া বিস্তার। / 
প্রধানা এ গ্রন্থ মধ্যে হইবেক দূতী। / অতএব, দৃতী বিলাসাখা এই পুথি ।।' তার 
কাব্যে দূতী পাঁচ প্রকার: “মালিনী', “নাপতিনী', 'উড়েনী', 'নেড়ী” এবং 
“সহবাসিনী দাসীরূপা'। এদের ভিতর মালিনী দূতীর চরিত্র, বেশভৃষা, এবং 
দক্ষতা বর্ণনে ভবানীচরণ স্পষ্টতই ভারতচন্দ্রের বিদ্াসুন্দর-এর অনুসারী! কিন্তু 
এই দৃত্তীরা সকলেই নিছক নগদ বিদায়ের বিনিময়েই নায়কের উপকার করতে 
সম্মত হয়। যেমন, মালিনী এই কাব্যের নায়ক শ্রীদেবকে বলে : 

শন ওহে রসরাজ ইকি অতি বড় কাম 
টাকা দিলে হইবে উপায়। 
অধিক কি কব আর বুঝিবা সকল সার 
কোন কর্ম না হয় টাকায় ।। 

অর্থাৎ, নগর কলকাতায় হাঁদয়বৃত্তিও সাফল্যের জন্য টাকার উপর নির্ভরশীল। 
পূর্ববর্তী কলিকাতা কমলালয় (১৮২৩) বইয়ের শুরুতেই ভবানীচরণ বলেছিলেন 
“কলিকাতা মুদ্রাবূপ অপেয় অগাধ জলে পরিপূরিতা হইয়াছে” শ্রীদেব নাগরের 
সঙ্গে কথোপকথনে নাপতিনী' শহরের বিভিন্ন পরিবারের ভরষ্টচরিত্র রমণীদের এক 
লম্বা তালিকা দেয়: 'অদুক সায়ের নাত”, “পালের বহু”, "দাসের ভগিনী”, “সুবোধ 
দত্তের বৌ", "অমুক সাহার কনা" প্রভৃতি । কিন্তু জনৈক ব্রান্মাণকন্যার প্রসঙ্গ 
উঠতেই অ-ব্রাহ্মণ শ্রীদেব যখন সংস্কাববশত বলে ওঠে ঘদ্যপি দ্বিজনারী 
দ্বিচারিণী হয়। / শুদ্রাদির মাতৃতুল্যা গমনীয় নয়।। / ব্রাঙ্গাণীর মন্দ কথা এনো 
না কো মুখে: / ইহ পরকাল র্লেশে যাবে রবে দুখে ।। তখন তাকে আশ্বস্ত করে 
নাপতিনী বলে কলকাতার “বাজারে' এহেন জাতপাতগত শুদ্ধতা আজ আর কেউ 
মানে না, বরং জাতি/জ্ঞাতি সম্পর্ক কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না কামসম্বন্ধ 
স্থাপনের কেরে: 


১০ 


কেহ হরে মাসী পিসি জানিল তা প্রতিবাসী 
মামি হরে বিশ্বধবন আশ। 
ভাদ্রবধূ হরে কেহ কহি যদি মন দেহ 
আছে বড় বাজারে প্রকাশ।। 
খুড়ি না শাশুড়ি বাছে শুনি অনেকের কাছে 
আর বহু বাজারে শুনিবে। 
স্ীদেব নাগর চরিত্রটির উপস্থাপনার ক্ষেত্রেও ভবানীচরণ এঁতিহ্য থেকে সরে 
এসেছেন সমকালীনতার প্রেক্ষিতে । “অথ শ্রীদেব নাগরের রূপ বেশ বর্ণন” অংশে 
সেকালের ধনী বিলাসী নবযুবকের পোশাকের বিবরণ দেবার পর শ্রীদেবকে 
“বিদগ্ধ নায়ক আখ্যা দেওয়া হয়েছে। “বিদগ্ধ নায়ক-_এই বিশেষণ একটি 
পারিভাষিক আখ্যা। বৈষ্ব রসশান্ত্রীরা এবং সংস্কৃত অলংকারপ্রকরণেও 
'নায়কভেদ' ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নায়কের গুণাবলীর অন্যতম একটি গুণ হিসেবে 
ব্যাখ্যা করা হয়েছে “বিদগ্ধতা'কে। ৯ষোড়শ শতকের রূপ গোস্বামী শ্রীকৃষ্ণের 
ব্রজলীলা নিয়ে লেখেন বিদশ্ধমাধব নাটক।১ রূপ গোস্বামীর ভাষায় “বিদগ্ধ, 
নবযুবা, পরিহাসবিশারদ ও নিশ্চিন্ত প্রকৃতির নায়ককে 'ীরললিত বলে।৯১ শ্রীদেব 
নাগর কি 'ধীরললিত' নায়কের উদাহরণ? স্পষ্টতই না। কারণ সংস্কৃত সাহিত্যে 
যে যে চারিত্রিক অভিব্যক্তির সাহায্যে নায়কচরিত্র প্রার্থিত আলংকারিক উচ্চতা 
পায়, ভবানীচরণের নায়ক তার চেয়ে অনেক বেশি একরৈখিক ও লঘুচিত্ত। যেন- 
তেন প্রকারে যৌন ঈপ্সা চরিতার্থ করা ব্যতীত মাঝে মধ্যে কিছু নৈতিক উক্তি 
উচ্চারণই কেবল করে সে। 'দৃতীবন্দনা'র মধ্য দিয়ে শ্রীদেব এক ভিন্নতর 
'পুরুষার্থের ধারণা ব্যক্ত করে : 
দূতী সঙ্গ নিরবধি যদি হয় বাল্যাবধি 
লোক তবে পুরুষার্থ হয়। 
দেখহ বালক কালে গুরুরূপে পাঠশালে 
দূতী আসি নিকটে উদয়।। 
আর নিজ নারী প্রতি যাহার না থাকে মতি 
মতি তার নারী প্রতি যায়। 
জানিলে তাহার মর্ম সাধিতে আপন ধর্ম 
নিজ মূর্তি ধরেন তথায়।।... 
অতএব দূতী ভক্তি করি তাহে অনুরক্তি 
সাক্ষী দেখ কৃষ্ণ অবতার। 
দূতীরে করিয়া বল বৃন্দাবনে বাসস্থল 
রসময় করেন প্রচার।। 
তে 
নিয়েছে পৌরাণিক কৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা। আর অবিমিশ্র শৃঙ্গারই যে এই বিপুল 
বিত্তশালী যুবকের জীবনে একমাত্র আকাঙক্ষা তা প্রার্থিত কামিনীর কাছে 
আত্মপরিচয় ব্যক্ত করতে গিয়ে নিজেই বলে শ্রীদেব : 


১১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


শ্রীদেব নাগর নাম শৃঙ্গার নগরে ধাম 
লেখাপড়া জ্ঞানগুণ কেবল নাগরী। 
কামপুরে জমিদারী সে কর্মেতে ব্যস্ত ভারি 
তালুক রক্ষার হেতু আছি বাসা করি।। 
বিবাহের নাহি আশ পরবাসে বারমাস 
সুখে থ/স্বার জন্য ব্যয় ক' ধন... 
অনঙ্গমঞ্জরীর সঙ্গে দ্বিতীয়বার মিলনে সময় বৈঞ্ণববেশী শ্রীদেব “ঠিক যেন 
চৈতন্য সাজিল। / মুখে হরি হরি বোল / অস্তরেতে গণ্ডগোল / ভাবি রূপ 
অনঙ্গমঞ্রী”_ _বৈষ্ঞলীহ ভাবাদ্শর এক চুড়ান্ত বাত্যয় ঘটেছে এখানে 
চ55 ৩নশ শতক 'কামসাহিতা'-এ. *আধুনিকতা"র যুগোপযোগী 
প্রতিসরণের এ এ পকৃষ্ট নিদর্শন মধ্যযুণীয় বৈষুব সাধনার ভিতর যে উচ্চতর 
4555210০ দাবি কপ" হত, উনি*' শতকের ব্রিটিশ কলকাতায় তা আজ লম্পট 
ধনীপুত্রের বাসনা চরিতার্থকরণের উপকরণ মাত্র । 
ওঁপনিবেশিক কলকাতার সামাজিক ইতিহানসর এক জীবন্ত ছবি পাওয়া যায় 
এই বইটিতে । এই সামাজিক ইতিহাস উনিশ শতকের প্রথমার্ধের সম্পন্ন পরিবার, 
স্বামীন্ত্রী সম্পর্ক এবং পিতৃতান্্রিক-পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের ভিতর যৌন 
অবরোধের বিরুদ্ধে গৃহস্থ মেয়েদের নিজস্ব শারীরিক উপভোগ" (0169501০) 
উৎপাদনের কথা বলে। নাগর 'নকটে গোপীর পরিচয়” অংশে গোপী যখন 
পিতৃকুল-শ্বশুরকুলেব পরিচয় দেয়, তখন বোঝ যায় সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারের 
এই মেয়েটি কোনে না কোনোভাবে পরিবার থেকে বিতাড়িত, যোন পদস্বলনের 
সূত্রেই হয়তো তাকে ঘর্ছাড়া হতে হবেছে। ১৮৫৩ সালে কলকাতার ৪ লক্ষ 
জনসংখ্যার মধ্যে বারবনিতার সংখা ১২৪১৯ । এদের মধ্যে একটা বৃহদংশই 
উচ্চবর্ণীয় পরিবারের মহিলা, যৌননৈতিক খ্রলনের কারাণে যালা একবার 
পরিবারচ্যুত হয়ে আর পাববারে ফিরতে পারেনি ৯২ সমকালীন সরকারি হিসেব 
অনুযায়ী এ বারো হাড় লব মারে দশ হাজার মহিলাই ছিলেন হিন্দু কলীন 
রা কন্যা ও লিপ, 'কে বলে (লিলা তারে বেশ্যা কে বলিতে পারে 
/ গণিতে গোপীর পতি আগ্থিব নিহিত কখপাব এই বর্ণনা ভাকে সমকালীন 
সমাজপ্রেক্ষিতেই স্থাপল কারে, আলাব উপ *চতণর বর্ণনায় “স্বজাতিব পঞ্চ নবে 
/ রতি যেবা দান জা পলা জুলি হনািত হালি শাডু অনুসারে ।!? -গাপাকে 
সরাসরি কামসূত্রের  পানপ্াণিপর্ণস হায় ল আদালে গড়ে নেবার শ্রয়াস। 


এটিও ভবানাচরণেপ গভির ঘাতক এ্ীনল্ত গগন্দাল আলিকে ধরার চেঙ্টা। আর 
'তসরের | পর * শাহ তিলক কস 1১7 পূতীর প্রসঙ্গ অনা একাধিক 
উনিশ শতকীয় টেস্তঠ ৩ রা পাডডেছে। নন নারাঘণ চট্টুরাজের লেখ! 
কলিকৌতুক লাউ” : ৮৮) একটি তালে পাগেচ্ে সহজিযা বেঝঃলাদের 


5 


আখড়ায় অনাধ শত ২ ডালিখ। আসলে লোদিলের সামাজিক 'প্রক্ষিতেও 
সহজিয়া বৈষওবদেব শত 25৭২ দের সম্পর্কে এপধরনের অভিযোগ প্রচলিত 
ছিল। অনেক সমাজ মঠিগ': ঠাই হত এখরনের প্রান্তিক ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলির 


০ 
বত 


মধ্যে। ভবানীচরণের “সহবাসিনী দাসীরূপ দৃতী” যখন শ্রীদেব নাগরের কাছে 
অনঙ্গমগ্জরীর কথা বলতে গিয়ে 'গোসা করে পরে মোরে করে চোটপাট। / 
পুলিশে পাঠাতে চায় শুনে মোটমাট।1” _-এ হেন উক্তি করে, তখন এই 
ওঁপনিবেশিক প্রশাসনের সরাসরি উল্লেখ কাব্যের চরিব্রগুলিকে সমকালীন করে 
তোলে। 
আবহমান সংস্কৃত ও বাংলা প্রাক-ওপনিবেশিক সাহিত্যে “'আলম্বন” ও 

উদ্দীপন" বিভাবের যে অলংকারশাস্ত্রসম্মত প্রকরণ তৈরি হয়েছিল, ভবানীচরণের 
কাব্য তা থেকেও সরে এসে কয়েকটি নতুন উপাদান সংযোজিত করেছে। 
বিশ্বনাথ কবিরাজের সাহিত্যদর্পণ অনুসারে “যেসকল পদার্থ রসকে উদ্দীপিত 
করে, তারাই উদ্দীপনাবিভাবসমূহ'_-“যো যস্য রসোদ্দীপনবিভাব সঃ 
তৎস্বরূপবর্ণনে বক্ষ্যতে ।৯ অর্থাৎ, “আলম্বন' বা পাত্রপাত্রীরূপ ০৮)৩০-এর 
“দেশকালাদি'-কেই বলে “উদ্দীপনবিভাব”। বিশ্বনাথের ভাষায় “ইহাতে “আদি, 
শব্দে চন্দ্র, চন্দন, কোকিল, সাপ, ভ্রমর, ঝঙ্কার প্রভৃতি বুঝায়”। দূতীবিলাস-এর 
'ধাতুরাজ বসম্তের আধিপত্য" অংশে (শীতল সুগন্ধি মন্দ বহিছে পবন। / 
বিয়োগী জনের হয় কামিনীতে মন।1) উদ্দীপন বসস্ত ঝতু প্রাক-গঁপনিবেশিক 
সাহিত্যতত্বের অনুসারী, কিন্তু যে স্থলে নায়িকাকে দেখে নায়কের হৃদয়ে বাসনার 
সঞ্চার হয়েছিল সেই স্থানটি হল উত্তর কলকাতার গৃহস্থ বাড়ির ছাদ : 

' সুস্বর অনল সম সম্তাপ জন্মায়। 

সুস্থির হইতে নারে পারে ছাতে যায়।। 

মলয় মারুত তাহে লাগে তার গায়। 

অস্থির হইয়া কামে চারিদিকে চায়।। 

অন্য মৌথোপরি নারী দান্ডাইয়া ছিল। 

অর্ধেক শরীর তার দেখিতে পাইল।। 

সুন্দরীর মুখ চক্ষু গুণ নিরখিয়ে। 

বিতর্ক করিছে কত কামেতে মজিয়ে।। 

ছাতে পুনর্বার আর তারে না দেখিয়া। 

বারান্দায় বৈসে আমি মলিন হইয়া।। 
এরপর টেকস্ট-এর প্রথমাংশে বেশ কয়েকবার এ ছাদ ও ছাদে নায়িকাকে দর্শন 
ইতিহাসের যৌন আচরণ-অভিব্যক্তি, সমাজ ও যৌননৈতিকতার এক অনুপঙক্ন 
অভিব্যক্তি ধরা পড়ে শ্রীদেব নাগর-অনঙমঞ্জরীর স্বামীর মধ্যেকার সম্পর্কের 
যৌন টানাপোড়েনটি লক্ষ করলে। উনিশ শতকের শেষার্ধের হিন্দু জাতীয়তাবাদ 
অ-নিয়ন্ত্রিত যৌন উদ্দীপনা-কে চিহিত করেছিল এবং “পরিবার, নামক 
ধারণাটিকে পুনর্বিন্যত্ত করে, নিরন্তর শিক্ষা, আলোকায়ন এবং অনুশাসনের দ্বারা 
পরিবারের প্রেক্ষাপটে নারীর ভূমিকা পুনর্নিরদিষ্ট করতে চেয়েছিল। এবং এই 
“অভীন্সা' নিজের যাথার্থ্য প্রমাণের জন্য যে যে সামাজিক উপাদানগুলিকে 


১৩ 


দুরপ্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


প্রাকৃশর্ত হিসেবে ধরে নিয়েছিল তার একটি প্রধান বিষয় ছিল মেয়েদের যৌন 
অভিব্যক্তি, অতিরেক (6%০5$5)। একাধিক সমকালীন সাক্ষ্য এবং সাম্প্রতিক 
গবেষণা থেকে জানা যায়, উনিশ শতকের প্রথমার্ধের বাঙালি অস্তঃপুরে মেয়েদের 
কথাবার্তার অনেকটাই জুড়ে থাকত আদিরসাত্মক বিষয়বস্ত। আদিরসাত্মক গল্প 
শোনা ছিল মেয়েলি বিনোদনের এক প্রিয় উপায়। এই পরিবেশে বালিকা বয়স 
থেকেই মেয়েরা যৌনতা বিষয়ে অকালপকক হয়ে উঠত। ১৮৩৯ সালে জনৈক 
ইংরেজ মিশনারি মহিলা লিখছেন অস্তঃপুরের বাঙালি মেয়েরা-__ 

4511] 510 001 1708115 117 0110155 ৬/1111175 25599 06 0075 

11) 5111) 0050155 ০017%5159010155, 10 ৮/17101) 17015 00 

21) 01011501211 5500611617550 16171915091) 52001) 1732910 

50090951116. ১৪ 
এই পারিবারিক কাঠামোয় অনঙ্গমঞ্জরীর মতো গৃহবধূর অভাব ছিল না, যারা 
বেশ্যাসক্ত স্বামীর অবহেলা এবং অমনোযোগের কারণে নিজেদের অবদমিত 
বাসনা চরিতার্থ করত পরপুরুষের সান্নিধ্যে। মালিনী অনঙ্গ সম্বন্ধে শ্রীদেবকে 
বলেছিল “রসিক যুবার প্রতি যত্ব তার অতি। / যেহেতু অকৃতি বড় শুনি তার 
পতি।। এবং এই গোপন মিলনে সহায়তা করত অনঙ্গের দাসী গোপী এবং 
দূরসম্পর্কের পিসি। পিসির পরামর্শে সন্তান উৎপাদনের জন্য শ্রীদেবের সঙ্গে 
নিয়মিত মিলনের অনুমতি স্বামীর কাছ থেকে আদায় করার আগে পর্যস্ত বিভিন্ন 
কৌশলে তারা মোট ছ'বার মিলিত হয়েছে। প্রথমবার পিসিকে দেখতে যাবার 
নাম করে স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি আদায়, দ্বিতীয় মিলনে বৈষ্তব আখড়ায় 
শ্রীদেব নাগরের বৈষ্তবের ছদ্মবেশ ধারণ, তৃতীয় মিলনে শ্রীদেব দাসীরূপ ধারণ 
করে অনঙ্গের অন্তঃপুরে এসে উপস্থিত হয়েছে, চতুর্থ মিলনে নায়ক ধারণ করেছে 
দ্বিজবেশ, নায়িকাকে সঙ্গে করে কালীঘাটে উপস্থিত হয়েছে পিসি এবং সেখানে 
ঘরভাড়া করে রাত্রিবাস ও মিলন ঘটেছে দুজনের । এই কালীঘাটেই অনঙ্গমঞ্জরীর 
পিসির প্রতি গোপনে আকৃষ্ট হয় শ্রীদেব। এরপর পিসির পরামর্শে স্বামীর 
অনুমতি নিয়ে বাড়িতে সখের যাত্রার আয়োজন করে অনঙ্গ। 'পল্লীগ্রামস্থ 
নারীবেশ' ধারণ করে অন্তঃপুরের মেয়েমহলে ঢুকে পড়ে শ্রীদেব এবং নায়ক 
নায়িকার পঞ্চমবার মিলন সাধিত হয়। এরপর অনঙ্গর পিসির সঙ্গে 
শারীরিকভাবে মিলিত হয় শ্রীদেব। ষষ্ঠ মিলন হয় তারকেশ্বরে। পথিমধ্যে “রাত্রি 
একঘরে হৈল সবাকার বাস / শ্রীদেব কৌশলে পুরে দুহাকার আশা ।' কাহিনির 
শেষে পিসি কৌশলে অনঙ্গর স্বামীকে রাজি করিয়েছে নিঃসস্তান স্ত্রীর গর্ভে 
পরপুরুষের সস্তান ধারণ করানোয়, কারণ বংশরক্ষার জন্যই একাজ করা একাস্ত 
প্রয়োজন। এই সুযোগে শ্রীদেবও অনঙ্গমঞ্জরীর গৃহে অনুপ্রবেশের সুযোগ পেয়ে 
যায় এবং অবাধে “কখনো রজনী যোগে কখনো দিবসে । / প্রত্যহ আইসে যায় 
অনঙ্গের বশে।।' কিন্তু গৃহাভ্যস্তরে প্রবেশের পরেও পিসির সঙ্গে মিলিত হওয়া 
থেকে বিরত হয়নি শ্রীদেব, এমনকি নিজগৃহে গোপীদাসীকে পেয়ে তাকেও 
ছাড়েনি সে। ফলে শ্রীদেবের প্রতি অনঙ্গমঞ্জরীর মান, শ্রীদেবের পালটা অভিমান। 


১৪ 


ভূমিকা 


ক্রমে অনঙ্গমঞ্জরীর গর্ভে শ্রীদেবের ওরসে তিন পুত্র হয়, তাদের প্রত্যেকের এবং 
অনঙ্গের ব্যয়ভার বহন করে নিঃস্ব হয়ে পড়ে শ্রীদেব।'পরিবারে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত 
স্বামীপুত্রবতী অনঙ্গমঞ্জরী শ্রীদেবের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে। হতাশ, ব্যর্থ, 
শ্রীদেবের কাতর আক্ষেপোক্তির মধ্য দিয়ে কাহিনির শেষ হয়। 
দুতীবিলাস-এর টেকৃস্ট উনিশ শতকের প্রথমার্ধের বাঙালি সমাজের একাংশে 

প্রচলিত 'কাম”এর নৈতিকতা ও সুখবোধ (015501০) সংক্তাত্ত এক অনবদ্য 
উপস্থাপনা । অপেক্ষাকৃত বিস্তবান পরিবারগুলিতে পুরুষের বেশ্যাসক্তি এবং 
অস্তঃপুরের মহিলাদের পরপুরুষগমন ---সেযুগের অধিকাংশ পত্রপত্রিকায় একটি 
চালু বিষয় হিসেবে ছাপা হত। দূতীবিলাস-এও অনঙ্গের স্বামী রাতে বাড়ি থাকত 
না, কিন্তু তার স্ত্রীর পরপুরুষ সম্ভোগের সম্ভবত সেটাই একমাত্র কারণ নয়। 
কারণ শ্রীদেবের সঙ্গে মিলিত হবার পরেও স্বামীর সঙ্গে একইভাবে শারীরিক 
মিলন চালিয়ে গিয়েছে সে। অর্থাৎ, সে যা! করেছে অত্যন্ত সচেতনভাবে করেছে। 
অন্তরে শ্রীদেবকে ধারণ করেই সে পতির সঙ্গে মিলিত হয়েছে : 

রঙ্গভঙ্গ দেখি তার পতি গেল ভুলিয়া। 

পালক্কেতে শুলো গিয়ে শিল বুকে তুলিয়া।। 

রসে বসে রাত্রিশেষে নিদ্রা যায় হইয়া 

অনঙ্গের নাহি নিদ্রা শ্রীদেবেরে ভাবিয়া ।। 
এখানে একধরনের স্বেচ্ছাধীন, স্বয়ংচালিত নারীসত্তার ছবি পাওয়া যায়, যে তার 
নিজের শরীর/সুখভোগের ক্ষেত্রে অন্য কারো মুখাপেক্ষী নয়। এই স্বাধীন 
যৌনসত্তার কথাই যেন প্রকট হয় দাসীরূপধারী শ্রীদেবের উক্তিতে, যেখানে 
রামচন্দ্র ও জরতকারু মুনির স্ত্রীর প্রতি নিষ্ঠুরতার প্রেক্ষিতে বলা হয়-_“অতএব 
দেখেশুনে স্বামী চাহি নাই। / স্বামীর অধিনা হলে কোন সুখ নাই।। / উপপতি 
করি যদি দূরে যায় দোষ। / এ যুক্তি করিলে থাকে সকলে সন্তোষ।।” সখের 
যাত্রা দেখতে আসা শহুরে মেয়েরাও মন্তব্য করেছিল, পল্লীগ্রামের মেয়েদের 
জীবনে কোনো স্বাধীনতা নেই (শুনে নাকে হাত দিয়ে কহে নারীগণ। / হেন 
যারা সহে ধিক তাদের জীবন।1)। অনঙ্গ তারকেম্বরে সন্তানের জন্মের জন্য 
মানত করতে যাবার যুক্তি হিসেবে স্বামীকে বলেছিল: “সদা মত্ত হৈয়ে থাক 
লৈয়ে বারাঙ্গনা। / আখেরে কি হবে তার নাহি বিবেচনা ।| / ... সন্তান না হলো 
মোর যৌবন না রয়। / তুমি যেন কথা শুন সে তো বশ নয়।। উনিশ 
শতকের শেবার্ধের যৌনতার ডিসকোর্সেও বারবার বলা হয়েছে এদেশীয় ধনী 
ব্যক্তিগণ অল্পবয়স থেকেই অতিরিক্ত শুক্রপাত করেন বলেই তারা সস্তানের 
জন্মদানকালে কার্যত ব্যর্থ হন।*" পরবর্তী যৌনতার ডিপকোর্সের একটি সামাজিক 
মতামতগত ভিত্তি দৃতীবিলাস-এর কাহিনিতেও লভ্য। তারকেমশ্বরে জনৈক 
সন্ন্যাসীর ভবিষ্যৎবাণী-সংক্রাত্ত মিথ্যা কথা বলে যেদিন অনঙ্গমঞ্রী স্বামীকে 
রতিক্রিয়ার পর উভয়ের পারস্পরিক সম্পর্কহীনতার ছবিটি প্রকট হয়: “রতি রস 
রঙ্গ হইল যেন শাস্ত্র পালা। /উভয়ের মনে অন্য করে দায় টালা।। / তাদের 


৯৫ 


দুষ্প্রাপা বাংলা সাহিত্য 


বাসর যেন হয় কারাগার। / দুজনে দুঃখিতমনে ভাবে অনিবার।।' আর 
পরপুরুষ-সংসর্গের মাধ্যমে গর্ভোৎপাদনেব বিষয়টি অনঙ্গের পিসি যে যুক্তিতে 
অনুমোদন করিয়েছে তার মধা দিয়েই উনিশ শতকের প্রথমার্ধের বাঙালি সমাজে 
যৌননৈতিকতার এক পৃথক %শ-: পলিন্্ট হয়: 

পৃত্র প্রয়োজন শন অবশা গৃহীর। 

ব্যক্ত পুরানেতে দেখ লেখন স্মৃতির ।। 

পণ্ডিতের আপন বংশ রাখিবার তরে। 

আত্ম হতে না হইল অন্য মত করে।। 

পাণ্ডুরাজা হৈতে পুত্র না হলো কুস্তীর। 

উপপতি জন্য বিধি দিলেন সুধীর।। 

লোকলজ্জা ভয় তুমি তাহারে পারিবে। 

গোপনে আসিবে কেহ কে ঢাক মারিবে।। 

সুজনবাবুর কথা শুনিয়াছ কানে। 

উপপতি সঙ্গে মাণ্ড পাঠায় বাগানে। 

কিছুদিন থাকে কথা শেষ কিবা রয়। 

কলঙ্ক কি বশ সব কালে লোপ হয়।। 

অতএব শাস্ত্র সিদ্ধ লোক ব্যবহার। 

ইথে পাপ লজ্জা কেন হইবে তোমার।। 
অতঃপর তিন পুত্রের জন্মদানের পর পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে 
প্রতিষ্ঠালাভের সঙ্গে সঙ্গে শ্রীদেবের প্রয়োজন সাঙ্গ হয়েছে অনঙ্গমপ্রীর জীবনে। 
আর শ্রীদেব আক্ষেপ করেছে, কীভাবে “অনিত্য সাধন” এর কারণে তার জীবন 
ছারখার হয়ে গিয়েছে। সাধারণ গৃহীর্‌ ইতিকর্তব্য সম্পাদনে অনীহাই যে তার 
পতনের মূল কারণ, এ কথাও কবুল করেছে সে। ভারতীয় পুরুষার্থ সাধনায় 
ধর্ম, “অর্থ ও কাম'-সাধনই “মোক্ষের উপায়। যে ব্যক্তি এদের ভিতর 
কোনো একটির অতিরিক্ত চর্চা করে, সে-ই জীবনে সামগ্রস্য হারায়। শ্রীদেবের 
কাতরোক্তি সেই সামঞ্জস্যহীনতার যন্ত্রণা থেকেই : “গৃহী হয়ে গৃহে থাকি না করি 
বিবাহ। /গৃহস্থের মত কর্ম না হলো নির্বাহ।। / ওঁরসে জন্মিল পুত্র বংশ না 
রহিল। / আপনার পিতৃপিণ্ড আশা না থাকিল।। / আমার সমান আর নাহি 
বুদ্ধিহীন। / সংসারী নহিক আমি নহি উদাসীন।। / নিতা সেই নিত্যানন্দ তারে 
না ভাবিয়া। / ভাবিলাম কামিনীবে কামেতে মজিয়া।।' শ্রীদেবের পতনের মূল 
কারণ কর্তব্যকর্মের যথাযথ গুরুত্ব না বোঝা-_আবহমানকালব্যাপী ভারতবর্ষীয় 
পুরুষার্থ সাধনার কাঠামোর ভিতরেই এভাবে “কাম'-কে স্থাপন করতে চান 
ভবানীচরণ। 

দূতীবিলাসসএর সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় উপাদান এর নায়ক-নায়িকার 

রতিবিহারের অনবদ্য বর্ণনা । এই বর্ণনা আধুনিক 'পর্নোগ্রাফিক' (0907095195০) 
বর্ণনার চেয়ে একেবারেই আলাদা । এখানে যৌনাঙ্গ এবং যৌনমিলনের অনুপুুন্র 
বর্ণনা বাস্তবানুগ নয় (70171651150), বরং একধরনের সরস আবরণ দ্বারা 


১৬ 


ভুমিকা 

আবৃত। প্রাক-উপনিবেশিক গীতগোবিন্দ (১২শ শতক), শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (১৫ 
শতক), রোমান্টিক কিস্সাসাহিত্য (যেমন: লোরচন্দ্রানী, ১৭ শতক), সর্বোপরি 
ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর (১৮ শতক) দ্বারা প্রভাবিত ভবানীচরণের ভাষাভঙ্গি। 
এক্ষেত্রে প্রাক-ওঁপনিবেশিক “কামসাহিত্য”র সম্প্রসারণই তার কাব্যে লক্ষণীয়। 
যেমন, ধরা যাক, তার কাব্যের “বিপরীত শৃঙ্গার'-এর সঙ্গে বিদ্যাসুন্দর-এর 
“বিপরীত বিহার'-এর বর্ণনাগত সাযুজ্য : 

লাজের মাথায় হানিয়া বাজ। 

সাধয়ে রামা বিপরীত কাজ |। 

ঘন অবিলম্ব নিতম্ব দোলে। 

ঘুন ঘুন ঘন ঘুঙ্ঘুর বোলে ।। 

আবেশে ছাদি ধরে ভুজযুগে। 

মুখ পুরে মুখ ক্পুর পুগে।। 

দংশয়ে পতির অধরদলে। 

কপোত কোকিলা কুহরে গলে ।। 

উলিল কামরস জলধি। 

কাম মত সুখ নাহি অবধি।।৯১ 


তুলনীয়, দূতীবিলাস-এর “পঞ্চম মিলনে খেলাচ্ছলে বিপরীত শৃঙ্গার”: 

লাজ বাদ সাদে আসি আঁখি ভরে। 

কামদেব আরো মনে ব্যস্ত করে।। 

কটিদে* তুলে ঘন শব্দ করে। 

জলবিন্দু তাতে তবু নাহি সরে।। 

অবলা হইয়া সবলারি মত। 

বহু কষ্ট পেলে নারী পারে কত।। 

বিধিমতে কামে কত বজ্র মারে। 

পরে বারি ঢালে মুষলের ধারে।। 
দুতীবিলাস-এর “চতুর্থ মিলনে” “কালীঘাটে রন্ধন” অংশে নায়িকার কুচ নিয়ে যে 
রসালাপ তাও বিদ্যাসুন্দর-এর অনুরূপ। বিদ্যাসুন্দর-এর “কুচপদ্মকলি কবিরাজ 
করে। / ধরিতে তরুণী পুলকে শিহরে'-র মতোই এখানেও পাই: “কুচ দুটি নিয়ে 
করে বার্তাকি বুঝিল। / কামানলে সে দুটারে ভাল পোড়াইল।।/ পুনঃ পুনঃ কাটি 
দিয়া নাড়ে চাড়ে ঢাকে। / বারম্বার টিপে দেখে যদি শক্ত থাকে।। এছাড়াও 
বিদ্যাসুন্দর-এর অনুকরণে একাধিকবার নায়কের ছদ্মবেশ ধারণ ছ্ধিজ ব্রাম্মাণের 
রূপ, দাসীরূপ, পল্লীগ্রামস্থ নারীরূপ ধারণ), রাজসভায় সুন্দরকে দেখে 
ারীগণের পতিনিন্দা*+র অনুকরণে “মেয়ে মজলিসে নারীদের প্রতিরূপ বর্ণনা' 
(এখানে মেয়েরা পতিনিন্দা করেনি, বরং চাকুরীজীবী ব্যস্ত স্বামীদের নিয়ে তাদের 
প্রচ্ছন্ন গবই প্রকাশিত হয়েছে এখানে, এবং স্বামীদের কর্মব্যস্ততার সুযোগে তারা 


১৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কী ধরনের আপেক্ষিক স্বাধীনতা ভোগ করে, সে কথাও বর্ণিত হয়েছে) প্রভু 
উপাদানের ক্ষেত্রে ভবানীচরণ এঁতিহ্যের অনুসারী। পুরুষের নারীবেশ ধারণে 
উল্লেখ (০:955-017555116) মহাভারত, পুরাণ, কামসূত্র থেকে শুর ক 
মধ্যযুগীয় সাহিত্যে বারবার উল্লিখিত হয়েছে নায়ক-নায়িকার মিলনের অনুষঙ্গে 
পিসি এবং দাসীদের সঙ্গে প্রার্থিত পুরুষকে দেখে নায়িকার মান, নায়ক কর্তৃব 
তার মানভঙ্গ, দাসীর শরীরে সম্ভোগচিহ দেখে নায়িকার অভিমান-_ প্রভৃতি বর্ণন 
স্পষ্টতই বৈষ্ণব সাহিত্যের রাধা-কৃষ্ের প্রণয়লীলার আদলে আঁকা হয়েছে। 
অর্থাৎ প্রাক-গপনিবেশিক কামসাহিত্যের ধারাবাহিকতার যুগোপযোগী 'প্রতিসরণ' 
(91100772170 এবং পুনঃস্থাপন*ই (1619০9018) ভবানীচরণের দৃতীবিলাস 
কাব্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। 


কলির কীর্ভি/কেরানিবৃত্তি 

জয়ন্ত গোস্বামীর দীর্ঘ পরিশ্রমলবধ গবেষণাবই সমাজচিত্রে উনবিংশ শতাব্দীর 
বাংলা প্রহসন-এ প্রায় ৫০৫ টি উনিশ শতবীয় প্রহসনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা বা নাম 
রয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ৩১টির শিরোনামে কোনো না কোনোভাবে কলিযুগের 
প্রত্যক্ষ উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতীয় পুরাণকল্পনায় কলিযুগের বিবরণ একটি 
সুপ্রাটীন বিষয় হলেও উনিশ শতকের ওঁপনিবেশিক সমাজের একটি পরিচিত 
ঘরানা হিসেবে সমকালীন সময়কে “কলিযুগ' হিসেবে বিশেষভাবে চিহিত করার 
পিছনেও যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমাজতাত্বিক কারণ থাকতে পারে এবং 
ওপনিবেশিক সমাজমনের এক বিস্তৃত অনালোকিত অংশকে তা প্রকাশ করতে 
পারে, এই বিষয়টি তাত্বিক আধারে ধরেছেন গবেষক সুমিত সরকার” তিনি 
দেখিয়েছেন ওঁপনিবেশিক আধিপত্য, অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক 
পরিবর্তন, বিশেষত পাশ্চাত্য জ্ঞান-যুক্তি-এনলাইটেনমেন্ট দেশীয় সমাজে যে 
বিপুল ভাঙাগড়া, উত্থানপতন ও সমাজস্থিতির অদলবদল ঘটায়, তার প্রভাব, 
প্রতিক্রিয়া ও অভিঘাত সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পড়েনি। রামমোহন- 
বিদ্যাসাগর-বঙ্কিম-কেশবচন্দ্র প্রমুখ তথাকথিত নবজাগরণের লকব্বপ্রতিষ্ঠ প্রতিনিধিরা 
“কলিযুগ” ঠিক উলটো, এখানে সময়ের রৈখিক প্রগতির বদলে চক্রাকার 
সময়মাত্রার (০/০1109] 076) অধঃপতিত, ক্ষয়িষু স্তরটির বিবরণই প্রাধান্য 
পায়। তুলনামূলক 1)121-01041৩এর জগতে “কলিযুগ” একটি হাঙ্কা ঠাট্টা 
তামাশার উপাদান হলেও, “কলিযুগ'-সাহিত্যের লেখকেরা এই যুগটিকে অবক্ষয়ের 
চরম স্তর হিসেবে চিহ্নিত রেছেন। এই সাহিত্যের সাপেক্ষে নিন্নবর্গীয় 
117051111150191-র এক বিস্তৃত জগতের সন্ধান পাওয়া যায়। এ হল এমন 
এক ধরনের নিম্ন মধ্যবিত্ত জগৎ: অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কলকাতা, মফষল শহর 
বা গ্রামের পড়স্ত উচ্চবর্ণীয় ব্রান্মাণ পণ্ডিত (এদের 09410017591] 1106150-ও 
বলা যায়), সেই সঙ্গে ইংরেজি শিক্ষা অল্পবিস্তর পেয়েও যাঁরা বিশেষ বস্তগত 
সাফল্যের মুখ দেখেননি, প্রতিষ্ঠিত-উকিল-ডাক্তার-অধ্যাপক-সাংবাদিক-লেখকদের 

১৮ 


ভুমিকা 
চেয়ে অনেকটা নীচে পড়ে-থাকা ভদ্রলোক চাকুরিজীবী স্কুলশিক্ষক এবং সর্বোপরি 
অফিসের কেরানি-_-এই অস্তর্বততী স্তরের চৈতন্যে কলিযুগ ভাবনা একধরনের 
প্রভাব ফেলেছিল, তা কলিযুগ সাহিত্যের প্রচলিত টেকস্টগুলি পড়লেই বো! 
যায়।১৮ 
কলিযুগ-কল্পনার বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় মহাভারতের বনপর্বে। মার্কণেয় 
মুনি যুধিষ্ঠিরকে বলেছেন: সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর যুগের পর কলিযুগ আসবে। রাজারা 
তখন হবে অত্যাচারী, ল্েচ্ছ। ব্রাহ্মাণেরা স্বীয় কর্তব্য, জ্ঞান, আচাব নিমৃত হয়ে 
অধিকার কেড়ে নেবার চেষ্টা করবে; মেয়েরা স্বয়ংবরা হু, স্বামীদের শাসন 
করবে, বিবিধ যৌন ব্যভিচার দেখা দেবে। অনাবৃষ্টি দুভভি'ক ইত্যাদির মধ্য দিয়ে 
প্রাকৃতিক দুর্যোগে কলিযুগের সমাপ্তি ঘটবে, মহাপ্লাবনে পৃথিবী ডুবে যাবে__ 
তারপর বিশাল সমুদ্রের মধ্যে ছোট্র দ্বীপে বালক নারাঘণের শরীরের ভিতর 
দেখা দেবে নতুন সত্য যুগের সুচনা। আরম্ভ হবে আর একটি চশ্র”দর্ত চতুর্যুগ। 
রাজাদের দমন করে সত্য যুগের সুচনা করবেন।১৯ পরবর্তী পুরাণ-পপুরাণ 
সমূহেও কলিযুগের নেতিবাচক দিকগুলি ফুটে উঠেছে, বৌদ্ধ ও তান্ত্রিক 
ভাবধারার সঙ্গে একত্র হয়ে। অর্বাচীন কক্কিপুরাণে কলিযুগের প্রতিভূ 
বিশাসনপুরের রাজা কলি। কলির সেনাবাহিনীতে নানা শ্লেচ্ছ জাতি ও 
চণ্ডালরাও সামিল। কীকটপুরের বৌদ্ধদের কক্কি দন করেন। কলিপ নাজাশাসনে 
পুরুষরা রমণীদের শাসনাধীন। সব ধরনের তথাকথিত 'অনাচার' দমন করে 
ব্রাহ্মণদের আচার ও প্রাধান্য এবং কঠোর জাতিভেদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, কাম্য 
নৈতিক আদর্শ হিসেবে অধিকার-ভেদভিত্তিক চতুর্বর্ণের “সত্যযুগ'কে ফিরিয়ে 
আনাই বিষ্ণুর অবতার কক্কির উদ্দেশ্য।০ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যেমন 
কক্ষিপুরাণের বঙ্গানুবাদ ছাপা হয়, তেমনই বিভিন্ন ধরনের লেখায় কলিযুগের 
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কল্পনা প্রকাশিত হতে শুরু করে। এই বইগুলিতে কলিযুগের 
মূল লক্ষণ: ল্লেচ্ছ রাজা, অধঃপতিত ব্রাহ্মাণ, উদ্ধত শুদ্র, মেয়েদের হাতে 
অতিরিক্ত ক্ষমতা ও মেয়েদের ব্যভিচার, স্বামীকে বশ করে রাখা, যুক্তিবাদের 
প্রভাবে ধর্মের অবক্ষয়, অর্থগৃধু স্বার্থপর দম্পতির কারণে যৌথ পরিবারের 
ভাঙন, সর্বোপরি অতি সাধারণ চাকুরিজীবী কেরানিদের ভয়ানক দুরবস্থা। উনিশ 
শতকের বাংলাদেশে দ্রুত পরিবর্তনের ফলে যেসব সামাজিক বদল ঘটে চলছিল, 
একধরনের বিশেষ স্তরের সমাজমনের কাছে সেই পরিবর্তনগুলি হয়তো এধরনের 
সুপরিচিত “চিহ" সমূহের ভিতর দিয়েই ধরা পড়ছিল। যে নির্দিষ্ট সামাজিক 
ংশের কথা আগে বলা হয়েছে, নতুন যুগের পরিস্থিতিতে ততটা মানিয়ে-নিতে- 
না-পারার ফলে তাদের হতাশা, উৎকণ্ঠা, পশ্চাৎপদ রক্ষণশীলতায় আস্থা খুঁজতে 
চাওয়ার মধ্যেই এই বিশেষ লক্ষণগুলিকে সর্বজনীন করে তোলার ব্যাখ্যা মিলতে 
পারে। বর্তমান সংকলনের কলিকুতুহল, সপত্বী নাটক, কেরাণিপুরাণ, ভ্যালারে 
মোর বাপ-_সবকটি বইতেই উপরোক্ত কলিযুগের লক্ষণগুলি কমবেশি বিদ্যমান। 


১৪) 


দুষ্প্রাপা বাংলা সাহিতা 


১৮৬০ সালে প্রকাশিত শ্রীহরিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রচিত কলির রাজ্যশাসন 
বইতে কলিরাজার প্রভাবে যে ভয়াবহ সামাজিক অনাচার সমূহ সংঘটিত হবে, 
তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। কলির যোগ্য সহচর এখানে কাম, মোহ, মদ, 
মাৎসর্য প্রভৃতি রিপু। এমনকি ক্রোধের পত্রী “দ্বেষ', লোভের পত্বী 'অসস্তোব'ও 
এই অভিযানে সামিল। কলির ইচ্ছা তার রাজত্বে প্রবঞ্চনা, দাসকর্তৃক প্রভুহত্যা, 
কুলীনের বহুবিবাহ, কুলীনকন্যাদের পরপুরুষে আসক্তি, বৈষ্ঞবদের মদ্য মাংস 
ভক্ষণসহ কৃষ্তনাম গ্রহণের মতো পাপাচার ঘটবে। কিন্তু এই টেকস্টে 
সমকালীনতার অনুপ্রবেশ ঘটেছে অদ্ভুতভাবে। ব্রিটিশ তথা ইউরোপীয় রাজশক্তির 
প্রভাবেই যে আমাদের নিজস্ব সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে বসেছে, সেকথা 
বোঝাতে লেখক কয়েকটি আশ্চর্য গল্প ব্যবহার করেছেন। স্বয়ং লোভ “অহিফেন' 
বা আফিং রূপ ধারণ করে এবং “মোহ” চরসরূপ ধারণ করে দিখ্িজয়ে 
বেরিয়েছে। আর “কাম “মদ' রূপ ধারণ করে কালাপানি পেরিয়ে ব্রিটিশ 
জাতিরও সর্বনাশ সাধন করেছে : 

সুরা কন ক্ষমা কর এ দাসের দোষ ধর 
এ জন্মে সাধিব তব কার্য্য। 
আনি দেহ ইস্টিমার হইয়া সাগর পার 
বশ করি আসি সেই রাজ্য।।... 
শুনে কলি দেন সায় আজ্ঞা পেয়ে মদ যায় 
উপনীত বিলাত নগরে। 
ছুটিল সৌরভ তার পেয়ে সেই সমাচার 
জয়ধবনি প্রতি ঘরে ঘরে ।।... 
চোলে যেতে টলে পদ হয়ে ভাবে গদগদ 
আধ আধ বচনে বচন। 
মাতিল যতেক গোরা যেন নদিয়ার গোরা 
নদে ছেড়ে বিলাত গমন।। 
পাইয়া সুরার তার নানাবিধ নাম তার 
রাখিলেন ইংরাজ সকল। 
ব্রান্ডি আর ওয়াইন সুধার স্যাম্পেন জিন 
যার গন্ধে ক্ষিতি টলমল || ২১ 
স্পষ্টতই “কলিযুগ+ কল্পনাব যে মাত্রা এখানে চিহ্নিত, তাতে ওঁপনিবেশিক শাসক 
গোষ্ঠীকেও অধঃপতিত বর্তমানের ছকে ফেলে দেখানো হয়েছে। নারায়ণ চট্টরাজ 
প্রণীত কলিকুতুহল বইতেও কলির আধিপত্য ও দিথিজয়ের প্রসঙ্গে 
সমকা্সীনতাকে গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে কলি ভার নতুন রাজধানী নির্মাণ 


বাণিজ্য করা কপটে সুরধুনীপুবর্বতটে 
বিরচিল অপূর্ব নগরী।। 


এইরূপ মনোহর নিম্মাণ করি নগর 
কলিকর্ত বলি রাখে নাম। 
গুণনিধি কহে সার কলি তব এইবার 
পরিপূর্ণ হবে মনস্কাম।। 
এই বইতে মহাদেবের কাছ থেকে বরপ্রাপ্ত হয়ে কলি তার অনুচরদের সঙ্গে মন্ত্রণা 
করেছে। অনুচরেরা যথাক্রমে কন্দর্প, দ্বেষদ্ত এবং মায়ামোহ। কন্দর্পের প্রভাবে 
বসন্তের আগমন, কামিনীদিগের কামোত্তব ও যুবাগণের বিবেকনাশ ঘটেছে। 
রমনীগণ কামের প্রভাবে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে গৃহাভ্যস্তরে অনাচার ঘটাচ্ছে, 
নিজের দাদার শয্যায় উপগত হচ্ছে: 
মদনমদঅলসে / প্রদোষে নিদ্রার রসে/ 
শয়নে আছি বিরসে / দাদার শয্যায় গো।।... 
আছি গৃহ অন্ধকারে / কেবা বল দেখে কারে / 
দাদা অবিজ্ঞতসারে /শুতিল তখনি গো।। 
বধূত্রমে দাদা মোরে / চুন করে অধরে / 
ধৈর্য্য কি তেজিয়া ধরে / অমনি ছুটিল গো।। 
কলির প্রভাবে যুবকগণের বিবেকনাশ অংশে কামের নিন্নাভিমুখী, ধ্বংসাত্মক 
গতি সম্পর্কে বলা হচ্ছে: পাপালয়ে হয় যদি নারী / তথাপি তাহারে কভু 
তেজিতে না পারি।। / ...পরলোকে হৈলে দুঃখ কে দেখিবে পরে / এখনতো 
করি মজা ঘরে কিম্বা পরে।। / আর জন কহে এত ভাব কেন ভাই। / 
রম্শীসঙ্গমে পাপ তাপ কিছু নাই।। / ...যে জন না দেখিয়াছে বেলাতী ষোড়শী। 
/ সেই বলে সুললনা স্বর্গের উবর্শী।। 
এখানে এঁতিহ্যগত যুগকল্পনা প্রত্যক্ষ বর্তমানকে আত্মসাৎ করতে চাইছে। 
কলির সহচর “ঘ্বেব দর্ভ -র প্রভাবে শাক্ত ও বৈষ্ঞবের ভিতর তীব্র দ্বন্দের সুচনা 
হল। ক্রোধ রিপুর বশবতী হয়ে বৈষ্ণব শাক্তকে বলছে: “আমি তন্ত্র শুনিয়াছি 
ও পণ্ডিত সমাজেও বাস করিয়াছি কিন্তু “মাদারচোত” তন্ত্র কখন শুনি নাই 
এবং মাদারচোত পণ্ডিতের সহিত কখন বসবাস করি নাই...” এই শ্যাং ব্যবহার 
এই টেকৃস্টের পাঠকসমাজ ও পাঠরুচি সম্পর্কে খানিকটা আন্দাজ পেতে সাহায্য 
করে। সমগ্র মধ্যযুগের বাংলায় শাক্ত-বৈষ্ঞবের কলহ একটি প্রচলিত ঘটনা, কিন্তু 
সমকালের ফ্রেমে সেই ইতিহাসকে ধারণ করা এক ভিন্ন ন্যারেটিভের জন্ম দেয়। 
কলির অপর দুই সহচর মায়া, মোহ এবার ইউরোপীয় মিশনারি রূপে হিন্দুধর্মকে 
ধ্বংস করতে উদ্যত হল: 
ভারত সাআজ্য পেয়ে মায়ামোহচর। 
ভাবে কিসে হবে ধর্মভ্রষ্ট সব নর।।... 
এই হেতু দেশে যবে আসে মিসনরী। 


২১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


আজ্ঞা দেন তা সবারে ভাসাইতে তরী।।... 
এই লাগি জানি তারা ভিন্ন অধিকার। 
শ্রীরামপুরেতে বাস করিল প্রচার।।... 
তাহাদের সমাশ্রয় লয়ে রী। 
আরম্তিল ধন্মকৃষি মার্শমেন কেরী।। 
হাটে মাঠে যীশুবীজ করিতে বপন। 
নিযুক্ত হইল যত প্রভুদূতগণ।। 
হিন্দু পণ্ডিত ও খ্রিস্টান মিশনারির ধর্মীয় বাগ্বিতগ্ডা আঠারো-উনিশ শতকের 
সামাজিক ইতিহাসের ভগ্নাংশকেই উপস্থাপিত করে। একইভাবে ব্রাঙ্দ যুবক ও 
ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ধর্মকলহও এই টেক্স্ট-এর প্রত্যক্ষ সমকালকেই হাজির করেছে। 
তবে কলিকৃতুহল-এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ "আদিসুর রাজার বেশে কলির 
তম্মহিধীতে উপগর্তি এবং “কলি-অংশে বল্লাল সেনের জন্ম এবং কুলমর্য্যাদা 
স্থাপন” । উনিশ শতকের মধ্যভাগেও কৌলিন্যপ্রথার বিষময় পরিণাম বাংলার 
সমাজে দৃশ্যমান ছিল এবং শিক্ষিত এলিটের একটি প্রধান অংশ এই প্রথার 
বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, বিধবাবিবাহ ও বছবিবাহের স্বপক্ষে-বিপক্ষে সামাজিক 
মতামত ও বিতর্কে সরগরম ছিল পত্রপত্রিকা ও ছাপাখানা । সেই সোস্যাল 
আযাক্টভিজম সমাজসংক্কারমূলক অসংখ্য ডিসকোর্সের জন্ম দিয়েছিল। নারায়ণ 
ট্টরাজের এই বই তথাকথিত এলিট ঘরানার বাইরে থেকেও সেই চলমান 
“ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিসে অংশগ্রহণ করেছে। এক্ষেত্রে পুরাণক্না, ইতিহাস, 
লোকশ্রুতি__-সবই মিলেমিশে গিয়েছে বর্তমানের প্রেক্ষিতে । “কুলীন কন্যাগণের 
দুর্গতি এবং “অকৃলীন ব্রাঙ্গণদিগের বিড়ন্বনা৯"অংশে বল্লাল সেনকে সমালোচনায় 
বিদ্ধ করা হয়েছে, “কলির স্ত্রী পুরুষ প্রভৃতির ব্যবহার'-কে বল্লাল সেন প্রবর্তিত 
কুপ্রথার অবশ্যন্তাবী ফল হিসেবে দেখানো হয়েছে, আর কলিকুতুহল-এর অস্তিম 
পর্বে 'অথ বিধবাবিবাহের আয়োজন” অংশে: 
আবাল বিধবা যারা মরি মরি কত তারা 
ক্লেশ সহে পতির বিরহে। 
সদা ভাবে হে ঈশ্বর এ যন্ত্রণা ঘোরতর 
ঘুচাও নতুবা প্রাণ দহে।।... 
বুঝি এই অনুরোধে করুণা কর্তব্যবোধে 
তা সবার স্বপক্ষে ঈশ্বর। 
অনুভবে জেনেছি অস্তর।। 
এখানে ঈশ্বর" আর কেউ নন, স্বয়ং “করুণাসাগর' ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ১৮৫৫ 
সালে প্রকাশিত হয় বিদ্যাসাগর রচিত বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা 
এতদ্বিবয়ক প্রস্তাব প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড। ঠিক তার দু'বছর আগে লেখা 
কলিকুতৃহল বইতে অখ্যাত লেখক নারায়ণ টট্টরাজ ঈশ্বরচন্দ্র ও বিধবাবিবাহ 


২ 


ভূমিকা 
আন্দোলনের স্বপক্ষে মত প্রকাশ করছেন। উনিশ শতকের “পপুলার সংস্কৃতি 
হিসেবে “কলিযুগসাহিত্য” রক্ষণশীলতাকেই সমাজসংরক্ষণের একমাত্র মাপকাঠি 
ধরে নিয়েছিল-_এই ধারণাকে স্বীকার করেও বলতে হয়, সেযুগের পক্ষে 
বৈপ্লবিক সমাজসংস্কারমূলক কষ্ঠস্বরগুলিকেও এখানে গুরুত্ব সহকারে ঠাই দেওয়া 
হয়েছে। এভাবেই এঁতিহ্যের ধারাবাহিকতা সমকালীনতার চাপে নানাবিধ 
“ছেদ'-এর সম্মুখীন হচ্ছে__ এখানেই এই টেকৃস্টগুলির গুরুত্ব। 


জ্ঞানাঙ্কুর পত্রিকার পৌষ, ১২৮২ বঙ্গাব্দ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল একটি 
রম্যগদ্য: 'কেরানী মেমোরিয়েল”। সুরলোকে প্রজাপতি ব্রহ্মার এজলাসে জনৈক 

পৃথিবীতে যদি কোন অবসরশূন্য দুর্ভাগ্য জীব থাকে তবে সে 

. বঙ্গীয় কেরানী। ঘন্মাক্ত কলেবরে অর্থোপার্জন করিয়াও যাহার 

অন্নকষ্তট দূর হয়না সস্তানগুলিকে মানুষ করিবার জন্য যাহার 

বিব্রত হইয়! বেড়াইতে হয়--পরিবারের মোটা ভাত, মোটা কাপড় 

জুটিয়া উঠা যাহার পক্ষে ভার হয়__ওঁষধ, পথ্য ও ডাক্তারের 

দর্শনী অভাবে যাহার পরিবারবর্গের রোগোপশম হয় না-__ 

প্রতিবেশিনীর ন্যায় বন্ত্রালঙ্কার হইল না বলিয়া যাহার রমনী শত 

শত ধিকার দিতে থাকে এমন ব্যক্তি পৃথিবীতে কে আছে? বঙ্গায় 

কেরাণী। ২২ 

কেরানিজগতের দুঃখদুর্দশার বর্ণনা উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের কলিযুগ- 
কল্পনার একটি কেন্দ্রবিন্দু। কেরানিজীবন নিয়ে রচিত অসংখ্য লেখালেখির মধ্য 
দিয়ে এই জগতের বেদনা বর্ণনার একটি বিশেষ ধরন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। 
“রামকৃষ্ণ কথামৃতে”ও কামিনী-কাঞ্চন এবং কেরানির চাকরিজীবনের দাসত্বের 
কথা মিলেমিশে গিয়েছে কলিযুগের অন্যতম লক্ষণ হিসেবেই। যেহেতু স্কুলকলেজ 
উত্তীর্ণ কমবেশি ইংরেজিশিক্ষিত এক বিপুল “ভদ্রলোক শ্রমশক্তি নিয়োজিত 
হয়েছিল এই পেশায়, তাই কেরানিজীবনের সুত্রে অধঃপতিত “কলিযুগে” এক 
বৃহৎ নিন্নবর্গীয় হিন্দু ভদ্রলোকজীবনের অস্তর্বেদনা প্রকাশিত হয়েছে এইসব 
লেখায়। এই মানুষদের চৈতন্যের জগতে হতাশা, ভয় ও উৎকণ্ঠার কারণ নিছক 
অর্থনৈতিক নয়, বরং অধস্তন মানসিকতায় সম্পূর্ণ বিজাতীয় পরিবেশে, নতুন 
কর্মসংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা, অত্যধিক কাজের চাপ, ঘড়ি-মাপা 
সময়ের কঠোর শৃঙ্খলে বাঁধা কাজের ধরন, ধনতান্ত্রিক সমাজের নিয়মানুবর্তিতা, 
সময়ের অনুশাসন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে সর্বদা অবদমিত হবার আশঙ্কা 
-_ এগুলিই বড় হয়ে উঠেছে এখানে। সেইসঙ্গে পূর্বের টিলেঢালা অনুশাসনবিহীন 
সময়মাত্রার সঙ্গে নতুন সময়সংস্কৃতির বিরোধও এই কেরানিমনের বেদনার 
অন্যতম কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।২ পূর্বোক্ত 'কেরানী মেমোরিয়েল' রচনায় 
বলা হয়েছে: 

ইহাদের আহারের, অবকাশ নাই, নিদ্রার অবকাশ নাই। প্রাতঃকালে 

১৬০] 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


উঠিয়াই ন্নানের উদ্যোগ- ক্রমে স্নান, আহারের কথা কি-_নাকে মুখে 
প্রদান মাত্র।... অমনি আপিস অঞ্চলে দৌড়। আপিসে গমন করিয়া 
নানাবিধ ফরমাইস সরবরাহ করিতে হয়। তাহার উপর আবার... 
বাজেওয়ালার পদাঘাত, ব্লডিনিগর প্রভৃতি সুধাময় সম্বোধন সহ্য 
করিতে হয়। রাত্রে বাটী আসিবার সময় মুলতবি কাজের প্যাকেট 
বগলে করিয়া আনিতে হয়... 
প্রায় সমসাময়িক অন্য একটি নাটকেও কেরানিজীবনের নিয়মানুবর্তিতার জীতাকল 
সম্পর্কে দুই কেরানির কথোপকথন: 
নন্দ। না হে সাহেবটা বড় 50100 ১১টা বেজে গেলে যদি অফিসে 
যাই তাহলে বড় রাগ করে। 
হীরা। বলি তুমি ত বড়বাবু তোমার উপরেও জুলুম হয় নাকি? 
নন্দ। আমার উপর সেরকম নয়, তবে 701 ০1611.-দের 
০1)০1-এ রাখা চাই ত-_সেইজন্য 20500061706 7651561- 
টা 111000900০০ করিছি। ...এতে একটা সুবিধেও আছে-_ 
সকলেই ভয় করে।২৪ 
এই বিবরণের প্রায় প্রত্যেকটা দিকই নিপুণভাবে ধরা পড়েছে বর্তমান 
সংকলনের কেরানীপুরাণ বইতে। তবে কেরানীপুরাণএর অন্তিম অংশে 
কেরানিজীবনের দুর্দশা থেকে মুক্তির যে দিক্নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তার ভিতর 
জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বেরিয়ে আসে। লেখকের মতে 
কেরানিদের দুরবস্থার কারণ মূলত তারা নিজেরাই। তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে 
বাঙালি জাতির উদ্যমহীন চরিত্রের প্রধানতম বহিঃপ্রকাশ নিছক কেরানিবৃত্তিকেই 
ও উডিএবপীিাুঃজি১৪ি ২৯৮৯ 
উদ্যোগে অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সমগ্র জাতির দুর্দশামোচনের চাবিকাঠি লুকিয়ে 
রয়েছে। পূর্বোস্ত “কেরানী মেমোরিয়েল” রচনাটিতেও “কেরানি-প্রধান' 
উদ্যমশূন্যতা”কে দোষারোপ করে বলা হয়েছে: “যতদিন তাহারা স্বাধীন বৃত্তি 
অবলম্বন করিতে না পারিবে, ততদিনে তাহাদের... পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইবে না। 
জাতীয় গৌরব রক্ষায় তাহাদের যত্বু নাই, যে পরিমাণে সেই যত্বু হইবে, সেই 
পরিমাণে তাহাদের উন্নতি হইবে এভাবেই জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্সের এক 
বিশেষ চেহারা প্রকট হচ্ছে এখানে । যে উন্নয়ন-মূলক ডিসকোর্সের ভিতর ঢুকে 
পড়ছে হতভাগ্য কেরানিজীবন নিয়ে লেখা অখ্যাত রলচয়িতাদের “কলিযুগ” 
আখ্যান, বাস্তবতার উপাদান রদবদল ঘটাচ্ছে মিথের শরীরে। 


সপত্বীসমস্যা, দাম্পত্যসংকট, “কলির বউ হাড়জালানী 

উনিশ শতকীয় “ভদ্রলোক চৈতন্যে পাশ্চাত্য জ্ঞান-যুক্তি-এনলাইটেনমেন্ট প্রবেশ 
করেছিল ইউরোপের সঙ্গে হুবহু এঁক্যের ভিত্তিতে নয়। বরং “পার্থক্যের 
(161217০০) সাপেক্ষে। পাশ্চাত্য “আধুনিকতার কোন্‌ কোন্‌ উপাদান দেশীয় 
প্রেক্ষিতে কতখানি গ্রহণযোগ্য, কীভাবে গ্রহণযোগ্য, দেশীয় বাস্তবতার সাপেক্ষে 


২৪ 


ভূমিকা 
তার কতটা অদলবদল ঘটানো দরকার, কতটাই বা তার কার্মকারিতা-_এ সম্পর্কে 
চুলচেরা বিশ্লেষণ উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের পত্রপত্রিকায় শুরু হয়। বিশেষত 
জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়গুলি ক্রমাগত 
আলোচনার কক্ষেত্র' হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে পরাধীন “জাতির চৈতন্যে “অন্দর'/ 
“বাহির বিভাজনটি (11761 00712178/011051 00177911)) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 
হয়ে ওঠে। বাইরের বাস্তব কর্মময় জগতে আমরা ব্রিটিশের পদানত। সেখানে 
আমাদের “স্বাধীনতা” নেই। তাই পরাধীন “জাতির আপেক্ষিক স্বাধীন ক্ষেত্র 
হিসেবে “গৃহাভ্যন্তর”টি অনেক বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে এবং সেই সঙ্গে বাঙালি 
হিন্দুর পরিবার, দাম্পত্যসম্পর্ক, পরিবারে মা, স্ত্রী, বিশেষত নারীর ভূমিকা নিয়ে 
নতুনভাবে মতামত গড়ে উঠতে থাকে। “পরিবার যদি হয় কাল্পনিক 
'জাতিরাষ্ট্রের একক, তবে আদর্শ গৃহনির্মাণ-এর (1)90591)010-1917)117) 
ধারণাটি হয়ে দাঁড়ায় সবচেয়ে জরুরি ইতিকর্তব্য, কারণ 'গৃহ-দাম্পত্য- 
করে নেবার মধ্যেই রয়েছে আপেক্ষিক স্বরাটত্ব অর্জনের চাবিকাঠি। তাই একদিকে 
যেমন হিন্দু পরিবারের অভ্যন্তরীণ কুপ্রথাগুলির বিরুদ্ধে লাগাতার কলম চালনার 
চারিত্রিক আদর্শ হয়ে ওঠে এক নতুন “ডিসকার্সিভ' ক্ষেত্র।২« উনিশ শতকের 
প্রথমার্ধ থেকেই কৌলীন্য প্রথা, পুরুষের বহুবিবাহ এবং নারীর সাপত্যু তথা হিন্দু 
উচ্চবর্ণীয় পরিবারের সপত্বীসমস্যা নিয়ে সচেতনতা গড়ে ওঠে। ঈশ্বরচন্দ্র 
বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার দত্ত, ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ যেমন বিষয়টির 
গভীরে গিয়ে সচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা চালায়, তেমনই ১৮৫৪ সালে 
রামনারায়ণ তর্করত্বের কৌলীন্যপ্রথাবিরোধী কুলীনকুলসর্ব্ষ নাটক থেকে শুরু 
করে বিপিনবিহারী সেনগুপ্তর হিন্দুমহিলা নাটক (১৮৬৬), রামনারায়ণের নবনাটব 
(১৮৬৬), দীনবন্ধু মিত্রের জামাইবারিক (১৮৭২), হরিশচন্দ্র মিত্র-র সপত্ীকলহ 
(১৮৭২), হরচন্দ্র ঘোষের সপতীসরো (১৮৭১), মনোমোহন বসু-র প্রণয়পরীক্ষা 
(১৮৬৯), এমনকি দামোদর মুখোপাধ্যায়ের সপত্ী (১৯০৪) পর্যস্ত অসংখ্য 
নাটকে কৌলীন্য ও সপত্বী-সমস্যাকে চিত্রায়িত করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে 
গোড়ার দিকের রচনা হিসেবে তারকচন্দ্র চুড়ামণি-র সপত্ী নাটক-এর (১৮৫৮) 
এঁতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। এই নাটকে তিন বিবাহিতা অথচ স্বামীসঙ্গবঞ্চিতা 
কুলীন কন্যা কাদঘ্বিনী, নিতদ্বিনী ও চঞ্চলার কথোপকথন থেকে জানা যায় ভূধর 
প্রথম স্ত্রী সৌদামিনী থাকা সত্তেও দ্বিতীয় বিবাহের উদ্যোগ নিচ্ছেন। সৌদামিনী 
সম্তানহীন, তদুপরি ভূধরের মা ও বোন মনে করে সৌদামিনীর প্রতি ভূধরের 
আকর্ষণ ও আনুগত্য দূর করা দরকার, তাই তারা উদ্যোগ নেয় ভূধরের দ্বিতীয় 
বিবাহের। উপরোক্ত অন্যান্য নাটকগুলির মতোই এখানেও স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের 
আয়োজনে স্ত্রী সৌদামিনী মানসিক যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ে। নাটকের শেষে সে 
আত্মহত্যার ব্যর্থ চেষ্টা করে। কুচন্রী শাশুড়ি তাকে পারিবারিক গুরুদেব 
রসিককৃষণ গোস্বামীর কাছে পাঠায় গুরুদেবের শারীরিক আসঙ্গলিক্সা চরিতার্থ 


২৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


করার জন্য। এই সবকটি নাটকেই স্বামীর ভালোবাসা, যত্ন, তার উপর 
আধিপত্যের মাত্রা, নিজের সন্তানদের অধিকারের সীমা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করেই 
সপত্বীরা কলহপরায়ণ হয়ে উঠেছে ও এর ফলে গোটা পরিবারই প্রভাবিত 
হয়েছে। নবনাটক-এর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী চন্দ্রকলা স্বামীর প্রতি কোনো পৃথক 
ভালোবাসা, মমতা বা শ্রদ্ধা পোষণ করে না, কেবল নিঃসপত্ব অধিকারের 
সাপেক্ষেই স্বামীর মূল্য নির্ধারণ করে সে: 

পরশে কাঞ্চন তার তাও লোকে রটে। 

কিন্ত সে পরশ যদি অন্যে গে পরশে, 

অমনি পুরুষ হয়ে সে পরশ বসে... 

কদাচ কটাক্ষ- পাতে অন্যে যার নাই, 

সহস্র বদনে দিদি তার গুণ গাই। 

কানা, খোঁড়া, কুঁজো, অন্ধ, হয় বা বধির, 

অথবা নির্ধন কিম্বা কুৎসিত শরীর। 

অন্য নারী পিশাচীতে যে আবিষ্ট নয়, 

তাহার রমণী ধন্য সর্বলোকে কয়।২৬ 


প্রণয়পরীক্ষা নাটকেও সপত্রীর প্রতি বড় বউ মহামায়া ঈর্ধাপরায়ণ। সে বলে: 
আমরা দু সতীনে যেন তৌলে উঠবো, আর তার মন যেন তার 
কাটা হবে, সেই কাটা যদি আমার দিকে ঝৌকে, তবে সব বজায 
থাকবে; যদি সমান থাকে, তাতেও থাকবে, আর যদি ছোট বৌর 
দিকে ঝোকে, তবে সব মরবোখ। ০, 
কিন্তু অচিরেই হিন্দু পরিবার, গৃহস্থালি, গৃহের অভ্যন্তরে স্ত্রীর কর্তব্য, শ্বামী- 
স্ত্রীর সম্বন্ধ, পরিবারে মায়ের অবস্থান সংক্রান্ত এক নতুন “ডিসকার্সিভ আদর্শের 
জন্ম হয়। অর্থাৎ প্রচলিত হিন্দু পরিবারের অভ্যন্তরের অপকৃষ্ট রুচি, “অনাধুনিক 
রীতিনীতির স্থলে এক নব্য “আধুনিক আদর্শায়নের প্রক্রিয়া সূচিত হয়। অস্ত্য- 
উনিশ শতকের এই লেখালেখিতে যেন অনেক ক্ষেত্রেই প্রাচীন হিন্দু এতিহ্যকেই 
নবকলেবরে “আধুনিক পরিবারের অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় প্রতিস্থাপিত করার প্রয়াস 
দেখা যায়, কিন্তু খুঁটিয়ে লক্ষ করলেই বোঝা যাবে এ নিছক এতিহ্যের 
পুনরাবিষ্ষার নয়, বরং আমাদের সম্পূর্ণ পৃথক এক নিজস্ব “আধুনিকতা”র 
সাপেক্ষে এতিহ্যের পুনরির্ষাণ। স্বামী-্ত্রী যে পরস্পরের পরিপূরক, তাদের সম্বন্ধ 
যে দৈনন্দিন দেনাপাওনার চেয়েও অনেক বেশি গভীর আধ্যাত্মিকতায় মণ্ডিত, 
পরিবারের সুখশাস্তির জন্য যে রমণীর ভূমিকাই সবচেয়ে বড়__এহেন তাত্বিক 
কাঠামো নতুনভাবে নির্মিত হতে শুরু করে। তথাকথিত “পশ্চাৎপদতা” ঘুচিয়ে এ 
যেন এক নতুন কল্প-এঁতিহ্যের পুনঃস্থাপন, যার সাপেক্ষে আমাদের “আধুনিকতা"র 
সম্পূর্ণ পৃথক অ-ইউবোপীয় নিজন্বতার ক্ষেত্রটিকে চেনা যায় 1 শুধু তাই নয়, 
আদর্শ গৃহিণীর' কর্তব্য সংক্রান্ত নব্য ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে উনিশ শতকীয় 


৬ 


ভূমিকা 


দৃষ্টিকোণ থেকে দৃঢ়মূল করে তোলে। গৃহলঙ্ষ্মী ৮৮৪) অথবা জয়কৃষ্ণ মৈত্র 
রচিত রমণীর কর্তব্য ১৮৯০) জাতীয় অসংখ্য বইপত্র এই নব্য পুরুষতান্ত্রিক 
জাতীয়তাবাদকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।২৯ ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত, ভোলানাথ 
মুখোপাধ্যায়ের ভ্যালারে মোর বাপ প্রহসনটি সেই পুরুষতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের 
একটি সুলভ বাজারচলতি চুল রূপ, যেখানে অতিরিক্ত স্ত্রীবশ্যতা পুরুষকে 
কীভাবে নিবীর্ধ করে তোলে, তার একটি রং-চড়ানো চালু প্যাটার্ন অস্কিত 
হয়েছে। সমকালীন দুটি প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিক উল্লেখ প্রহসনটির অন্তর্গত চরিত্র 
বুঝতে সাহায্য করবে। ১৮৯৪ খিস্টাব্দে বামাবোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত একটি 
লেখায় সন্তানের জীবনে মায়ের ভূমিকা সম্পর্কে বলা হয়েছে: 
ভগবানের প্রকৃতিরূপা, সন্তানের সাক্ষাতে সাক্ষাৎ ঈশ্বরী মাতৃদেবীর 
প্রতি ভক্তি ও উপাসনায় সন্তান যে মোক্ষলাভের অধিকারী হয়, সে 
কথা...বুঝিতে ...পারিলে, মাতৃভক্তির খনি, আর্য্ভূমি ভারতবর্ষ 
আজি ভক্তিহীন সম্ভানদিগের জন্য মরুভূমিপ্রায় হইত না।... যে দেশে 
সন্তানের হৃদয়ে মাতৃভক্তি আছে, সে দেশে ব্বর্গের চিত্র আছে। যে 
মানব প্রকৃত মুক্তির আকাঙঙ্ী, সে আগে মাতৃভক্ত হউক; সে যাহা 
চাহে তাহাই পাইবে।... এমনও দেখা যায় যে স্বার্থপরতাতেই হউক 
বা আর যাহাতেই হউক, স্বামী-স্ত্রীর হৃদয় বিচ্ছিন্ন হইয়াছে, এমনও 
দেখা যায় প্রাপ্ত বয়সে পুত্রকন্যা, ধন মান, বিদ্যা বুদ্ধি, সুখ সম্পদের 
মোহে পড়িয়া জীবনের দেবতা মাতা পিতাকে বিস্মৃতি-ক্রোতে 
ভাসাইয়া দিয়াছে। কিন্তু মানবের এমন কোনও অবস্থা নাই, মানব- 
জগতে এমন কোনও অপরাধ নাই যে তাহা দ্বারা মাতৃন্নেহ পরাস্ত 
হইতে পারে-_...ভগবান বলিয়া ডাকিলে যাহার হৃদয় শুক্ষ থাকে, 
“মা” বলিয়া ডাকিলে তাহার হৃদয়ও ভিজিয়া যায়।... তবে এ কথা 
কুসস্তানের জন্য নহে।৩০ 
এ একই পত্রিকার ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত অপর একটি রচনায় আদর্শ স্ত্রীর 
গুণাবলি কেমন হওয়া উচিত সে সম্পর্কে বলা হয়েছে: 
স্বামীর গুণে বা দোষে যেমন অনেক পত্রী ভালো বা মন্দ হয়, 
আবার পত্বী হইতেও অনেক স্বামীর স্বভাব ভালো বা মন্দ হইয়া 
থাকে।...ভারতবর্ষের নারীগণ যে এত হীনবল ও দুরবস্থাপন্ন, অনেক 
স্থলে স্বামীদের উপরে ইহাদেরও অতুল প্রভাব। শাস্ত প্রকৃতি ভার্য্যার 
গুণে কত পতি শান্তভাবে বছ পরিবারের সহিত কালযাপন 
করিতেছেন এবং দুরস্ত ভার্য্যার দোষে কত স্বামীও হিংসা 
দ্বেবপরায়ণ হইয়া ভ্রাতৃবিচ্ছেদ, পিতামাতার সহিত কলহ বিবাদ 
করিতেছেন ইহা কে না দেখিতে পান? দুঃখের বিষয়, আমাদিগের 
স্ত্রীলোকদিগের ভীরুতা, স্বার্থপরতা, কুসংস্কার ইত্যাদি দোষে 
স্বামীদিগের প্রকৃতি দূষিত হইতেছে এবং তাহাতে সমুদয় সমাজের 


২ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বহুতর অনিষ্ট হইতেছে। বিদ্যাবতী ও সদ্গুণাণ্থিতা স্ত্রীলোকের সংখ্যা 
যত অধিক হইবে, ততই তাহাদের দৃষ্টান্তে পরিবার সকল বিশুদ্ধ ও 
সুখী হইবে ।৩১ 
ভ্যালারে মোর বাপ প্রহসনে নায়ক কলিরকাপ স্ত্রীর বিজয়কালীর এতদূর 
বশ্যতা স্বীকার করে যে নিজের বাড়িঘর স্ত্রীকে লিখে দেয়, বৃদ্ধা মাতাকে বাড়ি 
থেকে তাড়িয়ে দেয়, এমনকি ভেড়ার পোশাক পরে নিজের স্ত্েণতা প্রতিষ্ঠিত 
করে। শেষ দৃশ্যে ভন্মীপতি বরেন্দ্রবাবুর উক্তিতে যেভাবে ভর্খসিত হয় 
কলীরকাপ: “লেখাপড়া যা শিখেছিলে, তা তোমার ভস্মে ঘি ঢালা হয়েচে। 
কেবল টাকা উপায় কোল্লেই যে মনুষ্য নামের যোগ্য হয় এমত বোধ করো 
না।... স্ত্ণতোটিও বড় সহজ বিষয় নহে। দেখ, এক স্ত্রিণতার জন্য তুমি যে 
মহাপাতক কোরেচ, পৃথিবীতে তাহাপেক্ষা আর কি পাপ আছে বল? জন্মভূমিকে 
পণ্ডিতেরা স্বর্গের গরিয়সী বলেন, আর জননীর তুলনা তাহারা কিছুরই সহিত 
দিতে পারেন নাই__” 
_ স্বল্পখ্যাত প্রহসনের চরিত্রের উক্তি, পূর্বোক্ত প্রবন্ধের যুক্তিত্রমের সঙ্গে যখন 
হুবহু মিলে যায়, তখন বোঝা যায়, এই দুই ধারাই আসলে একটাই “ডিসকার্সিভ 
প্যাকটিস-এর অস্তর্গত। ১৮৬৪ সালে প্রকাশিত এক অখ্যাত প্রহসনেও স্ত্রীবশ্য 
স্বামীকে একইভাবে ধিক্ৃত করা হয়েছে: 
ধিক্‌ ধিক শত ধিক এমন বেটায়। 
আপনি থাকিতে মাতা ভিক্ষা করে খায়।।' 
মাগ ছেলে নিয়ে আপনি থাকে সুখে। 
মাতা ঠাকুরাণী হোতা মরিতেছে দুঃখে ।। 
পরকালে নিতে হবে এ পাপের ভার। 
নরকে পড়িয়া তখন হবে ছারখার ।।... 
সমাপ্ত হইল এই রসের কাহিনী। 
তাই বলি কলির বউ বড় হাড়জ্বালানী।।৩২ 
নব্য জাতীয়তাবাদের উপযোগী সবল “পৌরুষে”র (12509811710) অনুসন্ধান 
ও বন্দনাই এই টেকস্টেও প্রকট হয়েছে। এই সংকলনের সবকটি টেকস্টই 
এভাবেই উনিশ শতকীয় “আধুনিকতা”র নিজস্ব চরিত্রটি গণপরিসরে' ঠিক 
কীধরনের চেহারা নিয়েছিল তার বিভিন্ন খণ্ডাংশকে প্রকাশিত করে। এঁতিহ্যের 
পুনর্নবীকরণ, প্রাক-আধুনিক আদর্শ ও ভাবের ধারাবাহিকতা কীভাবে এক জটিল 
প্রক্রিয়ায় পাশ্চাত্য আধুনিকতার সংস্পর্শে এসে “ছেদ' ও পুনঃস্থাপনের প্রক্রিয়াটি 
সূচিত করে তার ভগ্নাংশের পরিচয় এই' টেক্স্টগুলি।। উচ্চকোটির তথাকথিত 
শিষ্ট সাহিত্যের সমান্তরাল প্রকাশনা হিসেবে এধরনের অসংখ্য টেক্স্ট দৈনন্দিন 
বাস্তবতার নিরিখে উনিশ শতকীয় চৈতন্যের গণচরিত্রকে ধারণ করে আছে। 
আজকের পাঠকের কাছে, এর এঁতিহাসিক ও রাজনৈতিক চরিত্রটি, অস্তত এদিক 
থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। 


অর্ণব সাহা 


কলকাতা বইমেলা ২০১০ 
২৮ 


১. বড়বাজার, কমলাকাতের দপ্তর; বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সম্পা. ক্ষেত্র গুপ্ত, কলকাতা, 
১৯৯২, পৃ.৪৬ 

২. এই নিন্নবর্গের সাহিত্য সম্পর্কে তাত্বিক আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য : 71৩ 77167 চ771727 
€18116170 2170 076 1,0%/-110 06 11065120016 111 [৮০-1২65010001011217 চ121706) 1২01১1 
[09111017175 274 72671 515 2) 197] 

৩. অপেক্ষাকৃত বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্র. উনিশ শতকের আদিরসাত্মক বই; অর্ণব 
সাহা; পনোঁটোপিয়া; অবভাস, ২০০৮; পৃ.৯-পৃ.৪১ 

৪. দ্র. [16 10060) 791১9 2110 101১6 1৬06110190115 : [62556551176 [2119 6178311 বার 
[01৮6 11056 (1821-1862); 1915 17191061) 171%225 1:7/6741) 11£707) ::£554)5 07 22 
151772/267// 02%1%7), 6৫. 50081031500 8 39500199 [0911019, 5 [00117 
2004; 7.392-0.394 

৫. দ্র. 19//5 9 ৮2 15572/2 ::2558)5 07 02722712152), 12774716, 949%144 
17245 [01011092175 1000018, 2002) [১:৯1 

৬. দ্র: বাৎসায়নের কামসূত্র, “দূতীকর্মণী” অধ্যায়, অনু: গঙ্গাচরণ বেদান্ত বিদ্যাসাগর, 
সম্পা: ত্রিদিবনাথ রায়, কলকাতা, ১৯৮৬, পৃ. ২৭৪-২৭৫ 

৭. উদ্জ্বলনীলমণি, রূপ গোস্বামী, সম্পা: শ্রীহীরেন্দ্রনারায়ণ মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, 
১৩৭২ বঙ্গাব্দ, পৃ.১৮-২০ 

৮. কলিকাতা কমলালয়, ভবানীচরণ বন্দোপাধ্যায়, দুষ্প্রাপ্য সাহিত্য সংগ্রহ, খণ্ড-১, সম্পা: 
কাঞ্চন বসু, কলকাতা, ১৯৯৭, পৃ.৭২ 

৯. উজ্ভ্রলনীলমণি, বূপ গোস্বামী; পূর্বোক্ত। এর নায়কভেদ' অংশে 'নায়কে' র গুণাবলীর 
তালিকা: “সুরম্য, মধুর, সর্বসূলক্ষণাক্রাস্ত, বলিষ্ঠ, নবযৌবনাধিত, সুবক্তা, প্রিয়ভাষী, 
বুদ্ধিমান, সুপপ্ডিত, প্রতিভান্বিত, বিদগ্ধ, চতুর, সুখী, কৃতজ্ঞ, দক্ষিণ, প্রেমবশ্য, গম্ভীর, 
বরীয়াণ, কীর্তিমান, নারীজনমনোহারী, নিত্যনতুন, অতুল্য কেলিসৌন্দর্যবিশিষ্ট ও 
বংশীনিকণকারী বা সুমধুর সুরশিল্পী। পরিশেষে মন্তব্য: এই সকল মাধূর্যগুণের অধিকারীই 
সুযোগ্য নায়ক ও মধুর রসাম্বাদনের শ্রেষ্ঠ আধার বা অবলম্বন”। 

১০. বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত ২য় খণ্ড অসিতকুমার বন্দোপাধ্যায়, কলকাতা ১৯৯৬, 
পৃ. ২৬১-২৬৩ 

১১. উজ্ভ্লনীলমণি, রূপ গোস্বামী; পূর্বোক্ত সংস্করণ, পৃ.৪ 

১২. দ্র: অশ্রত কণ্ঠস্বর, সুমস্ত বন্দোপাধ্যায়, কলকাতা, ২০০২, পৃ. ২২ 

১৩. দ্র: সাহিত্যদর্পণ, শ্রীবিশ্বনাথ কবিরাজ প্রণীত, সম্পাদনা ও বঙ্গানুবাদ: শ্রীবিমলাকাস্ত 
মুখোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৩৮৬, পৃ. ১৭৮ 

১৪. দ্র: [7770000 [2216 চ:00008001%; [9 01381917721; [.015001, 1893, 7.28; উদ্ধৃত; 
776 05478%6 £9 ০ 777%2% 2 87241 (1949-1905)7 ৯1০6৫107 0০1051515 
[১1107051017 1984, 0.18 

১৫. ধনী লোক সম্ভানলাভে বঞ্চিত কেন? ; চিকিৎসা সম্মিলনী, ১৮৮৬; উদ্ধৃত; 


২৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সাময়িকী, প্রেথম খণ্ড), সম্পা. প্রদীপ বসু, কলকাতা, ১৯৯৮ পৃ.২০৮ 

১৬. দ্র. অননদামঙ্গল; ভারতচন্দ্র রচনাসমগ্র, সম্পা. ড. ক্ষেত্র গুপ্ত, ড. বিষ বসু, কলকাতা, 
১৯৭৪, পৃ.২৩৮ 

১৭. এই বিষয়ে পথিকৃৎ গবেষণা : 3615215521506 2190 152170059:70706, 1701) 470 1 
[০9 1) (00101721 31791) 5গা।0 ১৪৪1০7 077072 59271150170) তত [09117 
1997 [.186-1.215; 0০০91917191 11725: 010015 & 131/7062) 9010 52127 82- 
9072 15250772157 1747125: 76190217716 1957710467717577, 12277241/4, 1 1325707)% তত 
[)061%7, 2002; 7.10-7.37; এছাড়াও অস্ত্যউনিশ শতকে নব্য হিন্দু ভক্তিবাদের উতান ও 
কলিষযুগ ভাবনার প্রত্যক্ষ যোগ বিষয়ে তার অসামান্য গবেষণা: কলিযুগ চাকরি ভক্তি : 
রামকৃষ্ণ ও তার সময়; সুমিত সরকার, অনুবাদ : দেবব্রত পালধি; কলকাতা, ২০০২ 
১৮. সুমিত সরকার এই কলিযুগ কল্পনাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এইভাবে; “1511/082... 
19602817762 12175019656 101 65001655117 006 217020115], 00501201017 2100. 16561001612 04 
1655 50055655001] 2৫0102060 7561) 01 090 1১181161 095065. 10 00615 থা॥। ৫1800 [99110 11500 
2 [210911) 015011)00 110৮561 10110016 01855? ৮/0110, 10621-0/1982911) 67700016011) 076 
06011178116 05010101121 10191 11612012110 076 ০10 51011 (15012035080 00102110165 
০ 102119109, 1)0৬/6৮6৮ ০0010 2019621 2 010765 2150 00 090 17121 01195019101 (1) 
09617 0411061 [7109005, 001 ০01018191 00110120601) 10610 010 56161071356 06 006 $1০- 
০65$00] 61101005171 1021৩ 21145502116, 0152015019৩. 00 180190 1)01711118001 
দ্র. [50031552150 2110 14911062) 50017105205, পৃ্োক্তি, 9//202 5০241221970 
7.191 

১৯. কালীপ্রসন্ন সিংহ অনুদিত মহাভারত, পশ্চিমবঙ্গ নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি, 
কলকাতা, ১৯৭৪; এর ২য় খণ্ডের “বনপর্বে'র “মার্কণেয় সমস্যা" অধ্যায়ে কলিযুগ কল্পনার 
বিবরণ রয়েছে। পৃ. ১৮৭-পৃ.১৯০ 

২০. কক্কিপুরাণ, কালীপ্রসন্ন বিদ্যারত্র অনুদিত, ১০ম সংস্করণ, কলকাতা, ১৯৬২ 

২১. কলির রাজ্যশাসন, শ্রীহরিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রণীত, কলিকাতা, চাপাতলা বাঙ্গলা 
যন্ত্রে মুদ্রিত; সন ১২৬৭ সাল, পৃ. ৩২ 

২২. কেরানী মেমোরিয়েল, লেখকের নাম নেই; জ্ঞানাক্কুর, পৌষ ১২৮২, পৃ. ৬৮-পৃ.৭৫ 
২৩. কেরানিজীবনের অন্দরমহল নিয়ে একটি বিস্তৃত গবেষণায় ধরা পড়েছে এই নিন্নবর্গীয় 
জীবনের বেদনার স্বরূপ: '50৮]0177 190201011 58100117001 065011025 11)6)1 0011621- 
০5010 58005 210 07617 500191 5081101770. 1176 86116911 010115 10) ০01010121 201017- 
(5090101) 1190. 00 5016067 130121 ৫150110000700101) 1 160100100061705 1092) 10001700101 
৪৬৩1) 10 5620106 211911217001৮0 10007 00066810102 স10 0005 00616 আঅহও 5 2০০৫ 
[77525101601 00816211019010 ৫0111709001] 07 13110151) 0006 17851215- 10106 25 10 
9০01১6 001 )0) 52056900101) 25 10 ৮/25 ও 10001100৬01] 01 10৬1 51111. 41 006১6 825৩ 
1156 00 2 ০01160116 51)56 0 17662411%6 50019] 6$16617১-0619715৩0, 40110172060, ০৮৫] 
[11701108064 দ্র. ০9/2%841 027/5:4 59০41 22197) ঠা /)2১7277% 4714 99711787077 
[02119 (09091050210 16012252005, 0:181২৩- 

২৪. কেরানিচরিত; প্রাণকৃষ্ণ গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা, ১৮৮৫, পৃ. ১৩ 


৩০ 


ভূমিকা 


২৫. প্র. 176 001 80 [5 9/0180177 0১91082 00150061005) 12 12207 274 10 
/742716%6: (94974414714 15109197241 1215791765৩ [0178 1999. [১.1 16-0.154 
২৬. নবনাটক, রামনারায়ণ তর্করত্ব, ১৮৬৬; উদ্ধাতঃ সমাজসংস্কার আন্দোলন ও বাংলা 
নাটক, (১৮৫৪-১৮৭৬); গোলাম মুরশিদ, ঢাকা, ১৯৮৪, পৃ-১৯৩-পৃ১১৯৪ 

২৭. প্রণয়পরীক্ষা, মনোমোহন বসু; ১৮৬৯: উদ্ধৃত; পূর্বোক্ত; গোলাম মুরশিদ; পৃ. ১৯২ 
২৮. উনিশ শতকীয় বাঙালি হিন্দু “'আধুনিকতা'র এই নিজস্ব চেহারাটি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ 
বেশ কয়েকটি গবেষণার ভিতর উল্লেখযোগ্য: আমাদের আধুনিকতা; পার্থ চট্টোপাধ্যায়; 
ইতিহাসের উত্তরাধিকার, কলকাতা, ২০০০, পর. ১৭১-১৮৬ 70505010112110 2110 0116 
/10006 06 150019) 1019651) 00091051210: 19277704212 54776: 15459197241 
1/0%2/7 47 11151077041 19107701822 £92%% 2001, 2.27-2-46 

২৯. দ্র. 1116 ৬11000805 ৮16 2100 086 ৬৫1] 0146160 1101756: 116 [২6- 
(001061900311230101) 01 96176211 ৮/017861) 2150 05617 ৮/01105; 01010) /21517) 14174 
1904) 2714 59220: £26 4%4 17467712180 7 09£9%241 86712 24. 274 42754. 227 
1৬2 921 1995, 2 331-359, 

৩০. দ্র. মাতৃভক্তি ও মাতৃ-উপাসনায় সন্তানের মুক্তি, বামাবোধিনী পত্রিকা, ভাদ্র-আশ্বিন, 
১৩০১ বঙ্গাব্দ। উদ্ধৃত; সাময়িকী (২য় খণ্ড), সম্পা. প্রদীপ বসু, কলকাতা ২০০৯, 
প্‌. ১৯১-পৃ ১৯৩ 

৩১. দ্র. স্বামীর উপর স্ত্রীর প্রভাব; বামাবোধিনী পত্রিকা, ফাল্ধুন ১২৭৬ বঙ্গাব্দ, উদ্ধৃত; 
সাময়িকী, পূর্বোক্ত, পৃ. ২৯৪ 

৩২. হাড়ভ্বালানী, শ্রীযুক্ত গোলাম হোসেন কর্তৃক প্রণীত, কলকাতা, গরাণহাটা স্ট্রীটে ৯২ 
নং ভবনে এ্যাঙ্গলো ইপ্ডিয়ান ইউনিয়ন যন্ত্রে মুদ্রিত, সন ১২৭১ সাল। পৃ.১৫ 


৩১ 


শ্রীতীজগদণম্বর । 
শরণং। 


দুতী বিলাস 


নামক 


শ্রীভব'নীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় 


কত্ত্কি 


“নুকোমল পরারাদি নানাছদ্দ রচিত"** 
আদিরস ভাঁন্তরস ঘাঁটিত'"'সংরাঁসক রসদারক পযস্তক । 


১৮২৫ 


দুতীবিলাসের আখ্যাপত্রের অনুলিপি 


দুত্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


- দ্বুতীবিলাস 


ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় 


আখ্যাপত্রে প্রাপ্ত বিবরণ 


শ্রী শ্রী জগদীশ্বর শরণং “দৃতীবিলাস” নামক কাব্য। 
ভবানী চরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক 
আদি রস ও ভক্তি রস ঘটিত পিযুব প্রবন্ধে পয়ারাদি 
নানাবিধ ছন্দে 
বিরচিত হইল। 
ইদানীং শ্রীরসিকলাল চন্দ্রের আদেশ অনুসারে 
কলিকাতা, গরাণহাটা স্ট্রীটে, ৯৩ নং ভবনে 
আযাংলো ইন্ডিয়ান যন্ত্রে 
শকাবঝ ১৭৮২ 
মূল্য ৬ আনা, ছয় আন৷ 


+লি। 


শ্রীশ্রী দুর্গা 
শরণং। 


| অথ গণেশ বন্দনা ।। 


গণেশ গিরীশ সুত গজেন্দ্র বদন 
লন্বোদর বিদ্বহর বিশ্বাদি কারণ 
শরণ লইনু প্রভূ তোমার চরণে। 
দয়াময় দয়া কর দীন হীন জনে।। 


|| সূর্য্য বন্দনা ।। 


ভাঙ্কর কর তব তমোহর অতি। 
তামস মানস মম কর অবগতি ।। 
তিমিরারি চিন্তের তিমির কর নাশ। 
মলিন মনেতে প্রভু কর আসি বাস।। 


|| দুর্গা বন্দনা ।। 

দুর্গে তব দুর্গা নাম দুর্গাঙ্কুর নাশি 

দুর্গ হরা হৈমবতী হর দুর্গরাশি।। 

তুমি শক্তি তোমা ভক্তি বিনা মুক্তি নহে। 
ত্বমেকাদ্যা মহাবিদ্যা বেদে বিদ্যা কহে।। 


৩৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
|| শিব বন্দনা ।। 


শিবের শিবদ শিব অশিব নাশক । 
ভীষণ ভাষণ যম ভয় নিবারক। 
শাস্তমৃর্তি শাস্তভাব শাস্ত তব গুণ। 
সংহার সময়ে গুণ সংহারে নিপুণ ।। 


| বিধুও বন্দনা || 


বিশ্বধর বিধু৪ বিশ্বময় বিশ্ব পাল। 

বিশ্ব ব্যাপি বিশ্বকর তব মায়া জাল।। 
মায়াতে মোহিত বিধি পুরাণ বচন। 
পাঁচে এক ভাব ভনে ভবানীচরণ।। 


॥ মহাকবিকে নমস্কার || 


নলিনজ পুলিনজ বাল্মীকজ কবি। 
তথা কবিকুল মান্য যথা মান্যরবি।। 
কবিগুরু পাদপন্মে কোটি কোটি মতি। 
ভবানীচরণ করে করিয়া বিনতি || 


|| সন্রস্বতী বন্দনা ।। 


সতী সত্যা সরহ্বতী, ব্বচ্ছশ্বেত রূপবতী, 
বাণী বীণা বাদ বিনোদিনী। 
মহাবিদ্যা বিদ্যা বিধায়িনী।। 
সিত সরসী জামনা, স্মিত সৃখী সুবদনা, 
ভগবতী ভব ভয় হরা। 
সুমুক্তা মণ্ডিত শলা, মনোহর কণ্ঠকলা, 
লেখনী লিখিত ধৃত করা ।। 
কুচভর নতকায়া কমলা সপত্বী মায়া, 
মহেশা সুরেন্দ্র সেবিতা। 
বেদাগম নিগমাদি, তন্ত্রমন্ত্র যন্ত্রবাদি, 


৩৬ 


দুতীবিলাস 
ধীর জপগণ আরাধিতা।।' 
বর প্রদা বাগ্‌দেবী, ত্বদীয় চরণ সেবি, 
মহাকবি বিধি বেদব্যাস। 
অন্য আর কবি যত, বর্ণিয়াছে শত শত, 
পুরায়েছে মনো অভিলাষ ।। 
ভবানীচরণ দীনে, কৃপামযী কৃপাহীনে, 
কিঞ্িৎ করুণা কর পাত। 
এই গ্রন্থ রচিবারে, অকৃতী মা যেন পারে, 
করি পাদপদ্মে প্রণিপাত।। 


॥। গ্রস্থের সুচনা ।। 


নিবেদন শুন সব রসিক সুজন । 

যে কারণে এই গ্রন্থ হইল রচন।। 
কলিকাতা নগরস্থ নিমাঞ্ঞচরণ। 
মল্লিক উপাধি তিনি প্রতাপে রাবণ।। 
কীর্তির তুলনা তুল্য পাওয়া নাহি যায়। 
মৃত্যু কীর্তি ঘোষে লোকে ভীক্ম মৃত্যু প্রায়।। 
আট পুত্র তাহার সকলে গুণবান। 
এক্ষণে তাহার সাত জন বর্তমান ।। 
তার মধ্যে সপ্তম স্বরূপচন্দ্র নাম। 

দেব গুরু দ্বিজে ভক্তি অতি কৃপাবান।। 
ধনী গুণী মানী লোক মানা করে মানে। 
এক দিন সেই জন বসিয়া বাগানে ।! 
বুতর বিজ্ঞবর লয়ে গুণিসব। 
করিতেছিলেন নানা আনন্দ উৎসব।। 
নানা রস রাগরঙ্গে প্রসঙ্গ উঠিল। 
মুদ্রাক্ষরে বহুগ্রন্থ প্রকাশ হইল।। 

কিন্তু আদিরস কাব্য দেখিতে না পাই। 
ঘে দেখি ভারত কৃত নব্য কিছু নাই।। 
এখন কতক নব্য নায়ক মজিয়া। 

করে কত রস নানা নায়ক লইয়া ।। 
সে রস বর্ণিলে ভাল গ্রন্থ এক হয়। 
তাহারা কুকন্্ম ত্যজে ইথে সুখোদয়।। 


৩৭ 


দুষ্প্রপ্য বাংলা সাহিত্য 


সভাস্থ সকলে বলে তাহার নিকটে। 
এই মত গ্রন্থ করা যুক্তিসিদ্ধ বটে।। 
অনস্তর কহিলেন বিজ্ঞ বিচক্ষণ । 
ব্যক্তি কোথা পাব গ্রন্থ করিবে রচন।! 
কেহ পরে কহিলেন তাঁহার কথায়। 
ভবানীচরণ নাম বন্দ্যো উপাধ্ায় ।। 
সমাচার চন্দ্রিকা আকর তারে জানি। 
তাহা হইতে হইবেক এই অনুমানি।। 
সকলের সহ তিনি করিয়া মন্ত্রণা। 
আদেশ দিলেন গ্রন্থ করিতে র১না।! 
তাহার বিনয় বাকা স্বীকার করিয়া! 
কি ভবে রচিব গ্রন্থ না পাই ভাবিয়া। | 
ভাবিতে ভাবিতে ভাব হইল উদয়: 
নৃতন নূতন পধুতী আছে কতিপয় '। 
প্রবলা হইয়া তারা নবো করে বশ। 


বু 
এখ 
৭ 
৬ 
পা 
১ 
] 
রি 
এ 
এ 
১ 
চু 
না 
র্‌ 
৬. 
1 
রী 
$/ 
স্ব 
ঁ 


আলোচনা করি গ্রশ্থারপ্তিল রচনে ॥। 


|| অথ গ্রহারত্ত : দুতীর বন্দনা |। 


1৮ 
111 
$ 


চস 
( 


হালে হয়, সস করে কানেরে ভয়, 

শিব বির 

1 নিনভ নিরুপমা, গুণে নাহি তার সমা, 
কানুকে সবর্দা শান্ত করে।। 

বেশি শা ফ্ণযুতা, সুপুরুষ শুসিসুতাঃ 


| 
1 
) 


৯ 
৩ 


দুতীবিলাস 
সুন্দর সুন্দরী যত আছে।' 
কানা খোঁড়া অঙ্গহীন, যেবা হয় কামাধীন, 
দূতী ধন্যা তা সবার কাছে।। 
যেবা বাঞ্চা করে যারে, এনে দিয়ে তোষে তারে, 
জাতি কুল মজাইতে পারে 
দূতীর শরণে লোক, ভুলে যায় পুত্রশোক, 
কোন দুঃখ নাহি লাগে তারে। 
সবে বলে দৃতী তুমি, আসিয়া এ কর্মমভূমি, 
কত রূপ ধর বহুরাপা। 
শুনিয়াছি লোক মুখে, পঞ্চ রূপে থাক সুখে, 
তব গুণে কুরাপা সুরাপা।। 
কত শত ছল ধর, কামিনীর কুল হর, 
?ক বুঝিতে পারে তব মায়া। 
ভবানীচরণ ভনে, তোমার সাধন জনে, 
নিজ গুণে দেহ পদ ছায়া।। 


পঞ্চ প্রকার দূতী।। 
|| প্রথমা দূতী মালিনী বূপা।। 
|| পয়ার।। 


নাগরী নাগর মনোহর সুভাষিণী। 
পুবের্ণতে প্রসিদ্ধা দূতী ছিলেন মালিনা।। 
তাহা হৈতে আনায়েছে পৃষ্ঠ আদি ছলে। 
উভরের অভিলাষ পুরিত কৌশলে :! 
এন্দণে অধিক জনে পুন্পাদি চন্দনে। 
ক্ষান্ত মতি হয়ে আছে দেবের অঙ্ঠনে ।। 
যাহাদের পুম্পেতে আছয়ে প্রয়োজন । 
তাহাদের নিজের আছয়ে কুসুম কানন।। 
কেহ কেহ ক্রয় করে পুম্প নানা জাতি। 
মন্্লিকা মালতী যুতি বেল বক জাতি। 
এরূপে সঙ্জনে করে পুজাদি শিবর্বাহ। 
মালিনী কেবল যায় হইলে বিবাহ।! 
সুতরাং এক্ষণেতে সকল ভবনে। 
মালিনীর গমন অভাব করি মনে ।। 


৩৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা! সাহিতা 


পরেতে যে রূপ দৃতী ধরেন ভাবিয়ে। 
ভবানীচরণ ভনে মনে বিচারিয়ে।। 


|| দ্বিতীস্া দৃতী নাপিতিনী বাপ।। 
।।পয়ার।। 


শুভ ও সৌন্দর্য কন্ম করে যে কানিনী' 
সে কন্ম না সিদ্ধ হয় বিনা নাপিতিনী।। 
লয়ে নখ রঞ্জনী ও মাংসের ছেদক । 
চুপড়িতে ঘসা- ঝামা আর অলক্তক।। 
অস্তঃপুরে প্রবেশিয়ে বহু সমাদরে। 
স্ত্রীলোকের হস্ত পদ আদি শোভা করে! 
নারীর উৎসব কম্্ম যত হয় তায়। 
নারীগণ নিমস্ত্রিতি নাপিতিনী যায়।! 

এই হেতু নানা স্থানে গমন ইহার । 

ইহা হৈতে কন্মসিদ্ধ হয় রসিকার ।। 

এ কারণে দূতী ভাল নাপিত গেহিনী 
প্রধানা বলিরা খ্যাতা রস সঞ্চারিনী |) 
নাপিতিনী দূততী বড় এক. দোষ তার! 

না ডাকিলে কোন স্থানে যাওয়া তার ভাত 
এরাপেতে কর্ম যদি সিদ্ধ নাহি হয়ু। 
ভবানাচরণ পরে অন্যজপ কয।। 


|| তৃতীয়া দূতী ভড়েনী পাপা।। 


।পহাক |! 


[গা্প গোপী দধি দগ্ধ করে বিকিকিনি। 
ইহাতে প্রপধানা এবে উড়িব্যা গোপিনী।। 
উড়েরা বেহায়া হয় উড়েনী প্রবলা। 
দুগ্ধ দধি বেচিবারে বড় নলা গলা ।। 
স্বদেশী বিদেশী বাসে যায় অনায়াসে। 
কত বোল বলে হলে রস নানা ভানে।। 
পুর চারিণীর কাছে অন্তঃপুরে গিয়ে। 
দুগ্ধ দেয় কথ! কয় হাসিয়ে হাসিয়ে || 


৪60১ 


বিদেশী বিয়োগী বাবু যদি টের পায়। 
বহু বেশে তার বাসে অনায়াসে যায়।। 
বলে যোগাইব দুগ্ধ বাবুজী কোথায়। 
হেসে হেসে ঠারে ঠোরে ভুলাইতে চায় ।। 
হাব ভাব দেখে তার কেহ দুগ্ধ লয়। 
তাহে যেবা নাহি ভুলে নানা কথা কয়।। 
দুগ্ধ দিয়া থাকি আমি বড় বড় ঘরে। 
মোর কাছে দুগ্ধ লও দিব সেই দরে।। 
বৈকালে আসিয়া দুগ্ধ আওটিয়া দিব। 
সহরের সমাচার তোমারে কহিব।। 
ইহাতে তাহার দুগ্ধ কেবা নাহি চায়। 
জল বেচে ছলে কলে যাতে টাকা পায়।। 
গৃহহস্থের বাড়ী আর বাসাড়্যের বাসে। 
দুই বেলা দুগ্ধ দেয় সবে ভালবাসে ।। 
ইহাতে এ দৃতী প্রতি সকলে সন্তোষ । 
কিন্তু কিছুকাল বাস এই মাত্র দোব।। 
কামিনী কহিবে কথা অবকাশ পরে। 

এ কারণ অন্য দৃতী প্রয়োজন করে !। 
ভবানীচরণ কহে ভারতী সহায়। 

অন্য দূততী গুণ কহি মনো £দহ তার ।। 


|| চতুর্থ দূতী নেডী বাপা।। 
|পয়ার || 


হরিনাম মালা হাতে করে হয় নেড়ী। 
কখন তা ছেড়ে ছুড়ে হাতে করে বেড়ী।। 
পাচিকা হইয়া করে কোথাশ রহ্ধন। 

নানা দব্য পাক করি করান ভোজন ।। 
(প্রমের তরঙ্গ আর রসের তরঙ্গ। 

(যে সকল গ্রন্থে নানা রসের প্রসঙ্গ।। 
কোথাও করেন পাঠ হইয়া পাঠিকা। 
পরমার্থ পথ বলে ভুলার নায়িকা ।। 
বলিহারি যাই নেড়ী কেমন মন্দায়। 

শৃঙ্গার সুখেতে প্রেম যথার্থ ঘটায়।। 


৪৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


মধু মৃদুতধরে পাঠ করে অভ্তঃপুরে। 
শুনে কামিনীর কর্ম ধর্ম যায় ঘুরে ।। 
রসিকা সে রস শুনে মহা সমাদলুর। 
বিহারের আশ তার হয় পরে পরে।। 
নিজ্জন সময় পায় রন্ধনের কালে। 
বিবিধ রসের কথা কয় পাকশালে || 
সকলে ভুলায় প্রেম তরঙ্গের বলে। 
সতী নারী মজে তার কথার কৌশলে ।। 
পাক পাঠ করে পরে নিজ গৃহে যায়। 
সন্ধ্যার পরেতে ফিরে বাসায় বাসায় ।। 
রসের বৈষ্ুবী নেড়ী গুণেতে প্রচুর। 
গানেতে ভূলায় মন বিদেশী বাবুর ।। 
উভয়ের মন প্রীত করতে সে পারে। 
এ হেতু প্রধানা নেড়ী দূতি বলি তারে।। 
কামিনীর সঙ্গে কিন্ত দিবানিশি নয়। 
সবর্ধদা সঙ্গিনী বিনা কর্ম নাহি হয়।। 
অতএব সদা সঙ্গি সঞ্তারিকা চাই। 
ভবানীচরণ কহে শুন বলি তাই।। 


।।পঞ্চম দৃতী সহ্বাসিনী দাসীর পা।। 


পরার ।। 


দাসী দূতী ইদানী সে প্রধানেতে গণ্যা। 
দুর্ঘট ঘটায়্যা দেয় এই হেতু ধন্যা।। 
পুরচারিণীর সঙ্গে হইয়া সঙ্গিনী। 
অস্তঃপুরে থাকে সদা নিকট বর্তিনা।। 
সবর্দা সময় পায় দিবস রজনী । 

সময় বুঝিয়া তবে ভুলায় রমণী ।। 
নিঙ্জন স্থানেতে থাকে সদা সংগোপনে। 
অতএব নিপুণা £স প্রবৃন্তি জননে ।। 
নিত্যকর্্ম করি পরে হইয়া বিদায়। 
আহার করিতে মাত্র নিজ গৃহে যায়।। 
সে সময়ে গুপ্ত কর্ম কথা কয়ে থাকে। 
গওনে মনে বুঝে যায় যদি কেহ, ভাকে।। 


৪ 


দু্তীবিলাস 

এমত দৃত্তীর সঙ্গে কথোপকথনে। 
উভয়ে কহিতে পারে যার যেবা মনে ।। 
দাসী হৈতে অবশ্যই অভিলাষ পুরে। 
কামিনী কামুক দৌহে দাসী গুণ ঝুরে।। 
এ কারণ দাসী দৃতী স্বরূপ প্রধানা। 
যুবতী সস্তোব করে পরে সোনা দানা !। 
হইল নির্ণয় গ্রন্থে সব সঞ্চারিকা। 

পরে কহি কিসে মিলে নায়ক নায়িকা !। 
ঝতুরাজ বসস্তের হলে আগমন। 
বিরহী জনার হয় কাম উদ্দীপন ।! 
তখন দূতীর হয় অতি প্রয়োজন । 
সিদ্ধদেব মত আইসে করিলে স্মরণ।। 
ভবানীচরণ কহে স্মরি রতি পতি। 
বসস্ভ বর্ণন করি মন যথা মতি ।। 


।ঝতুন্াজ বসম্তের আধিপত্য || 
11পয়ার || 


খতু মধ্যে প্রধান বসন্ত ঝতুরাজ। 

£ঘী সুখী করে লোক শুন তার কাজ ।। 
কি শক্তি বর্ণন করি বসও্ রাজার! 
সংক্ষেপেতে আধিপতা কহি কিস তার।। 
(কোকিল নকিব হয়ে অগ্রে রব করে। 
পতাকা পল্লব শাখা তরুগণ বরে।। 
মলয় পবন মন্দথ্রি সঙ্গে আগমন। 

গায়ক ভ্রমর গানে সন্তোষ রাজন || 
কামিনী যোবন করি পৃষ্ঠে ভর করি। 
কাম চলে আগে নসনাপতি ভার ধরি ।। 
এর।পে আসিয়া রাজ্য করে অধিকার । 
উচিত বিহিত পরে করেন প্রজার ।। 
বসস্ত রাজার বজ্য আনন্দিত মনে। 
জীবজস্ত সুখে থাকে কানন ভবনে ।! 
প্রফুল্ল সকল তরু নষ্ট হয় কুল। 

রসাল রসেতে মগ্ন সরস মুকুল ।। 


শ৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


শীতল সুগন্ধি মন্দ বহিছে পবন। 
বিয়োগি জনের হয় কামিনীতে মন।। 
ভবানী কহিছে হেন বসম্ভ সময়। 
বহু সুখি লোক মধ্যে এক মহাশয় ।। 


|| অথ শ্ীদেব নাগরের বূপ বেশ বর্ণন।। 
|(পয়ার।। 


শ্রীদেব নাগর নামে নায়ক প্রধান। 

রূপে গুণে ধনে মানে না দেখি সমান ।। 
সুবর্ণ বরণ কায় নবীন নাগর | 

ঈষৎ গোৌঁফের রেখা নবীন নাগর ।। 
পরম সুন্দর অতি মনোহর বেশ। 
সংক্ষেপে কিঞ্চিৎ কহি বেশের বিশেষ ।। 
কালা কলকাদার ধুতি উত্তম ঢাকাই। 
পরিয়াছে সেই বস্ত্র যার সম নাই।। 
বুক মসলিন ভাল তার একলাই। 
অঙ্গে সুশোভিত এক লিনুর অ্রজাই।। 
হীরা পান্নাদার গোটা কিনরির তাজ। 
বাঁকায়ে দিয়েছে শিরে যেমত মেজাজ || 
কুটিল কুস্তল কাটা ঘষিয়াছে তায়। 
তাহার উপরে টুপি কিবা শোভা পায়।। 
মতির দ্বোনর কণ্ঠা গল দেশ সাজে । 
হিন্দু চিহ্ বিন্দুভাবে ভালে শোভে লাজে। 
হারক অঙ্গুরী বামকর কনিষ্ঠায়। 

ডালি করে নবরত্ব তর্জনী শোভায়।। 
সুবর্ণ সুন্দর গোট কটিদেশে দিয়ে। 
স্বর্ণের শিখলে চাবি রাখে ঝুলাইয়ে || 
গোড় তোলা মাথা নেড়া টাটবাবি জুতা । 
পদদ্ধায়ে আছে তার শোভা অভ্ভুতা। ৷ 
বামহাতে ধরিয়াছে স্বর্ণ গুড়গুড়ি। 
দেখি মদনেতে মজে যুবতী কি বুড়ি।। 
ভবানী কহিছে এ বিদগ্ধ নায়ক। 
আনন্দে করিছে গৃহে লইয়া গায়ক।। 


৪৪8 


।॥ অথ শ্ীদেবের বিরহ বর্থন।। 
|পয়ার।। 


গায়ক করিছে গান নানা রাগ রঙ্গ। 
কত মত গীত গায় যুবতী প্রসঙ্গ ।। 
নায়ক গায়ক প্রতি শুনে সুখে কয়। 
বাহার গাইতে হয় বসম্তভ সময়।। 
বাহার গাইতে যদি নায়ক কহিল । 
বাহার তাহার পর গাইতে লাগিল ।। 
একে সে বিয়োগী তায় বাহার শুনিয়া। 
বিরহ অনল গানে দিল জ্বালাইয়া।। 
গানে সে অনল বাড়ে নাহি পরিত্রাণ। 
ব্যাকুল হইল তাহে নায়কের প্রাণ।। 
সুস্বর অনল সম সম্ভাপ জন্মায়। 
সুস্থির হইতে নারে পারে ছাতে যায়।। 
মলয় মারুত তাহে লাগে তার গায়। 
অস্থির হইয়া কামে চারি দিগে চায়।। 
অন্য মৌথপরি নারী দান্ডাইয়া ছিল। 
অর্দেক শরীর তার দেখিতে পাইল ।। 
সুন্দরীর মুখ চক্ষু গুণ নিরখিয়ে। 
বিতর্ক করিছে কত কামেতে মজিয়ে।। 
ভবানীচরণ কহে হইয়া সতর্ক। 
কামুক কামিনী হেরে করিছে বিতর্ক ।। 


1 নাস্সিকার প্রতি নায়কের বিতর্ক ।। 
|পয়ার।। 


নারী মুখে নীরজ কি নিশাকর বটে। 
অস্থির চিন্তের চিন্তে স্থিরতা না ঘটে।। 
নয়নেতে নানামতে তর্ক করি কয়। 
সরোজ কি শফরী বা স্মরশর হয়। । 
কুচ দেখি করে কত তর্ক তারপর । 
কনকের কৌটা কি কলসী মনোহর ।। 
কামদেব দামামা কি জগত জিনিয়া। 
8৪৫ 


দৃত্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


অধোমুখে রেখে গেল না এলো ফিরিয়া। 
পরে মনে ভাবে এটা কামিনী তো নয়। 
তড়িৎ কি তারা বা কনকলতা চয়।। 
আপাতত আর্ত মনে বিতর্কিয়া পরে। 
কামী এ কামিনী বটে এই হ্ির করে।। 
নীরজ নীরসস্থলে প্রফুল্ল না থাকে৷ 
নিশাকর কর দিনে দিবাকর ঢাকে।। 
অতএব এতো বটে বিমল বদন। 
কিন্তু কি করিয়া বিধি করিল সৃজন ।। 
নিশ্চয় মীনের মৃত্যু স্থলে জল বিনা। 
সুতরাং মীন কভু বলিতে পারিনা ।। 
স্মরের শরের সহ সমান নয়ন। 
ক্ষণমাত্র নিরীক্ষণে জ্বলিতেছে মন।। 
কুচ বটে কিন্তু কনকের কাস্তি তায়। 
এই হেতু কনক কলসী বলা যায়।। 
কৌটা কবে কও কিন্তু এই যুক্তি রবে। 
নতুবা কি নবীনার কৃচ কৌটা হবে।। 
রস শূন্য ব্বর্ণে কৌটা করয়ে নির্মাণ। 
কামিনীর কুচরসে পীযুষ- পলান।। 
দামামা ছাড়িয়া কাম কভু নাহি রয়। 
কাম যুদ্ধ জয়ধ্বনি বিনা কোথা হয়।। 
তড়িৎ তরলা তাকে কে দেখিতে পায়। 
ধনাগমে সমাগম হলে দেখা বায়।। 
তারা কি কখন দেখা যায় দিনমানে। 
দিবাকর কর দিনে নিজ গুণ টানে ।। 
কনকের কান্তি বটে কিন্তু লতা নয়। 
লতার উপরে গিরি কেবা হেন কর।। 
এইরূপে রমণীর রূপ স্থির করি। 
পরে মনে করে লক্ষী অথবা অমরী।। 
ইন্দ্রাণী অপ্সরী কিন্ধা হবে বিদ্যাধরী। 
উবর্ধশী কি পরী রাজকন্যা মনে করি।। 
নিগুড না জানি মনে বিবেচনা করে। 
মানসে মানবী বটে হর করে পরে।। 


৪৬ 


দুতীবিলাস 
কমলা কটাক্ষ হলে কামনা পুর্িত। 
কামে মন্ত কেন চিত্ত কুবুদ্ধি ঘটিত।। 
অমরী অমর পুরে শুনি সদা রয়। 
না পড়ে পা পৃথিবীতে পুরাণেতে কয়।। 
ইন্দ্রাণী কি কারণে নিজ লোক ছাড়ি। 
আসিবেক মর্তলোকে মনুষ্যের বাড়ি ।। 
পরম রূপসী পরী পাখা দুটি আছে। 
অপ্সরী প্রভৃতি থাকে পুরন্দর কাছে।। 
রাজকন্যা বলা যেতো রাজবাড়ি হলে। 
কে পারে কহিতে শেষ এই রূপ বলে।। 
বাসনা পুরিত তাবে কহিয়া সে রূপ। 
নয়নে রসনা যদি দিত বিশ্ব ভূপ।। 
একে দেখে অন্য বলে কি কব কাহার । 
বিবিরো ওমতি নেল হায় হায় হায়।। 
সে রূপ হেরিয়া মন না হক হারায়। 
কেমনে মিলিবে তবে ভাবিছে উপায় ।। 
কামিনী কটাক্ষবাণ হানে তার পরে। 
ত্বরিত তড়িৎ প্রায় প্রবেশিল ঘরে।। 
নাগর দেখিল একি অন্ধকার ময়। 
একেবারে চন্দ্র সূর্য দুই অস্ত হয়।! 
ভবানীচরণ ভনে এই অনুমানে। 
মজিবে মজার কৃপে যাবে ধন মানে ।। 


|| নাগর নায়িকা শির্ীক্ষণ করিয়া প্রত্যাশায় 
মনে উদ্যোগ করিতেছেন ।। 
|| ভিপদী।। 


না দেখে কামিনী পরে, ব্যস্ত হয়ে আসি ঘরে, 
কামানলে তনু জবর জবর । 
সে দুঃখ কহিব কত, বারি হীন মীন মত, 
মন পোড়ে নাগর কাতর।। 
পোড়া মনে ভাবেন উপায়। 
এ দুঃখে হইতে পার, উপায় না দেখি আর, 
৪৭ 


দুত্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


জাগরণে যামিনী পোহায়।। 
মিষ্টানন ভোজনে অনাদর। 
যৌবন বুঝিয়া সরোবর ।। 
কাণ্ডারি কে হইবে তাহার। 

মনে পড়ে মালিনীরে, থাকে সরোবর তীরে, 
তারে ডাকি করি মুলাধার।। 

সে ঘটাবে প্রিয়তমা, কেহ নাহি তার সমা, 
সে আইলে হইবে উপায়। 

ভবানীচরণ কয়, দিন নাহি আর রয়, 
সূর্য্দেব অস্ত গিরি যায়।। 


|| নায়ক নিকটে মালিনী দূতীর আগমন ।। 
|।পয়ার || 


পদ্মিনী বধূর হয় গমন সময়। 
বিয়োগী বধুর আশা পুরাণ নিশ্চয় । 
প্রত্যক্ষ দেবের কৃপা "হইল উপায়। 
প্রথমে মালিনী রূপা আইল তথায়।। 
মালিনী সুন্দরী ছিল বিধাতার বাজি । 
বয়স হয়েছে কিছু তবু মাজা মাজি।। 
শ্যামল বরণ রামা অর্দেক বয়েস। 
ভুবন ভূুলাতে পারে যদি করে বেশ। । 
আকর্ণ পর্যস্ত তার কুমুদ নয়ন। 
ভুরু সেই মত বিধি করেছে সৃজন ।। 
দত্ত সব করে কাল দিয়ে গোলা মিশি। 
তার মধ্যে শশী দুই আলো করে নিশি।। 
পীনস্তন ছিল অতি কি কহিব হায়। 
তবু তারে এক্ষণে শ্রীফল বলা যায়।। 
নিতম্ব হয়েছে ভারি ক্রমে বাড়িয়াছে। 
দেখে যদি কেবা নাহি যায় পাছে পাছে।। 
দেখে শুনে রাপ বেশ লোকে পড়ে ঘ্বুরে। 
৪৮৮ 


দত্তীবিলাস 
পরিধেয় বাস খাস বাগানের ডুরে।। 
ঝুটা মুকুতার নত নোলক সহিত। 
স্বর্ণের পবিত্র হার গলায় শোভিত।। 
সোনালি সহিত পলা শঙ্থকড় করে। 
রূপার তাবিজ আছে বাজুর উপরে ।। 
মালিনী এরূপ বেশ করিয়া বিস্তার। 
বৈকালেতে বেলফুলে গাথি মালা হার। 
সেই পথে যায় যথা নায়ক ভবন। 
বলে বেল ফুল চাই যবে মজে মন।। 
স্বর শুনি. মালিনী এ নায়ক বুঝিল। 
তটস্থ হইয়া তবে তাহারে ডাকিল || 
শুনিয়া মালিনী কহে কে ডাকেরে ভাই। 
কে কোথায় কেন ডাকো বেল ফুল চাই।। 
কাতর নাগর হাসি যায় তার কাছে। 
আমি ডাকিয়াছি মাসি কিছু কথা আছে।। 
কথায় আশয় বুঝে বাসায় আইল। 
আইস আইস বৈস মাসি কহিতে লাগিল ।। 
আর্তধধরে করপুটে আর অকপটে । 
নিজ অভিলাষ কয় মালিনী নিকটে ।। 
শুন গুন গত দিনে দিবা অবসাহুন। 
পরম সুন্দরী এক দেখি এই স্থানে ।। 
ইহাতে আমার প্রতি সেই রসব্তী। 
ত্যজিল অপাঙ্গ শর অসহ্য £স অতি।। 
অস্তরে সে শরে আমি হয়ে জ্বরজুর। 
নিবারণ কিসে হবে ভাবিয়ে ফাপর!। 
প্রমত্ত চঞ্চল চিত্ত চকোর আমার। 
ব্যাকুল হয়েছে বড় নাহিক নিস্তার ।। 
শুনেছি তোমার গুণ করহ. বিহিত । 
ধনে পরিতুষ্ট হবে হইব বাধিত ।। 
ভবানীচরণ বলে নাহি কোন ভর । 
এখন শুনহ্‌ তবে মালিনী কি কয়।। 


৪৯ 


।1 মালিনীর সহিত শায়কেবর কথোপকথন ।। 
(| ভ্রপদী 11 


শুন হে লাগল বাব, 
শপ ছা 
নহে তোমার ক্র, 
ইলণ বাধা 


এ ০শ্রুনের বারা, 


৬ 


৬ 


ধন মান তুচ্ছ ভ্ভান করে! 
টিকা পীনে নাভি চায়, মেরা যত চাহে পায়, 
তিলেক নং ভব তার তে :। 
নন ওহে বীসলভা, উকি অভি কড় কাম্‌, 
উকি দিলো হইতে উব্দাহিই। 
অধিল্ ভি কল আক, বলিল সব সান, 
(বত কিট এ জু টাচ | 
“5 বুঝায় ছলে, সভাসয বরকত লে, 
এলি আসি কিমন হিভন্দী। 
বডিতভে হে নিম হঙহাত হিস প্র ুখদ নয়, 
০প্রেশ্ ভার্ন ভ্ভাি কলি 
নাগর কালনল দাত উন লি হালিবদিছ 
গড উ্িগিসামি চি কাছ 
তারে হেবা শী ভাতে, বিশটি শি ভাজি হাতে: 
[প্রন কি বিশ্গয় ছাড়ি পে, 
০ £প্রমেল অভিল্যাবী, বৌবিলি হাশর কা, 


দেখিয়া হয়েছ কাবু, 
০৮ বড় পাল। 

পায় গায়)! 

রত আন্ছ হারা, 


দেখে গাকিত, 


চড়িয়া! চিবেচ গর্পড়ত নিত্য খায় লেন আড়ি, 
এডি দেহা প্রেচা তালু ফাকি, 
এও হে 2গ্রনালী, £হতামভ মতিত আলি, 
লি লৃহিল পাহিল যাহাকিত 
ভাঙুত জায় পাকা শোভা, যুদি পাই মলোলোনড 
তবে বায় করিব ইহাতে! 
ইদ্ধে বি জিরা আনত তিবে খুচাহর ভম, 


দাত শপ হু আহে 


লিনা আল দিয়ে, 


কিবা নাহ । 
দুনাোহল তাতে দিয়ে, 


€৫ 


দৃ্াশিলাস 
বলে লও খাইবে মিঠাই ]। 
মালিনী কহিল সাপ, বলে ভাল মোর বাপ, 
তাই বলি কেন নাহি হবে। 
ভবানীচরণ স্মরি. মালিনী কি ভাব ধরি. 
কহিতেছে মন্দ মৃদু রবে।। 


|| মালিনীর নাগরকে আশ্বাস প্রদান || 
11 পয়ার।। 


মালিনী পাইয়: মুদ্রা সন্তোষ হইল । 
করিব তোমার কর্ম নায়কে কহিলি।। 
আমি তারে ভাল জানি অতি লসবতী!। 
রসিক যুবার প্রতি যত্র তার অতি?' 
যেহেতু অকৃতি বড় শুনি তার পতি। 
দেশে "লাক বোধ করে “যন পশুপতি 
আজি কালি তার কাছে যাব ফুল ছলে 
বিরলে আনিয়া অমি কহিব কৌশলে ।। 
অদ্য তবে ঘরে যাই দিবা অবসান 
স্বস্থানে মালিনী পরে কবিল প্রস্থান !। 
থা তাহার আশা কিয়! ধারণ। 
লহিলেন হির মনে চতিক যেমন ;। 
প্রভাত মালিনা আসি মলিন বদনে, 
কহিত লাগিল কবে নায়ক সদনে ৷ 
আজি কামিনীর কাছে যেতেছিনু ছলে। 
ফুল দেখি ফেবশপয় যেতে দ্বারি বলে; 
অন্দরে প্রবেশ করা হইল মোর ভার। 
শাপিতিনী যায় দেখি মানা নাহি তার, 
মোহিলী বাগানে বাস মতি তার নাম। 
তারে ভার দিলে পুরাইব মনক্কাম।। 
আমি ত সচেষ্ট 'আছি কি করিব হায়। 
এই কথা বলে মাগি ভোগা দিয়ে যায়।। 
নায়ক শুনিরা মনে ভাবে সবর্বনাশ। 
মালিনী করিবে হর ছিল যে বিশ্বাস।। 
এখন কি করি আর ভাবিলেন পরে। 


ভবানী কহিছে খেদ না ধরে অস্তরে।। 
৫৬ 


দু'্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


॥। মালিনীর কথায় নায়কের খেদ।। 
|| পয়ার।। 


রূপসীর রূপ নদী অকুল পাথার। 
কেমনে পাইব কুল না জানি সাঁতার।। 
মালিনীর বাক্য তাতে হইল তরঙ্গ। 
ইহাতে হরিবে প্রাণ হতেছে আতঙ্গ।। 
যদি সে তরুণী তরি হয় গুণবতী। 
শুনিলে সে গুণ হেতু পাঠাইবে মতি।। 
তবেই তরিতে পারি রূপ পারাবার। 
নহে ত নিমগ্ন হব নাহিক নিস্তার।। 
মনন কটাক্ষ বাণে ঘেরিল শরীর । 
বসন্ত বাতাস বহে তাহাতে অস্থির ।। 
আর তার অতিশয় অনঙ্গ তুফান। 
উপায় না ভাবা যায় হইতেছে জ্ঞান ।। 
অভাব কুস্ভতীর ভয় আছে সম্ভাবনা । 
ইহাতেই বুঝি মম না পুরে বাসনা ।। 
্ামী তার দ্বারি আদি আছে জল চর। 
ব্রমিতেছে ইতস্ততো বিষম দুস্তর।। 
মালিনী কহিল স্থির মতি যদি হয়। 
তবে তরিবারে পার ভয় করি জয়।। 
কবে সেই মতি পাব কোথায় বা মতি। 
মতি মত বোধ হয় রেখেছে যুবতী।। 
মালিনী তো বলে গেল যেই স্থানে বাস। 
ধনার্থি জনের কথা কে করে বিশ্বাস।। 
অঘোর নাগর ঘোর অকুলে পড়িল। 
কন্দপের স্তুতি কর ভবানী কহিল।। 


|| নাগর উক্ত কন্দর্পের তব।। 
'| পয়ার।। 


কন্দর্প হে কতগুণ কহিব তোমার । 
কটাক্ষ করিয়া কর কামের সঞ্চার ।। 
অনঙ্গে, হে অঙ্গহীন তথাপি অজব। 


৫২. 


অঙ্গপুরে প্রবেশিয়া কর জর জর।। 
সার ওহে শর তব চিনিতে না পারি। 
কি করে হে ব্রিভুবন হলে জয়কারী ।। 
দর্পক, দর্পিত জনার দর্প কর দুর। 
দয়াসিন্ধু দয়া কর দীন কামাতুর || 
মনসিজ, মনে জন্ম মন দগ্ধ কর। 
মনেরে কটাক্ষ করি মনেতে বিহর।। 
পর্চশর পধ্চাননে করেছে অস্থির । 
শুনেছি চঞ্চল চিত্ত হয়েছে বিধির ।। 
পুষ্পধন্ব পুম্পধনু লইয়া বেড়াও। 
পঞ্চপুম্প বাণ তাতে কিরূপে চড়াও || 
করহীন, কেমনে হে দিতেছ টক্কার। 
সব্বজীবে শরক্ষেপ একি চমৎকার ।। 
কামদেব, কামকেলি কর নিরস্তর। 
কেলিতে কম্পিত কেন কর কলেবর।। 
অন্যায় করিয়া যেবা করয়ে রমণ। 
মুলাধার তুমি তার তোমারি কারণ ।। 
রৃতিপতি, রমণে সুদিত সব আছে। 
সদা ভয় মনে হয় জাতি যায় পাছে।। 
কুসুমেষু, কুসুমিতা কামিনী লইয়া । 
যুখাসনে যুবতীরে দেহ মিলাইয়া।। 
আত্মভূ, হে আত্মমতে কর অধিকার । 
খণ্ডিতে তোমার মত সামর্ধ্য কাহার ।। 
প্রদ্যুন্ন, প্রমদা সহ. প্রমোদ জন্মাও। 
উভয়েরি মনোমত মদনে জাগাও ।। 
মদন, হে মত্তকরি যুবক যুবতী । 
জ্ঞানহত হয়ে করে বিপরীত রতি ।। 
ভুমি হে মকরধবজ দেহি কামরসে। 
ভঙ্গ নাহি হয় যেন অসম সাহসে ।। 
মনমথ, মনোরথ মনে পাছে রয়। 
স্থির মতি নহে মম সদা এই ভয়।। 
মীনকেতু মিথ্যা তব করি আকিঞ্চন। 
স্থির মতি বিনা কভু নাহয় সাধন।। 


৫৩ 


রঃ 
চা 
চু 


দৃদপ্রাপয বাংলা সাহিত্য 


সার, ও হে মন সদা করিছ মর্দন! 
আমারে যেমন কর অন্যে কি এমন || 
সন্বরারি, সম্বরণ কর ধনুকর্বাণ। 

আতঙ্ক হয়েছে বড় কাপাতেছে প্রাণ। 
কাম, হে কাতরে কহি কমল চরণে। 
কাস্ত কাস্তা বিয়োগের দগ্ধ কর মনে।। 
বিরল অনল একে হয়েছে প্রবল। 
শরঘৃত হবনেতে কর না উজ্জ্বুল।। 
সম্প্রতি আমারে কর কিঞ্চিত করুণা। 
মতি, মোরে আনে দিয়ে পুরাও বাসনা ।। 
ভবানী কহিছে মতি কামানের তরে। 
বিকালে কামিনী কাছে যায় বেশ করে।। 


|| মতি নাপিতিনী বেশ করিয়া যায় 
নাগরের সহিত পথে সাক্ষাৎ।। 
|| লঘু ত্রিপদী।। 


করিয়া মতি সুবেশ। 
সে বেশ বর্ণন, শুন বিচক্ষণ, 
কি শোভে চাচর কেশ।। 
নাসার উপরে, চারু রেখাপরে, 
ঘষিয়া তিলক মাটী। 
মুখচন্দ্র ভাতি, চারুদস্ত পাতি, 
তাহে মিসি পরিপাটা ।। 
সহজ সুন্দর, দুটি ওষ্ঠাধর, 
তাহে তান্বুলের শোভা! 
সেরূপ মাধুরী, বেন কামপুরি, 
কামিজন মনোলোভা ।। 


বাহির করিয়া দিয়ে। 
কে নাহি ভুলে দেখিয়ে ।। 
প্রকাশিছে নিজ রূপ। 
পথেতে চলিছে, কটাক্ষে ছলিছে, 
উথলিয়া রস কৃপ।। 
এরাপে দেখিল, নায়ক ভাবিল, 
বুঝি মতি এই হবে! 
তাহাকে ডাকিল তবে।। 
ভবানীচরণ, কহিছে তখন, 
কামদেব কৃপা করি। 
রূপনদী তার, হইবারে পার, 
নাগরে দিলেন তরি।। 


।| নাপিতিনীর সহিত নাগরের কথোপকথন ।। 
|| পয়ার।। 


মতিকে সকল কথা নায়ক কহিল। 
ঈষদ হাসিয়া মতি কহিতে লাগিল ।। 
মালিনীকে বলেছিলে একি তার কর্্ম। 
মতি বিনা দেবা জানে যুবতীর মর্্ম।। 
উপায় করিয়া দিব যাতে তারে পাও । 
তারে তো আনিতে পারি আর কারে চাও । 
দেখিতেছ ছোটখাট বয়ো বহু নয়। 
কিস্তু সে জনার হতে অসাধ্য কি হয়।। 
যারে দেখে তুমি এত হয়েছ পাগল। 
তারে বড় বড় আছে রূপসী সকল ।। 
অমুখ রায়ের মাগ্ড পরম সুন্দরী । 
দেখেছ পালের বহু যেন বিদ্যাধরী।। 
আর এক জনা আছে দাসের ভগিনী । 
কড়ে রীড়ী তবু ছুঁড়ি স্থির সৌদামিনী।। 
সুবোধ দত্তের বৌ বিখ্যাত রূপসী । 


৫৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


অমুক সাহার কন্যা নাম যার শশী।। 
এসব যুবতী মধ্যে যারে মন চায়। 
এখনি আনিতে পারি তোমার বাসায় ।। 
ভাল মনে পড়িয়াছে মোর প্রতিবাসী। 
অমুক ঠাকুর নারী এরা তার দাসী ।। 
ইহাতেই বুঝে দেখ শক্তি কার বড়। 
ঘটাইতে পারি আমি তাবড় তাবড়।। 
শুনিয়া নাগর কয় শুন শুন মতি। 
সকলে সুন্দরী বটে হবে রসবতী।। 
তার মধ্যে কহিলে যে ঠাকুরের নারী। 
এ বড় রহস্য কথা শুনিতে না পারি।। 
ব্রাহ্মণ বর্ণের গুরু শুনহ নিশ্চয়। 
ব্রান্মাণীরা মাতৃসম সবর্ব শাস্ত্রে কয়।। 
ব্রান্মণী গমনে পাপ কত কেবা জানে। 
মননেতে মহাপাপ পুরাণে বাখানে।। 
ব্রা্মাণের সেবা করা শৃদ্রের স্বধর্ম। 
তাহে তীর্থ যাগ যজ্ঞ সিদ্ধ সব কর্্ম।। 
সেবক হইয়া সেবে সে পদ পঙ্কজ। 
সেই শুদ্রে নাহি করে সে হয় অস্ত্যজ।। 
ব্রার্মাণের মর্যাদা জানেন নারায়ণ । 
ভৃগুপদ চিহ্ন তিনি করেন ধারণ।। 
অবিদ্যা সবিদ্যা যত ব্রান্মণ সমান। 
সকলি বিষ্ণুর দেহ কন ভগবান।। 
যদ্যপিও দ্বিজনারী দ্বিচারিণী হয়। 
শুদ্রাদির মাতৃতুল্যা গমনীয়া নয়।। 
ব্রা্মাণীর মন্দ কথা এনোনাক মুখে। 
ইহ পরকাল ক্রেশে যাবে রবে দুখে।। 
অন্য অন্য যে সকল কারে নাহি চাই। 
করহ. উপায় মতি তারে যাতে পাই।। 
ভবানীচরণ কহে নায়ক বীমান্।। 
রসিকের চূড়ামণি অতি সাবধান ।। 


৫৬ 


দূতীবিলাস 
|| নাগরের প্রতি নাপিতিনীর, যুক্তি প্রদান।। 
|| দীর্ঘ ব্রিপদী।। 


শুনিয়া কহিছে মতি, উপদেশ তার প্রতি, 
ওহে রসরাজ কেন ত্রাশ। 
সে কেন হে প্রেমে করে আশ।। 
বাছিবেক সে বাছা যাহার। 
শুনে ভ্রম যাইবে তোমার।। 
কেন ইতে করহ বিচার । 
গুরুপত্ত্ী অহল্যায়, ইন্দ্র উপগত তায়, 
রাবণ হারিল সীতা আর।। 
বালি ভার্য্যা তারাসতী, তাকে হরে কপিপতি, 
নিজ সৃতা হরে ব্রহ্মা শুনি। 
যাতে জন্মে বেদব্যাস মুনি।। 
এইরূপে দেবগণে, সম্ভোগে যুবতী জনে, 
পাপ কেনে হইবে রমণে। 
ভুবন মথনে ম্ড, মনুষ্যের শুন তত, 
কহিলে বুঝিবে মনে মনে।। 
কেহ হরে পিসি মাসি, জানিল তা প্রতিবাসী, 
মামি হরে বিশ্বেধন আশ। 
ভাদ্রবধূু হরে কেহ, কহি যদি মন দেহ, 
আছে বড় বাজারে প্রকাশ ।। 
খুড়ি না শাশুড়ি বাছে, শুনি অনেকের কাছে, 
আর বহু বাজারে শুনিবে। 
কহিলে তা এখুনি বুঝিবে।। 
জান দেব দত্ত সূত, তার গুণ অদ্ভুত, 
ভার্যা যার অতি রূপবতী। 
সে হইল পুত্রবতী, ফিরিল কর্তার মতি, 


৫৭ 


দু্প্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


ব্রাহ্মাণীর হৈল উপপতি।। . 
শুনি তার সতী নারী, বুঝে পতি পা'পকারি, 
রোগচ্ছলে পরাণ ত্যাজিল। 
পুনঃ করিল সংসার, অনুপম রূপ তার, 
দ্বিজ পত্রী তবু না ছাড়িল।। 
বহুকাল করি ভোগ, ভোগেতে হইল রোগ, 
কাশী গেল গৃহে রাখি নারী ।। 
ব্রাঙ্মণী হরণ গেল হারি।। 
অতএব মহাশয়, কেন ইথে কর ভয়, 
রসিক কি করে ভেদ নারী। 
ভবানী কহিছে কত, সাক্ষী তুমি চাও যত, 
আরো কত দেখাইতে পারি।! 


|| মতিব্র যুক্তির পর নাগরের ডত্তর প্রত্যুতর।। 
|| পয়ার।। 


নায়ক শুনিয়া সব কহে রাম রাম। 
অগম্যা গমন করে বিধি যারে বাম।। 
এসব কথায় আর-মাহি প্রয়োজন। 

যে কথা কয়েছি তার কর আয়োজন ।। 
তোমার শুনিয়া কথা হই প্রত্যয়। 

প্রবৃত্তি জন্মিয়া রাজি করহ নিশ্চয়।। 
কথা শুনে কি করিব কাযেতে জানিব। 
কাষে কাষে দেখা যাবে সকলি বুঝিব।। 
শুনিয়া কহিতে সবি সে যে বড় ঘর। 
সেখানেতে সরাসর যাওয়াই দুক্ষর | 

না ডাকিলে তার ঘরে 'কে যাইতে পারে। 
আমি যেতে পারি সেতা কামানের বারে ।। 
এক জোড়া মতি মারে পার যদি দিতে। 
তবে সেই ছুতা করে যাইব বেচিতে।। 
তখনি আনিয়া তার হাতে মতি দিল। 
পায়্যা মন মত মতি নাগরে কহিল।। 
শীঘ্র আমি যাব সেথা রহিল কামান। 


৫৮ 


বিলম্বে নাহিক ফল দিবা অবসান !। 
বিদায় হইনু ত্বরা যাইতে হইবে। 
কালি আসি কব সব গনিতে পাইবে ।। 
মতি ভ্রমে মতি দিল নাগর সুমতি। 
ভবানী কহিছে কিবা করে দেখ মতি ।। 


|| নাগর সমীপে মতি পুন আসিয়া নায়িকার সম্বাদ কহিতেছে।। 
|| একাবলি।। 


পর দিন আসি কহিছে মতি। 
গিয়াছিনু সেথা লইয়া মতি।। 
দিদি দিদি বলে ডাকিনু গিয়ে। 
তখনি আইল স্বর শুনিয়ে।। 
কি খাসা বসন ভূষণ পরি। 
বসিল কপাট আড়াল করি।। 
অনেকে বাহিরে দাঁড়ায়্যা আছে। 
এই ভয় কেহ নীরক্ষে পাছে।। 
সুন্দরী চম্পক বরণী বালা। 
রূপে তার ঘর করে উজ্জ্ুলা। ৷ 
সুমেরুর বড় বড়াঞ্ ছিল। 
পীন স্তন দেখি খাট হইল || 
বদন বিমল আভা দেখিয়ে। 
বিধু কলা ক্ষয় হয় ভাবিয়ে ।। 
নয়ন দেখিলে খঞ্জন তায়। 
আপন নাচন ভুলিয়া যায়।। 
ক্ষীণ মাজা অতি নিতম্ব পীন। 
উপমা কি দিব সকলি ক্ষীণ।। 
কুটীল কুগুল মস্তক ভরি। 
লাজ পেয়ে বনে যায় চামরী।। 
নাসার তিলক করিয়ে জ্ঞান। 
তিল ফুলে হয় কামের বাণ।। 
করি কর বিধি কাটিয়া নিল। 
হস্ত পদ গতে গঠিয়া উঠিল।। 
আর কি তেমন হবে রূপসী। 
৫৯) 


দুংপ্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আহা মরি যেন কনক শশী ।। 
বাহির করিল বদন খানি। 
ইঙ্গিতে কহিনু সঙ্কেত বাণী।। 
শুনি ধনী কহে কেমন জন। 
রূপগুণ তব কহি তখন ।। 
জিনিয়ে হরিতাল বদন মানি । 
নবীন পুরুষ মধুর বাণী ।। 
মদন মোহন রসের কৃপপ। 
ব্রসময় তনু রসিক ভূপ।। 
হেন মনে হয় নদের চাদ। 
কামিনী ধরিতে পেতেছে ফাঁদ।। 
আঁখি মুখ হস্ত পদ দেখিয়া। 
নলিনী জলেতে রহিল গিয়া ।। 
ভাগ্যবস্ত শাস্ত বড়ই বীর । 
তব প্রেম আশে যেন ফকীর।। 
কুলে শীলে শুনি বড় মানেতে। 
দ্বিতীয় না দেখি ধন দানেতে।। 
তাহাতে সম্মত, হলো যুবতী । 
সঙ্কেত করিয়া লইহলু. মতি।। 
তবে কহি. দেখা হইবে কবে। 
কহিল সুযোগ পাইব যবে।। 
ইয়ে ইয়ে কহিবে তারে । 

সব কব এসো কামান বারে ।। 
এই স্থির করে সে দিনে কবে। 
ইথে বুঝি কিছু গৌণ হবে।। 
নিত্য নিত্য যাওয়া নাহিক মোর। 
যদি যাহ যেন হইয়া চোর,। 
তুমি হইয়াছ কাতরা অতি। 
সদা কহ শীঘ্র এনে দে মতি।। 
ইথে তাড়াতাড়ি কেমনে হয়। 
মোর মনে এই রয়েছে ভয়।। 
ভয় পেয়ে স্থির করেছি মনে। 
মন দিয়ে শুন হবে যেমনে।। 


৬০৩১ 


দুবেলা যে জন যাইতে পায়। 
পায় সে তাহায় কহিতে তায়।। 
অতএব সেই উপায় কর। 

দুগ্ধ দেয় সেতা উড়েনী সার।। 
তারে ডেকে বল নাহিক লাজ। 
তবে হতে পারে ত্বরায় কাজ।। 
আমি যাই তারে ডাকিয়া দিব। 
পরে মোর সব বুঝিয়া নিব।। 
ভবানীচরণ ভাবিয়া কয়। 

তারিণীরে ডাকা উচিত হয়।। 


|॥ নাপিতিনীর কথামত নাগরের খেদ।। 
|| পয়ার।। 


শুনিয়া মতির কথা ভাবিত নাগর। 
মনেতে হয়েছে খেদ হইয়া কাতর ।। 
মতি মাগি নষ্ট লোক ইতি মন্দ অতি। 
ছলনা করিয়া বুঝি হরিলেক মতি।। 
আপনি পারগ তায় অন্যেরে ডাকায়। 
কিসেতে প্রতীত হবে এমন কথায়।। 
এমন কার্যেতে প্রাণ জুড়ায় যে জন। 
ফলে তার কাছে ফাকি এই সে রটন।। 
মতি গেলে তাহে বড় নাহি হয় ক্রেশ। 
কি জানি কেমন কর্ম কে করিবে শেষ।। 
কেমনে কুক্ষণে হায় হেরিয়াছি তায়। 
বুঝি বিধি বিদেশেতে বিপাকে মজায় ।। 
নয়নে লেগেছে পপ কেমনে পাসরি। 
একে পায় আর হয় এই ভয় করি।। 
কাতর হয়েছি আমি রূপ ভাবে যার। 
সে যদি জানিত মোর এই সমাচার ।। 
অবশ্য তাহার লোক আসিত হেতায়। 
নাপিতিনী বলে নাহি ইহাই বুঝায় ।। 
রাখিতে না পারি প্রাণ হৃদয় মাঝারে । 
যায় যায় যায় প্রাণ না হেরে তাহারে।। 
৬৬ 


দুত্প্রাপ্য বাংলা সাহিশ; 


আছে মাত্র উড়েনীর আসার আশয়। 
চিনি তারে নাহি জানি কোন্‌ স্থানে রয়।। 
কোন মতে নায়ক না দেখিয়া উপায়। 
অস্থির হইয়া গৃহে পরে ছাতে যায়।। 
কাতর হইয়া সদা সেই দিকে চায়। 
সেজন বারেক উঠে এই অভিপ্রায়।। 
ছাতে পুনবর্বার আর তারে না দেখিয়া । 
বারান্দায় বৈসে আসি মলিন হইয়া ।! 
মতি গিয়ে উড়েনীরে সকল কহিল। 
শুনি সর বেশ করি ত্বরায় আইল ।। 
ভবানীচরণ কহে উড়েনী মিলিল। 
তৃতীয় দূতীর কথা রচিতে হইল ।। 


|| সর উড়েনীর নাগর নিকটে আগমন ।। 
|। দীর্ঘ ব্রি্পদী।। 


গুনহ্‌ সরোর রূপ, কহিব স্বরূপ রাঁপ, 
অপরূপ কে বর্ণিতে পারে। 
খবর্ব নহে দীর্ঘাকার, নিতম্ব বড় দেহ তার, 
বর্ণে অমাবস্যা নিশি হারে ।। 
হরিপ্রা দিয়েছে গায়, কিবা শোভা হায় হায়, 
কভ্ভালে করেছে চক্ষু পড়। 
ল্ালিপেড়ে কটকিয়ে, সাড়ি পরা কাছ। দিয়ে, 
কষেছে কৌপীনে কটি দুঢ়।। 
পেশী খড় তুচ্ছ করে, রৌপ্য গড়গড়ে পরে, 
দ হাতে তর্বিজ বাজজু বঙ্ধা। 
1» ভিত পিন্দু ভালে, সব্রদাহ পানগাালে, 
দুগভাগ কাখে কথা ছন্দ | 
নুর্ধ নারে পাড় পাড়া, চলে দিয়ে হাত লাড়!, 
হপ্ডতিনা ভবশির সুগস্তনী। 
হিন্দি আদি কেতে পারে, দুগ্ধ নাহি বেছে ধারে, 
চক্ষু ঠারে দেখায় গস্তানী। 
এইব্দপে যায় সরু, সবে বলে সর সর, 
না সরিলে গুনায় সুবর। 
৬২ 


দূতীবিলাস 
নাগর মনেতে জানি, সর এই অনুমানি, 


ভাবে বুঝি দুঃখ অবসর।। 
অতি সমাদরে ধীরে, ডাকিলেন উড়েনীরে, 
এস সর দুগ্ধ দিতে হবে। 
সর তো তাহাই চায়, কুটীর ভিতরে যায়, 
মনে বুঝিয়াছে যাহা কবে।। 
তথাচ তাহার সনে, রসকিছু করি মনে, 
প্রকাশি আপন বাচালতা। 
উড়ে ভাষে করে রসিকতা || 


॥। সবোর উড়ে ভাষায় নাগরের সহিত বসিকত1॥। 
|| ললিত ছন্দ।। 


সত্য কৌচি মু তোতে দুধ দিমি নেই। 
আলো মো দুধ খাই কৌড়ি পারিবু দেই '। 
মো সেরেক দুধ দেই পাঁচ টাকা নিমি। 
তু আউ কৌঠি সালো মু তোতে না দিমি।. 
নটখট করচু কাই মতে ছাড়ি দে বাট। 
উচ্চ্ছার হইচি মু ভ্িব পথথর ঘাট।! 
আলোথরে শু অছি নন্দ শাশ শশর। 

দুধ বিকি করি মূ কাই যাউচি ঘর |! 

মতে কড় ঘর নিজিবি দুধ দিমি চল: 
আউক্কি কৌরাড় কু পাঞাব বল।। 

মতে মিছি মিছি, ডাকুচি ভাই। 

মতে কেতে দবু ভো টাকা দেখি বষ্ইি )) 
ভবানীচর্ণ কয় সরু জাতি 'শ্ীড়। 


অন্য কিছ নাহি জানে কেবল কৌড কৌড।। 
ছু নাহি 


4 


॥। নাগরের সহিত উড়েনীর কথোপকথন ।। 
| একাব্লি ছন্দ।। 


শুনে উড়ে কথা না বুঝে নাগর। 
ভাবে টাকা চায় নাহিক ডর ।| 


৬৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত 


কেন সর তুমি ভাব এমন। 

ঠিক মুল্য দিব দেখ তখন।। 
পাচ সাত টাকা যোগ্য কিতা কব। 
শতাবধি টাকা ছাড়া কথা না কব। 
তোমারে কি জন্যে ভাব ডেকে আনা। 
কবে না কি কারে করি হে মানা।। 
একদিন আমি উঠি ছাতে। 
ওমুকের বহু দেখিছে তাতে। 
পরম সুন্দরী ওই রূপের ফাদে। 
মন পড়িয়াছে পরাণ কাদে ।। 
তারে ফাদ তুমি ঘটাতে পার। 
তবে দুঃখ হতে হইব পার।। 
নাগর কহিল আর কি কব। 
শুনে সর কহে বুঝিনু সব।। 
শুনাই ওহে রসিক রাজ। 

আমা হতে হবে তোমার কাজ।। 
আছে কি মোর তথায় ভ্রম। 
বাধা সাধা করা কতেক শ্রম।। 
হবে হবে তুমি সুস্থির হও । 

দিব দিব এনে দুদিন রও || 
কলে বলে কিবা আটক রয়। 
আনিব তাহারে কাহারে ভয়।। 
পাবে পাবে তুমি তাহারে হেতা। 
যাব যাব আমি এখনি সেতা।। 
যাহা যাহা ধনি বলিবে মোরে। 
কব কব কালি আসিয়া ভোরে।। 
বলহ দেখি কি দিবে তবে। 
হাতে হাতে সেহ হাসিয়া লবে।। 
নিতি নিতি যাই তাহার বাড়ি। 
ছলে বলে এনো ঢাকাই সাড়ি।। 
হেসে হেসে বলে রসের কথা। 
একা থাকে কেহ নাহিক তথা ।। 
নিশানা করে রসিক পেলে। 


৬৪ 


রসে বশে আঁখি থাকিব মেলে ।। 
কোন কোন দিন ছাতের পর়ে। 
বধু মধু আসে ভ্রমণ করে।। 
হায় হায় যদি তোমারে পায়। 
বুদ্ধি শুদ্ধি ভুলে মজিয়া যায়।। 
এমনি এমনি পুরুষ চায়। 

বটে বটে বলে ভবানী তায়।। 


।। নাগরের প্রতি সরোর আম্মাস প্রদান 7। 


|| লঘু ভ্রিপদী।। 


সরোর কথায়, খফি মজে যাক, 


কামুক আছে কোথায়! 
নাগরের মন, করিল হরণ, 
দিলেক আশ্বাস তায়।। 
নায়ক ভাবিল, মঙ্গল হইল, 
সবর পারে মন নেহ। 


শুনি ততক্ষণে, বন্ট্রেল জাত, 


চারিটি মোহর দয় ।। 


কহিলেন শন, লু তল হি 
তুল হও যারে, তচ্চু কু বাটিতে, 


নাগর বাসাতে, রহিল আশাতে. 


সর যায় তার বাড়ি। 


চলে শীঘ্র গতি, যথায় যুলতী', 


দুরে গেল কেনা সাড়ি।! 


তুমি রূপসীর সার। 


শুন কিবা কব, হেরে রূপ তিব, 


পুরুষের বাঁচা ভার ।। 


৬৫ 


| তিতা? 


দুহপ্রাপ্য বাংলা সাহিত। 


বাবু একজন, বড়ই সুজন, 
পড়িয়াছে তব পিছে।। 
শুনি শিহরিল, সরকে কহিল, 
কেন বল মোরে মিছে।। 
হয়ে পরাধীন, আছি চিরদিন, 
তুমি তো সকলি জান।। 
কোন সুখ নাই, মর্যে আছি ভাই, 
বাঁচি যদি যায় প্রাণ।। 
শুন সর বলি, হবে ঢলাঢলি, 
'যদি শুনে ঘ্বুন যান। 
কর্তী বাটী আছে, ঘরে এসে পাছে, 
তবে হবে অপমান ।। 
লজ্জা পাছে পাও, আজি চলি যাও, 
কহিব শুনিব পরে। 
সর তা শুনিয়ে, ভবিতা হইয়ে, 
দ্রুত গেল নিজ ঘরে।। 
ধনাপহরণে, নায়ক ভবনে, 
আসি পর দিনে কয়। 
ভবানীচরণ, করিল রচন, 
সর মতি মত নয়।। 
|| সর নাস্সিকার সম্বাদ নায়ক নিকটে কহিতেছে।। 
1 পয়ার।। 


সর আসি বলে বাবু কি কর বসিয়ে। 
ভাল ফেরে ফেলিয়াছ সে কথা কহিয়ে।। 
না জানি কেমন মিষ্ট সুখ পেয়েছিলে। 
মধু মাখা কথা কয়ে মোরে কিনে নিলে ।। 
তব লাগি ভেবে ভেবে হইনু অঙ্গার। 
রেতে চক্ষু বুজি নাই দোহাই গঙ্গার।। 
কালিকার পরিশ্রম শুন তবে কই। 

টাকা নিয়া ঘরে যাই হেন মেয়ে নই।। 
তখনি বাজারে গেনু কাপড় কিনিতে। 
তার মনে ধরে সাড়ি না পাই দেখিতে ।। 


৬৬ 


(৬ 


দৃততাবিলাস 

দোকানে দোকানে ভাই ঘুরে, ঘুরে মরি। 
ভাল সাড়ি না পাইয়া ভাবি কিবা করি।। 
তার পরে দেখি এক চেনা লোক যায়। 
যেমন কাপড় চাহি কহিনু তাহায়।। 

সে আমারে সঙ্গে করে নিয়ে নিজ ঘরে। 
এক জোড়া সাড়ি দিল বড় সম্ভা দরে।। 
বাজারে তেমন সাড়ি কার সাধা পায়। 
তার জোড়া এক পোন টাকায় বিকায়।। 
আমি তারে চক্ষু ঠেরে কত ভোগা দিয়ে। 
ষোল গণ্ডা টাকা দিয়ে পরে এনু নিয়ে।। 
সেথা হতে দুগ্ধ নিয়ে গেনু তার বাড়ি। 
দিদি বলে ডেকে দেখাইনু সাড়ি।। 

তার পর সব কথা ভেঙ্গে কৈনু তারে। 
শুনে বলে সবর্বনাশ কি হবে আমারে ।। 
ওলো সব জেনে শুনে কেমনে বলিস। 
নষ্ট দুষ্ট মত মোরে কখন দেখিস।। 
তুই মোর বাড়ি ছুঁড়ি দুবেলা আসিস। 
কভু কিছু শুনেছিস বলিতে পারিস।। 
এই কথা শুনে মোর মনে হৈল ভয়! 
এলোমেলো কথা কয় রাজি বা না হয়।। 
পরে পায় ধুর বলি মোর কথা লও । 
আমল শ্াভিরে ভাই তারে রাজি হও ।। 
অনেন কথার পর শেব হল রাজি 

মন তর বুঝিয়াছি নহে কারসাজি ।। 
কিন্তু এক কথা ভাই বলেছে তখন। 
বলো তারে দেখা হবে যো পাব যখন।। 
মোর সেথা বছুকাল থাকা নাহি হয়। 
কেমনে বুঝিব তবে সুযোগ সময়! 
সম্মতি তাহার আমি করিয়া এসেছি। 
সুযোগ সময় জন্য উপায় ভেবেছি। 
কিশোরী নেড়ীর নাম শুনিয়া থাকিবে। 
তাহা হইতে তুমি তার সময় বুঝিবে।। 
তাহারে তোমার কাছে পাঠাইয়া দিব। 


৬৭ 


দুষ্প্রাপা বাংলা সাহিত্য 


আজিকে বিদায় হই পরেতে আসিব।। . 
এ কথা কহিয়া সর করিল প্রয়াণ। 

, শুনি নাগরের যেন উড়ে গেল প্রাণ।। 
কিস্ত সর গিয়ে সব নেড়ীকে কহিল। 
নেড়ী শুনি শীঘ্র করি বাসায় চলিল।। 
ভবানীচরণ কহে নাগরে মজায়। 

ধরা পাখি হাতে দিয়ে উড়েনী উড়ায়।। 


|| কিশোরী নেড়ীর সহিত নাগরের সাক্ষাৎ।। 


তসরের ঠেঁটী পরা, 
পানগুয়া গাল ভরা, 
নেড়ী বলা অতি ভুল, 
লাজ পায় অলি কুল, 
গলে শোভা চমৎকার, 
মোটা গোট কটি মেলে, 
ভাবে যেন পড়ে ঢুলে, 
বয়স বিহিত কুচ, 
তথাপি স্বর্ণের কুচ, 
আড়ে আড়ে পিছে চায়, 
দেখে যারে ঠেরে যায়, 
কথায় কথায় ভঙ্গি, 
এক নেত্রে কত রঙ্গি, 
ক্ষণেকে মুদিত আস্য, 
ক্ষণে ক্ষণে পরিহাস্য, 
এ ভাবে কিশোরী যায়, 
সে ভাব বর্ণন দায়, 
ভবানীচরণ কয়, 

আর না করিও ভয়, 


গোলাবি রঙ্গের গামছা কাধে, 
ঘষা মাথা ফাঁপা চুল, 
পড়িয়া কুণডল রূপ ফীদে।। 
আর (সোনা দানা মনোহর। 
চাবিশিক্রি তাহে ঝুলে, 
-গৌরাঙ্গে অনঙ্গ নির্ভর ।। 
কাপড়েতে করি উচ, 
লাগে ভাব থাকিলে অস্তর। 
ভাবে আছে কে কোথায়, 
বিধুমুখে হাসি স্বতস্তর।। 
দশনে মদন ভস্ম মিশি। 
ক্ষণে হয় সুপ্রকাশ্য, 

পুরুষে মজায় দিবানিশি || 
নাগর দেখিতে পায়, 
ভাবক যে মনে সেত বুঝিবে। 
শুন বাবু রসময়, 

নেড়ী হতে সন্ধান পাইবে।। 


৬৮ 


|| কিশোরী নেড়ীর প্রতি নাগরের উক্তি।। 


|| লঘু চৌপদী।। 
প্রকাশিছে মৃদুস্বরে মনো অভিলাষে। 
মিলনে মনন করে হয়েছি উদাস।। 
মনোদুঃখে দিন যায় হইনু দীনের প্রায়, 
প্রাণ তারে সদা চায় না দেখে উপায়। 
মালিনী ও মতি সর, হইয়াছে অবসর, 
তাহাতে কাপে অন্তর, বল কে ঘটায়।। 
মতি করেছিল তায় তাহাতে পুরিয়া যায়, 
বলেছিল সে কথায় আজি যাও মতি। 
এসো কামানের বারে, মনোবাঞঙ্থা জানিবারে, 
ইথে যদি হতে পারে, হয়েছে সন্মতি।। 
কিন্তু কামানের বারে কে বল যাইতে পারে, 
অতএব ঠেকে ভারে কহিল আমায়। 
সর সদা সেই ঘরে গমনাগমন করে, 
তাহারে বলিল পরে হইবে উপায়।। 
পরে সর নিয়ে ভার নাহিক পাইল পার, 
নাম করে সে তোমার, বলিল বিশেষ। 
হইয়াছি অস্থির, তুমি যদি কর স্থির, 
তবে হই সুস্থির, ' গ্ুচে এই ক্রেশ।। 
শুনেছি তোমার যশ জান ভাল প্রেমরস, 
তুমি তারে করে বশ বুঝাইতে পার। 
প্রেমের তরঙ্গ বল, সে বড় আশ্চর্য্য কল, 
তাহে জ্বালি কামানল, হঘুবতীরে সার।। 
তোমা বিনা এই কর্ম কে বুঝিতে পারে মন 
রাখহ আপন ধর্ম, করো না বঞ্চনা। 
ভবানীচরণ বলে, জুড়াবে যুবতী জলে, 
কর বাবু কুতৃহলে, কিশোরী সাধনা।। 


৬৯ 


দৃত্্াপ্য বাংলা সাহিতা 


|| নাগর প্রতি কিশোরীর উক্তি।। 
|| ত্ত্রিপদী।। 


কিশোরী শুনিয়া বাণী, জুড়িয়া যুগল পানি, 
কহে আমি অতি ক্ষুত্র প্রাণী। 
মোরে এত সমাদর, অকারণ গুণাকর, 
কহি শুন আমি যাহা জানি।। 
বুঝিনু তোমার মন, লুটিবা পরের ধন, 
সে বড় কঠিন ঠাই ভাই। 
মুখ দেখে আমি ভয় পাই।। 
খোটটা তারা বড় ঠেটা, বাপে .নাহি মানে বেটা 
প্রভু বাক্য করে ব্রন্মাজ্ঞান। 
যদি মুখ তুলে চায়, ভয়ে প্রাণ উড়ে যায়, 
কার সাধ্য অন্দরেতে যান।। 
মাতা হেট করিয়া পলাই। 
চাকর বাকর যারা, ধনে বশ হবে তারা, 
কিন্তু এ কাটারা বালাই! । 
সে বড় হে লোক খাসা, পিরীতের করে আশা, 
প্রেম আশে কত কথা কয় 
তারে রাজি করা যায়, সেটা বড় নহে দার, 
শাশুড়ী ননদ নাহি ভর।. 
অতঞ্ব মনে করি, এ কন্যা কারি পাত্র, 
কিন্তু বহু শ্রম ধন বায়: 
কেবল টাকার শ্রাঙ্ধ, নৈেলে হব সপরাক্চি, 
এই সত্য করহন প্রভার "' 
শুন হে নাগর রাজ, আমা 2৩ হু ক 
নাহি হতে পারে বাবু শেফ 
রাত্রি সেতা থাকি নাই, ইহাতেহ ভাবি নাহি, 
যাতে হবে গুনহ বিশেষ ।। 
(গাপী দাসী কাছে থাকে, দিদি দিদি বলে ডাকে, 
আর ভালবাসে অতিশয় । 
তারে যদি বল তবে, এই কম্ম সিদ্ধ হবে, 


গোপী বই করি সাদ্ধ নয়।। 
সেও লোক ভাল বড়, তারে যদি ধরে পড়, 
অনায়াসে পুরাবে বাসনা। 
সে যবে বাসায় যাবে, সেসময় দেখা পাবে, 
বলো তারে নাহিক ভাবনা ।। 
কিশোরী চলিল নিজ বাসে! 
নাগর করিছে খেদ, নেড়ী আশা হল ছেদ, 
না জানি ঘটিবে কত মাসে ।। 
সকলেরি এক মন, হরণ করিবে ধন, 
ভোগ দিয়ে করে না উপায়। 
ভবানীচরণ কয়, হলো বাবু সুসময়, 
দেখ গোপী নিজ গৃহে যায়।। 


|।গোপী দাসীর বদূপ বর্ণন।। 
|| দীর্ঘ ত্রিপদী।। 


তথায় পাইয়া সাড়ি, গোপী পরে যায় বাড়ি, 
পরিধেয় ভাল বটে কিন্তু পুরাতন। 
পেড়ে নীল আছে ভাল, ঈষৎ হতেছে কাল, 
সে কাল সেজেছে ভাল, দাসীর কারণ।। 
বাম করে কাষ্ট লুটি, বগাল বেগুন দুটি, 
চেলের পুটলি এক আছে ভান হাতে। 
হেলে দুলে যায় চলে, কাহারে না কিছু বলে, 
রূপের গৌরব করে বুঝায় তাহাতে।। 
এক ছড়া দানা গলে, বিধবা বলার ছলে, 
চুড়ি পলা আদি কিছু নাহি ধরে করে। 
তাহার জোরেতে তুচ্ছ করে যুবা বরে।। 
একমাত্র পতি যার, সধবা বলিয়া তার, 
খ্যাতি করে দেখ এই জগৎ সংসারে । 
স্বজাতির পঞ্চ নরে, রতি দান যেবা করে, 
বেশ্যা বলি খ্যাতি তার শান্ত্র অনুসারে ।। 
ভবানীচরণ ভনে, শুন সবে স্থির মনে, 


৭৯ 


দূতীবিলাস 


দোল শব সাহিতা 


নিতা নব পতি বিনা যেবা নহে স্থির। 
কে বলে বিধবা তারে, বেশ্যা কে বলিতে পারে, 
গণিতে গোপীর পতি অস্থির মিহির ।। 


|| নাগর নিকটে গোপীর আগমন।। 
।| একাবলী ছন্দ ।। 


রূপবতী গোন্পী চলিয়া যায়। 
ঘরে বসি নাগর দেখে তায়।। 
গোপীকে -চিনিয়া ডাকিল তবে। 
মোর কথা কিছু শুনিতে হবে।। 
শুনি ক্ষেপা গোপী হইল অতি। 
রোষে ভাষ কহে নাগর প্রতি ।। 
ও মাগো ইনি কে ভাল তো দায়। 
চেনা নয় কথা কহিতে চায়।। 
পথে চলে যেতে কতই পাপ। 
না জানি কতই আছেন কাপ।। 
লোক বুঝে কথা কহিতে হয়। 
ভাল মানুষের ধারা-তো নয়।। 
জান না যে আমি কেমন মেয়ে 
অষ্টম মঙ্গলা দিব কি গেয়ে।। 
যার ঘরে আমি করি চাকরি। 
তারে যদি এই সন্বাদ করি।। 
থোতা মুখ ভোতা হয় এখনি। 
শুনে চুপ করে নাগর মণি।। 
গোপী মনে মনে হাসে অমনি। 
কীচা নাগরের গতি এমনি.।। 
কিন্তু এটা জানা উচিত হয়। 
না জানি আমারে কি কথা কয়।। 
পুন ভাবে বুঝি আমারে চায়। 
এই ভাবে তার বাটীতে যায়।। 
মৃদু মৃদু হেসে জিজ্ঞানসে তায়। 
হাতে কাঠে হাসি ঠেকিয়া যায়।। 
গোপী আসি তার বসিল পাশে। 


৭২ 


নাগর আপন সরস ভাষে।। : 
শুন শুন গোপী আমার কথা। 
শুনিলে হৃদয়ে পাইবে ব্যথা ।। 
আমি একদিন ছাতেরো পরে। 
উঠেছিনু বায়ু সেবন তরে।। 
কোন্‌ সুধামুখী হেন সময়। 
সৌধপরি ভ্রমে আপনালয়।। 
রূপ হেন যেন হীরক রাশি। 
সেইরূপ হাদে পশিল আসি।। 
হীরে হেনরূপ হৃদয় ধরে। 
হীরা ধারে যেন বুক বিদরে।। 
যদি সেই নিশি পরশ হয়। 
তবে বাঁচে প্রাণ দেহেতে রয়।। 
তুমি সহচরী শুনেছি তার। 
যদি কর দুঃখ সাগর পার।। 
তরিবারে তরি নাই তোমা বৈ। 
মনে এই ভাবি তব সোমা কৈ।। 
ভবাণীচরণ কহিছে সার। 
গোপী হতে তুমি হইবে পার।। 


।। নাগরের কথায় গোপীর উত্তর প্রত্যুত্তর ।| 
।।পয়ার || 


গোপী সেই কথা শুনে ছাড়িল নিঃম্বাস। 
এসেছিনু ভাল বুঝে করিয়া বিশ্বাস।। 
কি কথা কইলে তুমি ইকি সবর্বনাশ। 
এইরূপে করে কত ভঙ্গী হা হুতাশ।। 
মাথার উপরে মাথা কে ধরিতে পারে। 
কিসের অভাব তার কে কহিবে তারে ।। 
এমন কথার মধ্যে মোরা থাকি নাই। 
বুঝিনু মহৎ তুমি বৈশ ঘরে যাই।। 
গোপী গোসা করে যায় নাগর ফিরায়। 
সমাদরে হাতে ধরে নিকটে বসায়।। 
শুন গোপী যদি ইথে তুমি দেহ মন। 


৭৩ 


দূতীবিলাস 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত) 


সাধ্য তব সিদ্ধি করা নহে দুর্ঘটন।। 
তোমায় আমায় ভাল পরিচয় নাই। 
বিদেশী বিয়োগী দেখি কর দূর ছাই।। 
মালিনী কিশোরী মতি গোয়ালিনী সর। 
দানে দেখিয়াছে জানে বিশেষ বিস্তর।। 
তাহারা তণ্পরা আমি এ কন্মমে জেনে। 
বহুবিধ ধনে মানে তুষেছিনু এনে ।। 
কারু হতে কোন মতে কর্ম যদি হতো। 
আমা হতে নানা মতে দূরে রতো।। 
ঘটায়ে ঘটক হয়ে তুমি যদি দেও। 
মতোমত ধন দিব আর কিনে নেও ।। 
যদ্যপি নবীনা তৃমে ধারা প্রবীণার। 
বুদ্ধিমতী নাহি দেখি সমান তোমার ।। 
পথে মোরে স্পঙ্ট কয়ে ঘরেতে আসিয়ে। 
মিষ্টবাক্যে জিজ্ঞাসিলে বিরল হহয়ে।। 
ভাবে বুঝি সল্লোকের মেয়ে তুমি হবে। 
রূপ ধারা সুচতুরা নীচ কেবা কবে।। 
স্বামী হীনে শোকাকুলে মনো দুঃখ পেয়ে। 
চেটো হয়ে চাকরিতে আছ লজ্জা পেয়ে ।। 
মান্যা ছিলে ক্ষণ মনে সদা ছোপ ছোপ । 
মরমেতে মরে আছ ছাড় ক্ষোপ কোপ ।। 
আমার আশার আশা পুরাইতে বিধি। 
সুন্দরীর সহচরী সেই করে বিধি।। 
চঞ্চল আমার চিত্ত করে দেও স্থির। 

ধন মান দিয়ে অসম করিব সুস্থির || 
ইহাতে চন্দ্রিকাকর পুরিলেন সায়। 

আশা ফাঁস দিল দেখে গোপীর গলায় || 


|| নাগর নিকটে গোপীর পরিচয় || 
।।পয়ার।। 


শুনিয়া কহিল গোপী ওগো মহাশয়। 
কেমনে বুঝিলে তুমি মোর পরিচয়।। 


সঙ্লোকের মেয়ে বল কি দেখিলে গুণ। 
৪ 


মরণ নাহিক মোর কপালে আগুন !। 
চিনেছো আমায় তুমি ভাড়ালে কি হবে। 
মোর মাথা খাও আর কারে নাহি কবে।। 
পরিচয় মোর তবে শুনহ বিশেব। 
আমার বাপের বাড়ি আকনা মহেশ । 
পিতৃ নাম নরোন্তম কুলীন কায়স্থ 
জাগুলী শ্বশুর বাড়ি কুটুন্ব সমস্ত: 
শ্বশুর স্বামীর নাম কেমনে ধরিব। 
দেখেছ যাহারে তুমি তার স্বামীনাম : 
মোর শ্বশুরের নাম এই কহিলাম।: 
স্বামীর কি কথা কব বিধি মোর বং: 
বাজার বেটার মত ছিল নাম ধাম' 
পিসাসের বহিন পো বড় সরকার ' 
নকুড় দত্তের মামি ননদ আমার :। 

বিধু বস শুনিয়াছি খুড়া মোর যার' 
মামাতো দেবর মোর দেওয়ান রাডার ।। 
আর কত কব বাবু কৈতে বুক হকুন। 
দেখে লোক চিনে ফেলে যাইনাকো ঘাটে।। 
তোমার কথায় আমি হইলাম তুষ্ট 
প্রথমে বলেছি শক্ত হইও নাকে! কু)! 
আমি এই কথা আজি কহিয়া দখিব। 
রাজি যদি হয় তবে তোমারে ক্হিব ।। 
বেলা হৈল যাই আমি আর কি করিব। 
দেখি যদি পারি তবে বিকালে আসিব।। 
নাগরের কাছে গোগী হইয়া বিদায় । 

দ্রুত গতি শেল পরে আপন বাসায় ।। 
রন্ধন ভোজন !গাপী করি শীঘ্রগতি। 
অনা দিন হতে ত্বরা করিলেক মতি।; 
ভবানী কহিছে যাহা নায়ক হাহল। 
গো'ী গিয়ে কামিনীরে কহিতে লাগিল ।। 


৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংল! সাহিত্য 


।। গোপী দাসীর সহিত নাস্িকার কথোপকথন।। 
॥| একাবলি ছন্দ।। 


সদাই তোমায় করিলো মানা। 
ছাদে গেলে কথা হইবে নানা।। 
তব রূপখানি যে জন হেরে। 
বাড়ি বেড়ে সেই ঘুরিয়া ফেরে।। 
নলিনী কাননে ভ্রমর গতি। . 
তাহা ঘুচাইতে কাহার শকতি।। 
কত শত জন এমনি করে। 
আনাচে কানাচে ঘ্ুরিয়া মরে।। 
যুবাজন গলে রূপের ফাঁস। 
দেও যারে সে যে ভাবে আকাশ।। 
সম্প্রতি এমনি ছাতেরো পরে। 
উঠেছিলে বটে শুনলো পরে।। 
তাতে একজন পড়েছে ফেরে। 
দেখা দিয়ে তারে বিন্ধেছ শরে।। 
তব সঙ্গে সঙ্গ হবার আশে। 
কত জনে টাকা দিল. অনাসে।। 
শুন তবে তার বিশেষ কই। 
প্রথমে তোমার মালিনী সই।। 
পরে সর মতি কিশোরী নারী। 
ভোগা দিয়ে হাত মেরেছে ভারী ।। 
অবশেষে বুঝি বুঝিয়া শেষ। 
আমারে ধরেছে জেনে বিশেষ ।। 
আমি যদি তাতে না দিনু সায়। 
কাতর হইয়া ধরিল পায়।। 
ধনে গুণে রূপে নাগর বটে। 
সব আশা পুরে যদি সে ঘটে।। 
পতো ফতো বধু দেখিয়া ভোল। 
পিরিতের কথা সবাই তোল।। 
কোন ঠেঁটা এনে পুড়িব পোড়া। 
এরে এনে দিব মিলিবে জোড়া ।। 
এখন তোমার কথা পাইলে । 
৭ 


হবে কি না হবে যাই জানিলে।। 
ভবানী স্মরিয়া কহিছে পরে। 
রমণী বদনে হাসি না ধরে।। 


॥। গোপীর শ্রতি নায়িকার উক্তি।। 
|| লঘু ত্রিপদী।। 


শুনে রসবতী, কহে গোপী প্রতি, 
নাগর দেখিব তব। 

যেমন কহিলে, এমন হইলে, 
এনে দিলে তার হব।। 

রসিক নাগর, গুণের সাগর, 
কামিনীর মনোলোভা । 


যদি হেন পাও, নিজে মজে যাও, 
কেন দিবা প্রাণ ধরে। 
মালিনী কিশোরী মতি। 
ভুলাইল তার মতি। 

ইথে বুঝা যায়, যেবা যাহা পায়, 
কেবা তারে তাহা দেয়। 
মোর মনে এই নেয়। 

বুঝিনু সকল, কেন মিছে বল, 
তুমি যত হিতকারী। 
সকলি বুঝিতে পারি। 
নীচগামী সে তো নয়। 

এ সব রমণী দাসী বা কুট্নি, 
সে জন তোমারি হয়।। 

৭৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


॥| নাস্সিকান্র সহিত গোপীন্ কথোপকথন ।। 
|| ললিত পয়ার।। 


শুনিয়া গজবে গোপী গুমোর করিয়ে । 
গুরু গঙ্গা গোসাঞ্ের দোহাই বলিয়ে।। 
মোর মনে ছিল মিটাব তব সাধ। 
হিতে বিপরীত দেখ বিধি সাধে বাদ।। 
আমার আমার করে মরি যার তরে। 
0স যে আপন করে না জানে অস্তরে।। 
হিয়ের মাঝেতে হিত করিবারে চাই। 
তবু তাতে-ভিন্ন ভাব ভাল তো বালাই।। 
মনে মনে বুঝে বুঝ কিবা না করেছি। 
কোথায় কোথায় গিয়ে নাগর এনেছি।। 
মুঠ মুঠ টাকা তারা মোর ঘরে যুয়ে। 
অর্ধেক অধিক রাত্রি থাকিত যে শুয়ে।। 
কত কথা কইত তার' কিছু শুনি নাই। 
ধর্ম জ্ঞানে মরন্ত্ম কা তোমার দোহাই ।। 
সত্দ এন কিছু বুভি হই নাই। 
চাই দি যুবা জনে 5 মজাই ।। 
সে সব ছেড়েছি শুন. ফেলার খাতিলে ! 
ভাল না ভাবিয়ে ইথে মন্দ বল ফি'দ।। 
বুঝিনু বুঝিনু তবে বড়র মর্্ম। 
কি তব তোমার দোষ কালের এ ধর্ম ।। 
ভোগা দিয়ে ভাল দেখে নাগর আনিয়ে। 
মুই তারে নিয়ে আছি তোমায় না দিয়ে।। 
এমন করিয়া থাকি হইবে প্রকাশ। 
যৌবন জুলিয়া যাবে হবে সবর্বনাশ ।। 
গোগীর বিরস মুখ দেখিয়া যুবতী । 
ভাবিল মনেতে দাসী (ক্রোধাকুলা অতি।। 
বিনয় করিয়া তবে গোপীকে বুঝায়। 
ভাল গোপী গোসা তোর হলো কি কথায়! ' 
বুঝায়্যা যুবতী কয় কেন কর রোষ। 
'কৌোতুকে কহিনু দোষ অন্তর সম্ভোষ।। 
এ কথা বলে মাত্র করেছি তামাসা। 
৬] 


নাগর লইয়া তুমি আছ বড় খাসা।। 
প্রাণ ধরে আমারে কি দিবে সে নাগরে। 
মনোমত ধন কেবা দেয় অন্য পরে।। 
এত বুঝি বড় অসঙ্গত কথা নয়। 
নবীনা নাগর ছেড়ে কেবা কোথা রয়।। 
যদি বল নাগর আনেছি যার তরে। 
তাহারে না দিয়ে আমি রেখেছিনু ঘরে।। 
দাসী হয়ে রঙ্গরসে দিবা নিশি থাকি। 
ইহা হৈতে কটু কথা আর কিবা বাকি।। 
কিন্তু সেতো এখনো আমার হয় নাই। 
হলে হতো গালাগালি বলেছ যা তাই।। 
এক কথা বুঝিতে লো পারি বা না পারি। 
বলেছিনু তাতে তোর মন হলো ভারি ।। 
বহিরঙ্গ হতে যদি তবে কি তা বলি। 
মনে করেছিনু যে গোপীর মন ছলি।। 
তাতে মোর হয়ে গেল হিতে বিপরীত। 
একে হয় আর যারে বিধাতা বঞ্চিত।। 
ক্ষমা কর গোগপী তোর ধরি দুটি হাতে। 
পরাণ কেমন করে তোমার গোসাতে।। 
মোর মাথে হাত দিয়ে সত্য করে কবে। 
তারে মোরে এনে দিয়ে বাচাইবে কবে।। 
ভবানীচরণ ভাবি যুবতীরে বলে। 
নাগর তোমার হবে রবে কুতৃহলে ।। 


॥। মিষ্টিবাক্যে সুতুষ্টী গোপীর যুবতী প্রতি যুক্তি প্রদান।। 
|| পয়ার।। 


মধুর মিনতি বাক্যে গোপী হইল বশ। 
যুবতীর প্রতি যুক্তি কহিছে সরস।। 

শুন লো সুন্দরী তবে সুখে পুর সায়। 
কি কথা কহিব সেথা কহ লো আমায়।। 
বুঝে সুঝে বল ভাই যাহা মনে ধরে। 
মিছা মজাইলি গোপী বলো নাকো পরে।। 
মতিবালা প্রভৃতি গহনা যত চাবে।। 


৭৪ 


দুম্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


অমনি তখনি সে তো শুনিলে পাঠাবে ।। 
সাথে সাথে যদি নেও কিস্তু হবে দোষ। 
ঠিক ঠিক কথা কই করো নাক রোশ।। 
গহনা গাঠা বড় লেঠা ভাল না সে আশ। 
পরিলে দেখিলে সবে হইবে প্রকাশ ।। 
টাকাটুকি নিলে থুলে কে জানিতে পারে। 
বিবেচনা করে কহ কহিব তাহারে ।। 
বিলম্ব বিস্তর আর করা মত নয়। 
বলেছি বিকাল বেলা যাইব নিশ্চয়।। 
এলোমেলো কথাতে কেবল গেল বেলা। 
মিছা মিছি বকাবকি যেন ছেলে খেলা ।। 
আসল কর্মের কথা কও কিছু মোরে। 
আমি মনে বুঝে তারে কব ঘোরে যারে।। 
কহিছে চন্দ্রিকাকার গোপী সব জান। 
মুখ দেখে মন কথা বুকে টেনে আন।। 


।॥ গোপী প্রতি নায়িকার অনুমতি || 
|| লঘু ব্রিপদী।। 
শুনি চন্দ্রাননে, সহাস্য বদনে, 
সখী সন্বোধনে -্দাসীরে কয়। 
যাও গোপী তথা, বুঝে কবে কথা, 
যেন সেখানেতে কেহ না রয়।। 


গোপী শুনে যায় কহিতে তারে।। 
৮৩ 


দতীবিলস 
|| গোপী নাগর নিকটে গমন করিয়া নাক্িকার সন্বাদ কহিতেছে।। 
|| অস্ত্যযমক পয়ার।। 


গোপনে গমন করে গোগী তাড়াতাড়ি । 
গ্তানী গমনকালে করে বাড়াবাড়ি !। 
নাগরের বাহারের ঘরে ধীরে ধীরে। 
গোপী গিয়ে প্রবেশিয়ে দেখে ফিরে কফিরে।। 
একাকী নাগর আছে নাহি গোলমাল। 
কহিতে লাগিল তবে কবে তিলে তাল! । 
সেই কথা কয়ে সেথা খাই গালাগালি। 
সে তো দিল আর দাসদাসী শালাশালী || 
তুমি বড় লোক বলে করি জীক7জাক। 
নাহি শুনে এরে পরে করে ডাক (ডাক।। 
গোসা করে পরে মোরে কহে চোটপাট! 
পুলিসে পাঠাতে চায় শুন মোটমাট।। 
শুনে মোর অঙ্গ তবে কাপে থরথর। 
দুই চক্ষে জল মোর ঝরে ঝর ঝর।! 
বুক দুড় দুড় করে প্রাণ ছটফট। 

ভেবে তবে তার পায়ে ধরি চটপট! ' 
গোসা গেল হাতে ধরে করে টানাটানি! 
তাহা দেখে দাসদাসী করে কানাকানি।! 
চুপে চুপে আমি যত করি ঘোরঘার। 
চাকর বাকর দেখে করে সোরসার।। 
তাদের মিনতি করি দিনু ফৌস ফাঁস। 
সকলে করিনু রাজী দিয়ে ঘুস ঘাস।। 
কেন বা এ কর্ম্মে হাত দিনু হায় হায়। 
তোমার জন্যেতে হলো প্রাণ যায় যায়।। 
অনেক দুঃ্কখেতে তবে করি রাজারাজি। 
এসব করিতে বেলা হলো সীজার্সীজি।। 
দেওয়া থোয়া কথা এবে কর ফুট ফাট। 
মনোমত নাহি দিলে সব ছুঁটছাট।। 
আমি গেলে তবে কথা হবে পাকাপাকি। 
আজিগে আনিব তাকে নহে ফীকাফীকি।। 


ত্বরায় বিদায় কর শত্রু পায় পায়। 
৮৬ 


সন্দর্রা আসিয়া “শাভা দিবে গায় গায়। 
ভবানীচরণ কহে লও সায় সায়। 
মিলন হইবে মিলে যাবে টায়টায়।। 


|| সুসম্বাদে গোপীর প্রতি নাগরের উ1।1 
|পয়ার ।। 


সুসন্ধাদ শুনে সুখে কহিছে শাগল। 
গোপা তব গুণ গাব কি আর বিস্তর :। 
হায় হায় তোমার হয়েছে অপমান। 
প্রাণপনে ধনেমানে করিব সন্মান।। 
দানহানে দয়া দানে দুঃখ কর দূর । 
অতুল এর হবে উন্নতি প্রচুর ।। 
কখন কেমনে কর্ম সিদ্ধি হবে কবে! 
দেয়াথোয়া কথা কিছু অনাপা ন! হবে।। 
মনে মনে কর বা বুবিবে মোর আশ। 
পঞ্চাশ মোহর করে দিব মাস মাস।। 
আর কি কহিব বল আছে কিছু বাকী। 
ধায় কাহনু সবু.পাডে বুঝ ফাকি।। 
ভতএবখ অতিশহ কথা কিছু নয়। 

কন সদ্ধ হলে হয় ফলে পরিচয়।। 
পাশ (আঠব ডাল মোড়ক করিল। 
পত্র দরশনি বাল শোপী হাতে দিল।। 
দ্রা নিয়ে গোপী তবে মুখ পানে চায়। 
[৩নগ৭ চাওয়া গেল মনে লাজ পায়।। 
ভবানী কহিচ্ছে লোভি কামিনীরে ধিকৃ। 
রফা করা দুরে গিয়ে আশার অধিক।। 


০৪৪ 


শপ নাগরের স্থানে মোহর পাইয়া বার্তী লইয়া কামিন।ীকে কহিল।। 


|| জ্িপদী।। 
গোপা যেথ! পায়ে লঙ্জা দেখ তার সজ্জা শঙ্জা, 
আর দান মনের আশায়। 
রসক নাগর বর ধন দানে অকাতর 


দেখে গিয়ে সুন্দরীরে কয়। 
৮০ 


আমারে থাকুক ধিক্‌ তোম্মাকেও ততোধিক্‌, 
টাকা চাওয়া হলো লজ্জাকর। 
তার কথা কি কহিব, ঠিক যেন সদাশিব, 
আহামরি কেমন সুন্দর । 
অতি বড় মিষ্ট শান্ত, কামিনীর প্রিয়কাস্ত 
মধুমাখা কথাগুলো কয়।। 


কি খাস! পোষাক পরে, টাকাকড়ি তুচ্ছ করে, 
বাবুগিরি করে অতিশয়।। 
বশ হবে তার গুণে, চমকে যাবে দান শুনে, 


এই দেখ আজি কি দিয়েছে। 
রফা কি করিব তার, আঁজলা পুরে দিতে চায়, 
বাকৃস ভরে মোহর গেখেছে।! 


তোমার দৌলতে কত, জানি বাবু শত শত, 
এর চাকরের যোগ্য নয়। 
কথা আর কত কব দেখিলে বুঝবিবে সব, 
শীঘ্র চল বিলম্ব না হয়।; 
তোমার আশার তরে, আছে £স মরমে মরে, 
গেলে তুমি না ভানি কি করে। 
ভবানীচরণ ভাষে, বাছ্ধি দুই ভুজ পাশে, 


রাখিবেক হাদয় উপরে ।। 


|| নাগপ্ের নিকটে নাখ্খিকার গমশোদ্যোগ।। 
।।পয়ার।। 


শুনিয়ে সন্তোষ পেয়ে কহিতে যুবতী। 
কি আর ওজর তবে যাব শীশ্রগতি || 
বেহারা ডাকিয়া তুমি এনে রাখ দ্বারে। 
কান্খানে যাবে যেন জানতে না পারে।। 
আমি গিয়ে গা ধুয়ে গহনা পরি ঘরে। 
বেহারা বাহিরে রেখে এসো তুমি পরে।। 
কর্তার কাছেতে আমি সাজগোজ পরে। 
খাবার দাবার তার যাব হাতে করে ।। 
সে সময় কবে এসে মুখ কর ভার। 
পিসির হয়েছে পীড়া জ্বর অতিশার।। 


চাও 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


চক্ষে দেখে এনু আমি বড় বাড়াবাড়ি । 
সঙ্গে সঙ্গে পালকি মোর দিল তাড়াতাড়ি।। 
পরে যা কহিতে হয় আমি কব তারে। 
গোপী গেল তখনি বেহারা আমিবারে।। 
ভবানীচরণ কহে রস কব কারে। 
ছেনালের কত ছল কে বুঝিতে পারে।। 


|| বেশ করিয়া নায়িকার পতির অনুমতি লইয়া নাগর নিকটে গমন।। 
।।পয়ার। | 


গোপীকে কহিয়া গৃহে করিল যে বেশ 
কিঞ্চিৎ কহিব যদি না পারি বিশেষ।। 
কুটিল কুস্তল কাল কপাল উপর। 
সৌদামিনী জিনি সিঁথি অতি শোভাকর।। 
কাণবালা কর্ণফুল কর্ণেতে পরেছে। 
মনোহর মুক্তা গোচ্ছা তাহাতে দিয়েছে।। 
মুক্তায় মণ্ডিত লত্‌ নাশায় দুলিছে। 
মজ্ঞনে মার্জিত দস্ত দামিনী খসিছে।। 
মুক্তালোচ্ছা গলদেশে সাজে সাতনরি। 
হীরাপান্না ধুকধুকি আছে শোভাকরি।। 
বাহুতে পরেছে বাজু হীরাতে জড়াও। 
পরেছে তাবিজ কোলে করিয়া মেলাও || 
ধানি মুড়কি মরদানি পৈঁছে আছে হাতে। 
নবরত্ব অঙ্গুরীর শোভা করে তাতে।। 
হীরার পুলেতে স্বর্ণবালা সুশোভিত। 
কটিতে কনকচন্দ্র হার মনোনীত।। 
চাবিশিক্লি তাহে পুন দিয়েছে ঝুলায়ে। 

. পদাঙ্গুলে আছে চুটকি ছাল্লাতে মিশায়ে।। 
সুবর্ণের গোল মল পরিয়াছে পায়। 
পরেছে ঢাকাই সাড়ি অঙ্গ দেখা যায়।। 

_ এ্রই বেশে স্বামী গৃহে প্রবেশ করিল। 
দাসী আসি পুর্ব মত কহিতে লাগিল।। 
শুনিয়া কপট কথা ভাবিতা ভবিনী। 
ভর্তার নিকটে ভাবে কহিল কামিনী ।। 


৮৪ 


পিসিকে আমার বলে আর ,কেহ নাই। 
যদি তুমি বল তবে আমি সেতা যাই।। 
কর্তাটি ভাবিত হয়ে দিলেন বিদায়। 
কামের তীরের ন্যায় সোয়ারিতে যায়।। 
ভবানীচরণ বলে সে রূপ ভাবিলে। 
ভুলে লোক জপতপ.কি হয় দেখিলে ।। 


|| নাগর নিজালয়ে উৎকঠিত এবং নায়িকার সহিত প্রথম মিলন ।। 
||শেষেক শব্দে পয়ার।। 


ভাবিত নাগর গৃহে ভাবে এলো এলো। 
গোপী পাকা কথা কহে কভু নহে এলো।। 
সেই বলে গেছে আজি পুরাইব আশা। 
কি জানি কেমন করে হবে তার আসা।। 
আসার বিলম্বে মন প্রবোধ না মানে। 
পুরাও কামনা কালি বলে পুজা মানে।। 
বারাগায় গিয়ে পথ দেখে ঘড়ি ঘড়ি। 
রাত্রি কত হলো বলে কভু দেখে ঘড়ি।। 
আশা না হইলে গোপী এসে খাড়া খাড়া। 
সমাচার দিবে বলে আছে কান খাড়া।। 
এমন সময় গোপী দ্বার খোল বলে।। 
নাগর ভাবিল এলো মম ভাগ্য বলে।। 
সোয়ারি ভিতরে এনে দ্বারে দিল খিল। 
পরম আনন্দে হাসে করে খিল খিল।। 
কামুক কামিনী পেয়ে ডাকিল তাহাতে। 
চিস্তনীয় চিত্তামণি মিলিল তাহাতে।। 
মনে ভাবিতেছে হেন কপাল কাহার। 
যতনে রতন মিলে শান্ত্রে আছে বিধি। 
এই হেতু আশা পূর্ণ করিয়াছে বিধি।। 
উজ্জ্বল করিল পুরী তোমার সুবর্ণ। 
পরশে এ লৌহ দেহ হইবে সুবর্ণ।। 
দেখিব তোমার মুখ ছিল না যে মনে। 
কি কব কাহারে তুমি মিলিল যেমনে।। 
বছ দুঃখ দিয়ে আগে এলে তার পর। 
৮৫ 


দু্প্াপ্য বাংলা সাহিত্য 
যা হউক কিনে নিলে ভেবনাক পর।। 
তাপ পাপ পলাইল আনন্দ অপার। 
কামের সাগর আর নাহিক অপার।। 
এক্ষণে পালঙ্গে বৈশ তবে শোভা পায়। 
ভবানী কহিছে বসাইবে ধরে পায়।। 


| নাগরের প্রতি নায়িকার উক্তি ।। 
।ত্রিপদী।। 
শুনিয়ে নায়িকা পরে, কহিছে নাগর বরে, 
নাসায় তুলিয়া দিয়ে কর। 
স্থির হলে হবে সুখকর।। 
এসেছি তোমার কাছে, সকলি হইবে পাছে, 
আগে মোর কথা দুটি শোন। 
যদি বড় ক্ষুধা পায়, কেহ না দু হাতে খায়, 
এই মাত্র হলো দেখা শুনা ।। 
আগে পরিচয় কর, কি জাতি কি নাম ধর, 
কোথা ঘর কি জন্যে এখানে। 
কহ যদি শুনি আগে, ** যদি মোর মনে লাগে, 
তবে বসি যেখানে সেখানে ।। 
শুনেছি গোপীর মুখে, সদা তুমি থাক সুখে, 
পীরিত করিতে নাকি চাও। 
তাহা যদি করা হয়, শুন তবে মহাশয়, 
চক্ষু কর্ণে বিবাদ ঘুচাও || 
গোপনেতে কথা ক্রমে, এসেছি হে মনো ভ্রমে, 
প্রেম করি যদি নাহি যায়।। 
ভবানী চরণ কয়, কামিনী কঠিন হয়, 
এই ছলে লম্পট মজায়।। 


|| কাষিনী নিকটে নাগর্ের পব্রিচয়্।। 
॥। ত্রিপদী।। 


শুনিয়া নাগর কয়, যাতে তার মন লয়, 
হেন পরিচয় দেয় করিয়া বিস্তার। 


৮৬ 


পতাবিাস 
বুঝিলাম তুমি অতি, সুচতুরা নুদ্দিতী, 
গুন তবে পরিচয় লিশেষ' আস।ব।, 
শ্রীদেব নাগর নাম, শঙ্গার নগরে ধাম, 
লেখাপড়া জ্ঞান গুণ কেবল নাগরা। 
কামপুরে জমিদারি, সে কন্মেতে ব্যস্ত ভারি, 
তালুক রক্ষার হেতু 'আছি বাসা করি।! 
বাপ বু ধন রেখে গিয়াছেন স্বর্গে ।। 
মাতা সহোদর ভাই, দারা সুত কেহ নাই, 
মায়াপুরে নিজ বাটী আছে গোষ্টাবর্গে।। 
বিবাহের নাহি আশ, প্রবাসে বারমাস, 
সুখে থাকিবার জন্য ব্যয় করি ধন।। 
শুন শুন সত্য কই, কাহার অধান নই, 
তব প্রেমাধীন হইয়াছে মন।! 
কামনা পুরণ বশে, কি রজনী কি দিবসে, 
সঙ্ধালে আকুল মন অতিশয় ছিল ।: 
তোমারে পাইয়া অদ্য, গিয়াছে সে দুঃখ সদ্য, 
সস্থির হইল মন বাসনা পুরিল!। 
প্রার্থনা এলণে মনে, কালিকার শ্রীচরণে, 
[2৮ এই সঙ্গ ভঙ্গ না হয় কখন।। 
কিন্তু নাহি জানি নাম বলিতে এখন।। 
নাম শুনে করি নাম, তবে পুরে মনক্কাম, 
অধিক কি কব আর শুন প্রাণ ধন।। 
ভবানীচরণ কয়, যে জন শরণ লয়, 
কামিনী করুণা করে তার বশ হন।। 


|| নাগর নিকটে নায়িকার পরিচয় ।। 
|| দীর্ঘ ভ্রিপদী।। 


শুনিয়া যুবতী কয়, নাম শুনে রসময়, 
কি হইবে তব কাম বল দেখি শুনি।। 

তন্ত্র মন্ত্র বলে ছলে, বশ করি করতলে, 
আমারে রাখিবে গুণে বুঝি তুমি গুণী।। 


৮৭ 


নৃদ্নগা। কালা সাহিন্তা 


শাম কি বলিতে হবে, শুন নাম বলি তবে, 
পুর্ণ নাম আছে মোর অনঙ্গমঞ্জরী। 
অদ্যাবধি হলো নাম, পুরিল হে মনোক্কাম, 
লাগ অনুরূপ নাম শ্রীদেব নাগরী।। 
দে শাশর শুনে, বাধ্য হয় তার গুণে, 
স্্খর সাগরে উঠে ভাসিয়া ভাসিয়া। 
কামিনা কমল পানি, গ্রহণ করিল টানি, 
কধিতি লাগিল পরে হাসিয়া হাসিয়া।। 
৩ পুগ্দ করি নাই, তোমারে গৃহেতে পাই, 
কি পাণ্যেতে তুমি মোরে হইলে সদয়। 
আমি এই মনে করি, দাসী দৃতী রূপ ধরি, 
ক্কারনা পুরাতে গোপী হইল উদয়।। 


।। নাগর উক্তি দূতী ভ্বতি।! 
|| ত্রিপদী!1 


নাগর করিছে স্তুতি, আমি বুঝিলাম দৃতী, 
পুরুষের সুখের উপায়।। 
চিরকাল দূত্তী গতি, বিনা নহে স্থির মতি, 
মনে বিবেচিলে জানা যায়। 
দূতী সঙ্গ নিরবধি, যদি হয় বাল্যাবধি, 
লোক তবে পুরুষার্থ হয়। 
“52 পল্ালক কালে, গুরুরূপে পাঠশালে, 
দৃত্তী আসি নিকটে উদয় ।। 
না হইলে ভঙ্গানোদয়, : কদাচ নাহিক হয়, 
যুবাকালে ঘটক রূপিণী। 
দৃতীল হাসীম দয়া, আহা তাকি যায় কয়া, 
ঘে বীপেতে বিবাহ সাথিনী।। 
*ানদিপ শানাস্থলে, বিষয়ে আবৃত হলে, 
দুইটার দালাল রাপ হয়।। 
৮৮ 


যাতে ধনি পুরুষ নিশ্চয়।। 
আর নিজ নারী প্রতি, যাহার না থাকে মতি, 
মতি তার নারী প্রতি যায়।। 
নিজ মূর্তি ধরেন তথায়।। 
দূতী গুণ শুনি অতিশয়।। 
ভূমগুলে নাম খ্যাত হয়।। 
অতএব দৃতী ভক্তি, করি তাহে অনুরক্তি, 
সাক্ষি দেখ কৃষ্ণ অবতার ।। 


দূততী মন্ত্র উপাসনা, করি করে আরাধনা, 
দূতী করে দুঃখ নিবারণ। 

ভবানী কহিছে রাম, স্তুতি উক্তি রচিলাম, 
কামে মুগ্ধ জনার কারণ।। 


॥| পয়ার।। 


উভয় সন্তোষ মনে পেয়ে পরিচয়। 
অবধান কর সবে কামযুদ্ধ হয়।। 
অনঙ্গমগ্ররী আর শ্রীদেব নাগরে। 
উভয়ে মিলিয়ে পরে কামযুদ্ধ করে।। 
সে যুদ্ধ বর্ণন শুন অপূবর্ষ ঘটন। 
বুঝিবে সে রস সব রসিক সুজন।। 
যৌবন রাজেতে নব রাজ দুই জন। 
কুচ নাম কামিনী হাদয় সিংহাসন।। 
৮৪ 


দূতীবিলাস 


দুষ্প্রাপা। বব? সাহিত। 


গুরুতর কলেবর অতি মনোহর । 
প্রবল প্রতাপে আজ্ঞাবহ যুবা নর।। 
নৃপতি নিকটে নভ্রমুখে যুবা আছে। 
কটাক্ষ করিলে কর দিতে গেল কাছে।। 
মনোনীত করে কুচ হয়ে হাষ্টমন। 
প্রজা যুবা নরে পরে করে আলিঙগন।। 
আলিঙ্গন কালেতে আনন সেনাপতি। 
রাজার নিকটে হৈল প্রিয়তম অতি।। 
রাজ আজ্ঞা অনুসারে মর্যাদা করিল। 
প্রথমে প্রজার মুখে সুধা বরিষিল।। 
কুচরাজে কররূপে এশ্বয্য অতুল। 
দেখে দ্বেষে কামরাজে হল কোপাকুল।। 
আপন সেনার পরে অনুমতি করে। 
করগে দশনদস্ত গণ্ডের উপরে ।। 
নখরূপ সেনা করে রাজারে আঘাত। 
কর হেতু কুচরাজে হইল উৎপাত ।। 
চপল নয়ন ছলে ভুরু ধনু লয়ে। 
ছাড়িল কটাক্ষবাণ দয়াশুন্য হয়ে।। 
বাহু গিয়ে বুবিধ করিয়া বন্ধন। 
প্রজারে লইয়া যায় কামের ভবন।। 
প্রজাপরে কাম ঘরে করিয়ে প্রবেশ। 
লুটিল ভাণ্ডার আর না থাকিল শেষ।। 
যুবতী যুবক দৌহে বিজয়ী হইল। 
স্বীয় সেনা লৈয়া কামরাজ্ পলাইল।। 
যুদ্ধকালে দুই অঙ্গে করিতে মিলন। 
বিচ্ছেদের ভয়ে ত্যক্ত বসন ভূষণ ।। 
যুবতী বিজয়ী যবে হেল সেই রণে। 
পুরস্কার করিল আপন সেনাগণে।। 
উরু গুরুতর যোদ্ধা তাহে বস্ত্র দিল। 
চরণাভরণ দিয়ে চরণ তুধষিল।। 
বাছযুগে বলয়াদি দিল অলঙ্কার । 

কুচ রাজচক্রুবস্তী তারে মতিহার।। 
.কর্ণকে কুস্তল দিল জিনি পূর্ণ শশী। 
নাশায় নোলক দানে তৃষিল রূপসী || 


১০ 


দৃতীবিলাস 
শোভাকর সিঁতিজালে করায় শোভন । 
এইরূপে সেনাগণে করিল তোষণ।। 
আতর গোলাপে অঙ্গ করিল শীতল । 
কেবল বান্ধিয়ে ফেলে স্বসৈন্যকুস্তভল।। 
বিনাইয়া ছিল বেণী জিনি নাগপাশ। 
আলিয়ে পড়িয়াছিল পাইয়া সে ত্রাস।। 
সুশীতল জলপান করি তারপর। 
নায়ক নায়িকা বসি পালক্ক উপর।। 
এলাচি লবঙ্গ আর জৈতী জায়ফলে। 
মিশ্রিত মগাই পান খায় কুতৃহলে || 
রঙ্গরসে রজনী হৈল অবসান। 
কোকিল ললিতরাগে করিতেছে গান।। 
কোকিলাদি রব শুনি কহিছে কামিনী। 
উপায় বলহ প্রাণ পোহায় যামিনী।। 
কি করিব কেন বিধি করে ছিল দিন। 
দিন হেতু বুঝি দীন হব দিন দিন।। 
অভাগীর ভাগ্যহেতু অরুণ উদয়। 
কপাল গুণেতে রাহু নাহি এ সময়।। 
লোক লজ্জা ভয় কেন দিয়েছিলে বিধি। 
না থাকিলে নিরবধি পাইতাম নিধি।। 
সুখের উপরে দুঃখ সহা নাহি যায়। 
আমার কপালে বিধি ঘটাইল তায়।। 
বিলম্ব না সহে প্রাণ করহ বিদায়। 
কিন্তু ভাবি বজ্্রসম বিদায়ের দায়।। 
কি করিব যদি তাতে থাকয়ে জীবন। 
তবে হলে হতে পারে পুন দরশন।। 
ভবানী কহিছে হেন নারী প্রাণধন। 
যারে ছেড়ে যায় তার উচিত মরণ।। 


।নাগর নিকটে অনঙ্গের বিদায়ে তজ্জন্য শ্রীদেবের খেদ।। 
1 পয়ার।। 
বিদায়ের কথা শুনি শ্রীদেব নাগর। 
কহিছে করুণা করি হইয়া কাতর।। 
প্রাণপণ করে প্রাণ পেয়েছি তোমায়। 
৯১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কিরূপে হে কোন্‌ প্রাণে করির বিদায়।। 
আর কিছুকাল থাকি করি নিরীক্ষণ। 
আঁখি স্থির হলে প্রাণ করিবে গমন।। 
কিন্তু পাপ আছে লোক লজ্জা অতিশয়। 
কুলনারী কর তুমি কলঙ্কের ভয়।। 
রজনী হইল শেষ থাকা অনুচিত। 
আমি কি কহিব বুঝে করহ বিহিত।। 
প্রাণরাপ পক্ষী তব সঙ্গেতে চলিল। 

এ দেহ পিঞ্জর পক্ষি ছাড়িয়া রহিল ।। 
এই কর প্রাণেশ্বরী যেন পুন পাই। 
তোমার নিকটে ভিক্ষা এই আমি চাই। 
বিদায় কি দিব প্রাণ করি অনুমান। 
সবেধন ছিল মন করিয়াছি দান।। 
সামান্য ধনেতে প্রাণ তুধিব কি আর। 
বিষয় বিভব যত সকলি তোমার ।। 
যদি মত হয় দাস দাসীর কারণ। 
বাক্‌স খুলি লও তব যাহা চায় মন।। 
এই কথা বলে তারে চাবি দিল ফেলে। 


উভয়ের মনোবাঞ্কা বিধি পুরাইল।| 


|| নাম্বক নিকটে নায়িকার বিদায় লইস্া নিজ গৃহে গমন।। 
|| পয়ার।। 


নাগরের স্থানে পরে লইয়া বিদায়। 
পালকি চড়িল গিয়ে গোপী সঙ্গে যায়।। 
বেহারার দাম তারা পথে পথে পায়। 
কি জানি কর্তার কাছে পাছে গিয়ে চায়।। 
বাটী পদার্পণ মাত্র বেহারা বিদায়। 

পরে কহে শুন গোপী কি হইল হায়।। 
পিসি নাহি যানে কিছু এ সব প্রকার। 
শীঘ্র তৃমি তারে গিয়ে কহ সমাচার ।। 
ইঙ্গিত করিলে পিসি তখনি বুঝিবে। 


৯২ 


তিনি না জানিলে তবে মজাবে' মজিবে।। 
গো'গী কহে আমি বুঝি এ কর্মে নৃতন। 
আমারে তোমার পিসি জানে বিলক্ষণ।। 
তুমি যেন জান নাকো এ আর কেমন। 
যাতে হাত দিই তাতে ঠেকেছ কখন ।। 
তোমরা দুজনে মন্ত হইলে যখন। 

আমি গিয়ে তার কাছে কহিনু তখন।। 
তাঁরে সাবধান করে এসেছি তখনি । 
ভবানী বাখানে শুনে সাবাসি কুটটনি|। 


|| দ্বিতীয় মিলনে নাগরের বৈষঝ্ব বেশ ধারণ।। 
|| দীর্ঘ ত্রিপদী।। 

শুনিয়া গোপীর মুখে, সুন্দরী ভাষিল সুখে, 
নির্ভর হইয়া রসবতী। 

গৃহ কর্ম্ম তেয়াগিয়ে, শয়ন আগারে গিয়ে, 
গোপীকে কহিল শীঘ্তরগতি।। 

তারে না দেখিয়া মরি, দেহ লো উপায় করি, 
পুরাতন দেখিব কেমনে। 
স্থির হইল উভয় মিলনে।। 

গোপী গিয়ে বল তায়, স্পষ্টবাদি আখড়ায়, 
থেকো আজি বাবাজীর বেশে। 
আমি যাব দিবসের শেষে ।। 

গোপী এই কথা নিয়ে, নাগরের কাছে গিয়ে, 
বলিল যা কামিনী কহিল। 
প্রেম বশে ধরিতে হইল ।! 

সে বেশ কহিব কত, কহি কিছু পারি যত, 
নাগর দর্পণ করি করে। 

স্মরিয়া শ্রীচক্রপাণি, তিলক কুতলি আনি, 
প্রথমে তিলক সেবা করে।। 


৯৩ 


দ্প্রাপ্য বাংজা সাহিতা 


বাহুমূলে শহ্খচত্র রেখা। 
রাধাকৃষ্ণ হরিনাম লেখা ।। 

তুলসীর কণ্তি গলে, নাম মালা করতলে, 
হাতে কানে গলে তিন ছড়া। 
কৌপীন পরিল চিরি গড়া।। 
আতরাদি সুগন্ধি মাখিল। 

সহজে সুবর্ণ কায়, নামাবলি দিল তায়, 
ঠিক যেন চৈতন্য সাজিল।। 

মুখে হরি হরি বোল, অস্তরেতে গণ্ডগোল, 
ভাবি রূপ অনঙ্গমঞ্জরী। 

ভবানীচরণ কয়, বিলম্ব উচিত নয়, 
শুভ যাত্রা কর শীঘ্র করি।। 


|| নাগরের বেঝুব বেশে আখড়ায় গমন ।। 
|পয়ার। 
এইরূপ নাগর বৈষ্ণব বেশ করি। 
বাহির হইল পথে স্মরিয়া শ্রীহরি।। 
পথে শুণগুণ স্বরে গোরাগুণ গায়। 
দয়া কর ওহে গৌর কলির উপায়।। 
নবদ্ীপে শচীসৃত হইলে গৌরহরি!। 
অচিতে চেতন ওহে তমি পার দিতে। 
আর কেবা পারে জগজন বুঝাই ।। 
শ্রীহরি চৈতন্য নাম প্রেমেতে বিলাগ। 
₹সার অসার সুখ নামেতে ভূল ।। 
প্রেম ভক্তি কল্পতরু তোমার মুরতি 
প্রেম বন্ধ পারিষদ কেশব ভারতি।। 
কপট সন্গ্যাসী বেশ করিয়া ধারণ। 
সঙ্গে সঙ্গি লয়ে প্রভু করহ ভমণ।। 
কি ভাবে ভ্রম হে প্রভু বুঝা নাহি, যায়, 


৯৪ 


দৃর্তীবিলাস 
গৃহী উদাসীন প্রভু কে চিনে তোমার) 
হরি হয়ে বল হরি সদা রসনায়। 
ভবানী কহিছে হরি রাখ রাঙ্গা পায়।! 


শ্রীদেব নাগর আখভায় উপনীত---পরে অনঙ্গমঞ্রবীসহ 
দ্বিতীয় মিলনে কামসাগর মন্থন || 
পন়্ার || 
প্রেমেতে কাতর একে অনঙ্গের বানে। 
অধিক বাড়িল প্রেম গোরা গুণ গানে ।। 
স্মরিয়া সে প্রাণেশ্বরী অনঙ্গ মঞ্জরী। 
আখড়ায় উপনীত হৈল ত্বরা করি।। 
আখড়াধারী বসিয়াছে অভি বড় সৎ। 
নেড়া নেড়ী শ্রীদেবেরে করে দণ্ডবৎ।। 
আইস বৈস বাবাজী বলিয়া সন্বোধিল। 
সমাদর পেয়ে সেথা নাগর বসিল।। 
আখড়াধারী শ্রীকৃষ্ণের প্রসঙ্গ করিল 
নগর উত্তর তার করিতে লাগিল ।। 
অস্ত গেল দিনমণি যামিনী হইল। 
সে সময়ে ডুলি করি কামিনী আইল ।। 
নাগরের বেশ দেখি ভাবে মনে ধনী! 
হায় হায় কিরূপ বৈষ্ঞব চুড়ামণি || 
বাবাজী বলিয়া 'তারে ডাকিল অনঙ্গ। 
শুনিয়া নাগর হরি কথা দিল ভঙ্গ।। 
মস্তরাম মত্তমনে গৃহ মধ্যে যায় 
তাহা দেখি নেড়া নেড়ী বাহিরে পলায় ;। 
এস ওহে প্রাণনাথ অনঙ্গ কহিল; 
সে বাকাতে কামানল দ্িগণ বাড়ল !! 
কামের সাগর প্রেম উঠে উথলিয়া। 
নাগর নিভাতে চায় মন্থন করিয়া ।। 
মন্থন করিতে বৈসে শ্রীদেব নাগর। 
মহাসুখী হয় পায় রত বহুতর।। 
প্রথমে দেখিল চন্দ্র বিমল বদন। 
পরেতে হেরিল ভাল মুকুতা দশন।! 
৯৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তার পরে করে বিধি কুচ স্বর্ণ দিল। 
এরাবত হস্তিকর পদদ্বয়ে নিল।। 
মৈনাক পর্বত ভাবে নিতম্ব দেখিয়া । 
কল্পতরু শাখা বহি ধরিল কবিয়া।। 
মন্থনের দণ্ড কাম সাগরে পশিল। 
পরে সুধা যুবতীর মুখেতে উঠিল ।। 
তাহা পান আশে দস্তে রশনা ধরিল। 
পানপাত্র করি পান করিতে লাগিল ।। 
নাগর সাগর মন্থে করে সুধাপান। 
অনঙ্গমঞ্জরী ভরি দিল মুখে পান।। 
সুধাপান করে পান খায় সুখোদয়। 
নিভাইল কামানল জলে জলময়।। 
সে সময়ে স্থিরে হেরে নয়নে নয়ন। 
ছাড়িছে নিশ্বাস দৌহে অতি ঘনে ঘন।। 
অবশ হইয়া দৌহে দৌহারে ছাড়িল। 
লণ্ড ভণ্ড ছিল বন্ত্র উঠিয়া পরিল।। 
কামের সাগর মথি উভয়ে বিদায় । 
বিচ্ছেদ বিষের ভরা. অবশেষে পায়।। 
নিজ নিজ গৃহে পরে গেল দুই জনে। 
ভবানী কহিছে পুন মিলন কেমনে ।। 


| তৃতীস্ম মিলনের উপায় চিতা ।। 
|| দীর্ঘ পয়ার।। 


অনঙ্গমঞ্জরী পরে দ্রুত ঘরে আসিয়া। 
স্বামী কাছে শুতে গেল আহারাদি করিয়া।। 
আসিতে হয়েছে গৌণ এই মনে ভাবিয়া । 
নানা ছল করে কথা কহিতেছে হাসিয়া ।। 
স্বামীর ধরিয়া গলা বৈসে কাছে বসিয়া। 
পরিধেয় পীতবাস পড়িতেছে খসিয়া।। 
রঙ্গ ভঙ্গ দেখি তার পতি গেল ভূলিয়া। 
পালক্কেতে শুলো গিয়ে নিল বুকে তুলিয়া।। 
পতির ধরিল গলা দুই হাতে ছান্দিয়া। 

সে রাখিল হাদয়েতে দুই করে বান্ধিয়া।। 


৯৬ 


পুরায় মনের সাধ কাম কুপে মজিয়া। 
অলসে অবশ হোয়ে সুখে দিল ছাড়িয়া।। 
রসে বসে রাত্রি শেষে নিদ্রা যায় শুইয়া। 
অনঙ্গের নাহি নিদ্রা শ্রীদেবেরে ভাবিয়া ।। 
রজনী করিল ভোর ভাবনাতে জাগিয়া। 
প্রত্যুষেতে শয্যা হতে দৌহে গেল উঠিয়া।। 
গোপী দাসী আসি মিশি জল দিল আনিয়া। 
রাপসী ঘষিছে মিশি আরশিতে দেখিয়া ।। 
মুখ ধুয়ে গোপীকে নিকটে কহে ডাকিয়া। 
আজি তাকে কিসে পাব কহ দেখি বুঝিয়া। ৷ 
যদি আজি নাহি পাই তবে যাব মরিয়া। 
গোপী কহে পাবে তারে আজি ঘরে বসিয়া । 
আসিতে কহিব হেথা দাসীরাপ হইয়া। 
অনঙ্গ সম্ভোষ হলো এই কথা শুনিয়া।। 
তখনি কহিল গোপী এসো গিয়ে বলিয়া। 
শুনিয়া নাগর কাছে গেল গোপী চলিয়া ।। 
নাগরে কহিছে কিবা কর ঘরে থাকিয়া। 
আজি সেথা যেতে হবে দাসী বেশ ধরিয়া।। 
মিঠায়ের থাল মাথে করে যাবে ঢাকিয়া। 
দ্বারে কবে গৃহিণীর পিসি দিল পাঠাইয়া।। 
এই কথা বলে গোপী গেল ত্বরা করিয়া। 
ভবানী কহিছে পরে দাসীরূপ রচিয়া।। 


তৃতীয়া মিলনে নাগরের দাসীকব্দপ ধারণ।। 
|| পয়ার।। 


শ্রীদেব সাজিয়ে দাসী দাসীর কথায়। 
প্রেমরসে বশ হৈয়ে দাসী হতে চায়।। 
নাগরের প্রতি হয় মদনের কোপ। 

যে হেতু তাহার কোপে মুড়াহিল গৌপ।। 
মিশিতে মাজিল দস্ভ কি কব বাহার। 
যেন লিখি রাখে নাম মদন রাজার।। 
পরিল মলমল ঠেঁটি গলে দিল হার। 
কাপড়ে গড়িল কুচ কত শোভা তার।। 

৯৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ঘষা পরচুল শিরে যেন চাদ ঘন। 
অনঙ্গ যুবতী রূপ করে আচ্ছাদন ।। 
সুবর্ণ অঙ্গুরী পরে চতুরের চূড়া । 
কটাক্ষেতে যুবা হয় যত থাকে বুড়া।। 
মিঠাইয়ের থালা নিয়ে সাজিল যুবতী । 
লক্কা কবুতর জিনি বামারূপে গতি ।। 
সন্ধ্যার সময়ে গেল অনঙ্গ আলয়। 
নব চাকরাণী দেখি দ্বারিগণ কয়।। 
কাহাসে আতহো আর কোন্‌ ভেজ দিয়া। 
গোপীর শিখান কথা দ্বারীকে কহিয়া।। 
প্রবেশ করিল পরে বাটার ভিতর। 
গোনপী দাসী নিয়ে গেল ধরি তার কর।। 
অনঙ্গমঞ্জরী শুনি নিকটে আইল । 

রঙ্গ ভঙ্গ দেখি তার বিস্ময় হইল ।। 
সম্মুখে আসন দিয়া শীঘ্র বসাইল। 
কেমনে আইলে তবে জিজ্ঞাসা করিল।। 
শুনিয়া নাগর তারে সকল কহিল। 
দ্বারে আসি দছ্বারিরে যে রূপে প্রবোধিল ।। 
অনঙ্গ শুনিয়া শিরে..করাঘাত করে। 
পিসির হইল দাসী এ দাসীর তরে।। 
নাগর কহিছে প্রাণ তোমার লাগিয়া । 
দাসীর যে সব কর্ম আস্যাছি শিখিয়া।। 
দাসী হয়ে তোমারি করিব দাসীপনা। 
কেবল সেবিব নাহি চাহি মাহিয়ানা।। 
সুন্দরী শুনিয়া রস করিতে লাগিল। 
নাম ধাম কেবা কাস্ত জিজ্ঞাসা করিল।। 
নাগর হাসিয়া তবে কহে. কুতৃহলে। 
করে কত রস পরে পরিচয় ছলে ।। 
কামপুরে জন্মেছি নগরে এবে ধাম। 
অনঙ্গ মঞ্জরী দাসী এই মোর নাম।। 
জন্মাবধি বিধবা হে পতিহীনা আমি। 
স্বামীর কুরীতি দেখি নাহি করি স্বামী।। 
সীতাপতি রামচন্দ্র জান অকারণে। 


৪৮ 


পরীক্ষা লইয়া সীতা পাঠাইলা বনে।। 
জরখকার মুনি কথা বিদিত সংসার। 
তপন কামিনী সঙ্গে করে যে প্রকার।। 
অতএব দেখেশুনে স্বামী নাহি চাই। 
স্বামীর অধিনী হলে কোন সুখ নাই।। 
একমাত্র দোষ আছে পতি না থাকিলে। 
রতিপতি পীড়া দেয় বিয়োগী দেখিলে ।। 
উপপতি করে যদি দূরে যায় দোষ। 

এ যুক্তি করিলে থাকে সকলে সম্তোষ।। 
আমি না ঠেকিব কভু বিয়োগের দায়। 
নিযুক্ত হইয়া রব তোমার সেবায়।। 
অনঙ্গ কহিছে শুন ওহে গুণরাশি। 
তুমি মোর প্রাণধন আমি তব দাসী।। 
অধিক হইল রাত্রি ভাবে ধনী মনে। 
লইয়া পালক্ক পরে তোষে আলিঙ্গনে।। 
আলিঙ্গনে তুষ্ট হয়ে দাসী যেতে চায়। 
রমণী চুন্বিয়া মুখ করিল বিদায়।। 
ভবানী কহিছে দাসী গুণ কব কারে | 
শুনিলে নাগর সব দাসী হতে পারে।। 


| চতুর্থ মিলনোপায় কালীঘাট গমন।। 
|| লঘু ত্রিপদী।। 
দাসী গেল ঘরে, ধনি ভেবে মরে, 
কালি কি সে পাবে তারে। 
শয়নেতে থাকে, স্বামী এসে ডাকে, 
জাগাইতে নাহি পারে।। 
তবু মুখে কথা নাই। 
দেখে মানবতী, কহে প্রাণ পতি, 
যাহা বল করি তাই।। 
মোর মাথা খাও, আর রক্তে নাও, 
যদি নাহি কথা কও। 
প্রাণে মলে তবে, কহিলে কি হবে, 
৯৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বলি যদি কথা লও।। 
কালীঘাটে দিতে হবে। 
আপনি মানিলে, তবু তো না দিলে, 
পূজা নাহি আর রবে।। 
দাসী এসেছিল, আমারে কহিল, 
কালি যাবে পৃজা দিতে। 
আমি যেতে চাই, যদি বল যাই, 
আমারে আসিবে নিতে।। 
সুজন-শুনিল, যাইতে কহিল, 
এই কথা বই নয়। 
অনঙ্গ শুনিয়া, উঠিল হাসিয়া, 
পরে কত কথা হয়।। 


তার পরে যত, কহিব তা কত, 
বুঝিবে সব আশায়। 
স্বামী হল বশ, 


স্বপনে নিশি পোহায়।। 


প্রভাত হইল, গোপীরে কহিল, 
সব ঠিক হইয়াছে। 
কহিনু তাহায়, _ ০ দিলে বিদায়, 
যাও তুমি পিসি কাছে।। 
তারে সব কবে, পুজা দিতে হবে, 
কালীঘাট আজি চল। 
95585 17 
তারে এই কথা বল।। 
হয়ে পুরোহিত, _ যাইবা ত্বরিত, 
থাকিবা মুদি দোকানে । 
গোন্পী তৎপরা, গেল করি ত্বরা, 
কহিল উভয়- স্থানে।। 
পরে শীঘ্রগতি, যথায় যুবতী, 
আসি সমাচার দিল। 
সুন্দরী শুনিয়া, সুখেতে ভাসিয়া, 
বেহারা ভাক কহিল।। 


১০১০ 


স্বামীকে কহিয়া, বিদায় লইয়া, 
বেশ করিতেছে ঘরে। 

শ্রীচন্দ্রিকাকর, শুনিয়া নিকর, 
সে বেশ কহিছে পরে।। 


|| নায়ক নায়িকার কালীঘাট গমন- _নাগরের ছবিজবেশ ধারণ।। 
|| দীর্ঘ পয়ার।। 


কনক বরণী বালা নাহি রূপ তুলনে। 
পল্মরাগমণি যেন ঢাকে শ্বেত বসনে।। 
চঞ্চল নয়ন পরে অতি ঘোর অগ্জনে। 
শোভা হল স্বর্ণপন্মে যেন নাচে খগ্রনে।। 
নাসাতে মুকুতা দিতে গেল তার তুলনা । 
তিলফুল টীয়াপাখি পেলে মর্ম বেদনা।। 
মণিময় ভূষণেতে ভূষিল শ্রী অঙ্গ। 
রতিভ্রমে অনঙ্গেরে ধরে বা অনঙ্গ।। 
দশ দিগ আলো করে হেন রূপে সাজিল। 
পিসি সঙ্গে টুলি করি কালীঘাট চলিল।। 
নাগর সেখানে গিয়ে নিজ বেশ ছাড়িল। 
ধনী যজমান আছে হেন দ্বিজ হইল।। 
কোমল শরীর অতি পদ্মগন্ধ বহিছে। 
শত শত মনমথ জিনি রূপ ধরিছে।। 
মোটা উপবীত শ্বেত শোভা পায় অসীমা। 
অর্ধচন্ত্র ফৌটা ভালে ভূদেবের ভঙ্গিমা।। 
গীতাম্বর জোড় পরে উত্তরীয় করিয়া। 
অক্ষমালা জপ করে কালী কালী বলিয়া।। 
সঙ্কেত স্থানেতে যায় দ্বিজ বেশ ছলিয়া। 
অনঙ্গ পৌছিয়ে ডাকে পুরোহিতে বলিয়া।। 
রূপসী কহিল পিসি পুরোহিত আইল। 
পিসি পুরোহিত দেখে বিপরীত ঘটিল।। 
হেতা আইস বৈস কহে সমাদর করিয়া। 
শ্রীদেব শুনিয়া বৈসে তার পাশ ঘেঁষিয়া।। 
হেরিয়া হরিল মন পাব কিসে ভাবিয়া। 
অনঙ্গেরে করে রামা মনে স্থির করিয়া।। 
১০১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


অনঙ্গমঞ্জরী যাও গঙ্গা শ্নান করিতে । " 
পুরোহিত আমি থাকি পুজা কার্য্যে তরিতে।। 
পিসির মনস্থ ভাব অনঙ্গ না বুঝিল। 
শ্নানেতে চলিল তার গোপী সঙ্গে চলিল।। 
নির্জন পাইয়া রামা পুরোহিতে কহিছে। 
তবরূপ দেখে মন কামানলে দহিছে।। 
পিপাস হয়েছি তব প্রেমে নারী গলিতে। 
কৃপা কর পুজা করি নাহি পারি বলিতে ।। 
আজীদেব ভাবিয়া ভাল পিপাসেরে কহিল। 
শুনি সুখে রসবতী পুজা দিতে বসিল।। 
ভবানী ভাবিয়া সেই পূজা কথা কহিল। 
শ্রীদেব তাহার পুজা কি ভাবেতে লইল।। 


॥| অনঙ্গের পিসি কর্তক শ্রাদেবের পুজা ।। 
!পয়ার || 
প্রথমে মুদির গৃহে স্থাপিল আসন। 
ইহাগচ্ছ তিষ্ট পুজা করহ গ্রহণ ।। 
আবাহনে তদাসনে "শ্রীদেব আইল। 
বাহু প্রসারিয়া রূপ হৃদয়ে ধরিল।। 
সেই ধ্যান মনে ভাবি কর পন্মোপরে। 
আহা মরি প্রাণ মন্ত্রে সমাপন করে।। 
পাদ্য অর্থ্য আচমন সকলি চুন্বন। 
নৈবেদ্য শ্রীকল দুটি করে নিবেদন ।। 
শীঘ্র শীঘ্র পুজা সারে অনঙ্গ স্মরিয়া। 
দক্ষিণান্তে করে পুজা মহামুদ্রা দিয়া।। 
প্জা যোগ্য ছিল মতি ন্ৃত্তিদান করি। 
তুমি প্রাণপতি ম্ভতি করিল সুন্দরী।। 
না জানি করিতে স্তব কিন্তু বর চাই। 
অনঙ্গ না জানে যেন দরশন পাই।। 
পূজান্তরে তুষ্ট হয়ে শ্রীদেব নাগর। 
গোপনে তোমার ঘরে যাব দিল বর।। 
ভবানী কহিছে দৌহে অবসর পরে। 
অনঙ্গ পুজিবে কালী আয়োজন করে।। 
১০২ 


|| কালী পৃর্জার আয়োজন।। 
| |পয়ার || 

ফুল বিল্বপত্র দিল আর জবামালা। 
সন্দেশ কিনিয়া রাখে কত শত থালা ।। 
আতপ তগ্ুল যদি আনে শত মণ। 
নানা উপচার ফল নৈবেদ্য রচছন।। 
ধূপধূনা অগুরু গুগগুল দীপ আর। 
চন্দনাদি গন্ধদ্রব্য বিবিধ প্রকার ।। 
পষ্টসুত বস্ত্র কত কে করে গণনা। 
স্বর্ণমতি হীরকাদি জড়াও গহনা ।। 
থাল গাড় বাটা বাটি কতই বাসন। 
শয্যা আদি নানাদ্রব্য হৈল আয়োজন।। 
হেনকালে ম্লান করি অনঙ্গমঞ্জরী। 
ত্বরায় আইল সেথা গোপী সঙ্গে করি।। 
এ সকল দ্রব্য লয়ে সুখেতে সুন্দরী । 
পুরোহিত সঙ্গে আর পিসি সহচরী || 
প্রথমে প্রবেশে নাট মন্দির ভিতরে। 
তথায় সে সব দ্রব্য রাখে থরে থরে।। 
পুজার দেখিয়া ঘটা ভাবে অধিকারী। 
এ যদি যজমান হয় তবে হাতসারী ।। 
শ্রীদেব নিকটে কহে করিয়া বিনয়। 
আমার পালায় দিন শুন মহাশয়।। 
তব পুরোহিত হই পুরুষানুক্রমে। 
চিনিতে না পার তুমি ভুলিয়াছ ভ্রমে। 
শ্রীদেব শুনিয়া পরে পুজা ভার দিল। 
অধিকারী হৃষ্টমনে পূজা আরম্তিল।। 
ব্রা্মাণ পণ্ডিত বহু আছিল সেখানে। 
কেহ বলে চণ্তী পড়ি তোমার কল্যাণে ।। 
কোন দ্বিজবর হোম করিতে চাহিল। 
কেহ কালী নাম জপ করিব কহিল।। 
কেহ বলে রাঙাজবা দিব শ্রীচরণে। 
এরাঁপ কহিয়া সব বৈশে যোগাসনে।। 
তেজঃ পুঞ্জ দ্বিজ সব ভৈরব আকার । 


৯১০৩ 


দুত্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সূর্য সম তেজ কারো কারো জটা ভার।। 
কারো গলে অক্ষ কারো স্ফটিকের মাল। 
কেহ কালী কালী বলি বাজাইছে গাল।। 
আগম নিগম আদি নানা শাস্ত্র জানে। 
দস্ভ করি কথা কহে কারে নাহি মানে ।। 
সকলে করহ কর্ম শ্রীদেব কহিল। 
অনুমতি পেয়ে সবে প্রবর্ত হইল ।। 
ভবানী কহিছে পরে কালী নাম স্মরি। 
স্তুতি আরম্ভিল মাকে প্রদক্ষিণ করি।। 


| শ্রীর্দেব উক্ত কালীভব।। 
|| লঘু ত্রিপদী।। 
জগত জননী, জগত পালিনী, 
জগত বিলয় কারিনী। 
ব্রিতাপ নাশিনী, ত্রিলোক তারিণী, 
ব্রিপুরারি মনোহরিণী।। 
করাল বরণিঃ সারিণী। 
বিভীষণ বেশা, বিভীষণ কেশা, 
বিভীষণ ভয় বারিণী।। 
কিরীট ভালিনী, কিরীট পালিণী, 


কটি বিরাজিত কিন্কিলী। 
বরাভয় করা, বরাসি বিধরা, 
বরা মুণ্ড করা বাঞ্িণী।। 
ভব ভয় হরা, ভবরাপ ধরা, 
ভব মন মোহ কারিণী। 
ভবভার তার তারিণী।। 


॥। চতুর্থ মিলনে কালীঘাটে বুন্ধন।। 
|।পয়ার || 


পুজা অঙ্গ সাঙ্গ করি বাসায় আইল । 
কালীর প্রসাদ সবে বাঁটিয়া খাইল।। 
অনঙ্গের পিসি ছলে কহিল নাগরে। 
তুমি গিয়ে পাক কর ঘরের ভিতরে ।। 
পাক আয়োজন সব অনঙ্গ করিবে। 
রন্ধন হইলে পরে বাহিরে আসিবে ।। 
না করো বাহুল্য আজি করো ভাতেপোড়া। 
শীঘ্র শীঘ্র কর্ম সারো আছে কত পোরা।। 
চতুর চতুরা দৌহে সঙ্কেত বুঝিল। 
অবিলম্বে গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিল।। 
পাক আয়োজন শুন নবরসতর। 

রন্ধন করিতে বৈসে শ্রীদেব নাগর।। 
পৃবের্বতে নাগর মুখ হাড়িপোড়া ছিল। 
যুবতী যৌবন জল তাহাতে ঢালিল।। 
উভয়ের কামানল তখনি জ্ালিল। 

মন চালু দিয়া পাক করিতে লাগিল।। 
কুচ দুটি নিয়ে করে বার্তীকি বুঝিল। 
কামানলে সে দুটোরে ভাল পোড়াইল।। 
পুনঃ পুনঃ কাটি দিয়া নাড়ে চাড়ে ঢাকে। 
বারম্বার টিপে দেখে যদি শক্ত থাকে।। 
রন্ধন হইল শেষ জল ছিল তায়। 

ফেণ গালি কামানল তখনি নিভায়।। 
অনল নিভিল শব্দ ফৌসর্ফাস হয়। 


১৯৩৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ফিস ফিস করি দুই জন কথা কয়।। 
পিসাস বাহিরে কহে শুন গো জামাই। 
ত্বরা করে কর্ম সারো আর বেলা নাই।। 
শ্রীদেব শুনিয়া পরে আইল বাহিরে। 
হিসাব করিয়া টাকা দিলেক মুদিরে।। 
পুরোহিত পুজকাদি যতেক বাল্গণে। 
পরিতোষ করিলেক দান বিতরণে ।। 
পিসাসেরে কহে পরে শুন গো শাগুড়ি। 
বয়সেতে কাঁচা বট সম্পর্কেতে বুড়ি।। 
পায় ধরি বলি বাছা যেন দয়া রয়। 
এই কাম কারো কালি যাতে দেখা হয়।। 
শুনে জামায়ের প্রতি কহিল সুন্দরী । 
সম্বাদ পাঠাব কালি কথা স্থির করি।। 
এই কথা বলে তারা সোয়ারি চড়িল। 
কালীকা প্রণাম করি শ্রীদেব চলিল।। 
পিসি সঙ্গে অনঙ্গ আপন ঘরে যায়। 
ভবানী কহিছে ভাব মিলন উপায়।। 


॥| পঞ্চম মিলনের উপায় ।। 
|| ব্রিপদী।। 


পিসিরে গোপীরে ডাকি বলে। 
উপায় বল গো পিসি, কেমনে পোহাব নিশি, 
কালি তারে পাব কোন স্থলে।। 
তারে যদি নাহি পাই, জাতি কুলে দিব ছাই, 
দেখিয়া এ দুঃখ কেবা সবে। 
শুনি তার পিসি কয়, কেন" তুমি কর ভয়, 
যুক্তি দিব যাতে সব রবে।। 
স্বামী একা আছে তোর, তাহাতে করিলে জোর, 
যা মনে করিবে তাহা হবে। 
রেতে তো বাহিরে যায়, আজি ধরে বৈস তায়, 
যেতে আমি নাহি দিব কবে।। 
তাহাতে ঠেঁকিবে দায়, ধরিবে তোমার পায়, 


১০৬ 


তুমি সে সময় কবে তারে। 

যাবে সেতো রবে সুখে, আমি রব মনোদুঃখে, 
এ পোড়া সহিতে কেবা পারে।। 

সুখ সাধ ঘুচাইব, গালাগালি খাওয়াইব, 
আজি আমি কভু নাহি ছাড়িব। 

তবে যেতে পাবে তথা, যদি মোর রাখ কথা, 
বুঝি কবে অবশ্য রাখিব।। 

তখন না করি ভয়, বল যদি মন্ত হয়, 
বাটাতে সখের যাত্রা দিব। 

টাকা কড়ি যা লাগিবে, পিসি তাহা সব দিবে, 
তোমার কেবল স্থান নিব।। 

ইহাতে সে রাজি হলে, তার পর দিব বলে, 
যাহাতে আনিতে পার তায়। 

শুনি ধনি তুষ্ট অতি, পরে ঘরে এলো পতি, 
আহার করিয়া পুনরায়।। 

অনঙ্গ ধরিল তারে, আর কি যাইতে পারে, 
পিসির শিক্ষার কথা কহে। 

শুনি সেই গুণনিধি, তখনি দেলেক বিধি, 
বলে ছাড় বিলম্ব না সহে।। 
পরে পিসি গোপী এলো কাছে। 

কহে রাজি করিয়াছি, পিসি কহে শুনিয়াছি, 
তোমারে যে কথা কহিয়াছে।। 

সে কথায় কায নাই, এখন যা বলি তাই, 
কর তাহা যাহা প্রয়োজন। 

ভবানী কহিল তবে, এক্ষণ করিতে হবে, 
যাত্রার সকল আয়োজন ।। 


।। সখের যাত্রার আমোজন।। 
।পয়ার ।। 
যাত্রা জন্য যুক্তি করে যামিনী পোহায়। 
সে সব রচনা হলে পুতি বেড়ে যায়।। 
উঠি অনঙ্গের পিসি গোপীকে কহিল। 


১০৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তোমাকে নাগর কাছে যাইতে হইল ।। 
অনঙ্গের নাম করে শ্রীদেবে কহিবে। 
নারী বেশ ধরি আজি যাইতে হইবে।। 
সখের সুযাত্রা আজি হবে সে বাটীতে। 
কুটুম্বের মেয়ে বহু আসিবে দেখিতে ।। 
বাসায় থাকিবে তুমি নারী বেশ ধরে। 
সন্ধ্যার পরেতে নিয়ে যাব ডুলি করে।। 
তার পরে দুইশত টাকা চেয়ে নিবে। 
টাকা নিয়ে শীঘ্র করে মোরে আনি দিবে।। 
অনঙ্গের পিসি যত গোপীকে কহিল। 
গোপী সেথা গিয়ে বলে টাকা আনি দিল।। 
টাকা হাতে পেয়ে ভাল নাগরে ভাবিল। 
অনঙ্গের প্রতি পরে কহিতে লাগিল। । 
সখের যাত্রার মধ্যে ভাল কোন্‌ দল। 
যারে বল তারে আনি আছে মোর বল।। 
শুনি ভাল বলে জোড়ার্সাকোর আসল। 
আর যত দল আছে সকলি নকল।। 
অনঙ্গের পিসি তার প্ছন্দ শুনিয়া । 
তুষ্ট হয়ে কহিতেছে গোপীকে ডাকিয়া ।। 
দলের প্রধান মিত্র জানিতে পারিবে। 
মোর ভাইঝির বাড়ি যাত্রা আজি হবে। 
অনেকে আসিবে হেথা সেকথাও কবে ।। 
একে মোর নাম তায় অনেক আশায়। 
তখনি হইবে রাজী তারা তাই চায়।। 
সেথা হতে ত্বরা করে কুটুম্বের বাড়ি। 
নিমন্ত্রণ করিবারে যাবে তাড়াতাড়ি।। 
আমাদের অন্তরঙ্গ যত মেয়ে আছে। 
বিশেষ করিয়া কবে সকলের কাছে।। 
সখের সুযাত্রা আজি শুনিতে যাইবা। 
অনঙ্গের নাম করে নিমন্ত্রণ দিবা।। 
গোপী এই কথা শুনে তখনি চলিল। 


গালিচা দুলিচা বাতি যাহা যাহা চাই।। 
নিমস্ত্রিত নারীগণ আসিতে লাগিল। 
রাত্রির সম্প্রদা যত তাহারা আইল ।। 
তোপের পরেতে সব বাতি জ্বালাইল। 
সম্প্রদা সাজিল সং যাত্রা আরভিল।। 
দলপতি বেদিনী সে সাজিল আপনি। 
গীত এঁ দীতের পোকা খসাই এখনি ।। 
এ যাত্রার সংগীত অনেকে তা জানে। 
দেখেছে নয়নে লোক শুনিয়াছে কানে ।। 
সে সব রসের কথা যদি লেখা যায়। 
রসধাম নামে এক গ্রন্থ হয় তায়।। 
অতএব কহি যাহা গ্রন্থ প্রয়োজন। 
রসিকা কি করে ঘরে করিয়া গোপন ।। 
নিমস্ত্রিত নারীগণ লইয়া যুবতী । 

নানা সং গান দেখে শুনে রসবতী।। 
হেনকালে গোপী যায় নাগরের কাছে। 
গিয়ে দেখে নারীবেশ ধরে বসে আছে।। 
দেখিয়া কহিছে গোপী এ কেমন বেশ। 
ভবানী কহিছে শুন বেশের বিশেষ ।। 


॥। নাগরেন পন্মীগ্রামস্থ নারীবেশেব কারণ ।। 
।|পয়ার || 

পরিয়াছে খাসা সাড়ি কাশী সাড়ি তার। 

কুসুমে রঙ্গীন ভাল বড় আঁচলাদার।। 

মেথিতেল দিয়া মাথা আঁচড়িয়া বাঁদে। 

দিয়েছে সিন্দুর ভালে যেন রবি চাদে।। 


সোনার ঠোসের লৎ আছে নাসিকায়।। 
ঠাপাকলি স্বর্ণমালা হাসলি বূপার। 

গলায় দিয়েছে সব শোভা কত তার ।। 
বাউটী পৈইছা লৌহ রূপাতে বান্ধান। 


১০১৪ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


রূপার মাদুলী হাতে রেশমে গাথান।। 
বড় মোটা বাঁকা মল পরিয়াছে পায়। 
আর অলঙ্কার ঢাকা নাহি দেখা যায়।। 
এরূপ দেখিয়া গোগী কহিতে লাগিল। 
পাড়ার্গেয়ে কু বেশ কেবা শিখাইল।। 
এক্ষণে বিলম্বে আর নাহি প্রয়োজন। 
ডুলি আনিয়াছি ইথে কর আরোহণ ।। 
অবিলম্বে কালী বলে ডুলিতে চড়িল। 
অতিবেগে গিয়ে ডুলি তথায় পৌঁছিল।। 
অন্দরে প্রবেশ করে গোপীর সহিতে। 
নাগর আইল ধনী পাইল দেখিতে।। 
অন্য অন্য যুবতীর পারে বসাইল। 
নাগর ঘোমটা টানি লজ্জা জানাইল।। 
অনঙ্গ আসিয়া তার নিকটে বসিল। 
করে ধরি তবে তারে কহিতে লাগিল ।। 
দেখ লো নূতন বৌ এ যাত্রা কেমন। 
পাড়ার্গায়ে দেখেছিস কখন এমন।। 
পাড়াগাঁয়ে মেয়ে কভু ঘোমটা নাহি খোলে। 
ফিসফিস করে কথা--কহে ঘুমে ঢোলে।। 
দেখেশুনে ইনি কেটা জিজ্ঞাসে সকলে । 
অনঙ্গ বিশেষ করে কহিছে কৌশলে ।। 
হুগলির পুর্ব হালি সহরেতে ঘর। 
পিসির ভাগিনা বহু গোষ্ঠীপতি ঘর।। 
সম্প্রতি সে দেশ থেকে পিসি আনিয়াছে। 
কোথাও নাহিক যায় ভাবে আগে পাছে।। 
সোজাসুজি লোক বহু কথা নাহি জানে। 
এসেছে অবধি কথা নাহি.শুনে কানে।। 
যতক্ষণ আছে হেথা কথা না কহিবে। 
বেশভৃষা দেখ যদি সকলে হাসিবে।। 
তাড় বাজুবন্ধ গয়না পরেছে রূপার। 
কাঁকালে তেনরি গোট আর চন্দ্রহার।। 
মোম দিয়ে পেটেপেড়ে খোঁপা বান্ধিয়াছে। 
বাঁপাতার আছে যেন ঝুলিতেছে গাছে।। 


১৯৯০ 


লজ্জার নাহিক সীমা ঘোমটা :সাত হাত। 
ভাতারের ভাবনায় নাহি রুচে ভাত ।। 
সন্ধ্যা জ্ছেলে পরেতে ঘ্বুমায় নিরবধি । 
আমি এই মত দেখি এসেছে অবধি।। 
ঘুমেতে কাতরা হয়ে ছুলে পড়ে যায়। 
অনঙ্গ তাহারে লয়ে শোয়াইতে যায়।। 
দেখে শুনে নারীগণ পরস্পর কহে। 
পাড়াগেয়ে মেয়েগুলো কেহ ভাল নহে।। 
তার মধ্যে কহে কেহ গলিত যৌবনা। 
পুরুষের গুণ কহি করি বিবেচনা ।। 
তামাসা দেখিতে যদি কোন মেয়ে চায় 
ভাতারের মত নৈলে যেতে নাহি পায়।। 
আপন খুসিতে কেহ দেখিবার তরে। 
যে যায় তাহাকে স্বামী ঝাটা পিটা করে।। 
শুনে নাকে হাত দিয়ে কহে নারীগণ। 
হেন যারা সহে ধিক তাদের জীবন।। 
বুঝহে রসিক কহে শ্রীচন্দ্রিকাকর। 
নারীগণ পতিগণ কহে পরস্পর ।। 


| পতিগুণ বর্ণনা ।। 
|।পয়ার || 


পাড়ােঁয়ে পুরুষের শুনিয়া কুধারা। 
নিজ পতি গুণ কহে রসিকা যাহারা ।। 
শুনে এক রসবতী কহে মৃদু্বরে। 
দেওয়ান আমার পতি আমদানি ঘরে।। 
ইংরাজী পারসী বিদ্যা কিছুই না জানে। 
দন্ত করি কর্ম করে কারে নাহি মানে।। 
সাহেবের সব কথা নাহি বুঝে শুনে। 
অথচ তাহারে ভালবাসে তার গুণে ।। 
কুঠী হতে আসিয়া বাহিরে জল খায়। 
গাড়ি চড়ি তখনি বাগানে চলি যায়।। 
দ্বারেতে দ্বারির প্রতি আজ্ঞা আছে তার। 
সে বাটীতে না থাকিলে হুকুম আমার ।। 


১১৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ইহাতেই বুঝ মনে নাহি পারি কিবা। 
অতএব পতিগুণ ঝুরি নিশি দিবা ।। 
শুনি কোন সুরসিকা কহিতেছে পরে। 
সদর মেটের কর্ম মোর স্বামী করে।। 
তাড়াতাড়ী কুঠী যায় তবু রাত্রি হয়। 
বাটী আসি বাহিরে থাকিয়া কথা কয়।। 
কাপড় ছাড়িয়া যায় বাবুর বাটীতে। 
চাকরে ছকুম করে যাইবা আনিতে।। 
সে তখন যেতে পারে যখন পাঠাই। 
ইথে কোন কর্ম সিদ্ধি নাহি হয় ভাই ।। 
অন্য রসবতী কহে একি বড় গুণ। 
খাতার মুহুরি পতি কাগজে নিপুণ।। 
ঠিকঠাক কাম বুঝে হয় উপনীত। 

সব আশা পুরে মোর যাহা মনোনীত ।। 
ভুল ভ্রমে যদি গৃহে এসে অসময়। 
কাগজ লইয়া বৈসে আনমনে রয়।। 
কহে কোন কামিনী করিয়া অহঙ্কার । 
মোর পতি অতি বড় ঘরে তবিলদার।। 
কত লোকে টাকা দয় থোক থাক পায়। 
রেতে ঘরে এসে বৈসে মজুদ মিলায়।। 
সে সময়ে কারো কথা নাহি শুনে কাণে। 
কাছ দিয়ে কেহ গেলে চায় না তা পানে।। 
মজুদ মিলিয়ে গেল হয় বড় খোস। 
কিছু যদি দেখে শুনে নাহি ধরে দোষ ।। 
হাসি খুসি করিয়া বেড়ায় ফিরে ঘ্ুরে। 
এমন পতির গুণ কেবা নাহি ঝুরে।। 
কেহ কহে পতি মোর ব্যাঙ্কের পোদ্দার। 
আর যত বেনে আছে তাঁরা তাবেদার।। 
ফাল্স নোট তাবা মেকী চেনে সে চকিতে। 
কেবা পারে তার ঘরে মেকী চালাইতে ।। 
টাকাই. সে ভাল চেনে আর কিছু নয়। 
টাকা তার হাতে দিলে পরকিয়া লয়।। 
শুনি কেহ কহে ভাব যেন রাজরাণী। 


৯৯৭২ 


কত কব পতি গুণ নিজে সে কেরানি।। 
ইংরাজী মেজাজ তার করে হটহাট। 
বিদ্যার জাহাজ ভাই জানে কত ঠাট।। 
নকল করিতে পারে মাছি না এড়ায়। 
ছল ছাড়া কর্ম নাহি করে বে দীড়ায়।। 
ফিটফাটে সদা থাকে রুটি ঘণ্ট খায়। 
ময়লা গলিজ কিছু দেখিতে না চায় || 
সুখেতে সদাই থাকে ঘরে নাহি রয়। 
ঘরে যবে এসে সাপ দেখে খুসি হয়।। 
বেআড়া কুত্সিত লোক দেখিতে না পারে। 
সোয়াকিন লয়্যা থাক বলে ঘোরে ঘারে।। 
কহিছে রমণী কোন শুন পতি গুণ। 
শুনিলে শত্রুর মুখে পড়ে কালি চুন।। 
পতি মোর করে চিনে বাজারে দোকান। 
ঘরে বাহিরেতে ভাল দোকান সাজান ।। 
সাজাতে কসুর নাই দুদিক সমান। 
কোথায় কি হয় তার করে না সন্ধান।। 
এইরূপে পতিগুণ করে নারীগণ। 
অধিক হইল রাত্রি যাত্রা সমাপন ।। 
মণ্ডা মিঠাই খিলি কত এনেছিল। 
সম্প্রদায়ে লোক যত প্রথমে খাইল।। 
আহারাদি করি তারা যাইতে চাহিল। 
অনঙ্গের পিসি আসি বিদায় করিল! 
তারা গেলে উঠাইল বিছানা বালিস। 
ভবানী বলিছে পরে মেয়ে মজলিস।। 


|| মেয়ে মজলিসে প্রমারা খেলা।। 
।পয়ার || 

মেয়ে মজলিস কথা উচিত জানিয়ে। 

অনঙ্গের পিসি তবে তাদের লহইয়ে।। 

খাওয়ায় সুখাদ্য যত আয়োজন ছিল। 

তাদের সহিত কিছু আপনি খাইল।। 

ভোজনান্ভে সকলে বসিল সভা করি। 
১১৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তাকিয়া লাগায় তারা লজ্জা পরিহরি।। 
গোপপী দাসী সাজি আনি দিল পান দান। 
কত মত ভ্ুুকুটী করিয়া পান খান।। 
কাহারো আলবোলা এলো কার গুড় গুড়ি। 
সকলে তামুক খায় নবীনা কি বুড়ি।। 

এ সব হইলে পরে রাত্রি কিছু ছিল। 
প্রেমিকারা প্রেমারা খেলা আরভ্ভিল।। 
যাও থাক এই শব্দ কেহ কেহ কহে। 
কেহ বা মৌরেত্ত ডাকে কেহ তাহা সহে।। 
সাবাসি কাগজ বলে কোন রসবতী। 
শুনিয়া কাগজ ফেলে খেলুড়ী যুবতী ।। 
প্রমারা খেলায় সবে হইয়াছে মন্ত। 

অনঙ্গ কি করে ঘরে কেবা লয় তত্ব।। 
অনঙ্গ শ্রীদেব দুঁহে শুইয়া তথায়। 

ভবানী কহিছে শুন কি খেলা খেলায়।। 


পঞ্চম মিলনে খেলাচ্ছলে বিপরীত শৃঙ্গার ।॥ 
।॥ তোটকৃ ছন্দ।। 
নব নাগর কামকৃপে মজিয়া। 
কত খেল খ্যালে রমণী লইয়া।। 
কামিনী কমলে হ্বদয়ে উঠিল। 
নলিনী তখনি মৃণালে বান্ধিল।। 
মধুপে অধরে মধু পান করে। 
ধনী ক্ষীণ কটি ধরি করে ধরে।। 
কামে মন্ত হয়ে মৃদু মন্দ স্বরে। 
যুবতী কহিছে প্রাণনাথ বরে।। 
হাত দেহ বুকে বড় ভয় করে। 
এখনো মদনে হানিতেছে শরে।। 
তুমি রূপধারী রূতিনাথ মত। 
গুণ ধরি নামে আরো কব কত।। 
অতি শীঘ্র কর হর কামজ্ালা। 
কামে জোর কর নাহি বুঝ বালা ।। 
শুনি প্রাণ পতি কহে তার প্রতি। 
| ১১৪ 


হৃদি উঠি করো বিপরীত রতি।। 
করি ইচ্ছা মতে স্মরে দূর কর। 
শুনি ধ্বনি মনে হলো হৃষ্টতর।। 
লাজ বাদ সাদে আসি আঁখি ভরে। 
কামদেব আরো মনে ব্যত্ত করে।। 
কামে মন্ত দেখে লাজ লাজ পেয়ে। 
টুটিল ছুটিল কোথা রয়ে যেয়ে।। 
পরে পতি কোলে ধনি পড়ে ঢুলি। 
প্রিয় পড়ি অধো বুকে নিল তুলি।। 
হৃদি সরোবরে ধবনি উঠে সুখে। 
যেন পদ্মশোভে ভাসে অধোমুখে || 
ঘন কেশে আরো অতি ঘোর মশী। 
উভয়েরি তাহা ঢাকে মুখখশশী।। 
মৃদুহাস্য মুখে অতি চিত্ত লোভা। 
যামিনীতে যেন দামিনীর শোভা ।। 
কটিদেশ তুলে ঘন শব্দ করে। 
জলবিন্দু তাতে তবু নাহি সরে।। 
অবলা হইয়া সবলারি মত। 

বহু কষ্ট পেলে নারী পারে কত।। 
পুন পালটিয়া নাথ উঠে বৈসে। 
তবু নাহি তাহে বাহুবন্ধ খসে ।। 
বিধিমতে কামে কত বজ মারে। 
পরে বারি ঢালে মুষলের ধারে।। 
গোপনে দুজনে করে রঙ্গছলে। 
ভবানী কবি তোটক ছন্দে বলে।। 


সভা ভাঙ্গিয়া নারীগণের শিজালয়ে গমন ।। 
| ।পয়ার || 

নাগর লইয়া সুখে অনঙ্গমঞ্জরী। 

রতি রস রঙ্গেতে রজনী শেব করি । । 

আইল সভায় যথা সুরসিকাগণ। 

দেখি তার পিসির চঞ্চল হৈল মন।। 

ভাবে সবে সভা ভাঙ্গি যাইবে যখন। 
৯৯৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


শ্রীদেবেরে লয়ে আমি যাইব তখন।। 
সভা ভাঙ্গিবার চেষ্টা তখনি করিল। 
রাত্রি কত আছে বলে কারে জিজ্ঞাসিল।। 
প্রমারায় মস্ত ছিল যত নারীগণ। 

নিশি শেষ শুনি সবে হলো সচেতন।। 
সভা ভাঙ্গি উঠি সবে নিজ ঘরে যায়। 
অনঙ্গ বিনয় করি করিল বিদায় ।। 
সেই গোলমালে যায় যুবা বছুরূপী। 
অনঙ্গের পিসি তার সঙ্গে চুপি চুপি।। 
আপনার ডুলির মধ্যে তারে তুলি নিল। 
ত্বরা করি সেথা হতে বেহারা আনিল।। 
পরম আহ্াদে রামা বাটাতে পৌঁছিল। 
নাগর লইয়া পরে পালক্কে বসিল।। 
পুরাই মনের সাধ মনেতে ভাবিল। 
ভবানী কহিছে সাধ বিধি পুরাইল।। 


॥। অনঙ্গের পিসি সহ শ্রাদেবের ক্রীড়া ।। - 
|।পয়ার | 


পালক্কে শুইয়া কহে রাত্রি আর নাই। 
বিলম্ব না কর আর শুন হে জামাই ।। 
শুনিয়া সঙ্কেত তার বুঝিল ইঙ্গিতে। 
সম্তোগে নিদ্রিত কামনারে জাগাইতে।। 
দুই পদ ধরি করে বসিল এমনি। 
গলা ধরি ধনী মুখ চুন্বিত; অমনি ।। 
নীরস রসনা দেখে নাহি রস লেস। 
নাগরে কহিছে করি অনঙ্গের দ্বেব।। 
আহা মরি এ চাদ বদন সুধা রাশি। 
নিঙ্গড়ে লয়েছে সব সেই সবর্বনাশী।। 
রজনীর শেষে প্রাণ কমল ফুটিল। 
ভাগ্য হেতু মধুকর ঘুমায়ে রহিল ।। 
মধুপরিপূর্ণ পদ্ম অলি না জাগিল। 
কি হবে উপায় প্রাণ আশা না পুরিল।। 
রমণীর খেদ শুনি শ্রীদেব কাতর। 


১৯৬ 


সম্তোগের পরে রস করিতে, ফাঁপর।। 
কামিনীর কাম আশা পুরাবার তরে। 
অলি জাগাইতে কুচপদ্ম কলি ধরে।। 
কত আকিঞ্চন করে তবু নাহি উঠে। 
লাজে হেট মুখে রহে কিছু নাহি ফুটে।। 
বহু কালে বহু শ্রমে ভ্রমর উঠিল। 
অর্থফুল্ল পদ্মিনীর মধ্যে প্রবেশিল।। 
জাগিল মধুপ আর কে করে সাস্তবনা। 
মন্ত হয়ে পিয়ে মধু নাহি বিবেচনা ।। 
কামিনীর কামনা পুরায়ে মধুকর। 
যামিনী পোহায় পুন হইল কাতর।। 
অরুণ উদয় হয় শ্রীদেব দেখিল। 
তুষিয়া প্রাণের প্রিয়া বিদায় হইল ।। 
নারী বেশে ভুলি চড়ি বাসায় চলিল। 
পথি মধ্যে চৌকিদার দেখিতে পাইল ।। 
বেহারারে কহে ওরে ডুলি কোথাকার। 
ভুলি খাড়া রাখ রাখ কহে বার বার ।। 
ডুলি রাখি ভয় পেয়ে বেহারা পলায়। 
চৌকিদার চোর বুঝি কাপড় উঠায়।। 
ভবানী কহিছে সাধু চোর হয় বেশে। 
চৌকিদার সাথে কথা শুন সব শেষে ।। 


॥। শ্ীদেব নারীবেশে চৌকিদারের হাতে পতিত ।। 
॥। মালঝাপ পয়ার। | 


চৌকিদার বলে কার পরিবার বল। 
সত্য হবে মান রবে নাহি করো ছল। ৷ 
এ থানার জমাদার দুরাচার বড়। 
তার ঠাই রক্ষা নাই সব জড় সড়।। . 
ঘরে আছে তার কাছে কেহ পাছে কহে। 
আমি চাহি করি রাহি তারে নাহি সহে।। 
সে তোমারে কারাগারে রাখিবারে কবে। 
বস্ত্র আর অলঙ্কার লবে তার হবে।। 
তার পরে তব ঘরে দম্ষ করে যাবে। 
১১৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আঁকা বাঁকা পাকা পাকা করে টাকা চাবে।। 
সব যাবে লজ্জা পাবে আর যাবে কুল। 
সতা কবে জাতি রবে নাহি হবে ভুল। ৷ 
চৌকিদারে বলে আরে নারী কার কহ। 
অতিশয় ভাল নয় পরিচয় লহ।। 

গুণধাম মোর নাম রতি গ্রাম বাসা। 

নহি নারী বেশধারী যাত্রা করি আসা।। 
চৌকিদার শুন সার কি বা আর কবে। 
রাখ মান ভূষাখান করি দান সবে।। 
শুনে বলে ইহা হলে যাবে চলে তবে। 
যে তোমারে ধরিবারে কেবা পারে কবে।। 
করি দান পেয়ে ত্রাণ ঘরে যান পরে। 
লাজ পেয়ে যায় ধেয়ে ঘরে যেয়ে ডরে।। 
বলে বাপ একি পাপ মনত্তাপ করে। 
ভবানীর কথা স্থির শুনে ধীর রবে।। 


|| চৌকিদার্ের হস্ত হইতে উদ্ধার হইম়্া মনে আক্ষেপ ও প্রবোধ।। 
|| ত্রিপদী।। 

গৃহে বসি সেই দিন,” করি মুখ অমলিন, 
ভাবেন কি হইল আমার। 

ধরেছিল চৌকিদার, মান রাখি অলঙ্কার, 
এলেম কি হবে আর বার।। 

এরূপ গমন দায়, চোর দশ দিন যায়, 
অবশ্য সাধুর একদিন। 

প্রহরী তো ধরেছিল, ধন পেয়ে ছেড়ে দিল, 
সেই যেন ছিল ধনহীন।। 

দ্বারি যত আছে দ্বারে, ষদ্যপি ধরিতে পারে, 
তখনি শুনিবে স্বামী তার। 

ধনে নাহি রবে মান, কি জানি বাযায় প্রাণ, 
তার হাতে না হবে নিস্তার।। 

এ প্রকারে যাওয়া ভার, কেমনে বা যাব আর, 
নাহি গেলে কেমনে বাঁচিব। 

করিলাম প্রেম সাধে, বুঝি বিধি বাদ সাধে, 


১১৮ 


কি জানে কি ঘটে কি করিব।। 
প্রাণ ভয়ে নারী প্রেম ছাড়ে। 

রসিকা প্রেমের তরে, কেহ বা যদাপি মরে, 
রসিকের কাছে যশ বাড়ে।। 

রাবণ সীতার আগে, দশ মুখ অনায়াসে, 
দিয়াছিল জগতে বিদিত। ৃ 

পেয়েছি পদ্মিনী তায়, এক মাথা যদি যায়, 
তাতে আমি না হত খেদিত।। 

ভবানী এস্ির করে, রাখে প্রেম যাতে রহে, 
কাছে যাবে যেরূপ কহিবে। 

অনঙ্গ মঞ্জরী ঘরে, ভাবে কি উপায় করে, 
কিসে প্রেম তরঙ্গ বহিবে।। 


॥॥ চিরমিলনের অনুপাযস ভাবিয়া অনঙ্গের খেদ।। 
|| ত্রিপদী।। 


সাহসে বুদ্ধির জোরে, হযে প্রকারে যায় চোরে, 
গেনু এলো হইল মিলন। 
যোগেযাগে এ প্রকার, দেখা হল পাঁচ বার, 
বার বার না হয় তেমন।। 
এই ভেবে মৌনী হয়, বিরহ হইলোদয়, 
মনোজের শরেতে কাতর। 
স্মরিয়া শ্রীদেব রূপ, কহে মরি অপরূপ, 
আর কি হেরিব মনোহর ।। 
গোপীকে ডাকিয়া বলে, পাব আর কোন ছলে, 
উপায় না দেখি কোন মতে। 
অতএব শুন বলি, কুলে দিয়ে জলাঞ্জলি, 
ঘর ছাড়ি রব তার সাতে।। 
হেন উপপতি যার, তার নিজ পতি ছার, 
সংসারেতে প্রয়োজন নাই। * 
গৃহ ধর্্ম নাহি চাই, তারে যদি সদা পাই, 
লাজের মুখেতে দিব ছাই।। 
একে সেই সুনবীনা, কেহ নাহি সুপ্রবীনা, 


১১৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


প্রবোধ কে দিবে সে সময়। 

বিরহে কাতর হয়, স্মর তারে অতিশয়, 
শরাঘাতে করিল প্রলয়।। 

ভাগ্যে গোপী কাছে ছিল, প্রবোধ কিঞিঃৎ দিল, 
তোমার পিসিরে ডেকে আনি। 

কেন এত কর ভয়, যস্ত্রণাতে কি না হয়, 
মস্ত্রিণী প্রধানা তিনি জানি।। 

গোপী তারে প্রবোধিয়ে, সেখানে কহিল গিয়ে, 
শুনি ধনি তখনি আইল । 

অনঙ্গের পিসি কবে, যাতে তুই ভাগ রবে, 
ভবানীচরণ বিরচিল। । 


॥॥ অনঙ্গের পিসির অনঙ্গ প্রতি চির মিলনের সুযুক্তি প্রদান ।। 
|।পয়ার।। 


অনঙ্গের পিসি আসি বৈসে তার পাশে। 
কি জন্য ভাবিছ বাছা বলিয়া জিজ্ঞাসে।। 
কহিলো গো পিসি তাহা তুমি কি জান না। 
তার বিরহেতে মরি উপায় বল না।। 
শুনি সেই রসবতী করিল প্রবোধ। 
অবোধের মত ভাব হইয়া সুবোধ ।. 
গোপীকে বলেছো তুমি কাতর হইয়া ।। 
বাহির হইতে চাহ সংসার ছাড়িয়া। 
ছিছি বাছা হেন কথা এনোনাক মুখে।। 
যা মনে করি বা কর ঘরে থেকে সুখে। 
দেখ দেখি আমি যুবা বিধবা হয়েছি।। 
কুটুন্বের মান্য আছি কিনা করিতেছি। 
ঘরে থাকি উপপতি করি যত চাই।। 
কেবা দোষ দিতে পারে তবু স্বামী নাই। 
তুমি ভাতারের মাপু তব কথা কিবা।। 
তার শিরে তাল রাখি সকলি পারিবা। 
সুশাসিত পতির গৃহিণী যেবা হয়।। 

' পরকে করিতে কৃপা তার কষ্ট নয়। 
নিবেব্ধে সংসার ছাড়ে হয় মানহীন ।। 


৯২০ 


(| অশজ 


সংসারে থাকিলে বড় সুখ চিরদিন। 
গৃহস্থ যুবতী প্রতি অনেকের আশ।। 
সব্বকালে পতি যার আছে অনুদাস।। 
পশ্চাৎ সম্ভতি হলে হয় সে গৃহিণী। 
তখন অধিক মান্য স্বামী সোহাণিনী।। 
কুলটার সুখ যে যৌবন যতকাল। 
তারপর হয় তার কতই জঞ্জাল।। 
তোর মত হাবা মেয়ে না দেখি কলিতে। 
এজেতের মধ্যে নাই পারি তো বলিতে।। 
শুনহ উপায় বলি রবে চিরদিন। 

দুদিক থাকিবে দৌহে হইবে অধীন।। 
ইহা বলি বহু যুক্তি শিক্ষাইয়া দিল। 
স্বামীকে কহিবে আজি অনঙ্গে কহিল।। 
শুনিয়া অনঙ্গ হাসে গেল আঁখি নীর। 
ভাল বলিয়াছ পিসি এই কথা স্থির।। 
নাগরের কাছে তবে গোপীকে পাঠায়। 
বুঝায়ে কহিবে যেন ভয় নাহি পায়।। 
গোপী সেথা গিয়ে সব নাগরে কহিল। 
আহ্ুাদে আটখান হয়ে দুঃখ পাসরিল।। 
গোপী সাস্তোষিক পেয়ে বিদায় হইল। 
অনঙ্গেরে আসি কহে ধরা পড়ে ছিল।। 
শুনিয়া অস্তরে কাদে না পারে ফুকুরে। 
ভবানী কহিছে খেদ যাবে সব দূরে।। 


মঞ্জরীর পতির নিকটে তারকেশ্বর গমন প্রার্থনা ।। 
|।পয়ার || 


সন্ধ্যার পরেতে ঘরে এলো তার পতি। 
কাছে আসি কহে হাসি অনঙ্গ যুবতী ।। 
সদা মত্ত হয়ে থাক লৈয়ে বারাঙ্গনা। 
আখেরে কি হবে তার নাহি বিবেচনা ।। 

এ সকল ধন কড়ি বাড়ি অলঙ্কার। 

কে ভোগ করিবে পরে আছে কে তোমার।। 
সম্ভান না হলো মোর যৌবন না রয়। 

১২১ 


দুহপ্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তুমি যেন কথা শুন সে তো বশ নয়।। 
এক্ষণে যুবতী আছি হবে আশা আছে। 
তবু বাঁজা বলে লোক যাই যার কাছে।। 
মনোদুঃখে মরি আর কত লজ্জা পাই। 
এ.কারণ তারকেশ্বরেতে যেতে চাই। | 
ধন্না দিয়ে রব সেথা তেরাত্রি করিব। 
সম্ভান হবে না হবে বুঝিতে পারিব।। 
তোমার কি মত এতে বল দেখি শুনি। 
মনে কিছু ভেবো নাক তারা খষি মুনি।। 
শুনিয়া তাহার স্বামী ছাঁড়িল নিশ্বীস। 
কার সঙ্গে যাবে কারে করিব বিশ্বাস।। 
অবশ্য উচিত দেবদ্ধারে চেষ্টা করা। 
কিন্তু সে কসিন বড় যায় প্রাণ হরা।। 
তপনে তাপিত হবে এ যে চৈত্র ম'স। 
পথে যেতে কত ক্লেশ সেথা উপবাস।। 
এ দুঃখ সহিতে যাবে করিয়া আশ্বাস। 
যদি মন্দ কথা রটে হবে সব্রবনাশ।। 
অনঙ্গ শুনিয়া কহে সে পার কেমন। 
পিসি সঙ্গে যাবে কেন ভাবিছ এমন।। 
প্রথর তপন বটে ভুলিতে কি ভয়। 
উপবাস ভয় কভু নারীর না হয়।। 
ব্রান্মোণের মেয়ে যত কত ব্রত করে। 
বার মাস উপবাস করে নাহি ভরে।। 
্রান্মাণেরা তুষ্ট তাতে আরো দিন বিধি। 
উপবাসে কিবা ভয় শুন গুণনিধি।। 
ব্রজবাসী সঙ্গে যাবে কি করিবে চোর। 
অতএব কোন দুঃখ না হইবে মোর।। 
মিছামিছি কেন তুমি ভাবনা করহ। 
কালি দিন ভালো যাবে যদি তুমি কহ।। 
শুনি গুণধাম কহে কালি তুমি যাও। 
গোগী সঙ্গে যাবে আর যারে যারে চাও।। 
পতির হরিল মতি অনঙ্গমঞ্জরী। 
ভবানী কহিছে সুখে পোহায় শর্বরী। 


১২২ 


| পতির অনুমতি প্রাপ্ত হইয়া অনঙ্গের তারকেম্খরে গমন।। 
| ।পয়ার || 

প্রভাতে পতির মত কহিল গোপীরে। 
এখনি ডাকিয়া তুমি আনহ পিসিরে।। 
পরে প্রাণ নাথে কবে হয়েছে উপায়। 
তারকেম্বরেতে আজি যাব বলো তীঁয়।। 
গঙ্গাপার হবো মোরা হাটখোলা ঘাটে। 
আগে যদি যাই রবো শালিকার মাঠে।। 
তারে বলো সেজেগুজে যেতে পালকিতে। 
হাটখোলা পার হলে পাইবে দেখিতে ।। 
এতেক শুনিয়া গোপী চলিল ত্বরিত। 
প্রথমে পিসির কাছে হৈল উপনীত।। 
কহিল পিসিরে তার পরেতে নাগরে। 
শুনিয়া শ্রীদেব ভাসে আনন্দ সাগরে।। 
গোপী গিয়ে দেখে ঘরে যাবার সংযোগ। 
হেনকালে পিসি এলো হইল সুযোগ।। 
গোপী দাসী ব্রজবাসী আর পিসি সঙ্গে। 
চলিল অনঙ্গ মৃদু হাস্যমুখ রঙ্গে।। 
শ্রীদেব করিল যাত্রা মঙ্গল হইবে। 
প্রথমে দেখিল বামে শব কুসম্ত শিবে।। 
দক্ষিণে হেরিল গাভী মৃগ আর দ্বিজ। 
কালী কালী বলে মুখে মনে মন নিজ।। 
উভয়ের হইল দেখা সুরধনী তীরে। 
সকলে মিলিয়া পরে যায় ধীরে ধীরে।। 
পথে এক রাত্রি থাকে হয়ে পুলকিত। 
প্রাতে উপনীত হৈল যথা মনোনীত।। 
শ্রীদেব সেখানে গিয়া ভিন্ন বাসা করে। 
অনঙ্গ পিসির সহ রহে স্থানাস্তরে।। 
স্থানাদি করিল সবে আপন বাসায়। 
ভবানী কহিছে পরে পুজা দিতে যায়।। 


১২৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


॥| তারকেম্খরের পুজা ।। 
| পয়ার।। 


প্রবেশিয়া পুরী সবে মিলিল তথায়। 
প্রথমে প্রণাম করি- মোহস্তের পায়।। 
পরেতে মন্দির মধ্যে প্রবেশ করিল। 
পুজা দ্রব্য সঙ্গে ছিল তথায় রাখিল।। 
স্মরিয়া বিষুণ্র নাম বসিল পুজার 
গঙ্গাজল দুগ্ধ ঢালে শিবের মাথায়।। 
অঞ্জলি পুরিয়া বিল্বদল দিল কত। 
দ্রোণ অর্ক আদি পুষ্প পেয়েছিল যত।। 
আনন্দে পুজিছে দিয়ে প্রিয় পত্র ফুল। 
ঘৃত চিনি মধু রভ্ভা আতপ তগুল।! 
প্রদান করিল সব মস্তক গহুরে। 

বম বম শব্দে বহু গালবাদ্য করে।। 
করতালি দেয় আর বগল বাজায়। 
গদশগদ ভাবে মনঃ স্থির তব পায়।। 
যুবতী সে ভাবে ভোর পুলকে পুরিল। 
অনঙ্গ শ্রীদেববর মনেতে চাহিল।। 
ভবানীচরণ কহে নহে *অসম্ভব। 
পাইবা বাঞ্িত আশুতোষে কয়।। 


।। শিবের ভ্ভতি || 
।।পয়ার।। 


অহে শম্ভু শুভদ কি কব তব গুণ। 
বেদবেত্তা বেদব্যাস বলে না সগুণ।। 
অঙ্গে ঈশ ঈশদ ঈষৎ কর কৃপা। 
তব কটাক্ষেতে কত ক্ষিতিপতি নৃপা।। 
পশ্ুপতি পশুসম হয়েছি অজ্ঞান। 
কৃপাময় কৃপা করি কর কৃপাদান।। 
অহে শিব শিবদ অশুভ কর নাশ। 
কালাস্তক কালভয়ে হয়েছে হতাশ ।। 
শুলিশুল দিয়ে মম শুল কর দূর । 
তব শুল বিনা শুল না হইবে দূর ।। 


১২৪ 


মহেম্বর মহিমা কি কহিব তোমার। 
আগম নিগমে প্রভু নাহি দেখি আর।। 
ঈশ্বর ঈশ্বর সবে তোমার প্রসাদে। 
দয়াময় দয়া কর পড়েছি প্রমাদে।। 
সবর্ব সবর্ব বেদে বলে সবর্ধময় তুমি। 
তেজস্‌ আকাশ সমীরণ জলভূমি।। 
ঈশান ঈশান কোণে আছে অধিষ্ঠান। 
ইহা বলি বলি সেই কোণে করে দান।। 
শঙ্কর শঙ্কর নাম কল্যাণ কারণ। 
কাতরে করুণা কর কৃতাত্ত বারণ।। 
হে চন্দ্রশেখর শিরে ধরি শশধর। 
ভালে বসি ভাল শশী হলো শোভাকর।। 
ভুতেশ ভূতের সঙ্গে শুনি সহবাস। 
পঞ্চভূত হৈতে মোরে করহ নিরাশ ।। 
হে খণ্ড পরশু খণ্ড খণ্ড পাপরাশি। 
পাপ করে সঙ্গী হয়ে আছি গৃহবাসী।। 
শিরিশ গিরিশ গিরি কন্যা লয়ে দান। 
কামনা পুরালে হলো শিখরি প্রদান।। 
মৃত্যুঞ্জয় মৃত্যুভয়ে ভাবিত অস্তর। 
অশাস্ত কৃতাস্ত শুনি ঘোর ভয়ঙ্কর ।। 
কৃত্তিবাস কৃত কৃত্য কর হে আমায়। 
বিষয় বাসনা কৃত্তি বাসনা পুরায়।। 
পিনাকি পিনাক তব আমি ভিক্ষা চাই। 
পাপিন্ঠ পাপের মাথা কাটিয়া ফেলাই।। 
উগ্র উগ্র মুর্তি শুনি উগ্র হয় করি। 
দীননাথ দয়া কর উগ্র মূর্তি হরি।। 
কপর্দ্টি কঠিন কটা জটাজুট ধারি। 
কটা জটা ঘটা ছটা কহিতে না পারি।। 
স্ীকঠ হে কণ্ঠ শোভা কি কহিব আর। 
কালকুট গলে গিয়ে হলো শোভাকার।। 
সিতিকষ্ঠ কণ্ঠ কাল কুটেতে শ্যামল। 
খল কাল কৃট ভাল হইল সরল।। 
ভুলাইলি কপাল কপাল করে করি। 


৯২৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কপালের কপাল কি আহা মরি মরি।। 
বামদেব দেববন্দ হইতে সুন্দর । 

রজত পর্বত যিনি শোভা কলেবর।। 
ত্রিলোচন ত্রিলোচন করেছ ধারণ । 

এক চক্ষে চকিতেছে কর নিরীক্ষণ।। 
করিলে করুণা করি মনেতে উদয়।। 
গঙ্গাধর ধরি শিরে সুর শৈবলিনী। 
ত্রিলোক জননী তিনি ত্রিলোক তারিণী। 
ভব তুমি তোমা হৈতে ভবের প্রকাশ। 
বিনাশ করহ ভব ভব অভিলাষ।। 
ভবের চরণ ভাবি ভবানীচরণ। 
আশুতোষ স্ব আশু করিল রচন।। 


॥। শ্রীদেবের যোগীবেশ ধারণ পৃবর্বক নায়িকার নিকট গমন।। 
|| একাবলি ছন্দ।। 


পূজা পরে স্তুতি করি অশেষ। 
মহাস্ত দক্ষিণা দিলেক শেষ।। 
পরে সে তাহাতে বাসায় চলে। 
অনঙ্গের পিসি শ্রীদেবে বলে।। 
কত মত বেশ ধরিলে কত। 
আজি হতে হবে যোগীর মত।। 
যাও তবে তুমি যেখানে বাসা। 
রেতে যাবে সেথা পুরিবে আশা ।। 
বাসে গিয়ে তবে প্রসাদ খায়। 
হেনকালে দেখি দিবস যায়।। 
শ্রীদেব সাজিছে মহেশ বেশ। 
মহেশ গুণের নাহিক লেশ।। 
কালাপেড়ে ধুতি দূরে ফেলিল। 
গেরুয়া বসন ভাল পরিল।। 
মুকুতার মালা রাখিল ঘরে। 
অক্ষমালা আর স্ফটিক পরে।। 
চন্দন আতর গোলাপ নীরে। 
১২৬ 


পিসি সঙ্গে ধনী বসিয়া ছিল।। 
দেখি ধনী কহে এসো গৌসাই। 
পিসি তার কহে কি গো জামাই।। 
আমি সবাকারে দিব গো বলে। 
অনঙ্গের তরে সন্যাসী হলে।। 
গুণমণি কহে বুঝি আভাস। 
আজ্ঞা বহই অনঙ্গ দাস।। 
হয়েছি গো আমি তোমার দাসী। 
সন্ন্যাসী হইনু এখানে আসি।। 
যখন যেমন হুকুম পাই। 
অমনি তখনি করি গো তাই।। 
দাস দাসী থাকে আজ্ঞার তাবে। 
তুমি কেন বাছা বুঝ না ভাবে।। 
শুনি ধনী মনে বাখানে তায়। 
কতগুণ তব হায় রে হায়।। 


১২৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


এতগুণ ধএেঁই তেই পারিলে। 
মোর অনঙ্গের মনো হরিলে।। 
পিসি সমন্বোধিয়ে কহে রূপসী। 
খেতে কিছু বল এখানে বসি।। 
সন্যাসী কহিছে যোগীর ধারা। 
যাগ আগে করে যোগী যাহারা ।। 
আমি যোগী যাগ করিব আগে। 
যাগ বিনা কিছু মনে না লাগে।। 
অনঙ্গ কহিল কেমন যাগ। 
যাগ ফল মোরে দেবে কি ভাগ।। 
ভবানী কহিছে দেখলো পরে। 
নাগর যাগের সুযোগ করে।। 


॥| ষন্ঠ মিলনে তারকেশ্খরে কামযাগ।। 
।পয়ার 11 


কোমল বিমল বেদীজঘন যুগল। 

তার মধ্যে হোম কুণ্ড বরাঙ্গ সুত্ল।। 
নবীন সন্স্যাসী বন্সি বেদির উপরে। 
কাম তন্ত্র মতে কামযাগ করে।। 
দীপাস্ত মানস পুজা মনোজের করি। 
বাহ্যে নিবেদিল কুচফল হস্তে ধরি।। 
মৃগাক্ষী কটাক্ষে জ্বালি দিল কামানল। 
বসস্ত বাতাসে অগ্নি করিল প্রবল।। 
বিধিকৃত শোক অ্রব এক যাগে ছিল। 
আহুতি দিবার লাগি বিভাগ হইল।। 
এইরূপে বাগ অঙ্গ হলো আয়োজন। 
দেখি হোতৃ কর্মে হোতা হরষিত মন।। 
পরম আনন্দে কাম যাগ আরমভিিল। 
সহস্র আহুতি দানে সঙ্কল্প করিল।। 
আহুতি প্রণালী দেখি সুখী ঘযজমান। 
মুখামূতে যোগীবরে করিল সম্মান।। 
সম্মানিত সন্গ্যাসীর যোগভঙ্গ নাই। 
যোগ বলে কাম সিদ্ধ করিছে গোসাঞ্রি।। 


৯২৮ 


বিস্তারিত শ্রব মুখে সহস্র আহুতি। 

পরে শুক্র হবনেতে করে পূর্ণাহুতি।। 
হোমকুণ্ডে কোথা হতে কিরূপেতে জল। 
আসি নিভাইয়া দিল মনোসিজানল।। 
বসুমতি দৈব যোগে শীতল হইল। 
পৃথ্বীত্বং শীতলা ভব মন্ত্র পড়ি দিল।। 
যাগ কুণ্ড জলে যোগী শ্রব ভাসাইল। 
সেই জলে যজমান শাস্তি জল নিল।। 
ভবানী কহিছে যোগীবর ভাল ছিল। 
অনঙ্গে অনঙ্গ যাগ ফল শীঘ্র দিল।। 


|| তারকেম্বরের পর একরাত্রি পথে বাস করিয়া স্ব স্ব গৃহে পুনরাগমন।। 
||পয়ার || 


কাম যজ্ঞ সাঙ্গ করি উভয়ে উঠিল। 
তখন তাহার যজ্ঞ সকলি খাইল।। 
এইরূপে তিন দিন করে কাম যাগ। 
যাগ ভাগ করি পরে বাড়ে অনুরাগ।। 
চতুর্থ দিবসে সবে ছাড়ি সেই স্থান। 
বাটী যাইবার জন্য হৈল যত্ববান।। 
পুর্ব মত দুইজনে ভুলিতে চড়িল। 
পিছে পিছে পালকিতে শ্রীদেব চলিল।। 
এক রাত্রি পথে থাকে বু যাত্রী সাতে। 
শ্রীদেবের বরযাত্রী বুঝায়ে তাহাতে ।। 
রাত্রি একঘরে হৈল সবাকার বাস। 
শ্রীদেব কৌশলে পুরে দুহাকার আশ।। 
নবীনা প্রবীণা পরে কহে গো অনঙ্গ। 
কালি ঘরে যাবে হবে সঙ্গ ভঙ্গ।। 
স্বামীরে কি কবে কিবা দেখিলে স্বপনে। 
কহে তুমি বলেছিলে নাহি কিছু মনে।। 
ভাল ভোলা মেয়ে বলে কহে পুনবর্বার। 
সার উপদেশ শুন যাতে পাবে পার।। 
এক্ষণে গোপনে থাকু সেই উপদেশ। 
ধর্মপতি কাছে কবে করিয়া বিশেষ।। 


১২৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


প্রভাতে সেখানে হতে চলিল ত্বরিতে। 
দিবসের মধ্যে ধনী আইল বাটীতে।। 
কর্তী আনন্দিত কর্ত্রী ঘরে এলো ফিরে। 
ভবানী কহিছে কহ স্বপন স্বামীরে।। 


|| অনঙ্গের রাত্রে পতিসহ্‌ শম্সনে তারকেম্খরের স্বপ্রকথা 
এবং পতির উত্তর! । 
|| পয়ার || 
নিশিতে স্বামীর সহ. করিয়া শয়ন। 
কহিছে তাহারে ধনী স্বপন বচন।। 
পুত্র মোর হবে বলে সেই কামনায়। 
দুই দিন হত্যা দিয়ে রহিনু তথায়।। 
তৃতীয় নিশিতে এক সন্াসী আইল। 
বসিয়া আমার কাছে কহিতে লাগিল।। 
অনঙ্গমঞ্জরী শুন তুমি মোর দাসী। 
আমারে না সহে তুমি আছ উপবাসী।। 
তোমার কামনা এই পুত্রবতী হও। 
অবশ্য সন্তান হবে তুমি বন্ধ্যা নও || 
তোর গর্ভে পুত্র হবে বর দিনু বসে। 
কিন্তু না হইবে তোর স্বামীর ওঁরসে।। 
শুনি তার পায়ে ধরে কহিলাম আমি। 
কহ প্রভু কোন্‌ দোষে দোবী মোর স্বামী।। 
গৌসাই কহেন কিছু দোষ নাহি পাই। 
তাহার সম্ভান ভাগ্যে বিধি লিখে নাই।। 
তোর ভাগ্যে ছিল আমি তাতে দিনু বর। 
তুই তার মত নিয়ে অন্য চেষ্টা কর।। 
শুনিয়া তাহার স্বামী হইল ভাবিত। 
কহে একি সবর্বনাশ হিতে বিপরীত।। 
কেমনে বা মত করি না বুঝিয়া মর্ম্ম। 
কলঙ্ক হইবে কত আর যাবে ধর্্ম।। 
একে তুমি সতী তাতে আমি হয়ে পতি। 
বলিব কি লজ্জা খেয়ে কর উপপতি।। 
নষ্ট হবে ধর্ম যাবে পাবে পাব লাজ। 


৯১৩৩ 


দুর্তীবিলাস 
কর্ম্ম কাণ্ড শ্রাদ্ধ পণ্ড সে পুত্রে কি কাজ।। 
মত না হইল শুনি ভাবিতা যুবতী। 
বিষাদে হর্ষিতা হলো স্বামী জানে সতী।। 
কিন্ত মত না হওয়াতে ভাবিছে আকাশ। 
সে রাব্রি স্বামির সহ হৈল সহবাস।। 
রতি রস রঙ্গ হৈল যেন শান্ত্র পালা। 
উভয়ের মনে অন্য করে দায় টালা।। 
তাদের বাসর হয় যেন কারাগার। 
দুজনে দুঃখিত মনে ভাবে অনিবার।। 
সতী পতি কষ্ট পায় অধিক কামিনী। 
মন্দালাপে মনস্তাপে পোহায় যামিনী।। 
প্রভাতে পিসিরে ধনী ডাকিয়া পাঠীয়। 
ভবানী কহিছে এবে হইবে উপায়।। 


||. অনঙ্গের পিসির বাক্যে উপপতি করিতে তৎপতির অনুমতি প্রদান ।। 
||পয়ার || 

অনঙ্গ প্রবীণা পিসি সাক্ষাতে কহিল। 

পতির সহিত যত কথা হয়েছিল।। 

ভাবিতা হয়েছি পিসি করি কি উপায়। 
জামাই তোমার বলে ইথে ধর্ম যায়।। 
প্রকাশ হইলে লোকে কলঙ্ক হইবে। 

এমন কুকর্ম্মে মত কেমনে করিবে।। 

নবীনে প্রবীণা কহে বুঝিনু সকল। 

বুঝায়ে করিব মত না হও বিকল।। 

কহিব অখণ্ড কথা কহিতে কে পারে। 
কোথা সেই বোকা বেটা ডাক দেখি তাকে।। 
অনঙ্গ শুনিয়া তারে ডেকে পাঠাইল। 
বাহিরে বসিয়া ছিল শুনিয়া আইল ।। 
পিসাস যথার্থ জানে জামাতারে কয়। 
অনঙ্গের স্বপ্নে কি তোমার মত নয়।। 
শুনি গুণনিধি কন তুমি বুদ্ধিমতী। 

তোমার সমান আর নাহি গুণবতী।। 

বিধবা হইয়া তুমি স্বামীর দৌলাৎ। 


১৩১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


দেবরে হারায়ে কোর্টে সব কৈলা হাত।। 
অতএব তোমার বুদ্ধির সীমা নাই। 
বিবেচনা করে বল করি আমি তাই।। 
লোকলজ্জা ধর্ম কর্ম যাতে সব রয়। 
হেন কথা কহ যদি তবে মত হয়।। 
ব্যাপিকা নায়িকা কহে কিছুই জানি না। 
বিধবার হইনু আমি নবীনা প্রবীণা।। 
বুদ্ধি সাধ্যমত বলি যাহা মোর ঘটে। 
এতে মত দিতে পার শাস্ত্র সিদ্ধ বটে।। 
পুরাণে শুনেছি আমি তাতে স্পষ্ট আছে। 
ধন্শাস্ত্র শুনিয়াছি পণ্ডিতের কাছে।। 
মোকদ্দমা করি যবে দেবর সহিত। 
ব্যবস্থার জন্যে আনি স্মৃতির পণ্ডিত।। 
ন্যায়রত্ব বিদ্যারত্ব কত চূড়ামণি। 
ব্যবস্থা পারগ যে পণ্ডিত শিরোমণি ।। 
তাদের মুখেতে কত শুনেছি বিধান। 
সেই মত কব আমি মতের প্রমাণ।। 
পুত্র প্রয়োজন আছে অবশ্য গৃহীর। 
ব্যক্ত পুরাণেতে দেখ লেখন স্মৃতির || 
পণ্ডিতের আপন বংশ রাখিবার তরে। 
আত্ম হতে না হইল অন্য মত করে।। 
পাণ্ডুরাজা হৈতে পুত্র না হলো কুস্তির। 
উপপতি জন্যে বিধি দিলেন সুধীর।। 
অনুমতি পেয়ে কুস্তি তাহাই করিল। 
পাঁচজন হতে পাচ পুত্র জন্মাইল || 
পতি অনুমতি বিনা তবু নারী পারে। 
অনুমতি চাহি লেখে দায়ভাগ কারে।। 
স্বামী অনুমতি বিনা বে পুত্র জন্মায়। 
শুনি সেই পুত্র পুণ্য অংশ নাহি পায়।। 
পুরাণ স্মতির কথা কেবা নাহি মানে। 
আর শিব আজ্ঞা আছে শুন সাবধানে ।। 
লোকলজ্জা ভয় তুমি তাহারে পারিবে। 
গোপনে আসিবে কেহ কে ঢাক মারিবে।। 


১৩৭ 


দূতীবিলাস 
যদ্যপিও জানে লোক তাতে বা' কি ভয়। 


বন্ধ্যার এমন কর্ম কোথায় না হয়।। 
অন্য জাতি ধারা আমি জানি কত মত। 
এ জাতির এই মত দেখি শত শত।। 
সুজন বাবুর কথা শুনিয়াছ কানে। 
উপপতি সঙ্গে মাণ্ড পাঠায় বাগানে ।। 
তিন পুত্র হৈল তার জারেতে জন্মায়। 
অনুমতি করেছিল বংশ রইল তায়।। 
যখন এসব কথা হয় জানাজানি। 

সে সময় লোকগুলো করে কানাকানি।। 
কিছুদিন থাকে কথা শেষ কিবা রয়। 
কলঙ্ক কি বশ সব কালে লোপ হয়।। 
অতএব শান্তর সিদ্ধ লোক ব্যবহার । 
ইথে পাপ লজ্জা কেন হইবে তোমার ।। 
গুণনিধি কহে শুনি পড়ি বাক জালে। 
শান্তর এই বটে নাহি মানে কলিকালে।। 
অনুমতি কর তুমি শুন গুণনিধি। 
ধন্মাধন্ম হবে মোর আমি দিনু বিধি।। 
চিস্তিত অনঙ্গ পতি করে অনুমান। 
সাপ হাঁড়ি দেব পাড়ি ইহার বিধান ।। 
পিঁড়ি যদি ভাঙ্গে তবে দেব রুষ্ট হন। 
না ভাঙ্গিলে সর্প তারে করিবে দংশন ।। 
অতএব মত মোরে করিতে হইল। 
হইল আমার মত অনঙ্গে কহিল।। 
ধনীগুণি সুপুরুষ দেখিয়া আনিবে। 
ভবানী কহিছে তাহা জানিতে পারিবে।। 


1 পতির অনুমতি পাইয়া তৎক্ষণাৎ নাগর আনয়ন পূর্বক 
অনঙ্গের সুখভোগ।। 
|| ত্রিপদাবলী ছন্দ।। 
শুনি স্বামী বচন, হইল মগন, 
পিসিরে গোপীরে দৌহে কহে। 
আনিতে নাগর, মোর মনোহর, 


১৩৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
পাঠাইব ব্যাজ নাহি সহে।। 
গোপী তার বাটীতে, যাও লো আনিতে, 
কহিবা এখনি চল সেথা । 
এই সব বচনে, জানাবে সুজনে, 
এখনি আমনিবা তারে হেথা ।। 
কবে এই চাতুরী, রবে বরাবরি, 
যখন তখন তুমি যাবে। 
গোন্পী তার কাছেতে, চলিল ত্বরিতে, 
সে কথায় কত সেথা পাবে।। 
সুজন মলিন মুখে আছে। 
ধনী বাণী কহিল, যুবক চলিল, 
গদ গদ ভাব তার কাছে।। 
গোপী আগে ধাইল, শীঘ্র জানাইল, 
দ্বারি দ্বারে ছেতে দিল তারে! 
আঁখি শর হত যত “দরে ?। 
করে ধরি তুষিল, উশয়োে লাল, 
চকাচকি হত দুইজনে 
নাগর শুনাহল, বাধা 
আব রাজী কারল যেমনে। 


শও[নয়া সুবচন্য, ভাঁসল উঃ - 
২৬১0 


কত পুঃখ পাইলে, প্রীতি বাড 
কোন্‌ জন হেন প্রেম করে' 

আগেতে মজাইলে, পরেতে বাচাইলে, 
বাহ্ধিয়ে রাখিলে প্রেমডোরে। 

সুখেতে ভাসাইলে, দাস বানাইলে, 
ভয় ভুলে গেল তব জোরে ।। 
অধিনীরে যেন মনে থাকে। 

শুনি মুখ চুিল, কাম আরম্তিল, 
গুণমণি মুখ মধু চাকে।। 


১৩৪ 


খেলিছে বলিছে কত মুখে। 
করিয়া কোলাকুলি, প্রেম ঢালাঢালি, 
করিছে খসিছে রস মুখে।। 
মনে মনে দুজনে হাসে। 
কবি করি রচন, ভবানীচরণ, 
কহে সুখ কর গৃহবাসে।। 


|| অনঙ্গের নাগর প্রতি অভয় প্রদান ও নাগরের নির্ভয়ে গমনাগমন || 
||পয়ার।। 


এইরূপে রতিরস করিয়া দুজনে। 

ছাড়ি সেই শয্যা বৈসে পৃথক আসনে ।। 
প্রেয়সী সরস ভাষে শুন প্রাণধন। 
এক্ষণে তোমার আর নাহিকো গোপন।। 
দিবা কি নিশিতে সদা বাসায় থাকিবে। 
যখন যাইবে গোপী তখনি আসিবে।। 
একথা অন্যথা যেন কখন না হয়। 
নিরস্তর অস্তরেতে করি এই ভয়।। 
পুরুষ ভ্রমর জাতি শ্রমে নানাফুলে। 
কোন্‌ ফুলে মধু পেলে থাকে সেথা ভুলে।। 
আর যেন প্রাণ মধু মক্ষিকা যেমন। 
আয়াসের মধু রাখে করিয়া গোপন।। 
অমল জ্বালিয়া কেহ মক্ষিকার মুখে। 
অনায়াসে মধু সব হরে লয় সুখে। ৷ 
দেখো যেন মোর প্রাণে ঘটনা তেমতি। 
যতনে রাখিবে প্রেম করি হে মিনতি।। 
শুনিয়া কহিল শুন শুন প্রাণেশ্বরি। 
শপথ করি হে তব পদস্পর্শ করি।। 
তোমা ছাড়া নারী নাহি হেরি অন্য পক্ষ। 
কথা তার সাথে কহি এতে যে স্বপক্ষ।। 
আমার প্রতিজ্ঞা এই শুন রসবতী। 

না ছাড়িব তব প্রেম থাকিতে শকতি।। 


১৩৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তুমি যদি ছাড় প্রাণ তবে কি করিব। 
তোমার বিরহে আমি তখনি মরিব।। 
শপথাদি স্তুতি করি অনঙ্গে তুষিয়া। 
সেদিন বাসায় গেল বিদায় হইয়া।। 
কখন রজনী যোগে কখন দিবসে। 
প্রত্যহ আইসে যায় অনঙ্গের বশে।। 
যখন অনঙ্গ পতি থাকে নিজ ঘরে। 
শ্রীদেব দেখিয়া আর নাহি ভাবে পরে।। 
নিবির্বকার দেহ আর সরলের শেষ। 

সে শরীরে কিছুমাত্র নাহি রাগ দ্বেষ।। 
শ্রীদেবে ডাকিয়া কভু আদর করিয়া। 
তাস খেলে জিতে লয় বোকা ভুলাইয়া।। 
বাহিরে শ্রীদেব হারে তাহার খেলায়। 
ঘরে রসবতী নিতি জিতিয়া হারায়।। 
একদিন দিবাভাগে অতি অসময়। 
অনঙ্গের মনে আসি অনঙ্গ উদয়।। 
তখনি পাঠায় লোক তাহার নিকট। 
লোক গিয়া দেখে ঘরে নাহি সে কপট।। 
অনঙ্গে সম্বাদ দিল পাঁরিল বুঝিতে। 
তবে তারে পাঠাইল পিসির বাটীতে।। 
সেথা তার দেখা পেয়ে ডাকিয়া আনিল। 
দেখে যুবতীর মনে মান উপজিল।। 
রাঙ্গা আঁখি রাঙ্গা দেখে করে তারে মান। 
ভবানী কহিছে তারে নাহি পরিভ্রাণ। 


|| শ্রীদেব নাগরের প্রতি অনঙ্গের মান।। 
|| ত্রিপদী।। 
ধনী কিছু নাহি বলে, জুলিতেছে ক্রোধানলে, 
কালকুট কটাক্ষ সমান। 
হানিছে নাগর প্রতি, অসহ্য সে হয় অতি, 
গুরুতর হইয়াছে মান।। 
নাগর বুঝিল মনে, মান হৈল যে কারণে, 
লোক গেল দেখা নাহি পায়। 
১৩৬ 


বাসায় না থাকি আমি, অনঙ্গ অস্তরযামি, 
ভাবিল পিসির ঘরে যায়।। 
সেথা লোক পাঠাইল, ঠিক যাহা ভেবেছিল, 
তথা দেখা পাইল আমার। 
আমি হারিয়াছি তারে, গুরুমান হতে পারে, 
গুরুতর সে হয় ইহার ।। 
দিবা নিশি থাকিবা বাসায়। 
তাহার কারণ যাহা, এক্ষণ বুঝিনু তাহা, 
আগে নাহি বুঝি অভিপ্রায়।। 
যদি কিছু ব্যক্ত করে, তবে মোর বাক্য সরে, 
নৈলে আমি কি কথা কহিব। 
করিনু যে অনুমান, তাহে যদি নহে মান, 
কথা ঢেকে পেঁচে কি পড়িব।। 
করপুটে গরুড়ের পায়। 
অনঙ্গ ফিরিয়া রহে, গোপীরে ডাকিয়া কহে, 
যেতে বল পিসির সেথায়।। 
ক্রোধে নাহি বাক্য স্ফুরে, চক্র ন্যায় চক্ষু ঘুরে, 
ক্ীণানঙ্গ দ্বিগুণ ফুলিল। 
গোপীরে কহিল ধনী, বুঝিল নাগর মণি, 
শুনে প্রাণ প্রিয়ারে কহিল ।। 
কিন্তু শুন কহি তার হেতু। 
অপরাধ বুঝে কও, তুমি সুখ নিধি হও, 
তিনি যে সুখের হন সেতু।। 
ইহাই বুয়া মনে, গিয়াছিনু দরশনে, 
শুনেছিনু তার বেয়ারাম। 
যদি না দেখিতে যাই, আপনি বলিতে ভাই, 
তুমি বড় নেমক হারাম ।। 
তুই তাহা না রাখিলি মনে। 
সেই ভয়ে গিয়েছিনু,। কেন তোমা না কহিনু, 


১৩৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংল! সাহিত্য 


অপরাধী হইনু গোপনে ।। 
যে কথা কহিল ছলে, শুনিয়া দ্বিগুণ জ্বলে, 
গুরুমান করিল অনঙ্গ। 
ভবানীচরণ ভাবে, কিসে এই মান, 
কি উপায়ে হবে মানভঙ্গ।। 


॥। শ্রীদেব কর্তৃক অনঙ্গের মানভঙগ।। 
|পয়ার।। 
মান ভাঙ্গিবার তরে শ্রীদেব নাগর। 
কাকুতি মিনতি করে হইয়া কাতর।। 
সুরসিকা তুমি আমি অরসিক মত। 
সরসে কুরস কন্্ম করিয়াছ কত।। 
পুরুষের অপরাধ ঘটে পায় পায়। 
কামিনী কুপিতা কভু নাহি হয় তায়।। 
সহস্র দোষের দোবী পুরুষ নিশ্চয়। 
কুলবততী পতি প্রতি তথাচ সদয়।। 
রমণীর এই কর্ম জগতে বিদিত। 
ইথে বুঝি মান নহে মনের সহিত ।। 
যদি কর্ম দোষে রীতি হয় বিপরীত। 
তথাচ চিহিন্ত দাসে মান অনুচিত।। 
বিমল বদন ভারি দেখে ভয়ে মরি। 
বিধু মুখে হাস্য করে ক্রোধ পরিহরি।। 
কামিনী বুঝিল মনে ঠেকিয়াছে দায়। 
পেয়েছি পতনে আজি আর কোথা যায়।। 
নানা মতে নায়িকারে নায়ক বুঝায়। 
অর্থাশী সন্ন্যাসী কভু প্রণাম না চায়।। 
চতুর নাগর তার চাতুরি বুঝিল। 
গলে ছিল মুক্তমালা পাদপন্মে দিল।। 
মালা দিয়ে দুই পায়ে ধরিয়া বসিল। 
কামিনীর রোব দিয়ে রস উপজিল।। 
নাগরে কহিল ধনী শুন প্রাণ ধন। 
এমন কুকর্ম পরে করো না কখন।। 


৯৩৮ 


শুনে কহে গিয়েছিনু হইয়া পাগল। 
আর কি তেমন করি গেলে এই ফল।। 
পায়ে ধরে আছে তারে ছাড়ে না তখন। 
কামিনী কাতরা কামে দিল আলিঙ্গন।। 
কামানলে মালানলে সুদগ্ধ শরীর। 
নাগর নিভায় দিয়ে সুশীতল নীর।। 
একই শরীর হয় নাহি মধ্যে বন্ত্র। 
লাজ পেয়ে কাম যায় লয়ে অস্ত্র শস্ত্।। 
উঠিয়া বসিল দৌহে কামে করি দূর। 
পরে জল পান করে সুজন চতুর।। 
অধিক রজনী হৈল বিদায় লইল। 
প্রবীণা পিসাস কাছে যাইয়া কহিল।। 
নবীনা প্রবীণা শুনে পরামর্শ কয়। 
এখানে আসিবা ফিরে যাবার সময়।। 
সেই পরামর্শ মত করে যাতায়াত। 
উভয় স্থানেতে যায় নাহিক উৎপাত || 
এরূপে বসন্ত খতু পালন হইল। 
তারপরে গ্রীষ্ম খতু আসি দেখা দিল।। 
ভবানীচরণ বলে অনঙ্গ যুবতী। 
বিদায়ে আকুল বড় হৈল রসবতী।। 


|| কামে কাতর হইয়া নিজগৃহে গোপী দাসী সহ শ্রীদেবের রতিক্রীড়া। 
|| ব্রিপদী।। | 
বৈকালে বৈশাখ মাস, নিবারি নিদাঘ আশ, 
সুবাতাস চাহিয়া অনঙ্গ। 
দৈব ভরে দুর্যোগ প্রসঙ্গ ।। 
ঘোর ঘটা প্রলয় সমান। 
ধুলায় তিমির চয়, ঘূর্ণবায়ু অতিশয়, 
পায় ভয় ভাবিত পরাণ।। 


১৩৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


গগনে সঘনে ঘন, করিতেছে সুগর্জন, 
সন্‌ সন্‌ ছুটিছে কাকর। 
চক্ষে পড়ে বহুধূলি, ফুটে যেন ছিটাগুলি, 
পথ ভুলি পথিক কাতর ।। 
মৃদু মৃদু বিন্দু পাত, অবিশ্রাস্ত বজ্ঞাঘাত, 
শব্দে দাত লাগয়ে কপাটি। 
হেন কালে গোপী ছিল, দিদি বলি সম্ভাষিল, 
আল্কা দিল যাও তার বাটী।। 
গোপী কহে কতগুলো, ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো, 
আছি হুলাহুলিতে কি হয়। 
নহে দুঃখি পর দুঃখে, মন্ত সদা নিজ সুখে, 
কোন্‌ মুখে কহ এ সময়।। 
যাই আমি বাঁচি মরি, ওজর নাহিক করি, 
ত্বরা করি নাগর নিকট। 
উত্তরিল নিবেদিল, সে আদরে বসাইল, 
সুধাইল আদরে সন্কট।। 
শুনি সিহরিয়া যায়, আপনার পা মোছায়, 
গা মোছায় দু হানুত তাহার। 
করে মাল্য গলে দিয়ে হার।। 
সেও ছিল ভাব রঙ্গি, গোপনে মিলিল সঙ্গি, 
করি ভঙ্গি জালে কামানল। 
টলে মজ্জা যে ছিল অটল।। 
এরূপে দিবস যায়, দুর্যোগ হইল সায়, 
ভাবনায় গোপী অন্যমন। 
কহে চল যুবরাজ, কর আপনার সাজ, 
আর ব্যাজ না সহে এখন।। 
নাগর কহিল কথা, সন্ধ্যা করি যাব তথা, 
তুমি সেথা করহ সংবাদ। 
ভবানী কহিছে দূতী, উপনীত শীঘ্র গতি, 
বেশে অতি ঘটিল প্রমাদ।। 


১৪০ 


|| দাসীর শরীরে সম্ভোগ চিহ্ু দেখিয়া তার প্রতি 
অনঙ্গের ভ্তসনাভরে দাসীর সদুভর।। 
|| ত্রিপদী।। 


নাগরের মতিমালা, গলেতে ছিল উজালা, 
এনেছিল বিস্মৃত হইয়া। 

অবিলম্বে ধনী যায়, গমন পবন প্রায়, 
হেথা দায় পোহায় ঠেকিয়া।। 

অনঙ্গ কহিছে হাসি, নাহি ছিলি অবিশ্বাসী, 
এই আসি বলি গেলি সেই। 

কি কারণে দীর্ঘবাসি, হইয়া বাঘের মাসি, 
আশা পশি দেখা দিলি এই। ৷ 

বামন হইয়া চান্দে, হাত বাড়াইলি ছান্দে, 
হেরে কাদে কত চকোরিণী। 

যার খাও যার পর, তাহাকে নিরাশ কর, 
মর মর কুল কলঙ্কিণী।। 
মাখাইল আতর চন্দন। 

এলো মেলো কেশবাস, মুখ শুষ্ক ঘনম্বাস, 
মোর গ্রাস করিলি ভক্ষণ ।। 

তখন বুঝিল অরে, হারে ভূর ভার হরে, 
নাহি ডরে কহিছে বচন। 

চোর যদি চুরি করে, সে ধন গোপনে সরে, 
কোথা চোরে দেখার ভাবন।। 

তুমি যার সে তোমার,  আনিয়াছি দ্রব্য তার, 
এই হার মোরে সম্ভাষিবে। 
সদ্য আছে পোকা পাড়াইবে।। 

ভিজে তিতে তাড়াতাড়ি, গেলেম তাহার বাড়ি, 
থান ফীড়ি বন্ত্র দিল আনি। 

সিন্দুকে সুগন্ধ মাখা, তাহাতে কাপড় রাখা, 
আছে দেখা পুবের্ব আমি জানি।। 

পাত্র মেজে রাখে হার, তাহার সাক্ষাৎ কার, 
পরিহার পরিহাস করি। 


১৪১ 


দুতীবিলাস 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কহিছে অনঙ্গে দিব, সে কহিল দেখাইব, 
প্রহারিব নিজ দণ্ড ধরি।। 

বেগে যাই রড়ারড়ি, উছট খাইয়া পড়ি, 
ভাঙ্গা কড়ি গালে কুটালাভ। 

কত রক্ত পড়িয়াছে, এখন সে চিহ্ন আছে, 
দেখি পাছে ভাব ভাবি ভাব।। 

যাতায়াত পরিশ্রমে, চুল খোলা কোন ধর্ম, 
সে ধন্ম্ম না জানিয়া আগেতে।। 

হার দিল হারাইল, নিজ হারি লুকাইল, 
হারাইল কথায় কথায়। 

কহিতেছে বিবরিয়া, রসিক শুনিল গিয়া, 
দাণ্ডাইল সিঁড়ির মাথায়। 

দুতীকা নায়িকা দৌহে, নাগর দেখিয়া মোহে, 
কহে কহে কেন ক্ষুগ্রমনা। 

ভবানী এ সুপ্রণালী, চতুরের চতুরালি, 
ভাবি কালী করিল রচনা ।। 


॥॥ অনঙ্গের প্রতি শ্রাদেবের অভিমান ।। 
|।পয়ার।। 


শ্রীদেব বসিল সেথা বিরস বদনে। 
ক্ষপ্রতা কারণ ধনী জিজ্ঞাসে সঘনে।। 
ক্ষুপ্রমনা কেন আমি শুন তবে বলি। 
দাসী অপবাদ দিয়ে কর ঢলাঢলি।। 
সকল শুনেছি আমি পিঁড়িতে থাকিয়া। 
শরীরে দিয়েছ নুন কাটিয়া কাটিয়া ।। 
তাহার জ্বালাতে মোর জ্বলিতেছে মন। 
ক্ষুপ্রমনা হৈনু আমি এই সে কারণ।। 
ধিক যাকু তোরে আমি বুঝিনু সকল। 
মরণ উচিত মোর বাঁচিয়া কি ফল।। 
নীচগামী হই আমি কেমনে কহিলে। 
এই কটু বাক্যানলে শরীর দহিলে।। 
হায় বিধি কি কহিব একি কলিকাল। 
যার আজ্ঞাবহ হই সেই দেয় গাল।। 
১৪২ 


দেখ দেখি আমি তব রূপ নিরক্ষীয়া। 
মজিলাম প্রেমে কুলে জলাঞ্জলি দিয়া।। 
তব প্রেমে বদ্ধ হয়ে তোমার আজ্জায়। 
দিবানিশি থাকি বসি কেবল বাসায়।। 
ধর্ম কর্ম সব গেল লোক লৌকিকতা। 
সবর্বদাই মনে করি তব রসিকতা ।। 
আমার থাকিত যদি নীচ অভিলাষ। 
তবে কেন হয়ে রব তব কেনা দাস।। 
শপথাদি করিয়াছি আর কত শ্রম। 
তথাচ তোমার নাহি ঘুচিল সে ভ্রম।। 
বুঝিলাম তব মন পাওয়া বড় দায়। 
সুখে থাকো মনে রেখো হইনু বিদায়।। 
করিয়া কপট ক্রোধ শ্রীদেব উঠিল। 
মনে মান হইয়াছে অনঙ্গ বুঝিল।। 
ভবানী কহিছে মান নহে অপমান। 
স্ত্রতি রতি করি দান করহ সম্মান।। 


|| অনঙ্গের বাক্য ও ব্যবহার ছারা নাগরের অভিমান পরিত্যাগ ।। 
|| ভ্রিপদী।। 

নাগরের করে ধরি, অনেক বিনয় করি, 
কহিছে অনঙ্গ প্রাণধন। 

যাহাতে হইল ক্রোধ, তুমি তার দেহ শোধ, 
তবে ক্রোধ হইবে মোচন।। 

দাসী অপবাদ দিনু। তাহে অপরাধি ছিনু, 
মোরে দিও দাস অপবাদ। 

তোমার চাকর আছে, পাঠাও আমার কাছে, 
দিয়ে তারে কোন সুসংবাদ।। 

সে হেতা আইলে পরে, আমি তারে নিয়ে ঘরে, 


সে যখন যাবে ফিরে, তুমি তারে বলো কিরে, 
এ সকল কোথা তুই পেলি। 
১৪৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


ইহা বলে তাই বলো, কেন এত গৌণ হলো, 
এখনি আসিব বলে গেলি।। 
বুঝা যাইতেছে তোর ভাবে। 
যাহা বলে দিনু তাই, কালি তুমি করো ভাই, 
তবেই এসব শোধ যাবে।। 
সুকৌশল বাক্যানলে, নাগর দ্বিগুণ জলে, 
মনে মনে বাখানে রমণী। 
অনঙ্গ দেখিল তায়, তবু নাহি ক্রোধ যায়, 
পরে স্তঁতি করিতেছে ধনী।। 
শুন হে রসিক রাজ, তোমারে না হয় লাজ, 
ক্রোধ কর নারীর কথায়। 
অধীনতা যাহার উপায়।। 
নায়ক উপরে গোষা, মান যেন আছে পোষা, 
কথায় কথায় অভিমান। 
মনে মনে মান হলে, প্রাণনাথে কটু বলে, 
আরো তারে করে অপমান ।। 
অতএব বলি প্রাণ, ..মোর বাক্যে হেয় জ্ঞান, 
করি ওহে ক্রোধ কর দূর। 
বৃথা যে যামিনী যায়, বাঁচাও অনঙ্গ দায়, 
কোপের করহ দর্প চুর।। 
শুনিয়া মধুর বোল, দুরে গেল গণগুগোল, 
শ্রীদেব ধরিল ধনী গলে। 
অনঙ্গ মনের প্রায়, পুরষাগ্নি লাগে তায়, 
নাগরের গায়ে পড়ে ঢলে।। 
তারপরে মাকামাকি, মুখামৃত চাকাচাকি, 
কষাকষি করি ধরে কামে। 
তিতিল দৌহার বন্ত্র ঘামে।। 
তথাপি না ছাড়ে কেহ, কামের কমল দেহ, 
ধরা পড়ে অনঙ্গ যুবতী । 
ধরিয়া যুবতী করে, কহিছে নাগর বরে, 


১৪৪ 


মৃদুব্বরে করিয়া মিনতি ।। 

তুষ্ট হেতু করি রতি দান। 
নাগর পাইল দান, দূরে গেল অপমান, 

নারী দানে করিল সম্মান।। 
ভবাণীচরণ মনে, করি কহে দুই জনে, 

উঠ উঠ কেন হেন সাজ। 

আর নাহি কর হেন কায।। 


|| বন্ু সুখখভোগ পরবে অনঙ্গের গর্ভ হয়।। 
।।পয়ার।। 


প্রভাতে নাগর গেল আপনার স্থানে। 
শ্নানাদি করিয়া নিদ্রা যায় দিনমানে।। 
সন্ধ্যার পরেতে যায় অনঙ্গ আলয়। 
প্রভাত হইলে আইসে আপন বাসায়।। 
এইরূপে গ্রীষ্ম খতু হইল সমাপন। 
আইল বরিষা খতু ঘন বরিষণ।। 
বরিষণে কত সুখ নাহি নিরূপণ। 
পরেতে শরদ খতু করে আগমন।। 
সুখেতে সম্ভোগ করে শরদ সময়। 
অন্বিকা অচ্চনকালে করে বহু ব্যয়।। 
শিশির সময়ে ভাসে সুখের সাগরে। 
শরীর শুখায়ে দেয় হিম খতু বরে।। 
এই মত বহু কাল হইয়া যুবতী। 

মহা সুখে কাটে কাল সুখী হৈল অতি।। 
বুদিন পরে তবে অনঙ্গ যুবতী। 
শ্রীদেব প্রসাদে ধনী হৈল গর্ভবতী ।। 
অনঙ্গের গর্ভ সবে করে অনুমান। 
বর্ণনে নাহিক ফল সবর্বত্র সমান।। 
ক্রমে চারি মাস গর্ভে অনেকে জানিল। 
পঞ্চমে নিশ্চয় হয় ভবানী রচিল।। 


১৪৫ 


দুত্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


| অনঙ্গ মঞ্জরী পুত্রবতী হয়- শ্রীদেবের ধনক্ষয়।।- 
|।পয়ার।। 

পাঁচমাস গর্ভবতী অনঙ্গ মঞ্জরী। 
পরে পঞ্চামৃত দেয় বড় ঘটা করি।। 
নবম মাসেতে সাধে করে ততোধিক। 
পুত্র হৈল দশমে শ্রীদেব রূপ ঠিক।। 
ধাত্র্যাদি নাপিত আর বাদ্যকর যত। 
গোপনে নাগর সবে টাকা দিল কত।। 
সৃতিকা যষ্ঠ্যাদি পুজী আছে যে নিয়ম। 
যাতে ব্যয় হয় দেয় না ভাবে বিষম।। 
কর্তাটি করেন সাধ নাচ করাইতে। 
তাহারো খরচ হৈল শ্রীদেবেরে দিতে।। 
শুভান্নপ্রাশনে বহু ব্যয়ে করাইল। 
এইরূপ বর্ধাবধি কতই করিল।। 
পুনরায় গর্ভবতী হয় রসবতী। 
মোহানা খুলিলে রাখে কাহার শকতি|। 
ক্রমে ক্রমে তিন পুত্র হইল তাহার। 
অনঙ্গ পতির হয় আনন্দ অপার।। 
নিজার্থ সামর্থ তার কিছু নাহি যায়। 
ভবানী কহিছে আরো পুত্র কোলে পায়।। 


|| অনঙ্গমঞ্রী সহ শ্রীদেবের অতি সাধের শ্রীতি এককালে বিচ্ছেদ।। 
|পয়ার || 


বালকের অলঙ্কার আর রসিকার। 
দিয়াছে শ্রীদেব তবু নাহিক নিস্তার।। 
পূজার সময় এক গহনা নুতন। 
মাসে এক জোড়া সাড়ী টাকার বুনন।। 
দ্বাীরী আর যত দাস দাসীর বেতন। 
অকাতরে এ সকল দিতেছে ভাজন।। 
সকল হইল ব্যয় সঞ্চয় যে ছিল। 
কাঙ্গাল ভাবিবে ভয়ে তালুক বেচিল।। 
যত ধন থাকে যদি আয় নাহি হয়। 
নিরস্তর ব্যয় হয়ে কত দিন রয়।। 


১৪৬ 


তাহার হইল শেষ নাহি কিছু 'আশ। 
তথাচ অনঙ্গ কাছে না করে প্রকাশ ।। 
একদিন অনঙ্গ সে বিরলে বসিয়া। 
শ্রীদেবে কহিছে কিছু বিনয় করিয়া।। 
জড়াও বাউটী আমি এক জোড়া চাহি। 
নাগর শুনিয়া মনে করে ত্রাহি ত্রাহি।। 
শুনিয়া কহিল তার লক্ষ টাকা দর। 
ধনী বলে ইহা দিতে হলে কি কাতর।। 
যদি তুমি এই ক্ষুদ্র কথা" না রাখিবা। 
তবে কি আমার পরকালে সাক্ষি দিবা ।। 
শুনেছিনু বড় লোক বড় জাকজৌক। 
হইল বিস্তর লাভ পেনু রোক থোক।। 
কুলবতী সাথে প্রেম কর বড় দায়। 
তখনি তা দিতে হয় যখন যা চায়।। 
কেন বল দেখি থাকি তোমার সহিত। 
নিজপতি আছে তাপে করিয়া বাঞ্চিত।। 
তুমি যদি অদ্যাবধি আশা ছাড় মোর । 
তবে স্বামী কাছে বলি কত করি জোর।। 
অতএব স্পষ্ট কথা শুন বলি ভাই। 
তোমার আসার হেথা লাভ কিছু নাই।। 
এতদিনে বুঝিলাম তুমি লোক শক্ত। 
টাকা তব ইঞ্টদেব তুমি তার ভক্ত! । 
অনেক দিনের প্রীতি তোমার সহিতে। 
কি কব তোমারে আর পারি না রাখিতে ।। 
তুমি অন্য চেষ্টা কর বুড়ি হৈনু আমি। 
অমনি তোমার সহ থাকু রামরামি।। 
শ্রীদেব শুনিয়া ঘন ছাড়য়ে নিশ্বাস। 
ভবানী কহিছে প্রেমে একি সবর্বনাশ।। 


॥। শ্রীতিরক্ষা হেতু অনঙ্গের প্রতি শ্রীদেবের কাতর উক্তি।। 
।।পয়ার || 
এমত নিষ্ঠুর বাক্য কেমনে কহিলে। 
এত প্রেম করে পরে সকলি ভুলিলে।। 
কি হবে আমারে প্রাণ মরি প্রাণ যায়। 
১৪৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ওষ্ঠাগত হল প্রাণ নিষ্ঠুর কথায়।। 
তুমি যদি ছাড় মোরে বল কি করিব। 
পরাণে মরিব কিম্বা সন্ন্যাসী হইব।। 
তোমার লাগিয়া আমি সংসার না করি। 
ধর্ম কর্ম ধ্যান জ্ঞান অনঙ্গমঞ্জরী। 
প্রেমের আধার আমি সঁপেছিনু প্রাণ। 
আধার না-ধার হবে নাহি ছিল জ্ঞান।। 
আমারে কহিলে যেতে অন্য নারী কাছে। 
তোমা ছেড়ে কোথা যাব কে আমার আছে।। 
চাতক জলদ জল করে থাকে পান। 
অন্য বারি না সায় যদি যায় প্রাণ।। 
যাব এ দেহে মোর প্রাণ করে নাশ। 
হেরিব তোমার রূপ অন্য নাহি আশ।। 
রোপিয়াছি প্রেমতরু পাব ফল ফুল। 
ভাট হেতু হয় বুঝি সমূলে নির্মূল 1! 
যদি ত্যাগ কর তবে বিচ্ছেদ দহন। 
আসি মোর দহিবেক শরীর ভবন।। 
শরীর ভবন মধ্যে তুমি আছ প্রাণ। 
তোমারে লাগিবে স্তাপ করি হেন জ্ঞান।। 
অতএব ভাবি আমি এই বড় খেদ। 
নতুবা নাহিক ভয় হইলে বিচ্ছেদ।। 
তোমা ছাড়ি শরীরেতে কোন্‌ প্রয়োজন। 
তোমার বিচ্ছেদ হলে ত্যজিব জীবন।। 
যদ্যপি জীবন থাকে এ পাপ শরীরে। 
কিন্তু ক্ষিপ্ত হয়ে কব মরিরে মরিরে।। 
স্মরণ হইবে সদা তব রূপ গুণ। 

সে সময়ে হবে গুণ কাটা ঘায়ে নুন।। 
তোমার বিচ্ছেদ হলে হইবে এমন। 
সুতরাং হবে মোর জীয়স্তে মরণ।। 
এইরূপ বহু খেদ নাগর করিল। 

অনঙ্গ ভাবিয়া পরে তাহারে কহিল ।। 
আজি তো বিদায় হয়ে চেষ্টা কর গিয়া। 
সম্বাদ লইব আমি দাসী পাঠাইয়া।। 


১৪৮ 


জড়াও বাউটা মোর আবশ্যক আছে। 
সেই হেতু এত করে বলি তব কাছে।। 
ইহা দিতে যদি শক্তি না হয় তোমার। 
আমিও পাইব চেষ্টা উপায় তাহার ।। 
শুনে হাতে পায়ে ধরে বিস্তর কান্দিয়া। 
নাগর বিদায় হয় মিনতি করিয়া।। 
শ্ীদেব চলিয়া গেল গোপীরে ভাকিল। 
দরয়ানে মানা কর তাহারে বলিল ।। 
পরদিন নিরূপিত সময়ে আইল। 
যেতে নাহি পারে দ্বারে দ্বারিয়া কহিল।। 
বাসায় আসিয়া পরে করে বহু খেদ। 
হায় হায় একি দায় পিরীত বিচ্ছেদ ।। 
বহু খেদ করে ভাবে সকলি অসার। 
কেন মরি কার তরে হয় কেবা কার।। 
চন্দ্রিকা আকর দ্বিজ ভবানীচরণ। 
খেদে আরম্তিল তার বিলাপ বর্ণন।। 


॥| অনঙ্গমঞ্জরীর বিচ্ছেদে শ্রীদেবের বিলাপ।। 
|।পয়ার || 

জননী জঠরে জন্ম করিয়া গ্রহণ। 
করিলাম চিরকাল অনিত্য সাধন ।। 
গৃহী হয়ে গৃহে থাকি না করি বিবাহ। 
গৃহস্থের মত কর্ম না হলো নিবর্বাহ।। 
ওরসে জন্মিল পুত্র বংশ না রহিল। 
আপনার পিতৃ পি্ড আশা না থাকিল।। 
আমার সমান আর নাহি. বুদ্ধিহীন। 
সংসারী নাহিক আমি নহি উদাসীন।। 


কম্মফলে কপালেতে বিধির লিখন। 
এই ছিল করিব কি নীচের সেবন।। 
দেখিয়া সামান্যা এক জঘন্যা যুবতী । 
তখনি পাপিষ্ঠ মনে হৈল ইচ্ছা রতি।। 


১৪৪) 


দুষ্প্রাপ্য বাংল! সাহিতা 


প্রথমে মালিনী পরে মতি নাপিতিনী। 
উড়েনী বৈঝুবী আর দাসী সঞ্চারিনী।। 
এ সব সামান্য নারী করি উপাসনা। 
পরে পুর্ণ হয়ে ছিল অধম বাসনা ।। 
সে বাসনা পূরণ হেতু যত ছিল ধন। 
পাপীয়সী মিলে জুলে করিল হরণ।। 
অবশেষে করিলাম তালুক বিক্রয় । 
তথাপি দুরাশা মনে নিবর্ত না হয়।। 
অধমা নায়িকা কাছে হয়ে আজ্ঞাকারী। 
নানা স্থানে হই আমি নানা বেশ ধারী।। 
প্রথমেতে আখড়ায় বৈষঝুবের বেশে। 
পরে দাসী বেশ ধরি নারীর আদেশে ।। 
ভূদেব ব্রান্মাণ আর সন্যাসীর বেশ। 
ধরিলাম তাতে পাপ হইল অশেষ ।। 
এইরূপে রঙ্গরস করে নিশিদিন। 
পাতক করিয়া কায় করিলাম ক্ষীণ। | 
ব্রা্মাণ বৈষ্ব জাতি জ্ঞাতি বন্ধুগণ। 
সকলি অন্যথা হল পাপে মগ্ন মন।। 
যখন তাবৎ ধন হৈল তার হাত। 
পরগোছে গাছ সেখ..-করি যাতায়াত।। 
শুনিল কি বুঝিল আমার কিছু নাই। 
তখন চড়াও বাউটী কহে আমি চাই ।। 
ল্ক্ষ টাকা মূল্য তার কোথায় পাইব। 
কোথা হতে আনি ধন তাহারে তুষিব।। 
আমার সঙ্গতি নাই বিশেষ বুঝিল। 
পর দিন দ্বারে দ্বারী ছেড়ে নাহি দিল।। 
অতএব বলি মন তুমি দুরাচার। 
এমন কুকর্ম্মে মতি করোনাক আর ।। 
এখনো সুপথে চল ধর্মে কর আশ। 
ছাড়িয়া নগর ধন্মপুরে কর বাস।। 
সে তো মহা সুখ ধাম অপুবর্ব কানন। 
পরম সন্তোষ হবে দেখে সেই বন।। 
ভবানীচরণ দ্বিজ বন্দ্যো উপাধ্যায়। 
রচিবেন জ্ঞানোদয় শেষের অধ্যায় ।। 


৯৫০ 


(॥ শেব অধ্যায় ।॥ 


|| শ্রীদেব জ্ঞানোদয়ে বনবাস।। 
1 পয়ার || 

মন রে চাতক তুমি পিপাসিত হয়ে। 
নীচ আশে গিয়ে গেলে একে কালে বয়ে।। 
যুবতী যৌবন জলে পিপাসা ভাঙ্গিলে। 
নবজলধর রূপ শ্ীনাথে ভূলিলে।। 
তুই বয়ে গেলি তাহে নাহি বড় শোক। 
কিস্ত কুলে কুষশ করিবে কত লোক ।। 
তোর আর কুলে থাকা অতি অনুচিত। 
বাহির হইয়া বনে যাওয়াই বিহিত।। 
যেহেতু সবর্বদা সুখ তোমার প্রয়াস। 
বনে অত সুখ তাহা করহ. নির্ধাস। | 
বনেতে কামিনী রূপ কালে না ধরিবে। 
বিষয় বাসনা কাছে যেতে না হইবে।। 
যদি কাম কোন মতে ভয় দিতে যায়। 
উড়ে গিয়ে বৈস তুমি শ্রীনাথের পায়।। 
সেই পদ কালাত্তক কালের বিপদ। 
দীন হীন ক্ষীণ বনবাস সম্পদ ।। 
তাহাতে বিবিধ সুখ অনায়াসে পাবে। 
সবি সুখ পাবে দুঃখ সব দূরে যাবে।। 
যাহা চাবে তাহা পাবে বিপিনে বসিয়া । 
চিস্তামণি চিস্তাকর দিবেন আনিয়া।। 
জগত নিবাসি বনবাসিদের তরে। 
নানা দ্রব্য রেখেছেন বনের ভিতরে ।। 
পিপাসা বারণ হেতু আছে নদীজল। 
ক্ষুধার নিমিত্ত আছে নানাবিধ ফল ।। 
বসনে বাসনা হলে বাকল পরিবে। 
নিদ্রা পেলে ধরাতলে শয়ন করিবে।। 
পুত্রভাবে মৃগগণে করিবে পালন। 
অনায়াসে হবে আশা বায়ু নিবারণ।। 
বনে বহুবিধ পক্ষী আছে বাসা করি। 


১৫১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তাহারা হইবে মিত্র তোমার প্রহরী ।। 
বিপিনে বিহার করি কর সুখ ভোগ। 
শোক তাপ দূরে যাবে দূরে যাবে রোগ।। 
এইরূপে আপনার মনঃ প্রবোধিয়ে। 

. বিপিনে গমন করে নগর ছাড়িয়ে।। 
ছাড়িয়া সংসার সুখ সব অভিলাস। 
ধর্মপুর নামে বনে করিল নিবাস।। 
ভবানীচরণ রচিল গ্রন্থ সকলি স্বরূপ । 
বুঝিল হইবে উপদেশের স্বরাপ।। 


ইতি দুতীবিলাস সমাপ্ত।। 


১৫৯ 


জ।হহিঃ । 


শরণৎ 


কিকুতৃহলনামক গ্রন্থ ॥ 
অর্থাৎ 
বর্তমান কলিবুগের পারস্তারধি অদাপর্ষান্থ 
[ €লকসকজের যেরূপ আচার বাবহার হইয়াছে 
তাহা সংশো।ধনাথ পত্রিহাসচ্ছহলে 
আকুবাদপুরংসহ 
ওমুক্ত গ্রীনারায়ণ চউনাজ ওণ(নখিকর্ঁক 


শদলিদে) হটিছ হইল । 


নক ৭ সাল 6 


৯৮৫৩ 
কলিকুতৃহল প্রথম সংকরণের আখ্যা পত্র 


কলিকুতৃহল 
নারায়ণ চট্টরাজ 


আখ্যাপত্রে প্রাপ্ত বিবরণ 
শ্রী শ্রী হরিঃ 
শরণং 
কলিকুতুহল নামক গ্রন্থ 
অর্থাৎ বর্তমান কলিযুগের প্রারস্তাবধি অদ্যপর্যস্ত 
লোকসকলের যেরূপ আচার ব্যবহার হইয়াছে 
তাহা সংশোধনার্থ পরিহাসচ্ছলে 
শ্রীযুক্ত শ্রী নারায়ণ চট্টরাজ গুণনিধি কর্তৃক গদ্যেপদ্যে রচিত হইল 
সন ১২৬০ সাল। 


জীত্রীব্রজগোপালো 
জয়তি। 


" অথবন্দনা। 
|ত্রিপদী। | 
শ্রীব্রজগোপাল তব পায়। 
তুমি সকলের হেতু, ধর্ম্মরক্ষা মূলসেতু 
অধান্মিক ধূমকেতু প্রায়।। 
তৃদচিস্ত্য শক্তি বল, কত কে জানে কৌশল 
অটল নিয়মে যার দ্বারে। 
ক্ষিতি আদি পঞ্চভৃত, ক্রমেতে হয়ে সম্ভূত 
শক্তিযুত হয়েছে সংসারে ।। 
অগম্য তোমার তত্ব, হইয়া বিষয়ে মত্ত 
তত্ব করি কে কোথা পেয়েছে। 
লভিতে তোমারে যত, আগম নিগম কত 
উচ্চ নীচ পথেতে ধেয়েছে।। 
বিটপির বীজ যাহা, অঙ্কুরিত হৈল তাহা 
কে বা কোথা পায় দেখিবারে। 
বিশ্ববীজরূপ তুমি, আকাশ পাতাল ভূমি 
ব্যক্ত হইয়াছে তব দ্বারে।। 
কারণের গুণচয়, কার্য্যেতে প্রকাশ রয় 


৯৫৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


দেখিয়াছি চাহিয়া সংসার। 
অতএব আত্মারূপে,  প্রবেশিয়া দেহকৃুপে 
প্রকাশ রয়েছে অনিবার।। 
তব-কৃপা হয় যারে, সেই সে জানিতে পারে 
তোমার মহিমা অবিকল। 
আমি মূঢ় অতি দীন, ভজন সাধনহীন 
তবে কিসে জানিব সকল ।। 
তুমি কালরূপী হয়ে, ব্যাপ্ত থাকি বিশ্বচয়ে 
অবিরত কর নিয়মন। 
তুমি সবর্ববস্তর কারণ।। 
তব নিয়মন দ্বারে, ভ্রমিতেছে এ সংসারে 
সত্ত্ব রজস্তমোগুণচয়। 
তাহে সত্য ব্রেতা আর, দাপর কলি দুষ্পার 
প্রবর্তিত যুগ চতুষ্টয়।। 
তার মধ্যে সুবিশাল, ভয়ানক কলিকাল 
সমাগত হইয়েছে জগতে। 
তমোবৃদ্ধিহেতু লোক, দ্বেষ দম্ভ ভয় শোক 
ভোগ করিতেছে নানা মতে।। 
কুকর্ম্মেতে সদা সন্তি, "করে তেজে তব ভক্তি 
মন হইয়াছে মোহাকুল। 
নিজগুণে কৃপা করি, যদি রক্ষা কর হরি 
তবে পদাশ্রিত পায় কুল।। 
বিবিধ পুস্ভকচয়, প্রকাশে সরসাশয় 
জ্ঞানোদয় হয় যার দ্বারে। 
সুবিপুল করেন সংসারে।। 
অতএব মম প্রতি, করিলেন অনুমতি 
বিরচিতে কলিকুতৃহল। 
যাহাতে কৌতুকলেশ, ব্যাজে বু উপদেশ 
প্রকাশ রহিয়াছে অবিকল।। 
, শগৌড়দেশে বিদ্যমান, খ্যাত গ্রাম বহড়ান 
মনোহরসাহি সুপ্রদেশ। 


১৫৬ 


শুণনিধি বিদিত সমাজ।। 


্রস্থারস্তে শ্রীমন্মহারাজা পরীক্ষিতের যশোবর্ণনা। 
| ত্রিপদী।। 
পাণ্ডুকুল প্রভাকর, হস্তিনার অধীশ্বর 
টার রত ভাতে 
সুশিক্ষিত নৃপগুণগণে।। 
যার কীর্তি সুধাকর, ব্যাপি বিশ্ব চরাচর 
রত্মাগুবিবর পরকাশে। 
তা যার গুণ গানে সুখে ভাসে।। 
ভুজগ যুবতীগণ যত। 
যাঁর গুণ করি গান, আর নিমগ্রমান 
নাগগণে তোষে অবিরত।। 
বীর্য্যে কার্তবীর্যোপম, শৌর্য্যেতে অর 
যুদ্ধে দাশরথি যেন, _ক্রুদ্ধে রিপুকাল হেন 
শুদ্ধে গঙ্গাসলিল সমান।। 
দানে শিবিরাজ প্রায়, মানে দুর্য্োধন তায় 
জ্ঞানে রাজা জনকসোসর। 
প্রক্রমে প্রভাতজলধর।। 
যার ভুজদগুস্থিত, কোদগুধবনিত্রাসিত 
প্রচণ্ড শাত্রব সৈন্যচয়। 
লয়ে প্রাণ সতত সংশয়।। 
১৫৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


মহামান্য মহীতলে, ধন্য ধন্য সবে বলে 
গণ্য পুণ্য গীবর্ধাণ নিলয়ে। 
যার গুণ ভাগবতে, বিস্তারিত বিধি মতে 
আমি কি বর্ণিব মুঢ় হয়ে।। 
যে রাজার রাজ্যকালে, জলদে বর্ষিতকালে 
অকালে না মরিত মানব। 
ধর্মে রত ছিল লোক, নাহি ছিল কোনো শোক 
দাস্তভভাবে আছিল দানব ।। 
সুর খাবি বিপ্রগণ, সুখে ছিল সর্বক্ষণ 
দস্যুজন না ছিল ভুবনে। 
আপনার বাহুবলে, সসাগর ভূমগ্ুলে 
শাসন করিল অযতনে।। 
নৃপগণ যুড়ি কর, যারে সমর্পিত কর 
কেহ আজ্ঞা নারিত লঙ্ঘিতে। 
যার যশে সবিশেষ, পরিপূর্ণ সব দেশ 
রাজাগণ গাইত সঙ্গীতে ।। 
এরূপ প্রভাববান, ভাবে ইন্দ্র সমভান 
পুণ্যবান রাজাধিরাজন। 
বিষুও্রাত অন্য নামে, খ্যাত এই তিন ধামে 
কহিতেছে এ শ্ররীনারায়ণ।। 


অথ মুনিগণের নিকট রাজার প্রশ্ন । 
|।পয়ার || 


একদিন নৃপমণি নিজ নিকেতনে। 
বসিয়া আছেন রত্বময় সিংহাসনে ।। 
পাত্র মিত্র বন্ধু পুরোহিত ভূত্যগণ। 
মুনি খষিসমূহে সেবিত সর্বক্ষণ! 
পুরট সুন্দর-দ্যুতি অতি শোভমান। 
সুর সিদ্ধগণে বৃত যেন মরুদ্যান।। 
শিরে শোভে শ্বেত আতপত্র মনোহর । 
পুর্ণচন্দ্র উদয়েতে যেমন অন্বর।। 
যাহা দেখি অন্য নৃপছত্র শতদল। 
তখনি অমনি হয় আপনি কুটল।। 


৯৫৮ 


ধবল চামর যুগ্ম মুহুরান্দোলয়।' 
সুমের শিখরে যেন চরে হংসন্বয়।। 
স্তুতি বন্দিগণে ঘন করে স্তুতিপাঠ। 
সম্মুখে সুশ্পোক গান করিতেছে ভাট ।। 
কালাস্তকালের প্রায় যত বীরগণ। 
নিকটে নৃপতি আজ্ঞা করে প্রতীক্ষণ।। 
নানাদিগ্‌ দেশ হৈতে রাজাগণ আসি। 
পুরস্কার করে নৃপে দিয়া রতুরাশি।। 
হয়েছে তখন কলিষুগ সমাগত। 
প্রজার আচার ক্রমে করেছে ব্যাহত।। 
তাহে নানা বাদ প্রতিবাদে যুক্ত জন। 
নিজ অভিযোগ নৃপে করে বিজ্ঞাপন ।। 
ন্পমণি জানি সেসবার সেই রীত। 
ভাবেন কি জন্যে হেন হেরি বিপরীত।। 
মম রাজ্যে প্রজাগণ ছিল ধর্মে রত। 
অকস্মাৎ কেন এবে দেখি অন্যমত।। 
আমাতেও নাহি কোন দোষের সঞ্চার। 
তবে কি কারণে হেরি হেন ব্যবহার ।। 
বিহিত অঞ্জলি পুটে করিয়া বিনতি। 
খষিগণে জিজ্ঞাসা করেন নরপতি।। 
ঝষিগণ আপনারা সবে বিচক্ষণ। 
জানেন ভবিষ্য ভূত আদি বিবরণ। । 
এই দেখ পৃথিবীর যত প্রজাচয়। 
আছিল সকলে প্রায় সুনির্মলাশয়।। 
ক্রমে সে সবার মন পাইল বিকৃতি। 
অন্যায় বিবাদে কেন দেখি ভিন্ন রীতি।। 
দ্বিজগণ পুকর্ষমতে স্বধর্ম আচার। 
কবিতি তাদৃশ শ্রদ্ধা না করে প্রচার।। 
রাজন্য দাক্ষিণ্য ভাব তেজেছে রণেতে। 
বৈশ্য শস্যজীবী হয়ে কাতর ধনেতে।। 
শুদ্রে নাহি করে যেন ছ্বিজ শুশ্রাষণ। 
কালেতে না বৃষ্টি করে জলধরগণ।। 
সর্পির সৌরভ নাহি দেখি পৃবর্বমত। 


১৫৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


গোব্রান্মণগণে দুঃখী হেরি অবিরত ।। 
কামী লোভী কপটী হয়েছে বছজন। 
কামিনী না করে কেন স্বপতি সেবন।। 
ক্ষুধায় তৃষ্তায় লোক কি জন্যে পীড়িত। 
বিবেচনা তেজে কেন সবে হিতাহিত। । 
শুনেছি রাজার পাপে রাজ্য পায় নাশ। 
আমাতেও নাহি কোন দোষের প্রকাশ ।। 
দেব দ্বিজ গুরু বৃত্তি কখন না হরি। 
অদণ্ড্েতে দণ্ড কদাচিৎ নাহি ধরি।। 
পরধন পরদারাপ্রতি নাহি লোভ । 
অন্যায় বিচারে চিত্ত সদা পায় ক্ষোভ।। 
অশাসন নাহি মোর রাজ্যে লব লেশ। 
তবে কেন হৈল তাহে অধর্ম্ম প্রবেশ ।। 
কহ কহ খধষিগণ তার বিবরণ। 
মার্জিত হউক মম মনের অঞ্জন ।। 
তোমা সব বিনা ইহা সকল বিস্তার। 
কহিয়া সাস্তনা করে হেন নাহি আর।। 
অতএব কহি সবে সেসব কারণ। 
আমার মনের শুল্দ করহ বারণ ।। 


অথ মুনিদিগের মুখে রাজার কলিবৃতাক্ত শ্রবণ। 
1 পয়ার। | 


ন্পবাক্য শুনিয়া কহেন মুনিগণ। 

কেন রাজা কর নিজ দোষসভ্ভাবন।। 
পাণ্ডুকুল চুড়ামণি তুমি হে নরেশ। 
তোমাতে কি হয় কভু দোষের প্রবেশ ।। 
পদ্মরাগ আকরে কি জন্মে কাঁচমণি। 
কমলে গরল্‌ কোথা সম্ভবে না শুনি।। 
বিশেষে বিন্যস্ত তব মন কৃষ্ণপদে। ২. 
তবে কিসে স্পর্শিবে কলুষ মহাপদো। 
সূর্যে কি স্পর্শিতে পারে নিশা-অন্ধক্লন। 
পারদে কি হয় কভু ধুলির সঞ্চার ।। 
ভারতে আগত হইয়াছে ঘোর কলি। 

১৬০ 


সেই হয় অশেষ কলুষবৃক্ষ কলি।। 
তাহাতে বিকৃত হইয়াছে লোকচিত। 
করিয়াছে সেই সবর্ব ভাব বিপরীত || 
এই কলিষুগে রাজা সব প্রজাগণ। 
ক্রমশঃ হইবে নানা অধর্্ম ভাজন।। 
মোহ নিদ্রা বিষাদ দৈন্যেতে লোক সব। 
শোক দুঃখ সম্ভাপে পাইবে পরাভব।। 
দয়াশুন্য দূরাচার দাভিক দুর্জন। 

ক্ষুধা তৃষ্তা ভয়োদ্বেগে হইবে মগন।। 
ক্ুদ্রদৃষ্টি বিস্তহীন কামী ক্রিয়াহত। 
নানা দুঃখভাগী হবে দৌর্ভাগ্যবশতঃ || 
বিপ্রগণ বেদপথ তেজি অনাপদে। 
বিহরিবে শিশ্সোদর ভরণ আমোদে।। 
না করিবে বিধিমত ধর্ম-আচরণ। 
শূদ্রসেবী হইবে কলিতে দ্বিজগণ।। 
মদ্য মাংস লোভে কেহ কেহ বামপথে। 
প্রবিষ্ট হইবে তন্ত্রবর্জ অভিমতে।। 
পাষণ্ড ধর্মেতে সবে হয়ে অনুকূল। 
সনাতন বেদশাখি নাশিবে সমূল॥। 
দস্তে শুদ্র অধ্যয়ন করিবেক বেদ। 
্রহ্গাজ্ঞানী হইবেক অজাতনিকের্দি।। 
রাজন্য জঘন্যবৃত্তি অবলম্ব করি। 
কলিতে শূৃদ্বের হবে যুদ্ধে ভরি।। 
বৈশ্য কুটবাণিজ্য করিবে আচরণ । 
গব্য লাক্ষা লবণ বেচিবে বিপ্রগণ।। 
তপস্বির বেশ উপজীবী শুদ্র হবে। 
নিজে অধাম্মিক কিস্ত অন্যে ধর্ম কবে।। 
নিজে শুদ্ধ মানি দ্বিজে তেজিবে আদর । 
আপনি হইবে দান প্রতিগ্রহ পর।। 
সেই ধন্য কলিতে যাহার রবে ধন। 
ধনির আচার গুণ পূজিবেক জন।। 
ধর্ম ন্যায় ব্যবস্থাতে হেতুমাত্র বল। 
দাম্পত্যেতে অভিরুচি কারণ কেবল।। 


৯৬১ 


দুশ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আশ্রমের চিহ ব্যবহারমাত্র হবে। 
বিপ্রের বিপ্রতা শুদ্ধ যজ্ঞ সূত্রে রবে।। 
যে জন বাচাল বড় সে হবে পণ্ডিত। 
সেই সে হইবে সাধু দভে যে মণ্ডিত।। 
শ্নানমাত্র হইবেক অঙ্গপ্রসাধন। 
লাবণ্যে কেবল কেশ করিবে ধারণ।। 
দূরে বারি আনয়ন তীর্থ যাত্রা হবে। 
উদর ভরণমাত্রে স্বার্থ জ্ঞান রবে।। 
কুটুন্ধ পালনমাত্র ক্ষমতার সীমা। 
সত্যেতে কেবল ধাফ্গ্য ধনেতে গরিমা।। 
পতি জায়া-প্রীতিহেতু রতিনিপুণতা। 
বিস্তব্যয় বিহীনের ন্যায়ে দুর্বলতা || 
পুরুষসকল হবে রমণীর বশ। 

তাদিগে ভূষণদান মানিবে সুযুশঃ || 
নির্ধন পতিরে ত্যাগ করিবে কামিনী। 
পরনিন্দা রত লোক দিবস যামিনী।। 
অকারণে কলহ করিবে বন্ধুসনে। 
কলিতে কাকিনী জন্যে মরিবে জীবনে ।। 
পিতা মাতা সেবা সবে দূরেতে তেজিবে। 
সুরত সম্বন্ষিগণ বীন্ধব হইবে।। 
কলিতে তেজিবে দেব-প্রতিমা পুজন। 
অতিথি শুশ্রাধা নাহি করিবেক জন।। 
গৃহে গৃহে কুলটা হইবে কলিফলে। 
যার উপাভ্জনজীবী হইবে সকলে ।। 
সুরত হইবে পরমার্থের সাধন। 
পাষণ্ডে করিবে বেদপথ বিনিন্দন।। 
পশু পিশাচের সম করিবে আচার । 
স্বজাতি বিজাতি কিছু নারবে বিচার ।। 
তাহে রাজাগণ সব হবে লেচ্ছপ্রায়। 
গো-বিপ্রদেবতাত্রোহী যারা সমুদায়।। 
ছলে বলে পরধন করিবে হরণ। 
করপীড়া ভয়ে প্রজা প্রবেশিবে বন।। 
আহার বিহার বাস ভূষণ ভাষণ। 


১৬ 


লেচ্ছপ্রায় সকলে করিবে আচরণ ।। 
শুক্ষ তর্ক হেতুবাদে বেদবর্্ব ছাড়ি। 
হইবে উৎপথগামী এই বর্ণচারি।। 
এইরূপ অধন্মে মজিবে সব দেশ! 
রোগ শোক অভিভবে পাই বহু ক্রেশ।। 
কত না কহিব আর বিস্তার বর্ণন। 
লিখিতে কম্পিত যাহা এ শ্রীনারায়ণ ।। 


অথথ কলিনিগ্রহার্থ রাজার দিখিজয়োদ্যম। 
| পয়ার || 


এইরূপ সুনিবাক্য শুনিতে শুনিতে। 
হইল দুর্জয় ব্রেশধ নৃপতির চিতে।। 
প্রভাত তপন হেন যুগল নয়ন। 

দশনে সঘন দংশে রদন ছদন।। 

ভ্রুকুটী ভ্রুভঙ্গে অঙ্গ হইল কম্পিত। 
করেতে কান্ম্ক লয়ে করেন লুম্ফিত।। 
কহিছেন খধিগণে স্ফুরিত অধর। 

কহ কোথা আছে এবে সে মুড পামর।। . 
কেমন আকৃতি তার কোন স্থানে থাকে। 
পাইলে উচিত শাস্তি দিব আমি তাকে ।। 
ধক ধিক ধিক মম থাকিতে জীবন। 
আমার রাজ্যেতে কলি করে আক্রমণ ।। 
বৃথা মোর পাগুবের কুলেতে জনম। 
বৃথা আমি ধরিয়াছি রাজন্যবিত্রম || 
যদি আমি তারে দণ্ড করিতে না পারি। 
ধরাতে কেমনে তবে হব দশুধারী।। 
মুনিগণ কন নৃপ শুন বিবরণ । 
প্রত্যক্ষেতে হওয়া ভার তাহার দর্শন।। 
নৃপদেহ অবলম্ব করিয়া সে থাকে। 
কিস্ত কভু স্পর্শিতে না পারয়ে তোমাকে ।। 
তুমি হও ধার্মিকি সুশীল শাস্তমতি। 
তোমার শরীরে তার না হয় বসতি।। 
মহারাজ যদি তারে করিবে দমন। 


১৬৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


দিথিজয় করি নিজ স্থাপন শাসন।। 
যাহে কেহ অধর্ম্েতে না করে প্রবেশ। 
হেন অনুমতি দিয়া উদ্ধারহ দেশ।। 
ভাল বলি ভূপতি ভাষেন ভূত্যগণে। 
অদ্যই যাইব আমি দুষ্টের দমনে ।। 
সেনাগণ সাজিতে করহ অনুমতি । 
রথ সঙ্জী করি শীঘ্র আনুক সারথি।। 
অশ্ব গজ পদাতিপ্রভৃতি সৈন্যচয়। 
সত্বরে সাজুক সবে বিলম্ব না সয়।। 
রাজআজ্ঞা পেয়ে দূত চলিল ধাইয়া। 
সেনাপতিগণেরে সম্বাদ কহে গিয়া।। 
সারথিরে সাজিতে করিল অনুমতি । 
সাজায় স্যন্দন সেহ সুশোভিত অতি।। 
রণভেরি বাজিল সাজিল বীরগণ। 
নানা অস্ত্রে পূর্ণতৃণ করিল ধারণ। 
কেহ অশ্বে কেহ গজে কেহ পদব্রজে। 
যুদ্ধে যাত্রাকারী সেনা গভীর গরজে।। 
এখানে নৃপতি নিজে করে রণবেশ। 
কঠিন কবচ অঙ্গে করয়ে নিবেশ।। 
মস্তকে মুকুট পরে. শ্রবণে কুগুল। 
প্রচণ্ড কোদণ্ড করে যেন আখগুল।। 
লইল শাণিত শর নিশিত কুঠার। 
কোশ আচ্ছাদিত অসি সুমার্ভর্জতধার।। 
পৃষ্ঠে তৃণ নূতন লইল চর্ম করে। 
যাহাতে শক্রর অস্ত্র নিবারণ করে।। 
নারায়ণ বর্ম ধরে স্বহৃদয়দেশে। 

এ শ্রীনারায়ণ দ্বিজ ভাষে রসাবেশে।। 


অথ রাজার দিখিজয়ে যাত্রা। 
বক্র চতুষ্পদী।। 
রাজার অনুমতি, পাইয়া সেনাপতি, সঙ্জিত হয়ে অতি, আইল সবে। 
সারথি সুশোভন, সাজায়ে সুস্যন্দন, করিল আনয়ন, তখনি তবে।। 
অতীব সুনির্মল, তেজেতে সমুজ্জবল, জিনিয়া স্বর্ণাচল, রথের নিভা। 
যাহার কাড়িভর, ব্যাপিল দিশস্তর, নাশিল মহত্তর, তিমির কিবা।। 


১৬৪ 


কলিকুতৃহল 
রতন মণিগণ, সারেতে সুগঠন, শোভিছে সুতোরণ, যাহাতে অতি। 
বিতান মনোহর, শোভাতে নিরস্তর, প্রকাশে গৃহাস্তর, কিরণ ততি।। 
কনকে সুকলিত, মণিতে সুখচিত, পেতেছে সুললিত, আসন তায়। 
যাহার সুমাধুর্য্য, রচন সৃচাতুর্য্য, রচিতে হেন ধূর্য্য, নাহিক শ্রায়।। 
রথ উপরিভাগে, মনের অনুরাগে, রঞ্িত নানা রাগে, পতাকা ততি। 
করেছে বিরচন, যাহার শোভাকণ, নিরখিয়া নয়ন না করে গতি।। 
কলস সন্নিধানে, শোভিছে সুবিধানে, ধরিয়া সুনিশানে, কেশরী ছয়। 
কনক বিরচিত, হেরিলে হর চিত, যাহাতে অতিভীত, বিপক্ষে হয়।। 
রথেতে ঘণ্টাগণ, বাজিছে ঠনঠন, সমর সুভীষণ, যাদের রব। 
যাহারা বেগভরে, সমীরমান হরে, এমন অশ্ব তরে, যুড়েছে সব!। 
সজ্জিত সেই রথ, হেরিয়া অভিমত, নৃপতি বিধিমত, আদর করি। 
পাইয়া শুভক্ষণ, তাহাতে আরোহণ, করিল সে রাজন, ধনুক ধ্রি!! 
তখন সেনাসব, বিরোধি সুভৈরব, করিয়া ঘোর রব, সঙ্গেতে চলে। 
আগেতে অগণন, প্রমস্ত করিগণ, করিতেছে গমন, স্বদলে দলে।। 
চড়িয়া অশ্ববরে, মনের মোদভরে, চলিল থরে থরে সেনানীগণ। 
রথেতে আরোহিয়া, কেহ বা সুখি হিয়া, চলিছে সে ধাইয়া, কতেক জন।। 
সৈন্যের কোলাহল, ব্যাপিল ধরাতল, তাহাতে অবিকল, বাজিছে ভেরি। 
পটহ পরিকর, দামামা সুদগড়, বাজিছে ঘোরতর, সমর টেরী।। 
সাহিনী সুসারঙ্গ, মৃদঙ্গ অনুষঙ্গ, পাইয়া সে মোচঙ্গ, প্রভৃতি বাজে। 
যাহার নাদভরে, আবরি দিশস্তরে প্রলয় জলধারে, ফেলয়ে লাজে।। 
যেদিগে নরপতি, লইয়া সেনাপতি, করেন সমাগতি, বিজয় আশে । 
সেদিগে নৃপগণ, ভয়েতে নিমগন, ছ্িজ শ্রীনারায়ণ, হরিষে ভাষে।। 


অথ কলির সহিত রাজার সাক্ষাৎ। 
||পয়ার।। 


এই মতে চতুরঙ্গ বল সঙ্গে লয়ে। 
দিগ্বিজয়ে যান রাজা উৎ্কঠিত হয়ে।। 
সপ্ত অক্ষৌহিনী সৈন্য সঙ্গেতে তাহার। 
দেবতা দানব যক্ষ রক্ষে চমৎকার ।। 
সৈন্য কোলাহলে ব্যাপ্ত দিগস্ত গগন। 
প্রলয়ে কল্লোলমান সমুদ্র যেমন।। 
যেদিগে সসৈন্যে রাজা করেন প্রস্থান। 
সেদিগে সভয়ে সবে হয় কম্পমান।। 


১৬৫ 


দুশ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


রাজাগণ ভীতমনে তেজিয়া ভবন। 
শরণ লভয়ে লয়ে নানা উপায়ন।। 
ভূপতি সুমতি অতি সেসব রাজনে। 
স্বরূপে শাসন আজ্ঞা করেন আপনে ।। 
প্রজাগণ যেন ধন্মপথ উপেক্ষণ। 
করিয়া উৎপথে কেহ না করে না গমন।। 
আমার বচন সবে যতনে রাখিবে। 
কখন কুপথ নাহি নয়নে দেখিবে।। 
এই হেতু হইয়াছে মম আগমন। 
অন্যথা করিলে তারে করিব নিধন।। 
নৃপতির এই আজ্ঞা অবধান করি। 
লইল ভূপীলগণ নিজ শিরে ধরি।। 
ভদ্র-অম্ব কেতুমাল আদি বর্ষগণে। 
ক্রমশঃ প্রবেশ করে নিজ সৈন্য সনে।। 
সেসব দেশেতে যত ছিল রাজাগণ। 
পর্বতে সকলেরে করিল শাসন।। 
তথা তথা নিজ পুর্ব বংশের চরিত। 
শুনিয়া নৃপতি বহু হৈল আনন্দিত।। 
কৃষ্ণ-অনুকম্পা নিজ পিতামহগণে। 
আপনারে গর্তে কৃষ্ণ রাখিলা যেমনে।। 
সেসব সম্বাদ শুনি নৃপতি প্রধান। 

বসন ভূষণে সবে করিলা সম্মান।। 
ক্রমেতে ভারতবর্ষ আগমন করি। 
স্থাপিল শাসন বহু দুষ্টপ্রাণ হরি।। 
অঙ্গ-বঙ্গকলিঙ্গ প্রভৃতি দেশগণ। 

জয় করি কুরুক্ষেত্রে করিল গমন।। 
সরস্বতী নদী পুর্্ববাহিনী যথায়। 
পাণ্ডুকুল চুড়ামণি উত্তরে' তথায়।। 
দেখেন আশ্চর্য্য এক সেখানে নৃপতি। 
গাবীরূপ ধারণ করেছে বসুমতী || 
বৃষরূপী ধর্ম পাদত্রয়েতে আহত। 
এক পদে ধরাপাশে হয়ে সমাগত।। 
দেখেন তাহারে অতি বিষণনবদনা। 
বৎসহারা .গাবীমত পূর্ণাশ্রুনয়না।। 


১৬৬ 


জিজ্ঞাসা করেন ধর্ম বৃবরূপধারী। 
কিহেতু মা তব নেত্রে বহে উদ বারি।। 
কি তব হয়েছে বল অস্তরে বেদনা। 
হয়েছে গো কেন এত মলিনরদনা।। 
কি নিমিত্ত শোক তব হয়েছে উদয়। 
জিজ্ঞাসি তোমারে তাহা বল সমুদয়।। 
আমারে দেখিয়া কি মা পাদত্রয়হীন। 
তোমার স্বরূপ এত হয়েছে মলিন ।। 
কিম্বা বৃবলেতে ভোগ করিবে তোমারে। 
এহেতু রোদন করিতেছ বারে বারে ।। 
অথবা অযজ্ঞভাগশ্প্রাপ্ত দেব দলে। 
ভাবিয়া তোমার বক্ষঃ ভাসে নেত্রজলে।। 
কলিতে হইবে শুদ্র-ভোগ্য বেদধবনি। 
এ লাগি ক্রন্দন নাকি কর গো জননি।। 
কিম্বা অধর্ম্মেতে রত হবে জীবলোক। 
তাহার কারণে তব হইয়াছে শোক ।। 
কহ মাতা কিবা তব ব্যাধির নিদান। 
যাহা নিরখিয়া মম বিদরিছে প্রাণ।। 
ধরণী কহেন ধর্ম জানহ সকলি। 

তব পদত্রয় ভগ্ন করিল যে কলি।। 
যার আগমনে হরি নৃলোক তেজিয়া। 
স্বলোকে গেলেন মোরে অনাথা করিয়া।। 
অলৌকিক গুণগণ যাঁর সমুদয়। 
তাহার বিরহ বল কিসে সহ্য হয়।। 
ভারতে হইলে অস্ত কৃষ্ণপ্রভাকর। 
আগত হইল কলি নিশা ঘোরতর ।। 
গাবী বৃষ দৌহে করে আলাপ এরপ। 
হেনকালে তথা উপস্থিত কলিভূপ।। 
নৃপ বেশধারী শূদ্র মহাদণ্ড করে। 
ধর্ম্মেরে প্রহার করে আসি বেগ ভরে।। 
পদাঘাতে ধরণীরে করিল কাতরা। 
ভয়ে অপমানে সশঙ্কিত ধর্ম ধরা।। 

এ শ্রীনারায়ণ চট্টরাজ দ্বিজ কয়। 
হইবে কলির শান্তি তেজ মনে ভয়।। 


৯৬৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
অথ রাজাকর্তৃক কলির নিশ্রহ। 


দুরে থাকি দৃষ্টি করিলেন নররায়। 
নৃপ বেশধারী একজন শৃত্রপ্রায়।। 
দণ্ডেতে দণ্ডিছে ব্যরাপী ধর্মপ্রতি। 
পদাঘাতে পৃথিবীর করিছে দুর্গাতি।। 
ক্রোধেতে কম্পিত তাহে নৃপ কলেবর। 
আরোপন করিয়া কাম্্মকে তীক্ষ শর।। 
রথে থাকি জিজ্ঞাসা করেন কলিরাজে। 
কেরে দুষ্টমতি তুই মম রাজ্য মাঝে।। 
ধরিয়া নৃূপের বেশ করিস্‌ কুনীতি। 
ভাবে নীচ বোধ হয় হেরি তোর রীতি। 
ওরে মুঢ্মতি অতি পামর স্বভাব। 
গোমিথুনপ্রতি দণ্ড করা একি ভাব।। 
কৃষ্ণসহ গাণ্ডিবী তেজেছে ধরাতল। 
তাই বুঝি হইয়াছে এত তোর বল।। 
ওহে বৃষ কেন তব প্রতি এ অধম। 
ক্রুদ্ধ হয়ে করিতেছে দণ্ড সুবিষম।। 
পাদত্রয় ভগ্ন করিয়াছে দণ্ডাঘাতে। 

কে বটে এ দুষ্ট বল" আমার সাক্ষাতে ।। 
আকার প্রকারআদি যে দেখি তোমার। 
তাহাতে দেবতা বোধ হইছে আমার ।। 
গাবি তুমি পরিত্যাগ কর মনে ভয়। 
রোদন না কর আর তেজহ সংশয়।। 
আমি খল সকলের প্রতি শান্তি দিতে। 
ধরেছি কা্ম্ম্ক এই দেখহ অক্ষিতে।। 
কহ বৃষ এই কি ভাঙ্গিল তব পদ। 
অন্যে বা করিল হেন তোমার বিপদ।। 
পাণুকুল-কীর্তিহারী এই ব্যবহার। 
কহ কে করিল করি দমন তাহার।। 
ধর্ম কন মহারাজ পাণুর নন্দন। 
যোগ্য বটে নিজ কুলোচিত এবচন।। 


এত গুণ তোমাদের যদি নাহি রবে। 
১৬৩৮ 


তবে কৃষ্ণ তোমাদের বশ কেন হবে।। 
কি জন্যেতে ক্লেশভোগী হয় প্রজাগণ। 
মহারাজ নাহি জানি আমি সে কেমন।। 
কেবা দুঃখ দেয় জীবে কিসের কারণে । 
বাক্যভেদ মোহে বোধ নাহি হয় মনে।। 
কেহ বলে নিজে নিজ দুঃখহেতু হয়। 
দুঃখের কারণ দেব অপরেতে কয়।। 
কেহ কেহ কর্মে কহে দুঃখের কারণ। 
দেহের স্বভাব ইহা বলে অন্য জন।। 
কেহ বলে অপ্রতর্ক্য ঈশ্বর হইতে। 
সুখ দুঃখ পায় জীব এই. পৃথিবীতে ।। 
নৃপবর তুমি নিজে সুবুদ্ধিআলয়। 
'বিবেচিয়া দেখ মনে যাহা সত্য হয়।। 
বৃষবাক্য শুনিয়া কহেন নৃপমণি। 
জানিলাম নিজে ধর্ম বটহ আপনি।। 
অধন্ষম্মিকৃত কর্ম যে করে কীর্তন। 
সেহ তার মত হয় অধন্মভাজন।। 
এই লাগি তুমি নাহি কহিছ বিশেষ। 
পাছে স্পর্শ হবে দেহে অধরন্মের লেশ।। 
তপস্যা শুচিতা দয়া সত্য এই চারি। 
ধন্মের চরণ হয় দেখেছি বিচারি।। 
তাহাতে অধন্্ম অংশে গেছে পদত্রয়। 
অবশিষ্ট পদ এই যাহা দৃষ্ট হয়।। 
তাহাও সংপ্রতি নাশ করিবারে কলি। 
উপস্থিত হইয়াছে দেখিনু সকলি।। 
এই আমি তার দণ্ড করিব এখন। 
ভয় তেজ ধরা ধর্ম না কর রোদন।। 
এত কহি কোপেতে কম্পিত নরপতি। 
রথ হৈতে নামিলেন অতি শীঘ্্রগতি।। 
সুপর্ণ যেমন সর্প ধরিবারে ধায়। 
কানন দহিতে দাবানল যেন যায়।। 
লম্ফ দিয়া কলিকেশে করি আকর্ষণ। 


৯৬৯ 


দুম্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


শাণিত সুধার খড়গ করিল ধারণ।। 
নৃপতির ক্রোধ দেখি ভয়েতে বিহ্‌ল। 
করযুগে ধরে কলি নৃপপদতল।। 
বলে মহারাজ রক্ষা কর এই জনে। 
শরণ নিলাম রাজা তোমার চরণে ।। 
হাসিয়া কহেন অভিমন্যুর নন্দন। 
তোমারে শরণ দেওয়া অযোগ্য করণ।। 
তথাপি পাশুবকুলে আছে এই রীত। 
পদানত জন বধ্য নহে কদাচিত। | 
অতএব না বধিব তোমার জীবন। 
মম অধিকার তেজি কর পলায়ন।। 
কলি কহে করপুট করি মহাশয়। 
তব অধিকার সব ভূমণ্ডল হয়।। 
তবে বল কোথা আমি করিব নিবাস। 
কৃপা করি সেই স্থান করহ প্রকাশ ।। 
নৃপ কহে ওহে কলি কর অবধান। 
কহি আমি এবে তব নিবাসের স্থান ।। 
দ্যুত ক্রীড়া সুরা পান রমণী মণ্ডল। 
অপর অবৈধ প্রাণীহিংসার যে স্থল।। 
এই স্থান চতুষ্টয় করি অতিক্রম। 
যদি অধিকার তুমি করিবে অধম।। 
তবে তব তর্খনি করিব প্রতিকার । 
শরণ আগত বলি না মানিব আর।। 
যে আজ্ঞা বলিয়া কলি নৃপে প্রণমিয়া। 
চলিল আপন স্থান দুগ্তখিত হইয়া ।। 
কলির নিগ্রহ করি রাজা পরীক্ষিত। 
*্. শান হস্তিনাপুরে হয়ে হরষিত।। 
কিছুকাল স্বধর্মেতে রাজ্য অধিকার । 
শাসন করিয়া নৃপ নীতির আধার।। 
পরে বিপ্রঅভিশাপ ব্যাজে নরপতি। 
জনমেজয়েরে রাজ্য দিয়া শুদ্ধমতি || 
সুরধুনীতীরে করি প্রায়োপবেশন। 


১৭২০ 


শুকমুখে ভাগবত করিয়া শ্রবণ ।। 
তেজিয়া আপন তনু তক্ষক দংশনে। 
শেষেতে গেলেন রাজা বৈকুষ্ঠ ভবনে ।। 
ভূদেব শ্রীনারায়ণ চট্টরাজ কয়। 
কৃষ্ণভক্তগণের এরূপ পরিচয়।। 


অথ কলির অনুতাপ ও অধরন্মেরে সহিত প্রথম মন্ত্রণা। 
| পয়ার | 
এখানেতে কলিরাজ পেয়ে পরাভব। 
দুঃখিত হইল চিত্তমাঝে অসম্ভব।। 
অনুতাপ করি কহে কি হৈল আমার। 
কিরূপে পাইবে রক্ষা মম অধিকার ।। 
বিধি মোরে প্রতিকূল হইল কি করি। 
কেমনে ভারতে আর অধিকার ধরি ।। 
নৃপতি যে দিল মোরে স্থান চতুষ্টয়। 
তাহাতে কিরূপে অধিকার সিদ্ধ হয়।। 
অন্তরে যে বীজ সব আছিল রোপণ । 
বিশ্ুক্ষ করিল তাহা দুর্দৈব তপণ।। 
এইরূপ ভাবি ভাবি কলি নিজমনে। 
অধর্্ম মন্ত্রিরে কান্দি কহেন গোপনে ।। 
হায় কি হইল মম ওহে মন্ত্রিবর। 
অধিকার গেল এই অবনীভিতর || 
কিরূপে কেমনে কোথা করিব নিবাস। 
বিধাতা করিল মোরে ফলেতে নিরাশ ।। 
আজি নৃপ পরীক্ষিৎ পাণ্ডুকুলধর। 
আমায় না দিল স্থান অবনীভিতর।। 
যে দেখি তাহার ক্রোধ কালানল প্রায়। 
প্রাণেতে পেয়েছি ত্রাণ ধরিমাত্র পায়।। 
দয়া করি এই স্থান দিল দগ্ডধারী। 
দ্যুত মদ্য পর দারা হিংসা এই চারি।। 
তাহাঁও সক্কীর্ণ হয় এ মহীমগুলে। 
কই এই নর সেবা করে সভ্য দলে।। 
বেদ-রূপ ভয়ানক শক্র যে আমার। 
১০৭১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


করিতে না দিবে সে কারেও আচার ।। 
কর্ণে কর্ণে কহিয়া বেড়ায় সে ভবনে। 
হিংসা মদ্য পরদার তেজ সবজনে।। 
তবে কি প্রকারে বল কোথায় রহিব। 
কেমনে ভুবনে অধিকার প্রকাশিব।। 
মন্ত্রি কহে মহারাজ চিস্ত কি কারণ। 
হইবে হইবে তব বাসনা পুরণ।। 

কাম ভ্রোধ আদি সৈন্য সহায় থাকিতে। 
শত্রগণে কি তোমার পারিবে করিতে।। 
যখন বসস্ত সঙ্গে লয়ে পঞ্চশর। 
সাজিবে সংগ্রামে তবে রবে কে অপর।। 
তার ফুলশর বরিষণের বৈভবে। 

জপ যজ্ঞ সমাধি সাধন কোথা রবে।। 
অবশ্য হইবে সবে পরনারীরত। 
মহারাজ কেন হও চিন্তায় নিরত।। 
ক্রোধ যদি দ্বেষ দম্ভ সৈন্যসঙ্গে সাজে। 
হিংসা তার পদানত হবে কাষে কাষে।। 
লোভ যদি অনুকূল রাগ আদিসনে। 
সাজিয়া সমরে যাত্রা ক্রয়ে ভুবনে ।। 
তবে কি বারুণীপান না করিবে লোক। 
তেজ তেজ মহারাজ হৃদয়ের শোক।। 
জানি আমি মোহ যেন পরাক্রম ধরে। 
তাহে দ্যুতপ্রিয় নাহি হবে কোন নরে।। 
কলি কহে মন্ত্রি যে কহিলে সমুদয়। 
সেসব আমার ভাল বোধ নাহি হয়।। 
দোষদৃষ্টি মস্ত্রিসহ বিবেক থাকিতে। 
কামের বিক্রম কভু নারে প্রকাশিতে।। 
ক্ষান্তিরূপ আছে যেই শত্রু ভয়ঙ্কর।, 
যাইতে কি পারে ক্রোধ তাহার গোচর।। 
সম্তভোষ স্বভার্য্যা তৃপ্তি সহিত থাকিতে। 
লোভের বিক্রম কিছু না পারে করিতে।। 
জ্ঞান আমার হয় শক্র ঘোরতর । 

মোহ কি করিতে- পারে তাহার উপর ।। 


১৭৭ 


দৈব বিনা দূর নাহি হয় অবসাদ।। 
দেবের পরম দেব হয়েন মহেশ। 
তার উপাসনা কর বিনাশিবে ক্রেশ।। 
আশুতোষ হন শিব তার সেবা করি। 
অনেকে পেয়েছে সিদ্ধি ভুবন ভিতরি।। 
অতএব কর তুমি শিবের সেবন। 
অবশ্য তোমার আশা হইবে পূরণ ।। 
ইহা বিনা উপায় না দেখি কিছু আর। 
যাহাতে বিপুল হয় তব অধিকার।। 
কলি কহে ভাল পরামর্শ এই হয়। 
আছয়ে আমার মনে ইহাই নিশ্চয় ।। 
তাহার বিলম্ব আর আমি না করিব। 
অদ্যই তপস্যা হেতু কাননে যাইবে ।। 
তোমা সবে বিধিমতে করিবে যতন। 
যাহে ধন্মপথে কেহ না করে গমন।। 
এতেক কহিয়া কলি করিল প্রস্থান। 
কহিছে শ্রীনারায়ণ ভাল এ বিধান ।। 


অথ মহাদেবের তপস্যার্থ কলির হিমালয় বাত্রা। 
|ত্রিপদী।। 


এইরূপ কলিরাজ, স্থির করি হৃদিমাঝ, 
মহাদেব উপাসক বেশে। 
চলিতেছে উত্তরপ্রদেশে ।। 

পুরগ্রাম ব্রজাকর, নদনদী সরোবর । 

নানা দেশ করি অতিক্রম। 
প্রবেশ করিল তেজি ভ্রম।। 

সাল তালআদি তরু, লতাতে আবৃত শুরু, 
অন্ধকারময় সব দেশ। 

১৭৩ 


দুত্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ভয়ানক জন্তগণ, সিংহ ব্যান অগণন, 
ঘোর রব করে সবিশেষ । 


হেন সব গিরি বন, ক্রমে করি উপেক্ষণ, 
কলিরাজ করিল গমন। 
উপনীত হইল তখন।। 

কিবা সেই হিমালয়, বর্ণনে বর্ণ বিকল, 
অবিচল সৌন্দর্য্য যাহার। 

কর্পুরের রাশি প্রায়, যার কান্তি দেখা যায়, 
হায় শোভা কি বর্ণিব তার।। 

নানা তরু লতাজাল, ব্যাপ্ত অতি সুবিশাল, 
আছে তাহে কত শৃঙ্গগণ। 

মগ খগ পতঙ্গম, না তেজে যার সঙ্গম, 


গুঞজ গুঞ রে গান করে।। 
প্রমত্ত কোকিলগণ, করে কল কল ্বন, 
শিখী শাখিশাখাতে নাচয়। 
হেরে মনোমুগ্ধ কার নয়।। 
কলরব করে জলচরে। 
সুরসিদ্ধবধূগণ, তাহে স্নানাবগাহন, 
সকলে করিছে মোদভরে ।। 
কলিরাজ সে পব্বত, নিকটেতে বিধিমত, 


. শ্লান করি সুরনদীজলে। 
ধরি তাপসের বেশ, বিকীর্ণ চাচর কেশ, 


১৭৪ 


বসি হিমগিরি শিলাতলে।। 
আপন ইন্ড্রিয়গণ, ক্রমে করি আহরণ, 
বিষম কুবিষয় হইতে। 
নাসাবায়ু রোধ করি, হ্বদয়ে সমাধি ধরি, 
নিরবধি রহে শুদ্ধচিতে।। 
আহার বিহার ভোগ, নিদ্রালস্য যোগাযোগ, 
তেজে যোগ ধরিয়া সকল। 
তরু শৈল সমান অচল ।। 
এইরূপে কতকাল, তেচিয়া বিষয় জাল, 
ভবে ভাবে ভাবের সহিত। 
কভু যদি ভাঙ্গে ধ্যান, করে স্তুতি সুবিধান, 
এ শ্ত্রীনারায়ণ সুবিদিত।। 


অথ কলিকৃত মহাদেবের সর। 
|।তোটক ।। 
জয় শঙ্কর শম্ভু শশাঙ্কধর। 
ত্রিপুরাস্তক ত্র্যক্ষ ব্রিশূলকর।। 
পরমেশ্বর পাপ প্রণাশন হে। 
সদনাস্তক মন্ত্র প্রকাশন হে।। 
ভবশীলনশ্রাত্তি বিনাশ তরো। 
সুর দানব মানব সিদ্ধগুরো।। 
মুনিমানস সারস হংসবর। 
করুণা কর হে হর দুঃখ হর।। 
নিজ ভক্ত সুরক্ষণ দক্ষ বিভো। 
সুরপক্ষ বিপক্ষ পরোক্ষ প্রভো।। 
তব বৈভব কৈতব কারি জনে। 
ভব ভ্রাস্ত অশাস্ত জনে কি জানে ।। 
যাহে মোহে অপোহে বেদাস্তবাণী। 
কে কবে হে তবে বল অন্য প্রাণী। ৷ 
সুবিশঙ্কট শক্ষট সিহ্ুনীরে। 
পড়িয়ে কাতরে ডাকি হে তোমারে ।। 
কোথা হে রজতাচলশৃঙ্গমণে। 


৯৭৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


পরিপালয়ে নাথ এ দীনজনে।। 
বিষয়চ্যুত সাম্প্রত আমি এবে। 
হের হে হর নেত্রকটাক্ষ লবে।। 
তব অন্তুত নেত্রকপা বিহনে। 
পরমাপদ ঘাত হবে কেমনে।। 
শ্রীনারায়ণ চট্ট বিমূঢ় বলে। 

কর ভক্তি বিভক্তি স্বপাদ তলে ।। 


অথ মহাদেবের নিকট কলির বর শ্রাপ্তি। 
|।পয়ার।। 


এরূপ কলির তপস্ভুতির প্রভাবে। 
আশুতোষ আশু তুষ্ট হইয়া সে ভাবে। 
নন্দিবিষ উপরিতে করি আরোহণ । 
দেব অধিদেব তারে দিলা দরশন।। 
রজত শিখরি প্রায় প্রকাণ্ড শরীর। 
বিভূতি ভূষণ অঙ্গে শিরে গঙ্গানীর।। 
অর্ধশশী শোভে ভালে শ্রবণে কুগুল। 
পঞ্চ বক্ত ত্রিনয়ন পরম উজ্জ্বল।। 
ত্রিশূল ডমরু করে দিগস্ত বসন। 
ব্যাস যজ্ঞসুত্রে দেহ অতি সুশোভন।। 
ঢুলু ঢুলু দুনয়ন সমাধি আবেশে। 
বিকীর্ণ বিপুল জটাজুট বক্ষ দেশে।। 
জলদগস্ভীর স্বরে কন কলিপ্রতি। 
নয়ন মিলন কর তেজ দুঃখ ততি।। 
জানি আমি তব তপস্যার বিবরণ। 
ভয় নাই মনোবাঞ্কা হইবে পুরণ ।। 
পরীক্ষিৎ দিল তোমা প্রতি যেই স্থান। 
তাহা হইতেই তব হইবে, কল্যাণ।। 
বিষুঅনুমতি মোরে আছে পুব্র্বাবধি। 
বেদবাহ্য আগম রচিতে নিরবধি ।। 
তব অধিকার কালে তাহা প্রকাশিবে। 
তাহে বেদ পথ অনায়াসে বিনাশিবে।। 
আপনিও বিষুঃ করিবারে দেবহিত। 


১৭৬ 


বুদ্ধরূপে অবতীর্ণ হবেন তুরিত।। 
ইতিপুকের্ব দেবগণ ক্ষীরোদেতে গিয়া। 
জানাইল নারায়ণে বিনয় করিয়া।। 
ওহে ত্রিভৃবন প্রতিপালক মুরারি। 
স্বভক্ত বৎসল ভবভ্রান্তি বিনিবারি।। 
নানা ভয় হৈতে হরি আমাসবাকারে। 
রক্ষা করিয়াছ নানা মতে বারেবারে।। 
প্রতি অসুরভাব প্রাপ্ত রাজাগণ। 
বেদ বিধিমতে করে তপ আচরণ।। 
যদি তারা সেইসব তপস্যার ফলে। 
জনম লভয়ে আসি দানবের দলে।। 
তবে সে সবার নাশ করা সুকঠিন। 
ধন্মরত লোক বধ্য নহে চিরদিন।। 
এখন তাদের যদি হয় ধর্মনাশ। 
আপনি সে ফলে তারা পাইবে বিনাশ ।। 
অতএব আমা সবে কৃপা প্রকফাশিয়া। 
যে হয় উচিত কর মনে বিবেচিয়া।। 
শুনি নারায়ণ কহিলেন দেবগণে। 

ভয় নাই তোমা সবে যাও নিকেতনে।। 
ভারত মণ্ডলে আমি মগধপ্রদেশে। 


এত শুনি দেবগণ তারে প্রণমিয়া! 
আপন আপন গৃহে রহিলেন গিয়া।। 
সেই বুদ্ধ অবতারকাল উপস্থিত। 
তাহাতেও হইবে তোমার বহু হিত্ব4। 
পরে আমি কল্পিত আগম প্রকাশন। 
করিয়া করিব তব শুভ আচরণ ।। 
তব অধিকারকালে বিষণ ভগবান। 
প্রতিমারূপেতে বর্ষ অযুত প্রমাণ।। 
থাকিয়া ভূমিতে পরে অন্যদেবসনে। 
পৃথিবী তেজিয়া স্বর্গে যাবেন আপনে ।। 
তুমি তাহে সাহায্য কিবা আচরণ। 


১৭৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত; 


যাহে এককালে সিদ্ধ হয় সে কারণ।। 
বিষুওস্থিতি সময়ের অর্ধেক ব্যাপিয়া। 
থাকি বিধুণপদী যাবে ভারত তেজিয়া।। 
তদর্ঘ সময়মাত্র গ্রাম্য দেবগণ। 
পৃথিবীতে রহি পরে করিবে গমন ।। 
বিষুও যবে তেজিবেন অবনীমণ্ডল। 
তখন পাবগু ধর্ম হইবে প্রবল।। 
তাহে তুমি অনায়াসে কৃত কার্য হবে। 
চিন্তা তেজ কলি তব দুঃখ নাহি রবে।। 
অন্য এক উপদেশ শুনহ শ্রবণে। 
আর্ধ্যাবর্তে তুমি না রহিবে এইক্ষণে।। 
এইদেশ হয় বহু ধার্মিক সেবিত। 
এখানে রহিলে শীঘ্র না হইবে হিত।। 
এ লাগি ভারতপৃবর্ব-দক্ষিণ প্রদেশে । 
গমন করহ তুমি মম উপদেশে।। 
তথা অভিমত স্থানে আপনার নাম। 
প্রকাশিয়া বিনিম্মাণ কর এক ধাম।। 
সেইস্থানে তুমিহ করিয়া অবস্থিতি। 
যেরূপ প্রকাশিবে রীতি নীতি।। 

সেই অনুসারে অন্য. প্রদেশীয় জন। 
অবশ্যই করিবে ক্রমেতে আচরণ।। 
এইরূপ কলিপ্রতি করি আশম্বীসন। 
মহাদেব তখনি হইলা অদর্শন।। 
তাহে আনন্দিত অতি কলিযুগরাজ। 
পুনরপি আইলেন ভারত সমাজ।। 
এহেতু শ্রীনারায়ণ চট্টরাজ কহে। 
দৈব বল তুল্য অন্য বল কিছু নহে।। 


অথ শ্রীবিধুগ্র বুদ্ধাবতাব্রের বিবরণ । 
পয়ার || 
এবে বন্ধুগণ কহি করহ শ্রবণ। 
যে প্রকারে বুদ্ধরূপী হৈলা হারায়ণ।। 
_ ধর্ম্মারণ্য নামে পুর খ্যাত গয়াদেশে। 
তাহে দ্বিসহত্ কলিবর্ষ অবশেষে ।। 


৯১৭৮ 


অজ্ঞাননন্দিনী মায়াদেবীর জঠরে। 
শুদ্ধোদন পুত্ররূপে ভারত ভিতরে ।। 
পিতৃমাতৃ সম্মত গৌতম নাম ধরি। 
অবনীতে অবতীর্ণ হইল শ্্রীহরি।। 
বিবস্ত্র মণ্ডিত কেশ শিখিপুচ্ছ করে। 
নম্ম্দা নদীর তটে প্রদেশ গুজ্জরে।। 
উপনীত হেলা যথা আসুরিক জন। 
মহাযত্বে করিতেছে তপ আচরণ ।। 
তা সবারে সম্ভাষি কহেন ভগবান। 
কি করে তোমরা সবে কহ সে বিধান।। 
কোন্‌ অভিলাষে কর এ দুক্কর কর্্ম। 
ইহ্‌ কিম্বা পরলোক বাঞঙ্কা তব মর্ন্ম।। 
কি ফল পাইবে সবে এই তপস্যায়। 
মোরে বিবরিয়া তাহা কহ সমুদায়।। 
শুনি সে সকলে কহে গৌতমের প্রতি। 
পরলোককামী মোরা হই মহামতি ।। 
কি তব জিজ্ঞাস্য বল আছে এ বিষয়ে। 
হাসিয়া কহেন হরি তা সবে প্রণয়ে।। 
যদি পরলোক বাঞ্চা আছে সবাকার। 
তবে কেন মিছা ক্লেশ পাও অনিবার।। 
বেদ মোহে ভুলি কেন হারাও দুকুল। 
ভ্রান্তি তেজি সত্যধর্মমে হও অনুকূল ।। 
আমি তোমা সবে যাহা করি উপদেশ। 
গ্রহণ করিলে তাহা বিনাশিবে ক্রেশ।। 
এই মহাধর্্ম হয় সকলের সার। 
ইহাতে অর্তা আছে তোমা সবাকার।। 
ইহা কহি অত বালয়া তার খ্যাতি। 
হইল জগতে যাহে মুগ্ধ দৈত্য জাতি।। 
বিষুণ্মায়া প্রভাবেতে সেই দৈত্যগণ। 
শ্রদ্ধা করি তার বাক্য করিল গ্রহণ ।। 
তবে কহিছেন সে সবারে ভগবান। 
শুনহ পরম ধর্ম হয়ে || 
জীবা-জীব আশ্রর সম্বর ও র। 


১০৪) 


দুম্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বন্ধ মোক্ষ এই সপ্ত পদার্থ প্রবর।। 
এই সংসারেতে হয় যে কোন ঘটন। 
তাহাতে জীবাদি সপ্ত পদার্থ কারণ ।। 
জীব বলি তারে যে জ্ঞানাদি গুণবান। 
সাবয়ব অহমর্থ কায় পরিমাণ।। 
অজীব তাহার ভোগ্য সামশ্রী সকল। 
আশ্রব ইন্দ্রিয়গণ জানিবে কেবল ।। 
যাহাতে আবৃত করে বিবেকাদি ধর্ম । 
অবিবেকপ্রভৃতি সম্বর শব্দ মর্্ম।। 
কামব্রোধ প্রভৃতিরে কহিয়ে নিজ্ঞরি। 
বন্ধ মোক্ষ বিবরণ শুন অতঃপর ।। 
পাপপুণ্য হেতু জন্ম মরণ প্রবাহ। 
বন্ধশব্দে এই অর্থ হয় সুনিকর্বাহ।। 
যারে পাপ কহি তাহা করহ শ্রবণ। 
যাতে হয় ভ্গনবীর্ধ্য সুখ বিনাশন।। 
এরূপ যে কোন কর্ম তারে পাপ কয়। 
জ্ঞানাদি প্রকাশে যাতে সেই পুণ্য হয়।। 
পাপপুণ্য ঘটে জন্ম মরণ প্রবৃত্তি! 
তার নিবারণসাত্র মোক্ষ শব্দ বৃত্তি।। 
চতুবির্বধ পরমাণু সৃষ্টির কারণ। 
কালে তার যোগাযোগে জন্মে কার্যণণ।। 
দিককাল আকাশ এসব নিত্য হয়। 
যে সবার আনুকুল্যে জন্মে বিশ্বচয়।। 
এককালে এক ত্রব্যে নানা ব্যপদেশ। 
সিদ্ধিহেতু হয় সপ্তভঙ্গী উপদেশ ।। 
এইরূপে বহুবিধ মতের প্রচার । 
করিয়া করিলা ধর্ম ভ্রষ্ট সে সবার।। 
তবে তথা হেতে হরি করিয়া প্রস্থান 
কষায় অরুণ বস্ত্র কৈলা পরিধান ।। 
নয়নে অগ্রন লয়ে করেন ভ্রমণ। 
উপনীত হৈলা যথা অন্য দৈত্যগণ॥। 
তথায় তাহারা বেদবিধি অভিমত। 
শ্রন্ধান্িত হয়ে যজ্ঞআদি করে কত।। 


৮৫৩ 


সে সবারে সম্ভাষা করিয়া কন হরি। 
কেন সবে ক্রেশ পাও অধর্্ম 'আচবি।। 
মিছামিছি কেন পশুগণে হিংসা কর। 
নিজ হিত চাহ যদি মম বাক্য ধর।। 
তোমা সবে দেখিতেছ যেই বিশ্বচয়। 
যথার্থত শুন্যমাত্র ইহা সমুদয় ।। 
ভ্রান্তিজ্ঞান হেতু সব হয়েছে কল্পিত। 
স্বপ্ন যেন নিরাধারে হয় প্রকাশিত।। 
অবিদ্যা কেবল হয় তাহার কারণ। 
এইরূপ বোধ কর সবে প্রতিক্ষণ।। 
ইহা বলি বুদ্ধনামে তথা ভগবান। 
প্রকাশিলা হয়ে সব্র্ব মোহের নিদান।। 
হেন মতে সে সবারে ধর্্মচত করি। 
স্থানাত্তরে পুনঃ উপনীত হন হরি।। 
তথা পৃর্র্বমত ক্রিয়ানিন্ত দৈত্যগণে। 
সম্ভাষা করিয়া কন মধুর বচনে।। 
ওহে দৈত্যগণ সব কিবা ধর্ম কর। 
অনর্থক কেন ভ্রান্তিকাননে বিহর।। 
পশুহিংসা করিলে যে পুণ্য লাভ হয়। 
হেন অপলাপ বাক্য পাগলেতে কয়।। 
যজ্ঞেতে বিনষ্ট পশু স্বর্গ যদি পায়। 
তবে কেন লোকে নাহি বধে স্বপিতায়।। 
পিতৃত্বর্গ লাগি লোক নানা যত্বু করে। 
যজ্ঞে নাহি বধি তারে মিছা ঘুরে মরে।। 
তোমা সবে বল ইন্দ্র বহু যজ্ঞ ফলে। 
রাজত্ব পাইল স্বর্গে অমর মণ্ডলে।। 
যদি সত্য হয় ইহা তবে কি প্রকারে। 
শুক্ক কান্ঠ ঘৃতে তার তৃপ্তি হৈতে পারে।। * 
পুণ্যদেহ পেয়ে যার ঈদৃশ ভোজন। 
পশুসঙ্গে আছে তার কিবা বিলক্ষণ।। 
কর্তা-ক্রিয়া-দ্রব্য-নাশে যদি স্বর্গ হয়। 
তবে দগ্ধবৃক্ষে কেন নহে ফলোদয়।। 
শ্রাহ্ধ যদি হয় মৃত-পিৃ-তৃপ্তি-কর। 


১৮৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তবে কেন প্রবাসেতে দুঃখ পায় নর।। 
গৃহে থাকি পুত্র শ্রা্ধ করিলে তাহার। 
অবশ্য হইতে পারে ক্ষুধার নিস্ভার।। 
শ্রাঙ্ধে যদি মৃত মানবের তৃপ্তি হয়। 
তৈল দানে মৃতদীপ দীপ্ত কেন হয়।। 
অগ্নিহোত্র বেদত্রয় ত্রিদণ্ড ধারণ। 
বুদ্ধিশক্তি বিহীনের জীবিকাকারণ।। 
অতএব এইরূপ তেজি ভ্রম জাল। 
মম বাক্য শুন যদি সুখে যাবে কাল।। 
পরোক্ষ ঈশ্বর আছে জগত কারণ। 
কেন মিছামিছি ইহা কর সম্ভাবন।। 
দেহনাশ হইলে কি থাকে পরলোক। 
তবে তার লাগি মিছা কেন পাও শোক।। 
বটবীজকণা যেন বৃক্ষের কারণ। 
দেহপ্রতি রেতঃকণা জানিবে তেমন।। 
বহুদ্রব্যযোগে যেন মাদকতা হয়। 
চারিভূত যোগে তেন চৈতন্য উদয়।। 
বীজাঙ্কুর প্রায় এই জগত সকল। 
অনাদিরপেতে আছে এমনি কেবল।। 
কালে পৃথিবীতে স্কেন শস্যগণ হয়। 
কালে নাশ হয় পুন তেন প্রাণীচয়।। 
ইহার কি কর্তী কেহ আছয়ে অপর। 
যে মানয়ে ইহা তার সম কে ববর্বর।। 
সে কর্তার কর্তী কেবা সুধাইলে ফলে। 
অনবস্থাভয়ে তার আদি নাহি বলে।। 
এরূপ কল্সনাজালে আবৃত হইয়ে। 
অন্ধপরম্পরা ন্যায়ে মরয়ে জমিয়ে।। 
তোমাসবে হেন রূপ তেজিয়া কুমত। 
করহ বিষয় সুখ সবে অবিরত।। 
যাহাতে এহিক ক্রেশ হয় সুঘটন। 
তারে পাপ কহি তাহা করিবা বজ্জন।। 
যাতে সুখ হয় সদা পুণ্য বলি তারে। 
তাই কর কেন মজ দুঃখ অকুপারে।। 


১৮৭ 


সব সুখ হৈতে শ্রেষ্ঠ নারীসঙ্গ হয়। 
নিজদারা পরদারা বলি তেজ ভয়।। 
অহিংসা পরম ধর্ম এই বাক্য সার। 
প্রাণীমাত্র হিংসা করা অসাধু আচার || 
নিজ সুখ দুঃখ যেন অন্যের তেমন। 
এজন্যেতে করা নহে কাহারো হিংসন।। 
অন্য যাতে সুখ হবে তাই আচরিবে। 
পরলোক আছে বলি মনে না করিবে ।। 
এইমত উপদেশে সে সকল জনে। 
ধন্ম্রিষ্ট করি যান অন্যত্র আপনে ।। 
ভ্রমেতে সেসব মত হইয়া প্রবল। 
ব্যাপ্ত প্রায় হইল এ অবনীমগুল।। 
অদ্যাপি নেপাল ভোট বর্ম্মা চীনদেশে। 
লঙ্কাআদি দেশ ব্যাপিয়াছে সুবিশেষে।। 
এ শ্রীনারায়ণ কহে ভাবি ভগবান। 
এখন কলির বহু হইবে কল্যাণ ।। 


অথ মহাদেবের কঙ্সিত আগম প্রকাশ। 
ত্রিপদী।। 
যখন এ ধরাতলে, ব্যাপিল বৌদ্ধের দলে, 
সকলে তেজিল বেদ পথ । 
সেইকালে শ্রীমহেশ, কুলধর্্ম উপদেশ, 
প্রদানে করিলা অভিমত।। 
দ্বিতীয় শঙ্কর বেশে, প্রবেশিয়া পুগুদেশে, 
বহু তন্ত্র লইয়া সঙ্গেতে। 
সহ বহু শিষ্যগণ, স্থানে স্থানে পর্যটন, 
করিয়া বেড়ান স্বরঙ্গেতে।। 
কহেন সবার প্রতি, তেজ সবে এ দুর্ম্মতি, 
পরলোক গতি চিস্তা কর। 
কেন মিছা বৌদ্ধমতে, ভ্রমিছ সদা কুপথে, 
শুদ্ধভাবে শিব আজ্ঞা ধর।। 
বিবেচিয়া দেখ ভাই, কে বলে ঈশ্বর নাই, 
সৃহামায়া জগত জননী । 
১৮৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সে বিচারে নাহি কাজ, মম বাক্য হৃদি মাঝ, 
রাখ যদি দেখাব এখনি।। 
যদি মহামন্ত্র তার, জপো হয়ে বীরাচার, 
তবে কিছু অপেক্ষা না রবে। 
পাবে চতুবর্র্ ফল, যাবে সন্দেহ সকল 
অনায়াসে সুখলাভ হবে।। 
তাহা যদি দেখ পরীক্ষিয়া। 
আপন কুমত উপেক্ষিয়া।। 
ত্রিপুরা ত্রিগুণাকারা, ত্রিলোক তারিণী তারা, 
ত্রিদেবজননী ব্রিনয়নী। 
ত্রি-পুরদহন যার, চরণ করেছে সার, 
পরম পদার্থ মনে গণি।। 
যিনি এই চরাচরে, ব্যাপ্ত সদা সুরনরে, 
পশুপক্ষিপ্রভৃতি সকলে। 
যে শ্যামার শক্তি লবে, শক্তিমান্‌ হৈল সবে, 
সে ঈশ্বরী নাহি কেবা বলে।। 
লোকের এ বুদ্ধি ভেদ, লাগি নিন্দা কৈল বেদ, 
বিষুণ্-বুদ্ধমুর্তি অঙ্গীকরি। 
এজন্যে তাহার নাম, করা নহে কোন যাম, 
তুলসী স্পর্শিতে ভয় করি।। 
অতএব সবে কই, বস্ত্র নাহি তারা বই, 
তারিতে সংসার ঘোরতর । 
তারি মন্ত্র কর জপ, তেজ পশুচেষ্টাতপ, 
পঞ্চ তত্তে করিয়া আদর।। 
তত্ব প্রিয়া হন তারা, পরতত্ব সমাকারা, 
তত্ব সেবা করহ যতনে। 
অদ্য মাংস মৎস্য আর, মুদ্রা ও মৈথুন তার, 
অঙ্গ কহে তারাপ্রিয় জনে।। 
এইরূপ উপদেশ, সে সবে করিয়া শেষ, 
অপর প্রদেশে প্রবেশিয়া। 


১৮৪ 


কেন তবে ভ্রম অকারণ ।। 
হবিষ্যাশী উপবাসী, হইলে কি রাশি রাশি, 
মোহমসী মাহির্জত হইবে। 
কুরসে সুরস না পাইবে।। 
চিদানন্দ উল্লাসিনী, কালিকাল সীমস্তিনী, 
নিজযোনিবর্মে এসকল। 
স্কুল সূশ্্ম বঙ্মান্ড মণ্ডল।। 
ভগরূপা ভগবতী, ত্রিকোণে ত্রিদেবগতি, 
ত্রিগুণা ত্রিশক্তি স্বরূপিণী। 
লিঙ্গরূপী মহেশ্বরে, স্বসঙ্গম সুখ ভরে, 
সুখী করে ত্রিকালরূপিণী। | 
ভগলিঙ্গ সমাযোগ, এই সে পরমযোগ, 
ভোগ মোক্ষ উভয় কারণ। 
শুক্রনিঃসরণকাল, নির্বাণ সুখ মিশাল, 
নিজাগমে কহে ব্রিলোচন। 
মহাকাল সঙ্গে শিবা, বিপরীত রতা কিবা, 
নিজ সুখামৃতি আস্বাদিতে। 
যদি মোক্ষে থাকে মন, ধরহ্‌ শিববচন, 
গুণনিধিমনে সুখ দিতে ।। 


অথ কৌলধর্্ম বিবরণ। 
| |পয়ার || 
কুলকুগুলিনী কালী ভজ কুলপথে। 
অকৃল সংসার পার হইবে যেমতে।। 
চরাচর বস্তু সবকুল শব্দে বলি। 
কালিকা কারণরূপে ব্যাপ্ত এসকলি।। 
বস্তভেদ মানি জীব পশুতুল্য হয়। 


৯৮৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


পশুমার্গে পরতত্তব প্রাপ্তি কভু নয়।। 
কহিলেন পশুশান্ত্র অন্যরূপে শিব। 
মহাপাপবশে তাতে রত হয় জীব।। 
অতএব পশুসঙ্গে তেজ আলাপন। 
পশ্ড কাছে নিজমত করহ গোপন ।। 
ব্রন্মাবস্ত অবিচ্ছিন্ন সুখরূপ হয়। 
কামিনীর অঙ্গে তাহা ব্যাপ্ত সমুদয়।। 
সে নারীসঙ্গম তেজি নিরানন্দকালে। 
সাধিলে শ্যামার সিদ্ধি নাহি কোন কালে ।। 
তার সাক্ষী দেখ সঙ্গে লয়ে কোচ নারী। 
শ্যামারে সাধিয়া সিদ্ধি পান ত্রিপুরারি।। 
সাবিভ্ত্রী সঙ্গেতে সিদ্ধ স্বয়সু সেরাপ। 
সত্যাসঙ্গে সিদ্ধ হরি ধরি কৃষ্তরাপ।। 
অতি সুগহন এই কুলধর্ম্ম হয়। 
যোগীন্দ্রজনার ইহা গম্য কভু নয়।। 
পৃব্র্বেতে বশিষ্ঠ তেজি কুল উপদেশ। 
পশুমার্গে তারা সেবি পায় নানা ক্রেশ।। 
বহুকালে জপ্‌ করি সিদ্ধ নাহি লভে। 
ক্রোধে তারা মন্ত্র প্রতি শাপ দিল তবে।। 
তাহে দৈববাণী তথা হইল তখন। 

কেন মুনি মন্ত্রে শাপ দিলে অকারণ ।। 
পশুবুদ্ধি তব নাহি হয়েছে মোচন। 
পশুভাবে ভজি ক্রেশ পাও সে কারণ।। 
সিদ্ধি বাঞ্া থাকে যদি যাও টীন দেশে। 
চীনের আচার সব সেবহ বিশেষে ।। 
যোনি অন্ন বিচার তথায় কিছু নাই। 
সিদ্ধিলাভ হবে যদি কর গিয়া তাই।। 
এত বাণী শুনি তবে বশিশ্ত সুমতি। 
সিদ্ধ হৈল টান দেশে করি সমাগতি।। 
এই হেতু কহি আমি শুন সবিশেষ। 
রমণীসঙ্গমপ্রতি সবে তেজ দ্বেষ।। 
যোনিরূপা হন কালী লিঙ্গরাপী হর। 
মাতৃভাব পিতৃভাব চিস্তা পরস্পর || 


৯৮৬ 


যেকালে যেখানে নারী দর্শন পাইবে। 
তখনি অমনি ভক্তিভাবে অলিঙ্গিবে।। 
অভাবেতে মনে মনে চিস্তিবেক রতি। 
নতুবা অধমলোকে হইবেক গতি।। 
রমণে কুশলা রামা কর সহকার। 
নিজপর বলি মনে না কর বিচার।। 
মদ্য মাংস মৎস্য মুদ্রা মৈথুন বিহনে। 
কলিতে কালিকা সিদ্ধি হইবে কেমনে ।। 
শুদ্ধাশুদ্ধ ভদ্রাভত্র এ কেবল ভ্রম। 

এক বিনা দুই নাই উচ্চ-নীচ সম।। 
কালাকাল বিবেচনা তেজ এপথেতে। 
কোটিগ্রহ তুল্য কাল নারী সঙ্গমেতে।। 
তাহে পুনঃ হয় যদি রাহুগ্রহযোগ। 
তখনি করিবে শিব শক্তিতে সংযোগ ।। 
মাতৃমুখে পিতৃমুখ করি সন্নিবেশ। 
জপিবেক্‌ মহাবিদ্যা পিয়া সুধালেশ।। 
যাবত না হবে মুক্ত গ্রহ উপরাগ। 
তাবত এরূপ করিবেক মহাযাগ।। 
মুক্তিকালে পূর্ণাহুতি করিয়া প্রদান। 
মহাবিদ্যা জপন করিবে সমাধান ।। 
ভগলিঙ্গামৃত সহ যোনি ধৌতনীরে। 
তর্পণ করিবে পরে পরমাদেবীরে।। 
তাহে বিদ্যা সিদ্ধি হবে অবিদ্যা নাশিবে। 
মাতৃজার তুল্য ইহা নাহি প্রকাশিবে।। 
বাহিরে বিশুদ্ধাচার বৈষ্তবের প্রায়। 
রহিবে লোকেতে যেন টের নাহি পায়।। 
পশুসঙ্গে আহার বিহার সম্ভাষণ। 
তেজিবে সবর্ধদা যাহে নহে প্রকাশন ।। 
পশুদৃষ্ট স্পৃষ্ট কিছু বস্তু না লইবে। 
হিতাহিত কিছু সে সবারে না কহিবে।। 
বীরসঙ্গে কারণ সেবিবে সবর্ক্ষণ। 
অকারণে বৃথা কাল অযোগ্য যাপন।। 
পিয়ে পিয়ে পুনঃ পিয়ে ভূতলে গড়িবে। 


৯৮৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


উঠি পুনঃ পিয়ে মদ্য জন্ম না হইবে।। 
এইরূপে বহুতর উপদেশ করি। 
কুলধর্্ম প্রকাশিলা ভুবন ভিতরি।। 
মদ্যমাংস লোভে কেহ মৈথুনলালসে। 
সকলে ভাসিল কুলাচার মহারসে।। 
বেদপথে বড় কেহ না করে আদর। 
আগম মোহেতে মুগ্ধ হৈল বহু নর।। 
ক্রমে ক্রমে কলিস্থান হইল বিপুল। 
বিনাশিল কলির মনের দুঃখ শুল।। 

এ শ্রীনারায়ণ কহে দৈব বল যার। 
ংসারে অলভ্য কিবা থাকয়ে তাহার ।। 


অথ কৌলধর্ল্মরক্ষার্থ কলির দ্বিতীয় মন্ত্রণা ও 
প্রথম দিখিজয়ার্থ কন্দর্পের প্রতি অনুজ্ঞা। 
|।পয়ার || 


এইরূপে বৌদ্ধ বাম মার্গে ধরাতল। 
যখন হইল ব্যাপ্ত প্রায় এসকল ।। 
লোকসব বেদপথ হইল বিরত। 
তেজিল স্বকুল অগ্নি অগ্নিহোত্রি যত।। 
বৃথা হিংসা বৃথা পান করে নিরস্তর। 
ক্রুর কর্মে ক্রিয়াবান্‌ হৈল বহু নর।। 
নিজ-পর নারী কিছু না করে বিচার। 
যাতে তাতে হয় রত হয়ে বামাচার।। 
কলির হইল যাতে অনুকূল বিধি। 
সেপথ রক্ষণে কলি চিত্তে সদা বিধি।। 
অধর্্ম সহিতে কলি করয়ে মন্ত্রণ। 
কিরূপে প্রবল হবে এই ধরন্মগিণ।। 
কুল ধর্ম প্রচারেতে পাইয়াছি কুল। 
যতনে রাখিব যাতে না হয় নিম্মূল।। 
শিবআজ্ঞা আছে মোরে যাব বঙ্গদেশে। 
কৌলিন্য মর্যাদা আগে স্থাপিব বিশেষে ।। 
যাহে শ্রেণীবদ্ধ হয়ে সেই প্রজাগণ। 
করিতে না পারে কুলপথ উলঙবঘন।। 


৯৮৮ 


তাহে বহুকালে স্ত্রীর না হবে বিবাহ। 
জার ভজি তারা কাম করিবে নিবর্ধাহ।| 
পুরুষে করিবে বহুতর পরিণয়। 
কুলিনের কুল রক্ষা না করিলে নয়।। 
একজন হৈতে বহু কামিনীর কাম। 
কদাচ না পারিবেক হইতে বিরাম।। 
তাহে সে রমণীগণ তেজি লাজ ভয়। 
পর পুরুষেতে রত হইবে নিশ্চয়।। 
যদি পুন তাহে বহুভার্্যা পতি মরে। 
তবে ত হইবে সব বেশ্যা ঘরে ঘরে।। 
অকুলীন পুরুষের বিবাহ না হবে। 

সে সবার দ্বারে সতীধর্্ম নাহি রবে।। 
অর্থলোভে কেহ কন্যা করিতে বিক্রয়। 
পরোটা করি রাখিবেক তেজি লোকভয়।। 
তাহাতে সহিতে নারি যৌবনের জ্বালা। 
স্বেচ্ছায় ভজিবে যারে তারে কুলবালা ।। 
এইসব মনোবৃত্তি করিতে সাধন। 
বঙ্গরাজ্যে এবে আমি করিব গমন। । 
আদিসুর রাজা আছে বিক্রম নগরে। 
নিজাংশে জন্মিব তার মহিবী উদরে।। 
বল্লাল নামেতে খ্যাতি হইবেক তথা। 
সেই দ্বারে নিজমত সাধিব সবর্থা।। 
আর এক পরামর্শ হয়েছে মনেতে। 
দিখ্িজয়ে মদনে পাঠাব ভুবনেতে।। 
মোহ অবিবেক দুই সেনাপতি লয়ে। 
বসম্ত সামস্ত সহ সুসজ্জিত হয়ে।। 
গমন করুক সেহ ধরি ফুলশর। 

মম অনুগত করিবারে চরাচর।। 
তোমারে জিজ্ঞাসি তাহা কি বল এখন। 
ভাল কিম্বা মন্দ হয় এরূপ মন্ত্রণ।। 
অধর্্ম কহেন রাজা তুমি মহাধীর। 
তব অভিমত যাহা তাহাই সুস্থির।। 
মদনে ডাকিয়া তবে কর আজ্ঞাপন। 


১৮৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


দিথিজয় হেতু সেহ করুক গমন।। 
এত শুনি মনমথে ভাকাইয়া কলি। 
নিজ অভিপ্রায় তারে কহিল সকলি।। 
যে আজ্ঞা বলিয়া তবে চলে রতিপতি। 
গুণনিধি কহে উপযুক্ত এই অতি।। 


অথ কন্দর্পের দিখিজয়বাসরে বসম্তবর্ণন। 
| মাত্রাবৃত্তি চতুষ্পদী।। 
ভূপতিসম্মতি মদন পাইয়ে, 
কর ফুলশর ধরিয়ে। 
প্রকাশিয়ে বহুবিধ ফুলকুল, 
রসাল পল্পবে ধরায়ে মুকুল, মলয়পবন হানিতেছে শূল, 
যার যার রব করিয়ে।। 
রণবার্তী আগে করিতে প্রচার, 
পিক্কুল ঘন করিছে ফুফার, তাহাতে পাপিহা কহিছে আবার, 
পিয়ু কাহা কার রয়েছে। 
মল্লিকা মুকুলে বসি মধুকর, 
পুর্ধে পুঞ্জে গুঞ্জে গুণ গুণ স্বর," সে যেন ভীষণ মদন সমর, 
শঙ্খ বাদ্যকর হয়েছে।। 
দণ্ডে দণ্ডে চাহে সে করিত দণ্ড, অতরুণ তরুচয়ে লগ্ড ভণ্ড, 
করে সে প্রচণ্ড সমীরে। 
বলে হেরে দুষ্ট তরু লতাগণ, 
কি গৌরবে সবে আছ নিগমন, এখনো সুসঙ্জ নহ সে কেমন, 
এমন কি বুদ্ধি কমিরে।। 
পাটল অটল রণ রসাবেশে, 
ধরে সে নৃতন তৃণ পৃষ্ঠদেশে, কাঞ্চন লাঞ্ন করিতে বিশেষে, 
তীক্ষ তলোয়ার ধরেছে। 
কেতকীর করে কঠিন করাত, 
অশোকেতে 'শোকে ফেলে অচিরাৎ, জাতি জাতিকুল করিতে আঘাত, 
| শুভদৃষ্টিপাত করেছে।। 
স্মরহতাশনে দদ্ধ তুষকণ, 
১৪৯০ 


কলিকুতৃহল 
তরুততি সদা করে বরিষণ, তাহে সুভীষণ করে কলস্বন, 
খগগণ অতি কপটে। 
সেই বজ্ৰসম কঠিন নিনাদে, 
বিরহিণীবৃন্দ পড়িছে প্রমাদে, একাস্ত স্বকাস্ত বিরহ বিষাদে, 
ভাবে ভাগ্যে আজি কি ঘটে।। 
চৌদিকে কুসুম সৌরভ ছুটিল, 
বিরহির সুখ সম্পদ লুটিল, দুঃখ হুতাশন জুলিয়া উঠিল, 
ব্যাকুল করিল সে সবে। 
যৌবনরথেতে করি আরোহণ, 
হায় আজি কি হবে।। 
ধর্ম ধৈর্য্য বীর্য্য লজ্জা জাতিকুল, 
বিবেকাদি সবে ভাবিয়া আকুল, গেল গেল কুল একি শক্রকুল, 
ঘোর প্রতিকূল হইছে। 
সাজো সাজো সেনাসমূহ সত্বর, 
আজি যুদ্ধ বুঝি হবে ভয়ঙ্কর, এল্য কাম করে ধরি ধনুঃশর, 
এ শ্রীনারায়ণ কহিছে।। 


অথ কন্দর্পের বিজয়। 
| |পয়ার || 


এইরূপে সসৈন্যে সাজিয়া পঞ্চবাণ। 
গবর্বভরে চরাচরে করে কম্পবান।। 
ভারতেতে বঙ্গরঙ্গ ভূমে অগ্রে আসি। 
বিপক্ষের লক্ষ্যে বাণ ছাড়ে রাশি রাশি।। 
প্রতিযোদ্ধা বিবেক দেখিয়া সেই রীত। 
দোষদৃষ্টি মন্ত্রিররে পাঠান তুরিত।। 
যাও যাও মন্ত্রি তুমি শীঘ্র রণস্থলে। 
বিনাশহ প্রতিপক্ষ পক্ষ সৈন্যদলে।। 
সঙ্গে লও লজ্জী ধৃতি ক্ষমা তিন জনে। 
শম দম আদি সৈন্যে সাজাও যতনে ।। 
বিলম্ব আলম্ব তাহে করা যোগ্য নহে। 
মজিল বিপক্ষকুল অকৃল কলহে।। 
বিবেকআজ্ঞায় লজ্জা ধৃতি ক্ষমাসনে। 


১৯৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


যুদ্ধেতে সাজিল মন্ত্রি লয়ে সৈন্যগণে।। 
রঙ্গভূমে দেখি কাম সৈন্যের তরঙ্গ। 
যুদ্ধে জুদ্ধভাব তেজি ভাবিল আতঙ্গ।। 
মনমথ মহাবেগে মোহনাস্ত্র ধরি। 
প্রহারে প্রথমে দোষ দৃষ্টিসৈন্যোপরি || 
তাহে পুনঃ কুসংক্কারে চাঞ্চল্য ম্ততা। 
লজ্জা ধৃতি ক্ষমা প্রতিপ্রহারে সবর্বথা।। 
একে তো মোহনবাণে মুগ্ধ সবর্বজন। 
অধিকন্তু পরস্পর করে আক্রমণ ।। 
কুসংস্কার আগেতে লজ্জার কেশে ধরি। 
নামায় নয়ন রথ হৈতে শীঘ্র করি।। 
তাহে সে কামিনীকুচকুস্ত করি ভর। 
কুসংস্কার সঙ্গে করে প্রচণ্ড সমর।। 
তবে সে শৃঙ্গাররুচি নামেতে রাক্ষসী। 
প্রহারে লজ্জারে আসি কামিনীবক্ষসি।। 
তাহাতে কম্পিতা হয়ে লজ্জা অতিশয়। 
ভয়েতে প্রবেশে গিয়া মদনআলয় || 
লজ্জার ভগিনী এক আছিল বামতা। 
সহায় হইল রণস্থলৈ আসি তথা ।। 
তাহে রতি শূঙ্গাররুচির পক্ষ হয়ে। 
বিনাশে লঙ্জারে পেয়ে পতির 'নিলয়ে।। 
সেকালে চাঞ্চল্য গিয়া ধৃতিসনিধানে। 
ঘোর যুদ্ধ করে দৌহে বিবিধ বিধানে ।। 
চাঞ্চল্যের পরাক্রম সহিতে না পারি। 
ভঙ্গ দিল ধুতিদেবী রণভূমি ছাড়ি।। 
সেইরূপে মন্ততা করিয়া আগমন। 
ক্ষমায় তেজিয়া ক্ষমা করে মহারণ।। 
হুস্তাহত্তী কেশাকেশী দস্তাদস্তি ভাবে। 
পরস্পর যুদ্ধ করে আপন প্রভাবে ।। 
ক্ষমার ক্ষমতা যাহা আছিল সঙ্গরে। 
নাশে তাহা মক্ততার উন্মস্ত সমরে।। 
অতএব মনে বহু পাইয়া আতঙ্গ। 
রণস্থল তেজি ক্ষমা ভয়ে দিল ভঙ্গ। ৷ 


১৯২ 


তবে কামসৈন্যগণ করি রণ জয়। 
আনন্দে করিছে রব সবে জয় জয়।। 
নানা বাদ্য বাজে তাহে করি ফোলাহল। 
ডম্ফ জগঝন্ফ বেণু বীণা সুমঙ্গল।। 
শর আকর্ষণে শ্রান্ত আছিল মদন। 
পুস্পনীরে সৈন্য তারে করিল সিঞ্চন।। 
দোযদৃষ্টি মুগ্ধভাব তবে পরিহরি। 
একা পলাইল পরে অনুতাপ করি।। 
পরে সে সমরজয়ী দু্াস্ত মদন। 
বিবেকে করিছে প্রতিস্থানে অন্বেষণ।। 
তাহাতে শঙ্কট ভাবি বিবেক সুমতি। 
বঙ্গরাজ্য তেজিয়া পলায় দ্রুতগতি।। 
দ্বিজ কহে মনসিজ হয়ে অনুকূল। 
কলিরে অকৃল চিন্তার্ণবে দিল কুল।। 


অথ বসম্ত আগমনে কামিনীদিগের কামোত্তব। 
| দীর্ঘ চতুষ্পদী।। 
নবখতু আগমন, হেরিয়া অবলাগণ, 
কামে হরে অচেতন, বলে একি দায় গো। 
সখি গো কি হলো বল, বসস্ত কি আবার এলো, 
মদন মরে না মোলো, সে কি পুনরায় গো।। 
এ দেখ বনে বনে, ফুটিল কুসুমগণে, 
সদা মলয়পবনে, হানিতেছে শূল গো। 
করিল কামিনীকৃলে, অধিক ব্যাকুল গো।। 
ডালে ভালে পিকৃ্‌গণ, করে প্রিয় আলাপন, 
প্রিয় বিনা কার মন, তাহাতে জুড়ায় গো। 
কাস্ত যার দেশাস্তরে, বসন্তে সে দুঃখাস্তরে, 
সদা বিরহ কাস্তারে, কান্দিয়া বেড়ায় গো।। 
আমাদের প্রাণেশ্বর, হয়েছে বেকার গো। 
আছিল যে পুবর্ধন, সে ধন হোলো নিধন, 
বাকি আছে প্রাণাধন, তা চায় আবার গো।। 
১৯৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


যৌবন নিবিড় বনে, বিচ্ছেদ দাবদাহনে, 

দ্ধ হই ক্ষণে ক্ষণে, তথাপি না ছাড়ে গো। 
সদা বলে দেনা কর, আমাদের দেনা কর, 
হল্যে কি নৃপতিকর, কেবা কোথা পাড়ে গো।। 
মনে হয় কর লাগি, হই নিজাকরত্যাগী, 
কলক্কনিকরভাগী, হব বল্যে ডরি গো। 

হেন কে আছে সুহৃদ, কাহারে সুধাই হিত, 
হিতে হয় বিপরীত, সেই ভয়ে মরি গো।। 
এক রাম বলে সই, কেন এত জ্বালা সই, 
প্রাণ বিনা প্রিয়া কই, আছে ত্রিলোকিতে গো। 
যদি দেহ ছাড়ে প্রাণ, কি করিবে কুল মান, 
কুলেতে অনল দান, করি ভাবি চিতে গো।। 
সদা করি লোকাপেক্ষে, নিবারি এ বারি চক্ষে, 
কত বা বহিব বক্ষে, যক্ষের সম্পদ গো। 
যদি মনোমত পাই, তবে এ জ্বালা নিবাই, 
সুখ পারাবারে যাই, তেজি এ বিপদ গো।। 
মৃদু মৃদু রাপে ভাসি, কহে আর রূপরাশি, 
দুঃখের উপরে হাসি, শুন বলি তোরে শো। 
একে এ পোড়া মদন, পোড়াইছে সবর্বক্ষিণ, 
তাহে যে দেখি স্বপন: আজি নিশিভোরে গো।। 
তোমারে কহিতে তাই, মুখে হাসি এসে ছাই, 
যেন ভাসুর ঝি জামাই, আসি মোর কাছে গো। 
মোর দুটি পয়োধর, উপরেতে ধরি কর, 
দিয়া অধরে অধর, চেপে ধরে পাছে গো।। 
আমি যত করি মানা, তবু কি গো মানে মানা, 
হৃদে তুলে লয়ে নানা, করয়ে কৌশল গো। 
লাজে উপজিল সুখ, প্রেমেতে পুরিল বুক, 
তখন তেজি বৈমুখ, দিনু তারে কোল গো।। 
সে কার্য হইল সাঙ্গ, আবেশে অবশ অঙ্গ, 
শেষে হয়ে নিদ্রাভঙ্গ, আতঙ্গেতে মরি গো।। 
তোর দিব্য কোরে কই, সেবধি গো প্রাণ সই, 
, আমাতে তো আমি নই, বল কিবা করি গো।। 
তবে অন্য নারী কয়, শুন মোর পরিচয়, 


১৪৯৪ 


বলিতে বলিতে হয়, তবু লাজ পায় গো। 
কালি পরদেশে হোতে, বনিপো এল বাটাতে, 
হয়েছে ভালো দেখিতে, থাকিয়া তথায় গো।। 
মুখে মৃদু মৃদু হাসি, বলে এলো মাসি মাসি, 
হেরে মুখ সুধারাশি, ভূলে গেল মন গো। 
নিশিতে করে সোহাগ, হেরি সে অধর রাগ, 
মনে মনে অনুরাগ, ধরিয়া তখন গো।। 
অধরে চুম্বন আশে, তান্বুল লইয়া পাশে, 
মধুর মধুর ভাষে, সম্ভাষি তাহারে গো। 
আহা আমি মরে যাই, লয়ে তোমার বালাই, 
কতদিন দেখি নাই, বনিপো তোমারে গো।। 
করি এত আলাপন, সে চান্দ মুখচুম্বন, 
করিতে হরিল মন, মদন অমনি গো। 
থর থর কাপে অঙ্গ, উথলে প্রেম তরঙ্গ, 
ভাগ্যে না ঘটিল সঙ্গ” সেকালে তখনি গো।। 
বলে আর রসবতী, এ নহে আশ্চর্য্য অতি, 
কামের কুটিলগতি, বুঝা অতি ভার গো। 
যদি নিজবিবরণ, করি সবে প্রকাশন, 
জানিবে সব কারণ, এখনি তাহার গো।। 
এ নব বসস্তকাল, কামিনীকুলের কাল, 
মনে মানি সুজগঞ্জাল, একে তা সদাই গো। 
হয়েছে যে প্রতিকুল, তাহাতে ডরাই গো।। 
হয়ে দুঃখ পরাধীন, সে দিনে গো সারাদিন, 
যেন বারি ছাড়া মীন, লুষ্ঠিত ধুলায় গো। 
শয়নে আছি বিরসে, দাদার শয্যায় গো।। 
দাদা গেছে স্থানাত্তর, বধূ করে ক্রিয়াস্তর, 
আমি তাপিত অন্তর, হইয়ে সজনি গো। 
আছি গৃহ অন্ধকারে, কেবা বল দেখে কারে, 
দাদা অবিজ্ঞাত সারে, শুভিল তখনি গো।। 
পেয়ে তার অঙ্গসঙ্গ, আবেশে জাগে অনঙ্গ, 
হে গো সখি সেকি রঙ্গ, তথায় ঘটিল গো। 


৯৪৫ 


দুষ্প্রাপ) বাংলা সাহিত্য 


বধুত্রমে দাদা মোরে, চুম্বন করে অধরে, 
ধৈষ্য কি তেজিয়া ধরে, অমনি ছুটিল গো।। 
সে করে রস সম্ভাষ, মোর মুখে নাহি ভাষ, 
করেতে পেতে আকাশ, বাকি নাহি ছিল গো। 
মত্ত হয়ে সে তাহাতে, দিল ফল হাতে হাতে, 
হৌক মেনে যাতে তাতে, প্রাণ তো বাঁচিল গো।। 
পূর্ণ হইল অভিলাষ, ফুরাইল রতিরাস, 
লাজে উপজিল ত্রাস, দাদা পাছে জানে গো। 
তবে না জানি কি হয়, প্রাণ মান কিসে রয়, 
বিধাতা হয়ে সদয়, রাখে মানে মানে গো।। 
সেবধি গিয়াছে শরম, হয়েছে দারুন কম, 
এমতে কি ধর্ম্াধম্মর কিছু রাখা যায় গো। 
শেষে যা হরেন হরি, কিছু দিস্তো সুখ করি, 
মিছা কেন ভেবে মরি, মদনের দায় গো!। 
এরূপে সে রামাগণ, কামে হয়ে অচেতন, 
করে নানা অকরণ, করিতে মানস গো। 
গুণনিধি হেসে কয়, কলিরকলুষাশয়, 
ভাবিলে কি কভু হয়, এমন সাহস গো।। 


অথ যুবাগণের বিবেকনাশ। 
স।পয়ার।। 


কলির আদেশে কাম করিয়া যতন। 
বসস্ত সামত্ত সঙ্গে করয়ে শাসন।। 
তরুতে মুগ্জরী হয় গুপ্জরে ভ্রমর। 
কোকিলার কলরবে করয়ে ফাপর।। 
বহিছে সুগন্ধ মন্দ তাহে সমীরণ। 
মদনশাসনে কিসে ধৈর্য্য হবে মন।। 
যুবাগণ প্রস্ফুটিত হেরি তরুলতা। 
প্রকাশিল সবে মনসিজ তরুলতা || 
শিথিল হইল জ্ঞান বিবেক সবার। 
কামেতে কামিনীময় দেখে এসংসার।। 
সবে বলে গেল গেল যাগ যোগ আদি। 
কেমনে এমনে মনে করিব সমাধি।। 


১৯৩ 


গেল গেল বেদবিদ্যা বিনয়িতা সব। 
বণিতা বিনোদ বিনা সকলি কৈতব।। 
হায় হায় হলোনাক ভজন সাধন। 
ধৈর্য্য ধর্ম আদি সব ধবংসিল মদন ।। 
লভয়ে নিবর্বাণ সুখ যাহার পরশে ।। 
কেহ বলে ভ্রমজালে গেল, চিরদিন। 
যুবতীযৌবন জলে না হইয়া মীন।। 
নারী কি অধুল্য ধন নারি চিনিবারে। 
বেদবাদ বিপিনেতে ঘুরি বারে বারে।। 
আনন্দ চিন্ময় রস ব্রন্ম বেদে কয়! 
কামিনীর কলেবরে সে করে উদয়।। 
শিবশান্ত্রে শুনেছি সে সাধন বিশেষ। 
তবে কেন কুরস সেবনে পাই ক্রেশ।। 
অন্যে কয় পাপালয় হয় যদি নারী! 
তথাপি তাহারে কভু তেজিতে না পারি।। 
সুখ দুঃখ ভিন্ন আর কোন বস্তু আছে। 
আগে সুখ করি নহে দুঃখ হবে পাছে।। 
পরলোকে হৈলে দুঃখ কে দেখিবে পরে। 
এখনতো করি মজা ঘরে কিম্বা পরে।। 
আর জন কহে এত কেন ভাব ভাই। 
বমণীসঙ্গমে পাপতাপ কিছু নাই।। 
“রা বা ভজিল শশধরে কি প্রকারে ।। 
ব্রন্গা হয়ে কেন বা দুহিতা কাছে যায়। 
সদাশিব কেন সদা কুচিনী পাড়ায়। । 
বৃন্দাবনে বিঝু দেখ ব্রজনারী লয়ে। 
তা হৈলে রমিবে কেন লোকনাথ হয়ে।। 
অতএব মিছা কেন আতঙ্গেতে মরি। 
সুখেতে গোঙাই কাল নাবী হৃদে ধরি।। 
কামিনী কাম কাননে করিয়া শয়ন। 
মদন রস অলসে মুদিয়া নয়ন।। 

আর না হেরিব বেদরূপা বিষলতা ৷ 
শ্রবণেতে না শুনিব শাস্ত্রের খলতা ।। 
ব্রাহ্মণ পণ্ডিত গুলা হয় মহাভগু । 


১৯৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


নাহি দেখি তা সবার সমান পাষণ্ড ।। 
শুনি পাপ করি পাপী পরে দণ্ড পায়। 
জীবিত শরীরে দণ্ড ভণ্ডের হেথায়।। 
শীত বর্ধা নাই প্রাতে ন্নান করি মরে। 
একাহারে আলু ভাতে কচু সিদ্ধ করে।। 
তৈল বিনা অঙ্গে খড়ি উড়ে সবাকার। 
শবীরের গন্ধে কাছে থাকে সাধ্য কার।। 
পান বিনা মুখে মাছি উড়ে চিরদিন। 
উপোসে উপোসে হয় তনু অতি ক্ষীণ|| 
পঞ্চপবের্ব পরশ না করে নিজজায়া। 
হায় কেন সেসবে বঞ্চিল মহামায়া। । 
আপন!দিগের নিত্য দুর্দাশা যেসন। 
অন্যে জিজ্ঞাসিলে আপনার মত কন।। 
পরে সুখ হবে বলি এবে পায় দুখ। 
বু পোড়া মুখ ]। 
সুখহেতু ইন্দ্রিয় দিলেন ভগবান। 
তারে কষ্ট দেয় যত ববর্বর প্রধ/ন।। 
পণ্ডিতের ভগুতায় আর না ভুলিব। 
নিজ অভিপ্রায় অন্যে কেন বা বলিব।। 
গোটে হেল করি যত আপদ বালাই । 
হোটেলে করিব বাস ভাবিয়াছি তাই।। 
আরমাণী বিহনে কি মিটে আরমান। 
আর মানি কেন লোকে হারাই কল্যাণ।। 
যে জন না দেখিয়াছে বেলাতী যোড়শী। 
সেই বলে সুললনা স্বর্গের উবর্বশী।। 
এইবাপে যুবাগণ তেজিল বিবেক। 
ুণনিধি কহে ইহা নহে অতিরেক।। 


অথ আদিরস রাজা বেশে কলির তন্মহিবীতে উপগতি। 
।[লঘুত্রিপদী।। 
চলিল সে বঙ্গদেশে। 
বিক্রমনগরে, নৃপতির ঘরে, 
সুখভরে সুপ্রবেশে।। 
১৯৮ 


কলিকুতুহল 
আদিসুর নাম, নানা গুণধাম, 
মহারাজ গৌড়মণি। 
রূপে যিনি শশী, বয়সে ষোড়শী, 
রাজার নিজ ঘরণী।। 
কিবা মুখশোভা, মুনিমনোলোভা, 
পর্ক বিল্বফলাধর। 
ভ্রধনু সুন্দরতর || 
সুকুঞ্চিত কেশ, সে মোহন বেশ, 
হেরি ভুলে রতিপতি। 
নিতম্ব বিশাল, তাহে কাধ্ধীজাল, 
সুশোভিত হয় অতি।। 
মধ্য অতিক্ষীণ, কুচযুগ পীন, 
ভুজ কল্পতাপ্রায়। 
তুলনা তুলিতে চায়।। 
মুখে মৃদু হাসি, কত সুধারাশি, 


বরিমে বচনছলে। 
নানা আভরণে, অঙ্গের কিরানে, 
বিশাল তিমির দলে ।! 
তাহার নিকটে, মনের কপটে, 
আদিসুর রাজবেশে ! 


উপনীত কামাবেশে।। 
রাজআগমন, করিয়া মনন, 
আদরে নৃপর্মণী। 
করিয়া সম্মান, আসন প্রদান, 
করিল মুগনয়নী !। 
মৃদু মৃদু হাসি, বর্ষি স্ধারাশি, 
বাজার মহিধী কম। 
একি ভাগ্যোদয়, মম আনি হয়, 
সুপ্রসনন দেবচয় ।। 
যে কারণবলে, অতিপুণ্যফলে, 


১৯৯৯ 


দু্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


গিয়া খতুরক্ষা কর। 
তবে অশংসয়, হইবে তনয়, 
তব কুলশশধর || 
অতএব রাণী, শুন মম বানী, 
বিলম্ব উচিত নয়। 
গোডাইব এসময় || 
এতেক বচন, করিয়া তখন, 
ধরিয়া রানীর করে। 
মদন পালক্কোপরে || 
করিয়া যতন, দৃঢ় আলিঙ্গন, 
মহিষবীরে ঘন করে। 
তাহে মনমণথ, হুইল উন্নত, 
প্রেমেতে তনু শিহরে।। 
কটির বচন, করিল মোচন, 
অধর চুন্দিয়া ঘন। 


রাজার ঘরণী, নবীন তরণী, 
তরঙ্গে ভাষয়ে তায়।। 
ঘন শীতকার, পুলক বিস্তার, 
অবশ করিল দেহ। 
রতির অলসে, অধর সুরসে, 
ঘন করে অবলেহ।। 
অঙ্গে স্ব্দে জল, ব্যাপিল সকল, 
মদন অনল তায়। 
হয়ে অতিশয়, দ্বিগুণ জুলয়, 
কি অদ্ভুত দেখি হায়।। 
এরূপে দুজন, রস আলাপন, 
করিতেছে রতিঘরে। 
কহে গুণনিধি, অবাধিত বিধি, 
লিঘতে কি পারে নরে।। 


অথ কলিঅংশে বল্লাল সেনের জন্ম এবং কুলময্যাদা সংস্থাপন। 
।|পয়ার || রর 


এইরূপে রতিরঙ্গ করয়ে দুজনে। 
হেনকালে নরপতি প্রবেশে ভবনে ।। 
বাহিরে থাকিয়া শুনি রতিকোলাহল। 
ক্রোধেতে হইল রাজা অধিক বিহ্ল।। 
জানিল রাণীর হইয়াছে দুষ্টচিত। 
কহিয়াছে হুঙ্কার করি করাল চেষ্টিত।। 
অরে দ্বিচারিণী কুলকলঙ্ককারিণী। 

হেন দুষ্টাচার তোর কেন লো পাপিনী।। 
চিকুরে ধরেছে বুঝি তোমার শমন। 
নতুঝ। এরূপ কেন হইবে করণ।। 
দ্বার অবরোধ মুক্ত করি পাপীয়সী। 
দেখহ কেমন আমি আনিয়াছি অসি।। 
নৃপবাক্য শুনি রাণী ভাবে একেমন। 
বাহিরে আবার মোরে করে কে তর্জন।। 
নৃপতি সঙ্গেতে আমি করি এ বিহার। 
বাহিরে তাদূশ কেবা গর্জে বার বার।। 


২০১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


এত চিত্তি নৃপবরে কহিছেন রাণী। 
কে তুমি বাহিরে এত কহ ভ্রুরবাণী।। 
কার জোরে বাড়িয়াছে এতেক সাহস। 
মরিতে কি তোর এবে হয়েছে মানস।। 
গৃহেতে আছেন রাজা গৌড়দেশমণি। 
তাহারে উত্ত্যক্ত করা ভাল নাহি গণি।। 
পলায়ন কর যদি চাহ নিজহিত। 
নতুবা এখনি শাস্তি পাইবা উচিত।। 
মহিবীর মুখে শুনি এরূপ বচন। 
ভাবিছেন মহারাজ এ আর কেমন ।। 
মত্ত হইয়াছে বুঝবি করি মধুপান। 
সেই কহিতেছে হেন বাক্য অপ্রমাণ।। 
অথবা থাকিবে ইথে অপর কারণ। 
নতুবা কি ঘটে মোরে এমন কথন ।। 
ইহা ভাবি পুনঃ কোপে কন নৃপবর। 
কবাট মোচন কর পাঁপিনী সত্বর।। 
কোন্‌ রাজা আছে ঘরে দেখিব বে-খন। 
মদিরা মক্ততা তোর করিব নাশন।। 
রাণী বলে মরিতে ধরেছে তোর দিন। 
নতুবা কহিবি কেন বচন কঠিন।। 

এত বলি উঠি দ্বার মোচন করিয়া। 
দেখিল বাহিরে রাজা আছে দাঁড়াইয়া ।। 
রাণী ভাবে একি দায় হইল ঘটন। 
নৃপতির মত কেন দেখি আর জন।। 
দ্বার মুক্ত পেয়ে রাজা প্রবেশিল ঘরে। 
হেরিল কলিরে গিয়া পালক্ক উপরে ।। 
নিজ সমরূপ বেশ আচার তাহার । 
হেরিয়া নৃপতিমনে লাগে চমৎকার || 
মনে ভাবে কে বটে এ বুঝিতে না পারি। 
কপট বেশেতে কে হরিল মম নারী ।। 
পুবের্ব যেন ইন্দ্র ধরি গৌতমের বেশ। 
অহল্যা নিকটে করেছিল সুপ্রবেশ।। 
সেহরূপ এই বুঝি কোন দেব হবে। 


২০২ 


অসুর কিন্নর কেবা আসিয়াছে ভবে।। 
নতুবা হইবে ভূতযোনি এই জন। 

না জানি ইহারে করা না হয় শাসন।। 
আগেতে জিজ্ঞাসা করি কেবা এই হয়। 
পশ্চাতে করিব যাহা বুঝিব নিশ্চয় ।। 
এত চিস্তি জিজ্ঞাসা করেন নৃপবর। 
কে তুমি আমার বেশে পালঙ্কউপর।। 
দেব উপদেব কিম্বা গন্ধবর্ব দানব। 
রাক্ষস পিশাচ যক্ষ অথবা মানব।। 
কপটে মহিষীপুরে করি প্রবেশন। 
কিহেতু করিলে তার ধর্ম বিনাশন।। 
শুনিয়া ভাবিছে কলি মানিয়া সংশয়। 
নিজ পরিচয় দেওয়া এবে যোগ্য নয়।। 
তাহে যদি ভয় পেয়ে বিনাশে সম্তভান। 
তবে না হইবে মম কায্য সমাধান ।। 
অতএব অন্যরূপে দিব পরিচয়। 
যাহাতে রাজার মন ক্ষুব্ধ নাহি হয়।। 
এত চিস্তি কহে কলি শুনহ রাজন। 
বন্মপুত্র নদ আমি নহি অন্যজন || 
তব মহিবীর রূপ লাবণ্য হেরিয়া। 
আসিয়াছি আমি তব স্বরূপ ধরিয়া।। 
ক্রোধ তেজ মহারাজ নহ ক্ষুননাশয়। 
ইহার গর্ভেতে তব হইবে তনয়।। 
রূপে গুণে পরিপূর্ণ পরম সুধীর। 
তাহার উদয়ে সুখ হবে পৃথিবীর || 
ঘুষিবে পুত্রের যশঃ তব ব্রিলোকেতে। 
৪খ নাহি রাজা কিছুমাত্র চিতে।। 
ইহা বলি কলি তথা হইল অস্তর্ধান। 
নৃপতি করিল ক্রোধভাব সমাধান ।! 
ক্রমশঃ হইল পূর্ণ সে গর্ভ তাহার। 
হইল তাহাতে কলি অংশ অবতার! 
রাখিল বল্লাল নাম তাহার ভূপতি ' 
নানা গুণগণে হৈল সে ভূষিত অতি,' 


১০০৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কিছুকাল পরে পুত্রে দিয়া রাজ্যভার। 
পরলোকে অবস্থিত হইল রাজার।। 
বল্লাল হইল রাজা বিভ্রমনগরে। 
শীলতাতে সস্তুষ্ট করিল সব নরে।। 
পরে বঙ্গদেশ নানা অংশেতে বিভাগ । 
করিয়া শোধিল জাতিমালা মহাভাগ।। 
্রান্মাণ প্রভৃতি যত ছিল বর্ণগণ। 
তাৎকালিক সে সবার হেরি আচরণ । 
শ্রেণীমত কুলধর্্ম নিবদ্ধ করিল। 

যে সবার বংশে এবে ভুবন ভরিল।। 
বিদ্যা-বুদ্ধি বিনয়িতা আদি সে সবার। 
যেমন হউক কিন্তু কুলে মহাসার।। 
এ শ্রীনারায়ণ নিজে সবর্ধানন্দী হয়। 
তথাপি দিতেছে কিছু কুলপরিচয়।। 


অথ কুলীনের পব্রিচয়। 
। অস্ত যমক || 

কলি অনুকূল হয়ে করিল কুলীন। 
সংসারে তেমন কোথা আছয়ে কুলীন।। 
জাতির যেমন হউক কুলে বড় আঁটি। 
শস্যহীন আন্রতক যেন সার আঁটি।। 
কুলঅভিমানে পদ না পরে ধরাতে। 
সঙ্জন সঙ্ঘ্যায় কিন্তু না পড়ে ধরাতে ।। 
বুদ্ধিতে বলদ বিদ্যাভাসে সিদ্ধি ফলা। 
অলগ্রলতাতে কে দেখেছে সিদ্ধিফলা ।। 
শ্রীবিঞ্চ বলিতে কষ্ট তুষ্ট ভোজ ভাতে। 
করেন বার্তীকু দগ্ধ নিত্য পরভাতে ।। 
খাইতে উৎসুক বড় ভায্যঠাউপাজ্জন। 
নির্লজ্জ নির্ধন নারী তেজয়ে দুর্জন || 
, ব্লাজকরহেতু যদি ধরে জমিদারে। 
দার লাগি তখনি ভ্রমেন দ্বারে দ্বারে ।। 
বিবাহসন্বন্ধে হয় আনন্দ বিশেষ। 
দুহিতা জন্মিলে পরে দুঃখ বহু শেষ।। 


২০৪ 


অধিক সৌভাগ্য এই উল্লাস জনক। 
বিনা শ্রমে হতে হয় পুত্রের জনক।। 
অকুলীন দ্বিজঅন্নে আছয়ে বিচার। 
দোষ নহে কিন্তু নারী কৈলে ব্যভিচার।। 
অশিষ্ট অপর কেবা তা সবে সমান। 
বিশিষ্টসম্ভান বলি তথাপি সমান।। 
পিতা পুত্রে অনেকের নাহি পরিচয়। 
কুলীনের ছেলে বলি তবু গবর্চিয়।। 
বিবাহের কালে গোত্র সুধায়ে না পাই। 
বিশিষ্ট বরেতে নাই শিষ্ট এক পাই।। 
পৃবের্ব শুনি যণ্ডামর্ক ছিল দুই জন। 
কুলীনের কুলে তাহা হেরি জনে জন।। 
অকালকুম্মাণ্ড বলি ছিল এক রব। 
কুলীনে হেরিয়া তাহা হয়েছে নীরব।। 
এইরূপ আর যত আছে ব্যবহার। 

কি কহিব কিন্তু তবু সে গলার হার। 
এ শ্ীনারায়ণ কহে শুন বন্ধুগণ। 
ভাবিলে কুলীনকৃত্য নিরখি গগন।। 


অথ কুলীন কন্যাগণের দুর্গাতি। 
|[ত্রিপদী।। 
বল্লাল বান্ধিল কুল, বঙ্গদেশ হুলুস্থুল, 
কুলে বড় বাড়য়ে সম্মান। 
নিকোষ যেজন থাকে, নিজকুল মান রাখে, 
কুলভঙ্গে ক্রমে অসম্মান।। 
ঘরে কন্যা আইবড়, ক্রমে হয় যত বড়, 
জড় সড় লোক লাজ ভয়ে। 
স্ত্রীধর্ম্মেতে ধর্ম যায় বয়ে।। 
মেল মত হবে ঘর, মনোমত পাবে বর, 
তবে কন্যা করিবে পাত্রস্থ। 
খুঁজিতে খুঁজিতে দেশ, দেখিতে শুনিতে শেষ, 
কন্যাকাল হয়ে যায় অত্ত।। 
২০৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


এইমত কত শত, নাহি পেয়ে মনোমত, 
কুল দায়ে কন্যা রাখে ঘরে। 

পতি বিনা পায় দুঃখ, অন্বরে সম্বরে দুঃখ, 
জ্বর জ্বর মন্মথের শরে।। 

বলে হায় হায় বিধি, বিদরিয়া যায় হৃদি, 
হৃদিশ্বর করিয়াছ কারে। 

কুলীনেতে জন্ম দিয়া, পাসরিয়া গেলে বিয়া, 
যায় প্রাণ যৌবনের ভারে ।। 

এই যে বসস্তকাল, বিরহি জনার কাল, 
ডালে ডালে কোকিল কুহরে। 

পুস্পময় কুঞ্জে কুঞ্জে, অলিকুল পুঞ্জে পুঞ্জে, 
গুঞ্জে গুজে মধুপান করে।। 

মন্দ মন্দ গন্ধ বহে, মন্দ মন্দ গন্ধ বহে, 
সুমান্দ্য মলয়াযুত হয়ে। 

বিরহিরে বাজে শুল, কি করে এ ছার কুল, 
জনক থাকুন কুল লয়ে।। 

অঙ্গেয়ে বল্লাল পোড়া, এ দুঃখ দিবার গোঁড়া, 
নিজে জাতি সঙ্কর আছিল। 

জগতে আপনমত, করিবারে শত শত, 
সঙ্করের বীজ -আরোপিল।। 

প্রাণসম প্রিয় নাই, তারে আগে রাখা চাই, 
তারপর ধন-মান-কুল। 

হবে যা কপালে আছে, মনোমত কারু কাছে, 
এইবার খশাব দুকুল।। 

মনে এই দিয়া পাড়া, কুল কন্যা পাড়া পাড়া, 
পাড়া করে সাড়া নাহি মানে। 

অধিক কি কব বাঢ়া, নাহি যায় দিলে তাড়া, 
ঠাট করে যেবা যত,জানে।। 

সবে করে সযতন, কিসে পুরুষের মনঃ, 
মজে ভজে বিনা-উপাসনা। 

নব নব রসরঙ্গে, করে কত ভঙ্গী অঙ্গে, 

ৃ শশীমুখে হাসে কত জনা ।। 

অস্তর দহিছে তাপে, কেহ মোহে রসালাপে, 


২০৩৬ 


কোকিল জিনিয়া প্রিয়রবে। 
কেহ মলধ্বনি করে, পুরুষের প্রাণ হরে, 
বজসম সে রব কে সবে।। 
স্বর্ণলতা সম দেহ, সরু বন্ত্র পরি কেহ, 
জলক্রীড়া করি যায় ঘরে। 
দৃষ্টিমাত্রে মনঃপ্রাণ হরে।। 
হিরা কাটা স্বর্ণ বালা, যত্বে পরে কোন বালা, 
রসভরা রসকলি নাকে। 
নিতন্বেতে চন্দ্রহার, যেন শোভে চন্দ্রহার, 
সে শোভায় কেবা সভ্য থাকে।। 
মনঃ ভুলাবার মুল, খোঁপায় টাপার ফুল, 
উদাস করয়ে যার বাস। 
তান্থুল চবর্বন করা, ওষ্ঠাধরে রাগধরা, 
সে মুখের হাসি সবর্বনাশ।। 
ধরিতে পুরুষটাদ, এইমত কত ফাঁদ, 
কাদে যত কুলের কামিনী। 
পোহাইছে জাগিয়া যামিনী।। 
পরদারা স্পর্শ নাহি করে। 
কলিকে না করে ভয়, রণে করে পাপ জয়, 
্রুতস্মৃতি পুরাণান্ত্র করে।। 
হাড়ি ডোম চণ্ডালাদি, নবে কেন প্রতিবাদী, 
যারা নাহি জানে নীতিকণা। 
দেখে মনোমতাচার, পশ্চাৎ না ভাবে আর, 
ফাঁদে পড়ে সেইসব জনা । । 
নড়ে চড়ে আঁচড়ে সর্বাঙ্গ। 
প্রাণ করে ছটফট, হদ্দ পাজি নটখট, 
চটপট হৈলে হয় সাঙ্গ ।। 
এরূপ নাগরীচয়, কোনমতে কায লয়, 
শেষে হয় লোকলাজভয়। 


২০৭ 


দু্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ক্রমে গৃহে গুরুজন, জ্ঞাত হয়ে বিবরণ, 
ওমা সেকি কানাকানি কয়।। 
হয়েছে গিয়েছে মারা, তার আর কিবা চারা, 
হারাধনে ভেবে কিবা করে। 
বহু কন্যা এক এক বরে।। 
যেজন সকৃত ভঙ্গ, ভূমিতে না পড়ে অঙ্গ, 
শতেক দুশত যার নারী। 
যেখানে সেখানে যায়, জামাই আদরে খায়, 
মুদ্রা লইবারে বাঢ়ে জারি।। 
দেহ কিবা রাখিয়াছ মান। 
টাকা পেলে হন খুশি, নতুবা মারেন ঘুষি, 
তৎক্ষণাৎ উঠি চলি যান।। 
নারী বলে একি ভাব, আমার অবস্থা ভাব, 
কোথা পাব তুমি নাহি দিলে। 
স্বামী কহে থাক থাক, সাতপাঁচ তুলে রাখ, 
সোজা বল মিলে কি না মিলে।। 
যেতে হবে বহু ঠাঁই, চালে মম খড় লাই, 
টাকার হয়েছে প্রয়োজন। 
নতুবা এদূরদেশে” কোন জন বল এসে, 
ঘরে নাহি হৈলে অনটন।। 
দুচারি বৎসর পরে, যদি পতি পায় ঘরে, 
তাহে হয় এরূপ ঘটন। 
টাকা দেহ এই বুলি, প্রায় হয় চুলাচুলি, 
দ্বদ্দে হয় রজনী বঞ্চন।। 
ইথে কী সতীত্ব থাকে, জাতিকুল কেবা রাখে, 
বিবাহ সে সংস্কার মাত্র। 
যার যাতে মন মজে, সে জন তাহারে ভজে, 
ছোট বড় নাহি পাত্রাপাত্র।। 
স্বভাবের গুণ বাহা, অরণ্যে জন্মায় তাহা, 
কেহ রাখে কেহ করে পাত। 
জ্ফিতি পে হয় বাকী, োনমতেতে দেয় ডক, 


২০৮৮ 


ফেলে সারে জামাহর পাত।। 
এইরূপে ধরাতলে, বর্ণসঙ্করের দলে, 
ক্রমে ক্রমে অনেক ব্যাপিল। 
যজ্ঞসূত্র গলে ধরি, বেদ উচ্চারণ করি, 
বর্ণশ্রেন্ঠ ব্রাহ্মণ হইল ।। 
তারা করে যোগাযোগ, ধর্মের বাড়য়ে রোগ, 
কলির উৎসাহ জন্মে মনে। 
এইরূপ দিন দিন, ধন্ম্ম কর্ম হয় ক্ষীণ, 
ডাক প্রাণ কৃষ্ণ নারায়ণে।। 


অথ অকুলীন ব্রান্মণদিগের বিড়ম্বনা । 
।।পয়ার || 


অর্থ স্বার্থ যোগাযোগ যাদিগের রয়। 
যোগে যাগে তাদিগের হয় পরিণয়।। 
নতুবা কিরূপে পিতৃবংশ রক্ষা পাবে। 
তাহা ভাবি কাল যায় একভাবে ।। 
জন্মাবধি কেহ করি উপার্জন। 
করিতে না পারে বিবাহের আয়োজন ।। 
তথাপি মনের আশা ক্ষাস্ত নাহি হয়। 
সদা ভাবে বিধাতা কি হবে না সদয়।। 
কানা খোঁড়া কুজা যদি এক নারী পাই। 
তবুতো আমারে কেহ বলয়ে জামাই ।। 
পাড়ায় জামাই যত আইসে লোকের। 
তাহারা বাড়ায় সিন্ধু আমার শোকের।। 
হায় বিধি কেন মোরে নিদারুণ হলি। 
কাস্তা লাগি কত না বেড়াব গলি।। 
ঘরকন্না বেচে যদি দিতে পারি পণ। 
তবু বিয়া নাহি হয় বিনা আভরণ।। 
নিশ্চয় বিবাহ হবে যদি যায় জানা। 
সর্ব্বস্থ ঘ্ডীয়ে নেজে করি ম্বেতখানা || 
এ বাজারে একটি নন্দিনী আছে যার। 
| ২০৯ 


দুম্প্রাপা বাংলা সাহিত। 


গবের্বতে তাহার পদ ভূমে পড়া ভার।। 
কত জন আসে কণ্যা বিবাহের খোঁজে। 
গরজে অগ্রিম পণ কত জন গোজে।। 
সন্দেশ মিষ্টান্ন সেই নাহি খায় যার। 
জগতের মধ্যে ছার কপাল তাহার || 
ধন থাকে পণ পায় পাত্র ভাল হয়। 
তবেই বিবাহ দিবে নতুবা তো নয়।। 
কিন্তু কিছু পাত্রের যদ্যপি দোষ থাকে। 
বাড়ায় পণের টাকা তবে থাকে ।। 
তাহাতেও- পরিপূর্ণ নহে অভিলাষ । 
বলে ভালরূপে দিতে হবে অধিবাস!। 
তাহা হৈলে কহে প্রনঃ বিবাহের দিনে। 
বিবাহ হবে না মাতৃপুরক্কার বিনে ।। 
ইহা ভিন্ন কণ্যা দিতে আমি অস্বীকার ।1 
হাদলা তলায় বরে বিবাহের কালে। 
ঝাহয়া নৃতন কথা ফেলায় জঞ্জালে।। 
এসেছে কন্যার মাসী বিদেশ হহাতি। 
তাহারে বিশেষ মান হইবে করিতে ।। 
বহযত্ছে কন্যারে চে করেছে পালন 
তালুর ক্ষপ্ন রাখি করা! আঅনযাগা কবল । 
আঁধিকস্ (সে যদি না কনা দু দিত 
তব না লরি আদি কিছুহু করিতে 
হশুকুল শট যত ভিত দেজ এলীভিা। 


এত বাবর?) সতী, হা গুহ শিকাটি শত 


শুনানি আশার পতণলে সাধ কার 


ল পট 
বক ল্াধাতি তজ বৃশিটিত কু পিজা 


নে 
উস € ৬ শা স্থ এ সপ ৮ 
খচিত চি? রর উর 2 রা গা রে শশা রি 


কলিকুতৃহল 
ভাগ্যবশে আযু তার হৈলে সমাধান। 
পৃথিবীতে করা হয় জলছত্র দান।। 
কেহ বা বিবাহ লাগি হইয়া পাগল। 
বুদ্ধি শুদ্ধি ছাড়া হয় যেমন ছাগল ।। 
বিবাহের কথা সেই যদি কভু শুনে। 
আহ্াদেতে নাচে গিয়া অন্ধকার কোণে।। 
বিয়া দিব বলি কেহ মোট দিল ঘাড়ে। 
অনায়াসে বয়ে যায় মাথা নাহি নাড়ে।। 
কেহ যর্দি আসে তারে পাত্র দেখা বলি। 
তার আগে যান নাকে কেটে রস কলি।। 
চুল পাকা দেখি যদি কেহ বুড়া কয়। 
তাহে বলে আমার বয়স এত নয়।। 
ক্রোধে পাকিয়াছে মম মস্তকের কেশ। 
বুড়া বলি কেন বাড়াইছ দ্বেষ।। 
তবে যে দেখিছ মম ভেঙেছে দশন। 
বয়োদোষে নহে কিন্তু পীড়ার কারণ । 
মারকুলি খাইয়াছি দুই তিনবার। 
সেইহেতু মুখ হইয়াছে মাড়ি সার।। 
এইরূপে শ্রোত্রিয় বিপ্রের বিড়ম্বনা । 
যত আছে তাহা করা যায় কি বর্ণনা ।। 
দ্বিজ কহে বল্লাল ইহার মূল হয়। 
কুলাকুল বদ্ধ যেই করে সমুদয়।। 


অথকলির শ্ত্রীপুরুষ প্রভৃতির ব্যবহার । 
।পয়ার।। 

ধন্য ধন্য কলি করি নমক্কার। 

যত কিছু বিঘটন সকলি তোমার ।। 
তোমার প্রতাপে এইসব প্রজাগণ। 
করিতেছে সবে বহুবিধ অকারণ ।। 
পতি জায়া প্রভৃতির যেন ব্যবহার । 
তব রাজ্যে হয়েছে তা কি বর্ণিব আর। 
বিধি করি বিয়া করি যারে ঘরে আনে। 


২১৯ 


দুষ্প্রাপা বাংলা সাহিত্য 


অমুল্যে বিক্রীত লোক হয় তার স্থানে ।। 
শন্ত্রে শাস্ত্রে যেজন জিনেছে সবদেশ। 
রমশীভুভঙ্গে ভঙ্গ সেও সবিশেষ ।। 
শান্ত্রে বলে রমণীর গুরু হয় পতি। 
মিথ্যা তাহা কিন্তু নারী পুরুষের গতি।। 
তত দিন মান্য পিতামাতা গুরুজন। 
যত দিন নহে শয্যা গুরুসম্ভাষণ। 
মহাকষ্টে শ্রে্ঠ দেহ পুষ্ট করে যারা। 
ভার্য্যার ভাড়ামি ন্নেহে পর হয় তারা ।। 
স্বগর্ব সম্বন্ধে প্রীতি যেসবার সনে। 
ভিন্ন হয় তাহারা স্বভার্য্যার কারণে ।। 
বরঞ্চ গুরুর বাক্য করয়ে হেলন। 
সাধ্য কি জায়ার কথা করিতে লঙ্ঘন ।। 
অত্যন্ত প্রগল্ভা নারী কলির প্রভাবে। 
পুরুষে পাগল করে কত কৃটভাবে।। 
পতিকোলে থাকি যারা বাঞ্ছে পরপতি। 
ধিক কলিযুগে তারা হয় সতী ।। 
কুকর্ম করিতে খদি কেহ দেখে তারে 
পতির নিকটে তাহা ছলে বলে সারে।। 
কন্দলের ভয়ে স্তব্ধ শাশুড়ী ননদ। 
এমনি কি গুণ ধরে ত্র্যঙ্গুল সনদ।। 
পতি যদি কভু কিছু করে তিরস্কার। 
শুনাইয়া দেয় শত গুণ তার।। 

ভাব্যা পরিতোষ মাত্র করি আকুঞ্চন। 
বেদ ছাড়ি লেচ্ছশান্ত্র পড়ে দ্বিজগণ।। 
নিত্য নৈমিত্তিক কর্ম্মে দিয়া জলাঞ্জলি। 
রমণীর অভিমুখে রহে কৃতার্জলি।। 
নারীমত ভিন্ন কেহ না শ্হয় স্বতন্ত্র। 
ধন্য রমণীর উপদেশ মন্ত্র।। 

মহাকন্টে প্রাণ গান করি পরিক্ষয়। 
ধন আভরণ আদি দিলে তুষ্ট হয়।। 
নহে বলে নীমুখার কপালে পড়িয়া। 
চিরকাল গেল মোর কান্দিয়া।। 


২১২ 


পাড়ার বহুড়ি সুখে পরে অভরণ। 
আমার নহিল কভু সে আশা পুরণ।। 
সধবার হৈল যদি বিধবার সাজ। 
পোড়ামুখ পতি বেঁচে থাকা কোন কায ।। 
হৌক মেনে যদ্যপি বৈধব্য দশা পাই। 
পরপতি ধরি মনোবাসনা পুরাই।। 

কবি কহে ধন্য কলি তোর বলিহারি। 
পুরুষে করিল ভেড়া যত কুলনারী।। 


অথ পৃথিবীতে শ্রীচৈতন্যাবতারের বিবরণ। 
|।ত্রিপদী।। 


এইরূপে ধরাতল, ব্যাপ্ত হেলে অবিকল, 
বেদ পথ হেরি লুপ্ত প্রায়। 
শ্রীনারদ তপোবন, পৃথিবী করি ভ্রমণ, 
দেখিলেন তাহা সমুদায়।। 
একি ঘোর কলিকাল, পাতিয়াছে মোহজাল, 
বিনাশিতে বিবেক হরিণ। 
ভারত মরুকানন, দিয়া পাপ হুতাশন, 
সেই দগ্ধ করে প্রতিদিন।। 
একপ সাবশক্কট, জীবের ঘোর শঙ্কট, 
কিরূপে হইবে নিবারণ। 
কেমনে তা হইবে ঘটন।। 
দেখেছি পুরাণ চাই, কলিতে কৃষ্ণের নাই, 
প্রত্যক্ষ রূপেতে অবতার। 
যদি ভক্তবেশ ধরি, অবতীর্ণ হন হরি, 
তবে হয় লোকের নিস্তার।। 
এত চিস্তা করি মনে, উপনীত বৃন্দাবনে, 
নারদকুশ্ডের উপকূলে । 
কৃষ্ে স্তুতি করে নীপমুলে।। 
তাহে তুষ্ট ভগবান, নারদে অভয় দান, 
করি কহিলেন তার প্রতি। 


২১৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আমি বিনাশিব এ সংপ্রতি।। 
গৌড় দেশে আছে ধাম, শ্রীল নবদ্বীপ নাম, 
সুরধনী তীরে চমণ্কার। 
তাহে বিপ্র অগ্রগণ্য, জগন্নাথ মিশ্র ধন্য, 
হব আমি তাহার কুমার।। 
জনম লইয়া সে জঠরে। 
নিজভক্তি উপদেশ ভরে ।। 
নারদে এতেক বলি, নিরস্ত করিতে কলি, 
জন্মিলেন আসি নদীয়ায়। 
ভক্তগণ সঙ্গে সমুদায়।। 
কৃষ্ণ ভজ কৃষ্ণ গাও, কুপথে কেও না যাও, 
কৃষ্তনাম যপ অনিবার। 
বিনা কৃষ্ণ রব, কলির কলুষ সব, 
নিস্তারিতে গতি নাহি আর।। 
যোগাযোগ ক্রিয়া যত, কলিতে হয়েছে হত, 
লুপ্ত হইয়ম্ছে বেদপথ। 
যদি হবে ভবে পার, হরিনাম কর সার, 
ইহা বিনা সকলি বিতথ।। 
এইরূপ উপদেশ, দিয়া ভ্রমি নানা দেশ, 
কৃষ্তভক্তি করেন প্রচার । 
হরিনাম সন্থীর্তন, শব্দে অতিভীত মনঃ, 
কলিরাজ করে হাহাকার ।। 
বলে একি দায়, দেখি একি অনুপায়, 
ঘটিল আমার অধিকারে। 
শুনে মাত্র হরিনাম, ভাবিতেছি পরিণাম, 
পড়ি বুঝি বিপদ পাথারে।। 
এত ভাবি কলিরাজ, ব্যথিত হ্দয় মাঝ, 
মন্ত্রিবরে ডাকিয়া তখন। 
নিজমনে পেয়ে ভয়, কাতরেতে স্ববিষয়, 
রক্ষাহেতু করয়ে মন্ত্রণ।। 


২১৪ 


কলিকুতুহল 
অথ কলির তৃতীম্ম মন্ত্রণা। 
||পয়ার || 


কলি কহে মন্ত্রিবর একি সবর্বনাশ। 
কেন প্রতিকূল মম প্রতি শ্রীনিবাস।। 
কত যত্বে এই রাজ্য করেছি শাসন। 
তাহে একি অমঙ্গল ঘটিল ভীষণ ।। 
একি হরিনাম মহিমা অপার। 
শ্রুতমাত্র পাপপুঞ্জে করে ছারকার।। 
মদ্য মাংস স্পৃহা দেখ সকলে তেজিছে। 
সকলেই. কৃষ্ণপদ সরোজ ভজিছে।। 
আর দেখ যে জন্যেতে কুলীনের কুল। 
নিবন্ধ হইল তাহে নাহি দেখি কুল।। 
এক পুরুষেতে যত নারী বিয়া করে। 
সে মরিলে তার সঙ্গে সবে পুড়ে মরে।। 
ইহাতে কিরুপে অধিকার রক্ষা হবে। 
কহ মন্ত্রি কি উপায় করি আমি তবে।। 
মস্ত্রি কহে মহারাজ না কর চিস্তন। 
আছে সদুপায় এক অতিসুলক্ষণ। ৷ 

এ ভারতবর্ষে আছে যতেক মানব। 
অদ্যপি সে সবে নাহি হয়েছে বেষ্ঞব।। 
আছে শাক্ত শৈব গাণপত্য বহু লোক । 
উপায়ে নাশহ মহারাজ নিজ শোক ।। 
ক্রোধ সেনাপতিপ্রতি কর আজ্ঞাপন। 
দ্বেষ দম্ভ সহ সেহ সাজুক এখন ।। 
বঙ্গরাজ্যে আছে যত ধার্মিক সকল । 
আক্রম করুক তাসবারে করি বল।। 
লোভ তাহে. রাগ আদি সহচর সনে। 
গমন করুক তার পশ্চাতে যতনে ।। 
মায়া আর মোহ নামে তব সেনাপতি । 
লেচ্ছদেশে যারা বাস করিছে সম্প্রতি | 
বিবেকের ভয়ে তারা ভারত ভবনে। 
প্রবেশিতে নাহি পারি রহে দুঃখিমনে।। 
লেচ্ছমাঝে মহাম্মদ মোজেস্‌ আখ্যান। 
মায়ামোহ দুইজনে আছে বিদ্যমান || 


২১৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আজ্ঞাকর তাগিদে আসিতে এই দেশে। 
দেখিবে তাদের শক্তি প্রকাশিবে শেষে। 
যার ভয়ে তারা হেথা না করে আগতি।। 
সে বিবেক এখন হয়েছে হীন অতি।। 
গিয়াছে যৌবন তার হয়েছে প্রাচীন। 
মদনের ভয়ে ভীত তাহে প্রতিদিন ।। 
অতএব মায়ামোহ তেজি তার ভয়। 
এখন আসিয়া হেথা লভুক বিজয়।। 
শুনিয়াছি ভাগবতে অন্য বিবরণ। 
কোঙ্কবেক্ক দেশে পুবের্ব ছিল যে রাজন।। 
অরৎ তাহার নাম খ্যাত চরাচরে। 

সে আসি জন্মিবে এবে ভারত ভিতরে ।। 


তদাভাস শিক্ষা করি সেই এ কলিতে। 
অবতীর্ণ হবে আসি ভয় কি বলিতে।। 
তার উপদেশে ক্রমে এই বঙ্গদেশ। 
তোমার আনন্দকর হইবে বিশেষ ।। 
নব্যগণ তার উপদেশ অনুসারে । 
শৌচ আদি ত্যাগ করিবেক একবারে ।। 
দেব দ্বিজ বেদ পথ করিবে দৃষিত। 
হইবে ভারত রাজ্য পাষণ্ডে ভূষিত। 
অধিকিস্ত বিধবা বিবাহ আয়োজন। 
তাহা হইতেই বহু হইবে ঘটন।। 
কালেতে ঈশ্বর ইচ্ছাবশতঃ সে কাষ। 
অনায়াসে প্রবেশিবে ভারত সমাজ ।। 
সেই দ্বারে ভূমিতল তেজিয়া শ্রীহরি। 
সতীহত্যা নিবারণ করিবেক "সেই 
তব অধিকার বৃদ্ধিহেতু আছে এই।। 
তুমি তাহে আনুকুল্য করিবা বিশেব। 


তব প্রতি শিবআজ্ঞা আছে পৃবর্বাপর। 
গৌড় দেশে নিজ নামে করিতে নগর।। 
তাহাতে বিলম্ব আর উপযুক্ত নয়। 


২১৬ 


করহ প্রযত্ব যাতে শ্রীঘ্্র সিদ্ধ হয়।। 
তাহে মায়ামোহ দলে করিলে স্থাপন। 
অনায়াসে সবর্দেশ হইবে শাসন ।। 
আর এক পরামর্শ আছে মহারাজ। 
বিষু ভক্তি যাহাতে তেজিবে এসমাজ।। 
প্রথমে কর্তব্য হুয় সেই অনুষ্ঠান । 
তাহাতে পাইবে তুমি অশেষ কল্যাণ ।। 
বমণীয় আছে এক তাহার উপায়। 
কুল ধর্ম যদি বিষু্ভক্তি পথে যায়।। 
তবেই উভয় ধর্ম ভ্রষ্ট হয়ে সবে। 
যথেক্টাচরণ তারা করিবে এভবে।। 
ইহাতে প্রযত্ব যাহা করিবারে হয়। 
মহারাজ বিবেচিয়া কর সমুদায়।। 
মন্ত্রিবাক্য শুনি কলি হয়ে হাষ্ট মন। 
ক্রোধপ্রতি দিখ্িজয়ে করে আজ্ঞাপন।। 


অথ ব্রেণধের দিখিজয়ার্থ দ্বেদস্তকে প্রেরণ। 
।লঘু ত্রিপদী।। 
কলিআজ্ঞাপন, পাইয়া তখন, 
ক্রোধ কহে দস্ত দ্বেষে। 
ওহে বীরছ্য়, দৌহে এসময়, 
যাত্রা কর গৌড়দেশে।। 
করি রণসজ্জা, নিবারহ লজ্জা, 
জয় কর শব্রদলে। 
যেন ধন্মসৈন্য, সবে পেয়ে দেন্য, 
নাহি রহে ভূমিতলে।। 
শুনি দ্বেষদভ্ত, সঙ্গে মান স্তম্ত, 
অবিলম্বে করি সাজ। 
আসি শৌড়দেশে, অমনি প্রবেশে, 
নদীয়া সমাজ মাঝ।। 
পণ্ডিত নিকরে, আগে আসি ধরে, 
তাহে তদধীন হয়ে। 
যত ধীরগণ, দভ্তে নিমগন, 


২১৯৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


দ্বেব করে ধরন্ম্ম লয়ে।। 
যত বেটা অধগ৪পেতে। 
রহে হরিনামে মেতে।। 
নাহি বুঝা সুজা, তেজে সন্ধ্যা পুজা, 
খড়ি মাটি মাখে গায়। 
এত বড় জ্বালা, বোঝা মালা, 
গলে পরে একি দায় !। 
তেজে দুর্গা কালী, হাতে কুঁড়ো জালি, 
টেনে সদা মরে। 
কতগুলো ভগু, দুবাহু উদ্দণ্ড, 
করি সদা নৃত্য করে।। 
কৃষ্ঞনাম শুনে, কান্দে কি কারণে, 
কিছুই বুঝিতে নারি। 
মৃত সুত দ্বারা, মনে হলে পারা, 
বহে দুনয়নে বারি ।। 
দৈব পৈত্র ক্রিয়া, সব বিসর্জ্জিয়া, 
কেবল কান্দ্রিয়া সারে। 
শচীপিশীর্‌ বেটা, সেতি এলেঠা, 
বাধায়েছে এসংসারে।। 
গলাগলি কোলাকুলি । 
নাহি যাগ যোগ, পিতৃশ্রাদ্ধে ভোগ, 
দিয়া করে হুলাহুলি।। 
ভ্রমে সদা দেশে। 
দেখি সে সকলে, ক্রোধে অঙ্গ জ্বলে, 
মনঃ পুড়ে যায় দ্বেষে।। 
এরাপে সে সবে, অসুয়া আসবে, 
মস্ত করি অতিশয়। 
চলে দ্বেষদস্ত, সঙ্গে মানস্তভ্, 


২১৮৮ 


বলে একি পাপ, একি পরিতাপ, 
এখন কি ধরাতলে। 
আছে দৈত্যকুল, না হয়ে নিন্মূল, 
দ্বিজরূপে দলে ।। 
প্রতিদিন হিংসে ছাগ। 
কপালে ত্রিপুণ্ড, যতেক পাষণ্ড, 
দেখিলে বাড়য়ে রাগ।। 
দ্বিজ অভিমান, সদা দীপ্যমান, 
আছে সকলের মনে। 
হাঁড়ি ডোম প্রায়, মদ্যমাংস খায়, 
তথাপিও জনে ।। 
বলি নীচ ক্ষুদ্র, নাহি ছোন শুদ্র, 
শুঁড়ি বুঝি শুদ্র নয়। 
সেই যে সবার, প্রবেশি আগার, 
সুখে মদ্যপান হয়।। 
অধিক উৎপাত, তে ফেরেঙ্গা পাত, 
দিয়া কারে পূজা করে। 
দেখি ০ে আচার, মনে নাহি কার, 
অনিবার রাগ ধরে।। 
পুস্প দেয় ইষ্টজ্ভানে। 
মাতৃতুল্য মনে মানে।। 
নিজে পশু যেই, পশুবধে সেই, 
দ্বিধা পশু না রাখিতে। 
সাধু শাস্ভগণে, পশু বলি গণে, 


২৯৪১ 


তাই দ্বেষ করি চিতে।। 
এরূপে সকলে, নানা দলে, 

নিন্দা করে পরস্পর। 
দ্বিজ কবি কহে, দেবতা কলহে, 

মন্ত হৈল চরাচর।। 


অথ শাক্ত বৈষ্বের কলহ। 
||গদ্য। | 


কোন সময়ে এক ভট্টাচার্য্য প্রাতঃকালে গাত্রোথান করিয়া প্রাতঃসন্ধ্যাদি 
সমাধানপৃবর্কক ললাটোপরি পরিস্কৃত গঙ্গামৃত্তিকানির্ষিত বিস্তৃত ব্রিগুধারণ এবং 
হস্তে আরক্ত জবা কুসুম ও বিল্লপাত্রাদি দ্বারা অর্থপূর্ণ পুষ্পভাজন গ্রহণপুরঃ্সর 
মুখে “কালী ব্রহ্ম”, এই শব্দ উচ্চারণপুবর্বক এক রম্যোদ্যানে পুষ্পাহরণার্থ 
গমন করিয়াছিলেন, দৈবাৎ এক জন বৈষ্ণব তথায় ভগবৎপুজার্থ তুলসী 
পুষ্পাদি চয়ন করিতে আপন কর্ণ বিরবে আগত ভট্রাচার্য্যকৃত “কালী ব্রহ্মা” 
এই ধ্বনি শ্রবণমাত্র চমকিত হইয়া আঃ! পাপ। কে এ প্রাতঃসময়ে কুৎসিত 
শব্দ করিতেছে? ইহা ভাবিয়া চতুঃপার্থ অবলোকনকরত সম্মুখ কর ও হস্ত 
ভট্টাচার্য্যকে দেখিয়া কহিলেন, ওহো দ্বিজহড্ডিপ! তা নৈলে এরূপ “রাম 
খোদাই” শব্দ কে আর প্রত্যুষকালে উচ্চারণ করে। ্্রাচার্য্য তাহার এই বাক্য 
শুনিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ওরে চৈতন্যের ষাঁড়! দ্বিজহড্ডিপ কি? বৈষ্ণব 
কহিলেন, তাহা জানিলে কি এরূপ দশা হয়? না, এই প্রকার “রাম খোদাই” 
শব্দ. উচ্চারণ করিস্‌। আমরা সকলেই জ্ঞাত আছি যে ব্রান্মাণেরা ব্রন্মোপাসনা 
করিয়া থাকেন ও হড়্ডিপেরা হা-করা দেবতার উপাসনা করে। তাহাতে যখন 
তুই ব্রাহ্মণ হইয়া এ হা-করা দেবতার নামের সহিত ব্রন্মাশব্দ উচ্চারণ করিলি 
তখন তোকে দ্বিজহভূডিপ না বলিয়া আর কি বলিব? 

শাক্ত ভট্টাচার্য কহিলেন, ওরে জাতিনাশা পশু? তোর এরপ বুদ্ধি না হইলে 
তুই “গোরা গোরা” করিয়া মরিবি কেন, তুই তো কখন তন্ত্র শুনিস্‌ নাই, ও 
কখন পণ্ডিতসমাজেও বসিস্‌ নাই তবে তোর ব্রহ্মপদার্থ কি প্রকারে জ্ঞান 
হইবে? তন্ত্রে যে কালীকেই ব্রহ্মা বলিয়াছেন তোর সে জ্ঞান থাকিলে কি 
তাহাকে হা- করা দেবতা বলিস্‌? 

বৈষ্ুব। হা আমি তন্ত্র শুনিয়া্ছি ও পণ্তিতসমাজেও বাস করিয়াছি 
কিন্ত“মাদারচোতে” তন্ত্র কখন শুনি নাই এবং মাদারচোত পণ্ডিতের সহিত 
কখন সহবাস করি নাই বটে বোধ করি সেই তন্ত্রেই হা-করা দেবতাকে ব্রন্গ 
বলে এবং সেই পগ্ডিতেরাই উক্ত দেবতার আরাধনা করে, কিন্তু আমরা 

২২০ 


কলিকুতৃহল 
তাহাকে ব্রন্ম বলি না ও তাহার উপাসনার কথা দূরে থাকুক ভুলেও কখন 
তাহার নাম করি না, ইহাতেই কি আমরা জাতিনাশা পশু হইলাম? 
শাক্ত। বড় যে গালাগালি দিতে আরম্ভ করিলি! তোরা কি জাতিনাশা পশু 
নহিস্? বল্‌ পশুর আচরণে ও তোদিগের আচরণে প্রভেদ কি? দেখ পশুরা 
যে প্রকার একত্র মিলিয়া আহার বিহার করে তোরাও সেই প্রকার ছত্রিশ. 
জাতি একত্র মেলিয়া সঙ্গতৈে আহার ও যত বেটী উর্ধচরণী বৈষ্ঞবীদিগের 
সহিত বিহার করিয়া থাকিস্, ইহাতে তোদিগকে পশু না বলিয়া কি মানুষ 
বলিতে হইবে? 
বৈষ্ব। ও রাম! ইহাকেই কি তুই গালাগালি বোধ করিলি? দোহাই 
তোদিগকে তোদের হাতিশুঁড়োর মার, তোরা সত্য বল্‌ দেখি, তোদিগের 
মানিত তন্ত্র কি, “মাদারচোত” তন্ত্র নয়? ও সেই তন্ত্র মানিয়া চলিলে কি 
“মাদারচোত'” হয় না? দেখ তোদিগের এঁ তন্ত্রে যাহাকে মাতৃভাবে চিন্তা 
করিতে কহিয়াছে তাহাকেই আবার রমণ করিতে ব্যবস্থা দিয়াছে যথা £-__ 
“আনীয় সংস্কৃতাং শক্তিং সুন্দরীং যৌবনান্বিতাং। বিধিবৎ পরয়া ভক্ত্যা 
মাতৃবুদ্ধ্যাচ পুজয়েৎ। মাতৃমুখে পিতৃমুখং সংযোজ্য ব্রিদশেশ্বরি। তাড়য়ন্‌ 
ভক্তিভাবেন সহস্রং প্রজপেম্মনুং। যোনিশ্চ জনিকা মাতা লিঙ্গশচ জনকঃ 
পিতা। মাতৃভাবং পিতৃভাবং তয়োস্ত পরিচিস্তনং।” হারে ও ষণ্তামর্ক! তবে 
যে আবার এই কথাকে গালাগালি বিবেচনা করিতেছিস্! আর তুই বল দেখি, 
তোদিগের কি নিজের জাতি আছে? 
শাক্ত। আমাদিগের কেন জাতি না থাকিবে, আমরা কি তোদিগের মত যার 
তার বাড়িতে যাই? না, যার তার সঙ্গে একত্রে ভোজন করি? 
বৈষ্ঞব। হারে ও মোনাকাটা বাম্না! তোরা যার তার বাড়িতে খাইস্‌ না 
বলিতেছিস্, আর যখন শুঁড়ি বাড়িতে চক্র করিয়া হাড়ি-ডোম-চণ্ডাল একত্রে 
সুরা পান করিস তখন তোদেরবেলায় বুঝি সে “প্রবৃত্তে ভৈরবীচক্রে সর্ব 
বর্ণাদ্বিজোত্তমাঃ। নিবৃত্তে “ভৈরবীচক্রে সবের্ব বর্ণাঃ পৃথক্‌ পৃথক্‌।৮ এই 
তন্ত্রবচন বেদের বচন বলিয়া জ্ঞান হয়, আর আমরা যে শ্রীমহাপ্রসাদ বৈষ্ব 
সকলের সহিত একত্র ভোজ করিয়া থাকি তাহাতেই কি আমরা জাতিনাশা 
হইব? 
শাক্ত। মর বেটা হতভাগা! কোথা রাজা ভোজ, আর কোথা গঙ্গারাম তেলি, 
কালী কুইন বিকৃটোরিয়া, কোথা তোদিগের কৃষ্ণ সড়াচাপরাসী, আমর! একথা 
বলিতে কি লজ্জা পায় না? 
বৈষ্ব। আঃ কি বিবেচনা! কি বুদ্ধির তাৎপর্য! না হবে কেন! রতনেই রতন 


২২১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


চেনে! তুই কি এই কথা সহজশরীরে বলিতেছিস্£ না, কিছু খেয়ে টেয়ে এসেছিস্? 
বোধ করি কিছু খেয়েই আসিয়া থাকিবি, নতুবা একথা বলিতে তোদের কি শরমও 
হয় না? কেননা তুই ব্রৈলোক্যুনাথ কৃষ্তকে সড়া চাপরাসী বলিয়া কোথাকার 
জলাপেতনীকে কুইন বিক্টোরিয়া বলিতেছিস্। কি হতভাগ্য! হারে কৃষ্ণ যদি মড়া 
চাপরাসী হয় তবে তোদের দীতফারা কুনি কেন তার দ্বারপালিকা হইবে? 

শাক্ত। আমাদিগের ত্রিলোকেশ্বরী কোথায় তোদিগের দ্বারপালিকা হইয়াছেন? 
বৈষ্ণব। কেন তা কি শুনিস্‌ নাই? হা কপাল তা শুনিলে এমন কহিবি কেন। 
এখন যাহারা শ্রীপুরুষোত্তম ক্ষেত্র গিয়াছিল তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা কর যে 
বিমলা সেখানে কি করে? 

শাক্ত। তাহা শুনিব না কেন! তুই যেমন হাবা শুনিতে বাবা শুনিস্‌ তাহাই 
শুনি নাই, বিমলা যে শ্রীক্ষেত্রের পীঠেশ্বরী সেটা জানিস্ঃ না, মুখে যাহা 
আইসে তাহাই বলিস্‌? বরঞ্চ তোদের জগন্নাথই ভারত দ্বারপাল, যেহেতু 
তন্ত্রে জগন্নাথকে বিমলার ভৈরব বলিয়া উক্ত করেন। 

বৈষ্ণব। হারে বামুনের ঘরের গরু! তোর ইহা বিবেচনা হইল না যে, যে 
স্বয়ং প্রভু হয় সে কি দ্বারপালের প্রসাদ খাইবার নিমিত্ত হা-করিয়া পড়িয়া 
থাকেঃ তুই ভাল-লোককে জিজ্ঞাসা করিস্, তোদের বিমলা আমাদিগের 
জগন্নাথের দুয়ারের হাড়ী কি না? অর্থাৎ হাড়ীজাতি যেমন কাহারো বাটাতে 
ভোজ কায হইলে তাহাদিগের উচ্ছিষ্টশেষ গ্রহণহেতু দ্বারে দণ্ডায়মান থাকে, 
সেই প্রকার তোদিগের বিমলা তথায় আছে কিনা? 

শাক্ত। হারে বেটা পাষণ্ড! তুই যে বড় শক্ত বলিতে লাগিলি! তুই কি 
তোদিগের কৃষ্জের দুর্গতিটা দেখিস্‌ নাই? সে যে আমাদিগের রাজরাজেশ্বরীর 
সুখাসন বহন হেতু বেহারাগিরি কার্যে নিযুক্ত আছে, তাকি জানিস্‌ না? 
বৈষ্ণব। হা, আমি তাহা জানি, কিন্ত যিনি মস্তকে করিয়া নানাবিধ প্রাণীর 
আসন স্বর্প এই ভূমণ্ডল বহন করেন তিনি যে তোদিগের দেবতার আসন 
বহিবেন ইহা বিচিত্র কি? কেন না তিনি যাহাকে না বহন করেন সেকি 
লবনিমেষকাল স্থিতি করিতে পারে? ইহাতেই বুঝিবি যে আমাদিগের প্রভু 
যতক্ষণ তোদিগের দেবতাকে ধারণ করিয়া আছেন ততক্ষণই সে আছে, নতুবা 
তিনি ছেড়ে সে এতদিন 'কোথায় রসাতলে যাইত তাহা তোরা দেখিতে 
পাইতিস্‌্? না, তাহার দোহাই দিয়া এইভাবে মদ খাইয়া বেড়াইতে পারিতিস্? 
বিশেষতঃ লোকে বলে জাতির মরা জাতিতেই বহে অতএব দেবতার মরা 
দেবতা ভিন্ন আর কে বহিবে? 

এইরূপ শাক্ত ভট্টাচার্য্য ও বৈষ্ণব উভয়ে কিয়কাল বাদানুবাদকরত পরস্পর 
রাগান্ধ হইয়া দুই জনে ঘোরতর সংগ্রাম আরম্ভ করিল ও এ প্রকার নানা 


২২২, 


কলিকুতৃহল 


উপাসকেরা পরস্পর বিবাদ করিতে লাগিল। বন্তুতঃ কি কালের মহিমা! 
যদ্দারা মুগ্ধ হইয়া উপাসনা ভেদে নানা মূর্তিধারি এক পরমেশ্বরের পরস্পর 
দ্বেষ আরম্ভ করিয়া পাপপঙ্কে সংসার নিমগ্ন করিতে উদ্যত হইল। 


অথ কলিকর্তৃক নুতন রাজধানী নির্মাণ 
।[ত্রিপদী।। 
এইরূপে কলিরাজ, দ্বেষে মগ্ন এসমাজ, 
দেখি অতি আনন্দিত চিতে। 
মনোমাঝে লাগিল চিস্তিতে।। 
নিষেধিল পশুপতি, আর্ধ্যাবর্তে নিবসতি, 
করিতে আমারে কিছুকাল। 
তার আজ্ঞা উলঙ্ঘিলে, সুবিপদ তিমিঙ্গিলে, 
গ্রাসে পাছে হইয়া করাল।। 
অতএব গৌড়দেশে, গিয়া এবে সুবিশেষে, 
নিজ নামে স্থাপিব নগর। 
মায়ামোহ অনুচরে, রাজ্য দিয়া তার করে, 
মন আশা পুরাব বিস্তর।। 
এত ভাবি সেই কলি, নিজকার্য্যে সুকৌশলী, 
ক্লাইব সাহেব বেশধরি। 
বাণিজ্য করা কপটে, সুরধনীপুবর্বতটে, 
বিরচিল অপুবর্ব নগরী || 
কি কব তাহার শোভা, ত্রিভৃুবন মনোলোভা, 
সুলভা অমরাপুরী প্রায়। 
সুরনর মনোরম্য, শোভে শত শত হয্থ্য, 
হেরি পাপ তাপ দূরে যায়।। 
কিবা ধবলিম কাত্তি, হেরে মনে হয় ভ্রাস্তি, 
কলিপ্রতি কৃপা করি হর। 
আপন নিবাস প্রায়, শত শত গিরি তায়, 
দিয়াছেন করিতে নগর।। 


২৩ 


দুপ্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


লকৃ্‌ করিছে সকল। 
পরিষ্কার তাবতীয় স্থল ।। 
্রান্মাণ ক্ষত্রিয় শৃদ্র, বৈশ্য আদি ক্ষুদ্রাক্ষুদ্র, 
ভদ্রাভদ্র নানা জাতিগণ। 
ইউরোপ বর্ম্মা চীন, জন্ম্মাণি যাবা কোচিন, 
গ্রীসিয়ান প্রভৃতি যবন।। 
সকলে আলয় করি, ভূষিচ করে নগরী, 
বলিহারি কি কহিৎ তার। 
দেবালয় গিভ্্জাঘর, আছে উ ছ উচ্চতর, 
মনোহর কতি চমৎকাঞ্চ ৷ 
দোকানী পশ!রি যারা, শারি শোতে তারা, 
নশিহারি মহাজন যত। 
কিলিন্ট লব আর, সেবাইন দিনামার, 
ভপাশাব "লন অবিরত।। 
স্থানে স্থাণে বিহযছয়, জহপিত বালকচয়, 
নিরবধি কলুর জব্যয়ন। 
যতেক চিকিৎসাগার, প্রশংসা £ক কবে ভার, 
সুস্থ হয় তাতে রোগিগণ।। 
বার নারী দিয়া বার, রহে তারা অনিবার, 
একবার যে নাকি তা হেরে। 
তেজি লজ্জা ধর্মভিয়, যে করে সে পদাশ্রয়, 
অসংশয় পড়ে যায় ফেরে।। 
পরিসর রাজপথ, তাহে করে গতাগত, 
অবিরত শত শত জন। 
কি মধুর সুঘর্ঘর, রবেত্ে চলে শগড়, 
ঞজঞ দড় বড় ধায় অস্বগণ।। 
ফোর্ট উইলম নাম, দুর্গ অতি অবিরাম, 
সংহাাপিত হয়েছে তথায়। 
কি কব অধিক আর, ধিক ধিক তার, 
নয়নে যে না দেখেছে তায়।। 
অনুপম সেই কেল্লা, অতুল তাহার জেল্লা, 
২২৪ 


ত্রিভুবনে না দেখি তেমন । 
কালাস্তক কাল সম, যুদ্ধে অতি সুবিষম, 
কত শত আছে বীরগণ।। 
দুড় দুড় ছড় হুড়, নিনাদেতে তিনপুর, 
কম্পিত করিয়া ক্ষণে ক্ষণে। 
হয় কত তোপধবনি, সে ধবনি শুনি তখনি, 
লজ্জা পেয়ে না রয় ভূবনে।। 
পশ্চিমদিগেতে গঙ্গা, বিপুলতর তরঙ্গা, 
কল কল রবে ধাবমানা। 
বোট বজরা্‌ ইষ্টিমর, রয়েছে তার উপর, 
পিনাস জাহাজ আদি নানা।। 
এইরাপ মনোহর, নির্মাণ করি নগর, 
কলিকর্তী বলি রাখে নাম। 
গুণনিধি কহে সার, কলি তব এইবার, 
পরিপূর্ণ হবে মনস্কাম।। 


অথ মায়ামোহ চরের প্রতি রাজ্যভারার্পণ। 
।।পয়ার || 
এইরূাপে কলিরাজ স্থাপিয়া নগর। 
শায়া মোহচরে রাজ্য দিল তার পর।। 
বিষকুম্ভ পয়োমুখখ সেই সভ্যজাতি। 
প্রকারে প্রজার দ্রোহ করে নানাজাতি।। 
লইতে প্রজার ধন নাহি করে বল। 
অথচ সব্র্বস্ব লয় করিয়া কৌশল।। 
যে দেশে যতেক হয় লোভের সঞ্চার। 
সে দেশে ততই দুঃখ বাড়য়ে সবার।। 
তার মুল হয় কৃট বাণিজ্য করণ। 
রাজার উচিত যাহা করা নিবারণ।। 
তাহা দূর পরাহত করি নিজে ভূপ। 
কুট ব্যবসায় সদা করে নানারূপ।। 
কান্ঠ লোস্ট্র ফুস্‌ কাস্‌ দিয়া নানামত। 
বদল করিয়া ধন লয় কতশত।। 
২২৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বিলাতী দ্রব্যের চাকচৈক্যে অনিবার। 
লইতে বাসনা তাহা নাহি হয় কার।। 
যে দ্রব্যতে যত লুব্ধ হয় যার মন। 

সে দ্রব্য লইতে তার তত আকুঞ্চন।। 
অথচ না থাকে ধন যদ্যপি তাহার। 
তবে সেহ করে নানামত কদাচার।। 
চৌর্য্য হিংসা প্রবঞ্চনা শিখে সেই দ্বারে। 
কুট বাণিজ্যের ফল এ তিন সংসারে ।। 
মদ্য পান প্রজাদের হানিকর হয়। 

লজ্জা ধর্ম ধন মান যাতে পায় ক্ষয়।। 
নির্ধন হইয়া যেই মদ্যপান করে। 
পৃর্ববৎ অপকর্ম্ম শিখে সেই নরে।। 
হেন মদ্য ব্রাজা নিজে করিতে বিক্রয়। 
স্থানে স্থানে করেছেন মদিরা আলয়।। 
বেশ্যাসঙ্গ হয় নানা কুকর্মের মূল। 
সেই বেশ্যাবৃদ্ধি প্রতি রাজা অনুকূল।। 
নারী যদি কুপথেতে করয়ে গমন। 
রাঙ্জার উচিত তারে করিতে শাসন।। 
তাহা কোথা বরঞ্চ 'রমণী যদি কয়। 
পতিগৃহে থাকিতে আমার মন হয়।। 
তবে তারে আজ্ঞা দেন করিতে এসব। 
এরাজার সুবিচার এইরূপ সব।। 

যে দেশে বেশ্যার যত যত বৃদ্ধি বটে। 
সেই দেশে তত তত অমঙ্গল ঘটে।। 
বেশ্যার সম্তোষহেতু বেশ্যাপ্রিয়জন। 
বিবিধ কুকর্ম্মে করে ধন উপার্জন।। 
চৌর্য্য দস্যুবৃত্তি প্রবঞ্চনা মিথ্যাবাদ। 
বেশ্যা সেবা হেতু আঁটাআঁটি। 
নারিকেলত্বক খাওয়া যেন ফেলে আঁটি।। 
“সাপ হয়ে খায় নিজে রোঝা হয়ে ঝাড়ে। 
হাকিম্‌ হয়ে হুকুম্‌ দেয় প্যাদা হয়ে মারে।। 
আপনিই পাতড়া পাতড়ী আপনি পৃজ্য শিলা। 


২২৬ 


কলিকুতৃহল 
ত্রিভঙ্গ হয়ে মূরলী বাজায় কে বুঝে তার লীলা ।। 


কলি যারে রাজ্য দিল সে কলুষকলি। 
পুরিবে মনের সাধ ইহাতে সকলি।। 
ভারত সাম্রাজ্য পেয়ে মায়ামোহচর। 
ভাবে কিসে হবে ধন্মন্রিষ্ট সব নর।। 
আনিতে উচিত হেথা মিসনরীগণে। 
কিন্তু পাছে প্রজাসব বিপক্ষতা গণে।। 
অতএব লাঠী দিয়া খেলাইয়া সাপ। 
নিবাইবি মনের উদ্বেগ কুসস্তাপ।। 
এই হেতু দেশে যবে আসে মিসনরী। 
আজ্ঞা দেন তা সবারে ভাসাইতে তরী ।। 
মিসনরীগণ অতি সুচতুর হয়! 
নৃপতির ভাব তারা বুঝে সমুদয়।। 
এই লাগি জানি তারা ভিন্ন অধিকার । 
শ্রীরামপুরেতে বাস করিল প্রচার ।। 
সেকালেতে সেই পুরে দিনামারগণ। 
কেন্পা করি করে প্রজাগণের শাসন ।। 
তাহাদের সমাশ্রয় লয়ে মিসনরী। 
আরম্ভিল ধন্মকৃষি মার্সমেন কেরী।। 
হাটে মাঠে যিশুবীজ করিতে বপন। 
নিযুক্ত হইল যত প্রভুদূতগণ || 

মালা মাজী হাড়ী ডোম আদি জাতিগণে। 
মজাইল লোভ ক্ষোভ দেখায়ে যতনে ।। 
ভদ্র ভদ্র লোকসহ ধর্মের বিচার। 
করিয়া না পায় তাহা হৈতে সুনিস্তার।। 
নীচজাতি তুল্য তারা মুর্খ নাহি ছিল। 
এহেতু ভদ্বের কিছু করিতে নারিল।। 
তথাপিও নাহি ছাড়ে কাছিম কামড়। 
যার তার সঙ্গে করে কলহ বিস্তর ।। 
কবি কহে অবধান কর বন্ধুগণ। 
ভায়াদের ধর্্মযুদ্ধ করিব বর্ণন।। 


২৭ 


অথ মোহচর মিসনরীদিগের ধর্্মযুদ্ধ। 
| |গদ্য || 

কোন এক বৎসর মাহেশের রথযাত্রা উপলক্ষে বহুতর লোকের সমারোহ 
হইলে হুচুকে মিসনারী ভায়ারা বোঝা বোঝা ধর্ম্মপুস্তক ঘাড়ে করিয়া তথায় 
উপনীত হইলেন, এবং কি বৃদ্ধ কি যুবা যাহাকে সম্মুূখে দেখেন তাহাকেই 
উপদেশ দিতে আরম্ভ করিলেন। যথা, হে ভায়াগণ, টোমরা একানে কি 
ডেকিতে আসিয়াছঃ ডেক টেমরা যাহাকে আপনি গড়াইয়াছ টাহাকেই ঈশ্বর 
বলিয়া প্রণাম করিতেছ, তোমাডিগের জগন্নাঠ যডি ঈশ্বর হইবে টবে টাহাটে 
ঘুণ ঢুরিবে কেন? টোমরা গঙ্গান্নান করিয়া যে পাপমুক্ট হইটে বাঞ্থা 
করিটেছ টাহা টোমাডিগের ভ্রান্টি, কেননা জলে ডুব ডিলে কি ককন পাপ 
ঢোয়া যায়? যেডিন মহাবিচারের সময় আসিবে যে ডিন টোমরা কি গঙ্গাম্নান 
করিয়াছি বলিলে পরিট্রাণ পাইবা? এইরূপে মিসনরীভায়ারা যারে দেখেন 
তারেই বিলাতী গৌরাঙ্গের প্রেম বিতরণ করিতে আরম্ভ করিলে দৈবাৎ এক 
জন শান্্রজ্ঞ-পণ্ডিত তাহাদিগের সেই গোলযোগ শুনিয়া তথায় আগমনপুবর্বক 
জিজ্ঞাসা করিলেন যে এখানে কিসের সোরসার হইতেছে। মিসনরীগণ 
কহিলেন যে আমরা টোমাডিগের উড়ারার্ঠ উপডেশ ডিটে আসিয়াছি। 
পঞ্ডিত। আমাদিগের বিপদ কি?যে তদুদ্ধারার্থ আমাদিগকে সদুপদেশ দিবা। 
তবে বৃথা কেন তোমরা আমাদিগের বিপদ মুক্ত করিতে আসিয়া স্বয়ং 
বিপদগ্রস্থ হও। 
মিস্নরী। টোমরা মহাবিপডে পড়িয়ার্ট, যেহেটু টোমাডিগের জ্ঞানসূর্য্ের প্রকাশ 
না ঠাকাপ্রযুক্ট টোমরা ঘোরটর অণ্চকারে বাস করিটেচ। 
পণ্ডিত। কই আমরা অন্ধকারে বাস করিতেছিঃ আমাদিগের চক্ষুঃ তো উজ্জ্বল 
কিরণ দেখিতেছে, ইহাতেও যদ্যপি তোমরা দিবান্ধ পেচকের ন্যায় সূর্য্যকে 
অন্ধকার বল, তবে কিছুই করিতে পারি না। 
মিস্নরী। টোমাডিগের শাসট্রে যে সকলই অণ্চকার, ডেক টোমাডিগের শাস্ট্র 
যাহাকে ঈশ্বর বলে সেই কৃষ্ণ নিজে কটো কুকর্ম করিয়াচে, সে চুরি 
করিয়াচে, সে পরনারী হরণ করিয়াচে, সে নরহট্যা করিয়াচে, অটএব টোমরা 
টাহাকেই ঈশ্বর বলিলে কি পরিস্রাণ পাইবাঃ একারণ টোমাডিগকে বলি, 
টোমরা আপন আপন কুমট পরিট্যাগ করিয়া সেই পরম ডয়ালু প্রভু যীজস্‌ 
ক্রাইস্টকে উপাসনা কর যে প্রভু টোমাডিগের পরিস্রাণ নিমিষ্ট আপন 
শরীরত্যাগরপ প্রায়শ্টিট্ট করিয়াচেন। 
পণ্ডিত। আঃ পাপিষ্ঠ! আমাদিগের পরমেশ্বর কৃষ্ণ যে কুকর্ম করিয়াছেন কি 
সুকর্ম্ম করিয়াছেন তাহা তোমরা কি প্রকারে জ্ঞাত হইবা? ভাল! কৃষ্ণের এ 
সকল কর্ম যদি কুকর্ম হয় তবে তোমাদিগের ক্রাইস্টকে কেন কুকম্মশালী 


১৬৪ 


কলিকুতৃহল 
না বলা যায়? দেখ, তোমাদিগের ক্রাইস্ট একদা ক্ষধবানিত হইয়া শিষ্যগণের 
কৃষিক্ষেত্রে গোধুম চুরি করিয়া খাইয়াছে ও কেবল তাহার বেশ্যা 


না? কি হতভাগ্য! কেবল আমাদিগের কৃষ্ণই পরদারা হরণ করিয়াছেন বলিয়া 

দুক্ষম্মশালী হইলেন? দুষ্কন্্ম সুকর্ম্ম কাহাকে বলি, তুমি তাহা জ্ঞাত আছ কি 

না? 

মিসনরী। হা টাহা আমি অবশ্যই জ্ঞাট আচি নটুবা টোমার সহিট কেন বিচার 

করিটে আসিয়াচি। 

রর াডাচরার দাগ রাজ রাজা রচা রোযা 
রি। 


মিসনরী। পরমেশ্খবরের আজ্ঞালঙ্ঘন করা ডুক্কর্্ম ও টাহার আজ্ঞা প্রটিপালন 
করা সুকর্ম্ম। 

পণ্ডিত। পরমেশ্বর কাহার প্রতি আজ্ঞা করেন? মনুষ্যের প্রতি কি আপনার 
প্রতি? তাহাতে যদি ত্বাহার আজ্ঞা মনুষ্যের প্রতি করা হয়, তবে সেই আজ্ঞা 
লঙ্ঘন করিলে মনুষ্যের অব্যশই পাপ হইতে পারে, নতুবা তন্নঙ্ঘনে 
পরমেশ্বরের নিজের পাপ হইতে পারে না। 

মিসনরী। পরমেশ্বর যাহা অপবিট্র জানিয়া স্বয়ং আচরণ করেন না টাহাই 
মনুষ্যকে আচরণ করিটে নিষে করেন একারণ টিনি যডি সেই অপবি্র কর্ম 
করেন টবে অবশ্যই অপক্ট্রি হইবেন। 

পণ্ডিত। পরমেশ্বর যাহা মনুষ্যকে আচরণ করিতে নিষেধ করেন তাহা যদ্যপি 
তিনি স্বয়ং আচরণ না করিতেন তবে তোমাদিগের মেরিনন্দনের কিপ্রকারে 
জন্ম হইত? কারণ তোমাদিগের ক্রাইস্টের.মাতা যে কৌমারকালে গর্ভধারণ 
করিয়াছিল, যদি সেই গর্ত পরমেশ্বরকর্তৃক হওয়া সত্য হয় তবে পরমেশ্বর 
তাহাতে উপগত না হইলে কিরূপে তাহার তাহা সম্ভাবিত হইল£ এতাবতা 
পরমেশ্বর যাহা না করেন তাহাইযে মনুষ্যের প্রতি নিষেধ করেন এমত কখনই 
নহে! 

মিস্নরী। টুমি পাগল মনুষ্য টোমার কোন জ্ঞান নাই কেননা যিনি আপন 


২২৯ 


দুতপ্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


ইচ্ছায় এই সংসার রচনা করিতে পারেন টাহার ইচ্ছায় কি মেরির আগনি 
গর্ত হওয়া সম্ভব হয় না? 

পণ্ডিত। যদ্যপি পরমেশ্বরের ইচ্ছামাত্র স্ত্রীলোকের গর্ত হওয়া সম্ভব .হইত, 
তবে স্ত্রীপুরুষ সংযোগ ব্যতিরেকে অবশ্যই কোন কোন স্থানে উক্তরূপ গর্ত 
হওয়া দৃষ্ট হইতে পারিত, কিন্তু তাহা যখন দৃষ্ট হয় না তখন তোমার এরূপ 
যুক্তি কোনপ্রকারেই কেহ মান্য করিবে না। এতাবতা এবিষয়ে বিজ্ঞদিগের 
এরূপ বলা কর্তব্য যে পরমেশ্বর জিতেন্দ্রিয়প্রযুক্ত স্বাধীন ইন্দ্রিয় দ্বারা যে 
কোন কর্ম করেন তাহাতে তাহার কদাচই পাপ হইতে পারে না। কারণ 
ইন্দ্রিয়পরাধীনতাই মনুষ্যের অসন্ভোষরূপ অনিষ্টকারহেতু পাপ বলিয়া 
পরিগণিত হয়। অতএব 'মনুষ্যগণ ইন্দ্রিয়পরাধীন হইয়া যে সকল কর্ম করিতে 
পুনঃপুনঃ অসস্তোষের কারণ হয়, এই নিমিত্ত মনুষ্যকে তাদৃশ কর্ম্ম করণ 
নিষেধরূপ যে আজ্ঞা করেন সেই আজ্ঞা উলঙ্ঘনকে পাপ কহা উক্ত পাপ 
পরমেশ্বরের হওয়া কদাপি সম্ভাবিত নহে। 

মিস্নরী। টুমি কি নিটান্ট মূর্ক আচ! ডেক যে ব্যক্তি জিটেখ্ডিয় হয় সেও কি 
ককন পরনারী গমন করিটে পারে? টোমার কি ইহা বিবেচনা হয়£ 
পণ্ডিত। যদ্যপি শাস্ত্রে ইন্দ্রিয়হীনকে জিতেন্দ্রিয় বলিতেন তবে জিতেন্দ্রিয় 
ব্যক্তির কখন কোন ইন্দ্রিয়কার্্য করিতে না পারা সম্ভব হইত। কিন্তু যখন 
তাহা না বলিয়া যে ব্যক্তির ইন্দ্রিয়সকল বশীভূত সেই ব্যক্তিই জিতেন্দ্রিয 
এইরূপ বলিয়াছেন তখন কি জিতেন্দ্রিয় ব্যক্তি কিছুই ইন্দ্রিয়কার্য্য করিতে 
পারে না এমত বুঝায়? বরঞ্চ তোমার এমত বলা সম্ভব যে জিতেন্দ্রিয়ের 
বিষয় ভোগে প্রয়োজন কি? উত্তর, তাহার বিষয় ভোগে নিজের প্রয়োজন 
নাই বটে কিন্তু তিনি পরপ্রয়োজ্বনার্থ পরদারা গমনাদি বিষয়ভোগও করিয়া 
থাকেন। কারণ তাহাকে যে ব্যক্তি যেরূপে চিস্তা করে তিনি তাহাকে 
সেইরূপে কৃপা করেন ইহা তাহার নিয়ম হইয়াছে, অতএব তিনি সেই নিয়ম 
ভঙ্গ করেন না এবিধায় তোমরা কৃষ্ণের প্রতি যে দোষ নিঃক্ষেপ করিতেছ 
তাহা অত্যন্ত অন্যায়। 

মিস্নরী। টোমরা যে গঙ্গার জলকে পকিষ্র জ্ঞান করিয়া ঠাক সেইজলে আর 
পুক্ষরিণীর জলে প্রভেড কি? 

পণ্ডিত। তোমাদিগের' জর্দননদীর জলে ও অন্যান্য জলে যেরূপ প্রভেদ 
আমাদিগের গঙ্গাজলে ও অন্যান্য জলেও সেইরূপ প্রভেদ। 

মিস্নরী। টোমরা মাটি ও পাঠর ভিয়া যাহাকে গড়াও টাহাকে ঈশ্বর ভাবিলে 
কি টোমাডের পরিভ্রাণ হইবে? 


২৩০ 


কলিকুতৃহল 
পণ্ডিত। হা! যদি রুটি এবং মদিরাকে ঈশ্বরের মাংস ও শোণিত জ্ঞানে 
ভোজন পান করিলে তোমাদিগের পরিত্রাণ হয় তবে মাটির ঈশ্বর গড়াইয়া 
পূজা করিলে অবশ্যই আমাদিগের পরিত্রাণ হইবে? 
মিস্নরী। টুমি বড় পাপী আচ, টোমার সঙ্গে বিচার কারটে চাহি না কিন্টু 
টোমাকে বন্ডু ভাবে উপডেশ কহি টুমি সেই ডয়ালু প্রভুর উপাসনা যে প্রভু 
টোমাডিগের পাপের প্রায়শ্টিট্ট নিমিষ্ট আপন প্রাণ পরিট্যাগ করিয়াচেন £ 
পণ্ডিত। যদি তোমাদিগের প্রভু পরবঞ্চক না হইত তবে আমি তোমাদিগের 
প্রভুর উপাসনা করিতাম? 
মিস্নরী। আমাডিগের প্রভু পরবঞ্চক কিসে? 
পণ্ডিত। আমরা শুনিয়াছি তোমাদিগের ধর্ম পুস্তকে লেখে যে, যে ব্যক্তি পাপ 
করে সে চিরদণ্ডের যোগ্য হয়, কিন্তু যদি সেই দণ্ড স্বয়ং স্বীকার করিয়া 
পাপিদিগের পরিভ্রাণহেতু তোমাদিগের ক্রাইস্ট আসিয়া থাকে তবে তাহাকে 
চিরদণ্ড স্বীকার করিতে হয়, কিন্ত তাহা না করিয়া যখন সে তদ্যাতনা সহ্য 
করিতে অপারগহেতু মরিয়াছিল কিম্বা মরণাস্তর পুনবর্ধার উঠিয়া পলাইয়াছিল 
তাহাকে. বঞ্চক ভিন্ন আর কি বলা যাইতে পারে? 
(এইরূপ মিস্নরীগণ পণ্ডিতের কথায় পরাভূত হইয়া ভগ্রমনে আপন আপন 
বাসে আসিয়া সকলে কমিটিপূব্বক স্থির করিল যে এদেশীয় প্রবীণলোকেরা 
আমাদিগের উপদেশ ভুলিবে না, এতন্নিমিত্ত ইংরাজি ভাষা অধ্যাপনচ্ছলে 
বালকদিগকে প্রথমাবধি উপদেশ দিলে কালে কৃতকার্য্য হইতে পারা যাইবে, 
এই বিবেচনায় ছেলেধেরা ফান্দের মত স্থানে স্থানে ইস্কুল স্থাপন করিবায় 
অধুনা অনেক নবীন পুরুষেরা কলির আনন্দবর্ধক হইতেছেন) 


অথ লোভের দিখিজস্ব। 
|ত্রিপদী।| 


এইরূপে মোহচর, যত শুভ্রবর্ণ নর, 

ভারত ক্ষেত্রেতে জনে। 
প্রায় সবে যীশুবীজ বনে।। 
আর্্যানার্্য কে করে গমন। 

অধর্ম্মের বাড়ে জোর, ধর্মের বিপদ ঘোর, 
একপদে কাপে সবর্ষিণ।। 

যার যাহা মনে ধরে, সেই মন তাহা করে, 

২৩১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
নিবারণ করিতে কে পারে। 
এমন সময়ে কলি, হয়ে অতি কুতৃহলী, 
লোভ প্রতি কহে বারে ।। 
শুন ওহে লোভ, কেন আর রাখ ক্ষোভ, 
রাগ রুচি সঙ্গে সজ্জা করি। 
যাও বঙ্গভূমে, প্রবেশি আপনজ্ুমে, 
শাসন করণে রাজ্যভরি || 
আগে গিয়া দ্বিজগণে, অধীর কর যতনে, 
যেন তারা বেদধন্্ম ছাড়ি। 
ভূঙ্জে ভোগ অবিরত, মদ্য মাংসে হয়ে রত, 
সকলেতে হয় স্বেচ্ছাচারী। | 
তা হইলে অন্য সবে, ধন্মশীল কেবা রবে, 
সকলে পড়িবে দেখাদেখি। 
ধন্মের পড়িবে ঠেকাঠেকি।। 
এইরূপ আজ্ঞা পেয়ে, লোভ তবে চলে ধেয়ে, 
প্রথমতঃ কলেজ ইন্কুলে। 
যত ছিল ছাত্রগণ, সকলে করি যতন, 
জলাঞ্জলি দেওয়াইল কুলে ।। 
সবে বলে হুট হুট্‌, বিনা ব্রাণ্ডি বিস্কুট, 
ঝুট্মুই কেন খেয়ে মরি। 
বেদের বাধিত হয়ে, মিছা দিন যায় বয়ে, 
জাতি লয়ে থাকিয়া কি করি।। 
সেম সেম একি নাট, যতেক মুর্শের হাট, 
স্থানে যুটেছে সকল। 
অবিবেক মদে মাতি, রচিয়াছে নানাজাতি, 
লো আলেেরজি ভারা 
এক মুলইহৈতে যাহা, জন্মে কভু হয় কি তাহা, 
আম যাম কুমুড়া কাঠাল। 
যত বেটা হস্তিমুর্খ নিজদোষে পায় দুঃখ, 
জাতি মানি বাড়ায় জঞ্জাল।। 
কান্ট মেনে কষ্ট পায়, নষ্ট তাহে সমুদায়, 


২৩২ 


সুখভোগ জগৎ সংসারে। 
চিজ যে উত্তম চিজ, তার নাহি জানে বীজ, 
তজবিজ করিতে না পারে।। 
কেহ কেহ আছে বীর, সেও নাহি খায় বির, 
ধীরশুন্য হয়েছে এদেশ। 
উইল্সনের মিষ্টখানা, খায় না কি কারখানা, 
খানাপ্রতি করে সদা দ্বেষ।। 
পাতরেতে ভাত খেয়ে, কেন মর কষ্ট পেয়ে, 
ডিস্‌ পূর্ণ ফিস্‌ ফেলি দবরে। 
জীবন সফল কর, বটল হস্তেতে ধর, 
সেরির্‌ সাধ লহ সাধপুরে।। 
মিসে যদি মিস্তে চাও, বারেক হোটেলে যাও, 
দেখে এসো তাহার বাহার। 
আহা মরি রোজ রোজ, সে বদনে কত রোজ, 
ফুটিয়া রয়েছে অনিবার।। 
কিসে আর পাবে সুখ, কিসেতে যদি বিমুখ, 
হও সেই সুচারু বদনে। 
যদি সুখসিন্ধুপারে, বাঞ্ছচা থাকে যাইবারে, 
তবে ভজ নববিবিগণে।। 
খোপাকাটা উহ্কি পরা, ভার্টি মিসি দস্তেভরা, 
আমাদের যত সব মেম। 
সাড়ী পরা সেম সেম।। 
গো টু হেল হিন্দুয়ানী, ব্যাড শাস্ত্র আর কি মানি, 
ম্যাড নই আমরা সকলে। 
বেড়ি গুড্‌ চল তবে, ডুবিয়া বের টবে, 
বেষ্ট খানা খাইব হোটেলে ।। 
এইরূপ কতজন, ইয়ং বেঙ্গলগণ, 
যীশুর জাসুর জালে পড়ে। 
কলির বাড়য়ে রাগ, লুপ্ত হয় যোগযাগ, 
ল্লেচ্ছ প্রায় হয় বু নরে।। 


২৩৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংল! সাহিত্য 
অথ কলিহিতার্থ মহাত্বরাজার প্রাদুর্ভাব। 


|।পয়ার।। 

এইরূপে লোভ মোহে হয়ে অচেতন। 
সকলে হইতে চাহে অধর্্মভাজন।। 
হিন্দুশান্ত্র হিন্দুমত সকলি অসার। 
বাইবেল বিনা বল নাহি তরিবার।। 
যা কহে সাহেব লোক তাই মহামান্য । 
বেদ তন্ত্র পুরাণের কে করে প্রামাণ্য ।। 
কিসে সাহেবের মত দেখাবে গঠন। 
এজন্যে উপায় নানা করে বিরচন।। 
অঙ্গে পেপ্টুলুন পরে পায়ে কালা বুট। 
ধুতিপরা লোক দেখি বলে হছট্‌ হুটু।। 
অর্থযোগ বিনা যদি ব্রাণ্ডি নাহি পায়। 
পানাতে মিসায়ে আল্তা গ্লাসে রেখে খায়।। 
পরস্পর সকলের হৈলে দেখাদেখি। 
সে কেন করেন হাতে করে ঠেকাঠেকি।। 
আর যত হোক নাহি হৌক বা সভ্যতা। 
হিন্দুধম্্ম নিন্দামাত্র স্বভাব নব্যতা।। 
হেন মতে যুবাবৃন্দ .তেজি ধন্মভিয়। 
যখন যীশুর পথে চলে অসংশয়।। 
তখন কলির সখা কোক্ক বেঙ্কভৃপ। 
অবতীর্ণ হৈল .ভূমে ধরি দ্বিজরূপ || 
বিবিধ ভাষায় নিজে সুশিক্ষিত হয়ে। 
রাজপ্রিয় হইলেন এই ভূবলয়ে।। 
আপনিও রাজখ্যাতি করি আলম্বন। 
কলি অনুকূলে বহু করিল যতন।। 

কলি প্রতি যেই স্থান দিল পরীক্ষিৎ। 
তার অগ্রগণ্যা হয় সকল যোষিৎ।। 
তাদিগের ব্যভিচার বিপুল করিতে। 
কৌলীন্য মর্যাদা যাহা স্থাপে পৃথিবীতে ।। 
তাহে বিপরীত ফল হইল ঘটন। 

এক নরসঙ্গে মরে বহু নারীগণ।। 
ইহাতেই ভয়াকূল হয়ে কলি অতি। 


২৩৪ 


কোঙ্কবেস্কভৃূপতির ফিরাইল মতি।। 
অতএব নবীন মহাত্মা নৃপবর। 
সতীহত্যা নিবারণে হন যত্বুপর।। 
মোহচরগণ সহ পরামর্ষ করি। 
উঠাইল সতীহত্যা ভারত ভিতরি।। 
বিধবার পুনশ্চ বিবাহ যাতে হয়। 
এপ আকাঙ্ক্ষা তার ছিল অতিশয়।। 
কিন্তু কোনত্রমে তাহা সিদ্ধ না হইল। 
মনের বেদনা তার মনেতে রহিল ।। 
তথাচ তাহাতে তিনি ক্ষান্ত না হইয়া। 
স্থাপিলেন সভা এক উপায় চিত্তিয়া।। 
যাহার প্রসাদে কালে সব প্রজাগণ। 
ক্রমেতে হইবে কলিআজ্ঞাপরায়ণ।। 
পুবর্বহৈতে শিবআন্ঞা আছে কলিপ্রতি। 
শুভ না হইবে বিষুণ না তেজিলে ক্ষিতি।। 
কলিতে অযুত বর্ষপর্য্যস্ত শ্রীহরি। 
পৃথিবীতে থাকি পরে করিয়া শ্রীহরি।। 
অতএব সুস্ঠুরূপে যাতে এই কায। 
সিদ্ধ হয় সে যত্ব করিয়া কলিরাজ।। 
সেই আজ্ঞা অনুসারে কলিযুগ পতি। 
মহাত্ম রাজার দেহে করিল বসতি।। 
তাহাতে সে রাজা বহু করিয়া যতন। 
করিলেন দেশে ব্রহ্ম সমাজ স্থাপন ।। 
তাহে প্রকাশিল অভিনব ব্রন্গজ্ঞান। 
অন্ন ব্রন্মা হইবার এই সে নিদান।। 
এক ব্রন্মা অদ্বিতীয় কহে সব বেদ। 
দ্বিজ মেচ্ছ জাতি তাহে কি আছে প্রভেদ।। 
অজ্ঞ লোকে মিথ্যা দেবপুজা করি মরে। 
ধিক অজ্ঞানান্ধ যত সব নরে।। 
ব্রা্মণ পণ্ডিতগণ মহাভগু হয়। 

স্ত্রী শুদ্রের বেদে অধিকার নাহি কয়।। 
ঈশ্বর প্রণীত শান্তর যদি হয় বেদ। 
তবে তাহে অবশ্য নাহিক ভেদাভেদ ।। 


২৩৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


যেহেতু ঈশ্বরকাছে সকলি সমান। 
এজন্যেতে জাতি নহে তাহার বিধান।। 
অতএব ভক্ষ্যাভক্ষ্য আদি বিধি যত। 
ঈশ্বরের তাহা নাহি হয় অভিমত ।। 
পিতৃশ্রাদ্ধ প্রভৃতি যতেক ক্রিয়াচার। 
মূর্খের জীবিকা ইহা বৃহস্পতি কয়।। 
এইরূপ উপদেশ দ্বারে প্রজাগণে। 
প্রবৃত্ত করিল সবে কুপথ গমনে।। 
শেষে রাজা শ্লেচ্ছ দেশে করিয়া প্রস্থান। 
স্বকীয় জীবন করিলেন সমাধান।। 
ব্রাহ্মধর্ম্ম প্রকাশের আদি খষিবর। 
স্বপুণ্যে বিলাতপ্রাপ্ত হন অতঃপর ।। 
তাহার রোপিত বীজ হইতে এখন। 
নানা স্বন্দশাখাচয়ে ব্যাপিল ভুবন ।। 
হাঠে মাঠে ঘাঠে তার বিকাইছে ফল। 
কবি কহে এরূপ কলির কুতৃহল।। 


অথ ব্রন্দাজানিদিগের সহিত বর্ণাশ্রমি বিপ্রের কলহ। 
| ।গুদ্যু || 

কোনসময়ে এক বিপ্র সায়ংকালে গঙ্গাতীরে সন্ধ্যা বন্দনাদি করিতেছিলেন, 
ইতিমধ্যে দুইজন ব্রন্গাজ্ঞানি যুবা তথায় বায়ুসেবনার্থ উপনীত হইয়া তাহাকে 
সন্ধ্যোপাসনা করিতে দেখিয়া পরস্পর ম্মেরানন হওত কহিতে লাগিলেন। 
আঃ কি ভ্রম! কি অসভ্যতা! দেখ এই বিপ্র পরিণামে ফল লাভ হইবে বলিয়া 
মিথ্যা জলকেলি করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছেন, ইনি বালককালে যেপ্রকার ক্রীড়া 
করিতেন এক্ষণেও সেইপ্রকার করিয়া থাকেন, বোধ করি পুর্র্বসংক্কার বিস্মৃত 
হইতে পারেন নাই। ব্রাঙ্মণ তাহাদিগের পরস্পর কথিত এই বাক্য শুনিয়া 
ঈষহহাস্যপুবর্বক সন্ধোপাসনা সমাপনের শেষে কহিতে লাগিলেন। কি হে 
বাপু! তোমরা কি কহিতেছিলা? তোমাদিগের নিবাস কোথায়? 
ব্াক্মা। আমাদিগের নিবাস যেখানে হউক কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি 
বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াও কি অদ্যাপি বাল্যচেষ্টা ত্যাগ কর নাই? 
বিপ্র। সে কেমন! আমার বাল্য চেষ্টা তোমরা কি দেখিলা? 
ব্রাহ্ম । তোমাদিগের সকলই বাল্যচেষ্টা, দেখ বাল্যকালে যে প্রকার পুত্তুলিকা 


২৩৬ 


কলিকুতৃহল 
লইয়া ক্রীড়া ও জলকেলি প্রভৃতি করিয়াছিলা এখনও যে আবার তাহাই 
করিতেছ। তোমরা যাহাকে স্বয়ং নির্মাণ করিয়াছ তাহাকেই বিশ্বনির্মাতা 
কহিতেছ ও যাহার ঘ্রাণশক্তি নাই তাহাকে ধূপাদির আঘ্রাণ দিতেছ, এবং যে 
খাইতে পারে না তাহাকে নৈবেদ্য সমর্পণ করিতেছ। ভাল, তোমাদিগের এই 
সকল করিতে কি সভ্য সমাজে লঙ্জা হয় না? 
বিপ্র। সভ্য কে? তোমরা? না, শ্রীষ্টীয়ানেরাঃ যদি তোমরা আবহমান 
কালাবধি আর্্পরম্পরাগত বর্ণাশ্রম ধর্ম কর্ম ত্যাগ করত সভ্য হইয়া 
ভদ্রসমাজে লঙ্জিত না হও তবে আমরা কি তোমাদিগকে লঙ্জা করিতে 
পারি? দেখ, এই পৃথিবীতে যে সকল লোক আছে তাহার মধ্যে কি কেহ 
কখন শিয়াল কুকুর প্রভৃতিকে লজ্জা করিয়া থাকে? আমরা যাহাকে স্বয়ং 
নির্মাণ করি তাহাকে বিশ্বনিম্মাতা বলি ও যাহার ঘ্রাণশক্তি নাই তাহাকে 
আদঘ্রেয় বস্ত প্রদান করি ও যে খাইতে পারে না তাহাকে নৈবেদ্য সমর্পণ 
করিয়া থাকি বটে, কিন্তু তোমরা যে নিস্্রিয় তাহাকে জগৎকর্তা ও যে নিগুণ 
তাহাকে সব্র্বশক্তিমান্‌ এবং যাহার ইন্দ্রিয় নাই তাহাকে প্রার্থনার ফলদাতা 
কোন্‌ বিবেচনায় সঙ্গত বল? আমরা আপন বুদ্ধি দ্বারা শুভাশুভ উচ্চ নীচ 
উত্তমাধম প্রভৃতি জ্ঞান করত ব্যবহার করিয়াই কি বাল্যচেষ্টা বিশিষ্ট হইব? 
না, তোমরা বালককালে যে প্রকার শুচি কি অশুচি ভক্ষ্য কি অভক্ষ্য কার্য কি 
অকার্ধ্য হেয় কি উপাদেয় ইত্যাদি বোধশুন্য ছিলা সেই প্রকার অধুনাও 
বোধশুন্য থাকিয়া বাল্যচেষ্টার বিপরীতে সভ্যচেষ্টান্বিত হইতে পারিবা? 
ব্রাহ্ম।। তুমি তো কেবল নামমাত্রই বিপ্র, নতুবা বিপ্রের কর্তব্য যে বেদাধ্যয়ন 
তাহাতো কর নাই। বেদে যে নির্গুণ নিষ্ক্রিয় নিরাকার ব্রহ্মকেই সব্বশক্তিমান 
সব্ব্বকর্তী সমস্ত ফলদাতা বলিয়াছেন তাহা জান? না, আপন পাগলামি বুদ্ধিতে 
যাহা লওয়ায় তাহাই বল? আমরা আপনাদিগের পক্ষে কি শুভ কি অশুভ 
কি ভাল কি মন্দ কি ভক্ষ্য কি অভক্ষ্য তাহা বিশেষ জানি, নতুবা তোমরা 
যেমন পুত্তলিকা পৃজাকে শুভ ও ব্রন্মাজ্ঞানকে অশুভ এবং শরীর নির্যাতনকে 
ভাল ও বিষয়োপভোগকে মন্দ ও পশুর আহারীয় বনজ দ্রব্যকে ভক্ষ্য এবং 
উত্তম মদ্য মাংসাদিকে অভক্ষ্য জান সেরূপ জানি না। 
বিপ্র। আমরা তোমাদিগের নিকট নামমাত্রেই বিপ্র বটি, কেননা তোমরা যে 
বেদ অধ্যয়ন করিয়া থাক সেই বিলাতীয় বেদ অধ্যয়ন করি নাই। আমাদিগের 
দেশীয় বেদেতো নির্গুণকে সবর্শিক্তিমান ও নিষ্ক্রিয়কে সর্র্বকর্তী এবং 
নিরিন্দ্রিয়কে সমস্ত ফলদাতা কোন স্থানেই বলেন নাই, যেহেতু বেদবক্তা 
মহর্ষিগণ এমত উন্মাদগ্রস্থ ছিলেন না যে তাহারা এক সময়ে যাহাকে অন্ধ 


২৩৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বলেন অন্য সময়ে তাহাকেই চন্ষুম্মান বলিয়া থাকেন। তবে যীহারা বেদের 
অর্থ বুঝেন না ত্বাহারাই বেদবক্তাদিগকে উন্মত্ত বলিতে বাধিত হন। অপর 
তোমরা আপনাদিগের শুভাশুভ বিলক্ষণ জান তাহা তোমার কথাতেই পরিচয় 
পাওয়া গেল। আহা! এমন জ্ঞানবান কি আর জন্মে? পরমেশ্বর তোমাদিগের 
পশ্চাদভাগে একটি পুচ্ছ দেন নাই কেন£ আমরা এখন তাহাই ভাবিতেছি। 
কারণ পুচ্ছবান্‌ মাহাত্মারা যে প্রকার নিঃসঙ্কোচে অভিলাষমত আহারীয় সামগ্রী 
প্রাপ্ত হইলে লগুড়াঘাত না মানিয়াও তদুপভোগে প্রবৃত্ত হন সেইপ্রকার 
তোমরাও স্বভাবতঃ প্রবৃত্ত হইয়া থাক। 

ব্রাহ্ম। পরমেশ্বর আমাদিগের পুচ্ছ দেন নাই বলিয়া তোমরা খিদ্যমান হইতে 
পারিতা। কিন্তু জগৎতকর্তী এমত অবিবেচক নহেন যে তিনি মনুষ্যের পুচ্ছ 
দিবেন। বিবেচনা করিয়া দেখ দেখি তোমরা পুচ্ছ পাইবার যোগ্য কি আমরা 
পুচ্ছ পাইবার যোগ্যঃ পরমেশ্বর জগতীতল মধ্যে যেসমস্ত প্রাণীজাত সৃষ্টি 
করিয়াছেন তৎসমুদায়মধ্যে মনুষ্যই প্রধান, যেহেতু অন্যান্য প্রাণী অপেক্ষা 
মনুষ্যের শরীরে অধিক বিবেচনা শক্তি সংস্থাপিতা হইয়াছে, এতাবতা নিজের 
বিবেক শক্তি থাকিতে যে অমুক মুনি ইহা বলিয়াছেন অমুক মোখাদিম ইহা 
করিয়াছেন ইত্যাদি দৃষ্টাস্তে কেন জীবনাস্ত কষ্ট পাও। পুরর্ধ পৃবর্ব লোকেরা যে 
প্রকার নিব্র্ধোধ ছিল এক্ষণে সেই প্রকার নিবের্বাধ নাই, তবে তোমরা বুদ্ধি 
থাকিতে কেন নিব্রবোধের আচরণ করিয়া থাক? 

বিপ্র। পুর্ব পূর্ব লোকাপেক্ষা তোমরা বড় বুদ্ধিমান বট, ইহা তোমাদিগের 
ব্যবহারেই টের পাওয়া গিয়াছে, সাবধান সাবধান দেখ্য যেন তোমাদিগের বুদ্ধি 
কোন দ্বারদিয়া পিছ্লিয়া পড়ে না। আমরা তোমাদিগের বুদ্ধির খুরে দণ্ডবৎ 
করি, কেননা তোমরা যে বুদ্ধির প্রভাবে আপন আপন পূর্ববর্তী 
পিতৃপিতামহগণকে নিবের্বাধ বলিতেছ আমরা কোটি জন্মেও তাদৃশ বুদ্ধিলাভ 
করিতে পারিব না। 

ব্রা্ম॥। আমরা অবশ্যই আপন আপন, পুরর্বপুরুষকে নিবের্বাধ বলিব, কারণ 
প্রভৃতিকে ঈশ্বর বলিয়া তাহাদিগের উপাসনার্থ মিথ্যা কষ্টভোগ করত 
প্রাণাবশেষ করিয়াছেন তখন তাহাদিগকে নিব্র্বোধ ভিন্ন কি বলা যায়? 
আমরাতো তাহাদিগের মত যাকে তাকে ঈশ্বর বলিয়া পুজা করি না, কেবল 
এক সর্রনিয়িস্তা সব্্বকর্তা নিরাকার ব্রহ্মা আছেন ইহাই জানিয়া সময়ে সময়ে 
তাহার নিকট কৃতজ্ঞতা স্বীকার করি ইহাতে আমরা তাহাদিগের অপেক্ষা 


, ২৩৮ 


| কলিকুতৃহল 
অবশ্যই বুদ্ধিমান বটি একথা বলিবার অপেক্ষা কি আছে? 

বিপ্র। ও হরি! তোমরা এই বুদ্ধিতেই কি পূবর্ষ পৃবর্ব পুরুষাপেক্ষা বুদ্ধিমান 
হইলা? না হইবা কেন? “কালস্য কুটিলা গতিঃ” সে যাহা হউক, 
তোমাদিগকে জিজ্ঞাসা করি, তোমরা বল দেখি যে যাহার কর্তৃত্ব শক্তি আছে 
সেও কখন কি নিরাকার হয়? দেখ লোকে তাহাকেই কর্তী বলে যে আপন 
ইচ্ছাতে স্বকীয় কর্তব্যকর্্ম করিতে পারে, এইহেতু মৃত্তিকাদি জড়পদার্থকে 
কর্তা না বলিয়া সকলে ইচ্ছাদি শক্তিমান্কে কর্তা বলিয়া থাকে, ক্ি্ভু যাহার 
ইচ্ছা আছে তাহার অবশ্যই মন আছে, এবং যাহার মন আছে তাহার অবশ্যই 
শরীর আছে ইহা কোন্‌ বিজ্ঞ ব্যক্তি স্বীকার না করিবেন? এ তাবত যিনি 
জগৎকর্তী তিনি কখনই নিরাকার হইতে পারেন না। 

ব্রাহ্ম । তোমরা যদি পরমেশ্বরকে সাকার বল তবে তিনি সব্ব্বব্যাপী কিরূপে 
হইবেন? এবং কেনই বা তাহার বিনাশ না হইবে? দেখ সংসারে যেসকল 
বস্ত সাকার দেখা যায় অবশ্যই সেই সকলের বিনাশ আছে, অতএব আমরা 
তোমাদিগের ঘুণখেগো যুক্তি মানিয়া পরমেশ্বরকে কখনই সাকার বলিতে পারি 
না। - 
বিপ্র। তোমাদিগের মতে সবর্বব্যাপী শব্দের অর্থ কি সর্র্বনিয়স্তা? না, সবর্বত্র 
তাহার অবস্থিতি থাকা? যদি তাহার অর্থ সব্র্বনিয়স্তা হয় তবে সাকার বস্তুর 
সবর্ধনিয়ন্ত্রিত থাকিবার অসম্ভব কি? আর যদি তাহার অর্থ সকত্রস্থিত বস্তুকে 
বুঝায় তথাচ তাহার সর্বত্র থাকা অসম্ভব নহে, দেখ যেমন দীপজ্যোতিঃ 
সাকারপ্রযুক্ত গৃহের একদেশে থাকিয়াও আপন কিরণ দ্বারা সমস্ত গৃহ 
ব্যাপিতে পারে তদ্রুপ পরমেশ্বর সাকার হইয়াও স্বীয় অচিস্ত্য শক্তিবশতঃ 
সব্রবত্রই থাকিতে পারেন। যদি বল পরমেশ্বর সাকার হইয়াও স্ব্বত্র অবস্থিতি 
করিলে কাহারও উপলব্ধি হয় না কেন? উত্তর, সকলেরই উপলব্ধি হয়, 
তাহা না হইলে সকল পদার্থই থাকে না, কারণ সকল বস্তুর সন্তারূপে তিনি 
অবস্থান করিতেছেন, তন্মধ্যে যে ব্যক্তি আলোকমাত্র দেখিয়া ইহা কিসের 
আলোক এইরূপ অনুসন্ধান করে সে অবশ্যই তদবয়বিদীপকেও দেখিতে পায় 
ও যে তাহা অনুসন্ধান না করে সে দেখিতে পায় না, ইহাতে বিশেষ এই যে 
যদ্রূপ দীপাদি পদার্থ সামান্য চক্ষুতে দেখিতে পাওয়া যায় তদ্রুপ পরমেশ্বরকে 
জ্ঞানচক্ষুঃ ভিন্ন সামান্য চক্ষুতে দেখিতে পাওয়া যায়না। অপর তুমি সাকার 
বস্তুমাত্রের বিনাশ আছে বলিয়া যে পরমেশ্বরকে নিরাকার বলিতেছ তাহাতেই 
বা কিসে তিনি অবিনাশী হইবেন? কেননা আমরা নিরাকার বায়ু প্রভৃতিরও 
বিনাশ দেখিতেছি। বস্ততঃ যে বস্তু বিক্রিয় তাহা সাকার বা নিরাকার হউক 


২৩৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


অবশ্যই বিনষ্ট হইবে, কিন্তু যাহা অবিক্রিয় তাহার কখনই বিনাশ সম্ভবে না। 
বেদে পরমেশ্বরকে অবিক্রিয় বলিয়াছেন এইহেতু তাহার বিনাশ নাই, ইহাতেই 
শাস্ত্রে যে যে স্থলে তাহাকে নিরাকার বলেন সেই স্থলে তাহার সবিক্রিয় 
আকার না থাকা অর্থ ভিন্ন বুঝায় না। | 
ব্রহ্মা। আমরা পরমেশ্বরের বিদ্যমানতা বিষয়ে ও তাহার উপাসনা বিষয়ে 
বেদাদি কোন শাস্ত্রের সাহায্য গ্রহণ করি না যেহেতু এ সকল শাস্ত্র মনুষ্যের 
বুদ্ধির ছ্বারা নির্মিত তজ্জন্যই নানা দেশে নানা জাতীয় ব্যক্তিদিগের মধ্যে ভিন্ন 
ভিন্ন নানা প্রকার শাস্ত্র দৃষ্ট হয়। আমরা কোন শান্ত্রকেই পরমেশ্বর প্রণীত না 
বলিয়া জগৎকেই তীহার প্রণীত শাস্ত্ররূপে স্বীকার করি, কারণ এই জগতীয় 
প্রাকৃতিক নিয়ম দৃষ্টে পরমেশ্বরের অস্তিতা ও তাহার উপাসনার বিষয় নিশ্চয় 
করিতে পারি, এবিধায় যাহা যুক্তিযুক্ত তাহাই গ্রাহ্য যাহাতে কোন যুক্তি নাই 
তাহা আমাদিগের গ্রহণীয় নহে। | 
বিপ্র। আ মরি! কি বিবেচনা! কি বুদ্ধির কৌশল? এই কি তোমাদিগের 
আত্তিকতা? না, দেশবঞ্চকতা? অথবা বর্বরতা? ইহা বিচার করিয়া স্থির পাই 
না। কারণ, যদি তোমরা সত্যই আত্তিক হও তবে শান্ত্রভিন্ন কেবল যুক্তি দ্বারা 
কি প্রকারে ঈশ্বর থাকা নিশ্চয় করিবাঃ আমরা তাহাই শুনিতে ইচ্ছা করি। 
ব্রাহ্ম। কেন মহাশয়! যুক্তি দ্বারা কি ঈশ্বরের অস্তিতা নিশ্চয় করা যায় না? 
দেখ আমরা কেবল যুক্তি দ্বারা পরমেশ্বর নিরূপণ করিতে পারি কি না? 
আমরা তো তোমাদিগের মতন দুই একটা ““ভবতি পচতি” পড়িয়া নিজে 
পণ্ডিত বলাই না, যে যুক্তি দিতে অক্ষম হইব, আমরা পেলিসাহেব প্রভৃতি 
ঘোরতর আস্তিক পণ্ডিতের পুস্তক পড়িয়াছি তাহাতেই অনায়াসে যুক্তি দ্বারা 
ঈশ্বর নিরূপণ করিব তোমার খণ্ডন করিতে সমর্থ থাকে কর। 
বিপ্র। পরমেশ্বর থাকার যুক্তি কি? 
্রাহ্ম। পরমেশ্বর থাকার যুক্তি এই যে এতজ্জগতীতল মধ্যে লৌকিক যে 
সমস্ত কার্ধ্য দেখিতেছি তাহা যেমন কোন সচেতন কর্তা দ্বারা নির্মিত হইয়াছে 
ইহা বিবেচনা করা যায় সেইরূপ জগতীয় কার্যসমূহ দেখিয়া অবশ্যই তাহার 
কোন সচেতন কর্তী আছে এমত নিশ্চয় করা যাইতে পারে! 
বিপ্র। কর্তাভিন্ন কার্য হয় না একথা তোমাকে কোন বর্বর কহিয়াছেঃ দেখ 
পৃথিবীতে বৃষ্টিধারা পতিত হইয়া যে সকল চিত্রবিচিত্র কার্য্য জন্মে ও বায়ুলোল 
কাষ্ঠাদি দ্বারা ভূমিতে যে অক্ষরাকার রেখা হয় তাহার কত্তা কি কেহ আছে 
এমত' বলিতে পার? তুমিও অচেতন জলবায়ু প্রভৃতিকে তো কর্তা বলিতে 
পারিবা না, কেননা যে ক্রিয়ার আয়োজন করিতে সমথ ততিম্স অপরকে কেহ 
২৪০ 


। কলিকৃত্হল 
কর্তা বলে না, তবে যদি তুমি অচেতনকে কর্তী বলিয়া ঈশ্বরকেও অচেতন 
বলিতে বাধিত হও তবে তাহাতে তোমার আস্তিকতা সিদ্ধ হয় না, কারণ 
অচেতন কর্জী থাকা না থাকা তুল্য হয়। 
ব্রাহ্ম । আমরা সচেতন কর্তা ভিন্ন কার্য্য হয় না এমত বলি না, কিন্তু তত্ভিনর 
কার্যের নিয়ম বদ্ধ হয় না ইহাই বলি। অতএব জগতীয় অদ্ভুত নিয়ম সকল 
দেখিয়া বিবেচনা হয় যে অবশ্যই ইহার নিয়ামক কেহ আছে। 
বিশ্ব। তোমরা যদি জগতের অদ্ভুত নিয়ম সকল দেখিয়া তাহার নিয়ামক কেহ 
আছে এমত কল্পনা কর তবে আমি এমত জিজ্ঞাসা করিতে পারি যে তোমার 
মানিত পরমেম্বরের যে সমস্ত শক্তি আছে তাহা নিয়মবদ্ধ কিনা? যদি তাহা 
নিয়মবদ্ধ না হয় তবে তাহার সৃষ্টি শক্তি উদয়কালীন বিনাশ শক্তি উদয় হইয়া 
সমস্ত বিশৃঙ্খল কেন না হয়? যদি বল যে তাহার ইচ্ছা, উত্তর তাহার ইচ্ছাও 
যদ্যপি নিয়মবদ্ধ না হয় তবে এক ইচ্ছা উদয়কালে অন্য ইচ্ছা উদয় হইয়া 
উক্তরূপ বিশৃঙ্খল হইবার অসম্ভব কি? বিশেষতঃ ইচ্ছাপ্রভৃতি মনের ধর্ম 
সেই মনঃ নিয়মবদ্ধ না হইলে তাহার কার্য্ও নিয়মবদ্ধ হইতে পারে না, 
অতএব যদি পরমেশ্বরের শক্তি সকল নিয়মবদ্ধ হয় তবে জিজ্ঞাসা করি সেই 
নিয়মবদ্ধ কে করিয়াছে? যদি তাহা আপনি হইয়াছে এমত স্বীকার কর তবে 
জগতীয় নিয়মসকলের আপনি না হইবার বাধা কি? এতাবতা শান্তর না 
মানিলে পরমেশ্বর নানা দুর্ঘট সুতরাং শাস্ত্র মানিতেই হইবে। 
্রাঙ্মা। যদি শান্তর মানিতে হয় তবে কোন্‌ শাস্ত্র মান্য করিব ও কোন শাস্ত্রই বা 
অমান্য করিব, কেন না হিন্দু মুসলমান খ্রিষ্টিয়ান প্রভৃতির ভিন্ন ভিন্ন শান্ত্ 
সকল আছে। তাহাতে যদি সকলই মান্য করি তবে কিছুই মান্য করা হয় না। 
কারণ এক শাস্ত্রে যাহা কর্তব্য বলিয়াছেন অন্যশান্ত্রে তাহাকে অকর্তব্য বলিয়া 
উল্লেখ করিয়াছেন, অতএব কি কর্তব্য কি অকর্তব্য এমত সন্দেহ হইলে 
সমস্তই অকর্তব্য হইয়া উঠে সুতরাং শাস্ত্র মানিলে নিস্তার কই। 
বিপ্র। হিন্দু মুসলমান প্রভৃতির শান্ত্রসকল ভিন্ন হইলেও কিছুই অমান্য নহে, 
কিন্তু যাহার যে শাস্ত্রে অধিকার তাহাকে সেই শাস্ত্র মানিতে হয়। কারণ যে 
প্রকার রাজনিয়মসকল দেশভেদে জাতিভেদে আচারভেদে ভিন্ন হইলেও যে 
তাহা রাজনিয়ম নহে এমত বলা যায় না এবং তত্তনিয়ম তত্তদ্দেশাদি ভেদে 
না মানিলে অবশ্যই দণ্ডার হইতে হয় তদ্রপ যাহাদিগের প্রতি যে ব্যবস্থা 
উপদিষ্ট হইয়াছে তাহারা তাহা মান্য না করিলে অবশ্যই দণ্ডারহ হইতে পারে। 
্রাহ্ম। হিন্দুশান্ত্রে যে পরমেশ্বরকে সাকার বলে সেই আকার কি? এইরূপ 
প্রশ্নে কেহ বলেন দ্বিভুজ মুরুলীধর, কেহ বলেন ব্রিশুল ডমুরুকর, কেহ 

২৪১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বলেন চতুর্ভুজ গজবক্ত, কেহ বলেন অরুণ বর্ণ ত্রিনয়ন, কেহ বলেন 
কি প্রকারে নিশচেয় হইবে? 

বিপ্র। পরমেশ্বরের আকার জ্ঞানচক্ষুর গোচর এইহেতু যাহার যাদৃশ জ্ঞান সে 
তাদৃশ আকার দর্শন করিবে সুতরাং তাঁহার কোন আকারই মিথ্যা নহে। দেখ 
দেখে অথচ তাহার প্রকৃত বর্ণ কি কেহ নির্ণয় করিতে না পারিলেও এমত 
বলা যায় যে সেই জন্তু সাকার বটে, এইপ্রকার পরমেম্বরকে আপন 
ভাবানুসারে সকলেই -দৃষ্ট করিয়া থাকেন কিন্তু তিনি যথার্থ কোন্রূপধারী ইহা 
হয়। 

ব্রাহ্মা। শান্ত্র যাহাকে একস্থলে পরমেশ্বর বলিয়াছেন অন্যস্থলে তাহাকেই 
অনীম্বর বলিয়া অন্যকে ঈশ্বর বলিয়াছেন ইহাতে শাস্ত্রের কথায় কি প্রকারে 
বিশ্বাস করিতে পারি? আমরা অপক্ষপাতি বিবেচনায় অনুগম করিয়াছি যে 
এসকল দেবতারা কেহই ঈশ্বর নহে যেহেতু ঈশ্বরীয় গুণ কাহাতেও দৃষ্ট হয় 
না। 

বিপ্র। দেবতাবিশেষে ঈশ্বরীয় গুণ দৃষ্ট না হউক তাহাতে ক্ষতি কি? ঈশ্বরেতো 
ঈশ্বরীয় গুণ দুষ্ট হয়, এইহেতুশ*যাঁহারা যে দেবতার মুর্তি উপাসনা করেন 
তাহারা সেই দেবতাকে দেবতা বলেন না; কিন্তু তাহাকে ঈশ্বর বলিয়া ভাবনা 
করিয়া থাকেন, এতাবতা তোমাকে জিজ্ঞাসা করি তুমি বল দেখি ঈশ্বর কি 
তত্তন্দেবতারূপে সাধকের কার্যযসিদ্ধি করিতে পারেন না? না, ঈশ্বরের তাদৃশ 
রূপ নাই? দেখ এই সংসারবর্তিলোকের ঈশ্বর উপাসনার প্রয়োজন কেবল 
সংসারমুক্তি, তাহা কোন বাহ্যিক দ্রব্যাদিদ্বারা হইতে পারে না, যেহেতু তাহার 
সহিত বাহ্য বস্তুর কোন সম্বন্ধ নাই, কেবল তাহাতে আন্তরিক সংস্কার 
অপেক্ষা করে, কেননা মনের স্বভাবতঃ নানাবিধ বাহ্য বিষয়ে প্রবৃত্তি 
হওয়াপ্রফস্ত কামক্রোধাদি বিবিধ বিকারজন্য যে মোহাদি জন্মে তাহাকেই বন্ধ 
ও তাহার নিবৃত্তিকে মোক্ষ বলে,অতএব বিজ্ঞ ব্যক্তিরা মনের বিষয় প্রবণতা 
নিবারণাথে বেদোক্ত নিষ্কাম কর্ম ও ঈশ্বরোপাসনা করিয়া থাকেন। মনুষ্য 
সকলের মনে ঘাদৃশ চিন্তার গাঢ়তা জন্মে তাহারা তাদৃশ সংস্কার প্রাপ্ত হইয়া 
তন্দ্ারা তদনুরূপে ফল লাভ করিতে পারে, ইহাতে অবান্তর প্রমাণ এই যে 
যে ব্যক্তির বাল্যকালাবধি মনোমধ্যে ভূত আছে এইরূপ সংস্কার থাকে, সেই 
ব্যক্তি সময়বিশেষে সুষ্ককাষ্ঠের স্তস্তে আপন মনঃস্থিত ভূত কল্পনা করিয়া 


২৪২ 


কলিকুতৃহল 
কাল্পত ভূতের কায্যাদ প্রত্যক্ষ করত ভয়ে প্রাণ ত্যাগও করিভে পারে। এস্থলে 


যদিও কাণ্তস্তস্ত যথার্থ ভূত না হউক তথাচ তাহার মনের ভাব যথার্থ বটে 
এইহেতু তাহার ভয়ে ভীরুব্যক্তির যেরূপ মৃত্যুলাভ হইবার সম্ভব সেইরূপ 
কোন দেবতাকে যদি যথার্থ ঈশ্বরও না বল তথাচ তাহার প্রতি ঈশ্বর ভাবনা 
করিলে অবশ্যই চিত্তবৃন্তি শোধিতা হইয়া সংস্কারমোক্ষ হইবে, ইহা সুদৃঢ় প্রতীত 
হইতেছে। বস্তুতঃ দেবতা সকলও ঈশ্বর হইতে ভিন্ন নহেন, যেহেতু বেদেতে 
সমস্ত বস্তুকেই ঈশ্বর হইতে অভিন্ন বলেন, অতএব প্রতিমা পুজা করিলেও 
আমাদিগের মোক্ষ হইবার ব্যাঘাত নাই। আমরা তোমাদিগকে বিনয়পৃর্বক 
কহি তোমরা অসৎ পথ পরিত্যাগপূর্রক পিতা পিতামহ যে পথে প্রস্থিত 
হইয়াছেন সেই পথে গমন কর। 

্রাহ্ম। আমরা তোমাদিগের ভোগ্লামি শুনিয়া পৌত্বলিক ধর্ম অনুষ্ঠান করত 
সাহেবমগ্লীর নিকট উপহাসাম্পদ হইতে পারি না ও তোমাদিগের মত 
আলুভাতে ভাত খাইয়া সকল সুখভোগে বঞ্চিত হইতে পারি না, আমাদিগের 
যাহা-মনে আইসে তাহাই করিব তোমরা কি আমাদিগকে শাসন করিয়া তাহা 
হইতে নিবৃত্ত করিতে পারিবা? 

(ইহা বলিয়া ব্রান্মদ্বয় তথা হইতে প্রস্থান করিলে বিপ্রও আপন আবাসে প্রস্থিত হইলেন) 


অথ বিধবাবিবাহের আয্বোজন। 
|ত্রিপদী।। 


এইরূপে ব্রন্মাজ্ঞান, আমোদে নিমজ্যমান, 
যতেক নবীন যুবাগণ।- 
নিজে বড় বিজ্ঞম, সকলের এই ভ্রম, 
হৃদে সদা করে জাগরণ।। 
কিন্তু তা সবার প্রায়, ষণ্তামর্ক দেখা দায়, 
হাঁসি পায় দেখিলে চরিত। 
যত তারা বুদ্ধিমান, পুস্তকে আছে প্রমাণ, 
যাহা সব তাদের রচিত।। 
পেয়ে ইস্কুলেতে শিক্ষা, দধিকে বলে আমিঙক্ষা, 
বদরীকে বলে ইহা কদু। 
কুম্মাগুকে বলে মান, সবার এরূপ জ্ঞান, 
যেবা আছে রাম শ্যাম যদু।। 
বাল্যকালাবধি যারা, কুসংসর্গে যায় জ্বারা, 


২৪৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


মারার যখন চারা নাই। 
অতএব সবে তারা, ত্যেজে হরি কালী তারা, 
বাইবেলে বাড়ায়েছে বাই।। 
কেহ বলে সব মিছা, কেন জুজু সাপ বিছা, 
“ভেবে ভেবে আতঙ্কেতে মরি। 
কারু শাস্ত্র কিছু নয়, কেবল ভাড়ামিময়, 
দেখিয়াছি সুবিচার করি।। 
যাহাতে বিনাশে ক্রেশ, সেই মাত্র উপদেশ, 
- গ্রহণ করিব সবর্বস্থানে। 
প্রাকৃতিক সুনিয়ম, করিব না অতিক্রম, 
বৈধাবৈধ বলি কেবা মানে।। 


বাথানিয়া গাবীপ্রায়, যাহা পায় তাই খায়, 
ধন্য ধন্য ঘোর কলি।। 

কোঙ্ক বেঙ্ক ভূপতির, সভারূপ বিটপির, 
স্কন্দ শাখা হয় এ সকল। 

এ লাগি তাহার চিতে, বিধবাবিবাহ দিতে, 
যে বাসনা আছিল প্রবল।। 

তাহা করিতে সাধন, ঈশ্বরের আকুঞ্ণন, 
হইয়া উঠিল নিজমনে। 

যা হবার তাহ হৌক, যে যা কবে সে তা কৌক, 

বিধবারা বাঁচুক জীবনে ।। 

আহা মরি কি কারুণ্য, কিবা নিষ্ঠুরতা শুন্য, 
ঈশ্বরের অগাধ আশয়। 

নতুবা কি এসময়ে, পরদুঃখে দুঃখি হয়ে, 
কেহ কভু সমুদ্যুক্ত হয়।। 

পুরাণে করি শ্রবণ, পৃরবের্ব সুরাসুরগণ, 


২৪৪ 


সুমন্থন করিয়া সাগর। 
পেয়েছিল নানা রত্ব, বিফল ক্ষি হয় যত্ব, 
ঈশ্বরেচ্ছা নহে বিনস্বর।। 
শুনি অবোধের ঠাই, কলিতে ঈশ্বর নাই, 
হরি হরি একি সবর্বনাশ। 
যার আছে এ সন্দেহ, এখন দেখিলে সেহ, 
প্রত্যক্ষেতে পাইবে বিশ্বাস।। 
আবাল বিধবা যারা, মরি মরি কত তারা, 
ক্লেশ সহে পতির বিরহে। 
সদা ভাবে এ ঈশ্বর, এ যন্ত্রণা ঘোরতর, 
ঘুচাও নতুবা প্রাণ দহে।। 
যদি প্রভু রতে খাতে, প্রাণ বাঁচে যাতে তাতে, 
তবু তো না হয় বাঞ্থাপূুর্ণ। 
দৈবে হৈলে তাতে ফল, সে ফলে না ফলে ফল, 
অবিফল কর আসি তুর্ণ।। 
বুঝি এই অনুরোধে, করুণা কর্তব্যবোধে, 
তা সবার স্বপক্ষে ঈশ্বর। 
অনুভবে জেনেছি অস্তর।। 
সেইতো ব্যবস্থাপত্র, দেখিতেছি যত্র তত্র, 
পাত্রাপাত্র সকলের স্থানে। 
যেন নবগোরাগণ, যীশুপ্রেম বিতরণ, 
কালে যোগ্য যোগ্য নাহি মানে ।। 
যারে দেখে নিজ কাছে, ধর বলি প্রেম যাচে, 
অদভূতগৌরাঙ্গ চরিত। 
তেন বিধবা বিবাহ, করিবারে সুনিবর্বাহ, 
তরঙ্গ উঠেছে আচ্কষিত।। 
হাটে ঘাটে যথা তথা, শুনি মাত্র সেই কথা, 
নব্যানব্য পতিহীনাগণ। 
তারে গিয়া করে জিজ্ঞাসন। ৷ 


৯২৪৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


অথ বিধবাগণের উল্লাস। 
| ।পয়ার।। 


হিরা বলে ধীরাপ্রতি আর্‌ শুনেছ দিদি। 
বিধবারে অনুকুল হল্য বাকি বিধি।। 
হাটে ঘাটে মাঠে এবে যেখানেতে যাই। 
বিধবার বিয়া হবে ইহা শুনতে পাই।। 
সত্য মিথ্যা যাহা হৌক কথা ভাল বটে। 
সবে কয় লোকে যাহা রটে তাহা ঘটে।। 
দেখ যদি ঈশ্বর সদয় হয়ে থাকে। 

তবে হবে বাঞ্কাসিদ্ধি আর ভয় কাকে।। 
বাল্যকালাবধি মোরা হয়ে পতিহীন। 
দুপ্ত$খৈতে কাটাই কাল কেন্দে নিশি দিন।। 
একে একাহারে সদা কলেবর দহে। 
তাহে সবর্বনাশ যদি একাদশী কহে।। 
পান বিনা প্রাণ যায় মুখের অসুখে। 
সধবার সুখ দেখি সেল ফোটে বুকে।। 
পতি কোলে শুয়ে সুখে নিদ্রা যায় তারা। 
অভাগিনীগণ তারা গুণে হয় সারা ।। 
ইচ্ছামত বাসভৃষা সধবারা পরে। 
বিধবার বেশ দেখে দ্বেষ করি মরে।। 
যৌবন জ্বালায় সদা তনু জ্বর জুর। 
যতনে জীবন রাখা অধিক দুক্ষর।। 
আপনার বুক দেখে দুঃখে ফাটে বুক। 
কিসে সুখ হবে বলি করি বুক বুক।। 
ভাবি লুকি চুরি করি জুড়াই জীবন। 
কাষে বাজ পড়ে যদি জানে কোন জন।। 
জঠর কঠোর শত্রপনা করে পাছে। 
অধিকস্ত মনে মনে এই: ভয় আছে।। 
বিধি বিধবার দেখি এসব দুর্গাতি। 

বুঝি বিবাহের বিধি গড়েছে সম্প্রতি ।। 
দেখ বাকি ফুটিয়াছে পরিণয় ফুল। 
নহিলে ঈশ্বর কেন হবে অনুকূল।। 
ধীরা বলে ওলো হিরা কি ভেবেছ চিতে। 


২৪৩ 


হবে না বিবাহ দেশে পণ্ডিত থাকিতে ।। 
ব্রান্মণ পণ্ডিতগুলো হয়েছে বালাই । 
তারা বলে বিধবার বিয়া শান্ত্রে নাই।। 
হয় নয় কেবা জানে লোকমুখে শুনি। 
বিধবার বিয়া লেখে পরাশর মুনি।। 
সে মুনির মনঃ ভাল জানি রীতি তার। 
কৈবর্ত-কন্যারে যেই করেছে উদ্ধার।। 
বশিন্টের পুত্র সেই বেশ্যা মাতা তার। 
সে কেন কবে না বিয়া দিতে বিধবার।। 
ইহার তনয় ব্যাস সেও ভাল হয়। 
ভ্রাতৃবধুসঙ্গে যার আছিল প্রণয়।। 
বিধবাবিবাহ সেকি নিষেধিতে পারে। 
তবে কেন ভগুগুলো মিছা মাথা নাড়ে।। 
গুণনিধি কহে কেন ভাব রামাগণ। 
বাঞ্তাসিদ্ধি হবে কিছু কর বিলম্বন।। 


সমাপ্ত। 


২৪৭ 


সপত্ী নাটক" ১৩ 


বির গুভূতি দিক্‌ পাল সকল, আসিরাছেন, ' কেবল বস্রাজ্‌ 
আসিতে বাকী ছিলেন, তাই, শান্মা উপস্থিত'। এই সবায় 
কন্যেরত্বি কুলভিলক দ. ত। ভোক্তা বদাল্য বান, ধন্য গণ্য 
সৌজন্য (ধনে মনে) “পণ্যের বিষয়টাও কন্যে ওজন করিয়। 
মঞ্টে মঞ্টে বচ্চ ২৭ নওয়া হইয়াছে, তায় কণ্ধুর নেই» শা- 
গিল্য শিরোষুণি শ্রীলপ্রীমান্‌ শ্রীযুক্ত রা কিন্কর বান্দ্যঘটায় 
মহাশর মহোদয় মহাত্মা মহাগত)প মহাএ্রতাপচন্দ্র রায় 
বাহাছুর কুলান কেশব, আপনার উপযুক্ত পাত্রে রূপগুণে 
অপ্থিতীয়। শ্রীযুতা শ্রীমতী শ্রীলা কন্যা সম্প্রদান করিবেন। 
আজ আর আনন্দেত্র -পরিসীমা কি। যেন, বলাল ঠাকুর 
নিজেই আসিয়। মট্কার বসিয়া: দেখিতেছেন। অহে কুল 
দেপরু কুল বাগীশ !. কুললক্কার ভষ্টায্য ; তোমর! কুল 
সংকীত্তন আরম্ত কর। 


উপস্থিত 7. হা মহাশয়" আস্তে আজ্ঞ। হয়ঃ এই যে 
ঘটকগণ $ কেবল আপনকার অপিক্ষা ছেল। (ঘটক স্বরে 
ফুলচিপাত) 
অশিদগ্ধাচ যে জীবে যে চ দগ্ধে। কুলাগুণে | 2 
রৃতিকান্ত । €উহাদিগের বচন পাঁঠ,শেষ ল! হইতে হইতেই দত্তে ) 
বিলক্ষণ ! তোমরা সব ভুলিয়। গিয়াছ হেঃ ওটা! এ বিবাহের 
কারিকে নয়, পুনব্বিবাহের £' এই আমার সঙ্গে এ বিবাহের 
কারিকে বল। (ঘটক শ্বরে)। 


£ শসানানল দগ্ধাহি পরিত্যন্কোহি বান্ধ বাত) | 


১৮৫৮ 
সপত্রী নাটক-এর প্রথম সংস্করণের একটি পৃষ্ঠা 


সপ্পত্বী নাটক 
তারকচন্দ্র চুড়ামণি 


কলিকাতা, ১৮৫৮ 
নাটকে উল্লিখিত রয়েছে এটি নাটকের প্রথম ভাগঃ 
কিন্তু দ্বিতায় ভাগ কখনই প্রকাশিত হয়নি। 


প্রথম অঙ্ক 
নান্দী 
ত্রিপদী। 


জয় জয় দয়াময়! বিশ্বময় দৃশ্য নয়, 
কে বর্তিবে তোমার স্বরূপ। 
নমঃ প্রভু জগদীশ!, তুমি সুধা তুমি বিষ, 
বেদে বলে তোমারে অনুপ।। 
মন্ত্রণা যন্ত্রণা পায় ভাবি। 
ব্ত্ত হয়ে দরশন, করে সৃম্ষ্ম দরশন, 
তথাপি ও ভাবে নয় ভাবী।। 
ন্যায় পাগলের ন্যায়, কত করে ন্যায়ান্যায়, 
ংখ্য করে অসংখ্য সন্ধান। 
যিনি পুণ্য পাতঞ্জলী, হইলেন কৃতাগ্জলি, 
তবু তব না পায় সন্ধান।। 
মীমাংসা যে কিছু কয়, তাহাতো মীমাংসা নয়, 
বৈশেষিক না জানে বিশেষ। 
তবে আর কার ঠাই, বল তব তত্ব পাই, 
সত্তা মাত্র মানি অবশেষ ।। 
ব্রক্মা চতুর্মূখ হয়্যে, তোমার মহিমা কয়োয, 
না পারিলা করিবারে শেষ। 


২৫৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত) 


কি কব সুধাল্যে জীব, এই ভারি সদাশিব, 
লইলেন পাগলের বেশ।। 
অনস্ত না অন্ত পেয়ে, পাতালে পলান ধেয়ে, 
মাথায় করিয়া বিশ্বপুর। 
বলেন“অজ্ঞাত শিব, এই বিশ্ব দেখ জীব, 
তাহার মহিমা কত দূর” ।। 
আমরা কি করি খেদ, বেদ নাহি জানে ভেদ, 
পুরাণেতে ফুরাণ না মায়। 
তাই বলি দয়াময়!, দীনে যদি দয়া হয়, 
তবে তরি এ ঘোর মায়ায়।। 
তান্‌ লয়- রাগ ভূমি, নটের নাগর তুমি, 
পুরাও ডাগর আশা ডোর। 
হর হর বিদ্ব হর, ওহে প্রভু স্মরহর!, 
আসরে বাসর কর ভোর।। 


|| সুত্রধার || 


নান্দীপাঠ সমাপন হইলে সুত্রধার বলিল,““অতি প্রসঙ্গে প্রয়োজন নাই, 
তাহাতে নাট্যরস বিরস হয়”। 
সৈভার চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিতে করিতে) 
হাঁ সভাস্থগণের অস্তঃকরণাকর্ষণ হইয়াছে!। 
হাঃ হাঃ হাঃস্দীর্ঘ হাস্য”করিয়া) না হইবে কেন?! 


পয়ার। 


ধৈর্য চন্দ্র, সুকবি কেশরী যার নাম। 
রসের বাসের স্থান যাঁর চিত্ত ধাম।। 
করিলেন অনুমতি সেই গুণাকর। 
রচিলেন সভাসদ সুকবি প্রবর।। 
সপত্বীর বিবরণ অতি মনোহর। 
সভাস্থ রসিক সবে সুবিদ্যা সাগর।। 
আমরা নিতাস্ত নই নটের অধম। 
কেন না সফল হবে এ সকল শ্রম£।। 
যাই, এক্ষণে গৃহিণীকে ডাকিয়া নাট্য আরম করি। 
(নেপথ্যের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া) 
প্রিয়ে! যথোপযুক্ত সঙ্জা সমাপন করিয়া ত্বরায় আইস। 


২৫৭ 


সপত্বী নাটক 

(নটীর প্রবেশ) 
নটী। আর্য্পুত্র! এই এল্যোম, বলুন কি কর্ববো। 
সুত্র। (হাস্য বদনে)। প্রিয়ে, এসো এসো, অহহ! কি আশ্চর্য্য শোভা হইয়াছে, 
প্রিয়তমে! এ দেখ দেখ “তোমার অপুবর্ব সঙ্জা দেখিয়া সৌদামিনী লঙ্জায় 
তাড়াতাড়ী মেঘাম্বরে সর্ব্বাঙ্গ ঢাকিতেছে, মলয়াচল, মন্দ মন্দ গন্ধ বহ দ্বারা 
তোমার অঙ্গ সৌগন্ধ্যের নিমিত্ত পবিত্র চন্দন গন্ধ উপহার দিতেছে” অহহ! 
কি চমতকার বেশ!। প্রণয়িণি! আজি আমরা এই যে সভায় আসিয়াছি, এ 
সভা সামান্য সভা নহে, মহাসভা। শুনিয়াছ “সত্যতা নদীর পরপারবর্তী সুখময় 
নগরে সারল্য দেশের শিরোভূষণ স্বরূপ মহারাজ ধৈর্য্য চন্দ্র বসতি করেন” । 
তিনিই এই মহাসভার অধিকারী, এ তীাহারি নাট্যালয়। 
নটী। (বিস্মিতা হইয়া)। হাঁ হাঁ সেই সেই। যীহাকে আমাদের ইঙ্গরেজ রাজারা 
বড় মান্য করেন? আমাদের দেশের কৃতবিদ্য যুবকেরা যীহার নাম শুনিলে 
এককালে পুলকিত হন, (কর্ণপাত করিয়া কৌতৃহলে) তারপর? তারপর? 
সুত্র। এ দেখ “তারকাবলী বিরাজিত পূর্ণশশধর সদৃশ শ্রীল শ্রীযুত অধিরাজ 
পণ্ডিত মণ্ডলী বিরাজিত হইয়া বিরাজ করিতেছেন। 
নটী। (রাজদর্শনে আহ্াদিতা হইয়া, প্রসন্ন বদনে)। 


পয়ার। 


হায় রে সারল্য দেশ কি সুখের দেশ! 
দেখি নাই শুনি নাই এমন সুদেশ।। 
সুখময় সুখময় নগর প্রধান। 
(হরিলে হরিষ চিত্ত জুড়ায় পরাণ ।। 
সত্যতা সুখের নদী নির্মলতা বারি। 
স্পর্শে পুলকিত অঙ্গ, যাই বলিহারি।। 
তাহাতে সুধৈর্ধ্যশীল ধৈর্য্য মহারাজ। 
দেবরাজ জিনি যিনি করেন বিরাজ।। 
বামদিকে পাটরাণী বসিয়া সুমতি। 
ইন্দ্রের ইন্দ্রাণী জিনি যাঁর দেহ জ্যোতিঃ।| 
ইচ্ছা হয় কি্করী হইয়া করি সেবা। 
যায় যাবে জাতিকুল যা বলুক যেবা।। 
স্বামি, কর কিন্কর হইয়া পদ সার। 
পোড়া ভারতের মুখ না হেরিব আর।। 
কি কায কি লাজ আর কিবা লোক ভয়। 
৫৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


মরুক সে দেশ হোক এদেশের জয়।। 

এদেশের প্রতি দ্বেষ দ্বেষ করি তুমি। 

বাস করি নাশ কর ভারতের ভূমি?।। 

সরলেতে! সরলতা করিয়া প্রকাশ। 

করিতেছ এদেশেতে বারোমাস বাস?।। 

হিংসে! কেন এ দেশেতে এত হিংসা তোর?। 

কেবল করিলি বঙ্গে এ বয়স ভোর?।। 

মাসর্য্য! মাৎসর্য্য তোর ভারতের প্রতি?। 

এই হেতু করিলি না সারল্যে বসতি?।। 

তোদের না দেখি হেথা, রাজ্য পৃণ সতে। 

মদ! তোর মন্ত ভাব কেবল ভারতে ?।| 

দূর হোক সে সব কথায় কায নাই। 

পেয়েছি সুখের দেশ ছাড়া ছাড়ী নাই।। 

এদেশ ছাড়িয়া আর নাহি যাব দেশে। 

এদেশে করিব বাস ভিখারীর বেশে।। 

এদেশে বিজ্ঞান বল মনোহর অতি। 

নাহয়, তথায় গিয়া করিব বসতি।। 

পল্পলে কি জল নাই গাছে নাই পাতা?। 

বাহু বল্লী উপধানে থাকে না কি মাতা?।। 

বাস করি গিরি গুহা হব ফল ভুকৃ। 

কাননে কি নাহি হয় আননের সুখ?।। 
আর্য্যপুত্র! তারপর? তারপর ?। 
সুত্র। মহোদয়ের সভাসদগণ সকলেই স্ব স্ব স্বামীর অনুমত তাহার সভাসদ 
কবিপ্রবর প্রণীত সপত্বী নাটক যাত্রা দেখিতে উৎসুক! অতএব তুমি ত্বরায় 
সভাকে সস্তষ্টা করিতে যত্ববতী হও। আর, সংপ্রতি সুখময় বসস্ত সময় 
সমাগত। অতএব ইহারা তোমার মুখে একটী বসন্ত সংকীর্তন শুনিতে বাসনা 
করেন। তুমি বসস্ত বিষয়ে একটু আলাপ কর। 
নটী। যে আজ্ঞা আর্্যপুত্র!। 

ত্রিপদী। 


, কালের প্রধান কাল, আসিয়া বসন্ত কাল, 
ধরাপাল হইল ধরায়। 
স্বভাবের ভাব যত, হয়্যে তারা অনুগত, 
অবিরত রাজগুণ গায়।। 
২৫৪ 


সপত্বী নাটক 


কোকীল নকীব বেশে, চরিয়া গগণ দেশে, 
দেশে দেশে করিছে প্রচার। 
এই সসাগরা ধরা, হলো এবে সুখভরা, 
বসস্ত রাজার অধিকার।। 
সুখময় ভরতের দেশ। 
ধরাধরে করিছে প্রবেশ।। 
দল দল ছিল বল, কার বলে করে বল, 
হত বল করে পলায়ন। 
বিপক্ষ পাইলে জুয়া, ভূপাল হইলে ভূয়া, 
সেনাগণ কোথা করে রণ?।। 
করেন দ্বিগুণ কর দান। 
ংশ সম্ভব যারা, অভিমানী বড় তারা, 
প্রাণের সমান দেখে মান।। 
কৃতাস্ত বৃত্তান্ত শুনি, চিস্তারে অন্তরে গুণি, - 
লভিতে রাজার পুরস্কার। 
হয়্যে তার আজ্ঞাবহ, গন্ধ বহ গন্ধ বহ, 
অহরহ দেয় উপহার ।। 
কি আর বর্তিব শেষ, সুখময় হলো দেশ, 
অদ্বেষ হইল দেশময়। 
দুঃখ দল হৈল পরাজয়।। 
আপনি আনন্দ আসি, নাশিল ক্লেশের রাশি, 
হাসি হাসি ভ্রমে দিগ্‌ দশ। 
কি ভাব হইল ভবে, পশু পক্ষী আদি যবে, 
হইল রাজার আজ্ঞাবশ।। 
কেহ নাচে কেহ গায়, পীছু নাহি ফির্যে চায়, 
আগু ধায় সুধাইতে বাণী। 
(নটীর বসন্ত সংকীর্তন সমাপন না হইতে হইতেই) 
সুত্র। প্রিয়ে! সাধু সাধু, অতি উত্তম সংগীত করিয়াছ! প্রিয়তমে! আহা। এঁদেখ 
দেখ, তোমার বিধুবদন বিগলিত সংগীতসুধা গ্রহণ করিয়া সভাস্থগণ সকলেই 


২৫৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


পুলকিত হইতেছেন, তাবতেই নিস্তব্ধ, চিত্র পুতুলিকার ন্যায় বসিয়া আছেন! 
যাহা হউক, প্রণয়িণি! চল চল, এক্ষণে আমরা বিদায় হই, এ দেখ, 
কুশীলবেরা কাদঘ্ঘিনী, নিতম্বিনী ও চঞ্চলার বেশ ধারণ করিয়া আসিতেছে। 
উভয়ের প্রস্থান। 
(জয় শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্তঃপুর) ৫১) 
(কাদদ্বিনী, নিতম্বিনী ও চঞ্চলার প্রবেশ) (২) 
চঞ্চলা। (এক যোড়া তাস হাতে করিয়া, হাস্য বদনে)। কোথা লো বড় বৌ? 
আজ বড় যে তোকে আর দেখতে পাই না? হোক্‌ না ভাই, আর কার্‌ কি 
কেউ কখন চাকরী কর্যে বাড়ী আসে না? তা হল্যেই কি এত ঘুমুতে হয় 
লা? মিটে পেল্যেই কি আঁটা শুদ্ধ গিল্তে হয়? সন্ধ্যে হলো যে, তবে আজ 
আর কখন খেল্বি?। 
কাদম্থিনী। (সবিস্ময়ে)। সেকি লো! ওমা কোথা যাব মা! দেখ্যে দেখ্যে যে 
আর বাঁচিনে! বৌ মানুষ, দিনের বেলা এত ঘুম কি লো! তায় আবার দাদা 
কাল বাড়ী এস্যেছেন! কেমন মেয়্যে লা! ওমমী নোকে শুন্লে বলবে কি লা! 
কি বলে, নেঙ্গ্ঠকে চেয়্যে নেঙ্গঠকে যে দেখে তার বেশী নজ্জা, এ যে তোর 
তাই হলো লো। 
নিতশ্বিনী। (হাসিতে হাসিতে)। রোস্‌ ভাই! রোস্‌, শুধু শুধু ফির্যে যাওয়া হবে 
না বোন! আয় আমরা সকলেই গিয়া ওর ঘরের ভিতর গোলমাল করি, বৌ 
ঘুম ভেঙ্গে উঠ্যে আমাদের দেখ্যে জড়সড় হয় কিনা?। মনের কথা বলতে 
কি ভাই! আজ খেলা হোক্‌ বা না হোক্‌, ভূধর দাদা কি এন্যে বৌকে 
দেয়েছে, তা কিন্তু সকল দেখতে হবে বোন। 


পি একত্র। (গৃহদ্বারের নিকটে গিয়া গৃহমধ্যে 
নিতথ্বিনী দৃষ্টি বিনিবেশিত করিয়াই বিশ্ময়ে।) 


ওমা এ যে দাদা রয়েছে লো ! কথা কচ্চে নয়?। (জিব কাটিয়া হাসিতে 
হাসিতে নিঃশব্দ পদসঞ্চারে তাড়াতাড়ী গবাক্ষ নিকটে প্রস্থান।) 
(শয়নাগার) 

(ভূধর ও সৌদামিনির প্রবেশ)। (৩) 
ভূধর। (সৌদামিনির হস্ত ধারণ পূর্বক বাষ্প কণে)। প্রিয়ে! উঠ উঠ, শাস্ত হও, 
রোদন সম্বরণ কর, আমার হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যাইতেছে, আমি আর তোমার 
(5) কংশজব্রান্থণ। 55757700000 
(২) প্রতি বাসিনী কুলীন কন্যাগণ, সধবা, কাদশ্থিনী জ্ঞোষ্ঠা, নিতম্বিনী মধ্যমা, চঞ্চলা কনিষ্ঠা, তিন 


সহোদরা, নিয়ত পিতৃকুল বাসিনী। 
(৩) জয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জেস্পুত্র ও জেষ্ঠপুত্রের প্রথমা সত্রী। 


৫৬ 


সপত্বী নাটক 

এ দুঃখ দেখিতে পারি না, শিরীষ কুসুমাপেক্ষা, তোমার কোমল কলেবর 
ধূলিশয্যায় কি এ কষ্ট সহিতে পারে£ চল চল, শয্যায় চল, বল বল কি 
কারণ এত রোদন করিতেছ? -__কি কারণ ধরা শয়ন অবলম্বন করিয়াছ?। 
প্রিয়তমে! তুমি তিলার্ঘ আমাকে বিরস বদন দেখিলে এককালে দশদিক শুন্য 
দেখ, আহার নিদ্রা পরিত্যাগ কর, কিন্ত এখন আমি তোমার রোদন দেখিয়া 
এত ব্যাকুল হইয়াছি, চক্ষের জলে বক্ষঃ্পর্য্যস্ত ভাসিয়া যাইতেছে, অস্তঃকরণ 
অস্থির হইয়াছে, তথাপি তুমি কথা কহিতেছ না কেন? হে অভিমানিনি! কে 
তোমাকে কি বলিয়াছেঃ কে তোমায় কি অবমাননা করিয়াছে? কি জন্যই বা 
তোমার এ অভিমান জন্মিয়াছে? বল তো শুনি। হে মৃদুভাষিণি! এই মাত্র 
প্রাত! কালে যখন আমি শয্যা হইতে উঠিয়া বাহিরে যাই, তুমি হাস্য পরিপূর্ণ 
বদনে প্রণয় বচনে বলিলে, “নাথ! অনেক দিনের পর তোমার চরণ সরোজ 
সন্দর্শন করিয়া আমার চিত্তভ্রমর চরিতার্থ হইয়াছে, আর তোমাকে তিলার্ 
চক্ষের আড়াল করিতে ইচ্ছা হয় না, প্রনয়িণি! আমিও তোমার মত অরধৈর্ধ্য 
ও বিহুল হইয়াছি, এই মাত্র বাহিরে বসিয়া অনেক দিনের পর প্রিয় বন্ধু 
বান্ধবগণে বেষ্টিত হইয়া, কত নৃতন নৃতন প্রস্তাব লইয়া, আমোদ প্রমোদ 
করিতেছিলাম, হঠাৎ যেমন তুমি আমার স্মৃতিরূপ সিংহাসনে অধ্যাসীনা 
হইলে, অমনি আমি সে সকল কৌতুহল পরিত্যাগ পূর্বক অন্য কোন 
কার্্যচ্ছলে তোমার বদনসুধাকর সন্দর্শন করিতে আসিলাম। 

হে জীবিতেশ্বরি! কোথায় তোমার অধর সুধা পান করিয়া দুাস্ত প্রদ্যু্নের 
জ্যোতমালোকে বিশ্ব সংসার এককালে সুপ্রসন্ন হেরিব, কোথায় তোমার বসস্ত 
কোকিলালাপ বিনির্জিত মৃদুমধুর বয়ন পরম্পরায় পরিতৃপ্ত হইতে থাকিব, 
না, ততোধিক কষ্ট পাইতে লাগিলাম? হায় হাঁয়! কি করি; এখন কিসে 
তোমাকে সাস্তবনা করি? বলতো। 

হে প্রণয় প্রিয়ে! এই দেখ, প্রজল্লিত হুতাশন শিখাবলী সদৃশ, প্রদীপ 
বিষধরের দশন বিগলিত বিষবিন্দুর ন্যায়, তোমার বাম্পবিন্দু আমার শরীর 
দগ্ধ করিতেছে। 

(কোলে লইয়া শয্যার এক পার্থ বসাইয়া) র 

হে মিতভাষিনী? বল বল, কেন এ বিষম বিষ দহন জালিয়াছে?। এ 
সময়ে এখানে আর আমার অধিকক্ষণ বিলম্ব করা ভাল দেখায় না, বন্ধু 
বান্ধবেরা লজ্জা দিবেন, গুরুজনের নিকট নিন্দিত হইব, মাতা, ভগিনী প্রভৃতি 
গুরুজন ও গৃহজনেরা চারিদিকে রহিয়াছেন। (ক্ষণকাল স্থিরভাবে দণ্ডায়মান 
থাকিয়া)। এঁ বুঝি, প্রিয় বয়স্যেরা রহস্য করিতেছেন, শীঘ্র গিয়া প্রিয় সভভাষণ 


২৫৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


করি, কিন্তু পরিয়ে! তোমার আজ্ঞা না হইলে যাইতে পারি না, বল বল, আর 
যাতনা দিও না। ্‌ 
নিতশ্ষিনী। (গবাক্ষ ব্যবধানে দাঁড়াইয়া কানে কানে)। দিদি, দেখলি ভাই! দেখ্লি? 
কেমন ভাতার দেখলি? আহা! স্বামী কেমন সামগৃগিরী দেখ দেখি বোন। 
এমন না হলে কি ঘরকন্না কর্যে সুখ জন্মে, না, ভাতার বল্যে সাধ মেটে? 
আহা! হাই তুল্লে হাত পাতে লাঃ পোড়া কপাল, ভাতার বল্যে কি একদিন 
চক্ষেও দেখতে পেলুম না যে খেদ মিটাবঃ আজন্ম কালটা কেবল বাপের 
বাড়ী দাসীপানা কন্তে কত্তেই মারা গেলোম! তাই বলি, বলি বোন! যার পূর্ব্ব 
জন্মে তপস্যে ভাল হয়, সে না হল্যে কি এমন মনের মতন স্বামী পায়?। 
দিদি! আর বল্‌্বো কি? অমূনি গুমুর্যে গুমুর্যে মর্যে যাচ্ছি। জানিস্‌তো ভাই! 
সব্বাইকেরি তো এই এক দশা । পোড়া বল্লেম্‌, মর্, কি বলে গা, বল্লেন, না, 
দূর হোক্‌, ক্ষেণেক চিস্তা করিয়া) না ভাই! নামটা ভাল মনে হচ্ছেনা, এ যে 
পুরুষগুলো কি বলে, কি একটা সেন পুব্যে বাঙাল ধলীধরা মর্! সে আবার 
রাজা হয়েছিল এ বোদ্যিটা না, মর্বে, আমাদের না এ যন্ত্রণা হবে, বল্‌্বো 
কি বোন! যেন টাড় বকৃনের মতন ঘৃর্যে ঘূর্যে মরে গেলোম! মেয়্যে মানুষের 
প্রাণে কি এত সয় গাঃ। 

মর্‌, তখনকার পর্মেশ্বরও কি এত কানা ছিল লা! যে এমন সোণার 
ইঙ্গরেজরা থাক্‌ৃতে কোথাকার অমনটাকে আহা! এত. বড় এক দেশের রাজা 
কর্যে দেছিল। মর্, বলতে নজ্জা পায়। যাব কোথা মা! পোড়া রাজারও কি 
কখন এমন হুকুম বের্‌ হয় গা!”যে একটা পুরুষের পঞ্চাশটা, ষাটটা, একশ্টা 
মাগ, আর কেউ কোগ্মী আর আপনি, লোটা আর সোটা নিয়্যে ঘুর্যে ঘুর্যে 
মরুক! এমন পোড়া রাজার মাথায় বজ্বাঘাত পড়ুক, মর্, হাসিও পায় দুঃখও 
ধরে। 
পড়্যে জন্ম কালটা মিথ্যা নষ্ট কল্লোম বোন! ইহকাল পরকাল দুটো কালই 
খোয়ালেম যার নক্ষীশ্রী না থাকে, সে কি কখন স্ত্রী কেমন সামগৃগিরী তা 
চিন্তে পারে?। আহা দেখলি নে ভাই! দাদার মুখখানী এককালে যেন তুল্সী 
পাতা হয়্যে গেলো লা, যেন হেদীয়্যে পড়ে গেলেন। 
চঞ্চলা। (হাসিতে হাসিতে) দিদি! শুন্লি, নিতু যেন একৃকালে খেপ্যে উঠূলো 
মা, ওর আগুন জ্বল্যে উঠ্যেছে, ও আর থাকৃতে পারে না, ওমা! চেনা দায়! 
নিতুতো সামান্টী মেয়ে নয়! এখনি কি বল্‌্তে কি বলে, না জানি, আবার 
কবে কি.কত্তে কি কর্যে বসে দেখ্‌ ভাই!। 

ছি ছি! ওমা! যাব কোথা মা। কি পোড়া? আ মর্। ও ছুঁড়ি! ওলো! ও 


২৫৮ 


সপত্বী নাটক 

যে দাদা হয় লো! ও কি বলিস! দিনে কেন সিঁধ, না, খেচ্কা ভারী, এ যে 
তুই তাই কলি লা!। 
নিতশ্থিনী। (কিঞ্িৎ রাগোম্মুখী হইয়া)। যা ভাই? তোদের মেনে কেমন রোগ, 
কেবল ছল ধন্তেই শিক্যেছিস্, তোদের জ্বালায় যে কথা কওয়াই দায় হলো! 
আমি কি বন্ুম, তা হোক্‌ না দাদা, কথা বলতেও কি এত দোষ! তোরা বড় 
মুখড় মেয়্যে ভাই যাঃ!। 
কাদশ্িনী। (সক্রোধে, আস্তে আস্তে)। আঃ, চুপ কর্‌ না, শুস্তে দেনা লা! 
ছুঁড়ীগুলো যেন একৃকালে মেত্যে উঠ্যেছে। 
সৌদামিনী। (অল্প ঘোম্টা টানিয়া, সজল নয়নে)। কি বল্বো ভাই! বল্বার কি 
আর কথা রেখ্যেছ, সব ফুরুয়্যে গ্যেছে, তা এখন মৈলেই বীচি, আর কি 
বাচতে সাধ্‌ আছে? এ অভাগীর আর কে আছে ভাই! তা কাকে কি বল্‌বো 
বল? পৃর্র্বজন্মে যেমন তপুস্যা কর্যে এস্যেছি তাই ভুগ্দে হবে, বিধাতার 
কলমপোড়া কপাল্যে তিনি যা আঁচূড়্যে রেখ্যেছেন, তা কি কেউ নয় কন্তে 
পার্বে, ভাই! তা বল্বো কি হাতের পোছ, পায়ের পোছ, কপালের তো 
পুছবার, নয়! তা তোমার কি দোষ দিব বল? দৌর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগপূ্র্বক 
মনে২)। হা জগদীশ্বর! হা বিশ্বনাথ! হা দয়াময়! হা করুণানিধান£ তোমার 
মনে কি এই ছেলো!। 

অভিপ্রায়। 


চৌপদী। 


পৃথিবীর সুখ, আমাতে বিমুখ, কহিতে সে দুঃখ, 
শোকানলে জ্বলে বুক। 
বিষধর ধরি, বিষপান করি, আহা! মরি মরি, 
হইয়া রয়্যেছি মুক।। 
সুধার আশয়, মথে সুধাশয়, দেবাসুর চয়, 
লয়্যে মথনী গিরীশ। 
কারু ভাগ্যে সুধা, নিবারিল ক্ষুধা, জিনিল বসুধা, 
কাহারো কপালে বিষ।। 
ছিল আশা মনে, ধনী হব ধনে, প্রিয় পতি সনে, 
সুখে রব দিবারাতি। 
ঘুচিল সে সব, হইলাম শব, রটিল কুরব, 
- জুলিল বিষের বাতি।। 


২৫৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


(এই ভাবিয়া অধোবদনে রোদন।) . 

ভূধর। (ব্যস্ত সমস্ত হইয়া থুতি ধরিয়া।) 

কেন? কেন? কি হয়্যেছেঃ কি হয়েছেঃ হর বুঝি ঝক্ড়া কর্যেছেঃ মা 
কি কিছু বক্যেছেনঃ বল না? বল না? সব ভেঙ্গে বল নাঃ যাদু শুনি? ছিঃ! 
অমন করিয়া কি কান্দিতে আছে?। 

সৌদামিনী। €ছিগুণ অভিমানিনী হইয়া, একটু ঘোমটা টানিয়া, রোদন করিতে করিতে) 
কাঁদবো কিসে ভাই! আমার কে আছে, তা কার কাছে কীদ্বো। ঝক্ড়া কেন 
হবে! যেমন তপুস্যা কর্যে এস্যেছি, ঝক্ড়া কল্পে আর কি হবে বল? কারু 
যেমন রেখ্যেছেন, তেম্নি আছি, কার জন্যে ঝক্ড়া করবো বল, ঝক্ড়ার সে 
সব ফুরিয়্যে গ্যেছে, বিধাতা সৈতে কর্যেছেন, সচ্ছি, তা আর বলবো কি, 
মেয়ে জাত ছাড় জাত, দশ হাত কাপড়েও নেঙ্গটো, বুদ্ধি শুদ্ধি মিথ্যে, তা 
থেক্েও নেই, শুন্যে অন্ধি অমূনি প্রাণটা যেন ধড় পড় কর্যে উঠৃতেছে, আর 
চুপ্‌ কর্যে থাকতে পান্থুম না, তাই বস্যে কীদ্দেছিলুম। তাই বলি, বলি হে 
বিধাতা! তোমার মনে কি এই ছেলো! 

পোড়াকপাল! কে আছে ভাই! কোথা যাব, কাকে বল্বো, বড়মানুষের 
ঘরে জন্ম্যেছিলুম বটে, বাপ বড়মানুষ, একজন মান্যগণ্য নোক ছিলেন, তা 
মিথ্যা নয় কিন্তু আমার নিতান্ত পোড়া কপাল! পর্মেশ্বর তাও সব কি 
রেখ্যেছেন! মা নেই! বাপ নেইু! তেমন একটা বোন নেই! যে সেখানেগ্যে 
পাঁচ দিন জুড়ুয়্যে আসি! শত্তুরের মুখে ছাই দিতে ভাই বড় মানুষ ভাগ্যমস্ত 
নোক বটেন, তা কি অভাগীর! সেখানেও সুখ আছে? এখনকার বৌয়েরা কি 
ভাই! ভাই রাখে?। 

তোমরা পুরুষ মানুষ, নিষ্ঠুর জাত, সব্‌ কন্তে পার, আজ আমাকে ফাঁকী 
দিতে বস্যে, তা বোস, কিন্ত তোমার সঙ্গেতো আর আমার আজকার এক 
দিনের আলাপ নয়, সকলি জান, তিনি কি এ নাগাদ এক দিন একটা কাগের 
মুখেও তত্ব কর্যে পেঠ্যেছেন? যে কথা থাক্বে!। 
ভূধর। কেন? কেন? এত হাড়ভাঙ্গা খেদ কেন? তুমি কার মুখে কি 
শুন্যেছ?। 

সৌদামিনী। শুনবো কি আর ছাই! যা শুন্লুম, তা কি তুমি যান না? যার 
ব্যে তার মনে নাই, পাড়া পড়্সীর কাট্না কামাই, এও কি কখন হয়্যে 
থাকে? তা আর কি বলবো? তুমি সুখে থাকলেই ভাল, তাই আমার সুখ। 
তবে মনটা কেমন কেমন করে, নিতাত্তই প্রবোধ মানে না, তাই সকল দিক 
একবার একবার ভাব্তে হয়, সবরকমই দেখ্তে হয়। 


২৬০ 


সপত্বী নাটক 


(একটা দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ পূর্বক অধোবদনে রোদন'করিতে করিতে মনে মনে ।) 
হে বিধাতা! তোমার মনে কি এই ছিল! এই নিরাশ্রয় হতভাগিনীকে 
সংসার আশ্রমের সুখ সম্ভোগ হইতে এককালে বঞ্চিত করিলেঃ হায় হায়! 
পূর্ব জন্মে কতই দুষ্ৃতি করিয়াছিলাম, বলিতে পারি না, তাহাতেই এই 
যৎপরোনাত্তি মনস্তাপ পাইতে হইল। হে দয়াময়! এ অভাগিনীর প্রতি দয়া 
করিয়া তাহা কি মার্জনা করিতে নাই! এমন কন্দর্পের মত পতিরত্ব দিয়াও 
পুর্নব্বার পথের ভিখারিণী করিলে! হায় হায়! যে শঙ্কট, দুর্দ্াস্ত কালম্বরূপ 
বদন বিস্তার করিতেছে, দেখিলে হৃদয় বিদীর্ণ হইয়া যায়। হে বিশ্বনাথ! 

তোমার অপার মহিমা, বুঝিতে পারে, সাধ্য কার। 


অভি ্রায়। 
পদ্য। 
হইয়া সদয়, ওহে দয়াময়, হইলে নির্দয়, 
কেন বা এবে। 
মরিনু ভেবে।। 
পিতা মাতা ভাই, অন্য কেহ নাই, বল কোথা যাই, 
করুণাময় । 
সুনিদ্তছি যত, হই জ্ঞান হত, সব, বল কত, 
দেহে না সয়।। . 
| এখনি হেন। | 
পরে ঠাকুরুণ, হইয়া বিগুণ, করিবেন খুন, 
বাচিব কেন?।। 
যত প্রতিবাসী, অনলের রাশি, সব সব্র্বনাশী, 
বসিবে মেলি। 
হাঁসিবে যখন, জীব কি তখন, বলিবে কেমন, 
ভাতার পেলি!?।। 
হেন পড়া দেশে, রমণীর বেশে, জন্মেছিনু এসে, 
মরিন্যু জুল্যে। 
হেন অবিচার, না হেরি রাজার, কোন দেশে আর, 
জুড়াই মল্যে।। 


৬১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বারণ নাই। 
ভাল বাসে যারে, তোষে শুধু তারে, অন্য বনিতারে, 
বাসে বালাই।। | 
রমণীর বেলা, সকলের হেলা, নাহি সেই খেলা, 
সবাই কাল। 
মরিলেও পতি, তবু নাহি গতি, ভূগিবে দুর্গতি, 
জীবন কাল।। 
এমন আচার, বলিব কি ছার, কোন দেশে আর, 
না শুনি কাণে। 
না সয় প্রাণে।। 
ভূধর। (মনে মনে) কি আশ্চর্য্য! কি আশ্চর্য্য! শান্ত্র কর্তারা যথার্থ আজ্ঞা 
করিয়াছেন “মন্ত্রণা ষট্কর্ণ হইলে আর তাহা কোন ক্রমেই গোপনে থাকে 
না।” আমার দ্বিতীয় দারপরিগ্রহের ব্যাপার ইতোমধ্যেই ইহার কর্ণ গোচর 
হইয়াছে, সন্দেহ নাই। যাহা হউক, এক্ষণে রহস্যবাক্য দ্বারা ইহাকে এক রূপ 
সাস্ত্বনা করিয়া বাহিরে যাইতে পারিলেই বাঁচি। €্হোঃ হাঃ হাঃ” একটা হাস্য 
করিয়া, প্রকাশ)। ভাই! এক্ষণে বুঝিতে পারিলাম, তাই কেন ভেঙ্গে বল না 
যাদু! বাবা আমার আর একটা বিবাহের নিমিত্ত উদ্যোগ করিতেছেন, তুমি 
বুঝি তাই শুনিয়া এত দু:খ করিতেছ। (“হাঃ হাঃ হাঃ” হাসিয়া)। 
হইবেই তো না হইবে কেন? তা না হইলে মেয়্ে মানুষ দশ হাত 
কাপড়ে উলঙ্গ বলবে কেন? হারে পাগল! বাবা যেন সম্বন্ধই করিলেন, তিনি 
তো আর আমার হয়্যে বিবাহ করিতে পারিবেন না, তা তো আমাকে 
করিতেই হইবে?। €্হাঃ হাঃ হাঃ” হাস্য করিয়া)। যাও, যাও, এখন গৃহন্থলীর 
কর্মকাম দেখ, অনেকক্ষণ বিলম্ব হইয়াছে, আমিও এখন বাহিরে চলিলাম। 
(থুতি ধরিয়া হাসিতে হাসিতে) 


পদ্য। 


ছিছি ছিছি মিছামিছি ভেবো না রে, ভেবো না। 
অকুল অসুখ নদে নেবো না রে, নেবো না।। 
মিছাছলে ঘোলাজলে গেবো না রে, গেবো না 
বিফল বিবেক মীন চেবো না রে, চেবো না।। 
বিচ্ছেদ কণ্টক বনে যেও না রে, যেও না। 
শুনিয়া পরের কথা তেও না রে, তেও না।। 


২৬২ 


সপত্বী নাটক 
অভিমান সরোবরে নেও না রে, নেও না। 
চটটাচ্টা মাঠে এত ধেও না রে, ধেও না।। 
নবীন প্রেমের ফল খেও না রে, খেও না। 
বিরাগ বিষম তরি বেও না রে, বেও না।। 
বিরস কুষশঃ "গান গেও না রে, গেও না। 
থেক্যে থেক্যে রাঙ্গা চোক্ষে চেও না রে, চেও না।। 
€পুনব্্বারি থুতি ধরিয়া, হাসিতে হাসিতে ।) 
যাই যাদু! তবে এখন বাহিরে যাই? আমার খেলানা শতরঞ্চ ঘোড়াটা 
কোথা? দেও তো, যাইয়া একটু খেলি। 
(শতরঞ্চ লইয়া বাহিরে প্রস্থান) 
(কাদম্ধিনী, নিতন্বিনী ও চঞ্চলা গৃহ প্রবেশ করিতে করিতে) 
চঞ্চলা। (হাসিতে হাসিতে)। কোথা লো বড় বৌ! কি কচ্ছিস?। 
নিতশ্থিনী। (ঈষৎ হাস্য বদনে)। আজ্‌ খেলবি না?। 
কাদশ্থিনী। (হাসিতে হাসিতে)। ওর বুঝি কিছু অসুখ কর্যেছে, তাই শুয়্যে 
রয়্যেছে। বেলিতে বলিতে গৃহ প্রবেশ) 
' সৌদামিনী। (ব্যস্ত সমস্ত হইয়া)। এসো দিদি! এসো, এসো বোন! তাই মনে 
কন্তেছিলুম বলি বের্যে না কার সাড়া পাচ্ছি। পোড়া কপাল ভাই! নিচ্চিন্দী 
হয়্যে তাই কি দুদণ্ড ঘুমুতে পারি! ক দিন দেখি নাই তাই বোন! বিছানাটায় 
যেন এক্‌কালে একহাঁটু ধুলো হয়ে রয়্যেছিল, তাই ভাই! ঝাড়ুতে ছিলুম। 
চঞ্চলা। (হাসিতে হাসিতে)। এখন বেশ কর্যে ধূলো ঝাড়া হয়্যেছে তো। 
নিতম্থিনী। (হাস্যবদনে)। অনেক দিন দেখাশুনা না থাকলে কি আর ভাই! ও 
সকল পরিষ্কার থাকে? ও সব হলো তাক্‌ তশ্বিতের সামগৃগিরী, তা না 
দেখলে এক হাঁটু হয়্যে থাকবে বৈ আর কি! 
কাদশ্বিনী। হালা বড় বৌ! আজ বড় যে তোর মনটা অমন কেমন কেমন 
ভার ভার দেখ্‌চ্ছি, একবারও হাসিস্‌ নে, ভাল কর্যে কথা কোস্‌ নে, যেন 
আনমনা আন্মনা হয়্যে রয়্যেছিস্‌, শরীরে আর তেমন ফুর্তি নেই, তুই তো 
এমন মেয়ে নোস্লা! তোর কাছে বল্লে, ভাল দেখায় না, আহা! তোকে 
পালিয়্যে যায়, তা, বোন! আজ বড় যে তোর কেমন রকম দেখছি 'লা!। 
ওমা! চোখ্‌ দুটো যেন পাকা করঞ্জার মতন কর্যেছিস্‌। ফুলো ফুলো হয়্যে 
উঠ্যেছে, আহা! তোর মুখের পানে তাকাবার যো নাই! কেন লা! কি হয়্যেছে 


বল্‌ দেখি? ঝক্ড়া করেছিস না কি?। 
চঞ্চলা। ও তো আর তোমাদের মতন নয়! যে ওর রেত্যে ঘুম কুলোবে না, 


২৬৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ও, সারারাত মড়ার মতন পড়্যে কেবল ঘুমোই তো? কাল্ই যেন দাদা বাড়ী 
এস্যেছেন, তা, হোক না! এমন কর্যে কি বৌ মানুষ কে নজ্জা দিতে হয় গা! 
তোরা মেনে দুরস্ত মেয়্যে ভাই!। 
নিতম্ষিনী। (গালে হাত দিয়া সবিস্ময়ে।) ও মা! চলী বলে কি লো! আমরা 
আবার দুরত্ত মেয়ে হলুম কি কর্যে লা! ওর ভাই! এই একটা বড় খোয় 
দেখছি, মিছেমিছি পরের কথা টেন্যে নিয়ে আপ্নার গায়ে মেখ্যে ঝগড়া 
করে, ও মা! আমরা কি কারুও রাজ্জাগদে বারণ কল্পুম নাকি লো! যে তুই 
যা মুখে বেরুলো হুড় ছুড়ু কর্যে অতগুনো কথা .বল্যে ফেল্লি, যেন হাউয়্যের 
মতন আকাশমুখো হয়ে তত্তরীয়্যে এত রেগ্যে উট্লি, ভূঞ্ঞে বাড়ী মান্তে কি 
তেই গুণগার চমকুলো লা! তুই বড় আগুণ ঝাপা মেয়ে হয়্যেছিস্!। | 
চঞ্চলা। (সক্রোধে, কাদঘ্বিনীকে সম্বোধন করিয়া।) দিদি! দেখলি, শুন্লি ভাই! 
দেখলি, নিতুর রকম দেখলি তো, ওর কাছে কথা বলাই বিষম দায়! ও, 
কথায় কথায় এককালে যেন ঢাল খাঁড়া ধর্যে উঠে, অমন আঁতে ছুরী মের্যে 
কথা বল্তে কি আর কেউ পার্বে, আমার মুখ্টো যেন বাধু বাধু কত্তেছে, 
কিন্ত না বললেও থাকৃতে পারিনে, নিতী বড় বেড়ে উঠেছে বোন! ওর আর 
সওয়া যায় না, হালা! আমিই কি এত রাজ্জাগি! তোরা কেবল আমারি 
রাজ্জাগি রোগ দেখ্ছিস্! অর্েশে অতগুনো কথা শুনিয়্যে দিলি, মুখে 
এককালে যেন খৈ ফুট্যে উঠূলো, একটুকুও কি আগঢাগ, চক্ষু নজ্জা রাখ্তে 
নেই লা! রাগে সব বেরেয়্যে পড়ে, কিন্তু ঘরের কথা বের কন্তে গেলেই 
প্রাচি...। 
কাদাম্বিনী। (চঞ্চলার ব. "” না হইতে £ইতেই)। থাক্‌ থাক্‌, আর কাঁদোলে কায 
নেই, আর মদ্দান, - বে না, তোরাই মেনে সব বড় বুজ্দার মেয়্যে 
হয়্যেছিস্! বাজে আসি। আ-এর্, ছুঁউ।৬ন।! হাদে রণে মাদলে কি আর জ্ঞান 
গোচর থাকে না লা! কি বল্তৈ কি বলিস্‌্, কি কন্তে কি করিস, তার কি 
আর আগাও দেখতে নেই গাছতলাও ভাবতে নেই। আ-মর্, থুব্ড়ো হাতে 
চল্লি, ছেলে রাখলে __শ্বেগত) মর্! রাগে কি বলতে কি বল্যে ফেলি, চারি 
দিকে শত্তুর। (সৌদামিনীর মুখের প্রতি চাহিয়া, চারিদিকে দৃষ্টিপাত করিয়া প্রকাশ) 
ভাতারণ্যে ঘর কন্না কল্পে, আজকে ছেলে রাখতে জায়গা কুলুতো না। 
বাবাকে আর কি বোল্‌বো, পোড়া কপাল্যে কটা মেয়ে, আহা! সব্‌ মেয়্যে 
তো নয় যেন টাদের হাট, চেয়্যে দেখলে শতুর ফেট্যে মরে, আপ্না আপনি 
রূপের গৈরব কন্তে নজ্জা হয় বোন! তবুও কথার অভ্যেসে বেরয়্যে পড়লো, 
তা যা হোক, সব্গুনোরি এ এক দশা কর্যে রেখ্যেছেন বৈ তো নয়, কারুই 
তো আর ভাস্যি রাখেন নেই। তোদেরি আর বা বল্‌বো কি, একে বয়েস 


৬৪ 


সপত্বী নাটক 

কম, কীচা মেয়্যে, তায় আবার. বয়েসে তো কখন শ্বশুর বাড়ীর মুখ্‌ দেখতো 
হলো না, ভাতার কেমন সামিগৃগিরি তা তো জান্লি না! যে ধীর হবি, জ্ঞান 
শেখ্বি, সব্দিক্‌ ভালো দেখাবে, ধন্ম কম্মে মন পড়ুবে। বাপের বাড়ী, দেন 
রাত তো বাছ নাই, সারা বেলা এ বাড়ী ও বাড়ী কর্যে বেড়াস্‌, কেবল রঙ্গ . 
নিয়্যে থাকিস্‌ বৈ তো নয়?। সব হলো সম্পকৃক ভাল, পাড়ার সব পুরুষ 
গুনো, কেউ হলো দাদা, কেউ হলো ভাই, কেউ হলো জ্যেঠা, কেউ হলো 
খুড়ো, কেউ হলো ভগ্নীপোত, কেউ হলো ঠাকুরদাদা, কেউ হলো মকর বাপ, 
কেউ হলো পড়ো দাদা, আর কত বলবো, এই রকম হলো সক্কল, পাড়ার 
নজ্জা হয় না? কারু সঙ্গে কথা কইতেও তো সরম কত্তে হয় না? নোকে 
দেখলেও তো কলঙ্কের ভয় নেই? তা, কি করে জ্ঞান্ন শিখ্বে বলো, 
সোমোত্ত মেয়ে, এত পুরুষ ঘেঁষা হলে তার আর কি আগ্‌ ঢাক থাকে, না, 
ভাস্যি আছে। 

আ-মর্‌ ছুঁড়ীগুনোকে নিয়্যে এত দিন দিবেনিশি যেন পাখী পড়ান কল্লোম, 
হাদে হত্ভাগীরা তবুও কি মানুষ হলো না গা!। মর, বল্তে নজ্জা, একটুকুও 
কি ভাব্তে নেই লা! কুলীনের হাতে পড়্যেছিস্‌, তাই আবার পোড়া কপাল! 
সেটা এক দশগণ্ডা, আর,এক নটা, এখানে ওখানে কর্যে, এ দেশ ও দেশ 
নিয়ে, সব শুদ্ধ এতগুনো ব্যে কর্যে মর্যেছে, ওমা বল্তে নজ্জা! মর্, 
তাতেও আবার সেটার মদ আবার রীড়ের খরচ কুলয়নি বল্যে, ওমা! 
শেষকালে আবার একটা ডাকাতের দলে মিশে গিয়্যেছে, পোড়া কপাল মা! 
তাতেও আবার ধরা পড়্যে আজম্মকালটা এ কি বলে? সরকারী শ্বশুর 
বাড়ীতে খেট্যে মন্তেছে, ভাতার কেমন সামিগৃিরি তা কখন চোকে দেখতেও 
পেলি নে, ভদ্রনোকের ঘরের মেয়্যে, বাড়ী থেক্যে থেক্যে বেরুলে কলঙ্ক, 
বাপের বাড়ী জন্মকালটা হলো পর নিয়্যে বিষয়, পর নিয়্যে কারবার, তাতে 
এত মুখ আল্গা হল্যে কি কম্ম চলে লা! না, এত চটা, এত রাগাল হল্যে 
প্রাণে বাঁচ্বি? বুক ফাটে তু কি মুখ ফাট্বে লা!। 

তা বোন! ওদের যত বল, চোরা না শোনে ধনম্মের কাহিনী, সকলি বালির 
বাঁধ। তুই চুপ্‌ কর্যে থাক্‌ ভাই! ওর কথায় কাণ দিস্‌ নে, ও, যা বলে বলুক, 
আমি ওকে আর বুজতে পারি নে বোন!। ও, ভাল বল্লে মন্দ বোঝে, খেত্যে 
বল্লে যেন মান্তে ধায়, কেমন রাগ করে, দেখিস্‌ দেখি বোন! মা শুনলে এখন 
খগুপ্রলয় ক্রেন, তিনি তো এমন হেজী পেঁজী গিনী নন, তা চুপ্‌ কর্যে 
থাকবেন, যে যা কর সৈবেন। কি করবো বোন! তোমরা সব হলে সমান, 
কাকে কি বল্বো বল, আমি আর পারি নে। 


৬৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


(কিঞ্চিৎ রাগ হইয়া) হেঁ লা। 
অভি প্রায়। 


পদ্য। 


যত বলি, ধীর হ, তবু বোধ, হয়্‌ নাঃ। 

কারু কথা কারু গায়ে, ফোঙ্কা হয়, সয় না?।। 

যাকে বল্যে, ভাল কর্যে, দিতে দিব, গয়্‌না। 

সেজ্যে গুজ্যে, হইতেছ, শতমুখ, ময়্‌ নাঃ।। 

বাবা যাই, মানী নোক, নোকে কিছু, কমু না। 

কোন দিকে, কোন কাষে, কিছু তাই, বয়্‌ না।। 

নোকে শুন্যে, কব্যে কিলো, মনে ভয়, হয় না;। 

হাল্কী হলে, কুলীনের, জাতিকুল, রয়্‌ না।। 
সৌদামিনী। চেক্ষুঃ মার্জনা করিতে করিতে, সবিষাদে।) আর ভাই! ওদের ওকথা 
মিছে বল, ওরা অজ্ঞান ওসব তো বুজ্বে না বোন! তা, ওদের বল্যে কেবল 
দুবববনে মুক্তো ছড়ান, অরণ্যে রোদন, মুখ নষ্ট করা হয় বৈ আর কিছু নয়? 
তা, ওদের মিছে বল, ওদের এ কাণদ্যে বল ও কাণদ্যে বেরয়্যে পড়ে, জ্ঞান 
হলে কি এত কর্যে বুজতে হয় বোন! ও সব যে ধার আপনি বোঝে। 
বাবাকেই বা আর বকৃলে কি হবে বল, তিনি কি করবেন বোন! ও সব 
যে যার অদৃষ্টের নেখা, তা কি” কেউ নয়ু কন্তে পারে? তা, তাঁকে মিছে 
বকা। এই বোজ দিগি বোন। তোমরা তো সব যেন কুলীনের ঘরে 
জন্মেছিলে, তায় আবার অমন রকম একটা বাউত্তুরে পোড়াকপাল্যে 
হাড়হাবাত্যের হাতে পড়্যেছিলে ভাই! তাই দিবা-নিশি এত জুল্যে মচ্ছ, এত 
খেদ কচ্ছ, আমার বাবারা তো আর তেমন নন, আমাকে তো আর অমন 
রকম কুলীনে কন্তে যান নি, কেবল ভাল ঘর আর ভাল বর দেখ্যে বংশজে 
করেছিলেন, তাঁ বোন! তবে আবার আমার কেন অমন রকম কপাল মন্দ 
হতে চল্লো, আমি আবার কেন তবে তোমাদের মতন এঁ বিষম পোড়ায় 
পুড়তে চল্লুম!। 
তাই শুন্যে অব্দি ্াণটা য়েন কেমন কেমন জুল্যে জুল্যে উঠেছে, কিছু 
আর ভাল লাগতেছে না বোন! কি করবো বল; তাই বস্যে বস্যে 
কীাদ্দেছিলুম। 
চঞ্চলা। (বিস্মিতা হইয়া) সেকি লো! তোর আবার ও কি বলিস্! ভূধর দাদা 
আবার ব্যে কর্বেন নাকি লো! ওমা যাব কোথা মা! শুন্যে শুন্যে যে আর 
বাঁচিনে!। 


সপত্বী নাটব 

নিতশ্বিনী। (বিশ্মিতা হইয়া) সে কি লো! তাই বুঝি তখন অত কর্যে বক্ড়া 
কন্তে ছিলি? ওমা! তবে যে তোর এখুনি মরা ভাল! জানিস্‌ নে বোন! সে 
পোড়া কি সামান্টী পোড়া! বিষম পোড়ার পোড়া! তা কি তুই সৈতে পার্বি 
লা! অম্নি আত্মঘাতী হয়্যে মর্যে যাবি! বেঁচ্যেছি বোন! আজম্মকালটা বাপের 
বাড়ী যা ইচ্ছা কর্যে কাটাচ্ছি, অমন ভাতার সুখে কায্‌ নেই দিদি; বেশ আছি, 
সতিন থেক্যেও নেই, সে জ্বালায় যে জুল্তে হলো না বোন। তাই পরম ভান্নি। 
কাদশ্থিনী। সেবিম্ময়ে)। সেকি লো বড় বৌ! সন্তি বল্ছিস্‌ নাকি? তুইও কি 
আবার আমাদের মতন হলি নাকি লো! কেন বল্‌ দিগি? তোর ভাতারের 
তো ভাই আমাদের মতন অমন লাভের ব্যে নয়, নোক্‌সানের ব্যে, তবে 
কেন বল দিগি এমন হলো? তোকে বুঝি মনে মনে ভূধর দাদা দেখতে 
পারেন না, তাই বুঝি মনের মতন আবার একটা ভাল দেখ্যে ব্যে কর্বেন, 
কল্কাতার চাক্র্যে ভাতারের মেগেদের ভাই! এই একটা বড় বিষম পোড়া! 
পোড়া খান্কীগুনো ভাই! সবার মন খারাপ কর্যে দেয়, হাজারও ভাল হও 
ভাল্‌ লাগে না, এটা ওটা চেয়্যে বেড়াতে ইচ্ছা করে। 
সৌদামিনী। (বিষম বদনে)। তা কেমন কর্যে জান্বো বল বোন! শুস্তে পাচ্ছি 
নাকি কোথা সম্বন্ধ হচ্ছে, শীগৃগির কর্যে ব্যে কর্বেন। পোড়া পোড়া পড়্সী 
বোন! সব্‌ নাকি একৃকালে ভেঙ্গে পড়্যেছে, শ্বশুর শাশুড়ী ননদ এরা তো 
সকল যো পেয়েছে বোন! তা নেচ্যে উট্বে না কেন বল। আমাকে তো 
ওরা কেউ দুচক্ষে দেখতে পারে না, এক্‌কালে বিষ নয়নে দেখ্যেছে, বলে কি, 
বৌটা বড় দুরস্ত মেয়্যে মা, কি ওষুধ কর্যে ফল্নাকে কি আর রেখ্যেছে, 
এককালে সের্যে দেছ্যে,। তা বোন! আমি তো ও সব কিছু মনে জ্ঞানেও 
জানি নে, কে জানে দিদি! কাকে বলে ওষুধ, তা আবার কেমন কর্যে কত্তে 
হয়!। 

রেমাকাস্ত বিদ্যাবাগীশের অস্তঃপুর) (১) 
হরমোহিনী। (২) ডেচচৈঃস্বরে)। কোথা লো কাদশ্থিনি! 
নিতথিনি। চঞ্চলা! তোরা সব কোথা গেলি .লো! কি কচ্ছিস্? বাড়ী কি 
আস্তে হবে না? অমন কর্যে পাড়া বেড়ালে কি পেট ভর্বে লা! সন্ধ্যা 
হলো যে! শীগৃগির আয়, শীগৃগির করে আয়!। 

(জয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্তঃপুর) 
কাদশিনী। ব্যস্ত সমস্ত হইয়া, সৌদামিনীর প্রতি)। যাই ভাই! আজ্‌ আসি বোন! 
কাল্‌ সকাল্‌ সকাল্‌ কর্যে আস্বো তখন, এখন চন্কুম, মা আবার বেজার 
(১) কুলীন ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, নিকট প্রতিবাসী। 
(২) রমাকাস্ত বিদ্যাবাগীশের স্ত্রী 

২৬৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
হবে। আয় লো নিতু! আয় লো চলি! বাড়ী যাই আয়, সন্ধ্যা হলো। 


(সকলের প্রস্থান) 
(রমাকাস্ত বিদ্যাবাগীশের অস্তঃপুর 1) 
(কাদদ্ধিনী, নিতম্বিনী ও চঞ্চলার প্রবেশ ।) 
কাদশ্বিনী। কেন গা মা! বড় যে এত তাড়াতাড়ী কর্যে চেচীয়্যে ডাক্তেছিলি? 
কেন মা!। 
হরমোহিনী। ডাকবো না গা! সারাদিন কি তোরা অমন রকম কর্যে কেবল 
খেল্য়্ে খেলয়্যে বেড়াবি, আমি হলুম বুড়োমানুষ, সংসারের দুটো আলে 
আশ্রে দেখলে হয় না-কি গা!। এ তোর পড়ো দাদা এয়্যেছে, কি বলে 
শোন্গে যা। 
কাদন্বিনী। (আহ্রাদিতা হইয়া)। কোথা পড়ো দাদা মা! কোথা গা! কখন 
এয়্যেছে! সে না বাড়ী গ্যেছলো?। 
হরমোহিনী। না যাওয়া হয় নাই, পথ থ্যেক্যে ফিরে এস্যেছে, এ উপরে 
গ্যেছে, যা তোরা, পান জল কি চায়, দ্যেনা গ্যে। 
কাদশ্িনী। (আহ্াদে আটখানা হইয়া)। আয় লো নিতি! আয় লো চলি! উপরে 
যাই আয়, পড়ো দাদা বাড়ী যায় নি লো!। 
(উপরে সকলের প্রস্থান) 
হরমোহিনী। (কন্যাগণকে উপরে পাঠাইয়া দিয়া, মনে মনে ।) 
অভিশ্রায়। 


পদ্য। 


হাদে রে বল্লাল তোরে যাই বলি হারি। 
কুটিনীর কাছে তুই মানাইলি হারি।। 
তারা সব পর নিয়া করে কারবার। 
কুলীনের পুঁজি পাটা নিজ পরিবার।। 
এরে হৈতে আর কি রৈ পাতক অধিক। 
কন্যার কুটিনী হই ধিক শত ধিকৃ।। 
প্রকারে বেশ্যার মত কন্যাকে না চাই। 
এমন পবিত্র কুল মল্যেও না চাই।। 
কে বলে ভূপাল তোরে নরাধম নর। 
মনুষ্য গঁরসে জন্মে এমন বানর।। 
তোর যে খরচ কুল সব কুল বাছা। 
২৬৮ 


সপত্বী নাটব 
তাই তোরে সাজিয়াছে হেন কুল বাছা।। 
তুই ছিলি রাজা মহাভারত ভারত। 
তোর পাপে অপবিত্র তাই সে ভারত।। 
কুলীন কন্যারা যত ফেলিতেছে বেদ। ৫১) 
দিন দিন অপ্পবিত্র তাহাতেই বেদ।। 
এই মত তোর যত কৌশল আদেশ। 
তাহাতেই অপবিত্র হয়্যেছে এদেশ।। 
কত দিনে তোর নাম ভুল্যে যাবে লোক। 
কত দিনে সুপবিত্র হইবে ভূলোক।। 
কত দিনে কুলীনের দর্প হবে চুর। 
কবে হবে 'এদেশের মঙ্গল প্রচুর।। 
কবে হবে হিন্দু গণে কুলসিম্ধু পার। 
কবে হবে দূর বহু বিবাহ ব্যাপার।। 
ওরে রে অবোধ হিন্দু আর কত সবে। 
ঘুচাইতে কুল বল দল বাঁধ সবে।। 
কত দিন রবে আর আশা পথ চেয়্যে। 
আর কেন কালে হর মুখ চেয়ে চেয়্যে।। 
কত অকারণ দেখ বহু পরিণয়। 
দিতেছে যন্ত্রণা কত কুল পরিণয়।। 
বুক ফেট্যে যায় দেখ্যে আহা মরি মরি। 
চোরের মায়ের মত গুমুরিয়া মরি।। 
দূর হোক, এচিস্তায় আর ফল কি;। যাই, এখন সীজ সল্ত্যের কম্ম কায 
দেখি গ্যে, সন্ধ্যা হলো। 
অভি প্রায়। 


পদ্য। 


অন্তছলে যান রবি, জিনিয়া জবার ছবি, 
অন্ধকার ঘেরিল সংসার। 

স্বভাবের ভাব কি বা, কোথা লুকাইল দিবা, 
নিশার হইল অধিকার ।। 

ধন্য ধন্য দিবা সতি, ধন্য তোর ধর্ম্মে মতি, 
হেরিয়া পতির পলায়ন। 

১. জারজ গর্ভ 
২৬৪৯ 


দুত্ধাপ্য বাংলা সাহিত্য 


পাছু পাছু করিলি গমন।। 
কোথা ছিল তমোরাশি, ভুবন ঢাকিল আসি, 
স্থল জল লিল শরীর। 
আকাশ মুষল ভরে, অঞ্জন বর্ষণ করে, 
ঝরে যেন বরষার নীর।। 
হারে রে রে রে রে বলে, রাখাল গোষ্ঠেতে চলে, 
নিজ নিজ লইয়া গোধন। 
দিবাচর পাখী সব, করি কিচিমিচি রব, 
_ নীড় মুখে করিল গমন।। 
ভাগ্যবতী নারী যারা, সুখ্যে ভরা হয়্যে তারা, 
মনোমত করে কত সাজ। 
মুখে মৃদু মৃদু হাসি, সম্ভোষ সাগরে ভাসি, 
অস্তরেতে নাহি সহে ব্যাজ।। 
হেরিয়া নিশার আগমন। 
আসিয়া ভোগের ভবে, সুখ ভূঞ্জে আর সবে, 
যে যেমন যাহার যেমন।। 
যাই কত্তাটী এ বুঝি গঙ্গাতীর থেক্যে সন্ধ্যা কর্যে বাড়ী আসছেন, কিছু 
জলটল খাওয়ার দিগ্যে। রি 
(রমাকাস্ত বিদ্যাবাগীশের প্রবেশ) 
রমাকান্ত। (মৃদুন্বরে) হরি বোল! হরি বোল! রাম রাম! শ্রীরাম! জয় রাম! 
“হরে! মুরারে! মধুকৈটভারে! গোপাল! গোবিন্দ! মুকুন্দ! শৌরে!। যজ্ঞেশ! 
নারায়ণ! কৃষ্ণ! বিষেন্ল! নিরাশ্রয় মাং জগদীশ! রক্ষ” হরি বোল! হরি বোল!। 
কোথা গো কাদন্থিনী! নিতম্বিনী! চঞ্চলা! তোরা সব কোথা গো মা! চোরিদিকে 
দৃষ্টিপাত করিয়া) হরি বোল! হরি বোল! রাম! রাম! আঃ! কি আপদ্‌ হইল! 
বাড়ীতে যে কাহাকেই দেখিতে পাইনা, অন্ধকার রাত্রি পাইলে সন্ধ্যার পর 
মেয়্যেগুলোর আর টিকী দেখিতে পাওয়া শ্যায় না। রাম! রাম! সব্র্বোপাপহরো 
হরিঃ। (পাকশালার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া) কোথা গেলে গিন্নি! ঘরে আছ কি? 
কি করিতেছ? কিছু জলখাবার আছে কি? থাকে তো আন। (এই বলিয়া উপরে 
উঠিতে উদ্যত হইলেন)। 
হরমোহিনী।..(ব্যস্তভাবে) আবার ওদিকে যাচ্ছ কোথা? আ মরণ্‌! দেখ্যে দেখ্যে 
যে হাড় কালি হলো, জ্বল্যে জ্বল্যে মলেম, আর বাঁচি নে! পড়ো পণ্ডিত 


২৭০ 


সপত্বী নাটব 
নোক হলেই কি এই একটা রকম হাবা গোবা হয় গা!। রোজ রোজই কি 
এই এক পোড়া, জেন্যেও কি জান না গা?। না বল্যে না কয়্যে একটা ঢং 
কর্যে উপরে যাচ্ছ কেন£ঃ এই এ দিকে এসো, ঘর ঘরকন্না কন্তে গেলেই 
সব দিকে একটুক চক্ষে আঁখঠার কর্যে চল্তে হয়, বিশেষে আমাদের 
কুলীনের ঘর। (দ্রতগতি নিকটে গিয়া কাণে কাণে)। উপরে যে কামদেব!16১) 
বমাকাস্ত। মুদুহ্বরে বিরাগে)। রাম! রাম! হরি বোল! হরি বোল! কৃষ্ণ হে 
তোমার ইচ্ছা!। থাকুক তবে আর জল খাব না, এখন বাহিরে চলিলাম। 
কামদেব না বাড়ী গিয়াছিল?। 
হরমোহিনী। তার কি আর বাড়ী যাওয়ার যো আছে, এমন রাসনীলে আর 
কোথা পাবে বল। 
রমাকাত্ত। (মৃদু মৃদু)। তবে আমি বাহিরে যাই। (বাহিরে যাইতে যাইতে দীর্ঘ 
নিঃশ্বাস পরিত্যাগ পুর্বক মনে মনে।) গুরু হে পার কর!। যাবৎকাল দিন রাত্রি 
হইবেক, যতদিন পর্য্যস্ত চন্দ্র সূর্য্য থাকিবেন, নরাধম বল্লাল, যেন, ততদিন 
পর্য্যস্ত অসহ্য নরক ভোগ করে। পাপিষ্ঠ, দেশটাকে এককালে ছার খার 
করিয়া গিয়াছে। হায়! এ সকল পাপের কি প্রায়শ্চিত্ত আছে? হে জগদীশ্বর! 
তোমার কি ইচ্ছা কিছুই বুঝিতে পারি না। 


পদা। 


প্রণাম তোমায় বিভূ। প্রণাম তোমায়। 
কৃপাকর! কৃপা কর মোহিত মায়ায় 
বিভু! মোহিত মায়ায়।। 

হর হর তাপ হর ভ্রমের সহিত। 
কর কর হিত কর যা হয় বিহিত।। 
না জানি তোমার. তত্ব বিবেক রহিত। 
না চিনি সুপথ পথ সাধু বিগর্হিত।। 
না যাই সুখের কাছে না চাই সম্পদ। 
চরমেতে পাই যেন পরমার্থ পদ।। 

রিপুচয় পরাজয় হয় যেন সবে। 
আর যেন না আসিতে হয় এই ভবে।। 
আর যেন জন্ম লতে না হয় ধরায়। 
প্রণাম তোমায় বিভু! প্রণাম তোমায়। 
কৃপাকর! কৃপাকর মোহিত মায়ায় 


২৭১ 


বিভুঃ মোহিত মায়ায়।। 
০৮০৮৮০৯০ 
ভব ভূমি সবর্ব সুখাকর ।। 
তা নয় তা নয় বিভু! তা নয় তা নয়। 
সার শ্মশান সম ভুতের আলয়।। 
ক্ষিতঠি জল তেজঃ আর আকাশ মরুত। 
নৃত্য করে এই পাঁচ ভয়ঙ্কর ভূত ।। 
এই আছে এক ভাবে এই অন্য বূপ। 
কখন বা নিরাকার কখন স্বরূপ ।। 
এই আছে পাচে এক এই পাঁচ ধায়। 
প্রণাম তোমায় বিভু! প্রণাম তোমায়। 
বিভু! মোহিত মায়ায়।। 
নিজ দোষ, করি তোষ, বৃথা কাল হরি। 
বং দেখাবার তরে সং সেজ্যে মরি ।। 
জানি না যে আমি নই আমার অধীন। 
রবে না এ ভবে বাস ফুরাইলে দিন।। 
কে আমার পরিবার আমি হই কার। 
বলা সার বার বার আমার আমার ।। 
জানি না যে মিছা কাজে কেন হই হত। 
বুয়ার জান হত জার হা হা 
কবে নাথ! আমি রব্‌ না রবে আমায়। 
প্রণাম তোমায় বিভু! প্রণাম তোমায়। 
কৃপাকর! কৃপাকর মোহিত মায়ায় 
বিভু! মোহিত মায়ায়।। 
(সকলের প্রস্থান) 


প্রেথম অন্ক সমাপ্ত।) 


৮৬৪১২ 


সপত্বী নাটক 


দ্বিতীয় অঙ্ক।। 


জেয়শক্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহির্বাটী) 

(ভূধর বাবুর বৈঠকখানা) 

(সৃ্কাস্ত গ্রহাচাষেরি প্রবেশ) 
সূর্ধ্যকাস্ত। (পঞ্জিকা হস্তে গুন্গুন্‌ স্বরে বচন পাঠ করিতে করিতে)। “গোচরে বা 
বিনগ্নে বা, যে গৃহারিষ্ঠশোচকঃ। পুজয়েত্তান্‌ প্রযত্রেন পুজিতঃ স্মুঃ 
শুভাবহাঃ।।” ভেধর বাবুকে সম্বোধন পূর্বক) কি গো বাবুজী মহাশয়! করে 
বাড়ী আসা হইয়াছেঃ শরীরগতিক ভাল আছেন তো? বিষয় কর্মের সমস্ত 
কুশল ?। 
ভূধধর। আসুন গ্রহাচার্্য মহাশয়! আসিতে আজ্ঞা হয়! আসিতে আজ্ঞা হয়! 
আজি চারি দিন হইল বাড়ী আসিয়াছি; শারীরিক ভাল আছি। বিষয় কর্মের 
কথা কি জিজ্ঞাসা করেন? চাকরী বাক্রীতে আর তখনকার মত সুখ নাই! 
বিশেষতঃ সাহেবেরা বড় সতর্ক হইয়া উঠিয়াছেন? কালেজেই আমাদের দেশ 
ছারখার হইল। 
সূ্ধ্যকাস্ত। (ঘাড় লাড়িতে লাড়িতে)। সত্য কথা বলিয়াছেন বাবু! গৃহদেবতা 
আপনকার মঙ্গল করুন। মহাশয় সদ্ধংশে জন্মিয়াছেন, অতএব, যথার্থ কথা 
কহিবেন না কেন? (দকালেজে” এই শব্দটী রাপাত্তর বুঝিয়া) কালে যে আমাদের 
দেশ ছারখার হইবে, ধর্ম কর্ম সকলই লোপাপত্ত পাইবে, শুনিয়াছি একথাটী 
আমাদের কক্কিপুরোণেও নেখা আছে বাবু! আমরা সব হইলাম জ্যোতিব 
ব্যবসাই মানুষ; আমাদের জ্যোতিষ নইয়াই হইল বিষয়, ও সকল শাস্ত্র বড় 
বুঝিসুজি না, বড় দেখা শোনাও নাই। 


২৭৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ভূধর। (মনে মনে)। বিলক্ষণ! ইনি তো পাঠশালা শব্দটাও আবার গিলিয়া 
ফেলিলেন। (প্রকাশ)। না, না, আচার্ধ্য মহাশয়! তা নয়, দেখিতেছেন না? এই 
যে স্থানে স্থানে কোম্পানি হইতে পড়োশাল সকল বসিয়াছে, আমি সেই কথা 
কহিতেছি। 
সূর্ধ্যকান্ত। (সবিম্ময়ে)। রাম! রাম! কি পাপ! আজি এত ভ্রম হইতেছে হে, 
রি নারি বারি বারের হুর রেরে। 

(গদাধর লাহিড়ির প্রবেশ)।(১) 
৪7 5 এ রর এ ভালই হইয়াছে; আমি এই 
আপনকার বাড়ী যাইতেছিলাম। যাক অন্য কথা দুর হোক্‌ ক্ষেণেক চিন্তা করিয়া) 
সে সব কথা পরে হইবে এখন; গণক মহাশয়! আজি বারবেলাটা কতক্ষণ 2। 
সূর্য্যকাস্ত। (কিঞ্চিৎ রাগান্বিত হইয়া, সদস্তে)। কি হে তুমি এত বড় নোকের 
সম্ভতান; তোমার বাপ দশখানা গ্রামের মাথা ছিলেন; আমি তোমার 
পিতামহকে উলঙ্গ ব্যাড়াইতে দেখিয়াছি, তুমি আমাকে উপহাস কর হে 
সন্ধ্যো পুববুটা যখন ছেলে পিলে গুনো সব ভাত খায়, যখন ঝিঙ্গে ফুল সশা 
ফুল গুনো সকল ফোটে, চিরকালই সেই কালটাকে বারব্যালা বলা যায়! 
রহিয়াছে, দেখনা কেন; “ভরসন্ধ্যের বারবেলা কোন কন্মহি করিতে নাই”। 
আর যখন যে কর্ম্মে বাহির হওয়া যায়, যদি তা নফল না হয়, তবে সেই 
সময়টাকেও আর একটা বারব্যালা বলে। এ ভিন্ন আর বারব্যালা কি আছে?। 
গদাধর। (ম্বগত)। বিলক্ষণ ইনিই” আবার আমাদের দেশের একজন ভবিষ্যদ্বক্তা 
বিধাতা পুরুষ; যাহা বলেন, অব্যর্থ, লোকের কি ভ্রম!। (প্রকাশ) সে যাহোক, 
ওটা রহস্য করিতেছিলাম; ভাল গণক মহাশয়! আজ তো হইল দ্বিতীয়া, মঘা 
নক্ষত্রটা কতক্ষণ আছে?। 
সূ্ধ্যকান্ত। আঃ! কি পাপ! তুমি যে বড়ই জ্বালাতন করিলে হে! দ্বিতীয়ার 
দিনেও কি আবার কখন মঘা হইয়া থাকেঃ তোমার কথায় কি শান্তর উলটো 
হইবে, না, তুমি বেদ, পুরাণ, বচন, প্রমাণ, সবগুনোই নোপ করিতে বসিয়াছ, 
বল কি? ন্যায় বল, সম্মিতি বল, পুরোণ বল, তন্ত্র বল, জ্যোতিষ বল, ইহার 
কোন্‌ ব্যাকর্টটী আমার কষ্ঠস্থ নাই যে, এত উপহাস করিতেছ? অধিক বলিব 
কি, ব্যাকর্ণে গোপ্রাচিত্তি খণ্ডে এই বচনটা পষ্ট নেখা আছে, “অমাবস্যার মঘা 
সামলাবি ক ঘা” দেখ দেখি অমাবস্যার দিন বৈ আর কি কখন মঘা হয়! 
সবি আর এক দিন মঘা হইয়া পড়িয়াছিল বটে, কিন্তু মানুষের কথা কিঃ 
হতে দেবভাবা শুদ্দে বিপোদে পড়িয়াছিলেন; সে আর কোন্‌ দিন হে! 
ধললে কি আর বুঝিতে পারিবে না? যে দিন সুমুদ্র মৈথন হয়ঃ তাইতে বিষ 
2 ঠোছিওন 
। ০) তত বারণ সব 


২৭৪ 


সপত্বী নাটক 

গদাধর। (হাসিতে হাসিতে)। দেখুন দেখি গণক মহাশয়! আপনাকে না ঘাঁটাইলে 
কি এত জ্ঞান পাইতাম; লোকে কথায় বলিয়াই থাকে “রাড় ঘাঁটাইয়া টাকর 
খায়, গুরু ঘাঁটাইয়া বিদ্যা পায়””। 
সূর্ধ্যকান্ত। প্রেফুল্ল বদনে)। বটে তো বাবু! তোমরা ধন্মশান্ত্রে এমন পাঁয়টা 
প্রসঙ্গে জিজ্ঞেসা না করিবে, তবে এ সকল বেদ বিদি কি আমাদের চালনা 
থাকে? আর মানুষ নাই বাবু! এখনকার কেহই আমাদিগকে আর তেমন ছেদ্ধা 
ভক্তি করে না, কাযে কাযেই সব ভুলিয়া গেলাম। 

তশ্রীক্ঠ ঘোষালের প্রবেশ)।0১) 
শ্রীকন্ঠ। গিরি যা হার গারো রাগ 
আমোদ করিতেছ? গণক মহাশর: আমি একটা বড বিপদে পড়িয়াছি, আমার 
কন্যাটীর খতু হইয়াছে, দেখুন তো দিনটা কেমন? 
সূর্ধ্যকাত্ত। (গম্ভীর ভাবে পঞ্জিকা দেখিয়া)। হাঁ তা বড় শক্ত কথা দেখিতেছি; 
বিশেষতঃ মেয়্যে মানুষের রিতু এ যে বড় শক্ত কথা, ঘর করিতে গেলে 
পুরুষের তাহা সচরাচর হইয়াই থাকে; তাহাতে এত ভয় নয়। ক্ষেণেক চিন্তা 
করিয়া) ভাল; হাঁগা! এই যে শক্রটা হইয়াছে বলিতেছ সেটা স্ত্রী কি পুরুষ বল 
দেখি2। 
শ্রীকন্ঠ। সে কি গণক মহাশয়! শক্র কি? আমি রিপু বলি নাই; রিতু রিতু ?। 
সূর্যকান্ত। হাঁ হী বটে বটে। তা বাপু! শুদু তোমার কন্যার বলিয়া কেন? 
তাহারা তো সব স্ত্রীনোক; খোলা গায়ে সবর্বদাই পাটঝাট করিয়া বেড়ান, যে 
দুরাস্ত শীত পড়িয়াছে, আমরাই কীপিয়া মরি; সময় অসময় নাই; এবচ্ছর 
বারো মাসই শীত। 
শ্্রীকশ্ঠ। মেনে মনে)। কি আপদ! তাল লোকের সঙ্গে কথা কহিতেছি, এটা 
পাগল নাকি? (প্রকাশ) সে আবার কি গণক মহাশয়! ও কি বলিতেছেন, 
আপনি কিসে কি বুঝিলেন, ও সকল নয়; আমার মেয়্যেটার পুষ্পোৎসব 
উপস্থিত। 
সূর্য্যকাত্ত। (আহুাদিত হইয়া)। হা! ভাল ভাল! তা বাবু! তোমাদের বাড়ীর 
ব্যাভারই স্বতন্ত্র; তোমরা বিলক্ষণ ক্রিয়াবান্‌ বটে; আবার তোমাদের বাড়ীর 
মেয়েরাও সেইরূপ, দুগ্যোচ্ছব, পুষ্পোচ্ছব, নক্ষীপুজা, সরম্বতীপূজা, শ্যামা 
পূজা এ সকল কোন কনম্মে তাহাদের কামাই নাই; তা যা হউক, বাপু! 
গৃহদেবতা তোমাদের মঙ্গল করুন, সুখে দেখুন, ফলে আমার নবগ্রহের 
নৈবিদ্দি ও কাপড় চোপড়ের বিষয়ে যেন সুবিবেচনা হয়। 
শ্রীকন্ঠ। দূর হউক, আজ মহাশয় এ সব কিসে কি বুঝিতেছেন, আমি তা বলি 
নাই; ও সকল নয়, আমার কন্যাটী ফুল দেখিয়াছে। 


(১) ভূধর বাবুর সহচর 
২৭৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সূর্ধ্যকাস্ত। (বিস্মিত ভাবে)। রাম! রাম! আজকি কু যাত্রায় বাড়ী হইতে বাহির 
হইয়াছি! তাই এত ভ্রম হইতেছে! ফুল দেখিয়াছেন? তবে কি অশুদ্ধ 
হইয়াছেন, বেশ বেশ বেশ হইয়াছে; তা বাবু আজ বড় কু-যাত্রা, এখন আর 
কোন কথায় কায নাই, এই কথা বই তো আর" কিছু নয়, তাই কেন এতক্ষণ 
ভেঙ্গে বল নাহ? তার একটা চিস্তা কি? তিনি যাতে অপৃ্‌পে অপ্‌পে ফল 
দেখেন তা আমি করিব, কাল তোমাদের বাড়ী যাইতেছি, কিন্তু যা হউক, 
বাপু! “পেটে ক্ষিদে মুখে নাজ সে কুটুমে কি কায” বলিতে কি? তোমার 
মেয়্যে ফুল দেখিয়াছেন, এ বড় আহ্রাদের বিষয়, শুনিয়া কাণটা শীতল হইল, 
বস্তুকত্যা বলিয়া রাখি, যা বল, যা কও, সে সকল কিছুই শুনিব না, নাতিনীর 
খতু হইয়াছে, আমাদের জীনেক দিনের আশা; রুধিরে যেন পেট ভরে, 
একখানি বনাত দিতে হইবে বাবু! আর, নয় তো জামাই কর। 
শ্রীকষ্ঠ। (মনে মনে)। বিলক্ষণ! বিদ্যা তো ভারী, খেউড় আরম্ভ করিল, দূর 
হউক, আর কায নাই, প্রকাশ)। তা বৈ কি গণক মহাশয়! আপনি তো 
জামাইই আছেন, আবার করিব কি?। 

সব্র্বনাথ রায়ের প্রবেশ ।১) 
সব্বনাথ। (ভূধরকে সম্বোধন করিয়া)। ভূধর বাবু! এই যে গণক মহাশয়! সকল 
কথা বলা হইয়াছে কি। ফসূর্য্যকাস্তকে সম্বোধন করিয়।)। গণক মহাশয়! আজ 
মাসের কঅই?। 
সূর্য্যকান্ত। (বিলক্ষণ করিয়া পঞ্জিকা দেখিয়া)। আজ প্রথম পীচদণ্ড ফাগুন মাসের 
১৫ই, ছিল; পরে এই কতক্ষণ হইল ১৭ই, পড়িয়াছে। (পুনবর্বার ভালরূপে 
পঞ্ভিকা দেখিয়া)| হাঁ হী, এই যে বটে বটে! “বাণ বিদ্ধি বসু ক্ষয়” আবার 
আজই ত্যেরস্পর্শ, ১৭ই, ক্ষয় হইয়া ২৬ শে, পড়িবে, বটে বটে, বটে তো, 
তবেই আজ মাসদদ্ধা হইল, অদ্য কোন কম্মই করিতে নাই। বিশেষতঃ 
আদ্যচ্ছাদ্দটা নিতান্তই নিষুদ্ধ। 
সব্্বনাথ। (হাসিতে হাসিতে)। ভূধর বাবু! আর কেন বিলম্ব? গণক মহাশয়কে 
: বূলিয়া.কহিয়া কর্মমটা গোছাল করিবার চেষ্টা কর; বড় উত্তম লোক পাওয়া 
গিয়াছে; এমনটা আর নাই। ৃ 
ভুধর+ হোসিতে হাসিতে)। হাঁ আর বিলম্ব কিঃ বলুন .না? আপনিই” বলিতে 
“আরম্ভ করুন। কোণে কাণে) আমাদের তো-রুষির নিয়া “বির ইনিই এ 
০০০০ | 
শিরিন রটনা 


(১) ভূধর বাবুর সহচর 
(২) ভূধরের পরিচিত গ্রামের স্কুল পণ্ডিত 
| ২৭৬ 


সপত্বী নাটক 
রামগতি। কি গো! ভূধর বাবু যে! তবে কবে বাড়ী আসা হইয়াছে? ভাল 
আছেন তো? করিতেছেন কি? এখনও সেই টীনা বাজারেই থাকা হইতেছে 
তো? মেনে মনে)। এই যে দৈবজ্ঞ সূর্য্যকাস্ত বুড়া এখানে, ভাল! ইহাকে লইয়া 
ক্ষণেক রহস্য করা যাউক। (প্রকাশ)। কি গো গণক মহাশয়! বড় যে বকাবকী 
করিতেছেন? এত বিচার কিসের? 
সুর্য্কাত্ত। (মনে মনে)। আঃ দুর হউক, আবার এই খ্রিষ্টানটা আসিল; বিরক্ত 
করিবে! । (প্রকাশ)। কিসের বিচার করিব বল? দেশে আর কি বিচার আছে? 
না, আচার আছে? দেশটা এককালে খ্রিষ্টান হইয়া উঠিল বৈ তো নয়?। 
রামগতি। (হাসিতে হাসিতে)। কেন মহাশয়! দেশ শ্রীষ্ঠীয়ান কিসে হইল ?। 
সূর্্যকাস্ত। (সদভে)। আবার জিজ্ঞেসা করিতেছ হে! রীড়ের বিবাহ হইতে 
চলিল? যাহা কখন কর্ণেও শুনি নাই। বেদে নেই, পুরোণে নেই, কোরাণেও 
খুঁজিয়া পাওয়া যায় কি না? আর এ কি দেশে মানুষ আছে বল?। 
রামগতি । কেন মহাশয়! এই যে বিদ্যাসাগর মহা-_ | 
সূর্য্কাস্ত। (রাম গতির কথা শেষ না হইতে হইতেই সক্রোধে)। আঃ! যাও যাও! 
ওটার আর নাম করিও না! শুনিলে রাগ জন্মে!। 
রামগৃতি। সে কি মহাশয়! এ কি বলেন? বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রাতঃস্মরণীয় 
লোক, তাহার নাম শুনিলে আবার আপনকার রাগ হয়? সব্ববাঙ্গ পুলকিত 
হয় না?ঃ। আর, দেশে লোক নাই বলেন কি? তিনি যখন বিধবাবিবাহ বিষয়ে 
প্রথম ব্যবস্থা বাহির করেন, তখন নব্বীপ প্রভৃতি যাবতীয় সমাজের ব্রান্মাণ 
পণ্ডিত মহাশয়েরা তাহার বিপক্ষ হইয়াছিলেন এবং কত শত আপত্তি উপস্থিত 
করিয়াছিলেন, একথা সত্য কি না?। 
সৃয্যকান্ত। (সন্ত্রমে) হাঁ হা! তা সত্য বটে! তাহারা কী সব যৎসামান্টী নোক? 
রাজা রাধাকাত্ত বাহাদুর এবং এ সকল মহামহাঁপাদ্যা মহাশয়েরাই তো 
আমাদের দেশের প্রধান নোক, এ সকল মহাত্মাদিগের পুণ্যি প্রতাপেই তো 
এখনও দিবারাত্র হইতেছে, চন্দ্র সূর্ী উঠিতেছেন, গঙ্গায় জোয়ার ভাটা 
খেলিতেছে, এখনও এদেশে যাঁ মানুষ আছেন তা ত্বাহারাইঃ আর সকল কি 
তাদৃশ মনুষ্যের মধ্যে গণ্যঃ। বারবার জিলার কয়েকজন জমীদার, কয়েক 
জন অন্য প্রকার সন্ত্রাত্ত নোক ও রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুর পৃভিতি কতগুণি 
ও যথার্থ হিন্দু আছেন বটে; তত্তিন্ন আর কি তদৃশ হিন্দু দেখিতে পাই! 
রামগতি। ভাল মহাশয়! আর কেহই যেন হিন্দু নন্ যাউক, এ. বিবাদে কাজ 
নাই। এক্ষণে বলুন দেখি আপনি যাহাদিগকে মানুষ ও হিন্দু স্থির করিয়াছেন, 
ইহাদের প্রতি আপনকার বিলক্ষণ শ্রদ্ধা আছে কিনা?। 
ূর্যাকাত্ত। (দস্তে, প্রফুল্ল বদনে) হাঁ আত্তরিক আস্থা আছে বৈকি?। 
রামগতি। আচ্ছা মহাশয়! এখন বলুন দেখি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রকাশিত 


২৭৭ 


দুত্্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


প্রথম ব্যবস্থা পত্রে ইহারা যে দোযোন্নাস করিয়াছিলেন, দ্বিতীয় ব্যবস্থাপত্র দ্বারা 
তিনি. তাহা তন্ন তন্ন রূপে খণ্ডন করিয়া দিলে তাহাতে আর কি কেউ কোনো 
উত্তর করিতে পরিয়াছিলেন?। 
এগার রাবার রাড রা ও পদ রাড সিডি 
চাই না। 
রামগতি। (হাসিতে হাসিতে)। সে কি মহাশয়! এ সকল আবার কিসে খ্রিষ্টান 
কথা হইল? আপনি শাস্ত্র বিচারকেও খ্রিষ্টানী কথা বলেন। 
সূর্য্যকাস্ত। (ক্রোধে) এ সকল কি খ্িষ্টানী কথা নয়! আবার শুনিতে পাইতেছি, 
কুলীন মৌলিক নাকি থাকিবে না, সব একসা হইবে; তবেই বলিতে হইল, 
আর কি দেশে মানুষ আছে? এ সকল কথা কি শুনা যায়?। 
রামগতি। সে কি মহাশয়! আবার গোল করেন কেন? দেশে মানুষ নাই 
বলেন কি? আপনি যাঁহাদিগকে মহাত্মা বলেন, আপনকার সেই সকল 
মহায্মারাও যে কুলীনদিগের বহুবিবাহ নিবারণের চেষ্টায় আছেন। 
সূর্ধযকান্ত। (বিরাগে) যাও যাও, তোমার সঙ্গে আর পারা যায় না বেনে, ক্ষাস্ত 
হও বাবু; মিছে বিবাদে কায নাই; তুমি বিদেশী নোক; তোমার সঙ্গে অমনি 
রামরামী থাকে, তাই ভাল। 
রামগতি। কাযে কাযষেই মহাশয়; আজ আমার বেলাটাও হইয়াছে; স্কুলে 
যাইতে হইবে; চলিলাম, নমস্কার, ব্রাহ্মাণেভ্যো নমঃ . 

(রোমগতির প্রস্থান) 
ভূধর। আচার্য্য মহাশয়! মিছা কেন উহার্দের সঙ্গে বাকৃবিতণ্ডা করিতেছেন; 
ইহাতে ফল কিঃ উহাদের মেজাজ দেখিতেছেন না, উঁহারা সব সাহেবদের 
চেলা, জানেন না কিঃ সাহেবদের মত নয়, তথাপি উহাদের মত আগে 
ভাগেই, আমাদের দেশ সাহেব হইয়া যায়, বামুন শৃদ্র, ক্ষত্রী, বৈশ্য, এ সকল 
জাতি ভেদ থাকে না, কুলীন মৌলিকের এককালে উঠিয়া যায়, স্ত্রী পুরুষ 
সকলেই লেখা পড়া শিখে, বিধবার বিবাহ হয়, একটী মানুষের এককালে দুই 
তিনটা স্ত্রীর পতি না হইতে পারে, স্ত্রীলোকেরা এত ঢাকাঢুকী ভাবে না 
থাকে? স্বয়ন্বরের কাণগুটা চল্যে যায়, তাহাদের সঙ্গে কি আপনি পারিয়া 
উঠিবেন, যে, এত বকাবুকী করিতেছেন ঃ। উঁহারা সব, সংস্কৃত কলেজের 
ছাত্র, ঘরের টেকি_-পেটের ছুরী- রাবণের ভাই “পিণ্ড গয়াং ছ””_ 
“অপরম্বা কিং ভবিষ্যর্তি” “মুঘলং কুলনাশনং” আমরা কলিকাতায় থাকি, 
চীনা বাজারের ভূত, সকলি জানি। ও সব দেখিয়া শুনিয়া আমাদের কাণ 
ঝালাপালা হইয়া গিয়াছে, এখন আর ও সব শুনি না। যদি শুনি, তো, এ 
কাণ দিয়া শুনি, অমনি ও কাণ দিয়া জমা খরচ ক্লোজ, যত জমা ততই খরচ, 


২৭৮” 


সপত্বী নাটক 
মজুতে ০, নীরোগের বৈদ্য, বিদ্যার পঞ্চামৃত। বিদ্যা সাধ্যের সঙ্গে আমাদের 
দলাদলী, কিন্তু কাজের সঙ্গে গলাগলী ভাব। পরস্পর সকলের সঙ্গেই 
আমাদের মাখুলী আছে, ফলতঃ ঢলাটলী করিতেও ছাড়ি না, আমরা 
মেড়ামাটী। মহাশয়! এত বকাবকীতে আবশ্যক কি? বসিয়া রঙ্গ দেখুন না 
কেন? বোবার শক্র নাই। বস্তুতঃ যা করিব তা মনে মনেই আছে। এই শুনুন 
না কেন মহাশয়: সে দিন এ উনি আমার নিকটে আসিয়াছিলেন, যিনি এখন 
গেলেন, এঁ যাঁর পায়ে মস্মস্যে বুট দেখিলেন। উনি বলিলেন “ভূদর বাবু! 
তোমাদের গ্রাম এখন আর সে ছোট গ্রাম নাই, এখানে সরকারী ইস্কুল 
হইয়াছে, তোমরা সব এখন আর পুর্বরবের মত পাড়া গেয়্যে লোক নও, সভ্য 
হইয়াছে, এই বই খানার একটা নাম লিখিয়া দেও, এ বই গবর্ণর কৌন্সেলে 
যাইবে, বড় সাহেব হাতে করিয়া দেখিবেন, আর কুলীন মৌলিক থাকিবে না, 
সব এক্‌সা হলো। বাবু! বলিলে না বিশ্বাস যাইবেন, হাস্যবদনে বইখানা তার 
উনি অমনি খুবী হইয়া আমায় কত প্রশংসা করিতে করিতে চলিয়া গেলেন। 
চুপ্‌ কুরিয়া থাকুন না কেন মহাশয়: সত্য সত্যই কি ও সব কর্ম আমাদের 
দেশে চলিবে, একবার একবার অমন হুজুক উঠে। তবে যথার্থ কথা বলিতে 
দোষ কি মহাশয়! যদি আমাদের দেশে স্বয়্বরের কাণুটা চলিত হয়, তাহা 
হইলে ভাল হয় বটে, ও কটার মধ্যে এটাই ভাল কথা, পোড়া দেশে তাকি 
চলিবে? 

(রুদ্ররাম বাচস্পতির প্রবেশ)0১) 
রুদ্বরাম। (গুন্‌ গুন্‌ স্বরে) হরি হরয়ে নমঃ, হরি হরয়ে নমঃ। (প্রকাশ) কি গো 
ভূধর বাবু! ভাল আছ তো?। 
ভূধর। (ব্যস্ত সমস্ত,গাত্রোথান)। আসুন ভট্টাচার্য্য মহাশয়। আস্তে আজ্ঞা হয়। 
প্রণাম। (উচ্চৈঃম্বরে ভূত্যদিগের প্রতি) কে আছ রে! আসন? আসন? তৎপর। 
(আসন প্রদান ও ভট্টাচার্যের উপবেশন) 

রুদ্ররাম। কি গো ভূধর বাবু! স্বয়ন্বরের কথা কি হইতে ছিল, বড় আড়ম্বর 
শুনিতে ছিলাম যে£। 
সুষ্কান্ত। ব্যেস্ত সমস্ত হইয়া)। হাঁ হা বেশ হইয়াছে, আচ্ছা বলুন তো বাচপোত 
মহাশয়! স্বয়ন্বরটা চলা ভাল না মন্দ?। 
রুদ্ররাম। (ক্ষণেক চিস্তা করিয়া)। হা! ধন্মশান্ত্রে তো কলিযুগে স্বয়ম্বরটা নিষিদ্ধ 
মধ্যেই গণনীয়। নিষিদ্ধ মধ্যে গণনীয় হউক অথবা বিধেয় বলিয়াই প্রতিপন্ন 
থাকুক; বস্তুতঃ আমার বোধে স্বয়ন্বর এদেশে বড় শুভকর নয়। 


0১) গ্রামস্থ মঠধারি অধ্যাপক ভট্টাচার্য্য, বড় বিজ্ঞ লোক, শাস্ত্রে অদ্বিতীয় প্রায়। 
২৭৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য - 


ভূধর। (উগ্রভাবে)। কেন? কেন? এমন কথা রেন. বলিবেন মহাশয়! 
কলিকাতায় এক্ষণে অনেকেই তো এ মত কুমত জ্ঞান করেন। 
রুদ্ররাম। (নশ্রভাবে)। বাবু! সে সব কথা স্বতন্ত্র; তাহারা সব বড়লোক; বড় 
পন্ডিত; তাহাদের বুদ্ধি, বড় বুদ্ধি; আমি অনেক চিস্তা করিয়া দেখিয়াছি 
ইহাতে এই এই দোষ দর্শন হয়, স্বয়ন্বর কেবল আড়ম্বর মাত্রঃ তাহা'ত 
উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইতে পারে না। সভা মধ্যে নিমেষ মাত্র সাক্ষাতে কি কখন 
যাবজ্জীবনের প্রণয় পরীক্ষা হইতে পারে-_কদাচ হয় না?। আর,_ 

(ুদ্ররামের কথা শেষ না হইতে হইতেই) 
ভূধর। (বিরক্ত ভাবে)। দূর হোক মহাশয়! আপনার ও সকল কথা ভাল লাগে 
না, ক্ষান্ত হউন। আপনাদের তো এই দোষ। 
রুদ্ররাম। (মনে মনে)। রাম রাম! কি বিস্মৃতি! ইহাদের নিকটে ও কথা কহাই 
অন্যায় হইয়াছে; যা হউক, আজ বড় কুযাত্রা, একটা মিষ্টালাপ করিয়া বিদায় 
হই, কালি তখন আসা যাইবে, যদিই কিছু হয়। (প্রকাশ)। ভূধর বাবু! আচ্ছা, 
আজ বেলাটাও অনেক হইয়াছে, মধ্যাহ্ন সন্ধ্যাদি কিছুই সারা হয় নাই। 
এবৎসর নবদ্বীপের কয়েকটী ছাত্রকে বাড়ীতে অন্ন দিয়া রাখিয়াছিঃ এখন 
চলিলামঃ যাও তোমরাও, বেলাটা অধিক হইল, তোমরা সব, সকালখেকো 
লোক, শ্নান কর গ্যে, গরম জলেই স্নান হয় তো?। 
ভ্ধর। হা মহাশয়! আচ্ছা, তবে আজ আসুন, প্রণাম। আমি আরও দুই 
একদিন বাড়ী আছি। রঃ 
রুত্ররাম। ভাল ভাল। প্রেস্থান) 
ভ্ধর। হাঁ_কি বলিতেছিলাম আচার্য্য মহাশয়! (ক্ষণ চিত্তা) হা।_মনে হইল। 
(পুনবর্বার ক্ষণকাল চিস্তা করিয়া সবর্বনাথ রায়ের প্রতি দৃষ্টিপাত)। রায় মহাশয়! আর 
বিলম্ব কেন? বন্ধুর কার্য করুন। 
সবর্বনাথ। হাঁ ভাই! আর বিলম্বে প্রয়োজন নাই বটে, বেলাটা অধিক হইতেছে, 
তবে কি আমাকেই বলিতে হইবেক?। 

(সুয্কাত্তকে সম্বোধন পূর্র্ককি) 

গণক মহাশয়! ভূধর বাবু আপনাকে একটা কথা বলিতে চান? 
সূর্্যকাত্ত। বিলক্ষণ! আমি তো আপনকারদেরই  প্রতিপাল্য! 
সব্বনাথ। তেমন নয় মহাশয়! ভূধরবাবু এবার আপনাকে বড় একটা শক্ত 
কথা বলিবেন। আমরা নিশ্চিত জানি বটে, এ প্রদেশে আপনার সঙ্গে কথা 
কয় এমন 'মনুষ্যই নেই, আপনি দিনকে রাত, রাতকে দিন করিতে পারেন, 
কিন্ত এবার বোঝাপড়া! 


২৮০ 


সপত্বী নাটক 
সূর্য্যকাস্ত ।(সভয়ে)। শক্ত কথা কি গো সব্র্বনাথ বাবাজী! শুন্যে যে ভয় হয়!। 
সবর্বনাথ। না, না, না মহাশয়! তেমন শক্ত কথা নয়,একটা দুঃসাধ্য বিষয় 
সাধন করিতে অনুরোধ করিবেন, তাহাতেই শক্ত কথা বূলিলাম। 
সূর্ধ্যকাত্ত। (কিঞ্চিৎ দন্ত ভাবির দা 
কি আছে? “হাঃ হাঃ হাঃ” হাসা করিয়া। 


পদ্য। 


চরাচর ধরাতল, জ্ঞান করি কর তল, 
আকাশ পাতাল ত্রিভুবন। 
নাহি কিছু অবিদিত, হিতাহিত সুবিদিত, 
বল্যে দেই জনম মরণ।। 
রোগ হয়্যে রুগী করি, বৈদ্টী হয়্যে থলী ধরি, 
সব কাজে হই সুনিপুণ। 
যে প্রকার নোক যারা, বিশেষ জানেন তারা, 
আর আর আছে যত গুণ।। 
আঁটা আঁটা জানি ভাল রপ। 
পরিচয় নাই যাই, বিশেষ জান না তাই, - 
সূর্য্কাস্ত নিজে বহুরূপ।। 
যে কম্ম করিতে বল, যথা ইচ্ছা তথা চল, 
কোন কাজে না হইব কম। 
জানি কত ফের ফার, সাধ্য আছে বোঝে কার, 
সূ্য্যকাস্তে ভয় করে যম।। 
এই শুনিলে বাপু! যা বলিলাম বুঝিতে পারিলে কি না? “হাঃ হাঃ হাঃ” 
বাপু! ইহা ব্যতীত সূর্য্যকান্তে আর কত গুণ আছে তা শুনিবে? তবে বলি 
শোন, বাল্যকালে বিদ্যা শিক্ষায় কত মনোযোগ ছিল এবং কেমন সুশিক্ষে 
করিয়াছি, আগে তাই বলি। 
পদ্য। 


বাবার জৌতিষ গ্রন্থ ছিল ঝুড়ী ঝুড়ী। 
পড়িতে দিতেন ছিড়ে করিতাম ঘুড়ী।। 
তিনি বড় ছিলেন পেটুক পাঠা খোর। 
চুরী বিদ্যা শিখে আমি খ্যাত পাঠা চোর।। 
অদ্যাপি বাছিনা বাপু! পাঠা আর পাঠী। 


২৮১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


হাড়ী পাড়া ঢুকিলে মারিতে আসে নাঠী।। 
জ্যোতিষেতে নেখা আছে সীতার হরণ। 
ব্যাকরণে শিখিয়াছি বারণের রণ।। 
দ্রৌপদী বসিয়া কাদে অশোকের বনে। 
না বুঝে করিয়া গ্রেম বেছুলার সনে।। 
কীচক বিনাশ করি টাদ সদাগর। 
রাজত্ব কাড়িয়া নিল সোণার লাহোর।। 
শক্তি শেলে পড়িলেন অর্জন সারথি। 
হনুমান আনিলেন গঙ্গাভাগীরথী || 
গৌরাঙ সন্াসে যান্‌ চড়িয়া জাহাজ। 
টুপী খুল্যে কাদে আসি সকল ইংরাজ।। 
কেমন বাবু! শুনিলেঃ সব বুঝিলে তো? কবিত্ব শক্তিই পৃথিবীর সার পদার্থ। 
ঈশ্বরের ইচ্ছায় তার অপ্রতুল নাই। শান্ত্রেও নাকি কবিত্ব শক্তির বিস্তর প্রশংসা 
করিয়াছেন, বাবার মুখে এ কথা শুনিয়াছিলাম। ছেল্যে ব্যালা ধরাধরী করিয়া 
বাবা আমাকে এই বচনটা শিখাইয়া দিয়া গিয়াছেন, তা এখনও ভুলি নাই, 
কড়ায় গণ্ডায় মনে আছে, যথা 
“নরত্বং দুর্নতা নোকে, আবার বিদ্যা তত্ব সৃদুর্নভিঃ। 
তারপর কপিত্বং দুর্নভা তত্ব, ফের্শকৃথি তত্ত্ব সুদূর্নভং |” 
“মানি যাদ পিতিষ্ঠাত্ত, মগম শীন্বতী সমে, 
যৎকিঞ্চিৎ মিথুলা দেকা, মবধি কাম মোহীনীঃ।1” 
কেমন বাপু! ঠিক রাখিয়াছি কিনাঁঃ এ তো কীচা সমস্কার নয়? আবার এ 
ভিন্ন আপনি পড়ে পড়্যে আর একটা ভাল প্রেমাণ পেয়েছি তা শুনিবে? 
এই শোন বলি, দেখ দেখি নাগে কিনা। 
ও শিব! তোর মাথায় সাপ111” 
সে যা হোক, এখন বল দেখি বাপু! বিষয়টাই কি শুনি। 
সবর্বনাথ। (চতুর্দিকি নিরীক্ষণ করিয়া)। আসুন, এদিকে সর্যে আসুন, একটু 
গোপনে বলিব। 
(সকলের স্ব নিকটে উপবেশন) 
সবর্বনাথ। (মৃদু মৃদু)। কোথা? লাহিড়ি মহাশয় কোথা? (পশ্চাদ্দিকে দৃষ্টিপাত 
করিয়া) কোথা হে শ্রীক্ঠ ভায়া! এখানে আছ কিনা?। 
গদাধর একত্র। মৃদু মৃদু)। হা এই যে আমরা সকলেই আছি (ভূধরকে 
শ্রীক্ঠ। সম্বোধন করিয়া)। যান্‌, কিছু অগ্রসর হউন,“শুভস্য শীঘ্রং”। 
ভূধর। (যৃদু হেসে)। এই যে হইয়াছে, বলুন না রায় মহাশয়! আর গৌণ 
কি?। 
২৮২ 


সপত্বী নাটক 
সবর্বনাথ। (চারিদিক চাহিয়া, মৃদু হেসে)। কথাটা কি মহাশয়! আঃ! আপনি তো 
সকলই, জানেন, ভূধর বাবুর অতি অল্প বয়সে বিবাহ হইয়াছিল, সুতরাং এ 
স্ত্রী ওঁর বড় মনোনীতা নয়, কিন্তু কি করেন, অগত্যা তথাপি উনি তাহাকেই 
অবলম্বন করিয়া এক প্রকার কষ্টশ্রেষ্টে কাল ক্ষেপ করিতেছিলেন। এক্ষণে 
উহার সেই অপাত্রে অনুচিত সমধিক _অনুরাগই মঙ্গলের বীজ স্বরূপ হইয়া 
উঠিয়াছেঃ উহার মাতা ভগিনী প্রভৃতি গুরুজন ও গৃহজনেরা মনে করিয়াছেন 
ভুধর এ স্ত্রীর বশীভূত হইয়া ক্রমে ক্রমে তাহাদের মতের বহির্গত হইতেছে। 
বিশেষতঃ এ বধুটীকে তাহারা কেহই দেখিতে পারেন না; এই নিমিত্তই 
সকলে একবাক্য হইয়া মনস্থ করিয়াছেন ভূধরের আর একটী বিবাহ দিয়া, 
স্ববশে আনিবেন; 
ফলতঃ ভূধর বাবু কিছু তাহাদের মতের বহির্গত নন্। সে যাহা হউক, যে 
পাত্রীটার সহিত এক্ষণে সম্বন্ধ নিবর্বন্ধ হইতেছে; [সটী ইহার অত্যন্ত 
মনোনীতা, ইনি তাহাকে ইতঃপুবের্ব বারংবার দেখিয়াছেন, এবং তদর্থ ব্যাকুল 
আছেন অতএব ইহ্‌'র বাসনা, মাতা, ভগিনী প্রভৃতি, যে উদ্যোগ করিতেছেন, 
সে কার্যযটা সম্পন্ন হইয়া যায়। কিন্তু কথা কি জানেন? এবিষয়ে কর্তাটীর 
একান্তই মত নাই; অতএব যদ্যপি অদ্য কল্য কোন সময়ে আপনি একবার 
আসিয়া, গণনা করিয়া ভালরূপে বলিয়া যান্‌ এ বৌটার সন্তান সম্ততি হইবেক 
না; তবেই সকলকার এক মত হয় এবং বিষয়টা সম্পন্ন হইয়া যায়। 
সূর্য্কান্ত। “হাঃ হাঃ হাঃ” এই বৈ তো নয়? এ আবার শক্ত কথা কি? 
আচ্ছা; আপনারা নিচ্চিন্দী বসিয়া থাকুন; কত্তা আছেন, আমি আছি; এক্ষণে 
উজ্জ্গ সঞ্জুগ করুন্‌ গ্যে। ক্ষেণেক চিস্তা করিয়া)। তবে আমার কথাটা কি বাপু 
জানেন? আমরা সব, হইলাম দুঃখি দারিত্্রী মানুষ; দু-দণ্ড দুঃখু সুক্ষু না করিলে 
সংসার চলে না, আবার সুমুখে পোড়া কিস্তিটা পড়িয়াছে, যে দুরাস্ত জমীদার; 
টাকা কাছায় বান্ধিয়া নিদ্রা যাইতে হয়ঃ তাই বলিতেছি, খাজনার ৪টা টাকার 
এ পর্য্যস্ত ভারী অসমস্থান রহিয়াছে, অতএব এ মাসের এ কটা দিন চুপ্‌ 
করিয়া থাকুন, পরে আমি কায্য শেষ করিব। 
সবর্বনাথ। (মনে মনে)। বোঝা গিয়াছে; ইহারা সেকেল্যে ঘাগী;ঃ কথার নয়; 
কাষের। (ভূধরের প্যাকেট হইতে ৪টী টাকা লইয়া প্রকাশ)। না না গণক মহাশয়! 
তা হবে না; কালই সকাল বেলা আসিতে হইবে; এ আপনার খাস্‌ তালুক, 
এই খাজনা ধরুন। (হাতে হাতে প্রদান)। 
সূর্্যকাস্ত। অর্থ পাইয়া পরিতোষ)। আচ্ছা বাপু! তবে আজ আসি। 

(সকলের প্রস্থান) 

ূর্য্যকাত্ত। (পথে যাইতে যাইতে উর্ধ্বদৃষ্টি করিয়া, স্বগত)। আঃ! ব্যালাটা এত হইয়া 
গিয়াছে! যা হউক, আজকার সুপ্রভাত বটে, ৪ চারিটা টাকা হাত হইল, গিনীর 
মলের দায়ে নিচ্চিন্দী হইলাম। উঃ-_-! কি রোক্র! 


২৮৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
(দ্বিতীয় প্রহর বর্ণন) 
অভি প্রায় । 
পদ্য। 
প্রখর গগনে দিনকর, 
দিবা হৈল দ্বিতীয় প্রহর। 


জিনিয়া জ্বুলন ছবি, উপরে উদিত রবি, 
উত্তাপে ধরণী খরতর।। 


ধরা বুঝি ধরাতল যায়। 

রাখে বুঝি ধরিয়া ধরায় ?।। 
মরীচিকা ঝিকি মিকি জুলে, 
ভূভাগ ডুবিল যেন জলে। 
ভ্রম হয় জলে আর জুলে।। 


অথবা এরূপ মনে লয়, 
ভূধাম হইবে বুঝি লয়। 

সাগর ডাগর হয়্যে, --ডুবায় ঝাপান বয়োয, 
সংসার করিল জলময়।। 


জীব জন্তু আকুল অন্তরে, 
আতপে তাপিত কলেবরে। 
তবু দাহ, দেহ দাহ করে।। 


শুকাইল তরুলতা দল, 
ধর্যে ছিল নব নব" দল। 

পথে না চরণ চলে, সবে বলে যাই জলে, 
প্রাণ করে সদা জল জল ।। 


বৈকাল সুখের কাল বটে, 
কবিরা এরূপ ভাব রটে। 
কিন্তু দুপুরের বেলা, যমে আর জীবে খেলা, 


£ ২৮৪ 


সপত্ী নাট 
যদি রয় এ জীবন এ জীবন ঘটে।। 
আহা! একি স্বভাবের ধারা, 
একি দেখি বিপরীত ধারা। 
আহা মরি! ভেব্যে হই সারা।। 


নিশি নাই শশী নাই আর, 

কোথা সেই বাতাস উষার। 
এখন ভানুর কর, দগ্ধ করে কলেবর, 

ংসার করিল ছারখার ।। 


পশু পক্ষী ভূচর খেচর, 
উত্তাপে হইয়া জবর জ্বর। 
নিদ্রাবেশে হইয়া কাতর ।। 
মন্দ মন্দ মলয় পবন, 
বহিতেছে বটে অনুক্ষণ। 
কিন্তু আগুণের কণা, ছুটে তাতে অগণনা, 
ভস্মরাশি করিল জীবন।। 
পথিকেরা শুয়িয়া ছায়ায়, 
চাদর পাতিয়া নিদ্রা যায়। 
কারু আছে বোচ্কা সাতে, কেহ দেয় হাত মাতে, 
কেহ কেহ লুষ্ঠিত ধুলায়।। 
পিয়ুপিয়ু পাপিয়ার রব, 
খগ্জন খঞ্জনী নাচে সব। / 
ছায়া পেয়্যে ডালে ডালে, নাচে গায় তালে তালে, 
করে মদনের মহোৎসব।। 


কোকিলের কুহু নয়, হেন ভাব মনে লয়, 
দুঃখ দেখি করে উহু ধ্বনি।। 


২৮৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বানর বানরী কুতৃহলী, 

শাখায় বসিয়া গলাগলী। 
মাতিয়া মদন বাণে, মত্ত মুখ মধুপানে, 

বলাবলি আর বলাবলী।। 


ভ্রমর ভ্রমরী দৌহে মেলি, 

বকের স্ভবক মাঝে কেলি। 
টকাটক্‌ করে রণ, শ্বাস বহে ঘন ঘন, 

শেষে প্রেমরসে ঢলাঢলী। ৷ 


গোকুলে গোকুলে লয়ে চলে। 
কবলে তৃণের গুচ্ছ, উচ্চদিকে উটে পুচ্ছ, 
হম্বা রব ধেনু বৎস দলে।। 


ধবলি! শ্যামলি! বলি মুখে, 
রাখাল চলিল গোষ্ঠমুখে। 

হারে রেরে রেরে রব, বলে চল ভাই সব, 
গোরু বান্ধি নিদ্রা যাই সুখে।। 


এঁ ভাই! গেল তোর ডেড়্যে, 
ফিরালে মারিতে ধায় তেড়্যে। 
যেত্যে চাও চল ভাই! ছেড়্যে।। 
ঘরে যায় হইয়া পাগল। 
গৃহিণী লইয়া তেল, পরিবারে দেয় চেল, 
খায় পরে ০মেমন সন্ল।। 
সে সময় সুসময় নয়, 
বনিতারা যত মিষ্ট কয়। 
গায়ে যেন বিষ লাগে, রেগ্যে উঠে আগেভাগে, 
বলে মাগি! এ দুঃখ কি সয়ঠ।। 


তোমা লাগি হয়েছি পাগল, 


২৮৬ 


সপত্বী নাটব 
আর কি করিতে বল, 'বল?। 
কটিতে কৌপিন পরা, মাতায় চুলের ভরা, 
রাঙ্গা আঁখী সদা ছল ছল।। 
(১) (নেপথ্যে মহান্‌ কলকল) 
অভি প্রায়। 


কবিতা। 


ধর ধর পুরবাসি! 
গলায় বসিল ফীসী। 
এমন ঢলানী, আগে নাহি জানি, 
কি করিল সবর্বনাশী।|| 


আলো আলো মর্‌ ছুঁড়ি! 

এখনি হনা লো কুড়ী। 
জানি তোর গুণ, দাদা হৈল খুন, 

আহা কি রূপের ঝুড়ী?।। 


কি হৈল কি হৈল হায়! 
পড়িলাম খুন দায়। 

একে নারী বধে, পাপ উর্ঘ অধে, 
ধন মান ধর্ম যায়?।। 


সেকি সেকি কেন কেন? 
প্রেয়সি! সাহস হেন?। 

হৈলে দোষ গুণ, হতে হয় খুন? 
আপনি সুবুদ্ধি ফেন?।। 
বৃথা কেন করি রোষ, 
বাবার কি দিব দোষ। 

পোড়া দেশ ছার, পোড়া দেশাচার, 
ভারত কষ্টের কোষ।। 

প্রোস্তর মধ্যবর্তী মহাশ্মশান, প্রকাণ্ড বটবৃক্ষ) 


(১) কলকল __- কলরব। 
২৮৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


(মাহেম্বরী, রাসবিলাসিনী, সব্র্বসুন্দর শিরোমণি, ব্রজবিলাস, ভুবনেশ্বর, এবং হস্তে রজ্জু 
লইয়া আলুলায়িত কেশা, জীবিতাবশেষা, মরণাবেশবেশা, উন্মাদিনী মোহিনীর প্রবেশ)0১) 
মাহেম্খরী। (ক্রোধাৰিতা ও চকিতা)। | 
ধর ধর পুরবাসী! 
গলায় বসিল ফীসী। 
এমন ঢলানী, আগে নাহি জানি, 
কি করিল সবর্বনাশী।। 
রাসবিলাসিনী॥। (ম্ভে)। 
আলো আলো মর্‌ ছুড়ি! 
এখনি হনা লো কুড়ী। 
জানি তোর গুণ, দীদা হৈল খুন, 
আহা কি রূপের ঝুড়ী?।। 
সবর্বসুন্দর। (ব্যস্ত সমস্ত ও বিমর্ষভাবে)। 
কি হৈল কি হৈল হায়! 
পড়িলাম খুন দায়। 
একে নারী বধে, পাপ উর্ধ অধে, 
ধন মান ধর্ম যায়।। 
ব্রজবিলাস। (অবাক হইয়া)। *- 
সে কিঃ সে কি? কেন? কেন: 
প্রেয়সী! সাহস হেন?। 
হৈলে দোষ গুণ, হতে হয় খুন, 
আপনি সুবুদ্ধি যেন?।। 
ভুবনেশ্খর। চকিত, বিরক্ত ও ভীত হইয়া)। 
বৃথা কেন করি রোষ, 
বাবার কি দিব দোষ। 
পোড়া দেশ ছার, পোড়া দেশাচার, 
ভারত কষ্টের কোষ।। 


সূর্য্যকা। (পার্শে দৃষ্টিপাত করিয়া সবিম্ময়ে)। যো! উদ্বন্ধন?। 
মোহিনী । (বটবৃক্ষ শাখায় রজ্জু সংযোগ করিয়া রোদন করিতে করিতে, স্বগত)। হা! এ 
(১)শাশুড়ী, ননদ, শ্বশুর, স্বামী, দেবর এবং বন্ত্রবিলাসের প্রথমা স্ত্রী জয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের 
পার্খগ্রামবাসী কোন গৃহস্থ পরিবার। ভুবনেশ্বর,” _গবর্ণমেন্ট স্কুলের ছাত্র । 

২৮৮ 


সপত্বী নাটব 
হতভাগিনীর সংসার আশ্রমের সুখ সম্ভোগের আশা সকলি ফুরাইল!। 
(বোম্পকণ্ঠে মৃদু মৃদু)। হা বিধাতা! তোমার মনে কি এই ছিল। হে জগদীশ্বর! 
এই দুর্ভাগিনী, অসহ্য সতিনী যন্ত্রণা ও পতির চির বিরহ একাত্ত সহ্য করিতে 
না পারিয়াই এই অকর্তব্য পাপ কর্মে প্রবর্ত হইতেছে _ উদছন্ধনে প্রাণ বিয়োগ 
করিতেছে, দেখ্যো দেখ্যো, হে ভগবান! তুমি দয়াময়, যেন ও নামের মহিমা 
থাকে। আমি এই তোমাকে স্মরণ করিয়া তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা 
করিতেছি, যেন স্মরণ রয়, এক্ষণে আর কিছুই চাই না। হে দয়াময়! দয়া 
করিয়া কেবল এই দুত্তার পাপ পঙ্ক হইতে নিস্তার করিও, দোহাই তোমার, 
হে দীননাথ-__শুনিয়াছি “অপঘাত মৃত্যুতে বড় পাপ হয়” (রোমাঞ্চ ও গাত্র 
শিহরণ) দেখ্যো ঠাকুর! আবার এ অভাগীর যেন সে পাপটীও না হয়, এই 
ভিক্ষা দিও। ক্ষেণকাল রোদন করিয়া) হে ঠাকুর! শুনিয়াছি “মনুষ্য জন্ম বড় 
দুর্লভ জন্ম” অতএব মরিয়া আর একবার যেন মনুষ্য দেহ পাই, এই করো। 
যদি পুরুষ হই, তবে যেন এক স্ত্রী থাকিতে অন্য বিবাহে মতি না হয়। যদি 
নারী হই, তবে যেন আবার এই দুর্নিবার সতিনী যন্ত্রণায় না পড়ি। 
হে অগতিনাথ! পতিত পাবন দীনবন্ধে! পতি কুরূপ কদাকার হন, তায় দুঃখ 
নাই; কিন্তু তিনি যেন এককালে একটী বৈ অনেক স্ত্রীর পতি না হন এই 
প্রার্থনা। আর, পতি দুঃখী হন, তাও ভাল, দিনান্তে ভক্ষণ করিয়া কাল যাপন 
করিব, ঘর না পাই, নাই নাই, তথাপি যেন মনের মত একটা বড় পাই 
ঠাকুর!_-বনে বনে বেড়াইব, গাছের ছাল পরিব, গলিত পত্র খাইব, গিরিগুহা 
বাস গৃহ হইবে, শ্যামায়মান নব নব দুবর্ধাদল সুশীতল শয্যা হইবে, দক্ষিণহত্ত 
বালিশ করিয়া পতিকে শয়ন করাইব-_তাহাতেই সুখে শয়ন করিব, হে 
ঠাকুর! তথাপি যেন পতি, সতিনীর পতি না হন, অবলার গতি পতিরত্বের 
যেন অংশী না থাকে, সাধবী স্ত্রীর পরম ধন পতির প্রেমধন যেন সতিনী হস্তে 
না যায়। দোহাই- দোহাই__-দোহাই অস্তর্যামি! এই ভিক্ষা দিও, নচেৎ এই 
্ত্ীত্যার পাপ তোমার হইবে, আমার নহে। 
হে বিশ্বনাথ! আমি মনে জ্ঞানেও তো কখন তোমার নিয়মের অন্যথা করি 
নাই, বরং তাহা প্রাণপণে রক্ষা করিয়া চলিয়াছি, পতিকে এক নিমেষের 
নিমিত্তও অভক্তি করি নাই স্বপ্নেও পরপুরুষে অভিরূচি জন্মে নাই। যদি সে 
পথ সুপথ জ্ঞান করিতাম, তবে কেন এ পাপ কর্ম্ম করিব, এবং তবে কেন 
ভীতা হইয়া তোমার নিকট এত বিনয় করিতে হইবে; যে জন্য এই আত্মহত্যা 
করিতেছি, পরপৃরুষ বিশেষেও তো আপাততঃ ইহার অনেক দুঃখ দূর হইতে 
পাঁরিত?। নী, নী, তা ভীল নয় ঠাকুর। তাহাতে তোমার নিয়ম লঙ্ঘন করা 
হয়। সে পাপ স্ত্রীলোকদিগের পক্ষে সামান্য পাঁপ হয়, অক্ষয় পাপ। যত দিন 


২৮ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


চন্দ্র সূর্য থাকিবেন-_যত দিন দিন যামিনী হইবে, তত দিন পর্য্যস্ত 
কামিনীদিগকে সেই মহাপাতক জন্য দুষ্কর কষ্ট ভোগ করিতে হয়, সন্দেহ 
নাই, জগনিয়স্তা! আমি সাহসপুব্র্বক বলিতে পারি তদপেক্ষা আত্মহত্যা উচিত 
ও বিস্তর পৃণ্যের কর্ম, বরং বিষ পান, বরং উদ্বন্ধন, বরং উর্দ হইতে 
নিপতন, বরং জলপ্রবেশ, বরং জুলস্ত হুতাশন দ্বারা আত্মহত্যা করা ভাল, 
তথাপি স্ত্রীলোকদিগকে পরপুরুষের মুখাবলোকন করিতে হয় নাই। এ বিষয়ে 
শান্ত্রেও গুরুতর নিষেধ আছে। 

(ক্ষণেক চিস্তিতার ন্যায় দাঁড়াইয়া) 
হা! এত বিলম্ব করিতেছি, ত্বরা করি; কেউ দেখিয়া ফেলিবে। (রজ্জু ধরিয়া 
উদ্ঘমুখে কৃতাঞ্জলি)। হে জগদীম্বর! হে ভূতভাবন! হে দয়াময়! হে সব্বান্তর্যামি! 
তুমি স্ব্বস্থানেই বিরাজ করিতেছ, সকলি দেখিতেছ, এ হতভাগিনীর সময় 
শেষ হইয়াছে, কাল নিকটবর্তী, আর কিছু বলিতে পারিল না, ঠাকুর! আর কি 
বলিব; যাহাতে তোমার নিষ্কলঙ্ক করুণাময় নামে কলঙ্ক না হয়, যাহাতে 
তোমার দয়াময় নামের মহিমাটী বজায় থাকে, করো। 

ক্ষেণকাল রোদন করিয়া) 

হা পিতঃ! হাঁ মাতঃ! হা ভ্রাতৃবর্গ! হা ভগিনীগণ! হা আত্মীয়স্বজন! এমন 
সময়ে তোমরা কোথায় রহিলে, শেষকালে তোমাদিগের সহিত একবার 
সাক্ষাৎ হইল না, এই খেদ রহিল! হা! তোমাদের মোহিনী এই জন্মের মত 
বিদায় হয় কোথায় যাইতেছে, একবার আসিয়া দেখিলে নাঠ। হা! তোমরা 
বলিতে “আমাদের মোহিনী অতি শাস্ত মেয়্যে, বড় সুধীর, দিবানিশি মুখে 
হাসি লাগিয়া রহিয়াছে, উচ্চ কথাটী নাই।” হা, এস্যে এস্যে, দেখ এস্যে, 
একবার দেখ্যে যাও, তোমাদের সেই মোহিনীর সেই হাস্যমুখের কি দুর্দশা 
হইয়াছে, হাস্যের পরিবর্তে এখন হা হা শব্দ অনবরত নির্গত হইতেছে, অজ্র 
অশ্রুধারা বহিতেছে, এস্যো এস্যো একবার দেখ, এখন কেমন দেখায়!। 
হা! তোমার বলিতে “মোহিনীর গড়ন খানি কি সুডৌল! হাত দুটি যেন 
পদ্মের মৃণাল! মুখখানি যেন আধফুটো পদ্মফুল! আহা! অভাগী, চক্ষুদুটী যেন 
হরিণী হইতে হরণ করিয়া এনেচে! চুলগুলি যেন চামরের মত! কথাগুলি কি 
মিষ্ট মিষ্ট! যেন মধুমাখা, কোকিলের কুহু ধ্বনি জিনিয়াছে! আহা! এ সময়ে 
তোমরা রহিলে, দেখিলে না? তোমাদের সেই সর্ব্বাঙ্গসুন্দরী মোহিনী, এখন 
আবার কেমন এক নূতন মুর্তি ধারণ করিয়া শ্মশানের বটবৃক্ষে ঝুলিতেছে। 
সে তোমাদের নিকট আর যাইবে না, তোমরাও আর তাহাকে দেখিতে পাইবে 
না, তার মানবীলীলা সাঙ্গ হইল, তার পতিব্রত উদ্যাপন, আসিয়া দেখিলে 
না?। 
হাঁ! তোমরা বলিতে “মোহিনীর কপালটা ভাল, যেমন হোক একটী চাকুর্যে 


২৯০ 


সপত্বী নাটক 
মিটাইতে পারিবে ।” আহা! এ সময়ে তোমরা কোথায়? তোমাদের সেই 
ভাগ্যবতী মোহিনী গলদেশে কেমন অলঙ্কার পরিতেছে দেখিলে না?। রেজ্জুর 
প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া, রোদন করিতে করিতে)। অলঙ্কার প্রতীকার হইবে, তোমরা 
বলিয়াছিলে, তোমরা স্বজন ও গুরুজন, তোমাদের কথা মিথ্যা কেন হইবে 
তোমাদের মোহিনীর এই তে নরীতেই পৃথিবীর সকল সাধ মিটিল। তা নিষ্ঠুর 
অদৃষ্ট! তোমাকে নমস্কার দি। 

(ক্ষণেক চিত্তা করিয়া, একান্ত ধৈর্যাবলম্বন করিতে না পারিয়া)। 
হা নিষ্ঠুর সতিনি! হা নির্দয় স্বামি! হা, পাষাণ হৃদয় শ্বশুর! হা ডাকিনি 
শাশুড়ি! হা রাক্ষসি ননদি! পোড়া পাড়া পড়সি! তোমরা আর মোহিনীকে 
কটু কহিও না। মোহিনী তোমাদের কত উপকারিণী, এবার বিশেষ জানিতে 
পারিলে তো?। 'এই দেখ, মোহিনী প্রাণাস্তপণে তোমাদের উপকার করিয়া 
গেল। আর কি উপকার করিতে বল, বল?। 
(ক্ষণেক চিস্তা করিয়া) 
হা দেবর ভুবনেশ্বর! এ সময়ে তুমি কোথায় রহিলে! আহা। চাঁদমুখে একবার 
“বড় বৌ, বড় বৌ” বলিয়া কি আর ডাকিতে হইল না?। আজ তোমার 
নির্দয় বড় বৌ তোমাকে ফীকী দিয়া কোথায় চলিল আসিয়া দেখ। হে 
প্রিয়তম আজ হইতে তোমার অযত্ব আরম্ভ হইল! তোমার যে ডাকিনী মা 
__ যে দুরস্ত বোন, আমার কাছে যে দুরস্তপণা করিতে, আর তাহা করিও 
না, করিলে অভিমানে বিস্তর কষ্ট হইবে, তাহারা কি তোমার সে আব্দার 
সহিবেঃ। আর, আমার নিকট “মা মা” বলিয়া যেমন আসিতে, কি করিবে; 
দুষ্টকে দূর পরিহার! ছোট বৌর নিকট আজ অবধি সেইরূপ করিও । হা যাদু 
রে। তুমি আজ অবধি মাতৃহীন হইলে, সাবধানে চলিও। কেহ কিছু বলিলেও 
তাহাতে কদাচ উত্তর করিও না। ছোট বৌ, দয়া করিয়া তোমার প্রতি যে 
সম্ধবহার করে, তুমি তাহাই প্রচুর মানিও। 
হাঁ বাছা! বুক যে কেমন কেমন করিতেছে রে? আর তোকে মনে করিতে 
পারি না। ঘরে জল খাওয়ার রাখিয়া আসিয়াছি, স্কুল হইতে আসিয়া অগ্রে 
তাহাই খাইও। বাছা! আমার মাথা খাও, আমার জন্য আর হাহুতাশ করিও 
না, পীড়া হইবে, পীড়া হইলে তোমাকে কে দেখিবে, বল? আর তোমার 
দেখিনার মানুষ নাই!। 
(প্রাা বিড়ালটীকে কোলে লইয়া) 

বাছা! যাও, ঘরে যাও, আর কেন এ অভাগিনীর চারিদিকে “মাঁও মাঁও” শব্দ 


২৯৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


করিয়া, ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াও, মায়া বাড়াও বল?। তোমার নিষ্ঠুর মীও, এই 
তোমাদিগকে ছাড়িয়া চলিল। যাও, বাছা! ঘরে যাও, এ' শ্মশানভূমি, বড় 
ভয়ঙ্কর স্থান, এ দেখ শৃগাল কুকুর সব চারিদিকে “হে হেঁ"” করিয়া 
বেড়াইতেছে, আর কিছুকাল পরে এখানে পাল পাল আসিয়া আমার মাংস 
শোণিত খাইবে। বাছা! যাও যাও, আমি জীবিত থাকিতে থাকিতেই ঘরে 
যাও। 
(মুখচুম্ধন করিয়া) 

বাছা! আমার ভূবনেশ্বরকে বলিও যে আমি মীওর সঙ্গে সঙ্গে শ্মশান পর্য্যসত 
গিয়াছিলাম, সৎকার করিয়া আসিয়াছি। আর, দাদা! মাও, তোমাকে কীদিতে 
বারণ করিয়া গিয়াছে। এবং আমাদিগকে অতি সাবধানে ঘর করিতে কত 
আশীব্বাদ করিয়া গিয়াছে। (পুনবর্ধার মুখ-চুম্বন পূর্বক বিড়াল পরিত্যাগ এবং 
উচ্চৈঃস্বরে রোদন)। বাছা! যাও যাও, শীঘ্র ঘরে যাও, আবার কেন “মীও 
মাঁও” কর, আমার আর বিলম্ব নাই, আমার মৃত্যুর পর এ স্থান অতি ভয়ঙ্কর 
হইবে! তোমরা আর এখানে আসিও না। 

(এই সময়ে বটবৃক্ষে এক টিক্টিকী ডাকিয়া উঠিল, তাহাকে লক্ষ করিয়া) 
অরে অদূরদর্শি টিক্টিকি! তুই আর কেন এখন বৃথা টিকৃটিক করিস্ঃ। নিষ্ঠুর 
বরের সহিত যখন এ হতভাগিনীর বিবাহ হয়, তখন তুই কোথায় ছিলি?। 
তোর দোষ কি? সকলি জন্মাস্তরের তপস্যার ফল!। 

(এই সময়ে বটবৃক্ষে বাতাস বহিতে লাগিল, তাহাকে লক্ষ করিয়া)। 

ও বায়ু! তুমি কি আমার আয়ু গ্রাস্ম.করিতে আসিয়াছঃ ভাল ভাল! তুমি কি 
আমার প্রাণ বায়ুর সঙ্গী হইলে, বেশ বেশ! তুমি এ অভাগিনীর প্রাণবায়ুকে 
সঙ্গী করিয়া লও, ভাল হইল, অভাগিনী একাকিনী কোথায় যাইত!। 

(বটবৃক্ষের অধিষ্ঠাত্রী দেবতাকে সম্বোধন করিয়া)। 
হে বটাধিষ্ঠাত্রি! তোমাকে প্রণিপাত করি, এ দুর্ভাগিনীর যেন পরকালটা ভাল 
হয়, হে ঠাকুর! এই আশীবর্বাদ কর, জগদীশ্বর দয়া করিয়া যেন এই অপঘাত 
মৃত্যু জন্য মহাপাতক ভিক্ষা দেন। 

(এই বলিয়া উর্ঘ মুদিত নয়নে গলে রজ্জু প্রদান) 
স্বসুন্দর। (তাড়াতাড়ী নিকটে গিয়া)। হাঁ তরী! কি সর্বনাশ! মা: ক্ষান্ত হও, 
ক্ষান্ত হও, ও কি কর কর! এমত অপকর্ম করিতে নাই। (বলপূবর্বক রজ্জু 
মোচন) 
ভুবনেম্বর। (রোদন করিতে করিতে)। ও কি! ও কি! হী হাঁ, মা! ও কি 
করিতেছ! স্থির হও , স্থির হও, এমন মহাপাপজনক দুঃসাহস করিতে নাই। 
হস্ত ধারগ)। 


২৪২, 


সপত্বী নাটক 
মাহেশ্খরী (একত্র, দস্ত কিড়িমিড়ি পর্বক গালে 
রাসবিলাসিনী। ঠোনা মারিয়া আক্রোশে)। 
মুয়্ে আগুন, আঁটকুড়ীর ঝী, ভাই খাগী, আ মরণ্‌। কৈ? মন্তে পালি না? 
সোগ্‌ কচ্চিস্‌ বুঝি? মর্ব্যি তো এমন গুষ্ঠী শুদ্ধ বাঁধ্য়্যে মরিস্‌ কেন? মন্তে 
জানিস্‌ না? অমনি অমনি কি মত্তে পারিস নাঃ মরবার কি আর ওষুধ পাস্‌ 
না। 
মোহিনী। (মৃদুন্বরে রোদন করিতে করিতে সকরুণ)। ওগো! তোমরা আর কেন 
আমাকে যন্ত্রণা দেও! আমি আর সৈতে পারি নে। 

(শশুর ও দেবরকে সম্বোধন করিয়া কাকুম্বরে) 

ওগো! আমাকে ছেড়ে দেও, আমি এ প্রাণ আর রাখবো না!। আকর্ষণ)। 
রাসবিলাসিনী। (আক্রোশে)। আঃ! মর্! মরণ্‌! হিংসায় মল্যেন আর কি?। 
মোহিনী। (কীদিতে কীদিতে কাকুস্বরে)। ও গো! তুমি আর এখনও আমাকে 
বক! এখনও তোমাকে একবার ভাল কর্যে দেখতে ইচ্ছা হয় কেন!। 
ডেচ্চৈঃস্বরে রোদন) 
সুন্দর (একক্রে, উহাদিগকে যথোচিত তিরস্কার 
ভূবনেশ্বর। করিতে করিতে তাড়াইয়া দিয়া) 
চল মা! চল, চল চল, ঘরে চল, ছিঃ মা! অমন কি কাদতে আছে, তুমি 
বুদ্ধিমতী কুলবধু, এখানে লোকারণ্য নেই, আর এ স্থলে থাকিতে আছে? 
কলঙ্ক হইবে, চল চল, চল, চল, শীঘ্র চল, ঘরে যাই। (আকর্ষণ)। 
মোহিনী। (উচ্চৈঃম্বরে রোদন করিতে করিতে)। ওগো! তোমরা আর কেন 
আমাকে দুঃখ দেও!, আমি কোথা গিয়্যে কেমন কর্যে আর এ মুখ দেখাব! 
ডিচ্চৈংস্বরে রোদন) 
সূর্ধ্যকাত্ত। (তোহাদিগের সরিহিত হইয়া, সবিস্ময়ে)। কি£ কি? কি এ মহাশয়! 
ব্যাপারটা কি?। 
ভুবনেশ্বর। (বিমর্ষ ও সলঙজ্জভাবে)। কেন আর মুখ পোড়ান মহাশয়! মাথা মুণ্ড 
কি বলিব! পিতৃ দোষ বাল্য বিবাহের ফল-_অবঘাত। 
সূর্য্যকান্ত। (কান পাতিয়া)। কি? কি বল্লে গা? কিছুইতো বুজ্দে পাল্লোম না। 
ভূবনেশ্বর। আর কি বলিব মহাশয়! বলিতে রোদন আইসে, বুক ফাটিয়া 
যায়। পিতা, আমার জ্যেক্টের অতি বাল্যকালে বিবাহ দিয়াছিলেন। পরে 
উপযুক্ত বয়গক্রম সময়ে সে বধূটী দাদার নিতাত্ত অমনোনীতা হইল! এবং 
সেইটিতেই নিতাস্ত রত হইলেন। ইনিই দাদার সেই অভাগিনী প্রথমা স্ত্ী। 
দুঃসহ সতিনী যন্ত্রণা সহ্য করিতে না পারিয়া এবং পতির চির বিরহে একাস্ত 
অধীরা ও সংজ্ঞা শূন্যা হইয়া এই নৃশংস ব্যাপারে আসিয়াছিলেন। তাই 
বলিলাম পিতৃ দোষ বাল্য বিবাহের ফল-_অবঘাত। 


২৯৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সবর্বসুন্দর। (সম্তানের মুখচুম্বন করিয়া)। বাছা! আর কেন মুখ পোড়াও বল, 
আমি কি করিব; পোড়া দেশাচারই সবর্বনাশের মুলীভূত হইয়াছে। 
আমি নিশ্চিত জানি বটে “বাল্য বিবাহ অত্যন্ত ভয়াবহ। বাপু! এই নিমিত্তই 
ভগবান্‌ মনু স্বয়ং লিখিয়াছেন-_ 
“ত্রিংশদ্বর্ষো বহেৎ কন্যাং, হৃদ্যাং দ্বাদশ বার্ধিকীম। য্যষ্টবর্ষো হস্টবর্ষাং বা, ধর্মে 
সীদতি সত্বরঃ।1” 
বাপু! আমরা ব্রাহ্মণ পণ্ডিত লোক, বিলক্ষণ অবগত হইয়াছি এই বচনে হাদ্যা 
শব্দের পরমার্থ এই যে বর আপনি কন্যা মনোনীতা করিয়া বিবাহ করিবে। 
বর ত্রিশ বৎসর বয়সে ছ্বাদশবর্ষ বয়স্কা হৃদ্যা কন্যা বিবাহ করিবে, অথবা 
চবিবশ বংসর বয়ঃক্রম কালে অষ্ট বর্ষ বয়স্কা হৃদ্যা কন্যা বিবাহ করিবে। এই 
কাল নিয়ম অতিক্রম করিয়া চলিলে ধর্মন্রংশ হয়। আর, বাপু! তোমরা যে 
সব কথ বল, সে সমস্তই আমার বিলক্ষণ মনে লাগে। অমনোনীতা বনিতাতে 
সন্তান সম্ততির উৎপাদন কদাচ হয় না। আমাদের ধর্মশান্ত্র কর্তারা এ কথাটা 
স্পষ্ট লিখিয়া গিয়াছেন। 

“যদি হি স্ত্রী ন রোচেত, পুমাংসং ন প্রমোদয়েৎ। অপ্রমোদাৎ পুনঃ 

পুংসঃ, প্রজনং নৈব যায়তে।। মনুঃ 
্ত্রী পুরুষের মধ্যে পরস্পর অপ্রণয় থাকিলে বংশবৃদ্ধি হয় না। অতএব বাছা! 
আর কেন মুখ পোড়াও। 
আহা। এই দুঃসময়ে রাজা রামমোহন রায়কে স্মরণ হইল। হা! রাজা 
মহোদয়! ভারতবর্ষের দুর্ভাগ্যবশতই কি তুমি অকালে মানবী লীলা সম্বরণ 
করিয়াছ?। হিন্দু ধন্মশীস্ত্রের যথার্থ মন্ম তুমিই পরিগ্রহ করিয়াছিলে। 
হা! বাছা ভুবনেশ্বর! তুমি আমাকে কি তিরস্কার কর£ তোমার মাই এই 
সবর্বনাশের মূল। 
ভুবনেশ্বর। তা বৈ কি মহাশয়! পিতা মাতাই তো অনর্থের হেতু। 
হায়! কি অদ্ভুদ কাল পড়িয়াছে! বলিতে হৃদয় বিদীর্ণ হয়;_শোক সিন্ধু 
উচ্ছলিত হইয়া উঠে!। অরে দুরাচার দেশাচার! তুই দীর্ঘায়ুঃ হইয়াই স্বর্ণময়ী 
ভারত ভূমিকে এককালে ছারখার করিলি!। তোর কি আর বিনাশ নাই রে!। 
তোর প্রতাপে পৃথিবী এককালে পাপে পরিপূর্ণ হইল!। হারে! তুই কি 
ভারতবর্কে পরিত্যাগ করিবি না?ঃ। তোর প্রতাপে অধন্মহি ধর্ম হইয়া 
উঠিয়াছে_অপকন্মইি কর্তব্য কর্ম বলিয়া সমাদরণীয়। তুইই শাস্ত্রকে 
অশান্ত্র ধার্মিককে অধার্িক, পণ্যকে পাপ, সুমনুষ্কে কুমনুষ্য 
করিতেছিস্‌। 


২৯৪ 


সপত্রী নাটক 
হা প্রিয় স্বয়ন্বর! দুঃসময় দেখিয়া তুমিও কি আমাদের প্রতি এককালে স্নেহ 
সম্বরণ করিলে? দয়াশূন্য হইলে?ঃ। আর কি তুমি এ পাপিষ্ঠ ভারতভূমির 
মুখাবলোকন করিবে না?। 
||পদ্য।। 


হারে দুষ্ট দেশাচার!, করিলি রে ছারখার, 
তবু তোর না হয় সম্তোষ। 
ক্রমে তোর বাড়িতেছে রোষ।। 
সর্বশান্ত্রে এই পাই, ছেল্যে মেয়্যে ভেদ নাই, 
তোর মতে বিস্তর প্রভেদ। 
সম্তানেরা পড়ে লেখে এ তিন ভূবন দেখে, 
দুহিতারা মনে পায় খেদ।। 
এ দেশের শুভকর, ছিল এক স্বয়ন্বর, 
পলাইল ক্রমে তোর ত্রাসে। 
যদি সে আসিতে চায়, তোর ভয়ে আসা দায়, 
তেড়্যে দিস্‌ তাহাকে উল্লাসে।। 
বাল্যকালে দিস্‌ বিয়া, পরস্পর ভিন্ন হিয়া, 
বর কন্যা মিলন না হয়। 
তাহাতেই বংশ নাশ, ধন নাশ ধর্ম নাশ, 
সর্বনাশ শোকের উদয়।। 
পুরুষেরা যত চায়, বিবাহ করিতে পায়, 
নারীর কপালে গগ্ডগোল। 
আর নাহি পায় পতি কোল।। 
এ তোর কেমন কর্ম্মন না বাছিস্‌ ধর্ম, 
মন্্ম ভেদ ধর্ম ভেদ কারি!। 
কে বুঝিবে এ চাতুরী, ধর্ম পথ করি চুরী, 
নিজে হোস্‌ অধন্মের দ্বারী। | 
শান্ত্র সব মিথ্যা হয়, ধন ধর্ম্ম ধতি ক্ষয়, 
সুনর দুর্নর তোর কাছে। 
হেন গুণ শত শত আছে।। 


২৯৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


পাতিয়া বঞ্চনা ফাস, করিলি রে সবর্বনাশ, 
নহিলে কি হয় হেন দশা। 
আহা তোর কি কৌতুক, তুচ্ছ হলি সারী শুক, 
পাখীর প্রধান হৈল মশা।। 
ভেবে মনে পাই ব্যথা, সোনা, হৈল শোনা কথা, 
রাঙ্গের বাড়িল রঙ্গরস। 
তাই ওরে তোরে বলি, যারে অন্য দেশে চলি, 
ভাল বলি গাই তোর যশঃ।। 
সূর্যকা্ত। (কিঞ্চিৎ উর্ষাযুক্ত হইয়া, সব্ববসুন্দরকে সম্বোধন পুরবর্কক)। মহাশয়! এটী 
কে£ আপনকার কনিষ্ঠ সম্ভান বুঝি?। 
সর্ব্সুন্দর। (প্রসন্ন বদনে)। হাঁ! মহাশয়! এখন আমার নয়, দশজনের, রাখিয়া 
মরিতে পারিলেই আমার। 
সূর্ধ্যকান্ত। (রাগভাবে)। এটী কেলিজে পড়ে বটে?। 
সব্বসুন্দর। হী! মহাশয়! সকলি দশজনের আশীব্বাদ। 
সূর্ধ্কাস্ত। মুখভঙ্গিমা করিয়া)। হাঁ, হা, বোঝা গিয়াছে, যাও; আর বলিতে হবে 
না। 
সবর্সুন্দর। (ত্রস্ত হইয়া)। কেন মহাশয়? বড় যে বিরক্ত হইলেনছ। 
সূর্ধ্যকাত্ত। বিরক্ত হই নাই, দুঃখিত হইলাম। 
সর্বসুন্দর। কেন? কেন? দুঃখিত হইবার কারণ কি?। 
সূর্য্কাত্ত। (দত্তে)। বল কি গো! "দুঃখিত হইব না? তোমাদের গ্রামে নাকি 
কোম্পানি থেকে একটা কেলিজ বসিয়াছে?। 
হইয়াছি, ছেল্যে পেল্যেগুলো মানুষ হইবার আশা হইয়াছি। 
সূর্য্যকান্ত। (মুখ বাঁকা করিয়া)। হাঃ! বিলক্ষণ!। এত বড় ভবিব সবি্বি নোক 
হইয়া আপনিও যে গভ্যের ছাদ্দে গিয়াছেন?। এর চেয়্যে গ্রামে মদের 
দোকান, গুলীর আড্ডা, কস্বীর ঘর বরং ভাল ছিল। আপনকার টোল ছিল 
লয়?। হেঃ!- ছেলেটিকেও এই যে বিলক্ষণ খিষ্টেন করিয়া তুলিয়াছেন। 
যান্‌ যান, এখন বৌমাকে নিয়্যে ঘরে যান। এত উতলা হইবেন না, ঘর 
করিতে গেলেই এমন কিঃ এরে চেয়েও বাড়া হইয়া থাকে, সব সৈতে হয়। 
তা বলিয়া কি ধম্ম কম্ম নোপ কন্ত্ে চান?। ও সব তো খিষ্টেনের কথা, 
শুনিলে রাগ জন্মে। ব্যালাটা অধিক হইয়াছে, অনেকক্ষণ হইল আসিয়াছি। 
আমিও বাড়ী চলিলাম। 
ৃ (সকলের প্রস্থান) 
সূর্ধ্যকাক্ত। (পথে যাইতে যাইতে, স্বগত)। 


২৯৩৬ 


_ সপত্রী নাটক 


পদ্য। 


একি দেখি ঘোর কলি, ভাল মন্দ কারে বলি, 
সকলি হইল একারার। 
দেশে যত ছিল টোল, তারাও মানিল গোল, 
ধম্ম কম্ম হৈল ছারখার।। 
যাহা যার মনে ভায়, বাধা আর নাহি তায়, 
১০8৮0-87নিি 
নাহি আর বলাবলী, উঠ্যে গেল | 
চলাচলী সকলের সনে।। 
হইল রাঁড়ের বিয়া, শুন্যে, রাগে জ্বলে হিয়া 
আর বা দেখিতে হয় কত। 
দেখ্যে শুন্ে হই বুদ্ধি হত।। 
যে দিকেতে করি দৃষ্টি, দেখি কেলিজের সৃষ্টি, 
ধরা বুঝি একাকার হবে। 
বুঝি ভাবে, শাস্ত্রের সম্মান যাবে, 
৯ নজীন পু 
ছিল যত সুরালয়, হৈল সব সুরালয়, 
গোহত্যেতে নাহি গণুগোল। 
বাবুগিরী ধুমধাম, খোষনাম বদকাম, 
বাজিয়াছে বজ্জাতীর খোল।। 
যে ছিল সমাজ সব, তারা সব হত রব, 
কেলিজের দেখিয়া কৌশল। 
বালী বাকসা হত জ্ঞান, নবদ্বীপ শ্রিয়মান, 
নাই কৃষ্ণ নগরের বল।। 
যারা সব বড় নোক, তারা সব বড় নোক, 
ধন্ম নোপ হইতেছে তাই। 
দেখ্যে এই টেনাপৌঁদা, ঠোট ফাটা পা গোদা, 
র সমাদর নাই।। 
তাই হৈল ধম্ম নোপ, ছুটিল ছটার তোপ, 
ফিট ফাট হৈল বঙ্গদেশ। 
ছিরে সমাজ রাজা লা বানি 
নাহি আর সক্কোচের নেশ।। 


২৯৭ 


দুশ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ভেব্যে হয় ছাতি ভেদ, না রহিল জাতি ভেদ, 


হুকা ন্যয়ে নুকাচুরী খেলা। 
ভাত হয় আত গত, সবে এক প্রেমে রত, 


যত সব সাহেবের চেলা।। 
হায় হায় কব কায়, দেখ্যে ছাতি ফেট্যে যায়, 


যায় যায় যায় হিদুয়ানি। 


এই বেলা খধিখিষ্ট মানি।। 


ন্দর। €পথে যাইতে যাইতে, স্বগত)। 
পদ্য। 
কি দুরস্ত কলিকাল বলি কাবু কাছে। 
ফুটিল ঘেঁটুর ফুল গোলাবের গাছে।। 
বেদ স্মৃতি পুরাণেতে মিশায়েছে মলা। 
পাপিন্ঠ কলির চেলা নিতে রঘো, বলা।। 
স্মার্ত লয়ে আর্তনাদ করি হায় হায়। 
কে কহিল হেন বিধি লিখিতে তাহায় £।। 
অবিধি রীড়ের বিয়ে কোথা পেল্যে সেটা?। 
স্বয়ন্বর নিষিদ্ধ বলিল তারে কেটা£।। 
কোন্‌ শান্দ্রে লেখে ইহা দেখিতে না পাই।। 
তবে কেন করিল, সে হেন গণুডগোল। 
কে বলিল বাজাইতে বজ্জাতীর ঢোল 211 
তাইতে এখন এই ঠেকিতেছি দায়। 
পদে পদে ধন মান আর ধর্ম্ম বায়।। 
নবদ্ীপে সচী পিশী, তাহার সম্ভান। 
রিরি রিরি করি এক তুলিয়াছে তান।। 
বেদে নাই ভেদে নাই হেদে ওরা কেটা?। 
এ পর্যযস্ত জানিতে না পারিলাম সেটা ।। 
ওদিকেতে বাঙ্গাল বল্লাল মহাশয়। 
তানা নানা নানা নান। তুলিলেন লয়।। 


২৯৮ 


সপত্বী নাটক 
সে লয় সামান্য নয় প্রলয়ের লয়। 


তাহাতেই হইয়াছে এ মহা প্রলয়।। 
কুলীন প্রবাহে ধরা হইল কুলীন। 
ম্যাও ম্যাও বাজিতেছে নষ্টামীর বীণ।। 
মাঝে মাঝে তাল দেন দেবীবর ভায়া। 
সে তাল বেতাল যেন বেতালের মায়া।। 
দূর হোক সে সব কথায় নাহি কায। 
সব জ্বালা ঘুচাইবে এবার ইংরাজ।। 
শিশু ফাদ ইহাদের যীশু ফাদ যেটা। 
সকলের সব ফন্দী ঘুচাইবে সেটা ।| 
দিন কত কর গত হবে একাকার। 
কলিকাতা চেয়্যে দেখ নমুনা তাহার ।। 
সাহেব বাঙালী আর নাহি যায় চেনা। 
উইলসনী খানা আনি বল খান কে না?।। 
গোটা কত মোটা মোটা বড় লোক আছে। 
ধন্মাধন্্ম সুবিচার তাহাদের কাছে।। 
বাজে নাই কাষে নাই লাজে নাই দিক।। 
কোথা গেলে মহারাজ শ্রীরাম মোহন। 
তোমার ভারতভূমি হৈল কাটা বন।। 
কি কর গো রাধাকাস্ত রাজা মহামতি। 
মনোযোগ কর দেশে হইল দুর্গতি।। 
কেট্যে ছিড়্যে হিন্দু ধর্্ম কর পরিক্কার। 
গোলযোগে কষ্ট ভোগে বাঁচি না যে আর।। 
তবে কেন এ হেন হইল বঙ্গভূমি।। 
বারো জনে গোল করি তোমারে হারায়। 
দেখিলে তোমার দশা প্রাণ ফেটে যায়।। 
কবে তুমি পুনবর্বার হইবে নির্ম্মল। 
কত দিনে প্রচল হইবে তব বল।। 
উঠিয়াছে যে দেখি বিবম গোলযোগ । 


২৪৪১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


এ রোগ সুরোগ নয় সাংঘাতিক রোগ।। 
কবি কয় মিথ্যা নয় এইরূপ বটে। 
যে কাল পড়েছে দেখ কি বিপত্তি ঘটে।। 

(জয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্তঃপুর) 

(হরিপ্রিয়া ও হরমণির প্রবেশ) ৫১) 
হর্র। (কর্ণপাত করিয়া আস্তে আন্তে)। ও মা! এঁ বুঝি পাড়াগাবনী পোড়ারমুখী 
পদী আশ্চে গো! আ মরণ! কি পোড়া! মর্!_ওর আর খেয়ে দেয়্যে কোন 
কম্ম নেই? কেবল হুজুক নিয়েই আছে। 
হরপ্রিয়া। (সবিস্ময়ে)। কৈ? কি পদী? দেখ্যো, ও যেন আবার ওখানে যায় না; 
খপৃ্পরা একে তো নেচে রয়্যেছেন। (সৌদামিনীর প্রতি মুখভঙ্গী)। 

(পদ্মমুখীর প্রবেশ) (২) 
পদ্। কোথা রে হর! কৈ? বৌ কোথা লো! তোরা সব কি কচ্ছিস্‌! আহা" 
শুনেছিস লা! জ্যেঠাই কোথা গো! 
হরিপ্রিয়া। (ব্যস্তভাবে)। থাক্‌ মা! থাক্‌; ও সকল কথা আর আমার বাড়িতে 
আনিস না মা! একে মন্সা নিয়ে ঘর, তায় আবার ধুনোর গন্ধ পেল্যে কি 
আর রক্ষা থাক্বে?। 
হর। (ব্যগ্রভাবে চুপু চুপু)। হেলা পদ্ম দিদি! ও ভাই! গড়া ভাই! শুন্যে অব্দি 
আমার বুকটা যেন গুর্‌ গুর্‌ কর্যে উঠ্তেছে, মেয়্যের কি বুকের পাটা বোন! 
সবর্বনাশী কেমন কর্যে গলায় দড়ী দিলে গা!। আমি হল্যে এমন সাঙ্গাতকে 
অম্নি আসবঠী দিয়ে দুখানা কতুম, আর কি দেখতুম?। 
(ভূধরের প্রবেশ) 

ভূধর। আক্রোশে)। মা! তোমাদের ও সব কি হইতেছে গো! হর বুঝি কিছু 
জানে না? পদ্ম! তোর কি আর গপপ্‌ করিবার জায়গা নাই? আর বুঝি কিছু 
কথা পাও না? 

জেয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবেশ) 
জয়শঙ্কর। (সকলকে সন্বোধন করিয়া, বিরাগে)। তোমরা সব চুপ করনা গা।__ 
চুপ কর, ও সকল কথায় তোমাদের কায কি, বল দেখি?। 

(অস্তঃপুরে গলায় দড়ীর কথা চুপ চাপ, সকলের প্রস্থান) 
পন্্মুখ্ধী। তেথা হইতে প্রস্থান করিতে করিতে, মনে মনে)। 
অভিপ্রায়। 
পদ্য। 

€১) ভূধরের মাতা ও ভগিনী 
€২) প্রতিবেশিনী ব্রাহ্ষ্মণ কন্যা, বাল্যরণা 


সপতী নাটক 


পোড়া দেশ বাঙ্গালার মুখে দেই নুড়ো। 
বেছ্যে বেছ্যে গড়িয়াছে চতুম্মু্খ বুড়ো।। 
আর যত দেশ আছে পৃথিবীর মাজে। 
ব্রহ্মার সুখ্যাতি করা সেই খানে সাজে।। 
যে শুনি সবার মুখে সে দেশের€১) কথা। 
সে দেশ পড়িলে মনে, মনে পাই ব্যাথা।। 
বিশেষতঃ ছেল্যেরা যখন পড়ে বই। 
কিছুই লাগে না ভাল শুধু তাহা বই।। 
আহা মরি কেমন সুন্দর সব কথা। 
শুনিলে অন্তরে যায় অন্তরের ব্যথা ।। 
মেয়্যে নাই, মন্দ নাই সবাই সমান। 
সবাই সমান সুখী সম ধন মান।। 
পিপ্জরে থাকে না বদ্ধ গৃহস্থের নারী। 
কি সুখে কাটায় কাল আহা মরি মরি।। 
বিবাহের কেমন সুন্দর সুনিয়ম। 
শুনিলে সম্তোষ জন্মে দূরে যায় ভ্রম।। 
কেমন গল্ভতীর ভাব অস্তরের ভার।। 
কেমন সুন্দর সব কাস্তিময় দেহ। 
না হয় সন্দেহ তথা না হয় সন্দেহ।। 
কেমন সুন্দর নর নারীর প্রণয়। 
না হয় সংশয় তথা না হয় সংশয়।। 
কেমন সুন্দর সত্য বিরাজিত তথা। 
না হয়, অন্যথা তথা না হয় অন্যথা।। 
কেমন সুন্দর নর নারী অসংকোচ। 
না হয় সংকোচ তথা না হয় সংকোচ।। 
সেদেশের লোক সব সরল সুজন। 
এদেশের লোক সব নিষ্কুর দুর্জনি।। 
সেদেশে অসুখ নাই সবরবদাই সুখ। 
এদেশেতে সুখ নাই সবরবদা অসুখ।। 
সেদেশেতে লেখাপড়া গুরুমন্ত্র জপ। 
এদেশেতে পরহিংসা তপস্বির তপঃ।। 


(১) ইংলগ প্রভৃতি। 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
সেদেশেতে সসম্ভোষ সবর্বদাই লোক । 
এদেশের লোকের যেন সদা পুত্র শোক।। 
পরন্বেষ পর হিংসা পর প্রতারণা। 
_. পরদার চৌর্য্য শাঠ্য কেবল যন্ত্রণা।। 
এ দেশেতে যত দেখি নাহি কোন দেশে। 
এতে কি মনের সুখ হয় পোড়া দেশে ।। 
অসুখ এদেশে দেখি প্রধান সম্পদ্‌। 
আত্মহত্যা এ দেশেতে যেন মুক্তি পদ।। 
ভাতারের মুখ যেন আকাশের ফুল। 
আর গর্তে এ দেশেতে মান্য করে কুল।। 
স্বামির সঙ্গেতে যেন শক্র ব্যবহার। 
কদাচার এই দেশে সত্য সদাচার।। 
মহাপাপ এ দেশেতে মহাপুণ্য গণি। 
জড় কিন্বা জন্ত সম এ দেশের ধনী।। 
এ দেশের পুরুষ যেন এ দেশের মেয়্যে। 
এ দেশের মেয়ে বরং ভাল তার চেয়্যে।। 
দিবানিশি বহিতেছে অসুখের ঝড়। 
দেখ্যে শুন্যে সদা ভাবি ভয়ে হই জ্ড়।। 
আর নাহি সয় দেহে নাহি রয় প্রাণ। 
জন্মিয়া যে জন মরে সেই পুণ্যবান্।। 
হায় বিশ্বনাথ! তুমি এমন নিষ্ঠুর । 
তোমার অস্তরে নাহি দয়ার অঙ্কুর ।। 
তোমার আকার বিশ্ব তুমি বিশ্বময়। 
তোমার এ পক্ষপাত উচিত তো নয়।। 
প্রকৃতির সঙ্গে তুমি পরামর্শ করি। 
অবশেষে করিয়াছ এই কারিগরি ।। 
তোমার প্রকৃতি যিনি ভাল জানি তারে। 
প্রধান কুহকী তিনি কে চিনিতে পারে ।। 
করিয়াছ এই কাণ্ড তার সঙ্গে যুট্যে।। 
সাধে কি তোমারে বলি দুরস্তের সুট্যে।। 
কবি কয় কুল কন্যে! কেন নিন্দা গাও । 
হবিষ্য ছাড়িয়া বুঝি খানা খেত্যে চাও 21! 


€্বিতীয় অক্ক সমাপ্ত) 


৩০২ 


সপত্বী নাটক 


তৃতীয় অক্ক 


(জয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্ত ঃপুর) 
(সৌদামিনীর প্রকোষ্ঠ) 

(কাদন্থিনী, নিতম্বিনী ও চঞ্চলার প্রবেশ) 
চঞ্চলা। (সৌদামিনীকে সম্বোধন করিয়া হাস্যবদনে)। কি লো বড় বৌ! কি 
কচ্চিস্? কই লো, বড় যে তোর গাটা কালো দেখছি,__হলুদ্‌ মাখিস্‌ নি?। 
নিতম্িনী। (কাদঘ্বিনীকে সম্বোধন করিয়া, জিব কাটিয়া, বিস্ময়ে)। ও দিদি ও মা! 
চলী কল্পলযে কি মা! কালো বল্প্যে কি গো! চেঞ্চলাকে সম্বোধন করিয়া) ও লো! 
ও যে তোর ভাতারের নামে আসে লো! তোকে যে নালো বলতে হয়!। 
চঞ্চলা। (বিরাগে)। যা ভাই! তোর এ বড় দোষ, কথায় কথায় ছল ধরিস্*+_ 
ঈস্‌্! কুলীনের ঘরে আবার ভাতারের নাম ধত্তে নেই£ঃ মরুক্‌ গ্যে, কি 
আমার পর কালের ভাতার রে! মল্যে সাক্ষী দেবে,_-সে ব্যে ভুল্যে গেছি 
যা!। 
নিতশ্থিনী। (সৌদামিনীকে সম্বোধন করিয়া)। ও বড় বৌ! বড় যে ঘটা দেখছি 
লো! বাজনা হলো, বমের গাছ হবে, আবার শুনতে পাচ্ছি নাকি ইঙ্গরিজী 
বাজনা আস্বে! ভূধর দাদার এ ব্যের যে বড় ঘটা শুঞ্চি লো! হর দিদী তো 
অধ্যিকী ভালো দেখছি! তোর ব্যেতে ভাই! অন্যে কি আমরাও জান্তে পারি 
নেই! “বেরাল দেখে নি ভাত, কুকুর দেখে নেই পাত।” 
কাদশ্িনী। দেঃখিনী ভাবে)। দুরু হোক্‌ বোন! ও কথায় আর কথা কইতে ইচ্ছে 
হয় না!___“কারো সাগে বালী, কারো দুধে চিনী” দেখ্যে বড় দুঃখু হয়! তোরা 
কি জান্বি বল্‌ ভাই? যার আঁতে ঘা, সেই জান্তে পেরেচে!। ঘটা হবে না 
কেন বল বোন? এ ব্যে ভূধর দাদার হাতে কলমের ব্যে, এতো পৈত্রিক ব্যে 
নয়? যে যা হোক্‌ কর্যে সার্ব্যে, চুপ্‌ কর্যে থাকতে হবে। 


৩০৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সৌদামিনী। €চক্ষের জলে বক্ষঃ ভাসাইতে ভাসাইতে, বাম পায়ের বৃদ্ধ দ্বারা ভূমি 
খুঁড়িতেই, অধোবদনে, মনে মনে)। হা! যাহা ভাবিয়াছিলাম, হতভাগিনীর পোড়া 
কপালে কি তাহাই ঘটিল! এখন কি করি! এই প্রতিবাসিনীরা কুলীন কন্যা, 
জন্মে কখন স্বামির মুখ দেখিতেও পায় না, উহারাও আমাকে উপহাস 
করিতেছে_না করিবেই বা কেন? আমি উহাদের কাছে ভাতার ভাতার 
করিয়া ভাতারের বড় অহংকার করিতাম! হা! এখন যে মুখ তুলিয়া কথা 
কহিতে পারি না। 
হা নিষ্ঠুর পতি! তোমার কি এই ধর্ম কর্ম বিশ্বাসঘাত করিলে!। 
হা ভারতবর্ষের ধর্ম! তোমার বিচিত্র কর্ম্ম কিছুই বুঝিতে পারি না। পুরুষ 
জাতি যত ইচ্ছা বিবাহ.করিতে পারে? নারীদিগের বেলাই মহাপাপ। (€ক্ষণকাল 
চিন্তা) হা! তাহা হইলেই বা কি হইত! যদিই সে বিধান চলিত থাকিত, তথাপি 
কি এ মর্মান্তিক দুঃখ দূর হইত? একটা কুকুর বিড়াল পুষিয়া যদি তাকে 
ভালবাসা যায়, সেটী হাত ছাটা হইলে সে দুঃখ এত হয় যে আর প্রাণ 
থাকিতে অন্য কুকুর বিড়াল পুবিতে ইচ্ছা হয় না! সে দুঃখই যখন এত 
মন্মানস্তিক দুঃখ হয়! তখন এ দুঙ্ঠখের কথা কি কহিব!। (স্বামিকে লক্ষ) হা! 
নিষ্টুর! লোকে দুটো বিবাহ করে বটে, কিন্তু এত ঘটা করে না, গোপনে 
গোপনে সারিয়া থাকে, আর প্রথম পক্ষের স্ত্রীর সহিত হঠাৎ ব্যবহার 
পরিত্যাগও করে না, দুই দিক্‌ রক্ষা করিবার চেষ্টা করে। হয় তো ক্রমে 
ক্রমে তাহা করিয়া লইতেও পারে। ক্ষেণকাল চিন্তা) হা নিষ্ঠুর! তোমার মনে 
কি এই ছিল? তুমি যে আমাকে এত মন্দ বাসিবে! এমন করিবে! একবার 
দেখাও দিবে না! আমি স্বপ্নেও জানিতাম না। হা। এখনও কি আমি তোমাকে 
.পাসরিতে পারিঃ আমি বড় পোড়া কপালী! না হইলে আমার কেন এই 
দুর্দশা হইবে-_! অমৃতে গরল উঠিল রে নির্দয়!!! 

অভিপ্রায়। 


পদ্য। 
বিধি, বিশেষ যতনে ।২। 


সৃজিলেন যত রত্ব এই ব্রিভুবনে।। 
ভাবি, পাত্রাপাত্র মনে ।২। 
দিলেন সে সব রত্বু এক এক জনে।। 
শুনি, পুরাণ প্রমাণ।২। 
গজ রত্ন পুরন্দরে করিলেন দান।। 
নাম, এরাবত তার।২। 
৩০৪ 


সপত্বী নাটক 
তরু রত্ব পারিজাত দিয়াছেন আর।। 
উচ্চ, _ শ্রবা নাম যার।২। 
এই অশ্ব রত্ব, রত্বু হইল তাহার।। 
হংস, যোজিত বিমান।২। 
এ রত্ব ব্রন্মারে বিধি করিলেন দান।। 
মহা,_ পদ্ম নামে নিধি।২। 
এই রত্ব ধনেশ্বরে দিয়াছেন বিধি।। 
বিধি, দয়ার সাগর ।২। 
কিঞ্জক্ষিনী মাল্য রত্ব পাইল সাগর।। 
দয়া, উপজিল তীয়।২। 
সেইরূপ পতি রত্ব দিলেন আমায়।: 
শোকে,বুক ফেটে যায়।২। 
তবে কেন এ দুর্দশা হৈল হায় হায়।। 
মনে, ভাবিতাম আমি।২। 
হইলাম শচী সম, ইন্দ্র সম স্বামী।। 
আজি, কি দশা আমার ।২। 
হৃদয় বহিয়া পড়ে বাম্প বিষ ধার।। 
মুখ তুলিব কেমনে ।২। | 
অভাগী আমার তুল্য নাহি ব্রিভূবনে।। 
যদি, জানিতাম হেন।২। 
যতনে পরাণ তবে সঁপিতাম কেন।। 
সঁপি, পাষণ্ডে জীবন।২। 
লাভ মাত্র হৈল শুধু অদন রোদন।। 
জীব, যত কাল আর।২। 
হইয়া রহিনু শুধু শোকের আধার ।। 
মুখে হাহাকার ধ্বনি ।২। 
শুনিয়া হাঁসিবে সব ভাগ্যবতী ধনী।। 
সাধছিল যত মনে ।২। 
একত্র হইল আসি বিষাদের সনে।। 
জবালা,সতিনীর যত ।২। 
ভুগি নাই তবু হই ভেব্যে জ্ঞান হত।। 
তাহা ভুগিব যখন। ২. 


প্রতিটি খণ্ডপঙ্ক্তি ২ বার উচ্চারিত হবে 


৩০৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ভাবিয়া না পাই জ্বালা হইবে কেমন।। 
আছে, দুষ্ট লোক যত। ২। 
পাইয়া অনাথা ছল করিবেগ কত।। 
কিসে,বাচিব সে দায়। ২। 
ভাবিয়া সে সব আগে ভাগে প্রাণ যায়।। 
পতি, এমন নিষ্ঠুর। ২। 
একবার ভাবিল না অধর্্ম অন্কুর।। 
করে, হোই হোই লোকে ।২। 
কত আর সই বল সারা হই শোকে।। 
কবি, করে হায় হায়।২। 
সতীত্ব রাখিয়া চলা বড় ঘোর দায়।। 
নিতশ্থিনী। (কাদপ্ধিনীকে সম্বোধন করিয়া)। চ ভাই! আমরা সব ঘরে যাই, আজ 
কম্ম ঘর, বড় বউয়ের ভাতারের ব্যে, দুটো আমোদ আহাদ কর্‌বো, রাত্তিরে 
জল সৈতে যাব, কুটুম্ব সাক্ষাত কত নোকের সঙ্গে কত আমোদ হবে, তাই 
বুঝি বড় বৌ আজ কথা কয়্‌না, কাষ্‌কি বোন!__-“মান্‌ বা নেই মান, তোর 
বাড়ীতে মেজ মান্?” তা কি ভাল নাগে?। 
(ক্ষেমন্করীর প্রবেশ) (১) 
ক্ষেমা। (অন্তর্বাষ্প নয়নে গদগদ কণ্ঠে, কাদম্বিনী, নিতম্বিনা' ও চঞ্চলাকে সম্বোধন 
করিয়া)। তোমরা এসেছ মা! বেশ করেছ; তাই ভাবতে ছিনু-_-বলি আবার 
ডাকৃতে যাব নাকি; দিদী ঠাকুরুণ, মা, ঠাকুরুণ, তোমাদের খুজদে ছেলেন। 
ব্যালা হয়্যে গেল, এখনও কিছু উজ্জুগ সুজ্জুগ হলো নি; এখনি আবার বার 
ব্যালা পড়বে, যাও না মা! এই ব্যালা কামান পাতনা গ্যে, সব উজ্জ্গ সুজ্ছুগ 
করে সকাল সকাল সেরে নেও গ্যে; তোমাদের দাদার ব্যে, তোমরা কর্বে 
না তো কে করব্যে বল। 
চঞ্চলা। না মা! আমরা ঘরে যাই; যার বাড়িতে কনম্ম, সেই যার আমাদের 
সঙ্গে কথা কয় না; আর কি থাকতে আছে৷ 
নিতশ্বিনী। বটে তো গা! আমরা কি অমনি এয়েছি, না, কখনো হলুদ মীখিনি? 
ক্ষেমা। না মা! অমন কথা বলো না; তোমরা সব বুজ্দার মেয়ে; বুজদে পার 
নাকি মা! --ও কি আজ আছে যে তোমাদের সঙ্গে আমোদ করবে? --ও 
মর্যে রয়েছে। যাও মা! যাও; তোমরা সব আমোদ আল্লাদ কর গ্যেঃ ওকে 
আজ আর কিছু বল্যে কাষ্‌ নি। 
(সকলকে সঙ্গে লইয়া এয়োকামানে গমন) 


€১) সৌদামিনীর পিতৃকুল হইতে আগতা দাসী। ক্ষেমার আর কেউ নাই, ক্ষেমাই সৌদামিনীকে মানুষ 
করিয়াছে। কন্যা বাৎসল্য করে। সৌদামিনী ক্ষেমাকে মা বলেন। 


৩০৬ 


| সপত্বী নাটক 
(বিবাহের দিবস পুবর্বাহিৰ) 
(ভূত্যদিগের গৃহ) 
বেচারাম।(১) (নিধিরাম২) কে সম্বোধন করিয়া) এই নিদে! দুঃশালা; তুই 
ব্যাথ্যাই বামুনদের বাড়ী চাকরী কর্যে মরিস? ক্ষেণকাল চিন্তা) না, তো শালার 
কাছে বলা হবে নি; তুই বড় বেআন্দজ নোক, ও সকল দেখতে পারিস্‌ নি। 
নিধিরাম। (আহ্রাদে)। কি রে ভাই! মোকে বল নাঃ বল্বি নিঃ রোস; 
তোশালাকে নন্দামায় পেলে দি। (জড়াজড়ী আমোদ) 
বেচারাম। (হাতাহাতী করিতে করিতে আহ্াদে অর্দউক্তি) ছা ভাই! ছা;__ বয়ি বয়ি; 
বয়ি রে! শা!। 
নিধিরাম। হ্যে ব শালা। (জেড়াজড়ী ছাড়াছাড়ী) 
বেচারাম। আজ আত্তিরে কি জানিস্?। 
নিধিরাম। কি রে ভাই?। 
বেচারাম। দুঃশা!__দিদী ঠাকুরুণ রা সব জল সৈত্তে যাবে যে রে! দেখেছিস 
পারগার একটা কেমন দিদী ঠাকুরুণ এয়েছে!। 
নিষিরাম। (আহ্াদে) হে হযে, বোটে তো রে! -_মুই যাব মুই যাব। 
বেচারাম। মুই ভাই! একটা বড় বুদ্ধি কর্যে একেছি। 
(বৈঠকখানা হইতে) 
জয়শক্কর। (ভূৃত্যদিগের প্রতি)। কে আছিস রে!। 
নিধিরাম। একজে যাচ্চি। 
(নিধিরামের গমন) 
(অস্তঃপুর) 
(কুলকামিনীগণের মনে মনে সন্তোষ) 
অভিপ্রায় 


পদ্য। 


কি আনন্দ নিশিযোগে সুযোগ সময়। 
সয়িতে যাইব জল কোলাহলময়।। 
কে কার লইবে তত্ব কোথা রবে কেবা। 
আনন্দে করিব আজি বাসনার সেবা।। 
পিঞ্ররে থাকিয়া বদ্ধ যত কষ্ট পাই। 
যোগে যাগে দূরে যাবে সে সব বালাই।। 
সাজিব সুসাজে আজি যাব বেশ্যাবেশে। 
বলাবলী গলাগলী ঢলাঢলী শেষে।। 





(5 ভৃতা 
(২) ভৃত্য 


৩০৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বাসর আসরে বটে মজা আছে কিছু। . 
কিন্তু সে একাকী বর মেয়ে থাকে নিচ্ধ্যু।। 
ভাগ্যবলে আলো যদি নেবে একবার। 
ভাগাড়ের মধ্যে শত শকনী সম্চার।। 
এ নয় সেরূপ শুধু রমণী বাজার। 
পুরুষ পরেশ আছে হাজার হাজার।। 
বিশেষে যাহার সঙ্গে আছে যার মন। 
সেকি কভু ছেড়ে দেয় সুযোগ এমন?।। 
লইয়া ফুলের তোড়া ছেঁড়াগুলো যত। 
হোই হোই করিতেছে সাজিতেছে কত।। 
হেরিয়া সে সব সাজ ব্যাজ নাহি সয়। 
মনে করি কোলে করি যা হয় তা হয়।। 
অপরূপ কাম কুপ কি গৌঁফের রেখা। 
রতির সহিত যেন মদনের দেখা ।। 
মুখে মৃদু মৃদু হাসে ভাসে মধুময়। 
আকাশের মাঝে যেন বিজলী উদয়।। 
সে হাস সে হাস নয়, সে ভাষ সে ভাষ। 
সুধাকরে করে যেন কত উপহাস।। 
এ বাড়ি ও বাড়ি পরিয়া ঢাকাই। 
ঢাকাই কেবল মাত্র কিছু না ঢাকাই ।। 
মাঝে মাঝে রং মশাল জুলিবে যখন। 
দেখিব দেখাব রং রসাল তখন।। 
চম্কে উঠি থমকে থাকি নাড়ির কাপড়। 
পরস্পর পরস্পরে মারিব চাপড় ।। 
কি আনন্দ সে সময় রসময় যদি। 
কাছে থাকি আঁখি ঠারে বাড়ে প্রেমনদী।। 
ধন্য রে হিন্দুর ধর্ম ধন্য আচরণ! 
নাহি হেরি কোন দেশে আনন্দ এমন।। 
ঘোমটা দিয়া খেম্টা নাচ নাচে কোন দেশে। 
বলিহারি দণ্ডবত্‌ বাঙালির দেশে ।। 
(সীতাপুর) ৫১) 

(রামকিন্কর মুখোপাধ্যায়ের অস্তঃপুর) €২) 
(রামীর প্রবেশ) ত৩) 

€১) কন্যা কর্তার বাসগ্রাম 


(২) কন্যা কর্তা 
(৩) নাপতেনী বড় গুনী, গুন গান অধুধ বিশুধ কত জানে তার সংখ্যা নাই। 


৩৩৮ 


সপত্বী নাটক 
রামী। কোথা গো মা ঠাকুরুণ! কি কচ্চ? ব্যে বাড়ী, সব চুপ্চাপ্‌ কেন?। 
ভবমোহিলী। (৪) কেও! _রামী এলি, আয় মা! আয়; তোকে যে ভাকতে গেছে 
রে। এত 'গৌণ কেন?। 
রামী। পোড়া কপাল! রামীকে আবার ডাকৃব্যে কে মা! সে আপনিই আসে, 
আপনিই যায়। হোগ্‌ মা! তোমরা সব যে ভালবাস, হোসে হেস্যে দুটো কথা 
কও, তাই ভাল। 
ভবমোহিনী। সে কি রে! ওমা! অমন কথা বলিস্‌ নে। শুনিস তখন, শামীর 
বাপ তোরে ডাকতে গেছে। 
রামী। হোগ্‌ মা! হোগ। তোমরা সুখে থাক, সে সব গেছে কোথা! সকলি 
হবে। তুমি কি তেমন গিন্নী; তোমার কাছে কি কিছু বৈতে পাবে? তবে 
এত তাড়াতাড়ী কেন ডাকতে পাঠিয়েছ?। 
ভবমোহিনী। তোরে ডাকবোনা গা! তোর বোনের ব্যে ও মা! তোরা অমন 
কর্যে বস্যে থাকলে কি চলে? তায় আবার দৌজ পক্ষের বর, তোর হাতেই 
গোড়া, তুই না এলে কি কোন কিছু হবে। 
রামী। হোস্য বদনে)। বটে তো! আমার বোনের ব্যে, আমি আসবো না তো 
আর আসবে কে; অব্যিশ্যি অব্যিশ্যি! তা যা বলতেছ মা! তা সত্যি কথা! 
দোজ পক্ষের বর জব্দ করা, না ঘোল ষাঁড় জব্দ করা। তা হোগ্না! রামী 
তোমার এমন মেয়্যে নয়, যে, যাদু আবার উঠ্যে ঘাস খাবেন, তার কি যো 
রাখবো? দেখ্যো তখন, যদু গোলাম বন্যে থাকবেন--ছেয়ার মত সঙ্গে সঙ্গে 
থাকৃতে চাইবেন। 
ভব। তোর কণ্যানে তাই হলেই বাঁচি, রামী! সেই আশীব্বাদ কর্‌! ভেবে 
আর বাঁচিনে; তিনি কারু কথা শুনলেন না, মেয়েটাকে দোজ বরে কল্লেন,_ 
ভেব্যে ভেব্যে রেত্যে ঘুমুতে পারি নে! 
রামী। তার আবার চিত্তে কি! সব হব্যে এখন যা যা চাই, তা সব এনে 
রেখেছ তো। 
ভব। তাই তোমাকে ডাকতে পায়ে ছিনু মা! আমরা তো ও সব জানিনে; 
কি কি কন্তে হবে, সব জেন্যে রাখি, অধুধ বিষুধ গাছ গাছড়া কি কি 
আন্তে হবে বলছ। 
রামী। আর এমন কিছু আস্তে হবে না; রামী মস্তরে না কন্তে পারে এমন 
কম্মই নেই, তবুও অন্য অন্য, সামিগৃগিরী গাছ গাছড়া কিছু চাই; তা এই 
আনিও। রাঙ্গা ধুতরোর শেঁকড়, চিতের শেঁকড়, এয়্যো স্ত্রীর বগলের মলা, 
তেপ্লতের পাতা, এই চারটা সামিগৃগিরী আনায়্যে রেখ্যো, আর যা যা চাই, 
আমি আনবো তখন। 


(৪) রাম কিন্করের স্ত্রী। 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আর হাই আমলা, ঝাল ঝাড়া বাটা, এ সকল তো জানই! এ সয় কটা মাকু, 
আর, একটা কুলুপ আনিও। আর বলতে কি মা! --ভাতার সোহাগী 
এয়্যোরাণীর একটু নেকড়া চাই, এই হলেই হৈল, আমি এখন আসি! আসবো 
তখন। আমার কি এক জ্বালা মা শতেক জ্বালা! আর পারি নে। হাদে 
কি পোড়া মা! আবার ও পাড়ার চাটুয্যেদের ছোট বৌ টো নাকি ভাতারের 
কাছে শুতে চায় না। তাই ডাকতে এয়্যেছিল। (কিছু দূর গিয়া পুনবর্বার আসিয়া) 
আ মরণ! পোড়া কপালী আসল কথাটাই ভুল্যে গেছলাম গা! হা দেখ মা! 
আগুণ খাকীর দুক্ড়ো কড়ী, আর একটু সিঁদুর আনিও। 
(রামীর প্রস্থান) 
(বিবাহের রাত্রি) 
(বিবাহ সভা) 
(রতিকান্ত কুলার্ণবের প্রবেশ) €১) 
রতিকাস্ত। (উপস্থিত ঘটক ও ব্রান্মণদিগের উদ্দেশে) ব্রার্মাণেভ্যো নমঃ; (জনেক 
ঘটককে সম্বোধন করিয়া) অহে কুলদেপক ভ্টায্য! সব চুপচাপ কেন হে! এ 
সামান্য নোকের কন্যের বিবাহ সবা নহে£? এ সবায় ইন্দ্রী, চন্দ্র, বাউ, বরুণ, 
ছিলেন, তাই শম্মা উপস্থিত। এই সবায় কন্যেরত্বি কুলতিলক দাতা ভোক্তা 
বদান্য মানা ধন্য গণ্য সৌজন্য (মনে মনে) “পণ্যের বিষয়টাও কন্যে ওজন 
করিয়া মষ্টে মষ্ট্রে ষষ্ঠ গুণ নওয়া হইয়াছে, তায় কসুর নেই” শাণ্ডিল্য 
মহাপ্রতাপ মহাপ্রতাপচন্দ্র রায় বাহাদুর কুলীন কেশর, আপনার উপযুক্ত পাত্রে 
রূপগুণে অদ্বিতীয়া শ্রীযুতা শ্রীমতী শ্রীলা কন্যা সম্প্রদান করিবেন। আজ আর 
দেখিতেছেন। অহে কুলদেপক! কুল বাগীশ! কুললঙ্কার ভট্টায্য! তোমরা কুল 
ংকীত্তন আরম্ভ কর। 
উপস্থিত হী মহাশয়! আসতে আজ্ঞা হয়, এই যে কেবল আপনকার 
ঘটকগণ অপিক্ষা ছেল। ঘটক শ্বরে কুলচিপাঠ) 
“আগ্রিদগ্ধাচ যে জীবে, যে ৮ দদ্ধো কুলাগণে।” 
রতিকাত্ত। (উহাদিগের বচন পাঠ শেষ না হইতে হইতেই দস্তে) বিলক্ষণ! তোমরা 
সব ভুলিয়া গিয়াছ হে, ওটা এ বিবাহের কারিকে নয়, পুনবিবর্বাহের; এই 
আমার সঙ্গে এ বিবাহের কারিকে বল। (ঘটক স্বরে) 
শসানানল দগ্ধাহি পরিত্যক্তোহি বান্ধবাঃ”। 
0 ঘটক. 
৩১০ 


সপত্বী নাটক 
কুলচন্দ্র (১) বিলক্ষণ! ও কি হে ওট' নয় যে, এই মামার সঙ্গে বল। 
(ঘটকম্বরে) | 
“বাহুদ্বোচি মিণাল মাস্য কমলং ধনম্মিন্য শৈবালকং কাস্তায়া স্তন 
চন্দ্রবাক যুগলং।” 
কুলঘট্র ।(২) (দস্তে) আঃ, ও কিও শম্মা না হইলে একটা সবাও ফতে 
হয় না। ও কি বলছ, আমার সঙ্গে বল। (ঘটক স্বরে)। 
“ও নমঃ শ্রীকুল দেবতাই। 
“নত্বা তং কুলদেবতৎ খলুসদাং, সম্মান সে হংসতৎ, হাতং ভক্তি বিশেষতা 
কুল সবা মাত্যে সদা রোদিতা। শ্রীমান বান্দঘটীয় কাদিক মহাবংশাবলী বেক্তি 
তো, বক্ষে তৎপরিবন্ত কম্মণ বিধৌ মিত্রো শ্ত্রীবানন্দকঃ।। 
আদিতশ্চ পরীবন্ত, আত্মা দেবনোকে পুরা! চট্টেন বধূ মকরন্দেন ভেদিতঃ।। 
নৃসিংহ বন্দের ছয় সম্তান__গাধিরাম, দধিরাম, অধিরাম, বিধিরাম, বন্দিরাম। 
গাধিরাম নিঃসস্তান, কাশীবাসে রাসনীলা সাঙ্গ করেন। দধিরাম বর্ণব্রান্মাণ 
হইল। অধিরাম বিবাহের পুবের্বহে মদ্যপানে প্রাণত্যাগ করে। 
বিধিরামের কথা বলিবার নয়। বন্দিরামই বংশ তিলক, যথার্থ বংশধর 
জন্মিয়াছেন। তাহার ৭ সম্ভান। ধন পুত্র লক্ষী লাভ। 
(রামকিন্করের প্রবেশ) 
রামকিস্কর। (গলবন্ত্র কৃতাগ্রলি, সকলকে সম্বোধন করিয়া)। মহাশয়! রাত্রি অধিক 
হইয়াছে, লগ্ন উপস্থিত! আজ্ঞা হয় তো কন্যা পাত্রস্থ করি। 
ঘটকগণ 
কন্যাযাত্র হ্যা, মহাশয়! “শুভস্য শীঘ্রং" বরপাত্র লইয়া গমন করুন। 
ও বরধাত্র 
সকল 
(অন্তঃপুরে শঙ্খধবনি, বর প্রবেশ) 
(বাসর জাগরণের অনুষ্ঠান) 
(কুলবতীদিগের মনে মনে সন্তোষ, কোন কুরূপপতি কুলকামিনীর অভিপ্রায়) 
কবিতা। 


এদেশে বাসনা পূর্ণ না হয় কাহার।। 
ভাবে যারা সতী রব, সতী রয় তারা। 
আছে অপরূপ ধর্ম নিয়মের ধারা।। 
€১) ঘটক 
(২) ঘটক 
৩১১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


যারা ভাবে গৃহে রব, পাব গৃহ সুখ । 
কিন্তু ভালো বাসে পরপুরুবের মুখ।। 
এদের কারণ আছে কতই কৌশল । 
বাসর আসর আর জল সহা ছল ।। 
খুদ মাগা, পড়সি জামাই লয়্যে খেলা । 
মুখের আচার ভ্রষ্টা কুলস্ত্রীর বেলা ।। 
জগন্নাথে যেমন সুখের সুনিয়ম। 

সেই রূপ এ সব আচার প্রিয়তম।। 
ধন্য ধন্য বিধিকর্তা, মুনি মহামতি। 
ভাল মন্দ সকলের করিয়াছ গতি।। 
মদ খোর মদ খায় তন্ত্রের শাসনে। 
পরনারী রহে পরপুরুষের সনে।। 
কেহ কহে ছুই ছুঁই কেহ নাহি ছোঁয়। 
বাঘিনী বৃবভবর একস্থানে শোয়।। 
শান্ত্রকার যত আছে তত আছে মত। 
বুঝিতে না পারে কেহ সুমত কুমত।। 
কেহ বলে এ কর্ম করিতে আছে মানা। 
কেহ কয় না করিলে হয় চক্ষুঃ কাণা ।। 
কেহ বলে স্বর্গ আছে ভিন্ন এক স্থানে । 
কেহ কয় তাহা নয় স্বর্গ এই খানে।। 
দূর হোক সে সব কথায় কিবা ফল। 
পড়িব বরের গায়ে করি নানা ছল ।। 
যদি" দেখি এ বরের মুখখানি ভাল। 
কবির যা মনে আছে রয় রবে আলো।। 
যদি হয় সে মুখ শারদ সুধাকর। 
বিশ্ব ফল জিনি যদি হয় সে অধর।। 
অধীরা হইয়া তবে বেধিবার যত। 
শুনিব না হাসুক্‌ বলুক 'যেবা যত।। 
চক্ষুঃ মুদি করিব সে মুখ সুধাপান। 
অভাগা পতির রাগে যায় যাবে প্রাণ।। 
নাহয় না রব ঘরে যাব বেশ্যা হয়্যে। 
ইংরাজ রাজত্বে বাস কিবা যাবে বয়্যে।। 
পুলিসেতে লিখাইব বেশ্যাখাতে নাম। 


৩৬১২ 


সপত্বী নাটক 
তা হৈলে তো পুরিবেক, সব মনক্কাম।। 
মনোমত জন পাব ধন পাব কত। 
দিবানিশি আমোদ প্রমোদে রব রত।। 
টাকা হৈলে ধর্ম কর্ম সব যায় রাখা। 
মিছে কেন ঢেলুতি হইয়া কুঁড়া মাখা ।। 
পিঞ্জরে থাকিয়া বদ্ধ কষ্ট পাই কত। 
কি ফল করিয়া ছাই পতিব্রতা ব্রত।। 
না হয় সুচেষ্টা তথা, যে প্রকার রোগ। 
গৃহস্থের গৃহে থাকা একি কর্্মভোগ।। 
কপালে কুরূপ পতি দিলেন গৌসাই। 
বরঞ্চ থাকিব একা তারে নাহি চাই ।। 
ভাগ্যবলে পাই. যদি প্রিয় রসময়। 
না পাই নির্জন স্থান, না পাই সময়।। 
কে শোনে কে দেখে পাছে সদা ভয় মনে। 
অমৃতে গরল উঠে আঁখির মিলনে ।। 
গুরুজন চখে চখে সাবধান রয়। 
ধর্মের ধোকড়া বাঁধে পরের সময়।। 
দিবানিশি দগ্ধ হই বিষের জ্বালায়। 
হায় হায় ভেব্যে ভেব্যে বুঝি প্রাণ যায়। ৷ 
কবি বলে কুলবতি কি করিবে বল। 
এ ঘোর সংকট কালে বুঝে সুঝে চল ।। 


(ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদিগের বিষয়, ফলারের হুড়াহুড়ী, কন্যার 
মায়ের কায়া এবং স্ত্রী আচার প্রভৃতি) 


কবি কয় বড় দুঃখে রহিনু নীরব। 

পুতী বেড়্যে যায় ভয়ে না রচি এ সব।। 
সারগ্রাহী রসিক পাঠকগণ যত। 

কৃপা করি যদি এ নাটকে হন রত।। 
বিশেষতঃ যার ধন যাঁর অনুমতি । 
ক্রমে যদি বাড়ে তার মানসিক গতি।। 
পুনবর্বার এ নাটক যদি হয় ছাপা। 
দেশের দুর্নীতি কিছু না রাখিব ছাপা।। 


৩১৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কিন্ত মনে মনে সদা এই হয় ভয়। 
দুর্দেশের দ্বেষে পাছে মারী খেত্যে হয়।। 
দেশের আচার লয়ে করি এই খেলা। 
শেষে কি হইব গোলড ইসমিতের চেলা।। 
যেখানে যে ক্রটি আছে ছুঁটিয়াছে তোষ। 
টুটিয়াছে রস ভাব যুটিয়াছে দোষ।। 


দুটী আছে, কবিদের সুসহায় যাহা। 
উটী আছে, এটী নাই নাই বটে তাহা।। 
দ্বিতীয় বারের বারে বাকী-নাহি রবে। 
সিদ্ধির সাহায্য ধরি খদ্ধি লাভ হবে।। 
বৃদ্ধি হৈলে যশঃ আর সন্ত্রম প্রসার। 
লৌকিক সংকোচ তবে না রহিবে আর।। 


(জয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহির্বাটী) 

(রামব্রন্গ ব্রন্মচারীর প্রবেশ)১) 
রামব্রন্ম। (ুঁদাস্যে দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাণ্ধ, পূর্বক সংস্কৃত ভাষায়) হা রামচন্দ্র! হা 
পরমাত্মন! কঃ কুত্র ভো গৃহাশ্রমিন্! অতিথিঃ ক্ষুধার্তো অহং। হা রামচন্দ্র! হা 
পরামাত্মন্! কে কোথা গো! ক্ষুধার্ত অতিথি আমি। 

(বাঘছাল পাড়িয়া উপবেশন) 
জয়শঙ্কর। (বৈঠকখানা হইতে বহির্গত হইয়া, স্বগত)। হাঁ ভক্তি হয় তো বটে; যথার্থ 
কি?। (নিরীক্ষণ) হাঁ ভেকধারী না হইতে পারেন; বিলক্ষণ ব্রহ্মজ্যোতিঃ 
দেখিতেছি। (প্রকাশ) গৌঁসাই! নমস্কার। 
রামব্রক্ষ। (ব্যেন্তভাবে, সংস্কৃত ভাষায়)। কন্তৃং দ্বিজাতি রসি! (তুমি কি ব্রান্দাণ!)। 
(করপুটে, প্রকাশ)। নারায়ণ! নারায়ণ! । মেস্তরে হস্তোন্সেলন)। 
জয়শক্কর। (ভক্তিভাবে)। ঠাকুর! পূর্বাশ্রম কোথায় ছিল? এক্ষণে কোথা 
হইতেই বা শুভাগমন হইল? 
ব্রামব্রন্মা। ভো সম্প্রত্যহং ব্রম্মানন্দপুরবাসী; নির্গতো বা; পুণ্যাশ্রম কপিলাশ্রম 
সন্দর্শন প্রসঙ্গেনাত্মানং নহে। উদাসীনস্য নিবাসেন পুনঃ কিমুতো ভবতাম্?। 
(১) একজন পণ্ডিত ব্রহ্মচারী। 

৩১৪ 


সপত্বী নাটক 
আমি ব্রন্মানন্দপুরে বাস করি; বারাণসী হইতে আসিতেছি; কপিলাশ্রম সন্দর্শন 
প্রসঙ্গে আত্মাকে পবিত্র করিতেছি, আমি উদাসীন;' উদাসীনের নিবাস জানিয়া 
আপনকার কি উপকার ?। 
(একত্র, স্বগত) হাঁ বেশ্‌ বেশ্‌! ব্রহ্মচারীটী পণ্ডিত বটেন। (প্রকাশ) ভাল ভাল, 
গোর্সাই! এক্ষণে ক্ষুধা নিবৃত্তি ও দূর করিতে আজ্ঞা হউক, পরে আলাপাদি . 
হইলেই মহাশয়! আপনাকে একটি কথা জিজ্ঞাসা করি, আপনি কি আমাদের 
এই বঙ্গ চলিত বাঙ্গলা ভাষায় আলাপ করিতে পারেন না? তাহা হইলে, 
আমরা আরও সুখ পাই। 
রামব্রন্মা। (ঈষদহাস্য বদনে, ঘাড় লাড়িতে লাড়িতে)। হী! গুরো! তোমার ইচ্ছা! ওঁ 
একমেবাদ্িতীয়ম। (নির্মেদ প্রকাশ)। 
(ব্রহ্মচারীর ভোজন সমাপন) 
জয়শক্কর। গৌসাই! আপনকাকে গৃহহ্থপূরর্ব অপুর্ব সম্পত্তিশালী মহা সন্গ্যাসী 
দেখিতেছি। বোধ হয়, আপনি সংস্কৃত মনুষ্য না হইতে পারেন। 
সব্্বশান্ত্রপারদর্শী সুদুর সংপাত্র হইবেন, সন্দেহ নাই। যাহা হউক, আপনকার 
এপ্রকার আয়াসাতিশয়ীন অবস্থাস্তর অবলম্বনের হেতু কি? অনুগ্রহ পুবর্বক 
যৎকিঞ্চিৎ পরিশ্রম স্বীকার সহকারে তাহা প্রকাশ করিলে, বিষমবিরুদ্ধ 
সংসারাশ্রমবিমুদ্ধ মাদ্‌শ অতি অকিঞ্চিৎকর, সংজ্ঞাশূন্য অভাজন জনগণের 
জ্ঞানোদয় সম্ভাবনা, তাহাতে নরাধমেরা চরিতার্থ হই। 
রামব্রম্মা। (সসস্তোষচিত্তে, সবিম্ময়ে)। মহাশয়! সূর্য্যকাস্ত মণির সংসর্গে কাচও 
নয়নানন্দকারী হয় বটে, একথা মিথ্যা নয়, অতএব আপনি এ নরাধমের 
বিষয়ে যে প্রশংসাবাদ করিতেছেন, তাহা নিতাস্ত অযথাবাদ নহে, প্রমাদবৎ 
বিসম্বাদও বলিতে পারি না। তা যা হউক, এক্ষণে মহাশয়দিগের স্বভাবসুলভ, 
সংসার সারভূত, অকৃত্রিম সাধুতা সদ্ধ্যবহারে পরিতৃপ্ত ও প্রযোজিত হইয়াই 
আমি আপনকারদিগের নিকটে আমার অনাবশ্যক আত্মবৃত্তাত্ত সংক্ষেপে বর্ণন 
করিতে প্রবৃত্ত হইতেছি, শ্রবণে কৃতার্থ করিতে আজ্ঞা হয়। 
“সুদৃশ্য বিশ্ব বলয়ের অস্তবর্বস্ী এই যে দুর্ভাগ্য ভারতবর্ষ 
দেখিতেছেন,_ 
ব্রেম্মচারীর কথা শেষ না হইতে হইতেই) 
রাধাপতি। বিস্ময়ে, ব্রন্মচারির প্রতি)। দুর্ভাগা কেমন ?।। 
রামব্রক্গ। (দস্তে, এবং খেদে)। হাঁ! জননী ভারতভূমিকে বড় দুর্ভাগা বলিতে 
হইবেক, না. হইলে, এতকালের পর ধর্মন্রষ্ট, আচারভ্রষ্ট, দয়াহীন, মায়াহীন, 
বাকজাল মাত্র সম্পত্তি এমন পাষগুপরিপূর্ণা হইবেন কেন? অমন রত্ব গর্ভে 
এত কুলাঙ্গার কুসস্তানই বা ধরিবেন কেন? 


৩১৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বায়ুদেব। ভেক্তিভাবে)। গোঁসাই! আপনি কোন্‌ ধর্মীয় ব্রাক্ষাণ। 

রামরন্দা। (সাক্ষেপে, সনিবের্বদে এবং সদস্তে)। মহাশয়! আর জিজ্ঞাসা করেন 
কেন? তবেই বা আর এ অবস্থা হইতেছেন কেন? মাতামুণ্ড কি বলিব? 
বলিতে হাদয় ক্ষীণ হইয়া যায়, রোদন সম্বরণ করিয়া রাখিতে পারি না, শ্রেণী, 
তায় আবার মহারথী কুলীন, শাণ্ডিল্য শিরোমণি মহাত্মা ভট্টানারায়ণ বংশ 
প্রবাহ। 

রাধাপতি। (সকলের মুখ নিরীক্ষণ করিয়া জনাস্তিকে)। মহাশয় লোক দেখিতেছি 
যে!। (ক্রহ্মচারীকে সম্বোধন করিয়া)। মহাশয়! আপনি যে প্রকার পরিচয় 
দিতেছেন, এ যৎসামান্য জনের পরিচয় নয়? যদিই এমত হইল, হবেই বা, 
আপনকার এ প্রকার অবস্থার হেতু কি? কিছুই তো অনুধাবন হয় না? এরূপ 
কুলমর্যাদা থাকিলে সংসার আশ্রমে বিলক্ষণ সুখ সম্ভোগ সম্ভাবনা। 
রামব্রন্গা। দেস্তে)। হা! হা! বিলক্ষণ সুখসম্ভোগ সম্ভাবনা! হা! সাংসারিক সুখ 
কাহাকে কহে, আদৌ তাহাই আপনারা অবগত নন্‌, অজ্ঞান অবস্থায় আমিও 
এই প্রকার মায়াজালে জড়িত ছিলাম, বস্তুতঃ আপনারা নিশ্চয় জানিবেন, 
বর্তমানে বল্লালী কুল মর্য্যাদা লৌহশলাকা (বল্লম) স্বরূপ হইয়া লোকেরদের 
অন্তর্ভেদ করিতেছে। আমার এরূপ দুর্দশী কেন হইল? তাহা এখনও কি 
মহাশয়দিগের হৃদয়ঙ্গম হয় নাই, এত কথার পরেও কি আবার মহাশয়েরা 
বুঝিতে পারিলেন না। আরও কি স্পষ্ট করিয়া বলিতে হইবেক।-_বিবাহ? 
বিবাহ? সকল দোষের ও সকল দুঃখের আকর ঘৃণিত বহুবিবাহ?। হায়! 


পদ্য। 


কহিতে সে সব কথা ঝরে দুনয়ন। 
ফুঁক দিয়া জ্বালিয়াছি অধর্ন্ম দহন।। 
এখনো জলিছে সেই অধর্্ম অনল। 
উচিত আহুতি পেয়্যে হৈতেছে প্রবল।। 
একা আমি করিয়াছি শত পরিণয়। 
পরিয়াছি ফণিমালা ছেল্যে খেলা নয়।। 
হরিদ্বার আর গঙ্গাসাগর সঙ্গম। 

কোথা না কব্যেছি পাপ পাপী নরাধম।। 
যেখানে সেখানে আছে শ্বশুর আলয়। 
এতে কি নিস্তার পাই আলোয় আলোয়।। 
হায় জগদীশ! তুমি কি করিবে গতি?। 


৩১৬ 


সপত্নী নাটক 
চিত্তিয়া হইনু সারা পাপিস্ঠ 'দুর্্মাতি।। 
কুলীন জনক বড় কুবুদ্ধি জনক। 
না হৈলে কি রাঙ হয় সম্ভান কনক£।। 
শত নারী অধিকারী একপতি ধনে। 
কারু কি কুলান হয় সুখ হয় মনে£।। 
সহজে সে ধন বিনা বিফল সংসার । 
সাধে কি রমণী হাটে উঠে হাহাকার £।। 
ছ মাসে ন মাসে যদি যাই কোন স্থানে। 
কতই গুমর করি কুল অভিমানে ।। 
আগ্রহ জানায় তারা মনে পায় ব্যথা। 
নীরব হইয়া থাকি মুখে নাই কথা ।। 
সতী যারা দিয়া তারা সুতা বেচা কড়ী। 
কান্দিয়া চরণ তলে যায় গড়াগড়ী।। 
না করে সম্ভাষ তারা সোজা লোক নয়।। 
এদিকেতে বয়সে সবার বড় নই। 
দীড়াইলে একত্র সম্ভান সম হই।। 
সম্পর্কে সকলে প্রায় হন গুরুজন। 
মাসী, পিসী, মাসী, ভগ্ী, এরূপ স্বজন ।। 
দূরে যাক সপিশ্তীয় পিশু সমন্বয়। 
ভাইঝির সঙ্গে হয় কুল পরিণয়।। 
যা হোক তা হোক্‌ কিন্ত পাপে না ডরাই। 
বিবাহ বাণিজ্য কর্যে উদর ভরাই।। 
কত নারী কত রূপে রাখে কুলমান। 
কত কর্যে গডে ধরে কতই সম্ভান।। 
সহস্র পুত্রের পিতা হইলে কুলীন। 
তথাপি রৌরবকুণ্ডে হইবে বিলীন ।। 
কেবা কার পিতা আর কেবা কার সুত। 
কুলীনেতে চেনা দায় এ বড় অভুদ?।। 
কুলীনের বাবা হন সম্পর্কের বহবা। 
ছেল্যে যদি বাবা চেনে মুখে মারে থাবা।। 
বালকে ভঙ্থসয়া বলে কুলবতী বামা। 
বাবা নয়, বাবা নয়, ও যে তোর মামা ।। 


৩১৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


' বিষম অধরন্্ম জাল, এ বড় জঙ্জাল। 
ইহকাল পরকাল যায় দুটী কাল।। 
সংসারির প্রতি ধর্ম হইলে বিমুখ। 
তাতে কি কখন হয় সাংসারিক সুখ।। 
এ সব ভাবিয়া আমি সন্ন্যাসির বেশে। 
দেশে দেশে ভ্রমিতেছি যাহা হয় শেষে।। 


প্রতাপ। (শুনিয়া দুঃখিত ভাবে)। রাম রাম! বল্লালী কুলকাণ্ডই এমনই কুকাণগ্ড 
বটে, হা! বল্লাল কি পাপিষ্ঠ নরাধম রাজাই ছিলেন! স্বহস্তে কি বিষবৃক্ষই 
রোপণ করিয়া গিয়াছেন! এক্ষণে ব্রহ্মচারী মহাশয়ের কথা শুনিয়া চৈতন্য 
হইল। 

বাসুদেব। (ব্যস্তভাবে ব্রম্মাচারীকে সম্বোধন করিয়া)। বটে বটে! বটে তো 
মহাশয়! বড় উত্তম আজ্ঞা করিতেছেন। 

রাধাপতি। (বিস্মিত হইয়া)। তবে তো বল্লাল নারকী লোক!। 

রামব্রন্গা। (জিহাগ্র দংশন করিয়া)। না, না, না মহাশয়! অমন কথা মুখেও 
আনিবেন না, পাপ স্পর্শ হইবেক, মহারাজ বল্লাল সেন, অবতার বিশেষ 
ছিলেন, তাহাকে সাক্ষাৎ ধর্ম বলিলেও বলা যাইত। তিনি মহামহোপাধ্যায় 
পণ্ডিত অতি সুবিচক্ষণ মহারাজ চক্রবর্তী ছিলেন। 

প্রতাপ। (বিরাগে)। পণ্ডিত রাজার" কি এই কর্ম্ম?। 

শক্কর। ফক্ষাস্তভাবে)। দূর হোক্‌ হে, না হয়, ও সব পাপেই আর কায নাই। 
আমাদের দেশ জান তো? কথায় কথায় এখনি এখন দলাদলী উপস্থিত হইয়া 
পড়িবে, লোকে আমাদিগকে খ্িষ্ঠীয়ান্‌ বলিয়া উঠিবে, হঠাৎ বন্ধ করিয়া 
ফেলিবে, বাড়ীতে তো খাবেই না। এক সময়ে কুটুম্িতা পর্য্যস্তও পরিত্যাগ 
করিয়া বসিবে, এমন একেবারে মুখ দেখাদেখীও থাকিবে না, সব জানই এ 
পাপিষ্ঠ কাণ্ডে বী বিউড়ী পর্যযত্তও পরিত্যাগ হয়! পোড়া দলাদলী,_ তাই 
লইয়া আবার কে ঢলাঢলী করে বল?। ওসব যেমন আছে থাকুক্‌, যেমন 
চলিতেছে চলুক্‌, অথবা, যা হয়, হউক গিয়া যাক্‌, মরুক্‌, ও সব কথায় 
আমাদের কায নাই, বল্লাল বড় লোক ছিলেন এ কথাই। “উচ করে বীধ টং, 
বস্যে বস্যে দেখ রং।” এই নিমিত্তই তো সবর্বনাশ ঘটিতেছে, ওদের অমৃককে 
সকলেই বুদ্ধিয়ান বলে, কেন?-_-কি মনে নাই হে? আমরাই যে কত তার 
নিন্দা করিয়াছি। ফলতঃ ক্রমে ক্রমে লোকের চক্ষুঃ কাটিতেছে, এ সব ভ্রম 
আর বড় অধিক দিন রহিবে না, কেবল বুড়ো কটা মরিবার অপেক্ষা মাত্র। 
প্রতাপ। ক্ষাস্ত হও ভাই তুমি, এখানে আর কে আছে? যে, এত ভয় 


৩১৮ 


সপত্বী নাটক 
করিতেছ, ব্রক্মচারি মহাশয়ের সঙ্গে তর্ক বিতর্ক' করিতেছি বই তো নয়?। না 
হয় এক হইলাম, তাতেই বা হইল কি?। 
শঙ্কর। সে যে বড় সহজ কথা নয় হে ভাই! দেশ শুদ্ধ লোক এক দিক্‌, আর 
আমরা তিন জনে এক দিক্‌, কি প্রকারে বাস করিব? রাজাও তেমন রক্ষা 
করেন না?। 
রামবন্ধ। ও সব কথা যাক্‌, এক্ষণে যাহা বলিতেছি তাহাতে মনোযোগ করেন্‌ 
মহাশয়! মহাত্মা বল্লাল সেন এ কর্ম মন্দ কর্ম করেন নাই, বরং ভালই 
করিয়াছেন, এক্ষণে কার্যগতিকে ততোধিক মন্দ হইয়া উঠিয়াছে বলিয়াই যা 
বলুন। বল্নাল মহোদয়ের অভিপ্রায় বড় ভাল ছিল, এখন আমরা 
আপনারদিগের দৌষেই আপনারা দুঃখ পাইতেছি বলিয়া সে মহাত্মার দোষ 
বীর্তন করিতে নাই। 
রাধাপতি। বল্লালের কি অভিপ্রায় ছিল মহাশয়! । 
রামব্রন্দা। তাহার অভিপ্রায় ছিল রাজ্যে মহাপাপকর কন্যা বিক্রয় না হয়, প্রজা 
সকল সাধু সদাচার করে, এমন কি? রাজ্যে বিন্দুমাত্র মহাপাপ সঞ্চারও না 
হইতে না পারে ইহাই তাঁহার আস্তরিক ইচ্ছা ছিল!। 
প্রতাপ। এখন যে মহাপাপের শ্রোতঃ বহিয়া যাইতেছে? 
রামবন্গা। হী তাই বলিতেছি, মনোযোগ করুন। 
রাধাপতি। মনোযোগ পৃক্কক)। ভাল, আজ্ঞা করুন মহাশয়!। 
রামব্রন্মা। বল্লাল দেখিলেন “রাজ্যে ভদ্র সম্প্রদায় মধ্যেও মহাপাপকর কন্যা 
বিক্রয় চলিতে লাগিল, একে তো শুধু বিক্রয় পাপে নিস্তার নাই, রাজা নারকী 
হন, রাজ্য অপবিত্র ও ছারখার হয়, তাহাতে আবার মহানিষ্টকর মনুষ্য 
বিক্রয়। সুতরাং ধর্মনাশে রাজ্যনাশ আশঙ্কায় তিনি মহা সশঙ্কিত হইলেন এবং 
কিসে রাজ্যমধ্যে এই কুপ্রথা এককালে রহিত হইয়া যায়, তাহার সদুপায় 
চিন্তা করিতে লাগিলেন। 
প্রতাপ। কেন? আবার তার একটা এত চিস্তা কি? তিনি তো চক্রবর্তী রাজা 
ছিলেন, আইন করিলেই তো নিশ্চিত্ত হইতে পারিতেন। 
রামব্রন্মা। (হাস্য করিয়া)। হাঁ! এ কথাই তৌ বটে!-_এ ভ্রমেই তো সব্র্বনাশের 
মূল,_এঁ ভরসাতেই তো এক্ষণকরি লোকেরা পৌত্তলিক ধর্মে এককালে 
জলাঞ্জলি দিতে বসিয়াছেন। 
রাধাপতি। সে কেমন মহাশয়! পৌত্তলিক ধর্ম লোপ হইতে বসিয়াছে কেন? 
রামব্রন্মা। রাজনিয়মই বলুন, অথবা পৌত্তলিক ধর্ম নিয়মই বলুন, এই দুয়েরই 
এক মাত্র মুলোদ্দেশ্য শাস্তি সংস্থাপন এবং চিত্তশুদ্ধি, এক্ষণকার লোকেরা 
ইহাই নিশ্চয় সুস্থির করিয়া, ক্রমে ক্রমে সব্বপ্রকার সম্প্রদায়ই স্ব স্ব পৌত্তলিক 
ধর্ম একেবারে পরিত্যাগ করিতেছেন, বলেন, পরমেশ্রের অভিপ্রেত কার্য্যই 


৩১৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


শাস্তি, সমুচিত রাজনিয়ম প্রচার দ্বারা রাজাই তাহার -স্থাপনা করিবেন এবং 
বিদ্যা সব্বোপরিকর্তৃত্ব সুতরাং লোকের চিত্তশুদ্ধি করিব, তবেই আর পৌত্তলিক 
ধর্মের আবশ্যকতা কি রহিল£ ভাল ভাল রাজনিয়ম প্রচার হউক ও বিদ্যা 
বিস্তার হইতে থাকুক, মনুষ্য বিদ্যোপার্জন করুন ও রাজনিয়ম শিরোধার্য্য 
করিয়া চলিতে থাকুন, দেশে শাস্তি স্থাপন হইবেক এবং চিত্তশুদ্ধিও জন্মিতে 
পারিবে, তাহা হইলেই তো ধর্ম উপাজ্জন হইবেক এবং সদগতি লাভ 
অবশ্যই হইতে পারিবেক, সংশয় কি, ধর্ম আর কিছুই নয়, পরমেম্বরের 
অভিপ্রেত সৎক্রিয়ার নামই ধর্মট আর, সনাতন সুখের নামই সদগতি অথবা 
মুক্তি। একমাত্র পরমেম্বরই জীবের উপাস্য, তাহার স্মরণ করাই উপাসনা। 
প্রতাপ। (সস্তভোষে)। বেশ্‌ বেশ্‌! বেশ কথা তো! এতো বড় ভাল কথা 
মহাশয়! 

রামব্রন্ম। হা! এক প্রকার বেশ কথা বটে, এটী যে বড় মন্দ কথা নয় ইহা 
আমিও স্বীকার করি! কিন্তু মহাশয়! এস্থলে একটী নীচ কথা মনে হইল; 
ছোট লোকেরা বলিয়া থাকে “সে গুড়ে বানি, দাদার ভরসায় বামে শুন্য” 
এ দুইটী কথাও তো বড় ভাল কথা; বিষু্শর্্মার সংগ্রহ হইতেও তো নীতি 
কথা বলিতে হয়। 

জয়শঙ্কর। (হাসিতে হাসিতে)। সে কেমন মহাশয়! হা, ছোট লোকেরা এ দুটা 
কথা বড় ভাল বলে বটে। এ দুটীর তাৎপর্য্য কি?।. 

রামত্রন্ষ। এখানে এ দুটী কথার তাৎপর্যই এই যে কেবল রাজনিয়ম হইতে 
কখনই ধর্্ম রক্ষা হয় না, আর₹-বিদ্যা পদার্থেরও সর্বত্র সপ্তাব হইতে পারে 
না, বরং প্রায় স্থলেই অত্যস্তাভাব লক্ষিত হয়, ইহা পরমেশ্বরের এক প্রকার 
অভিপ্রায় বলিতে হইবেক। অতএব মহাশয়েরা এক্ষণে বিবেচনা করুন দেখি, 
সব্্বদা সব্র্বত্র সবর্ধথা ধর্ম রক্ষা কিসে হইতে পারে। এমন স্থল অনেক আছে 
যেখানে রাজনিয়ম প্রবিষ্ট হইতেও পারে না, কর্তৃত্ব করা সুদূরপরাহতই 
রহিয়াছে। এবং বিদ্যার বিলক্ষণ অসত্তাবও আছে; মনের অগোচর তো পাপ 
নাই মহাশয়; ভাবিয়া দেখুন না কেন?। অন্যে পরে কা কথা আত্মাতেই বিশ্ব 
দর্শন হয়। 


পদ্য। 
চিস্তা কর মহাশয়, ও বড় সহজ নয়, 
সকলি তো মনে হয়, বাল্যকালে ছিলাম কেমন গো, 
| বাল্যকালে ছিলাম কেমন। 
দুরস্ভ যৌবন অরি, কুমন্ত্রণা অসি ধরি, 


৩২০ 


সপত্বী নাটক 


নাশিয়াছে রণ করি, যৌবনেও ছিল না চেতন গো, 
যৌবনেও ছিল না চেতন।। 
বার্ধক্য পরম গুরু, জ্ঞানদাতা কল্পতরু, 
করিল উবর্বরা মরু, মনে দিয়া উপদেশ সার গো, 
মনে দিয়া উপদেশ সার। 
পাইয়া প্রবোধ জল, দূরে গেল সব ছল, 
জন্মিল বিজ্ঞান ফল, যাহা ভিন্ন সকলি অসার গো, 
যাহা ভিন্ন সকলি অসার। 
এখন যে দিকে চাই, বিজ্ঞান আলোক পাই, 
ভ্রান্তি অন্ধকার নাই, ভূলোক আলোকময় হেরি গো, 
ভূলোক আলোকময় হেরি। 
লোভ মোহ কাম ক্রোধ, করে নাক উপরোধ, 
পলাইল জন্মশোধ, যারা ছিল জ্ঞান রত ঘেরি গো, 
যারা ছিল জ্ঞান রত্বু ঘেরি। 
ফুটিল প্রবোধ পদ্ম, সুগন্ধি সংসার সম্ম, 
ঘুচিল সকল ছন্ম, জ্ঞান পথে হইনু পথিক গো, 
জ্ঞান পথে হইনু পথিক। 
হইলাম পরিনামে, নিত্যজ্ঞান পথের পথিক গো, 
নিত্যজ্ঞান পথের পথিক।। 
"ভবে দেখ মহাশয়, সংসার বিরূপময়, 
এরূপ সকলে নয়, নরলোকে কতরূপ নর গো, 
নরলোকে কতরূপ নর। 
বরং মনে অনুমানি, অজ্ঞানী হইতে জ্ঞানী, 
অল্পাংশ বলিয়া জানি, অবিদ্যা সংকুল চরাচর গো, 
অবিদ্যা সংকুল চরাচর।| 


(জয়শঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের অস্তঃপুর) 
(সৌদামিনীর শয়নাগার) 
(ক্ষেমস্করীর প্রবেশ) 
ক্ষেমা। (আপনার নয়নাশ্র মুছিতে মুছিতে এবং সৌদামিনীর চক্ষের জল মুছাইতে 
মুছাইতে)। ওঠ মা! ওঠ; ওঠ ওঠ; সারা হলে যে মা! আর কেঁদোনি!। হায়! 
সোদু সোদু আমার! তোকে ন্যে আমি এখন কি করি; কোথায় যাই; এমন 


৩২১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কর্যে কি মানুষে বাঁচে! হা! পোড়া কপাল! তোর কি কখনই সুখ দেখতে 
পেলোম নারে! হেদয়দরিত ধারায় রোদন)। 
সৌদামিনী। (আরও অভিমানিনী হইয়া দরদরিত ধারায় রোদন করিতে করিতে, মনে 
মনে)। হা ধর্ম! তোমার কি এই কর্ম! আমি দিবানিশি যেমন. ধর্ম কর্ম 
করি! তুমি, এই কি তেমনি তাহার ধর্্ম রক্ষা করিতেছ! হা! তোমার দোষ 
কি; সকলি অদৃষ্টের দোষ! তোমাকে কি বলিব; অদৃষ্টকেই ভ্সনা করিতেছি। 
হে অদৃষ্ট! তুমি অদৃষ্ট! যদি তাহা না হইতে; তবে কি স্বহস্তে তুলিয়া এই 
বিষপান করিতাম! এমন নির্দয় নিষ্টুরের হস্তে জন্মের মত আত্ম সমর্পণ 
করিতাম,_না, এত কষ্ট পাইতাম!। 

(আপন স্বামি ভূধরকে মনে করিয়া) 
হা! জন্ম বিফল হইল রে নৃশংস নিষ্ঠুর! তুই অতি পাষণ্ড মুর্খ! না প্রাণ 
ধরিয়া কখন আমার এ দুর্দশা করিতে পারিস্‌! তুই গুরুজন! ইহকাল তো নষ্ট 
করিলি! আবার পরকালও নষ্ট হইবে বলিয়া তোকে আর অধিক বলিতে 
শঙ্কা হইতেছে; মনের দুঃখ মনেই রহিল। 
ক্ষেমা। (ভূমি শয্যা হইতে সৌদামিনীকে কোলে আকর্ষণ করিতে করিতে)। ছিঃ মা! 
ছিঃ! অমন কত্তে আছে? কি কবের্য বল; যেমন তপিস্যা কর্যে এসেছ; তা 
কি আর কাউকে ভূগ্‌্দ্যে হবে? ব্রন্মাশাপ না হলে সতিনীর জ্বালায় ভুগ্্‌দ্যে 
হয় না; ক্ষান্ত হও মা! যা হবার তা তো হয়েই গেছে; তা তোমার সাধ্য কি; 
আমিই বা কি কব্ৰ্যো বল! এখন তুমি একপ্রকার নিশ্চিন্দী হলে; বাছা! 
পরমেশ্বর তোমাকে একপ্রকার নিশ্চিন্দী করেছেন; কি কব্বর্যে ভদ্যর নোকের 
ঘরে জন্মেছ,পুণ্যি ধর্ম কর, এখন দুটো খাও দাও, আর ঈষ্ঠীদেব্তার নাম 
নেও, পরকালে ভাল হবে। যদ্দিন বেঁচ্যে আছি, তদ্দিন ভূগি, মলেই সব্‌ 
ফুরুলো; দেখতে আসবো না। 
সৌদামিনী। (ক্ষেমান্করীর গলা ধরিয়া, রোদন করিতে করিতে)। তা নয় মা! বুঝি 
পোড়া কপালে আবার ব্রহ্মশাপ হলো!। না মা! আমি আর আহ্বিক শিখবো 
না; আমার আহ্রুকে কাষ্‌ নেই মা! গুরুমস্তর কাণে যা উঠ্যেছে, তাই ভাল। 
(উচ্চৈঃম্বরে রোদন)। 
ক্ষেমা। (আশ্চর্ধ্যা্িতা হইয়া)। কেন? কেন মা! সে কি? আহ্িকে অচ্ছেদ্দা 
কেন হলো! ঠাকুর মশায় মন্দ নোক নাকি? ওমা! যাব কোথা মা! কি কাল 
পড়্যেছে মা! গুরুকেও যে আর বিশ্বেস রইলো নেই! তিনি কি বলেছেন? 
বল তো?। 

(সৌদামিনী অধোবদন) 

ক্ষেমা। কেন? কেন? কেন মা! আমার কাছে নজ্জা কি? বল না? সব ভেঙ্গে 


৩২২ 


ূ সপত্বী নাটক 
বল তো? আমি তার গোর্সীইপণা আজ শেখাব এখন, তিনি বড় গোসীয়ের 
ব্যাটা গোর্সাই হয়্যেছেন,_বাব্রী কেটেছেন,_্দাতে মিশী পরেছেন, __ 
লাগারা পায়ে দিয়া বেড়াচ্ছেন, পৈতের গোচ্ছা করেছেন। মর্‌ মিন্ষে! 
পিপ্ড়ের পালক বেঁদেছে? 
লৌদামিশী। (অধোবদনে)। ওমা! আর বলবো কি, তার দোষ কি? পোড়া 
কপালেই তো সব্‌ কর্যে রেখেছে! উনি আজ চারিদিন হলো আমাকে মস্তর 
দিয়েছেন; নিত্যি নিত্যি ডাকতে না ডাকৃতেই আহ্বিক শেখাতে আসেন, সে 
দিন তো কাণে এক রকম একটী মস্তুর দিয়েছিলেন, এখন আবার রোজ 
রোজই যে কত রকম মস্তর দেন, তা আর বল্বার নয়! আমি সব বুজেছি 
মা! আমার অমন ধম্ম কম্মে কায নি! আমি অমন গরু মেরে জুত দান 
কর্যে পরকাল খেতে পার্বো নে! ওই ঠাক্রুণ্‌কে বল, আমাকে আর 
শেখাতে হবে না, আমি সব মস্তর শিখেছি, তারা, আমার হাতে মালা পৌদে 
খোলা তো দিয়াছেনই, আবার কেন পরকালটা নষ্ট কত্তে বস্লেন। (রোদন)। 
ক্ষেমা। (সবিস্বয়ে)। ফ্য! গোসীঈ? কি সব্বনাশ মা! 
সৌদামিনী। বলিস্‌ কি?। রসো রসো; আমি তাঁর এখনি বিহিত কন্তেছি। কি 
কলিলাম মা।__ হা সবর্বনাশ! 

অভিতপ্রায়। 


পদ্য। 


হায় ধর্ম একি কর্ম্ম মন্ত্ম হয় ভেদ। 
পৃথিবী পুরিল পাপে কত করি খেদ।। 
যে দিকেতে যাই চাই যে দিকে যখন। 
বাত্যা সম বহিতেছে দুষ্ৃতি পবন।। 
সমূলে নির্মূল হৈল ধর্ম রূপ তরু। 
চৌর্য্য হৈল তৌর্য্য সম কোথা আর হিত।। 
মিলিয়া গিয়াছে সৌর্য্য ত্রৌর্য্যের সহিত।। 
দৌর্য্যভাবে পরিপূর্ণ সতের মানস। 

ধর্ম ধৌর্যয ধরিবারে কে করে সাহস।। 
পুরক্ত্রীরা পৌর্য্য পণ করি পরিহার। 
লইয়া নাগর্যাভাব করয়ে বিহার।। 

যদি কেহ থাকে সতী পতি ধন লয়্যে। 
কি দুরস্ত কলিকাল গ্রাসে শনি হয়্যে।। 
সুখের সহিত তার ঘটায় শাব্রব। 


৩২৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কান্দিয়া কাটায় কাল নাহি পায় ধব।। 
সতিনী যন্ত্রণা আর যে সব উৎপাত। 
একে একে কলিরাজ করে সুত্রপাত। 
পুণ্য ধন গণ্য করে নাহি কেহ আর। 
ধরণী হইল এক পাপের আগার ।। 
নারী আর নর যদি হৈল কাছাকাছী। 
অমনি গ্রাসিল ধর্ম নাহি বাছাবাছী।। 
ধন্মাধন্ম বোধ নাহি নাহি পাত্র বোধ। 
হাজার হাজার আছে এরূপ দুবের্বাধ।। 
এরূপ অনেক আছে আধুনিক জ্ঞানী। 
সেজেকুজে বলে আমি বড় ব্রহ্গজ্ঞানী।। 
₹কোচ ইন্দ্রিয় সুখের অনুরাগে । 
খাদ্যাখাদ্য বিচার ছাড়িয়া দেয় আগে।। 
মুখের সাপট আর চাপট কেমন। 
লম্পটের শিরোমণি না হেরি তেমন।। 
বিশ্বেতে তাদের নাই আত্ম সম জ্ঞান। 
বাহিরে বড়াই কত কত রূপ ভান।। 
পরদুঃখে দুঃখ বোধ না করে বারেক। 
মমতার বশীভূত না হয় তিলেক।। 
কুকাণ্ডে ব্রন্মাণ্ড-কিস্ত দেখে একাকার । 
পরদারে মনে করে আপনার দার।। 
পরধন পাইলে স্বধন বলি লয়। 
কালগুণে একালেতে তাহাদেরি জয়।। 
হায় হায় একি পবর্ব দেখি হুলস্ুল। 
জলেতে কুস্তর ভয় স্থলেতে শার্্দল।। 
পাছে কেউ দেখে শোনে তাই সে সতর্ক। 
ধন্মের বিতর্ক মনে নাহিক সম্পর্ক। 
স্থান আর সময় মানুষ যদি পায়। 
পাপিন্ঠেরা তবে কি ধন্মের মুখ চায় 211 
রমণী আপনি যদি না করে যতন। 
কার সাধ্য রক্ষা করে সতীত্ব রতন।। 
এত দিনে ধর্ম তুমি ধর্ম নাম হরি। 
করিয়াছ পলায়ন লীলা সাঙ্গ করি।। 


৩.৪ 


ৃ্‌ সপত্বী নাটক 

ভারতে করিতে রাজ্য বাঞ্চা নাই আর। 
ছাড়িয়া গিয়াছ তাই রাজ্য অধিকার ।। 
এখন রাজত্ব করে অধর্ম্ম রাজন। 
তাই এত মনঃপীড়া পায় প্রজাতন || 
তোমার অমাত্য যিনি সত্য নাম যাঁর। 
তাই বুঝি তার দেখা নাহি পাই আর।। 
অধর্ম্ের মন্ত্রির অসত্য রাক্ষস। 
প্রজালোকে করিয়াছে কুমন্ত্রণা বশ।। 
ভূৃত্যের উপর স্বামী শ্নেহবান্‌ নন্‌। 
ভৃত্য করে স্বামীর অহিত অথেবণ।। 
বনিতার প্রিয় নন বনিতার পতি। 
পতির প্রেয়সী নয় অবলা দুর্মাতি।! 
ভাই নয় ভাই, ভাই প্রেয়সীর ভাই। 
পিতা মাতা গুরুজনে ভক্তি লেশ নাই।। 
সাংঘাতিক রোগে রুগ্ন সাংসারিক সুখ। 
সত্য সদাচারে দেখি সবাই বিমুখ।। 
লোকে আর কণামাত্র নাহিক সংকোচ। 
নাহিক সংকোচ লোকে নাহিক সংকোচ।। 

(সক্রোষে প্রস্থান) 


সৌদামিনী। (রোদন করিতে করিতে মনে মনে) হাঁ! আমার মত হতভাগা রমণী 
ত্রিজগতে নাই! স্বামী দ্বিতীয়বার দার পরিগ্রহ করিলেন। স্পত্রী মন্তরণাই 'আমার 
জীবনের প্রধান উপভোগ হইল। হউক, তাহাতেও দুঃখ করি ন!। যেমন 
আরাধনা করিয়া আসিয়াছি তাহাই ভূগিতে হইবেক। শ্বশুর শাশুড়ী ননদ 
প্রভৃতি পতিকুল স্বভনেরা অকুতাপরাধে এককালে বিষনয়নে দেখিয়াছেন। 
পিতৃকুল নিশ্দুলঃ ক্ষেমাই মাতা ও পিতৃকুল স্বজন: একমাত্র আশ্রয়স্থল। 
একা তাহা হইতেই বা কি হইতে পারে£। 

হায়! এসকল সহ্য করিয়াও কি স্ত্রীর পরম ধন সতীত্ব রক্ষা করিতে পারিলাম 
না! জগদীম্বরের মনে কি আছে জানি হ্বা। সতিনীকে ভগিনীর ন্যায় জ্ঞান 
করিতেছি। শ্বশুর শীশুড়ী ননদ প্রভৃতি পতিকুল স্বজনেরা যাহা আজ্ঞা 
করিতেছেন তাহাই করিতেছি; হে জগদীশ্বর! এ পাপীয়সীর আবার কি পাপ 
দেখিলে! যে, এখনও এত বিড়প্বনা করিতে! 

নির্দয় শ্বশুরকুল--স্বজনগণের মত, আমি এজন্সের ত সাংসারিক সুখে 


৬৮ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


এককালে জলাঞ্জলি দিয়া, কেবল দাসীবৃত্তি করিয়া কালক্ষেপ করি। ঠাকুর! 
তাহাই করিতেছি আবার এ অপরাধিনীর কি অপরাধ হইল। শাশুড়ী অনুমতি 
করিলেন অস্তর নে, গোর্সাইয়ের নিকট পুজা শেখ, ভদ্র লোকের ঘরের মেয়ে 
এক একবার আহিদি করিবিঃ এই অনুমতি আমি সৌভাগ্য চিহ স্বীকার 
করিয়া লইলাম। যদিও বাল্যকালে বাশসল্য উপভোগ করিতে পাই নাই; 
যৌবনেও যৌবনদশার চরিতার্থতা লাভ হইল না,প্রতুত বার্ধক্য ব্যবহার 
করিতে হইল, তথাপি আমি অগত্যা দৃঢ়তর ভক্তি পুবর্বক তাহাই 
করিতেছিলাম। হায়! কি পোড়াকপাল! তাহাতেও আবার গরল উঠিল! 
গৌসাইয়ের নটবর বেশ দেখিয়া, আমি প্রথমেই বলিয়াছিলাম ঠাকুরাণি! 
আপনি আমার মাতা, আপনিই আমার কর্ণে মন্ত্র প্রদান পুবর্বক কৃপা করিয়া 
আহিটী শিখাইয়া দেউন। দুর্ভাগ্যক্রমে তখন তাহা করিলেন না; এখন এই 
দুবির্বপাক উপস্থিত, এদিকে গুরুভক্তি বড়, এ সকল শুনিলে যে তাহারা 
বিশ্বাস করিবেন এমতও বোধ হইতেছে না, প্রত্ুত আমাকে তিরস্কার 
করিবেন। হায়! কি পোড়াকপাল! এ, আবার কি কন্দোল উপস্থিত হইল; 
গঞ্জনা ভয়ে প্রাণ থর থর করিয়া কাপিতেছে। হে ঠাকুর! আর কেন? 
হইয়াছে; লও লও; এখন এ অভাগিনীকে ত্বরায় মুক্ত কর। 
অভিপ্রায় । 


 পদ্য। 
হায় রে নিষ্ঠুর পতি, তোমা হৈতে এ দুর্গতি 
ধন্মপথে রাখি মতি, আঁখিতে না হ্রিলে বারেক হে। 
আঁখিতে না হেরিলে বারেক। 
কিবা দৌষ কি কারণ, পাষাণে বাধিলে মন, 
করিলে নির্ঘাত পণ, পাশরিলে সকলি সাবেক হে। 
পাসরিলে সকলি সাবেক।। 
আমি দীনা কুলবালা, সই বল কত জ্বালা, 
হই সদা ঝাঁলাপালা, নই কি তোমার ধর্মমদাসী হে। 
নই কি তোমার ধর্মদাসী। 
তবে বল কোন প্রাণে, শুনিয়া না শুন কাণে, 
দিবে গলে কেবা জানে, সতিনী যন্ত্রণারূপ ফাসী হে। 
ৃ সতিনী যন্ত্রণারূপ ফীসী।। 
দুঃখ কব কার কাছে, এখন পরাণ আছে, 
দিবানিশি ভাবি পাছে, হারাই সতীত্ব স্বচ্ছ মণি হে। 


৩২৬ 


ৃ সপত্বী নাটক 
হারাই সতীত্ব স্বচ্ছ মণি।। 
তুচ্ছ করি সবর্ব দুঃখ, দুঃখেরে মানিয়া সুখ, 
নিবারি সুখের ভূখ, জান তো সকলি গুণমনি হে। 
জান তো সকলি গুণমণি।। 
সে বরঞ্চ ভাল জ্বালা, এ যে দেখি বড় সব্র্নাশ হে। 
এ যে দেখি বড় সবর্বনাশ।। 
না হেরি ইহার বাহা, শূন্য ঘরে ভূতে করে বাস হে। 
শূন্য ঘরে ভূতে করে বাস।। 
বারেক সদয় হও,আসি দুটো কথা কও, 
এ ঘরে তিলেক রও, তবে যায় ভূতের উৎপাত হোে। 
তবে যায় ভূতের উৎপাত।। 
শুরুজন সমুদয়, তাঁদের এ ধন নয়, 
কি জন্যে হইবে ভয়, কেন এত কর পক্ষপাত হে। 
কেন এত কর পক্ষপাত ॥। 
দুরাশয় গৃহজন, করিতেছে নিপীড়ন, 
ওহে অবলার ধন, প্রাণধন! কর পরিত্রাণ হে। 
প্রাণধন! কর পরিত্রাণ । 
সকল উৎপাত হর, সতীর কল্যাণ কর, 
ওহে কান্ত দয়াকর, দোহাই দোহহি রাখ মান হে। 
দোহাই দোহাই রাখ মান।। 
শুনিয়াছি শাস্ত্রে কয়, গুরু নিন্দা ভাল নয়, 
অস্ভে অধোগতি হয়; অতএব মনে পাই ভয় হে। 
অতএব মনে পাই ভয়। 
কিন্তু খবিগণ কন, গুরু যদি দোবী হন, 
বলিবেক সে বচন, তাই. বলি প্রাণে নাহি সয় হে। 
তাই বলি প্রাণে নাহি সয়। 
কৃষ্ণলীলা ভাল বটে, গোস্বামির শাস্ত্রে বটে, 
কিন্ত কিছু পাপ ঘটে, যদ্যপি না হই সাবধান হে। 
যদ্যপি না হই সাবধান।। 
যদি হয় কাচা মেয়্যে, পাশরে গোসীাঈ পেয়্যে, 
ধর্ম্মাধর্্ম সব খেয়ে, তাহারা না পায় পরিত্রাণ হে। 


৩২৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তাহারা না পায় পরিভ্রাণ।। 
গোরসীঈ কষাই প্রায়, কুলবধূ ধর্যে খায়, 
ধর্্মপানে নাহি চায়, এতো দেখি বড় ঘোর দায় হে। 
এতো দেখি বড় ঘোর দায়। 
£খ কই কার ঠাই, দেশে আর হিদু নাই, 
কিরূপে নিস্তার পাই, দেহ ছাড়ি দেহী না পলায় হে। 
দেহ ছাড়ি দেহী না পলায়।। 
কে দেয় ইহার সাজা, নিজে গোখাদক রাজা, 
মনস্তাপে হই ভাজা, প্রজাকুল আকুলহৃদয় হে। 
_... প্রজাকুল আকুলহাদয়। 
এ সময় দয়াময়! যদি তব দয়া হয়, 
তবে সব দিক রয়, দূর হয় এ বিষম ভয় হে। 
দূর হয় এ বিষম ভয়।| 
হেরিপ্রিয়ার শয়নাগার) 
(হরমণির প্রবেশ) 
হরমণি। (হরিপ্রিয়াকে সম্বোধন করিয়া, সাহংকারে) শুনেছিস গা! ঢং শুনেছিস? সং 
দেখ্যে দেখ্যে আর বাঁচিনে যে: জলে জ্বলে, মলেম! গুরু, মনে ধর্লো নি; 
আবার একটা কান্‌ কর্যেছেন! ক্ষেমাকে লক্ষ্য করিয়া) মর্‌ ডেক্রা মাগী; বাপ্‌ 
কেল্যে মেয়ে পেয়েছে! __আর সওয়া যায় না! “মা মরে বীয়ের জনো, 
বী মরে নাঙের জন্যে 1!!। 
হরিপ্রিয়া। (সবিরাগে) মরুক্‌ মেনে! ক্ষেম! ভাই! এতক্ষণ আমাকে জালাচ্ছেল; 
আমি অম্নি গায়ের রাগ্‌ গায়ে মেরে মেরো, চুপ্‌ কর্যে রৈলুম, আর কিছু 
বলগুম না। 
হরমণি। (ব্যস্তভাবে) কিছু না৷ বলাও কি ভাল হয়্যে হে। গোসীই শুল্লে এখন 
জ্বল্যে উট্ুবেন;ঃ মনে কত দুঃখু কবের্ন; আহা! তিনি কি এমন নোক গা! 
দেখলে চক্ষু জুড়োয়; এই যে আমি তীকে নিয়ে কত রাত্রি পর্যস্ত্য কত 
মস্তর শিখি; কত উপকথা কই, তার মুখের পানে চের্যে কত শাস্তরের কথা 
শুনি; এত কি ঢল্য়ে থাকিঃ কাবের্বা কি বল£ “খাট ভাঙিলেই ভূঁই শব্যা” 
ডাকের কথাই পড়ে রয়েছে; ঠা হলেই কি এত ঢলাতে হয় গা! না, এত 
নোক হাসাতে হয়। আমরাও তো সব হলোম কুলীনের মাগ্‌ঃ স্বামী কেমন 
সামিশ্রী, কাল কি ধল ভাল করে চক্ষেও দেখি নে! আমরা কি আর পৌদে 
কাপড় দি না গা! না কাল কাটাই না।__এত ফেচক্যে ফেচক্যে উঠি! 
“নেঁয়ের কুকুর পাতে ভোজে”!!1। 


৩২৮ 


সপতী নাটক 

হরিপ্রিয়া। চুপ্‌ কর মা! ও, যা করে করুক, মরুক! আমাদের আর ও 
কথাতেই কায নি! কন্তা শুল্লে আবার বেজার হবেন। ওর এহ কালও নেই, 
পরকালও নেই; ও, হিংসেতেই ফেট্যে মলো। দূর হোক, নিত্যি নিত্যি আর 
ও সকল ভাল লাগে না।--“অসৈরণ দেখতে নারি, শিকেয় পৌদদ্যে ঝুল্যে 
মরি!!! 

(ক্ষেত্র মোহিনীকে সম্বোধন করিয়া)0১) 
লক্ষি! সোণা মা আমার; একটু জল আন তো! তুমি আর ও পোড়ারমুখীর 
ছাই মাড়িও না!__-ওর অসাদ্দী কম্ম নেই, সব্বনাশী।__“না যাব বঙ্গ, না 
দেখবো রঙ্গ” বিষ দিয়ে মেরে ফেলবে! ও সব্বনাশীর কি ধম্মাধম্ম বোধ 
আছে? কেবল কতকগুনো কল্লা শিখেছে।--“অর্গুণ নেই, বরগুণ আছে!!!। 

(রসিককৃষ্ণ গোস্বামীর প্রবেশ)২) 

রসিক। (কুঁড়োজালি হস্তে নটবর ভাবে)। রাধে! রাধে! তোমার ইচ্ছা! (হেরিপ্রিয়াকে 
সম্বোধন করিয়া)। কোথা গে! গিন্নি মা! কোথা গেলে £হেরমণিকে সম্বোধন করিয়া) 
দিদি কোথা গো! কি করিতেছঃ প্রেমময়ী! তব কিন্করোহহং। (দীর্ঘশ্বাস 
পরিত্যাগ) । 
হরিপ্রিয়া। (ব্যস্তভাবে) এসো এসো, গোসীঈ! এসো, বসো বসো। 

(আসন প্রদান প্রবর্বক গলবস্ত্রে প্রণিপাত) 
হরমণি। (হাস্যবদনে) এই যে গোসীই দাদা। 

(গলে অঞ্চল দিয়া ভূমিষ্ঠা হইয়া প্রণিপাত) 
রসিক। (সন্তভোষে সম্পৃহমনে) প্রেমময়ী! চিরসস্তোষ মানময়ী! চিরসম্মানে রাখ। 

(হাস্য বদনে উপবেশন) 

হরমণি। (হাসা বদনে)। মানময়ীর যে বড় মান শুস্তে পাই--গুরুভক্তি কেমন 
দেখ্ছ?। 
রূসিক। (ঈষদ হাস্যবদনে)। রাধে! রাধে! ছেলে মানুষ এখনও বড় বুদ্ধি শুদ্ধি 
হয় নাই; হইবে ক্রমেই হইবে। সবুরে মেওয়া ফলে!!_-“তপ্ত ভাত ফুঁক 
দিয়া খেতে হয়!।” 
হরিপ্রিয়া। (বিরক্তভাবে)। হর! কই? গোসাঈকে যেন ছল দিলি গা! কথা 
পেল্যে তোদের কি আর কিছুই মনে থাকে না!। বলে“সবাই থাকে রঙ্গে, 
বুড়ী মরে সঙ্গে সঙ্গে!!!” 
হরমণি। সেবিস্ময়ে)। ও মা! বটে তো, ভুল্যে মরেছি গো! কই আমার পেতে 
দীও। (ফল গছানব্রত, হাতে হাতে ফল সূত্র ও কড়ি প্রদান) 


(১) ভূধরবাবুর 
(২) গুরু গৌসাই 


৩২৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা স্রহিত্য 


রসিকা। (রোমাঞ্চগাত্রে হাস্যবদনে হরর চক্ষে চক্ষু মিশাইয়া নাস্তিকে)। আ!11_ 
চোরের রাত্রিবাস!!1! (ফলগ্রহণ পূর্বক প্রকাশে)। প্রেমময়ি! প্রসন্না হও; হেরকে 
সম্বোধন করিয়া) যেমন হাতে হাতে ফল দিলে, তেমনি হাতে হাতেই ফল 
পাইবে। 
হরিপ্রিয়া। (বিরাগে)। হর! ও কি কচ্ছিস্‌ গা£ঃ তোরে কি একবারে বল্লে হয় 
না গা! ছোট বৌমাকে নিয়া ফল দেওয়ানা। 
হরিমণি। আয় লো ছোট বৌ! ফল দেসে?। 
রূসিক। হেস্তে হস্তে ফল গ্রহণ করিয়া)। এসো, কৃষ্ণে মতি হউক। 
(আশীব্বদি করিয়া প্রস্থান) 
রামব্রন্ম। (জয়শঙ্করকে সম্বোধন করিয়া)। হা, কি কহিতেছিলাম মহাশয়? (ক্ষণেক 
চিন্তা করিয়া)। হা।__আর আপনারা ইহাও চিন্তা করিয়া দেখুন, সংসারে সকল 
লোকেই কিছু এককালে এমন বিদ্বান হয় না যে বিশ্বরূপ পুস্তক দৃষ্টি করিয়া 
এশ্বরিক নিয়ম সকলই অবগত হইতে পারে ও তদনুগামী হইয়া চলিতে 
পারে। ইহাও জগৎকর্তার একপ্রকার অভিপ্রায় বটে, সংশয় কি? তবেই স্থির 
করুন, পৌত্তলিক ধর্ম্মের সার্থকতা আছে কিনা? 
প্রতাপ। ভাল মহাশয়! পৌত্তলিক ধর্ম্ম নিয়মের বিলক্ষণ তাৎপর্য আছে বটে 
বুঝিলাম; কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, এই পৌত্তলিক ন্মনিয়ম, সম্প্রদায় ভেদে 
পৃথক্‌ পৃথক্‌ হইবার তাৎপর্য্য কি?! 
রামব্রক্ষম। হাঁ, জিজ্ঞাস্য বটে; কিন্তু উত্তরকল্পে স্থিরচিত্তে চিস্তা ও বিবেচনা 
করুন, যদি এক বিষয় উদ্দেশে পাঁচজনে স্বতন্ত্র পাঁচটী রচনা করা যায়, তবে 
কি সেই পীচটী রচনাই সমান হয়ঃ সকলেরই উদ্দেশ্য স্থির থাকে বটে, 
ফলিতার্থ, প্রক্রিয়া অবশ্যই প্রভিন্ন হইয়া পড়ে। শান্ত্রেও নির্দেশে আছে 
“ভিন্নরুচি হি লোকঃ, ভিন্ন ভিন্ন লোকের ভিন্ন প্রকৃতি। আর, দেশ বিশেষে 
আয়ু স্থাপক বায়ুরও গতি শেষ আছে; ইহাও উহার এক প্রধান কারণ হইতে 
পারে। বাসু। ভাল ব্রস্তচারি মহাশয়! পৌত্তলিক ধর্্মনিয়ম করিয়া চলা কি 
ভাল তাহাতে কি জগদীশ্বরের আরাধনা করা হয়£এবং সুকৃতি জন্মে?। 
জয়শঙ্কর। (হাস্যবদনে)। ও কথা আর জিজ্ঞেস করিতে হবেক কেন হে? 
ব্রশ্মাচারি মহাশয় ইতঃপুবের্ব তো ইহাই*ন্যস্ত করিয়া রাখিয়াছেন। অহহ! কি 
আশ্চর্য্য! মহাশয়ের ব্রম্মাচারি মহাশয়ের প্রসাদে দিব্য জ্ঞান পাইলাম। 


কবিতা। 
পরাৎপর পরব্রহ্গ বিশ্ব বিরচক। 
দ্বিতীয় রহিত সনাতন প্ররোচক।। 
গড় বল; জ্যোভ বল, বল জ্ঞুপিটর। 


৩৩০০ 


সপত্বী নাটক 
খোদা বল, আল্লা বল, বল বা' ঈশ্বর ।। 
সকলি তাহার সংজ্ঞা তিনি বিশ্বময়। 
কি ফল করিয়া বল, বিফল সংশয়।। 
কেহ তারে জ্যিয়োভা জ্যিয়োভা বলি স্মরে। 
কেহ বা জ্যিয়োভা নামে সদা দ্বেষ করে।। 
অদ্ভুত তাহার মায়া ছায়াবাজী সম। 
কায়াবাজী করে জীব বহে শুধু ভ্রম।। 
শ্রীষ্ট আর কৃষ্ নামে ভেদ জ্গান যার। 
তারেই পাষণ্ড বলি পাষণ্ড কে আর।। 
পুরুষপ্রধান তিনি প্রকৃতি প্রধান। 
রচিতে প্রকাণ্ড বিশ্ব বহুরূপ ভান ।। 
রাধা নামে বাধা যিনি বংশিধারি প্রেমে। 
সীতা নামে প্রকাশিতা প্রকৃতির ক্ষেমে।। 
বৃন্দাবনে বনে বনে বাজাইয়া বাঁশী। 
মজান গোপের কুল কংশ বংশ নাশি।। 
জনকের গৃহে শুধি জনকের ধার। 
ব্ামরূপে রাবণের করেন উদ্ধার । | 
বার বার কত বার কত লীলা তার। 
কে যাইতে পারে পার, অপার সংসার ।। 
স্থল জল ব্যোম বহি বায়ুরূপী তিনি। 
না চিনে তাহারে কিস্তু সবে বলে চিনি।। 
কেহ বলে বাড়ি তার বৃন্দাবন ধামে। 
কেহ বলে মক্কাবাসী মহম্মদ নামে।। 
কেহ বলে তার বাস জুডিয়া নগর। 
কেহ বলে অলিম পিয়স্‌ ধরাধর।। 
কেহ বলে দেখিয়াছি পুরীমধ্যে আমি। 
জগন্নাথ নামে তিনি উড়িষ্যার স্বামী ।। 
কেহ কয় সেতো নয় তাহার নিলয়। 
কালীঘাটে তার সঙ্গে সদা দেখা হয়।। 
কেহ কন তিন হন পঞ্জাবের পতি। 
ধরিয়া নানক নাম করেন সদগতি।। 
তা নয় তা নয বলি আর জন কয়। 
ভৈরব তাহার নাম ভোটাস্তে নিলয় ।। 
নামাগুরু নামে তিনি মর্ত্যমুর্তি ধরি। 


৩৩১১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


তরান তারকক্রন্মা মর্তে অবতরি।। 
কেহ বলে চন্দ্রনাথে বিরাজেন তিনি । 
সে দেশে আমার বাস আমি ভাল চিনি ।। 
কেহ কয় তাতো নয় কাশী তাঁর বাস। 
কেহ কহে গয়া কিম্বা প্রয়াগে নিবাস।। 
কেহ বলে আকাশে বিকাশমান তিনি। 
বড় জল আলো অন্ধ রৌদ্র সৌদামিনী।। 
এইরূপে লোক সব করয়ে বিবাদ। 
ফলতঃ নিবর্বাদ তিনি বিবাদ কি বাদ।। 
যাহা বলি এ সকলি তাহার বিকার। 
মনে লয় বিশ্বময় তিনি বিশ্বাধার।। 
পশুপক্ষী কীট আর পতঙ্গ ভুজঙ্গ। 
সকলি তাহার অঙ্গ সব তাঁর রঙ্গ।। 
মর্তভে এ সকল মর্ম করিতে প্রচার। 
হইয়াছিলেন নিজে দশ অবতার ।। 
মীন্রূপে তিনপুরী তরান্‌ তারক। 
ত্রিদশ প্রধান তিনি ত্রিতাপ হারক।। 
এইরূপে করিলেন বেদের উদ্ধার; 
হইল ধরণী ধামে ধন্ছের সঞ্চার ।। 
দীননাথ দ্বিতীয় রূপেতে অবতরি। 
ভাসেন কারণ জলে পৃষ্ঠে ধরা ধরি।। 
কর্মভূমি রক্ষা হেতু কুন্মরাপ তার। 
অক্রেশে ধরেন এই ধরণীর ভার।। 
বিশাল বরাহরূপ বরাভয় বূপ। 
উদ্ধার করেন বিশ্বব্ূপ ধর্মকুপ :। 
নৃসিংহ আকার তিনি করিয়া স্বাকার। 
হিরণ্যকশিপু বধি হরেন ভার || 
বলিকে ছলেন তিনি হইয়া বামন! 
রামরূপে করিলেন রাবণ নিধন।। 
পরশু লইয়। করে সুশাণিত ধার। 
কোন রূপে করিলেন ক্ষত্রিয় সংহার।। 
গোকালে গোপের গৃহে আর রূপ ধরি! 
ব্রেন আনবী লীলা আশা মতি সার ।! 


বুদ্ধরীপে খুর্দির করেন বলল, 


তা 


সপত্বী নাটক 
কে জানে তাঁহার তত্ব জানে শুধু বেদ।। 
সম্ভল গ্রামেতে বিষ্ুযশার আলয়। 
কক্কিরূপে বার বার করেন প্রলয়।। 
কে চিনে তাহায় বল কে চিনে তীহায়। 
ভোজবাজী সম বাজী এ যে চিনা দায়।। 
বার বার কতবার এইরূপ খেলা। 
এ খেলা খেলিতে তার নাহি অবহেলা ।। 
এ সব দেখিয়া জীব ভাব বুঝ ভবে। 
সারাংশ গ্রহণ কর, জ্ঞানী হবে তবে।। 
খাদ্যাখাদ্য বিচার আছয়ে যত আর। 
বলিতে বিস্তার হয় প্রস্তাব বিস্তার।। 
অতএব লোক সব সম্প্রদায় ধর্ম লয়্যে।। 
সম্প্রদায় ধর্ম হয় সুখের আকর। 
অনায়াসে হবে পার সংসার সাগর।। 
অন্যথা সংকোচ কিম্বা সন্দেহ সংসয়। 
কর মন বিসঙ্জন হইবেক জয়।। 
এটা ওটা সেটা বৃথা ভাব ক্রমে ক্রমে। 
বৃথা শ্রম বয়ঃক্রম কাট বৃথা ভ্রমে।। 
ধরিয়া করালমৃূর্তি এই বিশ্বপতি। 
সুকৃতি বুঝিয়া অস্তে করিবেন গতি।। 
শেষের সেদিন বড় ভঙ্কর দিন। 
একবার ভাব মন হইয়া প্রবীণ।। 
ভাই বন্ধু সুত দ্বারা তারা নয় কেহ। 
যতই যতন কর না রবে এ দেহ।। 
আত্মীয় স্বজন কেহ সঙ্গে নাহি যায়। 
সুকৃতি সহায় তথা সুকৃতি সহায়।। 
(নেপথ্যে মহান্‌ কল কল) 
অভি শ্রাম্ব। 


পদ্য। 


ও মা! ও মা! সে কি? সবর্বনেশ্যে মেয়ে একি। 
কানে শুনি নাই, এমন বালাই, 
সোণার সংসার হৈল মেকি।। 


৩৩৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
মর্‌ মর্‌ পোড়ামুখী, এত কি হইলী দু'খী। 
সতিন কি আর, হয় নাই কার, 
জান না তুমি কি কিছু খুকী?।। 


কি হল্যো রে সবর্বনাশ, ও মা! তুই কোথা যাস্ঃ। 
ধর না ধর না, বারণ কর না, 
এখন আছে গো বুঝি শ্বাস?।। 


তত্ব না করেন রাজা, কে ইহার দেয় সাজা। 
_ বাবারে কি কব, কতই বা সব, 
দুঃখানলে হইতেছি ভাজা ।। 


(জয়শঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের খড়্‌কি পুক্করিণী) 
€হরিপ্রিয়া, হরমণি, ক্ষেমক্করী ও ভবদেবের€১) প্রবেশ) 
হরিপ্রিয়া। (ক্রোধ বিল্ময়ে)। | 
ওমা! ওমা! সে কিঃ সব্র্বনেশ্যে মেয়্যে একি। 
কাণে শুনি নাই, এমন বালাই, 
সোণার সংসার হৈল মেকি।। 
হরিমণি। (আক্রোশে দত্ত কড়মড়ি করিতে করিতে)। 
মর্‌ মর্‌ পোড়ামুখী, এত কি হইলি দুী। 
সতিন কি আর, হয় নাই কার, 
জান না তৃমি কি কিছু খুকী?।। 
ক্ষেমা। ডেচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে করিতে)। 
কি হৈল রে সবর্বনাশ, ও মা! তুই কোথা যাস্£। 
ধর না ধর না, বারণ কর না, 
এখন আছে গো বুঝি শ্বাসঃ।। 
ভবদেব। (বিষাদে) 
তত্ব না করেন রাজা, কে ইহার দেয় সাজা। 
বাবারে কি কব, কতই বা সব, 
দুঃখানলে হইতেছি ভাজা।। 


৫১) ভূধরবাবুর কনিষ্ঠ 


৩৩৪ 


সপত্বী নাটক 

(জয়শঙ্করের বহিবর্বাটী) 
রন্মাচারী। (কর্ণদ্য় উদ্ধত করিয়া, জয়শঙ্করকে সম্ভোধন পুরর্ষক সবিস্ময়ে)। কি এ? কি 
এ মহাশয়! অস্তঃপুর মধ্যে এ গোল কেন?। 

(সকলে চকিত ও উর্ধ্বকর্ণ) 
জয়শক্কর। (চকিত ভাবে) কি এ? (সকলকে সম্বোধন করিয়া সত্ত্র)। মহাশয়েরা 
বসুন, আমি আসিতেছি। (স্তঃপুর মুখে তাড়াতাড়ি প্রস্থান)। 

(খাটকিক সরোবর) 
সৌদামিনী। (গলাধঃ সলিলে দণ্ডায়মানা, কলসী হস্তে দরদরধারায় রোদন করিতে করিতে 
স্বগত)। হা! পতি মুখ চাহিয়া দখ দূর করা দুরে থাকুক্‌, ক্রমেই দুঃখ 
বাড়াইতে লাগিলেন, এবার যখন চাকরী স্থলে গমন করিলেন, কথার কথাটাও 
বলিয়া গেলেন না! হা! পোড়াকপালীর কপাল! অতঃপর প্রাণনাথের বচন 
দরিদ্রতাও আরম্ভ হইল রে। হায় হায়! আরও কি এ পাপিষ্ট জীবনেহ ভার 
বহন করিতে আছে!। 
পতিব্রতা ধর্ম নারীজাতির পরম ধর্্ম। অধিক কি? অবলাবলীর তাহাই বল, 
তাহাই বুদ্ধি, তাহাই ভরসা, তাহাই রূপ, তাহাই গুণ, তাহাই যৌবন এবং ইহ 
পরত্র পরিত্রাণের একমাত্র হেতু। শাস্ত্রে বলে, পতি, কান, খঞ্জ, কুব্জ, বধির, 
মূক, পঙ্গু, যাহাই হউন না কেন, একাগ্র মনে তীহার শুশ্রাধা করিতে 
পারিলেই নারী, নরলোক জয় করিতে পারে, সংশয় নাই। হা! এ দুর্ভাগিনী, 
কন্দর্পের মত পতিরত্ব পাইয়াও যত্ব করিতে পারিল না! হায় হায়! বক্ষস্থল 
বিদীর্ণ হইয়া যায়!!! 
হা! কাস্ত, হতভাগিনীর প্রতি যেরূপ একাস্ত বিমুখ দেখিতেছি; আর, পৃথিবীর 
যে প্রকার ভয়ঙ্কর বিরুদ্ধ ভাব দেখি, ইহাতে সতীত্ব রত্ব রক্ষা করিতে পারিব, 
ইহাও বিশ্বাস হইতেছে না, অতএব এই দণ্ডেই মরণ, আমার পক্ষে মঙ্গ 
লকর!!!। 
হা! শুনিয়াছি অবঘাত মৃত্যু হইলে মহাপাপ হয়, কিন্তু ইহাও আমার বিলক্ষণ 
বিশ্বাস হইতেছে ধর্ম রক্ষা নিমিত্ত অধর্্ম করিলে সে অধর্্মও ধর্মাধিক 
হইবেক, সংশয় মাত্র নাই। না হয়, আমার এ অধন্ম্ট পরমেশ্বর অবশ্য ক্ষমা 
করবেন। আমি মেয়্যে মানুষ; তথাপি আমার এটা বিল বোধ হইতেছে, যে, 
সতীত্ব রক্ষা করা পরমেশ্বরের অভিপ্রায়, সন্দেহ নাই। অতএব আমি তাহার 
অভিপ্রায় রক্ষা নিমিস্তই অবঘাত করিতেছি। (ক্ষণেক চিস্তা)। আত্মরক্ষাও তাহার 
অভিপ্রেত বটে; কিন্তু বিবেচনা করিতেছি, যদিই সতীত্ব রক্ষা করিতে না পারি, 
তবে আর আত্মরক্ষা কই হয়, শেষে কি দুকুল হারাইয়া অকুল মহাপাপে 
ভাসিব111। না, না, সে কথা কিছু নয়, অথবা বুঝিতেই পারিতেছি না, 
যাহউক, ঠাকুর! তুমি এ হতভাগিনীর এ মহাপাপে ক্ষমা করিও।__ক্ষমা 


৩৩৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


করিও!। ঠাকুর ক্ষমা করিও- ক্ষমা করিও!। দোহাই! দোহাই!-_দোহাই। 
পতিত পাবন, সনাতন 11111 

(হিংস জলজস্তগণকে সম্বোধন ও রোদন) 
অরে গম্ভীর জলশায়ি কুস্ীরাদি জন্তগণ! আমি পাপিনী, তোরা পাপ ভয়ে 
আমাকে স্পশ করিতে অনিচ্ছা করিস না। আমি জন্মাত্তরীন পাপে পাপিনী 
বটি, কিন্তু ইহ জন্মে পাপ কাহাকে বলে জানি না। যদি তাহাই হইবে, তবে 
কেন প্রাণত্যাগ করিব বল্‌£ পাপ স্বীকার করিলে এখনি সুখ হয়!_পাপিষ্ঠ 
লোকেরা আমার যৌবন পান করিবার নিমিত্ত অঞ্জলি বান্দিয়া চতুর্দিকে 
ফিরিতেছে!!!!। হা! কি হইল কি হইল। কেন সংসারে আসিয়াছিলাম! জন্ম 
বিফল করিলি আমার নির্দয় পাপিষ্ঠ নরাধম!1!! (পতিকে উদ্দেশ রোদন)। 

সুশীল দেবর ভবদেবকে উদ্দেশ করিয়া) 
হা! বাছা ভবদেব! এ সময়ে তুমি কোথায় রহিলে! তোমার বড় বৌ জন্মের 
মত বিদায় হয়, একবার দেখা দিলে না! হা! বাছা! তুমি জ্ঞানবান হইয়াছ! 
গুনিয়াছি, সকলে বলে, লেখাপড়ায় মূর্তিমান হইয়াছ। সেই জন্যেই আমাকে 
বড় ভাল বাসিতে! মা মা বলিয়া ডাকিতে! হা! এখন তোকে মনে হইলে 
বুক ফাটিয়া যায় যে রে! তুমি আমাকে মা বলিতে বলিয়া, ঠাকুরবীর কাছে 
কত গালি খাইয়া! হা! বাছা! এ হতভাগিনীর জন্যে কত দুঃখ পাইয়াছ রে! 
এ সময়ে একবার তোমার টাদমুখ দেখিতে পাইনাম না!!!1। 
হা! বাছা! তুমি আমার জন্যে ভাবিও না! এখন, তুমি মা বোনের প্রিয় হইতে 
পারিবে! কণ্টক ঘুচিল, তাহার্দৈর অনুগত হইয়া চলিও!!! €ক্ষণেক চিস্তা)। বরং 
তোমার সকল আপদ্‌ দুর হল!1!। 
হে জগদীশ্বর! আমার মা, বাপ, ভাই,ভগিনী প্রভৃতি পিতৃকুল স্বজন জনমাত্র 
নাই, ক্ষেণেক চিস্তা)। যে এক ভাই আছেন, তিনি কখন কাকের মুখেও তত্ত্ব 
করেন না। অতএব এখন আমি এই মনে করিতেছি, অনেক দিনের পর যেন 
বাপের বাড়ী চলিলাম, দেখো ঠাকুর! তুমি জগতের পিতা, যেন আমাকে 
অনাদর করিও না, দোহহি! দোহাই!__-দোহাই বিশ্বপিতা! যেন পথেও কোন 
বিদ্ধ না ঘটে!!! (রোদন)। 

(ক্ষেমার্কে উদ্দেশ করিয়া) 

মা ক্ষেমা গো! আমি তোমাকে ফাকী দিয়া চলিলাম! আমার বিছানার নীচে 
গহনাগুলি রহিল, লইয়া কাশীবাস করিস্!!! €ক্ষেণেক চিন্তা)। আমার ভবদেবকে 
কিছু দিস্‌ গো!!! (রোদন)। 
হা! এইবার পৃথিবীর সকল সুখে জলাগ্রলি দিলাম!!! (গলে কলসী প্রদান) 
| ' (তীর হইতে) 


৩৩৩৬ 


সপত্বী নাটক 
হরিপ্রিয়া। (উচ্চৈঃম্বরে)। ওরে! একি সবর্বনেশ্যে মেয়্যে রে! দেশ বাঁধাতে 
বস্যেছে!!! আ মর্! ও কি লো! ওঠ ওঠ! 'আঁ!_সতীর সাত বুদ্ধি, 
ছিনালের ছত্রিশ বুদ্ধি!!!। 
হর। (আক্রোশে)। মরণ্‌! একি করে রে! আ মর্! খাণ্ডাত! আবার একটা. 
সোগ্‌ তুলেছঃ ঝাটার বাড়ী মের্যে যমের বাড়ী পাটাব না?। বিষ ঝাড়বো্‌ 
এখন, জান না?। মা! বাবাকে ডাকৃতো গা!!! “আপনার বেলা আটী আঁটী, 
পরের বেলা দত কপাটা!!!। 
ভবদেব। (উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে করিতে)। ওমা! তুই কোথা যাস্‌ গো!!। 

(জলে বম্প দিতে উদ্যত) 

হর। (ভ্রাতাকে ধরিয়া ব্যস্তভাবে)। রোস্নারে! আগে বাবা আসুন! তুই কোথা 
যাবি- য়্ে!-_কি সা রে! ময়না মাগী!!! 
ক্ষেমা। (উচ্চৈঃস্বরে রোদন করিতে করিতে)। ওমা! তুই কোথা যাস্‌ গো, কি 
করিলে গো!!!। (জলে বম্প প্রদান) 
জয়শঙ্কর। (সকলকে যৎপরোনাস্তি ভত্সনা করিতে করিতে জলে বম্পপ্রদান পূর্র্বক 
বিবিধর্পে শান্তনা করিতে করিতে ক্ষেমা ও ভবদেবের সাহায্যে বধূকে গৃহে আনয়ন, 
সাবধানে রক্ষা এবং বহিবর্বাটীতে আগমন)। 
ভবদেব। (বাম্পাকুল লোচনে বহিবর্বাটীতে আগমন)। 


তৃতীয় অঙ্ক ও প্রথম ভাগ সম্পূর্ণ 


ভ্যালারে মোর বাপ। 


অর্থাৎ 


স্্ীবাধ্য প্রহুনন 


ঘণিভার ঘশে দ্যায় অননীকে হখ ॥ 
তার চেয়ে বিবা আর আছে হত মুখ: 


রাযুক্ত ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় 
প্রণীত। 


আই. লি. চক্র এও ব্রাদার কর্তৃক 
প্রকাশিত । 


[41172017765 225৫7০2-] 


কলিকাতা । 
চিঞ্পুর রোনড,-১১৫ নং 
জেনারেল প্রিন্টিং প্রেসে 


৫৮ 


মুদ্রিত । টু 
_ হান ১২৮৩ সাল। 


£9870601£ £/ 47০ এ £7476100/27/6 


১৮৭৩৬ 
ভ্যালারে মোর বাপ প্রথম সংস্করণের আখ্যাপত্র 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ভ্যালারে মোর বাপ 
ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় 


আখ্যাপত্রে প্রাপ্ত বিবরণ 


ভ্যালারে মোর বাপ অর্থাৎ স্ত্রীবাধ্য প্রহসন। 
বনিতার বশে দ্যায় জননীকে দুখ। 
তার চেয়ে কিবা আর আছে হত মুখ।। 
শ্রীযুক্ত ভোলানাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত 
আই.সি.চন্দ্র এগ ব্রাদার কর্তৃক প্রকাশিত। 
কলিকাতা । চিৎপুর রোড ১১৫নং জেনারেল প্রিন্টিং প্রেসে মুদ্রিত। 
সন ১২৮৩ সাল। 
[১0260 07 0. ১. 91/0501091005 


ভ্যালারে মোর বাপ 


প্রথম উদ্যম। 
(নটীর প্রবেশ) 


নটী। (স্বগত) প্রাণনাথ যাই বোলে যে আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিলেন, তা 
এখনও আস্চেন না কেন? একাকিনী এ সসজ্জন সমাবীর্ণ সমাজে আসাই 
অন্যায় হয়েছে। যদ্যপি কেহ কোন কথা জিজ্ঞাসা করেন, আমি স্ত্রীলোক, 
তার ত কোন উত্তর কোরতে পার্বো না, সহজেই নীরব্‌ হয়ে থাক্‌তে হবে। 
কি করি এখন, ফিরে যাওয়াও ত বিহিত বোধ হচ্ছে না, তবে ততক্ষণ একটা 
গীত গাই না কেন? 


গীত 

কে বলে রসিক বল রসহীন জনে। 

সে জন রসিক যীর নব রস মনে। 
অকৃত্রিম প্রেম রস, তাহে যার মন বশ, 
প্রেমিক সে প্রেম রস, পিয়ে সুযতনে। 
সঙ্গীত সুরস বলি, যে জন সে রসে অলি, 
সদা মন কুতৃহলি, রস আ্বাদনে। 
তত্ব রস সম যার, কোন রস নাহি আর, 
মোক্ষ ফল, ফল তার, লভে আরাধনে।। 


(নটের প্রবেশ) 


৩৪১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 

গীত। . 
প্রিয়ে তব প্রেমাধীন চিরদিন এই জন। 
দিবা নিশি সুখে ভাসি, হেরিলে বদন। 
ক্ষণকাল অদর্শনে, সব শুন্য ভাবি মনে, 
রাখি প্রণয় রতনে, করিয়ে যতন। 
যাবত রবে জীবন, পর বচনে শ্রবণ, 
দিও না স্থান প্রাণধন, বিচ্ছেদে কখন। 


নটী। (স্বগত) এই যে আস্চেন, আমি যখন এসেচি আর কি থাকতে পারেন? 

নট। প্রিয়ে! এ সমাজটী কেমন দেখ্চো? 

নটী। সঙ্জনে মণ্ডিত অতি সমারোহের সভা দেখ্‌চি। 

নট। প্রিয়ে! এই সকল সভ্য ভব্য মহোদয় মহাশয়-দিগের সমাগমের কারণ 

কি তা তুমি জান? 

নটী। না, তবে বোধ করি এখানে কোন একটা গীতাভিনয় হবে, এস না 

কেন! আমরাও একটু স্থান নিয়ে বসি। 

নট। প্রিয়ে! তুমি বোসবে কি? আমাদিগকেই যে একটি গীতাভিনয় কোর্তে 
হবে। 

নচী। সে কি নাথ! আমি যে এর বাম্পও জানিনে? বি. গীতাভিনয় কবের্বন 
বলুন দেখি? 

নট। প্রিয়ে সেই স্ত্রীবাধ্য বিষয়ই স্থির হয়েছে। 

নটী। তাতে আর আশ্চর্য্য কি হবে? শঙ্কর শঙ্করির বাধ্য, নারায়ণ কমলার 

বাধ্য, ব্রহ্মা সাবিত্রির বাধ্য, ইন্দ্র সচীর বাধ্য, তা তুমি সামান্য মানবের আর 

এ বিষয়ে কি বোল্বে? 

নট। প্রিয়ে! এ বিষয়ে যে অনেকেই জননীকে অসীম কষ্ট প্রদান কচ্চেন, 

সেঁটী ত সহজ ব্যাপার নয়, আর এ দোষটা এখন কেমন প্রবল হয়ে উঠেছে 

তা ত দেখতে পাচ্চ। স্ত্রীবাধ্য বশতঃ লোকে যে সকল লোকালয়ের ঘ্ৃণীত 

কর্দ্্য কার্য করেন, আমরা তাহাই গীতাভিনয়চ্ছল প্রকাশ করবো? বোধ করি 

ইহাতে সঙ্জনগণের সহজেই মনোরম্য ও স্্রীবাধ্যগণের চরিত্র সংশোধন হতে 

পারবে। | 

নচী। তা বলতে পারিনে। সঙ্জনগণে, দুষ্বন্ম্মানিত স্ত্রীবাধ্যদিগের কদর্য 

আচরণের কথায় কি কর্ণপাত কবের্বন£ আর স্ত্রীবাধ্গণের কি আপনার 

সামান্য উপদেশে চরিত্র সংশোধন হতে পারবে? তারা যে এককালে লোক 

লঙ্জাকে 'জলাঞ্লি দিয়েচে। আর আপনিই বা সে অভিনয় কেমন করে 

৩৪২ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
কবের্বন? তুমি নিজেও ত সেই দলের একজন্‌ | 

নট। প্রিয়ে! ও সব কথা এখন থাক, সঙ্জনেরা এ বিষয়ে বিশেষরূপে 
কর্ণপাত কব্রবনঃ প্রথমতঃ তাঁদের মহত্বতা গুণ আছে, দ্বিতীয়ত এ দেশাচার 
সংশোধন বিষয়ে তাদের কি বিরক্তি আছে? এখন অভিনয় আরম্ভ কর। 


গীত। 
অধীনিরে ওহে নাথ এ কথা বল কেমনে। 
কি জানি গীতাভিনয়, তুধষিতে সঙ্জনগণে। 
গুণী জ্ঞানী যে সমাজে, অবলা কি তথা সাজে, 
নারী জাতি মরি লাজে, তুমি তা ভাবনা মনে। 
নহ তুমি মম বশ, নিয়ে আছ রঙ্গ রস, 
নট বোলে অপযশ, করে তব কত জনে।। 


নট। প্রিয়ে! তুমি অত শঙ্কিত হোচ্চ কেন? 
নটী। নাথ! আমার যা হচ্চে তা আমিই জানি। 


গীত। 
কি কহিব ওহে নাথ যে ভয় হতেছে মনে। 
জান ত অন্তরে ভাল ছলগ্রাহী জনগণে। 
তুমি দেশ সংশোধনে, কোরেছ বাসনা মনে, 
ছলগ্রাহী জনগণে, ভ্রমে ছল অন্বেষণে। 
বিশেষত কাল দোষে, অনেকে রত এ দোষে, 
নিন্দিলে নিন্দিবে রোষে, নিন্দুকেতে অকারণে ।। 


নট। তা সঙ্জনগণে কেহ ছলগ্রাহী নহেন। এক্ষণে চল আমরা প্রস্থান করি। 


(নট নটীর প্রস্থান) 


৩৪৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
প্রথমাঙ্ক ৷ 


(কালীরকাপের অস্তঃপুর1) 
বিজয়কালী আসীনা, পরে সিদুরমাতার প্রবেশ। 
বিজ। ঠান্দিদি! মিতিনের ভাতারের কথা কি কিছু শুনেচো? 
সি-মা। না লো! কি হয়েচে। 
বিজ। মিতে আপিশের কত টাকা ভেঙ্গেছিল, তার তরে কাল সন্ধ্যার সময়ে 
বেঁধে নে গ্যাচে । এখন কি যে হবে তার ঠিকানা নাই। কেও কেও বোল্চে 
পুলী-পালাম যেতে হবে। 
গীত 

কি কব দুখো যে মনে। 

এ কথা শুনে শ্রবণে হাদে শেল সম বাজিছে ক্ষণ ক্ষণে।। 

আহা! সে মিতিন জীবন তুল, অকুলে কে তারে দিবে গো কুল, 

মরি মরি মনে কত ব্যাকুল, হতেছে এই ক্ষণে। 

এণ নয়না নবীনা ললনা, জানে না মনে চাতুরি ছলনা, 

কি হবে আহা! তারো বল না, কি দুঃখ মরি মনে। 

দারুণ বিধি এ কি বাদ সাধে, যত সুখ-সাধে বিষাদ সাধে, 

তবে কেন তারো চরণ সাধে, বল আরো জনগণে।। 
সীমা। সে কির্যা! আমার যে শুনেই গা কাপচে? তা সে টাকা সব কেন 
ফেলে দিক নাঃ 
বিজ। সে সব টাকা এখন পাবে কোথা, কম্তো নয় পঁচিশ হাজার। 
সি-মা। কেন? শুস্তে পাই, তোমার মিতিনের হাতে পঁচিশ তিরিশ হাজার টাকা 
আছে। এ সওয়ায় তোমার মিতের যখন বাপ মোরে যায়, রূপচটককে পঁচিশ 
হাজার, আর মাগীকে স্ত্রীধন বোলে পীচ হাজার টাকা দে গেছলো। তা ওদের 
পঁচিশ হাজার টাকার ভাবনা কি বল দেখি? 
বিজ। মিতের কথা আর কেন বল? তেমন্‌ কত পঁচিশ হাজার টাকা রোজগার 
কোরেছিল। এখন মিতিনের হাতে যা সত্তর আশি হাজার টাকা আছে, আর 
গায়ের গহনাগুলী। মিতে বিষয় রাখ্তে' পাল্লে কৈ যে খরচ কোন্তে আরম্ভ 
কোল্পে, তাতেই সব ফুঁকে দিলে। মিতিনকে যেমন কাপড় গয়না টয়না দিত 
আপনার ছোট বোনটাকেও তাই দিত। বুড়ী মাগীকে গরদের কাপড় সওয়ায় 
আর পরাত না যা দু একটা যোড়া সুতর কাপড় দিত, তারো পাঁচ ছ টাকা 
দাম। মাগীর আবার একটা আলাদা চাকরাণী, এক শের দু, এক পোয়া 
সন্দেশ বরাদ্দ, আর বার বন্তের কত আগড়ম্‌ বাগড়ম্‌ খরচ ছিল। ঠান্দিদি! 

৩৪৪ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
মিতে মা ল্ষ্মীকে যেন গলা টিপে বার কোরে দিয়েচে। এই এখন কি হলো 
বল দেখি? কেও কারো নয়, মাগীর হাতে 'কি কম টাকা আছে? আজ দশ 
বচ্ছর পাঁচ হাজার টাকার সুদ পাচ্ছে। মিতে প্রথম যখন মুখখানী চুন পানা 
ক'রে বাড়ীতে এসে টাকার কতা বোললে, এমনি ক্রেট পিশাচ মাগী, বলতে 
পালে না যে, “ভয় কিঃ আমি সব টাকা দিব” কত কষ্টে দশটি হাজার টাকা 
বার করে দিয়েছে। 


গীত। 
কি কব তব সদনে। 
নহে কাহারো কেহ ভুবনে ।। 
জননী কি নন্দন, নহে গো আপন জন, 
কেবল জানিবে ধন, আপন। 
সবে ধন রাখিবে যতনে।। 


সি-মা। মাগীর তবে দোষ কি বল? পাঁচ হাজার বৈত আর নশোপঞ্চাশ টাকা 
ছিল না। মাগী কবার আবার কটা কর্ম কোল্লে; শ্রীমস্তাগবত, মহাভারত, 
রামায়ণ, ও কটা বার বন্ত মাগী আপনার টাকায় কোরেচে, তাতো আমরা সব 
জানি। তবে আর মাগীর দোষ কি? আচ্ছা, মাগী যদি দশ হাজার টাকা দিলে, 
আর তোমার মিতের আপিশের পঁচিশ হাজার টাকা ভাঙা যার তরে, তাও 
তো আমরা জানি, তোমার মিতিনকে জড়য়া গহনা কিনে দিয়েছিল। তা 
তোমার মিতিন পনেরো হাজার টাকা ফেলে দিলে আর ত এ বিপদ ঘটতো 
না? 

বিজ। সেকি এ সময়ে টাকা দিতে পারে? তার তিন চাটা অবগণ্ড ছেলে, 
মিতের যদি একটা ভাল মন্দ হয় সে গুলিকেতো মানুষ কন্তে হবে 
ঠান্দিদি! আর মেয়েমানুষের টাকা কেমন তা তো জান? 

সি-মা। এ সময়ে তোমার" মিতিনের টাকা দেওয়া খুব উচিত ছিল। এ কি 
কম সবর্বনাশ! সময় অসময়ের তরে টাকা । ভাতার যার বাড়া এ পৃথিবীতে 
আর কিছু নাই, সেই যদি গেলো, তবে আর জকের মতন টাকা বুকে করে 
থাকলে কি হবে? এর চেয়ে তোমার মিতেকে লয়ে তোমার মিতিনের ভিক্ষে 
করে খাওয়া ভাল। 

বিজ। ঠান্দিদি! তোমরা সেকেলে লোক বোঝো কম, তাই এ কথা বলচো। 
স্বামীর অপেক্ষা আর কিছুই না সত্য , কিন্তু কপালের কথা কেউ বলতে 
পারে না। স্বামী কিছু কারো চিরকাল থাকে না। ভাই আগে সমস্থানটী করা 


চাই। স্বামীর ভাল মন্দ হলে ধন থাকলে তবু বুক পৌতা থাকে ।__ 
৩৪৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
ৃ নীত। 
আমি কব তোমারে দিদি কিবা গো এখন। 
দেখ এ যে কাল, নহে গো সে কাল, 
এখন ধনই হয়েছে সার, ধরিলে জীবন। . 
সেকেলে লোক স্বল্প মতি, তোম্রা বুঝ অল্প অতি, 
চিরকাল কি থাকে পতি, চিরপতি ধন।। 
সি-মা। স্বেগত) এমন ধনের মুখে ছাই, এমন বুক পৌতার মুখে আগুন, আর 
এমন যে পুরুষ আপনার হাতে কিছু না রেখে স্ত্রীকে যথাসবর্বস্ব দ্যায়, তারো 
জীবনকে ধিক। প্রকাশ্যে) তোরা বুজেচিশ ভাল। সে যা হোক, এখন তোমার 
মিতিন কি কচ্চে বল দেখি? 
বিজ। ঠান্দিদি গো! মিতিনের কথা আর বল না, আহা! যেন মড়ার মতন 
পড়ে আছে। দুটা চোক দিয়ে জল পোড়চে, কেবল মাঝে মাঝে এক একটা 
দীর্ঘ-নিশ্বাস ফেল্চে। দেখে, আমার যেন বুক ফেটে যেতে লাগলো । বুড়ী 
মাগীর চোকে জল নাই, হাও হাও করে মায়াকান্না কেঁদে যেন বাড়ী মাথায় 
করে তুলেচে। ৃ 
গীত।। 
সে কথা কি কব তব কাছে আর। 
ধরাতে পড়িয়ে আছে যেন শবাকার। 
নেত্রে বহে শত.ধার। 
কেবল রব মুখে হাহাকার। 
বিন্দু বারি নাহি চক্ষে, বুড়ী মিছে উপলক্ষে, 
আঘাত করিছে বক্ষে, মিছে মায়া তার। 
নাহি মনে মায়া তার।। 


সি-মা। বুড়ীর নাড়ী ছেঁড়া ধন। ছেলের প্রতি মা বাপের যে কেমন ন্নেহ, তা 
ছেলের ছেলে না হলে আর জান্তে পারে না, তাও পোড়া কালের দোষে 
কালা-মুখো গুলো ভাবে না। নাতবৌ! তোমার মিতিনের শাশুড়ির যা হোচ্ছে, 
তা সেই জানে। 

বিজ। আপনার এক রকমের কথা, মিতিনের চেয়ে আর কার দুঃখ বল? 
বুড়ী মাগীদের হাও হাউনি কেমন এক দশা। আমাদের এঁর একবার বিয়ারাম 
হলো ভাকতারে জবাব দিয়ে গ্যালো, বুড়ী আবাগী হাও হাও করে কেঁদে বুক 
চাপড়ে বোল্‌লে কিঃ গো আমার যথাসবর্বহ্ব নিয়ে অমুককে বাঁচিয়ে দাও 
আমি অমুককে নিয়ে ভিক্ষে মেগে খাব... ঈশ্বরের ইচ্ছায় ইনি সান্তে, 


৩৪৬ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
ডাকৃতারের দেড়শো টাকার বিল হলো। তখন আবাগী আর একটি পয়সা 
দিতে চায় না। আমি তোমার নাতীকে এক কড়া কড়ী দিতে দিলাম না। 
মাগীকে “তোমার নামে বিল হয়েছে। টাকা না দিলে ডাকতার নালিশ 
করবে” কত ভয় দেখাতে, কত কষ্টে তবে পাঁচ টাকা কম একশ টাকা ফেলে 
দিলে। ঠান্দিদি! বুড়ীমাগীদের কথা আর কেন বল? অমন ক্রেট কি আর 
আছে? আমার একবার একছড়া শেক্লানো সাতনর দেখে কিন্তে ইচ্ছে 
হতে, মাগীকে বোলতে অমনি, “হরিবল আমি টাকা কোথা পাব মা?” বলে 
এক কথাতে সব সেরে দিলে। সেই অবধি আবাগীর উপর আমার চিত্তির 
চোটে গ্যাচে। এখনও মাগীর কথা শুন্লে আমার গায়ে কে যেন আগুন 
ছড়িয়ে দ্যায়। আবাগীকে দেখলে আমার পীঁস পেড়ে কাটতে ইচ্ছে করে। 
সি-মা। এতে তোমার রাগ করা অন্যায় দিদি? ও টাকা কোথা পাবে। 
কলীরকাপের বাপ আর তো ওকে একটা পয়সা দ্যায়নি, সে ওকে দুচক্ষে 
দেখতে পান্তো না। আর জন্মে ফল দান করেছিল বোলে, তাই এ জন্মে 
কলীরকাপকে পেয়েচে। 
বিজ। ঠান্দিদি! মাগী ফল দান করেছিল, তা একটু মধু দান করে নি কেন? 
ওর কট্কটে কথা গুলো শুন্লে আমার গাটা জ্বালা করে ওঠে। 
সি-মা। স্বেগত) মধু দান যা তুমিই করে এসেছ, তার জন্যেই বাক্য গুলি যেন 
মধুমাখা হয়েচে। স্বামীকে ভ্যাড়া বানিয়ে মাগীকে কেনা বাঁদির বাড়া করেচে। 

(নেপথ্যে রাধামণি) 

রাধা। (নেপথ্য হইতে) বৌ মা! বৌ মা 
বিজ। এ আবাগী আসচেন, বেটার মরণ নাই, এসে আবার কি হুকুম করেন 
দেখ। 
সি-মা। (স্বগত) ওমা কলীরকাপ কি আসম্পদ্দাই দিয়েচে? আবাগী যেন সাপের 
পাচ পা দেখেচে? রোধামনির প্রবেশ) 
রাধা। বৌ মা! বাবাকে কাপড় কিনে দিতে বল মা? হাড়ী বাগ্দির মতন 
লোকের কাছে এ কাপড়ে বেরুতে লজ্জা করে মা। 
বিজ। কেমন করে বলবো? সে দিন তোমাকে এক যোড়া কাপড় কিনে 
দিলে, এখন বচর ফিরেনি। ঘরে আর ত তাত বসানো নেই, যে বোললেই 
অমনি কাপড় দেবে? (সিদুর মাতার প্রতি) ঠানদিদি! এমন ঢুশনো আর বিশ্ব 
সংসারে দেখিনি। কাপ দিলেই অমনি ছিঁড়ে বসেন। আর মাগীর হাড়ে ল্ষ্ী 
নাই বলে সংসারটারও ভদ্রস্থ নাই। 
রাধা। ওমা! কি বলিসগো? বাবা কি সে দুখানি কাপড় আজ দিয়েচে গা? 
এই পূজো এলে বচর ফেরে তারপর তোমাকে পাচ ছ যোড়া কাপড় এনে 


৩৪৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


দিয়েছেন। , 

বিজ। মর মাগী! আমাতে আর তোতে সমান£ (সিঁদুর "মাতার প্রতি) ঠান্দিদি! 
আবাগী আমার হিংসাতেই মলেন। শাশুড়ী ত নয় যেন আমার সতীন। 
সি-মা। (কানে হাত দিয়ে) স্বেগত) রাম! রাম! কি সর্বনাশ! এ কথা কেমন করে 
বললে, এ যে কানে শুনলে পাপ হয় গা। 

রাধা। বৌমা! আমি আর কদিন বাঁচবো মা? আমাকে এখন আর কুকথা 
গুলো বলিস্নে। মনে দুঃখ দিয়ে কথা কইলে, যদি আমার চোখ দিয়ে জল 
পড়ে, কি একটা দীর্ঘনিশ্বীস ফেলি, তা. হলে তাতে আমার বাবার অমঙ্গল 
হবে। বাছা! বাবা আমার রাজ হোক্‌, তুমি রাণীর মতন সুখে ঘর কন্না কর, 
তোমার সুখ দেখে আমি হিংসা করি এও কেমন কথা মা? 


গীত। 


কেন মা আমারে বল; বলিছ কুকথা অতি। 

তব সুখে দুঃখী হবো নহে গো তেমন মতি। 

মনে ব্যথা দিলে পরে, যদি নেত্রে জল ঝরে, 

জানি অমঙ্গল করে, তাহে ওগো গুণবতি। 

তুমি হওগো রাজ্যেশ্বরী, বাবা বসুন দণ্ড ধরি, 

কায়মনে ইচ্ছা করি, নহে মম ভিন্ন মতি। 
বিজ। মর মাগী! গ্যাজ গ্যাজ কোরে বোকচিস কেন£ তোর স্বভাব কি আমি 
জানিনে? “যার ঘর করিনে সে বড় ঘরনি, আর, যার রান্না খাইনে সে বড় 
রীদুনী” সিন্দুর মাতার প্রতি) ঠান্দিদি! আবাগীর বাকড় আর কিছুতেই ভরে 
না। যার তার কাছে খেতে পাইনে বোলে আমাদের নিন্দে করে বেড়ায়। তা 
কোল্লেই বা, তাতে কি বয়ে গ্যাল? বোধ করি ঘোষেদের সেজ বোয়ের 
কাছে কি বোলেছিল, সে তার চাকরানীকে দিয়ে মাগীকে এক ঠোঙ্গা সন্দেশ 
পা্টিয়ে দিয়েচে। আবাগী আপনার ঘরে বসে মুখ টিপে টিপে খাচ্চে। আমার 
কি দরকার পোড়েছে, ওর ঘরে গেচি, আমাকে দেখে অন্নি সন্দেশ গুলো 
নুকুলেন। (রাধামণির প্রতি) মর আবাগী! আমি কি তোর সন্দেশের পিস্তিশি, যে 
তুই আমাকে দেখে নুকুশ, আমার ঘরে' কত সন্দেশ পোচে ছাতা উঠে যাচ্চে। 
(সিদুরমাতার প্রতি) ঠান্দিদি! চিম্সে মাগীর কি আকেল দেখেচো, এতে মুখে 
নুড়ো গুঁজে দিতে ইচ্ছে করে কি না? 
রাধা। সিদুর মা! আমার বৌমার কথা শোন, লোকে বলে এরা শাশুড়ী বোয়ে 
দিবারান্তির ঝকড়া করে। আমি ঝগড়ার কি কথা কয়েচি, যে বৌমা আমাকে 


হাঁড়ির তেরক্কার কোচ্চেন। 
৩৪৮ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
বির দরিয়া বর বক 
বে আকেলে মাগী যেন ক্ষুদে পিপড়ের মতন মুখ টিপে কুট কুট কোরে 
কামড়াচ্ছেন। 
সি-মা। (রাধামণির প্রতি) ওগো তুমি ঘরে যাও। (বিজয়কলীর প্রতি) নাতবৌ! 
চুপ কর ভাই, এখনি আবার একটা কাণ্ড হবে। (রাধামনির প্রস্থান) 
বিজ। ঠানদিদি! আবাগী যেন আমার দুটী-চক্ষের বিষ হয়েচে, তোমার নাতিরও 
মাগীর উপর এক রত্তি চিত্তির নাই। 


গীত। 

কি কব তোমারে আর। 

দুটা চক্ষের বিষ মাগী হয়েচে আমার ।। 

যেরূপ আমার মন, তব নাতীর তেমন, 

দেখ না ভুলে বদন, গুণেতে উহার।। 

মুখের দিকে দৃষ্টি হলে, মন মম উঠে জুলে, 

বাঁচি এখন মাগী মোলে, যুড়ায় সংসার। 
সি-মা। (স্বগত) তুমিই সব চিত্তির কোরে তুলেচো আর কি কুলগ্নে ভিটেতে 
পদার্পণ কোরেচ, তা আর বোলতে পারি না। তোমার আগ নেই কলীরকাপের 
বাপ মোরে গ্যালো, ছোট ভাইটে নিউদ্দেশ হোলো, পিসিমাগী পাগল হোয়ে 
মোলো, সব খেয়ে এখন কলিরকাপের যেন হত্তাকর্তী বিধাতা হয়ে বসেচ। 
বুড়ীমাগীকে যে গৌড়ান্‌ পোড়াচ্চ, কলী বোলেই শিগগির শিগৃগির কিছু 
ফোলচে না; কিন্তু এর ভোগ ভুগতেই হবে। বিনা অপরাধে গুরুতর লোক্বে 
যে কটু কথা বলা সে বড় সহজ কথা নয়। মাগীর মরণ নাই, অপমানে 
অপমানে শরীরটে যেন কালী হয়ে যাচ্চে, না পেট ভোরে খাচ্ছে, না 
কাপড়খানা পোচ্চে, না মনের সুখে আছে। পোড়া গর্ভেও ছাই, এমন কু- 
পুত্রকে পেটে ঠাই দিয়েছিল, যে মায়ের ভাবলে না! মেগের ভ্যাড়া হয়ে 
রইলো! 
বিজ: ঠানদিদি! ভাবচো কি? তুমি এমন মনে করো না যে তোমার নাতী 
এসে আমাকে কিছু বোল্বে, আমি সে পাট রাখিনে। তাকে উঠতে বোল্লে 
ওঠে, বস্তে বোল্লে বসে। আমি একটু মুখ ভারি কোরে বোস্‌্লে সে অমূনি 
সৃষ্টি সংসার অন্ধকার দেখতে থাকে। 
সি-মা। নাতবৌ! তাতো ভাই দেখতে পাচ্চি, কলিরকাপকে দিব্বি একটী ভ্যাড়া 
বানিয়েচো। এমন নাহলে, ভাই ভাতার নিয়ে সুখ নাই? আমাদের পোড়া 
কপালে বিধাতা কি ভাতারই লিখেছিলেন। একদিন রাত্রে পান সাজাতে 


৩৩৪ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আঙ্গুলে একটু চুন খয়ের লেগেছিল, তামাসা করে তোর ঠাকুরদাদার গালে 
দিতে, পুরুষ অমনি রেগে চোক দুটো কপালে তুলতে ভয়ে কেঁচো হয়ে 
পায়ে ধরেছিলাম। অরসিক কিনা? তাতে রাগ গেল না, আমার গালে এক 
যে চড় মেরেছিল, তাতে প্রাণ্টা যেন বেরিয়ে গেছলো। তারপর লঙজ্জাতে 
লোকের সাক্ষাতে দু-দিন তিন-দিন আর মুখ দেখাতে পারিনে। 

বিজ। ঠান্দিদি! আমাদের সে রকম নয়, আমি যদি তার এক গালে চড় 
মারি, সে ভয়ে অমনি অন্য গাল পেতে দ্যায়। 

সি-মা। তাতো দেখতে পাচ্চি। আশীর্বাদ করি, পাকা মাথা শিদুর পারে যেন 
নাতীর সঙ্গে এই রকমেই কেটে যায়। 


গীত। 


আশীর্বাদ করি দিদি সদীকাল থাক সুখে। 

চিরকাল্‌ এরূপে যেন হরে কাল হাঁসি মুখে।। 

গৌরী পঞ্চানন, রতি ও মদন, 

সম তোমরা দু'জন, রহ বিবাদ বিমুখে। 

সাবিভ্রী সমান, যেন বাড়ে মান, 

শক্র ভ্রিয়মান, হয়ে থাকে মন দুঃখে।। 
বিজ। ঠান্দিদি! তোমাকে আর অধিক কি বোলবো, তোমার নাতি যেন 
আমার কেনা গোলাম হোয়ে আছে। 
সি-মা। আচ্ছা ভাই নাতবৌ?ঃ লোকে একটা কথা বলে “মেগের কাছে 
ভাতার ভ্যাড়া” কৈ তুমি ত ভাই আমার নাতীকে এখন ভ্যাড়া সাজাতে 
পাবোনি। 
বিজ। ঠান্দিদি! দেখতে তো পাচ্চ, উপরে কেবল মানুষের চামড়াখানি 
রেখেচি, তা না হলে ভিতরে সব ঠিক কোরে এনেচি। 
সি-মা। আচ্ছা ভাই তোমাকে কেমন আমার নাতী ভালবাসে কই, তাকে 
একদিন ভ্যাড়া সাজিয়ে আমাকে দেখাও দেখি? 
বিজ। ঠান্দিদি! এ আর আশ্চর্য কি? গ্রকরাত্রে আপনি মোদো চাকর সেজে 
আমাকে মাথার দিবি্বি দিয়ে তামাক সেজে খাইয়েছে। ভ্যাড়াও অনাসে 
সাজাতে পারি, তবে মুস্কিল কি জান, ভ্যাড়ার সে উপরের চামড়া টামড়া 
কোথা পাব। 
সি-মা। আমার সিদুর একটা ভ্যাড়ার পোশাক আছে, সে, সেইটে পারে ভ্যাড়া 
সেজে খ্যালা কোরে ব্যাড়ায়। সেইটে কি আনিয়ে দোব? 
বিজ। বেস তো! তবে সেইটে আনাও। ঠান্দিদি! আর একটা কথা আছে 


৩৫০ 


ভ্যালারে মোর বাপ 

ভাই? আমি ঘরের ভিতর তাকে ভ্যাড়া সাজাব, তুমি কিন্তু বাইরে থেকে 
দ্যাখো ।__ 
সি-মা। দেখতে পেলেই হলো। তুমি যেৎথেকে বোলবে আমি সেইখান 
থেকেই দেখবো। তবে সে ভ্যাড়ার পোশাকটা আনাই। তোমার চাকরকে 
ডাকাওনা ভাই£ 
বিজ। মোদো! মোদো! আমার! ও মোদো।-_ 
মোদো। (নেপথ্যে) আজ্ঞা যাই।-__ 

(মোদোর প্রবেশ) 
বিজ। মর ব্যাটা? বাবু ঘরে নেই বোলে বুঝি এত ডাকা-ডাকিতেও শুস্তে 
পাচ্চিসনে? ব্যাটা “যেমন কুকুর সেও তেম্নি মুগুর” এক ডাকের উপর দু- 
ডাক ডাক্‌লে অন্নি চাবকে দ্যায়। ভাড়া ব্যাটা? আজ তোর বাবু আসুক; 
আমি ডাকলে কেমন তুই চুপ করে থাকিস্‌। 
মোদো। মা-ঠাকুরুন! আপ্রি এমন অন্যায় কথা বোলচেন কেন? আমি বাবুর 
চেয়ে আপনাকে জেয়াদা ভয় করি। আপনিই আমার মনিব। আপনাকে 
দেখলে আমার গায়ের আদশের রক্ত শুকিয়ে যায়। এখন কি আজ্জে 
করুন।-_- গোলামতো হুকুমের তলে পোড়ে আছে?__ 
জটিল হার নাহার উরস রানানিরিননিন 

? 

মোদো। (স্বগত) ভ্যাড়ার পোশাক আবার কেনরে বাবু? বাবুকে তো ভ্যাড়া 
বানাতে বাকি নাই। আমাকে আবার ত ভ্যাড়া সাজাবে না? (প্রকাশ্যে) মা 
ঠাকুরুন! ভ্যাড়ার পোশাক কেন গা? 
বিজ। আমার দরকার আছে। 
মোদো। কি দরকার গা? 
বিজ। তোর সে কথায় কাজ কি? তুই যা না। 
মোদো। কে পোরবে গা বল না? 
বিজ। কি আপদ! তোর সে খপরে কাজ কি? 
মোদো। তা বাবু আমি আগে থাক্তে বোলে রাখচি, আপনি যে আমাকে 
ভ্যাড়ার পোশাক পরিয়ে মজা দেখবেন?' আমি তা পোরবো না বাবু। 
বিজ। মর ব্যাটা, তোকে পরাব কেন? ব্যাটা কি মানুষের মতন মানুষ, যে 
ওকে আমি ভ্যাড়ার পোশাক পরাব? 
মোদো। স্বগত) তবে বাবুকেই পরাবেন; তা আমি ডেমাক করে বলতে পারি, 
এ বিষয়ে আমি বাবুর চেয়ে মানুষের মতন। আমার মাগ যদি আমার মাকে 
একটা কোন শক্ত কথা বলে, তা হলে সে দিন আর তার রক্ষা থাকে না। 


৩৫১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


(প্রকাশ্যে) মা ঠাকুরুন্‌! ভ্যাড়ার পোশাকটা কে পোরবে তা বল্লে না গা? 
বিজ। তোর বাবা পোরবে। 

মোদো। বাবু! তিনি এটা পোরে ঘরে থাকবেন না রাস্তায় বেরুবেন গা? 
স্বগত) লোক দেখান তাঁর বাড়ার ভাগ। তিনি যে একটি মেগের আস্ত ভ্যাড়া 
তা সকলেই জানে। 

বিজ। বাবু কেন পোরবেন? তোর ঘরের বাবা পোরবে। 

মোদো। আমার বাবা ত বাবু এখানে নাই। 

বিজ। তোর যে বাপকে হোক সাজাবো। তুই এখন পোশাকটা শিগগির আন 
দেখি! 

মোদো। ্বগত) বাবুকেই সাজাবেন তা বুঝেছি, যা হোক দেখতে হবে। 
(প্রকাশ্যে) মা ঠাকুরুন! সিদুবাবুকে গিয়ে কি বোলবো। 

বিজ। আমার নাম কোরে গে চাইলেই দেবে। 

মোদো। যে আজ্ঞে, তবে চল্লেম। (যেতে যেতে স্বগত) মা বাবুর দফা এককালে 
নিরেশ কোরে ফেলেচেন। তাঁর আর দশ জন ভদ্রলোকের সঙ্গে বৈঠকখানায় 
বসবার যো রাখেন নি। আজ ভ্যাড়া সাজতে বোললেই দিবিব কাশ্মিরি ভ্যাড়া 
সেজে বোসবেন। (মোদোর প্রস্থান) 

বিজ। ঠান্দিদি! ভাতার যেমন পেতে হয় তা পেয়েছি। আমার কোন বিষয়ে 
আর দুঃখ নাই। এখন আশীব্বাদ করুন, একটী ছেলে হোক্‌। ছেলে অভাবে 
আমার সংসার যেন অন্ধকার হয়ে রয়েছে। 


গীত। 
পতি গো যেমন পেয়েছি তেমন। 
সদা মনোসাধ হতেছে পূরণ ।। 
এক দুঃখে মন, পোড়ে অনুক্ষণ, (না জানি) 
বিহিন তনয় ধন। এ সংসার বন, 
তাহার কারণ, (অধিনী) সতত ব্যাকুল মন। 
সি-মা। তা হবে বইকি£ঃ এখন ঢের সময় আছে। গাছের ফলতো আগু পিছু 
ফলে। স্বেগত) বুড়ী মাগীর মনে থে দুঃখ দিচ্চ, তখন তোমার গর্ভে যে বংশ 
থাকবে সে আশা মিছে। তুমি মলে তবে যদি কলীরকাপের বংশ থাকে! 
বিজ। ঠান্দিদি! ছেলে দি আমার হয়, তাহলে আমোদ আহাদ যা কর্বো তা 
আর্মার মনেই আছে? হাটকৌড়ে আর ষেটেরা পুজো খুব ঘটা করে কর্বো। 
সি-মা। আটক্ে':ডটা ৬ মাদের নিছে হবে, সেদিন আর তোমার কর্তীকে 
তহ 


ভালারে মোর বাপ 
কিছু খেতে হবে নাঃ আমরাই পেট ভরিয়ে দোব। 
বিজ। ঠান্দিদি! আটকৌড়েতো তোমাদের নিয়ে। তবে ভাই (তামার নাতীর 
পের্ট ভরাবার সময় আমিও দুএকবার বোলবো। 
(ভ্যাড়ার পোশাক সহ মোদোর প্রবেশ) 

মোদো। মাঠাকুরুন! সিদুবাবুর কাছ থেকে যে কোরে পোশাক এনেচি, তা 
আর কি বোল্বোঃ আমাদের বাবুকে কত লোক যে কত কথা বোল্তে 
আরম্ভ কোল্পে, তা আর বোল্তৈে পারি না। 
বিজ। পোশাকটা (তো এনেচিস্? 
মোদো। তা এনেছি বইকি £ স্বগত) পোশাক আন্বোনা ! আজ বাবুর ভ্যাড়া 
সাজা দেখতে হবে? প্রেকাশ্যে) তবে এই নিন। ভভ্যোড়ার সাজ প্রদান) মা 
ঠাকুরুন! তবে আমি চল্লেম এখন। (মোদোর প্রস্থান) 
সিমা। তোর কর্তা এখন আস্চে না কেন? 
বিজ। আপিশের কি ভীড় পড়েছে, ক-দিনই আসতে দেরি হোচ্ে। 
সিমা। ভাল কথা মনে পড়েছে। হ্যারে! পরশুদিন রাত্রে কর্তার সঙ্গে কি 
বকাবকি কচ্ছিলি।__ 
বিজ। এমন কিছু নয়, আপিস থেকে আস্তে একটু "ার হয়েছিল। মন 
জানি, কোথাও যায়নি, তবু বল্পে কি হয়? কেমন জাত ত।৬তা জানেন। ওদের 
কি ভাই আন্মা দিতে আছে। 

সি-মা। তুমি যে ভাই লাগাম টেনে আছ, নাতীর আর কি কোনদিকে মুখ 
ফেরাবার যো আছে। 
বিজ। ঠান্দিদি! সঙ্গ-দোষটা ভারি খারাপ। দিনকতক কতকগুলো কুসঙ্গী যুটে 
খারাপ কোরে তোলবার উজ্জুগ কোরেছিল। আমার কাছে কি সে পাট হবার 
যো আছে? দুদিন চোক রাঙাতেই কোথায় বা জটলা, কোথায় বা গাওনা 
বাজনা, কোথায় বা পান তামাকের শ্রাদ্ধ, এককালে বৈঠকখানায় বসাই বন্দ 
কোরে দিলেম। 

(একটা বাকৃসো, তাহার উপর এক ওড়া সন্দেশ, 
ও কোঁচড়ে গোর্টাকতক সন্দেশ লয়ে খেতে খেতে মোদোর প্রবেশ) 

সি-মা। মোদো! তোর বাবু বুঝি এলো। 
মোদো। (মুখে সন্দেশ) হুঁ। 
বিজ। কি খাচ্ছিস র্যা। 
মোদো। উ হুঁ। 
বিজ। মর ব্যাটা? সন্দেশ খাচ্ছিস নাকি? 
মোদো। (সত্বরে চিবিয়ে গেলেন) 


৩৫৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


বিজ। আবার ব্যাটা সব এঁটো কল্লি? 
মোদো। কি বলেন আপনি? আমার কি আকেল নাই? আমি আপনার সন্দেশ 
খাই নাই। ্বগত) খাটবো তোমাদের বাড়ী, আর কি আমার মাসীর মা 
সন্দেশ খেতে দেবে£ঃ সন্দেশ আবার খাবার জিনিস! মধুসুদনের এখন কপাল 
মন্দ বোলেই যা হোক, তা না হলে সন্দেশকে তো মাটীর ঢ্যালা বলতেম। 
যখন কর্তাবাবুর বাড়ীতে ছিলেম, শাণক শাণক মুরগী আগে পেশাদ কোরে 
দিয়েচি, তবে সেজবাবু খেতে পেয়েচেন; সন্দেশ এঁটো কোরেচি তবেই তো 
মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেচে, কত মাছী, বোলতা, পিঁপড়ে, খেয়ে হেগে মুতে 
দিচ্চে, তাতে রুচি হয়; মধুসুদনের এঁটোতেই ঘেন্না হোচ্চে। 
বিজ। তুই তবে সন্দেশ কোথা পেলি। 
মোদো। কে কোথা দিলে আপনি তার খোঁজ নিচ্চেন কেন? 

(আপিস পরিচ্ছদে কলীকাপের প্রবেশ) 
কলি। (সিদুর মাতার প্রতি) ঠান্দিদি কতক্ষণ ?__ 
সি-মা। অনেকক্ষণ এসেচি ভাই, এখন চল্লেম। 
কলি। বসুন্‌ নাঃ এত ব্যস্ত কেন? 
সি-মা। সিদুকে খাবার টাবার দিয়ে আসি, আবার আস্বো এখন। নাতবৌ! 

এখন আসি তবে। সেটা যেন হয়। (সিদুর মাতার প্রস্থান) 

কলি। (বিজয়ের প্রতি) দেখ, তুমি সন্দেশ ভালবাস বোলে আমি আপিসে 
একদিনও সন্দেশ খাইনে? আজ ময়রা ব্যাটা না বোলে সন্দেশ রেখে গেছলো, 
একটু কামড়ে আর গলাতে উঠ্লো নাঃ অন্নি একটু জল খেয়ে উপরে 
গেলেম। আসবার সময়ে বড় বাজার থেকে সন্দেশ কিনে নিয়ে তবে আস্চি। 
আগে তুমি খাও দেখি, আমার সন্দেশ কেনা সফল হোক্‌। তারপর আমি 
কাপড় ছেড়ে হাতে মুখে জল দোব। 
বিজ। তোমার ও সন্দেশ খাবে কে? যে চাকর রেখেচো সে আগে পেশাদী 
কোরে এনেছে। আমি কি তোমার মোদোর এঁটো খাবো? 
কলি। (মোদোর প্রতি) মোদো! আ মর ব্যাটা? তোর যে ভারি আম্পদ্দা 
দেখ্ছি। আমি কি তোর জন্যে সন্দেশ কিনে এনেচি? 
মোদো। আমি ও সন্দেশ খাবো কেন? 
কলি। তবে ও বুঝি মিছে কথা বোল্চে, মর ব্যাটাঃ তুই এখনি বাড়ী থেকে 
বেরো?-_ 
মোদো। (স্বগত) কি আপদ! ভালত দুটো সন্দেশ খেয়েচি, এখন চাকরি যে 
যায় দেখ্‌চি। 


কলি। নজর থেকে যা ব্যাটা, আর তোর মুখ দেখতে চাইনে। 


৩৫৪ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
মোদো। (স্বগত) রুটা তো গ্যালো। আমিও নাণ্তে ধুত্ত, যাবার সময় এক্‌টা 
মরণ কামড় কামড়ে যাই (প্রকাশ্যে) মশায়! আপনি অনর্থক রাগ কচ্চেন, 
আপনি গোলাপবিবিকে যে এক ওড়া সন্দেশ দিতে দিলেন, তাঁকে সন্দেশ 
দিতে, তিনি আমাকে চাট্রে সন্দেস দিয়েছিলেন, তারই একটা খেয়েচি। এখন 
এই দেখুন কোঁচড়ে তিন্টে আছে। (কোঁচড় হতে তিন্টে সন্দেশ দেখান।) 
কলি। বেরো না ব্যাটা! এখন সামনে দাড়িয়ে মিথ্যা কথা কচ্চিস। প্রেহারে 
উদ্যত) 
বিজ। মোদো! যাস্নে ভাড়া না, দেখি ও তোর কি করে। 
কলি। ও ব্যাটা সব মিথ্যা কথা বোল্চে। 
বিজ। মিথ্যে কথা বইকিঃ আর জ্বালাচ্চ কেন? দু-রকম সন্দেশ কিনে 
একরকম সেখানে দেওয়া হয়েছে। একরকম বাড়ীতে আনা হোয়েচে। তা না 
হ'লে মোদো গোল্লা কোথা পাবে বল দেখি? 
কলি। ও ব্যাটা এই সন্দেশ ভেঙ্গে গড়েচে। 
বিজ। ভেঙ্গে গড়তে তুমি খুব পার, ও এখন তত শেখেনি। (বাপরে)! 
পুরুষের পেটে পেটে বুদ্ধি। 
কলি। তোমার দিবিবি কোরে বোলচি, আমি গোলাপীকে চিনিনে। 
বিজ। এখন আর চিন্বে কেন? 
কলি। তোমার মাথায় হাত দিয়ে বোলচি, সে কে আমি তাকে চিনিনে। (মস্তকে 
হাত দিতে উদ্যত) 
বিজ। যাও, যাও, আর মাথায় হাত দিয়ে দিবিব গালতে হবে না? “পরের 
মাথায় দিয়ে হাত, দিব্বি গালে নির্ঘাত” (মোদোর প্রতি) মোদো! একখানা পাক্ছি 
ডেকে দে ত, আমি আর এখানে থাকৃবো না, এখনি আমার বাপের বাড়ী 
যাব! 
কলি। (পায়ে পোড়ে) আমার গলায় আগে ছুরী দাও তারপর তোমার বাপের 
বাড়ী যেও। 
বিজ। মিছে আর ঢং কোচ্চ কেন? (মোদোর প্রতি) মোদো! পান্কি একখানা 
ডাক্‌ না। 
কলি। (মোদোর প্রতি) মোদো! নারে। (বিজয়কালীর প্রতি) তোমার পায়ে পড়ি 
পাক্ষে ডাক্তে বোলো না। পাক্কি ডাক্তে বোল্লে আমার প্রাণ উড়ে যায়। 
মোদো। (স্বগত) আচ্ছা মজা কোরেচি। চাকরি তো থেকে গ্যালো। বাবুর 
মাথার উপর আর এমন মা নাই, যে আমাকে ছাড়ান্‌। এখন মজা দেখা 
যাক । . 
বিজ। মোদো! পাক্ষি ডাক্না। 


৩৫৫ 


দু্প্রাপ৷ াংলা সাহিত্য 


কলি। (পায়ে পোড়ে) দেখ, আমি যদিও দোষা নই, তবু আমার ঘাট হয়েছে। 

এ যাত্রা আমাকে মাপ কর। 

বিজ। কি আপদ পা ছাড় নাঃ আমি আর এখানে থাকবো না?. 

কলি। (রোদন করিতে) ও বাপরে! আমার একি সবর্বনাশ হোলো। আমি 

চারদিক যে শুন্য দেখ্চি, আমার বুক ফেটে যাচ্ছে । (বিজয়কালীর প্রতি যোড় হস্ত 

করিয়া) আমাকে মাপ কর। 

বিজ। তোমার মুখ দেখতে আর আমার ইচ্ছে নাই। (মোদোর প্রতি) মোদো! 

পালকি ডাক্‌ নাঃ মর্‌ ব্যাটা! এখন ডাড়িয়ে আছিস 

কলি। (বিজয়কালীর পদ ধরিয়া) তবে আমি এই মলেম। বুকে করাঘাত করিতে) 

আমার এ পাপ প্রাণ এখন কেন আছেঃ আমি মলেই বাঁচি। 

বিজ। এখানে বুক চাপড়ালে কি হবে? তোমার সেই গোলাপবিবির কাছে 

যাও, বুকে এখন হাত বুলিয়ে দেবে। হাতে কতকগুলো টাকা হয়েচে বোলে, 

যা মনে হচ্চে তাই কোচ্চেন। টাকা নিয়ে আমার সঙ্গে আবার নুকো চুরি 

কোরে মরেন। মোদো! পালকি ডাক না। 

কলি। আমার যা আছে আমি সব তোমাকে দিচ্চি, ইস্তক আমার পৈত্রিক 

বাড়ী পর্য্যস্ত নাও। আর আমি আপিশে যা পাব, তোমাকে সব এনে দিব, 

তুমি কেবল আমাকে খেতে পোন্তে দিও। আর আপিসের জল খাবার মাসে 

চাট্রে টাকা দিও। 

বিজ। আমি চাট্‌ টাকা মাট্‌ টাকা বুঝিনে, (ন্লাজ আপিসে যাবার সময় চাট্রে 

কোরে পয়সা ফেলে দোব, জল খাওয়া কৈত নয়, সেখানে আর তো হাতি 

ঘোড়া খাবে না? 

কলি। আচ্ছা! তাই দিও। 

বিজ। তবে এখনি আমাকে সব লিখে দা: 

কলি। তা আমি এখনি লিখে দিচ্চি। (লিখন) 

কলি। শোন দেখি? -_(পঠন) 

স্বস্তি সকল মঙ্গলালয় শ্রীমতী বিজয়কালী দাসী 

সুচরিতেষু।-_ 

লিখিতং শ্রীকলিরকাপ বর্্ম। কস্য বিক্রয়নামা পত্র মিদং কার্যযনধ্াগে। আমি 

তোমার নিকট হইতে দফাওয়ারিতে ব্রিটিশ ইগ্ডিয়ার চলিত ২৫০০০ পঁচিশ 

হাজার টাকা তোমার স্ত্রীধন হইতে কর্য লইয়াছিলাম; এপর্য্যস্ত তা পরিশোধ 

পরিবর্তে তোমাকে বিতরণ করিয়া আমি উপরোক্ত খণ হইতে মুক্ত হইলাম। 

ইহা তোমার স্ত্রীধন হইল, কম্মিনকালে আমি কি আমার উত্তরাধিকার কি 


৩৫৬ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
বিষয়রক্ষক কি যে কেহ হোক, ইহার দাবি দওয়া করি কিম্বা করেন, সে 
নামঞ্জুর এবং বাতিল। এতদর্থে আপন খুসিতে সুস্থ শরীরে তোমাকে এই 
বিক্রয়নামা পত্র লিখিয়া দিলাম ইতি সন ১২৭৪ সাল তারিখ ১৯ মাঘ। 
ইসাদী 
বিজ। তুমি কি লিখলে আমি ত লেখাপড়া জানিনে। মোদো আমার ভাইকে 
দেখিয়ে আসুগ। (মোদোর প্রতি) মোদো এই কাগজখানা আমার দাদাকে দেখিয়ে 
আন দেখি। (মোদোর হস্তে কাগজ প্রদান) 

(মোদোর প্রস্থান) 
কলি। এখন সন্দেশ খাও, আমি বোল্‌তে পারি এ আর মোদো এঁটো করে 
নি। ও আর তো নিব্বধধি নয়, যে তোমাকে ভ্রীটো খাওয়াবে। 
বিজ। মোদো আসুক না? কি লিখেচো আগে শুনি। 
কলি। তোমার দিবিব করে বলচি, যা পড়েচি তাই লিখেচি। তুমি সন্দেশ 
খাও, আমি যে যত্ব করে এনেচি তা সার্থক হোকু। হোতে করে দুটো সন্দেশ 
খাইয আর একটা খাওয়াতে খাওয়াতে) মাকে চাট্টে সন্দেশ দিয়ে আসি। 
বিশু, মুখ হইতে সন্দেশ ফেলে দিয়ে) এই বুঝি আমার তরে সন্দেশ এনেচ? এ 
শুয়োরের শু" তবে এখানে আন্তে কে বল্লে? 
কলি। ঘাট হয়েছে, “৩” খেয়েচি, ও কথা আর কখন মুখে আন্বো না। 
আমি তোমার তরে সন্দেশ এনেচি। যে না খাবে, সে আমার মাথা খাবে, 
মরা মুখ দেখ্বে। (পুনঃ সন্দেশ লইয়া খাওয়ান)। 

(রাধামণির প্রবেশ) 
রাধা। বাবা! তুমি যে দুখানি কাপড় দিয়েছিলে, সে এই পুজো এলে লচর 
কেরে, এই দেখ বাবা এতে আর বস্তু নাই। ন্যাক্ড়া গুচিয়ে আর লোকের 
সাক্ষাতে বেরুতে পারিনে। (ক্রন্দন করিতে করিতে) আজ বৌমাকে বোল্তে, 
উনি আমাকে হাড়ির তেরস্কার করেচেন। 
বিজ। মাগীর ঢং দেখলে জামার গাটা ন্যাকার ন্যাকার করে। ন্যাক্ড়া গুচুনো 
কেমন এক দশা। পুটুলী বেঁধে কাপড় রেখে, লোকের সাক্ষাতে সং সেজে 
ভেক দেখাতে কি একট্র লঙ্জা করে নাঃ মলে বুঝি কাপড়গুলো সঙ্গে করে 
নে যাবে? আজ ঠান্দিদী আস্তে আর একবার এমনি ভেক করে এসে 
দাড়িয়েছিলেন। (ক্ষণেক পরে) দেখ, মাগী আমার হিংসাতে মরেন। তুমি যে 
আমাকে রকম রকম যোড়া যোড়া "কাপড় এনে দীও, তাতে মাগীর যেন বুক 
চড়চড় করে। ওর যেন কত ভাতারের ধন তুমি আমাকে দিচ্চ। 
রাধা। বাছা! শোন্রে | 
বিজ। শুন্বে কি? তোমার গুণ আর ত জানতে বাকি নাই। তোমার তরে 


5৫4 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


লোকালয়ে আমাদের মানসন্ত্রম সকলী গ্যাচে। তুমি না ম'লে আর আমাদের 
হাড়ে বাতাস লাগ্চে না। | 
রাধা। পোড়া মৃত্যুই যদি হবে, তবে আর এত অপমান কে সইবে মাঃ ইচ্ছে 
ভিক্ষে মেগে খাই। 
বিজ। আমরা বাঁচি তাহলে। দড়ী কল্সী কি কিনে দোব? একৃকালে যাও না। 
রাধা। বাবা শোন্রে। 
কলি। শুন্চি তো। তা ওর তো কোন দোষ দেখতে পাচ্চিনে? তোমারই তো 
খুব অন্যায় দেখৃচিঃ যেমন হোক লোকালয়ে আমার মানসন্ভ্রম আছে, তুমি 
লোকের কাছে গ্লানী কোল্লে ও সে কেমন করে বরদাস্ত কোন্তে পারে? তুমি 
নিব্বেধিঃ ও আর ত আমার নিব্বেধি নয়। 
রা অনি বি নিএউরগোর আক ডের এর ভিজারা হর আমি 
কোন কথা কইনে। 
কলি। আরে মর! মোদো ব্যাটা তামাক দে গ্যাল না। (কোল্কেটা নিয়ে 
রাধামণির প্রতি) একটু আগুন আন দেখি! 
(কোল্‌কে সহ রাধামণির প্রস্থান) 

বিজ। মাগীর যত বয়েস হচ্ছে, বুদ্ধি সুদ্ধি তত যেন লোপ পাচ্চে। আর এমন 
বয়েসই বা কি? অথবব তো হন-নি। ওর বইসি গিন্লিবান্নিরা সংসারের কত 
কর্ম কাজ কচ্চে। উনি তেমন হলে আমাদের কি আর চাকর চাকরাণী 
রাখতে হয়ঃ কড়ার কুটোটী “মাড়ুবেন নাঃ কেবল বাকড় ভোরে খেতে 
আছেন। | 

(রোধামণি কক্ধেতে “ফুঁ” দিতে দিতে প্রবেশ) 
রাধা। বাবা! তুমি বরঞ্চ সিদু ঠাকুরপোর মাকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসা কর, 
আমি কোন কথা কইনে। 
কলি। তোমার আমি ত সব জানি, আমার আর ত কিছু জান্তে বাকি নাই; 
আর সিদের মাকে ডাকৃতে হবে কেন? আচ্ছা, তোমাদের যদি বনিবনাও না 
হয়, তবে তুমি কেন দশ হাত তফাতে গিয়ে থাক না। কুঁদুল কচকচিতে 
সংসারের ভদ্রস্থ হয় না। তোমার মেয়ে আছে, জামাই আছে, সেখানে গে ত 
অনায়াসেই থাকৃতে পারো। তারা খেতে পোত্তে না দ্যায়, আচ্ছা আমি 
তোমাকে সেখানে খোরাকি দু-টাকা, আর বচ্চরে দু-খানা কাপড় পাঠিয়ে দিব। 
বিজ। এখনি পাঠিয়ে দাও, তা না হলে আমি আজ আর জলস্পর্শ কোরব 
না। আমি বারানশী চিনেপুত কাপড়গুলো আটপৌরে পরি, বোলে, মাগী যেন 
দম আট্কে মরে। চোখে দেখতে পারে না বোলে বলে কি, “ও বৌমা! এ 


৩৫৮ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
গুলো আটপৌরে পোরে পোরে ছিড্চিশ কেন? ওর গুণ আর কত বলব, 
হাঁড়ীতে ভাল মাচ রেঁদে রাখ্বার যো নাই। ' 
কলি। (রাধামণির প্রতি) ওগো! তোমার আর এখানে থাকা হবে না। মোদো 
আসুক আজই তোমাকে তোমার মেয়ের বাড়ীতে রেখে আস্বে। 
রাধা। জামাইয়ের বাড়ী গিয়ে থাক্বো না বাবা? তা হলে লোকে তোমার 
নিন্দে কোর্বে। 
কলি। সে আমার নিন্দে হবে ? তোমার তাতে ক্ষতি কি? 

(মোদোর প্রবেশ) 

বিজ। মোদো! দাদা কি বল্লেন র্যা। 
মোদো। সব ঠিক হয়েচে বল্লেন, কেবল কটা স্বাক্ষি বসাতে হবে। 
কলি। তা কাল সকালে করে দেওয়া যাবে। 
বিজ। সে আবার কি? স্বাক্মী আজই কোরে দিতে হবে £ 
কলি। রাত্তির হয়েচে; এখন আর কে আস্বে। আচ্ছা তোমার মোদো তো 
আছে, এ একজন ভারবেল স্বাক্ষী রইলো। (মোদোর প্রতি) মোদো! আমি 
তোর মায়ের কাছে টাকা ধাত্তেম, তার বদলে আমার এই বাড়ী খানা তোর 
মাকে আজ লিখে দিলেম। এতে আর আমার কোন স্বত্ব রইলো না। 
মোদো।। (স্বগত) তোমার শরীরেই কোন স্বত্ব নাই, তা বাড়ীতে থাক্‌বে। 
বিজ। মোদো শুন্লী? 
মোদো। খুব শুনেচি। স্বেগত) এই বারেই উচ্ছন্ন গেলেন আর কি? জগবম্প 
বাবুও এই রকম সব মাগ্‌কে লিখে দিয়েছিল, শেষে ছেলে না হতে আর 
একটী বিয়ে কোন্তে মাগ রাগ কোরে বাপের বাড়ী চোলে গ্যালো। সেখানে 
তার বিয়ারাম হতে সে ভাইকে সব বিষয়াদি দানপত্রের দ্বারা লিখে দিয়ে 
মরে গ্যালো। শেষে জগবম্পবাবুর শ্যালা বাড়ী দখল কোন্তে এলো, তখন 
আর মুক্কিলের সীমা নাই। একটা পয়সাও হাতে ছিল না। শেষে দশজন 
ভদ্রলোককে ধোরে, শালার পায়ে পোড়ে বাড়ীখানি ভিক্ষা মেগে নিয়েছিল। 
মাগমুখোরা দেখে শুনেও তো শিখে না। 
বিজ। মোদো! আর একটা কর্ম কর দেখি? এ মাগীকে ওর মেয়ের বাড়ী 
রেখে আস্গে। | 
রাধা। (কলিরকাপের প্রতি) বাবা! আমি মেয়ের বাড়ী যাব না। 
কলি। তা না গ্যালে চোল্বে কেন? তোমার এ রোজ রোজ কিচ্‌্কিচি আমি 
আর বরদাস্ত কোন্তে পারিনে। (মোদোর প্রতি) মোদো! ওঁকে রেখে আস্গে। 
মোদো। স্বেগত) হায়! হায়! কি সবর্বনাশ! দিদিমার ভাগ্যেও এত ছিল। 
প্রেকাশ্যে) দিদি-মা! আসুন তবে। 


৩৫৯ 


নুহ্তাপ্য পাংল সাহিতা 


রাধা। মধু! আমি সেখানে যাব না। আমি আমার আপনার ঘরে চল্লেম। 
বিজ। আর আপনার খর বোল্তে হবে না। এখন তোমার কোন বাবার ঘরে 
যেতে চাচ্চ। (সাপের প্রতি) মোদো! ও মাগী সহজে যাবে না দেখ্চি? হাত 
ধরে টেনে নিয়ে মা। 

রাধা। (কিলিরকাপের প্রতি) বাবা! তুমি কি কিছু বোললে না? 

কলি। আমি আর কি বোলবো? এখন আমার আর তে! কোন হাত নাই। ও 
আমাকে যতক্ষন খেতে দেবে ততক্ষণ আমি একমুঠো খেতে পাব? 

বিজ। মোদো! মাগাকে টেনে নে যানা? এখন ডাড়িয়ে কি ভাবচিস্£ঃ মর 
ব্যাটাঃ আমার কথা যেন গ্রাহ্য হোচ্চে না। মাগীকে ঝ্যাটা না মাল্লে আর বুঝি 
যাবে না । 

মোদো। (পাধানণির হ'ত ধরিয়া) দিদিমা! চলুন , আর কেন 

রাধা। (কলিরিকাপের প্রতি ক্রন্দন করিতে করিতে) বানা! আমি রাত্রে চোখে 
দেখতে পাইনে, পথে কো পোড়ে মোর্বো, আমাকে কাল সকালে পাঠিয়ে 
দিও! 

বিজ। আনার বাড়ীতে আর তোমাকে থাক্‌তে দেবো না. তুমি গ্যালে তবে 
অমি জলমস্পশ কোরবো। লক্ষ্মী মা আমার, এখন ভালঘ ভালয় বেরোও, 
আমর ভারা তেঙ্তা পেয়েচে একটু জল খেয়ে বাঁচি! 

কলি। [মানে তাবে আর দেবি করিস্নে রে, মাকে শিগগির নিয়ে যা। এ 
বল প্যাস্ত তোর মায়ের ক্ষিদে কি তেষ্ট পেয়েছে বোল্তৈ আমি শুনিনে। 
ঢোক ভাজ ভারি তা পেঠেছে। 

মোদো। (হ-) দিদিমা! আনলে হে ভিলাবাতসেত।, বেত কোরে হাত ধরে 
টেনে নে মাত তি বেছিছপা লাবুহ দাবি টি ৬৭ * হালে কেমন বাবু 


এ হু ধলিয়া) দিদিহত। টান, আক এখানে কেন? 


৬ হল ভ্যাদে প্রাণ বা না। 

দিদিমা যে ভালোবাসে মা তিনন হস মা।। 

দুটি শেছে বারি ঝরে কি বরে হাত করে ধোরে, 
নে যাই বাটীর বাহির “কাকে, পৃ এনে ভাল না। 
জানি, যাব গন পাগারে, বাবু হান গর সংসারে, 

কি. দুখ দিলণ গত ভারে, ধন তা সনে শা। 

রাধা । ওঠে! আমার ভাগ্যে রি এই ছিল, আমি ব্যাটার এ হি 


ব্যাটা খেলে বিদায় হচ্চি। হায় হায়! কলীরকাপের মনেও কি এই ছিল, আমি 


ভ্যালারে মোর বং 
যে ন্যাকড়া পোরে, কোন দিন অর্াশন, কোন দিন ভাতেহাতে, কোন দিন 
নিরন্ব, কোন দিন কেবল একটু জল খেয়ে, প্রাণ ধরে আছি, কিন্তু 
কলীরকাপের মুখ দেখলে আমার যে এসকল দুঃখ আর মনের মধ্যে থাকে 
না। হায়! কলীরকাপ কি আমার মুখের দিকেও চেয়ে দেখলে না। সে কি 
ধর্মের দিকে ফিরে চাইলে নাঃ মায়া কি একেবারে তার শরীর পরিত্যাগ 
কোরে গ্যাচে। এমন রাক্ষসী বৌকেও ঘরে এনেছিলেম, সে তার বিদ্যা 
বুদ্ধিকে বাকড়ে ভরেচে। 
বিজ। আ মর মাগী? টেঁচাচ্চিস্‌ কেন? কানে তালা ধরিয়ে দিলে। বের না 
এখন। মোদো! আবাগীকে কুলোর বাতাস দিয়ে কুলো বাজাতে নিয়ে যা। 
মোদো। (হস্ত ধরিয়া) দিদিমা আসুন। 

(রাধামণি ও মোদোর প্রস্থান) 

বিজ। (কলিরকাপের প্রতি) আর আলম্ষ্মী মাগীকে ঘরে ঢুকিও না? এইবার 
দেখ তোমার সোনার সংসার হবে। মাগার অপয়ে সংসারটা যেন ডুবে 
যাচ্ছিল। মোদোর আস্তে দেরি হবে, কাপড় ছেড়ে মুখ হাত প! ধোবে চল, 
আমি এখন জলটল সব দিব। 

(বিজ্জয়কালী ও কলির্কাপের প্রস্থান) 


ইতি প্রথম অঙ্ক সমাপ্ত। 


দুর্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
দ্বিতীয় অঙ্ক 


ফেলিরকাপের অস্তঃপুর) 
(কলিরকাপ ও বিজয়কালী আসীনা 1) 
কলি। ঠান্দিদি যে আস্চি ব'লে গ্যালেন, বোধ করি আজ আর এলেন না। 
বিজ। এখন এলেও আস্তে পারেন, রাত্তির তো অধিক হয়নি। 
(সিদুরমাতার প্রবেশ) 
বিজ। এই যে মেঘ চাইতেই জল। ঠান্দিদি! তুমি ভাই অনেক দিন বীচবে। 
এই তোমার নাম করেছি। 
সি-মা। আর বাঁচতে বোলোনা দিদি? এখন সিদুকে রেখে শিগ্নির শিক্সির যাতে 
যাই তাই বল। 
বিজ। বালাই! এখন ও কথা বোলো না। সিদুর বিয়ে দাও, বোয়ের একটা 
ছেলে হোক, (একখানা রেকাবিতে আন্ট্রা সন্দেশ দিয়ে) ঠান্দিদি! একটু জল খেতে 
হবে ভাই। 
সি-মা। নাতৃবৌ! তুমি কবে না খাওয়াচ্চ ভাই£ আশীব্্বাদ করি, নাতী আমার 
রাজা হোক, তোমার একটা ছেলে হোক, আমরা যেন এন্নি কোরে এসে 
তাতে বোসে বোসে সন্দেশ খাই। 
বিজ। তাই আশীব্র্বাদ করুন। এখন আপনি জল খান। 
সি-মা। নাতৃবৌ এ সন্দেশ কটী আমি আর খাব না। সিদুর তরে নিয়ে যাই। 
(আঁচশুল সন্দেশ বন্ধন) 
বিজ। আপনি ও খান্নাঃ আমি শ্বশুরকে আলাদা দোব এখন। 
সি-মা। আজ জল খেয়ে এসেচি, এখন আর খেতে পারবো না ভাই? 
বিজ। (অপর চাট্রে সন্দেশ লইয়া) তবে শ্বশুরের তরে এই চাট্রে সন্দেশ নিন্‌। 
সন্দেশ কিন্তু আপনি খাবেন। (সন্দেশ প্রদান)__ 
সি-মা। (আঁচলের £গেরে! খুলে সন্দেশ লইয়া পুনঃবন্ধন) 
কলি। ঠান্দিষি তোমার নাতৃবৌ খুব দাতা। ওর পুণ্যেতে আমার সংসাগ। 
ওর গুণের ক' আমি এক মুখে বলতে পারিনে। আমার শাশুড়ীকে মাঝে 
মাঝে কাপড় কিনে দিচ্ছেই; যে দিনকার যে খাবার জিনিস তা না দিলেই 
নয়। আপনি সাতনর গড়ালে, ওর ভেয়ের স্ত্রীকেও ঠিক তেমনি সাতনর 
গড়ীয়ে দিলে। ওকে আমি এক যোড়া বারাণসী কাপড় কিনে দিলেম, ও 
তার একখানা আপনার ভাজকে দিলে। আর আমার কাপড় চোপড় মাঝে 
মাঝে ওর. ভাইকে দিচ্চেই। এ সওযায় কত জিনিসপত্র ও টাকা দিয়ে তাদের 
সংসারের সুসার কোচ্ছে। 


৩৬২ 


ভ্যালারে মোর বাপ 

সি-মা। ওর মনও যেমন, ভগবান তেম্নি ভালও কোচ্চেন। মনের মতন 
পতিও পেয়েছে। স্বগত) লোকে কথায় বলে “রাজা অন্দরে ধন বিলচ্চেন” 
আপনার ভাই ভাজ মাকে দিচ্চে, এর আবার কথাঃ এমন ভ্যাড়া ত আর 
কখন দেখিনে? 
কলি। ঠান্দিদি! ওর গুণে আমি ওকে ভারি ভালবাসি। ও যদি একটু মুখ 
ভারি কোরে বোসে থাকে আমার বুকের ভেতরে যে কি কোন্তে থাকে তা 
আর বোলতে পারিনে। 
সি-মা। ভাই! এক হাতে আর তালি বাজে না, তুমি ওকে যেমন ভালবাস, ও 
ও তোমাকে তেন্নি ভালবাসে । তোমার যেদিন আফিস থেকে আসতে দেরি 
হয়, ওর ভাবনার সীমা থাকে না। 
কলি। ঠান্দিদি! আমার শরীরে আর তো কোন বদচাল নাই। আমি মদ 
খাইনে, যারা নরাধম তারাই মদ খেয়ে লোক ঢলাঢলি করে। আমি কুসঙ্গে 
বেড়াইনে, যারা নিন্দুক মনুষ্য তারাই কুসঙ্গে থাকে। পাছে কুসঙ্গ যোটে তার 
জন্যে আমি বৈঠকখানায় বসা তুলে দিয়েচি। আমি বেশ্যালয়ে যাইনে। যারা 
বাউত্রে, তারাই খান্‌্কির বাড়ী গিয়ে টাকা নষ্ট করে দঠান্দিদি, তোমাকে 
বোলতে কি? আমি আপিশ থেকে আস্বার সময় রার্তীর ধারে বারেপ্ডায় 
খান্কি বেটীরে যেমন কোরে সেজে বোসে থাকে দেখি, ঘরে এসে তোমার 
নাত্বৌকে ঠিক তেন্ি করে সাজাই। 
সিমা। সেইতো ভালো ভাই, বাইরে টাকা নষ্ট করায় কি দরকার আছে। ঘরে 
সেই রকম আমোদ আহাদ কোল্লেই তো হোলো। 
কলি। ঠান্দিদি! একদিন ফিরোজা, বাইআনা পোষাক পোরে বারেগডায় বোসে 
বিয়ারাকে একছিলিম তামাক দিতে বোল্তে, বিয়ারা যেমন কোরে এসে 
তামাক সেজে দিলে, ফিরোজা যেমন ক'রে তামাক খেতে লাগলো। আমি 
ঘরে এসে বিয়ারা সেজে তোমার নাতৃবৌকে ফিরোজা বাই সাজিয়ে ঠিক 
তেম্নি কোরে তামাক সেজে দিয়েছি। 
সি-মা। কই ভাই, আমাকে সেটা একবার দেখাও না? 
কলি। আপনি তবে বসুন, আমরা ও ঘর থেকে সেজে আসি। 

(কলিরকাপ ও বিজয়কালীর প্রস্থান) 

(অপর দিকে মোদোর প্রবেশ) 
মোদো। আজ, দিদিমার কথা শুনেছেন কি? 
সি-মা। নাঃ কি হয়েছে? 
মোদো। আজ যে তাকে বাড়ী থেকে বিদায় কল্লেন? 
সি-মা। বলিস্‌ কিরে! কি সব্বনাশ! মাকে একমুটো ভাত দিলে না। মধু! 


৩৬৩ 


দৃহ্প্রীপ্য বাংলা সাহিত্য 


তিনি কোথা গ্যালেন তবে র্যা? 
মোদো। তার মেয়ের বাড়ী তাকে রাখতে গেছলাম। ত্বার জামাই বরেন্দ্রবাবু, 
আমাদের বাবুর কথাবার্তা শুনে অবাক হ'য়ে রইলেন। পিশিমা দিদিমার দুর্গাতি 
দেখে কীদ্তে লাগলেন। দিদিমা যত দিন বেঁচে থাকবেন, পিশিমা আর তাকে 
এ বাড়ীতে আস্তে দেবেন না। যাহোক দিদিমার কিন্তু এক রকম ভালো 
হ'লো বোলতে হবে। 
সি-মা। মধু! কলিরকাপ লোকালয়ে মুখ দেখাবে কেমন কোরে র্যা। 
মোদো। সে কথা আর কেন বলেন, উনি ত লোকলৌকিকতা কিছুই মানেন 
না। এক স্তট্রীকেই জীবনের সার্থক জেনেচেন। (চারদিক দেখে) মা আজ বাবুকে 
যে ভ্যাড়া সাজাবেন, তা বরেন্দ্রবাবুকে বলেচি। তিনি আজ তা দেখতে 
এসেচেন, আড়ালে লুকিয়ে আছেন। যাতে ভ্যাড়া সাজানো হয় এটী কোরো 
বাবু। 
সি-মা। বরেন্দ্র একলা এসেছে, না সঙ্গে আর কেউ আছে? 
মোদো। (চাদ্দিক দেখে) পিশিমাও দিদিমাও এসেছেন। বরেন্দ্রবাবুর মত এমন 
নে আর দেখিনি। আমি দিদিমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছলেম বোলে 
আমাকে দশ টাকা বোকশিষ দিয়েচেন। এবার আমাকে তিনি তার বাড়ীতে 
রাখবেন। 
সিমা। তবে ওই আর এখানে থাকবিনে? ৃ 
মোদো। এখানে কি থাক্‌ৃতে আছে মা? এর যে ভাত খায় তারো মহাপাতক 
হয়। মা! যার বাড়া আর কেউ নাই, যার জন্যে সৃষ্টি কোরলে, তাকে বাড়ী 
থেকে তাড়িয়ে দিলে। বরেন্দ্র বাবু কত লোককে ভাত দিচ্চেন। মাসী, পিশি, 
মামাতো পিশতাতো ভাই, আর আর কতো লোক রয়েচে। মানুষই লক্ষ্মী: 
বাড়ীটাতে ঢুকল যেন মা লক্ষ্মী বিরাজ কচ্চেন এমনি বোধ হয়। কত লোক 
আসচে, কত লোক যাচ্চে। বরেন্দ্র বাবু কত করে তবে ল্কিয়ে বেরিয়ে 
এসেছেন! যাঠেক আজ যেন বাবুকে ভ্যাড়া সাজান হয়। 
সি-মা। ভ্যাড়! হত সেজেই আছে, তবে বাড়ার ভাগ কেবল একটা "ভাড়ার 
হাল উপরে দ€য়া। ভা যেমন কোরে পারি সাজাব। সম্প্রতি কি রঙ্গ করে, 
৩াদের দেখত বোলিগে ! দুটোতে কি সাজতে গ্যানে! 
মোদো। তদে আমি চল্লেম। 
(ঘোদোর প্রস্থান) 
কলিরকাপ ও বিজয়কালীর প্রবেশ। 
. (বিজয়কালী বাইজীর পোষাক পোরে মাথায় উড়না দিয়ে 
কেদারার উপবেশন।) 


৮১০৫০, 


ভ্যালারে মোর বাপ 
বিজ। (কলরকাপের প্রতি) শিউরৎ! একঠো চিলাম্‌ ভরকে লাও। 
কলি। (নেপথ্য হইতে) আ'মে বাইজি! 
সি-মা। বড় মন্দ নয়। বেশ বাইজী সেজেচিশ। 

(কলিরকাপ তামাক সেজে কোক্কেতে “ফুঁ ” দিতে দিতে প্রবেশ) ূ 
কলি। মাথার কাপড় খুলে বোস না? ঠান্দিদির কাছে লজ্জা কি? (মাথার 
কাপড় খুলে দিয়ে) তামাক খাও দেখি£ ঠানদিদির দেখে তাক লেগে যাক। 

(বিজয়কালীর তামাক খাওয়া)। 
সি-মা। বা নাতবৌ বেশ যে তামাক খেতে শিখেচিস? 
কলি। ঠান্দিদি! সুদু তামাক খাওয়া কি? আবার কেমন কথা কয় দেখুন। 
(বিজয়কালীর প্রতি) বাইজি। হামরা মুন্ধুক সে খবর আয়া, মেরা জরুকো 
বেমার হুয়া, ইসিবাস্তে হাম ছোটা মাংতা। 
বিজ। তব্‌ হাম্রা নওকরি কোন্‌ করেগা। 
কলি। আপকো হুকুম হোনেসে বদলি লামে। 
বিজ। ও আদ্মি আচ্ছা কাম কর্নে সাকেগা। 
কলি। ও বি মজবুত আদমি হ্যায়, ওন্‌্কো কুচ শেকলানে হোগা নেই। 
বিজ। ঘরমে তোম্হারা কেনা রোজ দের হোগা। 
কলি। বহুত রোজ হোগা নেই, এক মাহিনা বিচমে আয়েঙ্গে। 
বিজ। খবরদার! এক মাহিনা বিচমে আনা চাহিয়ে। নেইতো দোশ্রা আদ্মি 
ভর্তি করেঙ্গে। 
কলি। নেহি ক্ষণিক পরে যোড় হস্ত করিয়া) মেরা তলব। 
বিজ। কব্‌ যাওগে। 
কলি। আবি রওনা হোনে মাংতে। 
বিজ। ইএ বড়া মুক্ষিল! আবিতো হামারা হাতমে রোপেয়া কৌড়ী কুচ হায় 
নেই। কাল রাতকো মিলেগা। 
কলি। (যোড়হাত করিয়া) হামকো জরুর যানা লিখা, মেহেরবানি কোরকে 
গোলামকো আজ ছুঁটী দিজে বাইজি। 
বিজ। আচ্ছা! মেরা ফুফিকো বোলাও। 
কলি। (সিদুরমাতার প্রতি) ঠান্দিদি! আপৃনি একবার ফুফি হয়ে দীঁড়ান্‌। 
সি-মা। আমি ত ভাই তোমাদের মতন অমন কোরে কতা কইতে পার্ব না? 
কলি। আপ্নি একবার কেবল উঠে দাঁড়ান নাঃ আমি আপনার পেছন থেকে 
ফুফির কথা কচ্চি। 

(সিদুরমাতা দণ্ডায়মানা) 

বিজ। ফুফি! শিউরৎকো জরু বড়া বেমারি হ্যায়, ও ঘর যানে মাংতা। 


৩৬৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কলি। (সিদুরমাতার পশ্চাৎ হইতে) হামসে উও শুনা হ্যায়। (সত্বরে কিঞ্চিৎ অন্তরে 
গমন) 
বিজ। আবি উনকো তলব দেনে হোগা, হামারা পাশ পয়সা কৌড়ী কুচ হ্যায় 
নেই। ইয়ে! হামারা পেশরাজ লেকে বন্দক রাখকো থোড়া রোপেয়া লেয়াও। 
কলি। (সিদুর মাতার পশ্চাতে যাইয়া) মজুরা আনেসে পেশয়াজ কাহা মিলেগা। 
(সত্বরে অন্তরে গমন) 
বিজ। মজুরা কো আগাড়ী বায়না মিলেগা। তব্‌ কুচ হরকত হোগা নেই। 
কলি। (সিদুর মাতার পশ্চাৎ হইতে) বহুত আচ্ছা । (বলিয়া স্বস্থানে দণ্ডায়মান ।) 
বিজ। শিউরত! দোশরা চিলাম দেও। 
কলি। যো হুঁকুম। 

(কলিরকাপের কোল্‌কে লয়ে প্রস্থান) 
সি-মা। নাতবৌ! খুব মজায় আছিস, ভগবান চেরকাল তোমায় এমনি সুখে 
রাখুন। 
বিজ। আশীব্র্বাদ করুন। ঠান্দিদি! আজ এ কি দেখচেন্‌ আমরা যে কত মজা 
করি, তা আর কি বোল্বো। 
সি-মা। নাতৃবৌ! আজ যে বড় তোর ঠাক্রুনের সাড়া শব্দ পাচ্চিনে? 
বিজ। ঠান্দিদি! তোমাকে বোলতে মনে নেই ভাই। আজ মাগীকে ভিটে ছাড়া 
কোরেচি। এতক্ষণ বাড়ীতে থাক্লে চিহ্কারে কানে তালা ধরিয়ে দিত। 
সি-মা। তবে আজ তো তোমার .গেরো কেটে গেলো। 
বিজ। তা আর একবার বোল্চেন। 
সি-মা। (স্বগত) মুখে আগুন তোমার। এ কথা বোলতে আর একটু আটকালো 
না? এমন “ভ্যাড়াকান্ত” ভাতার ও আর দেখিনে। 
বিজ। ঠান্দিদি! আমি তোমার নাতীকে যা বোলবো তা না শুনলে তার কি 
আর রক্ষা আছে? 
সি-মা। নাৎবৌ! আজ কিন্তু তোর কত্তাকে ভ্যাড়া সাজিয়ে দেখাতে হবে; 
তবে জানবো ভালবাসা। 
বিজ। এই সাজাই আরকি? সে সময়টা তুমি ভাই বাইরে থেকো। এখন যেটা 
হোচ্চে সেইটে দেখ। 

(কলিরকাপের তামাক সেজে প্রবেশ) 
কলি। (তামাক দিয়ে) বাইজি! এক বাবু দরজামে খাড়া হ্যায়, উপর আনে 
মাংতা। 

(বিজয়কালীর সসব্যস্তে প্রস্থান) 

বিজ। (নেপথ্য হইতে) শিউরৎ! হিঁয়া পান্কি বাট্টা আর ছিলাম একঠো লাও। 


৩৬৬ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
(কলীরকাপের সসব্যস্তে পানের বাটা ও ছিলাম লইয়া প্রস্থান) 

সি-মা। (স্বগত) ভাল ভ্যাড়া বানিয়েছে, এটা মাগ মাগ করে একেবারে পাগল 
হয়ে গেছে। জগদীশ্বরের বিশ্বসংসারে যে কত রকম জানোয়ার আছে তার 
সংখ্যা নাই। তার মধ্যে মাগমুখো এও এক রকম দুপেয়ে জন্ত। মান্ষে আর 
মানুষ বলে না? আর মানুষ হওয়া অত সহজ কথা নয়? মনে মনে 
আপনাআপনি আমি একজন মস্ত লোক এ আজকাল অনেকেই বোধ করে; 
কিন্তু তাদের মধ্যে অনেককেই জানোয়ার বোলে বোধ হয়। কেও মাগমুখো 
হয়ে বুড়ো মা-বাপকে অন্ন দিচ্ে না। কেও বারমুখো হয়ে লোক লজ্জার 
মাথা খাচ্চে। কেউ মাতাল হয়ে নদ্দামায় পোড়ে মোচ্চে। কেউ ধনের লোভে 
বিশ্বাসঘাতক হোচ্চে। কেউ গণগ্ডা পাঁচ ছয় বিবাহ কোরে পাপের মহোৎসব 
কোচ্চে। কেউ বাইরে বকথধার্ম্মিকের মতন, লোক দেখিয়ে ভিতরে ভিতরে যে 
কুকর্ম না কোচ্চে, এমন কর্্মই নাই? শতেকের মধ্যে একটা মানুষ খুঁজে 
পাওয়া যায় না। (ক্ষণেক নিস্তব্ধ হইয়া চারিদিকে দেখে) আ মর! রাত্তির হোতে 
লাগল যে? এখন আসচে না কেন? 
. (বিজয়কালী ও কলিরকাপের প্রবেশ।) 
বিজ। ফুফি! আওর পেশোয়াজ বন্দক নেহি দেনে হোগা । রোপেয়া মিলা 
হ্যায়। কলুটোলাকি মোট্টা বাবু, যেস্কা পেট ঢাকাই জ্বালাকি মাফিক হ্যায়, ও 
বরষ যেস্কা বাড়ীমে একবার মজুরা হো গয়া। আবি ও বাধু আয়া থা, পরশু 
ওস্কা বাড়ীমে সাদী হোগা, আজ পঁচিশ রোপেয়া বায়না দে গিয়া। 
কলি। ঠান্দিদি! কেমন মজা। 
সি-মা। তোমাদের পেটে ভাই এতও আছে? স্বপ্নেও তা জানতেম না? 
কলি। ঠানদিদি! আমার আর তো কোন সক নাই, তোমার নাৎবৌই আমার 


সব। 

সি-মা। এই ত ভাল ভাই, তুমিই বুঝেছ ভাল; এ কি সকলে বুঝতে পারে? 
কলি। ঠান্দিদি! ওকে যে আমি কি ভালবাসি, তা আর বোল্তে পারিনে। 
আর ওকে নিয়ে আমি যে সক্‌ না মেটাই এমন সকই নাই। বিবিয়ানা, 
বাইয়ানা, ইহুদীআনা, ওর সব রকম পোষাক করে দিয়েচি। যে দিন আমার 
যে রকম দেখতে ইচ্ছা হয়, তাই সাজতে বলি। বিশ পঁচিশ যোড়া ওর 
জুতোই কিনে দিয়েচি; আপনার ঘরের ভিতর যা করি, কে তা দেখতে আসে 
ভাই£ঃ তোমার সঙ্গে ভারি খোলাখুলি বোলে, 'তাই আজ সব বোল্লেম। 
ঠান্দিদি! আর একটা গোপনীয় কথা তোমার সাক্ষাতে বোল্চি, দেখো, 
কারেও বলো না। ও দৈবাৎ যদি বাপের বাড়ী কি অন্য কোথাও যায়, ওর 
পায়ের এক জোড়া জুতো নিয়ে আমি বুকে কোরে শুয়ে থাকি। তাতেও 


৩৬৭ 


দুপ্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 

আমার মন খুব ঠাণ্ডা থাকে। 

সি-মা। মিছে বোক্চ কেন ভাই? তুমি এমন হলে নাৎ- বৌয়ের আর ভাবনা 
ছিল না। 

কলি। ঠান্দিদি! আমার কথা বুঝি বিশ্বাস হ'ল না। তবে দেখাই। (বিজয়কালীর 
প্রতি) একবার তোমার পায়ের জুতো যোড়াটা দাওত। (বলিয়া জুতো লইয়া 
হৃদয়ে স্থাপন পূর্বক সিদুরমাতার প্রতি) ঠান্দিদি! এতে যে আমি কি সুখী হচ্চি, 
তা আর বোলে জানাতে পারিনে। 

সি-মা। (স্বগত) কি আপদ! এটা মাগ মাগ কোরে এককালে বদ্ধ পাগল হয়ে 
গ্যাচে? 

কলি। ঠান্দিদি! আমি ওর কেনা গোলাম, আমি ওর চাকর, ও আমার মনিব, 
ও আমার গুরু, ও আমার ইষ্টঈদেবতা, ও আমার সাধনের ধন। কত তপস্যা 
করে যে ওকে আমি পেয়েচি, তা বোলতে পারিনে। ঠান্দিদি! আমি এখন 
আর ইষ্ট মন্ত্র জপ করিনে, সে সব ছেড়ে দিয়েচি। এখন দিবারান্তির কেবল 
তোমার নাতবৌই আমার ভাবনা হোয়েছে। 

বিজ। দেখো, ভেবে ভেবে যেন পাগল হয়ে যেও না। 

কলি। ঠান্দিদি! ও ত এক কথা যা মুখে এলো তাই বোল্লে, আমার যা হয় 
তা আমিই জানি। বুঝেচো। 

সি-মা। তার আর ভুল কি আছে, ওকি একটা কম মেয়েমানুষ; শাপতষট 
জান্মেছে। 

কলি। ঠান্দিদি! যদি বোলে তবে বলি, আমার চকে আমি এমন আর 
দেখিনে। ওর কোন অঙ্গটা আমি ত আর নিন্দের দেখিনে। 

সি-মা। নাতি! বোল্তে কি? তুমি কিছু মনে করনা ভাই? অমন মাগ যদি 
অপর কেউ পেতো, সে তার চন্নামেত্ত খেতো। 

কলি। (ক্ষণেক হাস্য করিয়া) স্বগত) ঠান্দিদি মনে করেচেন আমি খাইনে। 
আমার চেয়ে মাগকে ভাল বাসতে এমন আর কোন্‌ ব্যাটা আছে। আমি যদি 
মেগের চন্নামেত্ত না খাব, তবে আর খাবে কে£ প্রেকাশ্যে) ঠান্দিদি! চন্নামেত্ত 
খাই কিনা একবার আপনার নাংবৌকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন না? আর 
জিজ্ঞাসা কোরেই বা কাজ কি? এখনি আপনাকে দেখিয়ে দিচ্চি। 
(নেপথ্যাভিমুখে) মোদো! মোদো! 

মোদো। (নেপথ্য হইতে) আজ্ঞা যাই। 

কলি। -ওরে একটু পাৎকোর জল আন্তো। 

মোদো। (এক গেলাস জল সহ প্রবেশ করিতে করিতে) (স্বগত) “মোদো মোদো” 
আর আজকের দিন্টে, যাবার সময় যা হোক আজ একটা রকম সকন কোরে 


৩৬৮ 


ভ্যালারে মোর বাপ 


যেতে হবে। দিদি-মা আমাকে যে ভালবাসেন, আজ তীর যে দুর্দশ! দেখা 
গ্যাচে, তা মনে হলে আর বেঁচে থাকৃতে ইচ্ছে করে না। 
(মোদোর প্রবেশ) 


কলি। চলে আয় ব্যাটা । গেলাস হইতে এক গণ্ডুষ জল লইয়া) (মোদোর প্রতি) মর 
ব্যাটা তুই আর এখানে কেন? 

মোদো। আজ্ঞে আমি রইলেম বা? আমি ত আর কারো সাক্ষাতে বোল্তে 
যাব নাঃ “নেমকের চাকর, আর কুকুর।” 

কলি। দেখিস ব্যাটা? আর বল্লিত বয়েই গ্যালো। আমি ত আর অসৎ কর্ম 
কচ্চিনে। বিজ্য়কালীর প্রতি) একবার চরণটী ডুবিয়ে দাও। 

বিজ। (চরণাবৃত দিয়ে) ঠান্দিদি! এ আর আমাদের নতুন নয়? তুমি কিন্তু ভাই 
কারো সাক্ষাতে বলো না। 

মোদো। স্বেগত) আজ তোমার হাটের মাঝে হাঁড়ী ভাঙ্গা হোচ্চে। বরেন্দ্রবাবু 
সব দেখচেন। মধুসুদনও আর ভয় করেন না। 

কলি। (বিভয়কালীর চরণোদক পান করিয়া মত্তকে ও অষ্টাঙ্গে হাত বুলাইয়া) ঠান্দিদি! 
এ 'যে আমাকে কি মিষ্টি লাগে, তা আর বোলতে পারিনে। এ চন্লামেত্ত 
খেলেহ আমার মন যেন নিম্ম্ল আর দেহ পবিত্র হয়, মনের মধ্যে যে পাপ 
তাপ আছে, এমন আর বোধ হয় না? 

সি-মা। মাগও এক রকম গুরু হে!!! 

কলি। ঠান্দিদি! গুরু শব্দ আর ত গাছ থেকে পোড়ে হয় নি? যার ভারিত্বে 
তঅছে সেহ গুকু, তা, স্ত্রীতে যে ভারিত্ব আছে, বোধ করি বিশ্বসংসারে তা 
নেই। বিবেচনা করে দেখুন, মাগ যদি এ দিকে একট্রু মুখ ভারি কোরে বসে, 
৪ দিকে অমনি বিশ্বসংসার শুন্য হয়ে পড়ে। নির্বোধ লোকেরা বলে মায়ের 
চেয়ে আর গুরুতর নাই। ঠান্দিদি! এও কি কথা? না এ মনে ধরে? দেখুন! 
মাকে হেলে কত লোক বিবাগী হয়ে যাচ্চে, মুনি খষিরে ত অনেকেই 
গযাচেন, তাদের চেয়ে সামান্য নরে আর ত জ্ঞানবান নয়? মাগকে ফেলে 
কটা লোক বিবাগী হায়েছে বলুন? তবে যারা যায়, তাদের চেয়ে প্র জ্রান 
আছে। নিশ্মসংসারে মাগই সকলের সার, তার সেবা কোলে শরীরে কোন 
পাতক ভজাণ্মায় না, আমি খুব বোল্তে পারি, আমার শরীরে কোন পপ নাই। 
মোদো। (স্বগত) পাপের গন্ধ মাত্রও নাইই। তুমি যে মহাপাতকী যম তোমার 
তরে একটী কেবল মুদ্দকরাধের “বিষ্টায়” নরক কুণ্ড, আর ফরমাসে ডাঙ্গস 
গড়িয়ে রেখেচেন। একবার নিয়ৎ ফুরুলেই হোলো, অমনি কাটা বন দিয়ে 
হিচুরে টেনে নে যাবে। সে সময় আমি যদি দেখতে পাই, দিদিমার যে দুর্দশা 
করেচ, আমিও একটী আত্ত যম দূত হবো। এখনি আমার এমনি বোধ হচ্ছে, 


৩৬৯ 


দুত্প্রাপ্য বাংলা সাহিতা 


মাথাটা ভেঙ্গে ফেল্লে তবে দুঃখ যায়। 
কলি। ঠান্দিদি! একটা গীত গাই শুনুন। 


গীত। 
যারা গো অল্প বুদ্ধি জন। 
সত্ররতনে অযতনে করে জ্বালাতন। 
জগত দেখিলে চেয়ে, কি আছে রমণীর চেয়ে, 
এমন" রতন পেয়ে, করে অবতন! 
বনিতা' লয়ে সংসার, সে ধন বিহীন যার, 
বিফল জীবন তার, গৃহ যেন বন।। 
সি-মা। নাতি! তুমি ভাই “হু সব কথ" বোল্চ, এ গুলি জ্ঞানের কথা। বিস্তর 


লেখাপড়া শিখেচ, তাই ভাই তৌমার এ জ্ঞান জন্মেচে! সকলের কেমন করে 
হবে বল£ যা হোক (ভার স্ত্রাভন্তি দেখে আজ খুব খুশি হলেম। 
মোদো। (স্বগত) লোকালিনে [কিল নাম কিন্লেন। কলির একটী আদত 


জানোয়ার হলেন তু তাল সঞশয় নাই 
সি-মা। নাতি! ঢের লীত্তর হয়েছে এখন চল্লেম ভাই! 
কলি। রাত্তির অধিক হয়েচে বটে আছু বেসতে বোলতে পারিনে। কাল 
আবার আসবেন। আল কি বা দেখলেন £ আরো কত দেখাবো । 
সি-মা। আসবো বই লিগ এখচিস ভাহ (সিদুরমাভার প্রস্থান) 
বিজ। মোদো! তুই বা: মার এখান কিন? 
মোদো। আমাকে আর কি কোন দরকার নাই£ তবে চন্লেমশ এখন । (যেতে 
যেতে স্বগত) মধুসুদন এখন বাচ্ছেন না, আড়ালে থেকে মজা দেখা যাক্গে। 
(কিঞ্চিৎ অন্তরালে দণ্ডায়মান) 
বিজ। (ভ্যাড়ার পোষাক লইয়া, কলিরকাপকে দেখাইয়।) দেখ, আজ ঠানদিদির ছেলে 
এই ভ্যাড়ার পোষাকটা পোরে এসেছিল, এটা পোরলে ঠিক ঠডার মতন 
দেখায়; মানুষ বোলে আর চিন্তে পারা যায় না। তুমি একবা পর না? 
কলি। দেখি! দেখি! (হাতে লইয়া) বা" সিদে ছোড়া ত মন্দ নয়! এটা বেশ 
করেচে। দেখি আমাকে কেমন দেখায়। (পরিধান) 
বিজ। মাইরি! তোমাকে ঠিক ভ্যাড়াব মতন দেখাচ্চে। 

বেরেন্দ্রবাবুর প্রবেশ) 
বরেন্দ্র।.(নেপথ্য হইতে বলিতে বলিতে) কলিরকাপ কোথা হে! 
কলি। (বিজয়কালীর প্রতি) কি সবর্বনাশ! বরেন্দ্র লালু যে। যা, এখন এ দিকে 
যেন এসেন না! 


৩৭০ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
বিজ। (প্রস্থানাভিমুখ) 
বরেন্দ্র। (প্রবেশ করিয়া বিজয়কালীকে দেখে ) একি! আজ যে দিবিব বাইজী 
সেজেচো। বন্দিকি বাইজ'. (০সলাম করে) কর্তী কোথা। 
বিজ। এই ছিলেন, €ে এসে ডাকতে তার সঙ্গে কোথা গ্যালেন। 
বরে। (ভ্যাড়ার দিকে চাহিয়া) বা! বা! দিবিব ভ্যাড়া যে? এটা কোথা পেলে? 
বিজ। কর্তী আজ এনেচেন। 
বরে। একে কাশ্মিরি ভ্যাড়া বলে না? 
বিজ! অত জানিনে ভাই। (নেপথ্যভিমুখে) মোদো! এক ছিলিম তামাক দিয়ে 
যা রে। 
মোদো। (নেপথ্য হইতে) আজ্ঞে যাই। 
বরে। হ্যা বৌ! এ ভ্যাড়াটা নড়াই করে। 
বিজ। তা বোল্তে পারিনে, আজ সবে এনেছেন। 
বরে। খুব তেজি দেখুচি, বোধ করি নোড়তে পারে। 
| (তামাক সাজিয়া মোদোর প্রবেশ) 
বরে। (দু হাতে ভ্যাড়ার মাথা ঠেলে দিয়ে তাল ধরিয়া)(বিজয়কালীর প্রতি) না, 
নোড়তে শিখেনি। কোন গুণ নাই, কেবল ভড়ং সার। 
মোদো। মশাই! আমি ঢের ম্যাড়ার নড়াই দেখেছি, আর ম্যাড়্যার নড়াই 
শেখাতেও পারি, আপনি এইবার হাত পেতে তাল ধরুন, আমি আগে ওটার 
কান মোলে দি, তবে রাগবে, না রাগূলে টু মারবে কেন? 
বরে। দে হাতে তাল ধরা ।) 
মোদো। (ভ্যাড়ার কান মলিয়া) টু! টু! লাগে, লাগে। 
বরে। কইরে কিছুই যে নয়? 
মোদো। মশায় একটু রসুন না? না রাগলে তাল মারবে কেন? যতক্ষণ না রাগবে 
ততক্ষণ কান মল্বো। পুনঃ কান মোলে) টু! ট্র! লাগে, লাগে, তাল। 
বরে। কইরে কিছুই যে নয়। 
মোদো। তাইতো মশায়! এটা যে ভারি বোকা ভ্যাড়া। আজ কান মলে মলে 
টু শিখিয়ে তবে ছাড়্বো। মশায়! এইবার তাল ধরুন্‌ দেখি। (পুনঃ কান মলিযা) 
টু, &, লাগে লাগে, অড়র্‌ অড়র্!! 
বিজ। মোদো! অত মাচ্চিশ কেনঃ আর তোকে মারতে হবে না। 
মোদো। তুমি জান কিগো?ঃ এ রকম কোরে না শেখালে তাল শিখবে কেন£ 
বিজ। না তোর আর তাল শেখাতে হবে না, ওকে. আর তো নোড়তে দোব 
না। 
বরে। শেখাগ না, তোমার এতে ক্ষতি কি? 


৩৭১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


মোদো। তাইতো ভাল কোন্তে মন্দ হয়। বরেন্দ্র বাবুর প্রতি) আপনি তাল ধরুন্‌ 
দেখি? এবার এন্পি কান মোল্বো যে টু না মেরে আর বাঁচবে না? 
কলি। (স্বগত) কি আপদ! আজ তো ভারি নাকাল দেখ্চি? মোদো চাকর 
ব্যাটা মনের সাধে কাণ মোল্চে। ওর দোষ কি? আমার আপনার দোষে এ 
নাকাল হোচ্চে । ও তো আর আমাকে চিন্তে পারে নাই, ভ্যাড়া বোলে কান 
মোল্চে। এখন যতক্ষণ টু না মারবো, ও কান মোল্তে ছাড়বে না, তার 
চেয়ে একটা টু মারি। পোষাক টা ঠিক ভ্যাড়ার মতন বোলেই রক্ষা; তা না 
হলে এতক্ষণ চিনে ফেল্লে লজ্জার আর শেষ ছিল না। 
মোদো। (কান মোলে) টু! টু! লাগে লাগে। 
কলি। (মস্তক তুলিয়া টু মারণ।) 
মোদো। (বিজয়কালীর প্রতি) সা ঠাকুরুন্! দেখলেন, শেখালেই শেখে। আর 
ভ্যাড়াগুলোর প্রহারের চেয়ে ওষুধ নাই। বেরেন্দ্র বাবুর প্রতি) বাবু! এবার আর 
মাতে হবে না, তাল ধরুন দেখি? 
ববে। [হস্ত পাতিয়া তাল ধরণ) 
মোদো। (মুখে) টু টু। 
কলি। (তাল মারণ) 
বরে। মোদো! তোর বাহাদুরী আছে। 
'মাদো। মশায়! আমি যে এ ভ্যাড়ার স্বভাব্‌ ইস্তক নাগাদ দেখে আসচি। 
শামি পূব শাল জানি। রি 
পরে। দিবিব ভ্যাডা! (নিজয়কালীর প্রতি) বাইজি! বোল্তে পারিনে, যদি এ 
ভাড়াঠি আমাকে দাও তা হলে আমি বিশেষ বাধিত হই। 
বিজ। না ভাই! এ আনার ভারি সকের, আমি প্রাণ থাকতে তা দিতে পারবো 
না। 
বরে। তবে এক কন্মট কর, আজ একবার আমাকে দাও, আমি তোমার 
ননদকে দোঁথিয়ে, এখনি আবার পাগিয়ে দিচ্চি। 
বিজ। আমি তাও পারবে ন। ভাই? স্বেগত) কি সবর্বনাশই আজ কোরেচি। 
মোদো। (স্বগত) আজ মাচ্ছা মজা! করা যাচ্ছে। আমি কিছু কিছু বুঝি, যেমন 
কর্ম তার তেমনি ফল হোচ্চে। মন তুমি বুঝলে কি না, বাবুরা একেই বলে 
সভ্যতা । 

নবীনকালীর প্রবেশ। 
মোদো। (স্বগত) পাশ-মা আর থাকতে পাল্লেন না; কি বলেন শুনি। 
নবীন। বৌ! তুই যে মাকে বাড়ি “থকে বিদায় কল্লি, লোকালয়ে মুখ দেখাবি 
কেমন কোরে বল্‌ দেখিঃ আর এ বাড়ী কি তোর বাপের বাড়ী থেকে 


৩৭২ 


ভ্যালারে মোর বাপ 
এনেচিশ। কলিরকাপ কোথা গ্যালো, তাকে এখনি ডাকা, আমি দুটো একটা 
কথা বোলে যাই। 

মোদো। পিশি-মা! আজ আমাদের বাবু কেমন একটা ভ্যাড়া এনেছেন দেখুন। 
নবীন। (ভ্যাড়ার কাছে আসিয়া) এটা কি ভ্যাড়া? (ছাল খুলে ফেলে) কলীরকাপ! 
লোকালয়ে মুখ দেখাবি কেমন ক'রে? তোর কি একগাছা দড়ী কিনে গলায় 
দিতে যোটে না। ছি! ছি! ছি!!! বাপের নামটা ডুবুলি। 

মোদো। (মৌখিক সভয়ে) ওমা একি গো! বাবু মে! আমি যে ভ্যাড়া মনে 
কোরে কত কান মলেছি। কি সবর্বনাশ! কি সব্রবনাশ! (স্বগত) শর্মা যেন 
কিছুই জানেন না, ব্যাটা যেমন কুকুর, আজ তার তেন্নি মুণ্ডর হয়েছে। 
নবীন। আমার যে কি দুঃখ হোচ্চে তা বোল্তে পারিনে। হায় হায়! মায়ের 
আমার শেষ দশা হয়েছে, তিনি কদিন আর বাঁচবেন, পেটের ছেলে হয়ে তার 
মুখের দিকে চেয়ে দেখলে না? অন্ধকার রাস্তিরে মোার সঙ্গে তাকে কেমন 
করে বিদায় কর্লিঃ তোদের যদি এতই ভার বোধ হয়েছিল, তা আমায় কেন 
খপর দিলিনেঃ তা হলে আমি আপনি এসে তাকে নিয়ে যেতেম। 
(বিজয়কালীর প্রতি) বৌ! পরকালে কি হবে বল্‌ দেখি? 

মোদো। (স্বগত) পরকালে পৌচে পোকা হবেন। ধ্রেকাশ্যে) পরকাল কি আছে 
গা? ওরা পরকালের বুকে পাথর চাপা দিয়ে রেখেচেন। (স্বগত) আজ দু 
চার কথা বোলে নেওয়া যাক্‌ ৷ (বিজয়কালীর প্রতি প্রকাশ্যে।) মা-ঠাকুরুণ! কোন 
কথা কোচ্চ না কেন গা? | 

বরে। কলিরকাপ! যাহোক লোকালয়ে খুব নাম কিন্লে, লেখাপড়া যা 
শিখেছিলে, তা তোমার ভন্মে ঘি ঢালা হয়েচে। কেবল টাকা উপায় কোল্লেই 
যে মনুষ্য নামের ঘোগ্য হয় এমন বোধ কোরো না। সুরা সেবন, 
লাম্পট্যদোষ, বহুধিবাহ, বিশ্বাসঘাতকী, অপব্যয়, আত্মশ্লাঘা, লোকনিন্দা প্রভৃতি 
যে এইগুলিই কেবল দৌষাকর এমন মনেও কোরো না। স্ত্রেশতাটীও বড় 
সহজ বিষয় নহে। দেখ, এক স্ত্রণতার জন্যে তুমি যে মহাপাতক কোরেচ, 
পৃথিবীতে তাহাপেক্ষা আব কি পাপ আছে বল? জন্মভূমিকে পণ্ডিতেরা 
স্বর্গের গরিয়সী বলেন, আব জননীর তুলনা তাহারা কিছুরই সহিত দিতে 
পারেন নাই। যদ্যপি কোন তীর্থ পর্যটক দ্বাদশবর্ষ তীর্থ পর্য্যটন করে জন্মভূমি 
দর্শন না করে, তাহার সে তীর্থের সমস্ত ফল্‌ ব্যর্থ হয়। তুমি কিনা স্ত্রেণত! 
পরবশে, যে জননী তোমাকে ঈ্দশ মাস দশ দিন গে স্থান প্রদান, ও অসহ! 
প্রসববেদনা সহ্য কোরে এই বিশ্বসংসার দর্শন করালেন, যিনি আপনার 
শরীরের রক্ত প্রদান কোরে তোমার শরীরের পুষ্টি সাধন কোরেচেন, যিনি 
তোমার সামান্য পীড়াতে অসহ্য মনোকষ্ট পেয়েছেন, যিনি কোন উত্তম দ্রব্য 


৩৭৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


প্রাপ্ত হোলে, তাহা তোমাকেই প্রদান করেছেন; যিনি তোমার জন্য ঈশ্বরের 
অশেষ দুর্গতি কোরে, শেষে কিনা একমুঠো অন্নের জন্য তাকে বাটী হইতে 
বহিষ্কৃতা কোরে দিলে? ধিক তোমাকে! আর এই স্ত্রেণতোর জন্য তোমার কি 
দুর্দশা হোলো বল দেখি? তোমার স্ত্রী তোমাকে ভ্যাড়া সাজতে বোলতে তুমি 
কিনা তাই সেজে বোসলে। লোকালয়ে মুক দেখাবে কেমন কোরে, এখন 
গলায় দড়ী দিয়ে মর। তোমার মুখে আগুন, তুমি যা কোরেছ, তাহাতে 
তোমার মরণই মঙ্গল দেখুছি। 

(রাধামণির প্রবেশ।) 
রাধা। বাবা বরেন্দ্র! কলিরকাপকে গালাগাল দিওনা, মায়ের প্রাণে ব্যাথা 
লাগে। আমার গর্ভকে- ধিক! ফকেলিরকাপের প্রতি) বাবা! আমি এমন গর্ভও 
ধরেছিলাম। লোকে পুত্র-কন্যা কিসের তরে কামনা করে? বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে 
প্রতিপালন, শ্রাদ্ধশাস্তিতে পুবর্পুরুষগণকে সম্ভোষপ্রদান, লোকালয়ে 
লোকলৌকিকতা করিয়া পিতা-মাতার মুখোজ্জ্বল করিবে এইমাত্র কলীরকাপ! 
তুমি কলির ছেলে তোমার দোষ কি? কালের মতনই কর্ম কোরেচ। বাবা! 
বেঁচে থাক, সুখে থাক, তোমাকে অধিক আর কি বোলব। যে কর্ম কোরেচ 
“ভ্যালারে মোর বাপ”!!! 

(েকলের প্রস্থান) 

যবনিকা পতন 


৩৭৪ 


কেরাশী পুবাণ ৃ ১৫ 


ইহ।ছেব উদ্ধারের উপায়কি হইবে নাগ মানুর চুপ কারস 
ক থাক ভগবান কিন্তু চুপ কবির! থাকিবেন না: উপায় একদিন 
হইবে ভাস 
| ছাট লে শীর হুখ বড! আহারে সমন গ্রারই 
ন পান লা, ছু গরম, ঠেলে হেলে বুদ আঙ্গুলের নধ খেষে 
সায়: তরকারি যাহ। রন্ধন হন প্রায় স্বামী ও অন্তানগণকে খ।ওয়ং 
ইতে ছুরাইয়া বায়, নিজের ভাগে বড় কিছু পড়ে না। পরিধানের 
শু প্রর্নপ, প্রতি ধোপে ছুই স্ি তিন খানা কাপড় পরেন, 
ধোপী মহাশয়ের দৌরাস্থ্ে পরিষ্কার কাপড় পরা প্রাই হয়ে উঠে 
না; কাপড়ে হলুদ, তেল, হুধ, ওমাটির দগ্‌ প্রারই দেখাধায় এবং 
বিলক্ষ গন্ধ বাহির হর, চুল বেধে এবং আলভী পরে কোন 
রকমে নিজ্জ শ্। বজীয রাখেন। কাজের সীম। নাই, চাকরাণী 
হা পাট করেন, বীধুনী হয়ে রঙ্গুন করেন, মেখরাণী হইদ। 
' ছেলের মলা পরিক্ধাব কেন, গৃহিণী হইয়া ভাওার রক্ষা করেল, 
সবর হইয়া লোকলৌকতার বিহয় স্বামীকে উপদেশ দেন, পরি- 
চালিকা হইয়া স্টাহাকে চালান এবং প্রণয়িদী হই! গতির 
ছুঃহীদারিদ্র-প্রপীড়িত ও সাহেবের ভাড়ার অর্জ্ববিভ 
। জ্দয়কে মাস্তন! দান করেন। এর উপ্র "আবার ছেলের কথা, 
। পুরাণ কাপড়ের বিছ্বানার চাদর ও বালিসের ওয়াড় সেলাই 
ট করিতে হয় এবং মশারিতে কাগড়ে ও ভ্বামাতে তালি দিতে 
১হুয়। ঝির সঙ্গে বকাবকী, শাশুড়ী ননবের সঙ্গে ঝগড়া এবং 
টিসংমারের-খরচ-লইয় কষামীর সঙ্গে লড়াই করিতে ইর়। গ্ামীর 
ঘীবিত,অবস্থার়ত .এই:দশা. তাহার মৃত্যুর পর বৈ-কি হয়, তাহা 


এ 


১৮৮৬ 
কেরাণীপুরাণ প্রথম সংস্করণের একটি পৃষ্ঠা 


দুৎপ্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কেরাণী পুরাণ 
লেখকের নাম নেই 


আখ্যাপত্রে প্রাপ্ত বিবরণ 
[1২4 004 0: 4 ঢো০০ 01008016012. 15012111, 


[915 1017070, 15910) 2100 10155090191 50005 00 20921851106 
কেরাণী-পুরাণ। 
প্রথম সংস্করণ, কলিকাতা, ৬৪/১ নং মেছুয়া ব'জার স্ট্রীট, 
মঙ্গলগঞ্জ মিশন প্রেসে শ্রী তারিনীচরণ দাস দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত। 
১৮৮৬। 


মূল্য দুই আনা। 


কেরানী পুরাণ 


আদিপবর্ব-পূবর্বাভাস। 


নারদ খষির একদিন মনে হইল যে অনেক দিন হল পিতামহের সঙ্গে দেখা 
হয় নাই, একবার দেখা করে আসা যাকৃ। নামাবলি খানি কাদে ফেলে বীণাযন্ত্ 
হাতে করে টেকির উপর সোয়ার হয়ে মুহূর্ত মধ্যে ব্রন্মালোকে গিয়া উপস্থিত। 
কৃতাঞ্জলি-পুটে ব্রন্মার চরণ বন্দনা করে তাহার সম্মুখে গিয়ে দীড়ালেন। ব্রন্মা 
কতকগুলি কাগজপত্র লয়ে বড় ব্যস্ত ছিলেন, তথাপি নারদকে আদর করে 
কুশল বার্তা জিজ্ঞাসা করে বসিতে আসন দিলেন, আর কাগজ পত্র গুছাইয়া 
রাখিয়া তাঁহার সঙ্গে কথা বার্তী আরম্ভ করিলেন। নারদ! ভায়া তোমায় অনেক 
দিন দেখিনি, কেমন আছ, কি কর্চো, বল দেখি? কি আর করবো, আপনি 
আমাকে যে দুটি কাজ দিয়াছিলেন, তার এখন একটাও কাজে লাগে না; 
মর্ত্যলোকে সংবাদপত্র সম্পাদক আর বক্তা বলে দুই রকম জীব জন্মেচে, 
তাহারাই এখন বিবাদ বিধান কাজটা আমার হাত থেকে নিয়েচে, আর হরিগুণ 
গান শুনিবার লোক প্রায় নেই বলিলেই হইল; যে কয়জন লোকের অল্প অল্প 
মন আছে তাহারা আমার কাছে আসে না, থিয়েটারে গেলেই তাহাদের অভাব 
মিটে; আমার নিকট হরিনাম শুনিলে সংসারের সঙ্গে গোল বেঁধে যায়, সকল 
রকম বিলাশের মাথায় লাঠি পড়ে, এবং অহঙ্কার চূর্ণ হয়। থিয়েটারে সে 
বিপদ নাই, সুতরাং লোকে সেইখানেই যায়। কখন কদাচ দু একটা লোক 
আমার কাছে আসে তাদেরই শুনাই, আর নিজে পড়ে পড়ে জপ আর গান 
করি, এই করেই দিন কাটিতেছে। ব্রন্মা বলিলেন, দেখ নারদ, তুমি ও কিছু 
মনে করো না, সময়ে সময়ে অমন হয়ে থাকে, আবার সত্য যুগ আসবে, 
আবার তোমার আদর হবে। আপাততঃ তোমায় একটি কাজের ভার দিতেছি। 
সেইটী করে এসো দেখি; জীবের অনেক উপকার হবে; আর তোমারও 
কাজের অনেক সুবিধা হবে। সংসারী জীবের বড় অন্নকষ্ট থাকলে তাহার 


৩৭৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


ধর্ম কর্মের দিকে তত মন গেলেও কাজে কিছু করিতে পারে না; অন্ন 
চেষ্টাতেই দিন রাত যায়। শুন নারদ অনেক কাল হল, একদিন আমার বাহন 
হংসরাজ আমার কাছে এত্লা করে, যে, কেরাণী বলে এক প্রকার নৃতন 
জাত জন্মেচে, তাহারা তাহার হেংসের) পরিবারবর্গের ডানা ছিড়ে নিয়ে কলম 
করে, তাহাতে হংস জাতির মধ্যে বড় কষ্ট উপস্থিত হয়েচে। এই কথা শুনে 
আমার বড় রাগ হল, অভিসম্পাত করে বলিলাম এই অত্যাচারের জন্য 
কেরাণীর ঘরে লক্ষী থাকবে না। এই রেজোলিউশান (মন্তব্য) স্থির করিলাম 
এবং তাহার এক কপি বিষুগ্র নিকট পাঠালাম এবং তাহা বাহাল হইল। 
সংপ্রতি পশুপালন বিভাগের সম্পাদক এক প্রকাণ্ড নোট লিখে বিষ্ণুর কাছে 
পেস করেন, তিনি তার কাপি আমার কাছে পাঠিয়ে দেন এবং 
রেজোলিউশনটি “রিভিউ, করতে আমাকে অনুরোধ করেচেন। “নোট” পাঠে 
জান্লেম যে কেরাণীদের পালন করতে লক্ষ্মী দেবীর কষ্ট হয়, তিনি আমার 
অনুরোধে তাহাদের ঘরেও থাকিতে পারেন না, অথচ তাহার কোমল হৃদয় 
তাহাদের পালন না করিয়া থাকিতে পারেন না। এবং নোটে ইহাও স্পষ্ট 
প্রমাণিত হইয়াছে যে “যে অপরাধের জন্য আমি দণ্ড দিয়াছিলাম কেরাণীরা 
এখন সে অপরাধে অপরাধী নয়, তাহারা এখন “স্টীল পেনে” লেখে হাঁসের 
পালক ব্যবহার করে না। এখানকার “ডেসপেচ*, এবং পুর্বকার নথি পাঠ 
করে আমার স্পষ্ট বোধ হয়েচে যে কেরাণীদের আমার সাবেক দণ্ড ভোগ 
করা আর উচিৎ নয়, কেরাণীদের পুবর্ব পাতক কাটাইবার জন্য আমি একখানি 
পুরাণ রচনা করাইব। সেই পুরাণ মূল্য দিয়া ক্রয় করে, ভক্তি পুবর্বক যে 
পাঠ করিবে, তাহার উপদেশ গ্রহণ করিবে, তাহাদের আর দুঃখ থাকিবে না। 
সেই পুরাণের মূল শ্লোক কটি স্তোমার কানে কানে বলে দিতেছি, তুমি মর্ত 
লোকে গিয়া সেই শ্লোক কটার মর্ম কেরাণী তারণ শর্্মাকে বুঝাইয়া দিয়া 
এস; তাহা হইলেই সে গ্রন্থ রচনা করিতে পারিবে। নারদের কানে কানে 
শ্লোক বলে দেওয়া হলে তিনি ব্রহ্মাকে ভক্তিপূবর্ক নমস্কার করে বিদায় 
লইলেন। 


আদিপবর্ব। 


বেলা ৯টা ১০টার সময় নানান্‌ রকমের পোষাক পরা ট্রাম-কারে, গাড়িতে, 
বা পদত্রজে দক্ষিণদিকে ব্যস্ত হইয়া চলিতেছেন, এঁরা কে? কাহার ধুতি 
চাপকান পরা, কাহার ধুতিকোট, কাহার পেন্টালুন চাপকান, কাহার বা 
পেন্টালুন কোট; কাহার মাথায় ক্যাপ আছে কাহার বা খোলা মাথা; কাহার 
ঘড়ি ও সেফটি চেন। পোষাক পরিক্ষার, জুতোগুলি মন্দ নয়, চুল বেশ 
ফেরাণ, চেহারা ভদ্র লোকের মতন, কোমল দেহ এবং বোধ হয় কোমল 


৩৭৮ 


কেরানী পুরাণ 
প্রকৃতি। উহাদের নাম কেরাণী। কেরাণী£ ঈ€-) হইল কেন? স্ত্রীলিঙ্গে 
ব্যবহার হয়। হাঁ হা কারণ আছে, স্ত্রীজাতির সঙ্গে উহাদের অনেক সৌসাদৃশ্য 
আছে। নারীর ন্যায় উহাদের শরীর কোমল এবং অপটু; বাজার হাটের সংবাদ 
বড় রাখেন না, গৃহের বাহিরে যাইতে বড় ভাল বাসেন না, বিদেশে গিয়া 
অবস্থা উন্নত করিতে মত নাই। কোন হাঙ্গামের মধ্যে নাই; নিবির্রোধে কোন 
ক্রমে কাল যাপন করা জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য । স্ত্রীলোকের মতন ভীরু 
স্বভাব, পাছে সাহেব বিরক্ত হন সব্বদা এই ভয়, ব্যবসায় করিলে পাছে ক্ষতি 
হয়, শিল্প শিখিলে পাছে লোকে নিন্দা করে, চাষ করিলে পাছে”কোমলাঙ্গে” 
সুযেরি করস্পর্শ হয়, এই সকল ভয়েই তাঁহারা আকুল। সকলকেই ভয় 
করেন, কিন্তু দুঃখ দারিদ্র্য ও খণকে ভয় করেন না। সতী যেমন পতিকে 
কখন পরিত্যাগ করেন না, নানা প্রকার অসহ্য ক্লেশ বহন করিয়াও পতিতেই 
রত থাকেন, কেরাণীও যতই ক্লেশ কষ্ট পান্‌ না কেন, প্রাণের কেরাণীগিরি 
ছাড়েন না; দারিত্রে হাড় মাটি, অন্নাভাবে আপনারও পরিবারের জীর্ণকায়; 
সম্তানের বিদ্যোপার্্জনের বন্দোবস্ত হয় না; রোগের চিকিৎসা ও ওঁষধ পাওয়া 
ভার, ছেলে মেয়ের বিয়ে দেওয়া ত এক প্রকার অসম্ভবঃ তবুও আপনাদের 
প্রাণসর্বস্ব জীবিতেশ্বর কেরাণীগিরি ছাড়িয়া আশ্রয়াস্তর গ্রহণ করেন না; এবং 
প্রাণান্তেও অপরকে বিধি দেন না। নারীর ন্যায় কেরাণীর সরল স্বভাব-_ 
উকীল বাবুর মতন “হয়*কে “নয়” এবং “নয়””কে “হয়” করিতে জানেন 
না। জমিদার মহাশয়ের মতন মাম্লা মকদ্দমা করিতে পারেন না। ব্যবসায়ী 
লোকেদের মতন এক প্রকার দ্রব্যের দর করিয়া অন্য প্রকার দ্রব্য চালাইতে 
ইচ্ছা রাখেন না। চাতুরী এবং বুদ্ধিকৌশলে আপনার উন্নতি সাধন করা 
কেরাণীর ধর্ম নয়; “কৃতবিদ্য অতি উন্নতিশীল” যুবাদের মত যথেচ্ছাচারকে 
ধর্ম বলিয়া বিশ্বাস করিতে পারেন না এবং সংবাদপত্রের সম্পাদকদিগের 
মতন বাক্যুদ্ধে দেশে আগুন জ্বালাইতে পারেন না। এই সকল কারণেই 
“কেরাণী” লিখিতে হইলে ঈ ব্যবহার করিতে হয়। 
কেরাণী লিখিতে গেলে ঈ (শী ) লিখিত হইবার কারণ বিশদ রূপে 
বলিলাম। এখন “কেরাণী” নাম কেন হইল, প্রকাশ করিয়া বলি শুন। কে 
রাণী, ইহারা জানেন না বলিয়া ইহাদের নাম কেরাণী। রাণীর রাজ্যে বাস 
করেন, এবং তাহারই রাজ্যে খেটে মরেন, কিন্তু পরস্পরে জানা শুনা নাই। 
গবর্ণমেন্ট আপিসে অনেকে ভাল কাজ করে থাকেন, এবং উচ্চ বেতনও 
পান, এবং অনেক গুরুতর বিষয় উঁহাদেরই “নোট” এবং পরামর্শে মীমাংসা 
হইয়া থাকে; কিন্তু তাহা রাণীর কানে উঠে না, এবং তাহার জন্য 
জনসমাজের কাছেও কোন প্রশংসা নাই। ভুল হইলে তিরস্কার আছে এবং 
মারা পড়িতে তিনিই আগে মারা পড়েন, যদিও তাহার কাজ তাঁহার 
উপরওয়ালা সাহব বাহাদুরের হাত দিয়া যায়; কিন্তু গৌরব সাহেবের এবং 


৩৭৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য . 


নিন্দা তাহার। সেব্রেটেরিয়েটে আপিসের কেরাণী বাবুই মুন্সেফ, ডেপুটি 
মেজিক্ট্রেট এবং সবজজ প্রভৃতির কার্য্য সমালোচনা করে- মন্তব্য লেখেন; এবং 
তাহার উপরে “বাহাদুরেদের” পদোন্নতি অনেকটা নির্ভর করে; কিন্তু হজুরেরা 
কেরাণীকে অতি হীন বলিয়া জানেন, এবং কাছে বসিতে দিতেও বড় ভাল 
বাসেন না। রাণী যদি কেরাণীকে জানিতেন, ও কেরাণী যদি রাণীকে 
জানিতেন, এবং কেরাণী যদি রাণীকে কোন কথা জানাইতে পারিতেন, তাহা 
হইলে কি, ৯০৮8 

রাণী নারীশ্রেষ্ঠ; লক্ষ্মীও নারীশ্রেষ্ঠ। তাই রাণী শব্দ লক্ষ্মী অর্থে আমার 
অভিধান অনুসারে ব্যবহার হয়। লক্ষ্মীকে কেরাণীরা চেনেন না বলিয়া 
তাহাদের নাম কেরাণী হইয়াছে। লক্ষ্মী কেরাণীর বাটা আসেন; কিন্তু প্রায় 
তিন দিনের অধিক আর থাকিতে স্থান পান না। নানা প্রকার উপায়ে কেরাণী 
লল্ষ্লীকে তাড়াইয়া দেন। যে কয়েকদিন লক্ষ্মী বাটীতে থাকেন, কষ্ট ও 
ঝনঝাটের সীমা নাই। মেলাই লোকের যাতায়াত এবং গোলমাল। কেরাণী 
শান্তিপ্রিয়; তাই লক্ষ্মীকে বাটীতে স্থান দেন না। তবে ইহার চলে কিসে? 
লক্ষ্মী পরম করুণাময়ী; তাই দয়া করে তিন দিনের পর যাইবার সময় তাহার 
সতাত ভন্মনী খণদেবীকে কেরাণীর বাটীতে রাখিয়া যান। এই খণদেবীই 
কেরাণীর পরম বন্ধু; ইহার প্রসাদে কেরাণীর খাওয়া পরা চিকিৎসা চলে; 
সম্ভানদের লেখাপড়া শেখান, বিবাহ দেওয়া, স্ত্রীর গহনা ইত্যাদি সকল 
লেন্দেন নগদ হয় না। কেবল “যৌতুক” আর পুজার “প্রণামীটা” নগদ 
দিতে হয়; এদুটা বিষয় যাহাতে খণদেবী হস্তে লন, ইহার জন্য অনেক চেষ্টা 
করেছেন, কিন্তু এখনও কৃতকার্য হন নাই। খণদেবী কেরাণীকে সকল দেন 
বটে, কিন্তু উনুতে দুনো লাগান "সে যাহা হউক খণদেবীর কোলে কেরাণীর 
বাস; এমন কি দেবী কখন কখন গৃহ পর্য্যস্ত নির্মাণ করে দেন, তাহা কিন্তু 
কেরাণীর সন্তানেরা প্রায় ভোগ করিতে পায় না। 


আফিস পবর্ব। 


কেরাণী তিনি প্রকার। কুলীন, মৌলিক এবং বংশজ। কুলীন ২০০ হইতে 
৪০০, বংশজ ১০০ হইতে ২০০, এবং মৌলিক ৩০ হইতে ১০০ টাকা 
বেতন পান। ৩০ টাকার নীচে যাহারা পান তাহারা পচা মৌলিক এবং ৪০০ 
টাকার উপর যাহারা পান তাহারা মুখ্য কুলীন। বিদ্যা কিম্বা বুদ্ধি অনুসারে 
পদোন্নতি প্রায় হয় না। কিঞ্চিৎ কার্য্যদক্ষতা, সেলাম, তৈল, ভেট, পরনিন্দা, 
উপরচালাকী এবং সাহেবের “নেক নজরের” উপরেই পদোনতি নির্ভর করে। 
সকল শ্রেণীর কেরাণীর মধ্যেই বিদ্বান এবং মূর্খ উভয়েরই দর্শন পাওয়া যায়। 
বিশ্ববিদ্যালয়ের চিহিন্তি এবং সাবেক কলেজের বৃত্তিধারী দুদশ জনকেও 


৩৮০ 


কেরানী পুরাণ 
কেরাণীদের মধ্যে পাওয়া যায় এবং তাঁহাদের ভিতর সংবাদপত্র লেখক, 
সমালোচক, বক্তা এবং গ্রন্থকার দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ কেরাণী মা 
সরস্বতীর সঙ্গে বিবাদ করিয়া আফিসে প্রবেশ করেন। অধমতারণ 
কেরাণীগিরি না থাকিলে তাহাদের যে কি দশা হইত, তাহা কে বলিতে পারে? 
“পচা আদার ঝাল বড়” সরস্বতীত্যাগী কেরাণী মহাশয়দের বড় জীক। কেহ 
ভাল নকল করিতে পারেন, কেহ বা ঠিক দিতে পারেন, কেহ বা হিসাব 
করিতে পারেন, কেহ বা কোন কাগজ কোথায় থাকে মনে করিয়া রাখিতে 
পারেন, কাহার বা নিয়মাবলী মুখস্থ থাকে, এই সকলের অহঙ্কারে কেরাণী 
আর বাঁচেন না। প্রত্যেকে আপনাকে বড় কাজের লোক মনে করেন এবং 
এই উপলক্ষ করিয়া অনেক সময় তুমুল বিবাদ লাগাইয়া দেন। এমন কি 
অশ্রাব্য এবং অবক্তব্য কথার আদান প্রদান হইয়া থাকে। অহঙ্কার! তুমি ধন্য, 
তোমার কি অসীম মহিমা? দরিদ্রকে ধনী মনে করাও, কুৎসিতকে সুন্দর 
মনে করাও, মুর্খকে পণ্ডিতভিমানী করিতে পার! কেরাণীদের প্রায় বিবাদ 
হইয়া থাকে, কিন্তু বালকের ঝগড়ার মতন মনে থাকে না। এই মাত্র বিবাদ 
কলহ করিলেন এবং পর মুহূর্তেই গলাগলি ভাব। ইহাদের আলাপ পেতনীর 
হাতের শাখার মতন কখন আছে কখন নেই, কিছু বুঝা যায় না। ইহারা বড় 
গল্পপ্রিয়, কাজ করিতে করিতে নানান্‌ প্রকার গল্প করেন, কিন্তু হাত বড় 
কামাই যায় না। মুখে গল্প হাতে কাজ; এটাই কেরাণীর বিশেষ গুণ। গল্পের 
বাধাবীধী কিম্বা কোন যোগাযোগ নাই; সাময়িক হুজুগ, পরনিন্দা আর 
আহারের গল্পই সাধারণত হইয়া থাকে। গল্প করিতে করিতে গর্মীও চড়ে যায় 
এবং গালি ও টেঁচামেচিও হয়। এমন কি অনেক সময় অধ্যক্ষ সাহেবের 
বজ্রধ্বনি না শুনিলে গোলযোগ নিবারণ হয় না। 
বিদ্যাশূন্য কেরাণী যদি “হেডরাইটর" হন, তাহা হইলে তাহার অধীনস্থ 
কেরাণীদিগের ঘোর বিপদ। বড় বাবুর মুখ দিয়া কত কি বাহির হয়, গলার 
স্বর কীসার মত খন্‌ খন্‌ করে। “ভাল করিতে পারিব না মন্দ করিব, কি 
দিবি তা বল” উপকার করিবার ক্ষমতা নাই কিন্তু অপকার করিতে বড় 
পটু; কোন নূতন প্রকার কার্য বুঝাইতে পারেন না, ধমক দিয়াই সারেন এবং 
আপনার ভূল পরের মাথায় চাপাইতে পারিলে ছাড়েন না; পাছে তাহার 
চেষ্টা। 
সুশিক্ষিত কেরাণীদের আচার ব্যবহার ও রুচি অন্য প্রকার। অশ্রাব্য কথা 
তাহাদের মুখে শোনা যায় না, আপিগে: কলহ করেন না, এবং গল্প করিবার 
সময় কোন সামাজিক বিষয় লইয়া মতামত প্রকাশ করিয়া থাকেন। ইহাদের 
মধ্যে অনেকে কোন না কোন প্রকাশ্য সভার সভ্য এবং সেই সভার কার্য্যে 


৩৮১ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আপনাদের কতক সময় ও চিত্তা দিয়া থাকেন। জ্ঞান লাভ করিতেও বিলক্ষণ 
ইচ্ছা আছে, সাবকাশ পাইলেই লেখাপড়া করিয়া থাকেন। নদের সকলেই 
পণ্ডিত নয়, সুশিক্ষিত কেরাণীর মধ্যে সকলেই যে সচ্চরিত্র, তাহা নহে। 
ইহাদের ভিতর শয়তানের প্রিয় চেলাও আছে। তাহারা সুরেশ্বরী ও বারাঙ্গনা 
দেবীর পুজাতে সবর আহুতি দিয়া থাকেন এবং অতি অল্পকাল মধ্যেই 
সিদ্ধিলাভ করিয়া ইহ সংসার ছাড়িয়া চলিয়া যান্‌; স্ত্রী পুত্র পথের ভিখারী 
হয়। 

কেরাণীর স্বাস্থ্য মন্দ নয়, আহার বিহারের আতিশয্যের অভাব এবং 
নিয়মিত সময়ে আহার এবং নিদ্রা এবং পরিমিত পরিশ্রম কেরাণীর স্বাস্থ্যের 
মূল কারণ। কেরাণীর. ভাবনা চিস্তা কম এবং মস্তিষ্কের পরিশ্রম অধিক নয় 
এইগুলিই তীহার স্বাস্থ্যের অন্যতম কারণ, কেরাণীর মধ্যে অনেক বৃদ্ধ লোক 
দেখা যায় এবং তাঁহারা এমন সবল যে সামান্য পীড়া হইলেও না খাইয়াই 
দু-তিন দিন অনায়াসে কার্য্য করেন, কিন্ত যুবা কেরাণীদের ভিতর এরূপ লোক 
অতি বিরল। “সিডেনটারি হ্যাবিট” অর্থাৎ দৌড়-বাঁপ করে না বেড়ান 
পরমায়ু ক্ষয় এবং স্বাস্থ্য হানির একটী কারণ বলিয়া সাহেবেরা নির্দিষ্ট 
করিয়াছেন। একথা ইউরোপে সত্য হইতে পারে কিন্তু এ দেশে এইটী যে 
খাটে না কেরাণীর জীবন তাহার প্রমাণ, আমাদের মহিলাগণ যেরূপ করিয়া 
কাল কাটান, তাঁহাদের ত ইংরাজের মতে সদ্যই যমের বাটা যাওয়া উচিৎ। 
ঘরের বাহিরে বাহির হন না, চলা ফেরা নাই কেবল বদ্ধ বায়ুতে ও বদ্ধ 
স্থানে চিরদিন বাস, কিন্তু আমৃদের স্ত্রীলোকের মত বিশেষতঃ আমাদের 
বিধবাদের মতন কে সুস্থ এবং দীর্ঘজীবিঃ আমাদের প্রাচীন যোগীদের মতে 
যতই অঙ্গ-চালনা কম ততই আয়ুবৃদ্ধির ও স্বাস্থ্যের অধিক সম্ভাবনা, “বাঁশ 
মরে ফুলে আর মানুষ মরে বুলে” এই যে চলন কথ্াটী আছে ইহার মূলে 
বিলক্ষণ সত্য আছে। শ্রীষ্মপ্রধান দেশে অল্প পরিশ্রম ও শৈত্য সামগ্রী ভোজন 
করিলে রৌদ্র ও বৃষ্টিতে না বাহির হইলেই শরীর ভাল থাকে। যীহারা মদ 
মাংস সেবন করেন এবং ইংরাজী চালে চলেন তাহাদের স্বাস্থ্য প্রায়ই ভালো 
থাকে না। সাধারণ ভাবে কেরাণীর স্বাস্থ্য ভাল কিন্তু গোটা কত পীড়া আছে 
যাহা কেরাণীর প্রায় একচেটে; অর্শ, নাসা ও অন্বলের রোগ কেরাণীর ভিতর 
অনেক দেখা যায়। কিন্তু অন্বল (রোগ* কেরাণীগিরির জন্য জন্মে না তাহা 
অফিসের ময়রা মহাশয়ের অনুগ্রহেই জন্মে থাকে। যদিও কেরাণীর মধ্যে 
অনেকরই অর্থকষ্ট কিন্তু এই অনটনই অধিক পরিমাণে তাহার ধর্ম এবং 
স্বাস্থ্য রক্ষা করিয়া থাকে। বিধাতার কি আশ্চয্য করুণা ও কৌশল! তিনি 
দুঃখকেও সুখের কারণে পরিণত করেন। যতই অর্থের স্বচ্ছলতা ততই ভোগ- 
বিলাস. ও নানা-প্রকার ইন্দ্রিয় সুখের কামনা এবং যতই অধিক ভোগ ততই 
শরীর ও মনের স্বাস্ত্যের হানি হয়। 


৩৮৭ 


কেরানী পুরাণ 
গৃহপব্্ব 


সাধারণতঃ কেরাণীদের মধ্যে পানদোষ অল্প। “ছাই পায় না মুড়কি জলপান” 
অধিকাংশ কেরাণীর খাওয়া পরা চলে না আবার মদ খাবে! “হের্ফের্” 
ঘোচে না; শীতবস্ত্র গ্রীষ্মকালে, আর শ্্রীষ্মবন্ত্র শীতকালে অনেক সময় 
অনেককে পরিতে হয়। পুজার কাপড়ের দেনা সংবৎসরে আর মেয়ের 
বিবাহের দেনা সমস্ত জীবনে শোধ হয় না; এ অবস্থায় কি মদ চলিতে পারে? 
পাছে অফিসে সময়ে পৌছিতে না পারেন এবং কামাই হয় এই ভয়েতেও 
অনেকটা ভালো থাকিতে হয়। অর্থকষ্ট সংসারে বড় মন্দ নয়। যদিও কিছু 
কষ্ট হয় কিন্তু ইহার প্রসাদে অনেকের চরিত্র ভাল থাকে। যতই ভোগ এবং 
বিলাসের সুযোগ ততই চরিত্র মন্দ হইবার সম্ভাবনা । ধনী লোকেদের ভিতর 
অসচ্চরিত্র লোক অধিক, না গরীব লোকদের ভিতর£ গরিব লোক সমস্ত 
দিবস খেটেখুটে ক্লাস্ত হয়, রাত্রি ৮টা না বাজিতে বাজিতেই ঘুমাইতে পারিলে 
বাঁচে, মদ পান করিয়া নিশাচর হইবার প্রবৃত্তিও থাকে না, শক্তিও থাকে না। 

কুলীন এবং বংশজ কেরাণীদের অবস্থা নিতান্ত মন্দ নয়। সংসারে টানাটানি 
নাই ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া অনায়াসে হয়, জীবন এক প্রকার নিবির্বরোধে 
এবং সুখে কাটে, কেরাণীদের কেহ গাড়ি ঘোড়াও চাপিতে পারেন এবং 
মৃত্যুকালে কিঞ্চিৎ সংস্থান রাখিয়াও যান! উচ্চ বেতনের কেরাণীর অপেক্ষা 
অতি অল্প লোকই সুখী ও স্বচ্ছন্দ; দিবসে এমন কোন কার্য করা আবশ্যক 
হয় না যে রাত্রিতে নিদ্রার ব্যাঘাত হয়। ব্যবসায়ী বা বেনিয়ান বাবুর মতন 
এক জনের পাগড়ি অপরের মাথায় দিয়া ভেবে মরিতে হয় না। টাকা অধিক 
আনেন না বটে, কিন্তু আরামে ও নির্ভাবনায় কাল কাটিয়া যায়। এইরূপ 
কেরাণীর সংখ্যা অতি অল্প। অধিকাংশ কেরাণীই টানাটানির মহলে বাস করেন 
এবং খণদেবীর অধীনস্থ । ঢাকের বাজনা যেমন একেবারে দুইদিক বাজে না, 
সেইরূপ কেরাণীর দুইদিক একেবারে চলে না। যে মাসে আহার সেই সেই 
মাসেই পরিধান হইবার সম্ভাবনা নাই। কেরাণীর ঘরে দুই সীমা যে মিলাইয়া 
দিতে পারে সেই ধন্য, তাহাকে বলি পাকা অর্থমন্ত্রী (ফিনান্সিয়ার)। 
রাজভাগ্ডারের অনটন নিবারণ করা ত কঠিন নয়, রাজকর বা মাদক দ্রব্যের 
মাসুল বৃদ্ধি করিয়া দিলেই হয়; কিন্তু খণ না করিয়া কেরাণীর অকুলান 
ঘুচাইতে পারে, এমন সুদক্ষ সুপণ্ডিত এবং সহৃদয় ব্যক্তি কোথায় আছে? যদি 
কেহ থাকেন তবে দয়া করিয়া বাহির হইয়া কেরাণীকে ঘোর বিপদ হইতে 
রক্ষা করুন। কেরাণী খণ করিয়া কষ্ট পান এবং কখন কখন তাহাকে 
জেলেও যাইতে হয়, কিন্তু কেন যে খণ হয় এবং কি প্রকারেই বা নিবারণ 
হয় সে বিষয়ে ভাবিবার কি কেহ আছেনঃ “খণ করা বড় দোষ বলিয়া” 
উপদেষ্টা ধর্মডাক ডাকিয়া ক্ষান্ত পান; বক্তারা “পলিটিকস্* লইয়া ব্যস্ত এবং 


৩৮৩ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


সংবাদপত্র লেখক উচ্চ উচ্চ বিষয় লইয়া থাকেন, কেরাণীর বিষয় ভাবিবার 
সময় নাই এবং বোধ হয় এরূপ ভাবনাকে নীচ মনে করেন। কোন্‌ কোন্‌ 
কারণে কেরাণীর অবস্থা মন্দ এবং তাহা নিবারণের উপায় কি; এ বিষয় 
ভাবিবারও লোক দেখিতে পাই না। বঙ্গদেশের অধিকাংশ ভদ্রলোক কেরাণী, 
ইহাদের অবস্থা উন্নত না করিতে পারিলে কেবল বড় বড় ““বক্ভীমা” 
করিলেই কি দেশের অবস্থা উন্নত হইতে পারিবে? একা আমি আর কত 
ভাবিব! কেরাণীর “ভারায় মেনে সরায় শোধ" । অনেক বিষয় মাস কাবারের 
সময়ে করিবেন বলেন, কিন্তু প্রায়ই কিছুই হয় না; ““দরিদ্রস্য মনোরথঃ” 
মনের ইচ্ছা মনেই মিলাইয়া যায়। কাপড়, জুতা, জামা, বিছানার চাদর, 
মসারী, ছেলের খেলনা, বাটী মেরামত, মেয়ের বাড়ী তত্ব, সময়ের নৃতন 
ফলমূল কত কি মাসকাবারের সময়ে কিনিবেন ও করিবেন বলেন, কিন্তু 
কাজে অতি অল্পই হইয়া থাকে। পাঁচ যোড়। কাপড্ের স্থানে এক (খাড়া 
কেনা হয়, চাপকান করিব ২ ক'রে তিন মাস কেটে মায়; জুতা না কিনে 
খেলনার বদলে মিষ্ট বা রুনু কথ দিধা ছেলে-মেয়েকে থামান। মাস 
কাবারের সময়ে কেরাণীর বড় কষ্ট, ঘরে পরে গঞ্রনা। এদিকে স্ত্রী ধার 
করিয়া সংসার খরচ চালাইয়াছেন পরিশোধ করিতে হইবে, ও দিকে মুদী, 
গয়লা ডাক্তারখানার বিলওয়ালা ও কাপড়ওয়ালাকে দিতি হইবে, টাকা আঁটে 
না, অথচ না দিলে খাওয়া-পরা বন্ধ। এ ঘোর বিপদ হইতে কে উদ্ধার 
করিবেন? একমাস নয়, এক বৎসর নয়, চির-জীবন এইরাপে কাটাইতে হয়। 
ইহাদের উদ্ধারের উপায় কি হহ্.ব না? মানুষ চুপ করিয়। থাকে থাক্‌ ভগবান 
কিন্তু চুপ করিয়া থাকিবেন না; উপায় একদিন হইবেই হইাবে। 

ছোট £করাণীার স্ত্রীর সুখ বড়! আহারের সময় প্রায়ই ব্যঞ্জন পান না, সুদু 
প্রায় স্বামী ও সম্ভানগণকে খাওয়াইতে ফুরাইয়া যায়, নিজের ভাগে বড় কিছু 
পড়ে না। পরিধানের সুখও এরূপ, প্রতি ধোপে দুই কি তিন খানা কাপড় 
পরেন, তা ধোপা মহাশয়ের দৌরাক্সে পরিষ্কার কাপড় পরা প্রায়ই হয়ে উঠে 
না; কাপড়ে হলুদ, তেল, দুধ, ও মাটির দাগ্‌ প্রায়ই দেখা যায় এবং বিলক্ষণ 
গন্ধও বাহির হয়, চুল বেঁধে এবং অ'লতা পরে কোন রকমে নিজ শ্রী বজায় 
রাখেন। কাজের সীমা নাই. চাকর!ণ: হইয়া পাট করেন, রাঁধুনী হয়ে রন্ধন 
করেন, মেথরাণী হইয়! ছেলের ময়ল: পরিষ্কার করেন, গৃহিণী হইয়া ভাণ্ডার 
রক্ষা করেন, গুব্বা হইয়া! (লাকলৌকিকতার বিষয় স্বামীকে উপদেশ দেন, 
পরিচালিকা হইয়া তাহাকে গলান এবং প্রণরিণী হইয়া পতির দুঃখীদার্সিদর 
প্রপীড়িত ও সাহেবের ভণ্ডনায় দঙ্রিত হৃদয়কে সান্ত্বনা দান করেন। এর 
উপর আবার ছেলের কাথ: পুরান কাপড়ের বিছানার চাদর ও বালিসের 


৩৮৪ 


কেরানী পুরাণ 
ওয়াড় সেলাই করিতে হয় এবং মশারিতে বাপড়ে ও জামাতে তালি দিতে 
হয়। ঝির সঙ্গে বকাবকি, শাশুড়ী ননদের ঝগড়া এবং সংসারের খরচ লইয়া 
স্বামীর সঙ্গে লড়াই করিতে হয়। স্বামীর জীবিত অবস্থায় ত এই দশা তাহার 
মৃত্যুর পর যে কি হয়, তাহা বলিতে গেলে চোখে জল আসে। চিরবিরোধ 
ও আদাআদির পাত্রী জা আর ভাজের পদানত হইয়া কোন ক্রমে চোখের 
জলে ও নাকের জলে কাল কাটাইতে হয়। ভাজ আর ভায়ের খোসামোদ 
করে ভাত খাওয়া যে কি কষ্টকর, যে খায় সে জানে; অন্যে কি বুঝিতে 
পারে? ছোট কেরাণীর স্ত্রীর অবস্থা ত এই। তাহার ঘরের শ্রী কেমন? 
অনেকের ত বৈঠকখানা নাই, সদর দরজায় হুঁকা হাতে করিয়া আসিয়া বন্ধু 
বান্ধবের এবং পাওনাদারের সঙ্গে কথা কহিয়া সারেন। কাহার কাহার বাহিরে 
ঘর আছে, ঘরটা সাজান বড় চমৎকার। একখানা তক্তপোষের উপর একটা 
মাদুর পাতা, দুইটা ঠেকো হুঁকা, কেঠো দের্‌কো কিম্বা ব্রোতলের উপর প্রদীপ, 
ঘরের কোণে তামাকের গুল জড় করা, দেয়ালের চুণকাম ভাঙ্গা এবং 
জানালায় হয়তো একআধ খানা কপাট নাই। ভিতর বাটা “তখৈবচ”; ছাদ 
দিয়া প্রায় জল পড়ে, কড়ির নীচে বাঁশের ঠেকো এবং দেয়ালের চুণকাম 
উঠে গেছে, বিছানা অপরিষ্কার এবং ছেঁড়া মসারিতে তালি দেওয়া, ছেঁড়া 
কাথায় মৃত্রের গন্ধ, আল্লায় কাপড়গুলি ময়লা রকমের ও ছেঁড়া, সিম্ধুক 
পেটরা বড় বেশী নাই, বাসন কোসন তদ্রুপ; কিন্তু ঘরের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি 
করিবার জন্য কালিঘাটের ছবি এবং চড়ক ও রথের সময়ে বিক্রীত পুতুল 
এবং সোলার ফুল দিয়া ঘর সাজান থাকে। 
ছোট কেরাণীর ছেলে মেয়ের অবস্থা কেমন? শিশুকালে অন্যের ছেলে 
যে সময় ঝির .কোলে মানুষ হয়, কেরাণীর ছেলে ধূলা-কাদা মেখে আর 
কেঁদে কেঁদে কাটায়। গায়ে মুখে ধূলা মাখা, গায়ে আবার নানান রকম দরাণী, 
হাত দুটী অপরিষ্কার, হাঁটুতে কাদা মাখা, চুলগুলি আঁচড়ান নয়, তাতে আবার 
হয়ত দুই একটা জটা। মা রসুই ঘরে কিম্বা অন্য কোন কার্যে নিযুক্ত, ছেলেটা 
ঘুম থেকে উঠিল, মাকে না দেখতে পেয়ে কান্না জুড়ে দিলে। মা হেঁসেলে, 
বুড় ঠাকুরমা আহিক করিতে বসেছেন, বিধবা পিশিমা নিরামিষ রসুই 
গিয়াছে, ছেলে বিছানা থেকে তোলে কে? ছেলেটা কেঁদে কেদে আর আছাড় 
পিছাড় খেয়ে ধুপ করে তক্তাপোষ থেকে পড়ে গিয়ে ককাইয়া উঠিল। মা 
কি আর থাকৃতে পারেন? পোড়া সংসারে আগুন লাগুক, পোড়ার মুখো 
কোথা গিয়ে বসে রহিল; ছেলেটাকে একটু ধর্তে নেই, কীড়ি গিল্তে হবে 
না, পুঁটি পোড়ার মুখী বুঝি মরেছে, এইরূপ নানা প্রকার গালাগালি দিতে 
দিতে ছেলেটাকে তুলে আনিয়া মাই খুলে দিলেন, হয়ত রাগে একটা চাপড় 
বসাইয়া দিলেন। ছেলে বেচারার অপরাধ কি? খোকা শাস্ত হলো, এখন 


৩৮৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


“মাধু” ডে বছরের ছেলে) একজন নিচুওয়ালাকে ডেকে বসেছে, গোটা 
কতক নিচু হাতে করে প্রফুল্ল মুখে উৎসাহের সহিত এসে বলিলেন মা নিচু 
কিনে দে না, ভাল নিচু ৪ টা করে পয়সায়। মারও প্রাণ উড়ে গেল, চারি 
পয়সা নিচু না কিনিলে আর সকলের কুলোবে না, বাজারের পয়সা ভেঙ্গে 
কত হবেঃ “ছি বাবা ও কাচা নিচু খেলে ব্যাম হবে, ফিরিয়া দাও গে।” “হা 
করিল। “আরে পোড়া কপালে খাবি আর কোথা থেকে? তোদের কি খাবার 
কপাল?” এই বলে মরি মরি করে দুটো পয়সা ফেলে দিলেন। মাধু হাস্তে 
হাস্তে নিচু কিনে আনিল, আর মা আপনার কাজে নিযুক্ত রহিলেন; খানিক 
পরে বড় খুকী খুকী। বৎসরের মেয়ে, উঠানে খেলা করিতে করিতে 
একেবারে হঠাৎ চোখ কপালে তুলেছে মাধু বলে উঠিল, “মা দেখ বড় খুকী 
এক মজা করিতেছে, মার তো দেখেই প্রাণ উড়ে গেল। “ও মা কি সবর্বনাশ 
হলো গো”, বলে মেয়ে কোলে করে নিয়ে দেখেন যে মেয়েটার গলায় নিচুর 
মেয়েটা বীচে। 

শিশুকাল গেলে লেখা পড়ার সময় উপস্থিত। ছেলে ত স্কুলে যায়, কিন্তু 
জুতা থাকে ত, কাপড় থাকে না; মাহিনা সময়ে যোটে না, সকল বইয়ের 
জোগাড় হঠাৎ হয় না, ছেলে যদি বড় বুদ্ধিমান হয়, তবেই ত প্রবেশিকা 
দিয়ে লেখা পড়া শিখে। অধিকাংশ ছেলেই “টুটামটি” শিখে অফিসে 
এপ্রেণ্টিস হয়; অনেক কষ্ট এবং অনেক খোসামোদ করে কুড়ি টাকা বেতনের 
এক কর্ম জোটায়। চাকরির আগেই মা বাপ বিবাহ দিয়ে বসে আসেন, হয়ত 
নাতির মুখও দেখে সুখী হয়েছেন, আর বিবাহ না দিলেই বা কি করেন? 
বিলম্ব করিলে ছেলে হয়তো ব্রান্মাসমাজে গিয়া বৈরাগী হয় নয়ত খ্রীষ্টান 
হতে যায়, নয়তো বিদেশে চলে যেতে চায়, আর নয়ত রাক্ষসীদের চরণ 
সেবা করিতে যায়। এইরূপে কেরাণীর দুঃখের স্রোত পুরুষানুক্রমে চলিতে 
থাকে। ইহা নিবারণের উপায় আছে বলিব কাজে কিছু হউক আর না হউক। 

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলু খাঁকড়ার প্রাণ যায়। কৃতবিদ্য রাজনীতি 
বক্তৃতা করেন এবং আপনার কোটে বসিয়া বড় বড় সম্পাদকীয় প্রবন্ধ 
লেখেন, আর সাহেবেরা তাইতে রেগে উঠেন। রাগ চগ্াল যাহার ঘাড়ে 
চাপেন তাহার আর জ্ঞান থাকে না, জ্ঞান হারাইয়া কি করিতে যে কি করেন, 
তাহার আর ঠিক থাকে না। যাহারা জ্বালাইয়া দেন তাহাদের ত কিছু করিতে 
পারেন না, তাই অধীনস্থ কেরাণীদের উপরে যত ঝাল ঝাড়েন। “পরের কিছু 
ছেলেকে বারণ করবি ত কর্‌, নইলে বড় ছেলের ঘাড় ভাঙ্গিব। গরিব 


৩৮৬ 


, কেরানী পুরাণ 
কেরাণী বেচারার উপর চোট কেন? ইলবার্ট বিল উল্লেখ করে তাহাকে এত 
টিটৃকিরি দেওয়া কেন? তাহার প্রোমোশন বন্ধ করিলে কি হবে? আপিসে 
কর্ম খালি হলে বাঙ্গালীর কাজে ফিরিঙ্গী আনিলে কি ভাল বিবেচনা করা 
হয়? অবলা নিরীহ কেরাণী কিছুর মধ্যে নেই, “ভাত খায় কাসি বাজায়, 
রগড়ের ধার ধারে না”। কোন্ক্রমে গোটা কতক টাকা নিয়ে, পরিবারকে 
মোটা ভাত মোটা কাপড় দিয়া জীবন কাটান তাহার একমাত্র উদ্দেশ্য । বড় 
বড় বাবুদেরই বা বিবেচনা কি? এমন ভাবে সাহেব ক্ষেপাইয়া গরিব চাক্‌রে 
লোকের কি প্রাণ বধ করিতে আছে? সাহেবের দোষ ত্রটির কথা কি মিষ্টি 
করে বলা যায় না। সাহেবদের রাগাইলে কি হবে? তাহাদের হাতেই তো 
আমাদের অনেকের প্রাণ£ঃ তাহাদের না হইলে যে ঘরে লক্ষ্মীপূজা বন্ধ হয়ে 
যায়। তাহাদের “ক্যাপিটাল” না খাটিলে কি দেশের উন্নতি হয়? না কারবার 
ভাল করে চলে? দেশীয় ধন ত গহনা ও কোম্পানীর কাগজে আবদ্ধ। 
গরিবদের ডান হাতের ব্যাপারটা চলে কিরূপে? সাহেবদের অনেক অন্যায় 
অবিচার আছে বটে, কিন্তু অমন করে ঝাল ঝাড়লে কি তাহার কোন উপায় 
হবে, না আরও রোগের বৃদ্ধিই হইবে? বড় বাবুদের একটু ধৈর্য্য থাকিলে 
ভাল হয়। আগে কৃষি কার্য, বাণিজ্য, শিল্লের উন্নতি সাধন করা হউক, 
কুসংস্কার নিবারণ করা হউক, কেরাণীগিরি ছেড়ে অন্য উপায়ে উপার্জন 
করিবার পন্থা স্থাপন করা হউক, তার পর ইংরেজের কতকটা সমকক্ষ হইয়া 
পলিটিক্যাল প্রিভিলেজের জন্য বাদানুবাদ করিবার যোগ্যতা জন্মিবে। আর তা 
নইলে “চরমের পদ অগ্রে” বলিলেই শতফোটা ভট্টাচার্যের মতো চড় খাইতে 
হইবে। তাই বলি বাবুরা একটু ক্ষান্ত হও; আর কথা বাড়াইও না। কাকেই 
বলি, আর কে বা আমার কথা শুনে! 

ধনীর মাথায় ধর ছাতী-_ নির্ধনীর মাথায় মার লাথি এই ত সংসারের 
ব্যবস্থা, অফিস অঞ্চলে এই বিধিই চলে, এমন কি গবর্ণমেন্ট পর্য্যস্ত ইহার 
অনেকটা সম্মান রক্ষা করেন। ছোট কেরাণী প্রায়ই “প্রিভিলেজ লিভ্‌” পান 
না। যদি বড় পীড়া হইলে কিম্বা অন্য কোন কোন বিশেষ কারণে পান.তাহা 
হইলে ছুটির মাহিয়ানা পাইবেন না, কিন্তু বড় বড় কেরাণীর উপর এ বিধি 
নাই। হায় রে খোঁড়ার পাই খালে পড়ে! বেচারা একে রোগের জ্বালায় 
জালাতন, তাতে আবার উপরি খরচ, তার উপর আবার মাহিয়ানা বন্ধ; 
সহজেই মাহিয়ানা পাইতে এক দিন বিলম্ব হইলে আঁধার দেখিতে হয়। তা 
আবার এমন রোগের সময় বেতন বন্ধ থাকিলে যে কি কষ্ট হয়, তা তিনিই 
জানেন আর ভগবান জানেন। গবর্ণমেন্টের মনে একটু বিবেচনাও নাই, এবং 
ছোট কেরাণী বেচারার প্রতি দয়াও হয় না। শান্ত সুবোধ সৎ এবং নির্বিরোধ 
কেরাণীর উপর কি কাহারো দয়া হয় না? এমন শাস্ত শিষ্ট প্রজা গবর্ণমেন্ট 
আর কোথায় পাইবেন? তবু ইহাদের প্রতি এরূপ দৃষ্টিহীনতা কেন? বড় 


৩৮৭ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


কেরাণীর ভুল হইলে স্পষ্টা্পষ্টি মুখামুখী ধমকান হয়। প্রশংসা বড় 
কেরাণীর; কিন্তু তিরস্কার আর গাধা-খাটুনী ছোট কেরাণীর। কর্্মথালি হইলে 
উপর শ্রেণীতে বাহিরের লোক প্রায়ই আসে না কিন্তু নীচের শ্রেণীতে প্রায়ই 
বাহিরের লোককে আনা হয়, পাঁচ বার নিরাশ হইয়া যদি একবার প্রমোশন 
পান, তাহা হইলে নীচের কেরাণী আপনাকে ধন্য মনে করেন। ছোট কেরাণীর 
কাজ বড় কেরাণী হাতে করে লইয়া গিয়া সাহেবের নিকট বাহবা পান, কিন্তু 
কোন কসুর হইলে ছোট কেরাণীকেই বিপদে পতিত হইতে হয়। এককার 
একটা হাঁ-র স্থানে না-র ভুল হইয়া একটা কেল্লা ভাঙ্গা গিয়াছিল, এই ভূল 
কত বড় বড় সাহেবের হাত দিয়া বাহির হইয়া গিয়াছিল, কিন্তু গরীব 
নকলনবিস কেরাণীর কন্মটী গেল। “বড় গাছে ঝড় লাগে” এ কথা আফিসে 
বড় চলে না। 

কেরাণীগিরিতে বড় অর্থকষ্ট, কিন্তু এমন সংপথ এ সংসারে আর দেখা 
যায় না। এখনকার কালে মিথ্যাকথা না কহিয়া এবং অল্প পরিমাণে প্রবঞ্চনা 
না করিয়া প্রায়ই কোন ব্যবসায় কি পেসা চালান ভার হয়ে উঠেছে। 
ভরণ পোষণ চালাইতে হইলে কেরাণীগিরি ভিন্ন বোধ হয় অন্য কোন উপায় 
এত সহজ নয়। দু-দিনের জন্য পৃথিবীতে আসিয়া যদি ধর্ম হারাইতে হইল, 
তবে গাড়ি, ঘোড়া, মান, সন্ত্রম, সম্পত্তি, অলঙ্কার, বস্ত্রাদির প্রয়োজন কি? দু- 
দিন পরেই ত সব রেখে যেতেই হবে, তবে আর ধর্ম হারাইয়া নিঃসম্বলে 
পরকালে গিয়া কি হইবে? 

পূজার সময়। 


কেরাণীর বাটীতে পুজার সময় ধূম কেমন? বড় কেরাণীর বাড়ীতে বড় মন্দ 
ধুমধাম নয়; ছেলে-মেয়ের ভাল-ভাল কাপড়, সাটানের পিরাণ, ইংরাজের 
বাড়ির জুতা। গৃহিণীর বারানসীর বা অন্য কোন রকম ভাল শাড়ী, মাতাঘসা, 
বাবুর নিজের নূতন কাপড় চোপড় ও নানা প্রকার সখের জিনিস কেনা 
হয়েছে, কেহ কেহ বা দুই-দশ বোতল, লাল পানিও সংগ্রহ করেছেন। কোন 
কোন বাবু পুজার ছুঁটীতে নানা প্রকার মজায় কাটাইবেন, সেই আমোদেই 
আছেন, কেহ বা দেশ দর্শনে যাইবার আহ্াদে আছেন, ছেলে বুড় সকলের 
আনন্দ; কিন্তু ছোট কেরাণীর বাড়ী দুর্গোৎসবের ধূমে অন্ধকার। দুর্গোৎসব 
নয়, দুর্গাবিপত্তি। যে কটী মাহিনার টাকা পেয়েছিলেন তা ত গত মাসের 
কতক ঝণ শোধে আর সংসারের নিয়মিত খরচেই গিয়েহে, সকল মহাজনকে 
এখনও থামান হয়নি, পূজার সময় সকলকেই ত কিছু কিছু দিতেই হবে, 
কিন্তু টাকায় কুলায় না। এইত এক বিষম বিপদ, তার উপর আবার পুজার 


৩৮৮ 


কেরানী পুরাণ 
কাপড় না করিলেই ত নয়, ছেলেগুলো কেঁদে গড়াগড়ি দেবে। গৃহিণী 
নবপ্রসৃতা সাপিনীর ন্যায় তর্জন-গর্জন করবেন, মেয়ের শাশুড়ী ত রক্ষা 
রাখবেন না। কি করেন, কোন দিকে আর কুল-কিনারা না দেখে চখে যেন 
সরিসা ফুল দেখিতেছেন। পুজার সময় সকলেরই অধিক খরচ, কাহার কাছে 
বা ধার পাবেন? ভাবিতে ভাবিতে ভিতরটা যেন ধড় ফড় করতে লাগল, 
আর গাটা যেন কাপতে লাগ্‌লো, আর বসিতে না পেরে ঘরের ভিতর গিয়া 
উপুড় হয়ে শুলেন। পাশের ঘরে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে গুলো কেহ বা 
আধ আধ কেহ বা স্পষ্ট কথায় কাহার কেমন কাপড় হইবে, কাহার কেমন 
জুতা হইবে বলাবলি করিতেছে। একটা ছেলে বলে উঠ্‌লো, বাবা আমায় 
সাহেবের বটার বুট জুতা এনে দেবেন, মেয়েটা বলিল ঘোষেদের চপলার 
মতন আমার সাটানের ঘাগরা হবে, ছোট পুঁটী (এখন তার কথা ভাল 
ফোটেনি) বল্লে “বাবা আঁ- আঁ”। ছেলেদের কথা কানে যতই যাইতেছে, 
আর ততই তাহার যেন বুকে শেল বিধিতেছে; এমন সময় গৃহিণী ঘরে 
প্রবেশ করিলেম। ওকি উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে কেন? আজ যষ্ঠী এখনও 
কাপড় আনিলে না, বাছাদের ত আর থামিয়ে রাখিতে পারিনা । বাবুজি 
কাপিতে কীপিতে মৃদুস্বরে বলিলেন কাপড় কিনিবার কি হবে, টাকা ত কোন 
খানে ধার পেলুম না। এই শুনেই গৃহিণী তেলে বেগুনে জুলে উঠলেন। 
তাহার চোক ঘোরানির ভঙ্গি দেখে কে? “অমন মিষ্টি কথায় আমি ভুলিনে, 
যেখানে পাও সেই খান থেকে এনে দাও। এমন যদি দশা তবে হাতে সুতা 
বেঁধে আমোদ করে বে করিতে গিয়াছিলে কেন?” এই প্রকারে গৃহিণী ত 
কত প্রকারে তিরস্কার করিলেন, বাবুজি একেবারে নিরুত্তর। অনেকক্ষণ পরে 
ঠাকুরাণীর একটু রাগ পড়ে গেলে বলিতে লাগিলেন, তোমাকেই বাকি দোষ 
দেব, সকলি আমার পোড়া কপালের দোষ, তুমি ত চাকৃবিও কর, মদ-গাঁজাও 
খাও না, বাজে খরচও কর না। “ন্ত্রীভাগ্যে ধন, পুরুষভাগ্যে সস্তান” তা 
তোমার ভাগ্য ত ফলেছে, আমারি ভাগ্য ফলে নাই। সে যাই হোক পুজার 
কাপড় আর তন্্ব করা চাইই চাই। কথায় বলে “যাক প্রাণ থাক মান” আমার 
এই বালা দু-গাছা নিয়ে বাঁধা দিয়ে ত এখন খরচ চালাও; পৃজার পরে উদ্ধার 
করে দিও। -_বলি ঠাকুরণ, আমার একটী কথা শোন, বালা উদ্ধারের আর 
নাম করো না, তোমার কোন্‌ গহনা খানি বাঁধা পড়ে আবার ঘরে ফিরে 
এসেছে? আজ অবধি কাচের চুড়ী সার কর। একি দুর্গাবিপত্তি নয়? 
কেরাণীর একদিকে যেমন দুঃখ অপর দিকে তাহার সুখও আছে! ক্ষুধায় 
আহার, অনায়াসে নিদ্রা এবং ধর্ম পথে বিচরণ অপেক্ষা আর কি সুখ আছে? 
ধন্য ভগবান; তিনি কঠিন পাথর ভেদ করিয়া শীতল এবং সুস্বাদু জল বাহির 
করেন। কেরাণীর অর্থকষ্ট নিবারণ হয়, অথচ ধর্ম্ম ও স্বাস্থ্য রক্ষা হয়, এমন 
সকল উপায় আছে, ক্রমে বলা যাইবে। 


৩৮৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 
ছোট কেরাণীর মৃত্যু। 


দুই-তিন দিন অল্প-অল্প জবর হয়েছে, তবু আপিসে যাওয়া হইতেছে, না গেলে 
যে রোজ কাটা যাবে। কেরাণীর মাহিনা কাটা গেলে হয় ১৫ দিনের বাজার 
খরচ কমে যাবে। তিন দিনের দিন বৈকালবেলা কাজ করিতে করিতে ঘাড় 
মুড় ভেঙ্গে জ্বর এল, আর বসিতে পারিলেন না। তামাক খাবার ঘরে গিয়ে 
শুয়ে পড়িলেন, আপিসের ছুঁটী হলে একখানা পালকী করে বাড়ী উপস্থিত 
হলেন। ছোট ছেলে মাধু সদর দরজায় খেলা করিতেছিল, বাবাকে পালকি 
করে আসিতে দেখে বড় খুসী হয়ে দৌড়ে গিয়ে মার কাছে বল্লে, মা! বাবা 
আজ বড় মানুষ হয়েছেন, মিত্রদের কর্তা বাবুর মতন পালকী করে কুটী থেকে 
এসেছেন। পালকির কথা শুনে মার প্রাণ উড়ে গেল, তবে ত বড় অসুখ 
হয়েচেঃ নইলে পালকি করে এলেন কেন? আর ভাড়ার পয়সাই বা কোথা 
পাই? মাসকাবার প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, বাজার খরচই নাই, তার উপর 
আবার রুগীর সেবা। এ দিকে ত বেহারারা ধরাধরি করে কর্তাকে শুয়াইয়া 
আসিল। কর্তী বড় পাকা লোক বহুদর্শী, আপিস হতে আসিবার সময় 
যে কিছু নাই তাহা তীহার বিলক্ষণ স্মরণ ছিল। গিন্নী হেসেল থেকে 
তাড়াতাড়ি এসে কর্তার গায়ে হাত দিয়ে দেখেন, যে “ধান দিলে যেন খই 
ফুটে।” ঘড় ছেলেটী বৎসর চোদ্দ বয়সের; বাবার বড় জর দেখে ব্যস্ত হয়ে 
ডাক্তারের বাড়ী দৌড়ে গেল; কিন্তু ডাক্তার বাবু খে নাই; আবার রাত্র 
নয়টার সময় গেল, কিন্তু তিনি এলেন না। গরিব পেসেন্টের বাড়ী হতে ডাক্‌ 
এলে ডাক্তার বাবুদের বড় গা খীমে না। নগদ ফি দেবার ভয়ে আর অন্য 
ডাক্তার ডাকা হল না; সে রাত্রি বিনা চিকিৎসায়ই গেল। পরদিন বেলা 
. একটার সময় ডাক্তার বাবু এলেন। রোগীকে দেখেই ত আকেল গুড়ুম। হাই 
ফিবর হয়েচে এবং তার সঙ্গে কমপ্লিকেসন। চটে উঠে বলিলেন, আগে 
ডাকৃতে নেই? বাঙ্গালিরা বড় খারাপ, পীড়া খুব না বাড়িলে আর চিকিৎসা 
করায় না। বলি ডাক্তার বাবু! মিছে তিরস্কার করেন কেন? গরিব লোক কি 
আপনাদের সহজে ডাকিতে পারে? না ডাকিলেই সহজে পায়? 

দেখিতে দেখিতে পীড়া খুব বেড়ে উঠিল। রক্ষা পাবার আশা প্রায় নাই। 
যে টাকা কটী ধার করে আনা হয়েছিল, সব খরচ হয়ে গেল। চিকিৎসা চলা 
ভার হয়ে উঠিল, কেরাণীর আত্মীয় কুটুম্ব প্রায়ই কেরাণী; সুতরাং বিপদ হলে 
অর্থকষ্টে পড়িলে সাহায্য করিবার লোক প্রায়ই পাওয়া যায় না; দুই একজন 
ধনী কুটুন্ব থাকিলেও থাকিতে পারে; কিন্তু তাহারা কোন সংবাদ লন না। 
গরিবের বড় মানুষ কুটুম্ব থাকার সুবিধা প্রথমতঃ মনের মিল হয় না; 
দ্বিতীয়তঃ লোক-লৌকিকতা রাখিতে গিয়া গরিব মারা যায়; ক্রমে -আট-দশ 


৩৯০ 


কেরানী পুরাণ 
দিন চলে গেল। পীড়াটা যেন একটু কমে এল; আর ডাক্তার বাবুও একটু 
আশা দিলেন। কিন্তু এগার দিনের দিন হঠাৎ বেড়ে উঠিল। ১০৫ ডিগ্রি জবর, 
আর তার উপর উপদ্রব। বড় মানুষের ব্যামো নয় যে অনেকে রাত জীগিতে 
আসিবে; গরিবের খবর কেবা লয়? পাছে কিছু সাহায্য করিতে হয়, এই 
ভয়ে পাড়া প্রতিবেশী এবং সকল আত্মীয়রা বড় ছৌঁ ঘা দেয় না। দেখিতে 
দেখিতে রাত্রি দুই প্রহর হইল; জুর একেবারে কমে গেল; বিল বিল করে 
ঘাম বাহির হইতে লাগিল, চক্ষু কপালে উঠিল। তাড়াতাড়ী করে তক্তাপস 
হইতে যেই নাবান, অমনি একটা কি দুটী খাপি খাওয়া আর মৃত্যু। কর্তা যে 
আর নড়েন না। ওগো আমার কি হল।-_ বলে গিনি উপুড় হয়ে পড়েই 
অচেতন। মা ঠাকুরাণী, “বাবা! তোমার বুড়া মাকে কি ফেলে গেলি” বলেই 
অজ্ঞান; “বাবা আমায় কাকে দিয়া গেলে গো” বলে বিধবা কন্যা চীৎকার 
করে সংজ্ঞাবিহীন। বড় ছেলেটা একেবারে অবাকৃ! সেই কাল রাত্রের কথা 
কে বর্ণন করিতে পারে? এদিকে ত এই দৃশ্য, ও দিকে পাশের ঘরে বুড়া 
বির কাছে ছোট-বড় সাতটি ছেলে-মেয়ে ঘুমাতেছিল, একেবারে সকলে 
কেদে উঠে বাবার ঘরে এসে দেখে, যে বাবা মেজেয় পড়ে, আর মা, 
ঠাকুরমা আর দিদি তিন দিকে তিন জনে পড়ে আছে। ছয় বৎসরের মেয়েটা 
দৌড়ে গিয়া বাবার গলা জড়াইয়া বলিতে লাগিল, _ বাবা তুমি অমন করে 
শুয়ে কেন? একটা কথা বল না, ওরা অমন করে পড়ে আছে কেন? দাদা! 
বাবার কি হয়েছে বল না? বাবা! একবার কথা কও না। খানিক পরে 
সকলের জ্ঞান হল; ক্ষণ কাল অবাক হয়ে থেকে বিনাইয়া বিনাইয়া কাদিতে 
লাগিলেন। সে কান্না শুনে কার বুক না ফাটে? আর কার চক্ষে জল না 
আসে? গিন্নী কাদিতে কাদিতে বলিতে লাগিলেন, “ওগো তুমি আমায় কার 
হাতে সৌপে দিয়ে গেলে গোঃ আমাদের মায়া একেবারে কেমন করে 
ভুলিলে গোঃ আর আমাদের মুখপানে কে চেয়ে দেখিবে গো? কাল খাবার 
চাল ঘরে নেই। আমার অবগন্ড ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোথায় যাব গো? ওগো 
তোমার বড় মেয়ের বিবাহের সময় বাড়ী বাধা দিয়েছিলে; এখন যে ওদরান 
হয় নি গো; পাছে আমাদের কষ্ট হয় বলে তুমি যে হেঁটে কুটি যেতে গো; 
বড়. মেয়ের এমন দশা হওয়া অবধি তুমি যে আপিসে জল খাবার না খেয়ে 
তার সংস্থান কচ্ছিলে গো, তুমি যে আমাদের আত্ত কাপড় পরাইয়া আমাদের 
ছেঁড়া কাপড় পরিতে গো, এত মায়া কেমন করে একবারে ভুলিলে গো!” 
এরূপ করে যে কত কান্না কাটা হল, কে লিখে উঠিতে পারে? এত বড় 
মানুষের মৃত্যু নয় যে কান্না সিকেয় তুলে রেখে মাল খানার চাবি দেবার ধুম 
লেগে যাবে। রাত ত প্রায় শেষ হয়ে এল। মড়া ত ঘাটে নিয়ে যেতে হবে। 
সৎকারের টাকা নাই; নিয়ে যাবার লোক নাই। বড় মানুষকে নিয়ে যাবার 
লোক অনেক যোটে; কিন্তু গরিবকে কাধে কে করে, লাভও নাই প্রশংসাও 


৩৯১ 


দুহপ্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


নাই।' ঘাটে কামানর সময় নৃতন কাপড়. পাইবারও. আশা নাই। কাল রাত্র 
এলি নকল যোগাড় হয়? 


রা খুলে নিয়ে বাঁধা দিয়ে টাকা যোগাড় হইল। খুকী কি মাক্ড়ি 
খুলিতে দেয়? কত কীদিতে লাগিল; আর আধ স্বরে বলিল, মা তুই যদি 
অমন করিস্‌ বাবাকে বলে দিব। টাকা ত সংগ্রহ হল। লোক কোথা পাওয়া 
যায়? বড় ছেলেটা আর একটী সহৃদয় প্রতিবেশী অনেক কষ্ট করে লোক 
জোটালে। প্রায় বেলা আড়াইটার সময় কেরাণীর গঙ্গা যাত্রা হইল। 


উদ্ধার পবর্ব। 


কেরাণীর দুঃখের কথা এমন স্পষ্ট করিয়া বলিলাম যে, হয়ত অনেক 
কেরাণীর মনে কষ্ট হইল ও কেহ কেহ রাগিয়াও গেলেন “যার জন্য করি 
চুরি, সেও বলে চোরা হরি" কেরাণীদের মনে কষ্ট দেওয়া কিম্বা তাঁহাদের 
কষ্টের কথা প্রকাশ করে বড় লোকদের দয়া উদ্দীপন করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। 
ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর লোকদের উন্নতি সাধন জন্য যেমন সভা আছে কেরাণীদের 
অবস্থা উন্নতি করিবার জন্য সেইরূপ একটী সভা চাই; কারণ কেরাণীর অবস্থা 
ভাল করা অল্প কাঠখড়ের কর্ম নয়। জনকতক সহাদয় উন্নতমনা, পরদুঃখ 
কাতর, ত্যাগশ্বীকারশীল কৃতবিদ্যু লোক প্রাণ মন দিয়া কেরাণীর অবস্থা 
উন্নতির ব্রত গ্রহণ করিলে ১০/১৫ বৎসর পরে কিছু ফল ফলিতে পারে৷ 
এই সভা কিরূপ হইবে, ক্রমে বলিতে চেষ্টা করিব কিন্তু উক্তরূপ লোক 
কোথায় পাওয়া যাইবে? আপনাকে ভুলে পরের মঙ্গলে উদ্যোগী থাকিবার 
লোক আমাদের দেশে কত পাওয়া যায়? কেরাণীর উদ্ধার ব্রতে বড় প্রতিষ্ঠা 
লাভ করিবার সম্ভাবনা নাই, আর গায়ের ঝাল মিটিয়ে ইংরাজকে গালি দেবার 
বড় সুবিধা নাই। এমন অবস্থায় কেবল পরোপকার করিবার জন্য কয়জন 
অগ্রসর হইতে পারেন? যে কয়েকটা দেশহিতৈবী লোক আছেন, তাহারা 
তাহাদের নিজ নিজ অবলম্বিত ব্রত সাধনে এমন ব্যস্ত, যে তাহাদের কেরাণীর 
বিষয় ভাবিবার সময় নাই। নূতন লোক চাই, যাঁহাদের হাদয় আছে, বিদ্যা 
আছে, বুদ্ধি আছে, ধৈর্য্য আছে, এবং সহিষুর্তা আছে। “গান শুনিতে ইচ্ছা 
করে, ভিক্ষা দিতে প্রাণ পোড়ে” । রিফর্মার হবার সাধ হয় কিন্তু প্রকৃত 
রিফর্মার হওয়া বড় কঠিন। আপনাকে একেবারে হারাইতে হয়, কত বিদ্যা- 
বুদ্ধির প্রয়োজন হয়, কত কষ্ট ক্লেশ বহন করিতে এবং সেই সকলের উপরে 
যাহাদের সেবা করিবার জন্য সব্র্বস্ষ পণ করা হয় তাহারাই আবার অত্যাচার 


৩৯২ 


কেরানী পুরাণ 
করে, কত গালাগালি দেয়, চোর বলে, জুয়াচোর বলে এবং কত রকমেই 
অনিষ্ট করিবার চেষ্টা করে। যিনি কেবল ভগবানের মুখ পানে চাহিয়া 
পরসেবা করিতে পারেন, তিনি দেশহিতৈধী বা দেশসংস্কারের নাম গ্রহণ 
করুন! নতুবা হয় হমবাগ্‌ নয়ত মিসানঘ্োপ হইতে হইবে। কেরাণীরা নিজের 
চেষ্টায় যতটুকু উন্নতি সাধন করিতে পারেন আপাতত ততটুকু করিতে চেষ্টা 
করুন, আপনার কাজ আপনি না করিলে অপরে কি সহজে সাহায্য করে? 
বিবাহে ও লোকলৌকিকতার খরচ কমাইতে পারিলে কেরাণীর অনেক কষ্ট 
নিবারণ হইতে পারে। 
আয়োজন ও প্রয়োজন অনুসারে দ্রব্যের দরের কম বেশি হয়। সংসারের 
সকল প্রকারের কারবার ও পেশা এই নিয়মের অধীন। কেরাণী যদিও ব্রন্মা'র 
বরপুত্র, কিন্তু এ নিয়মের অতীত নহেন। স্কুল এবং কলেজ হইতে যতই 
কেরাণীর আমদানী হইতেছে, ততই হাটের দর কমিতেছে, জিনিষের আদর 
যাইতেছে। সেকেলে কেরাণী লেখা পড়া না জানিয়াও যেরূপ সম্মানের সহিত 
চাকরি করিয়া গিয়াছন, এখনকার কেরাণী সুপরিচ্ছদধারী এবং কৃতবিদ্য হইয়াও 
তাহার দশাংশের এক অংশের সম্মান বা আদর পান না। এক সময়ে 
কেরাণীগিরি অতি সুখের পেসা ছিল, নতুবা ধোপা নাপিত কামার কুমার 
ঢাষা তাতি সকলেই আপন আপন ব্যবসায় ছেড়ে কেরাণীগিরিতে প্রবেশ 
করিয়াছেন কেন? “মাতায় পা দিলেই টাকা” এমন সুখের ও মান্যের 
ব্যবসায় ছাড়িয়া বামুন ঠাকুরেরা কেরাণী হলেন কেন? তাহারা জ্ঞান ধর্ম্মে 
আধার হয়ে সমাজের শিরোভূষণ হয়ে লোকের গুরু ও নেতা হয়ে যে 
কেরাণী হলেন, তাহাতেই বেস বুঝা যাইতেছে যে কেরাণীগিরিতে এমন অর্থ 
উপার্জন হইত, যে তাহাদের নির্লোভী বৈরাগী মনকেও আকৃষ্ট করিয়াছিল। 
এত লোক যে কেরাণী হয়েছে, তার আর একটী কারণ এই যে 
কেরাণীগিরিতে প্রবেশ করা সোজা ছিল। একটু মোটামুটা ইংরাজী শিখে আর 
হাতটা পাকাইতে পারিলেই চাকরি জুটিয়া যাইত। নিজের কোন যন্ত্র চাই না, 
মূলধন চাই না, কেবল একখানি দরখাস্ত লিখিতে পারিলেই হয়। এই সকল 
কারণেই কেরাণীগিরির ভিতরে এত লোক প্রবেশ করে ফেলেছে। এক্ষণে 
কেরাণী-হাটে প্রয়োজন অপেক্ষা অপ্রয়োজন অধিক হইয়াছে; সুতরাং 
অপ্রয়োজন কমাইতে হইবে। কিন্তু কিরূপে হয়? প্রথমত কেরাণীগিরিতে 
প্রবেশ একটু কষ্ট সাধ্য হওয়া চাই। যেমন ইর্জিনিয়ারিং কলেজ মেডিকেল 
কলেজ প্রভৃতি আছে সেইর্প কেরাণীগিরির কলেজ চাই, যেখানে প্রবেশ 
করিবার পূরবের্ব এনট্রা্স পাশ করা চাই এখানে দুই বংসর কাল উচ্চ 
কেরাণীগিরির নিয়মে উপযুক্ত শিক্ষা লাভ করিয়া ছাত্রেরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ 
হইবেন এবং ৫০ টাকার উপরের মাহিনার কাজ তাহারা ব্যতীত আর কেহ 
পাইবে না। নীচের শ্রেণীর কেরাণীদেরও প্রবেশ করিবার সময় সামান্য 


৩৯৩ 


দুত্্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


রকমের পরীক্ষা দেওয়া আবশ্যক; এবং উচ্চশ্রেণীতে উঠিতে গেলে পুনরায় 
পরীক্ষা দিতে হইবে। এইরূপ করিলেই কেরাণীর সংখ্যা মিয়া যাইতে পারে 
এবং সংখ্যা কম হইলে প্রয়োজন অধিক হইবে সুতরাং দর আর আদর দুই 
বাড়িবে। কেরাণীদেরও বিদ্যা বুদ্ধি নিপুণতা ক্রমে বৃদ্ধি হইবে, অর্থ কষ্ট 
অনেক নিবারণ হইবে এবং অবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের উচ্চ উচ্চ 
মনোবৃত্তি সকল চালনার সুবিধা হইবে এবং কেরাণীদের ভিতর হইতে 
যথাকালে ভাল ভাল লোক বাহির হইবে; সুবিখ্যাত মিল সাহেব এক সময় 
কেরাণী ছিলেন, পুব্বকার সিভিল সারভাণ্টেরা কেরাণী ছিলেন, ভারত 
পরাজয়কারী ক্লাইভ সাহেব কেরাণী ছিলেন, অধমতারণ কেরাণীগিরিই এখন 
ভদ্রলোকের একমাত্র জীবিকার উপায়। এখনি ত কেরাণীর সংখ্যা অধিক 
হওয়াতে চাকরি জোটানো ভার, আবার তার উপর অধিকতর কঠিন হইলে 
লোকের উপায় কি হবে? “যা ছিল উঠে বসে, তা ঘুচাল কবিরাজ এসে” । 
যে উপায় বলা হইল তাহাতে কষ্ট না কমিয়া যে বেড়ে যাবে। 

এমন সকল রোগ আছে যাহা আগে একটু না বাড়াইলে আরাম করা যায় 
না। কেরাণীগিরি বর্তমান সমাজের একটী রোগ বিশেষ, এই রোগটী নিবারণ 
ছাড়িয়া লোক অন্য কাজ করিতে যাইবে না। আপনার বিদ্যা বুদ্ধি মনের 
গঠন এবং আয়োজন প্রয়োজনের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া পেশা অবলম্বন করিতে 
হয়, তাহা না করিলে কষ্ট হইবেই হইবে। যেরূপ কাটা দিয়া কাটা বাহির 
করিতে হয় সেইরূপ কষ্ট দিয়া সামাজিক কষ্ট নিবারণ করিতে হয়। একদিকে 
কেরাণীগিরিতে প্রবেশ করা কঠিন করিতে হইবে, অপর দিকে দেশীয় শিল্পের 
উন্নতি সাধন করিতে হইবে। শিল্প কার্য্যের বাৎসরিক প্রদর্শনী স্থাপন করা 
আবশ্যক এবং উৎকৃষ্ট কারিগরদের পারিতোষিক দেওয়া চাই। দেশীয় দ্রব্য- 
-সকল অধিক পরিমাণে যাহাতে ক্রয় বিক্রয় হয়, তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। 
গবর্ণমেন্ট এক্ষণে এ বিষয়ে অনুকূল। তাহারা এইরূপ নিয়ম করিয়াছেন, 
পাবলিকওয়ার্ক এবং অন্য অন্য বিভাগে দ্রব্য প্রয়োজন হইলে দেশীয় দ্রব্য 
পাইলে আর বিদেশীয় দ্রব্য খরিদ করা হইবে না। সাধারণে যাহাতে এইরূপ 
নিয়ম অবলম্বন করেন, তাহার বিধিমত চেষ্টা চাই। আমাদের কৃতবিদ্য 
লেখক, সম্পাদক ও বক্তারা এই বিষয়ের উপকারিতা সাধারণকে অনেক 
পরিমাণে বুঝাইয়া দিতে পারেন। ভদ্রলোকের ছেলেদের শিল্প বিদ্যা শিক্ষার 
জন্য স্থানে স্থানে বিদ্যালয় স্থাপন করিতে হইবে। এই সকল ছাত্ররা 
আপনাদের পারদর্শিতা এবং সচ্চরিত্রের প্রতিন্ঠাপত্র লাভ করিলে যাহাতে 
সাহাষ্য দান হয়, যথাযোগ্য জামিন লইয়া তাহাদিগকে মুল্ধন (ক্যাপিটাল) 
কর্জ দেওয়া হয়, এই উদ্দেশে সাধারণ ভাণ্ডার (ফণ্ড) প্রয়োজন এবং 


৩৯৪ 


কেরানী পুরাণ 
ধনীলোকের সহানুভূতি আবশ্যক। কিন্তু এইসকল বিষয়ে ধনী লোকের সাহায্য 
পাওয়া বড় সহজ নয়। যাহারা দুখ কাহারে বলে জানেন না, টানাটানির 
মহলে বাস করেন না, অভাবের আশ্বাদন পান নাই, তাঁহাদের হাদয়ে গরিবের 
প্রতি দয়া উদ্রেক করিয়া দেওয়া বড় দুরূহ। রাস্তা ঘাট প্রস্তুত করা পুক্ষরিণী 
খনন করা, দেবালয় স্থাপন করা, শ্রাদ্ধের সময় কাঙালি বিদায় করা, 
অতিথিশালা স্থাপন করা, বড়লাট ছোটলাট এবং অন্য কোন বড়লোকেদের 
অভ্যর্থনা করিবার জন্য টাদা দেওয়া, এই সমস্ত কাজ ধনী লোকেরা বুঝিতে 
পারেন। ইহাতে ধর্ম্ম, প্রতিষ্ঠা রাজদ্বারে সম্মান আছে, কিন্তু দেশের গরিব 
ভদ্রলোক এবং সামান্য লোকেদের অবস্থার উন্নতি করিবার জন্য অর্থ দান 
কিম্বা অসাক্ষাৎ সম্বন্ধে সাহায্য দান করা কেমন করিয়া তাহারা সহজে বুঝিতে 
পারিবেন? গরিব লোকেদের অনেক কাল পরে ভাল হইবে এই জন্য কি 
তাঁহারা বিলাতি জিনিস না কিনিয়া অপেক্ষাকৃৎ অপকৃষ্ট দেশীয় জিনিস 
ব্যবহার করিবেন, না গরিব ভদ্রলোকের ছেলে সুখে সংসার যাত্রা নির্বাহ 
করিবে বলিয়া টাকা ধার দিয়া পথ খুলিয়া দিবেন? এরপ প্রত্যাশা করা ঠিক 
নয়। সাধারণ ভাবে যদিও এই সব কথা ধনীদের উপর খাটে। কিন্তু তাহাদের 
মধ্যে এমন উন্নতমনা এবং সহ্দয় ব্যক্তি আছেন, যাহাদের সহানুভূতি অল্প 
হ্েষ্টা করিলেই পাওয়া যাইতে পারে। বিদ্যা বুদ্ধি এবং সহৃদয়তা যতই বৃদ্ধি 
হইতে থাকিবে, ততই এ সকল বিষয় ব্রমে সহজ হইয়া আসিবে। এই 
সকল বিষয়ে সাহায্য করিলে রাজা যদি কোন সম্মান ও পদ দেন, তাহা 
হইলে ধনীদের আরও উৎসাহ হইবে। কেবল ধনীদেরই রা প্রত্যাশা কেন? 
প্রত্যেক ভদ্রলোক যদি বৎসর একটী করে টাকা দেন তাহা হইলে এত অর্থ 
গ্রহ হয়, যে সমাজ সংস্কারকেরা আপাতত কাজ আরম্ভ করিতে পারেন। 
ভগবানের কৃপার স্রোতে নৌকা ছাড়িয়া দিয়া কসে দাঁড় বাও, ক্রমে কুলে 
পৌছবে। তাহার উপর নির্ভর করে এবং আপনাদের প্রাণ মন ঢেলে দিয়ে 
কাজ করিলে কোন্‌ কাজ না সিদ্ধ হয়ঃ ধৈর্য অবলম্বন করে কাজ কর, 
সফল-যত্ব হইবেই হইবে। যতই কেন ইংরাজ জাতিকে গালাগালি দাও না, 
তাহাদের মত ধৈর্য্য ও কার্য্যদক্ষতা না শিখিলে দেশের ভাল হবে না। কেবল 
কথায় চিড়ে ভিজিবে না। 
আমাদের কান্নার জল কি চোখেই মিলাইয়া যাইবে, মনের দুঃখ কি মনেই 
থাকিবেঃ কেন আমি ত অরণ্যে রোদন করিনি, সংবাদপত্রে আমার মন 
দুঃখের কথা বলিয়াছি এবং পুস্তকাকারে ছাপাইলাম। কেরাণী ভাইদের লুকান 
দুঃখের সংবাদ যত পারিলাম প্রকাশ করিলাম, এত ফুটে বলিলাম, যে কেহ 
কেহ চটে যাবেন। কেরাণীর দুঃখে আমার বুক ফাটে বলে তাই মুখে এত 
বোল ফোটে। কেমন করে কেরাণীর দুঃখ নিবারণ হইতে পারে, সে বিষয়েও 
কতক কতক বলিয়াছি এবং আরও বলিবার আছে, কিন্তু হায় কেহ কি 


৩৯৫ 


দুষ্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আপনি যাইবেন, মাসকাবারের শেষাশেষি মরিলে পোড়াইবার কড়িও থাকিবে 
না। তবে কোন্‌ সাহসে চুপ করে বসে আছেন? হাদয়কেই বা কি বলে 
প্রবোধ দিতেছেন£ আর ভগবানকেই বা কি বলে জবাব দিবেন? আপনাদের 
মধ্যে যাহারা বেশী মাহিনা পান, তাহাদের কষ্ট নাই একথা সত্য বটে; কিন্ত 
ভাই কয় জন আপনাদের মধ্যে এরূপ অবস্থার লোক? বড় কেরাণী ভাই, 
আপনাদের বলি আপনারা একটু মনোযোগ করুন, আপনাদের চরণে ধরে 
বিনয় করে বলিতেছি, আর ঘুমাইবেন না, আপনারা কেরাণীদিগের দলপতি; 
আপনারা মনে করিলে অনেক কাজ করিতে পারেন। সংকার্য্ের অল্প আরম্ভ 
ভাল, আরম্ভ করুন, ভগবান আশীব্ধাদ করিবেন। আপনারা যদি একটু 
উৎসাহ দেন হ্াদয় খুলে অনেক কথা বলতে পারি এবং আপনাদের চরণ 
তলে বসে কাটবিড়ালীর সাগর বাঁধার মতন কিছু কিছু সাহায্যও করিতে 
পারি। 

যতই কেরাণীদের কথা ভাবি ততই বুক ফাটে, আর কান্না ছোটে। ভাবী 
বংশীয় কেরাণীদের কি দশা হবে তাহা ভেবে উঠা যায় না। এখনি ত চাকরি 
জোটা ভার একটা কর্ম খালি হইলে দুইসত দরখাস্ত পড়ে, কত “বি এ” 
উপাধিকারী বড় বড় লোকের সই সুপারিশ লইয়া একটী ৩০ টাকার বেতনের 
চাকরি বাগাইতে পারিলে আপনাকে কৃতার্থ মনে করেন। “এল এ” বা “বি 
এ” উপাধিকারী না হইলে আপিসে এপ্রেন্টিস হইয়া প্রবেশ"করিতৈে পারিবার 
উপায় নাই। তাই কি আবার প্রবেশ করিলেই কর্ম হয়ঃ কত খোসামোদ 
করিতে হয়, কত ধমকানি খেতে হয়, এরূপ করে যদি দুই বা তিন বৎসর 
ঘরের পয়সায় খেয়ে পোরে এবং বাড়ী ভাড়া দিয়ে থাকিতে পারে, তবে 
অনেক কষ্টে ২৫/৩০ টাকার বেতনের চাকরি লাগিতে পারে। এই কটা 
টাকায় ন্যায্য খরচ চলাই ভার, তার উপর আবার মনের উচ্চ ভার এবং 
রুচির কিছু কিছু রক্ষা করিতে হয়। সংবাদপত্র খানি না পড়িলে চলে না, 
একটী ঘড়ি না রাখিলে সময়ের উপযুক্ত ব্যবহার করিতে পারা যায় না, 
নিদেন মাসের মধ্যে এক দিন করেও ইংরাজিতর খানা না খাইলেই নয়, 
নতুবা ইংরাজি পড়াই বৃথা হইয়া যায়। 'স্ত্রীকেও কারপেট বুনিবার জন্য উল 
এবং পড়িবার দুই এক খানা বই মাঝে কিনে দিতে হয় এবং অঙ্গ পরিষ্কার 
রাখিবার জন্য সাবান আর চুল বাঁধিবার জন্য হেয়ার অয়েল, পিন্‌ এবং 
জালও কিনে দিতে হয়, এত লেখা পড়া শিখে ও উন্নত ভাব উপার্জন করে 
এইরূপ না করিলে কেমন করেই বা একজন কৃতবিদ্য যুবা কেরাণীর চলিতে 
পারে? কৃতবিদ্যেরত এই দশা অর শিক্ষিতদের দুঃখে ত শিয়াল কুকুর কীদে, 
কাজ প্রায়ই জোটে না, বাপ পিতামহের যদি কিঞ্চিৎ সংস্থান থাকে সেই টাকা 
লইয়া কিন্বা স্ত্রীর গহনা বাঁধা দিয়া দরজির দোকান বা মণিহারির দোকান 


৩৯৩৬ 


কেরানী পুরাণ 


আমার কথায় কান দিবেন না? বড়মানুষেরাও শুনিবেন না, দেশ 
সংস্কারকেরাও শুনিবেন না? সংবাদপত্র লোকেরাও শুনিবেন না ভাল, দেশের 
এত ভদ্রলোক কেরাণীগিরি করে খায়, তাহাদের অবস্থা ক্রমেই মন্দ হইতেছে 
দুঃখ বাড়িতেছে; এ বিষয়ের একটা উপায় করিবার আবশ্যকতা বুঝাইয়া 
দেওয়া এবং সদুপায় উদ্তাবন করা দেশসংস্কারক মহাশয়দের কি ভাবিবার ও 
বলিবার বিষয় নয়? সাধারণ জনসমাজকে শিক্ষা দিবার ভার যে সংবাদপত্রের 
হস্তে একথা তাহারা কেন ভূলিলেন£ অধিকাংশ কেরাণী, মেয়ের হদ্দ, তাহারা 
ত আপনাদের বিষয় আপনি ভাবিতে জানেন না ও ভাবিতে পারেন ন] এবং 
পারিলেও নিতাত্ত নিরুপায়। “অন্ন চিস্তা চমৎকারা, ঘরে ভাত নাই জায়স্তে 
মরা” মরা মানুষ কি আর ভাবতে পারে, না কিছু করিতে পারে? যাহারা 
দেশের দুঃখ মোচন করিবার ভার লইয়াছেন, তাঁহারা যদি আপনার কর্তব্য 
ভুলিয়া থাকেন তাহা হইলে আর উপায় কি? আমার মতন লোক কি করিতে 
পারে? একে মূর্খ মানুষ তায় নিতান্ত ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে যে 
এ বিষয়ে বিশেষ আন্দোলন করে, ধনী ও কৃতবিদ্যের দ্বারে গিয়া হাতে পায়ে 
ধরে কোন একটা উপায় করিব, তা ত আর আমি পারি না; আমার কথাই 
বা কে শুনিবে? আমার ভুঁড়ি নাই, ভাল চেহারা নাই, সোনার মোটা চেন 
নাই, গাড়ী নাই, ভেকে ভিক্ষা, তা ভেক নাই, কেবল হৃদয় আছে কীদিবার 
জন্য। কিন্তু দুঃখীর কান্না কে শোনে! যখন সুরেন্দ্রবাবু জেলে গেলেন, তাহার 
পরিবারের কান্না নিবারণের জন্য কত লোক কত সহানুভূতি প্রকাশ করিলেন 
কিন্তু একজন সিপাই যখন বীরত্ব প্রকাশ করে আপনার দেশ রক্ষার্থ মরে, 
তার দুঃখিনী স্ত্রীকে কে সহানুভূতি করে পত্র লেখে? 

কেরাণী ভাই, ভাল আপনাদের বলি আপনারা ত নিতান্ত নিবের্বাধ নন। 
আপনাদের মধ্যে কত কৃতবিদ্য বুদ্ধিমান সহৃদয় লোক আছেন। ভাই, 
আপনারা আপনাদের দুঃখ নিবারণের সময় একটা কিছু করুন। দেশ যে 
উচ্ছন্নে যায় আর কত দিন যাইবে? যার বে তার ঘুম নাই, পাড়া পোড়সির 
ঘুম নাই তা করিলে কি হয়? উদ্যোগী পুরুষসিংহকেই লক্ষ্মী আশ্রয় করেন। 
দুজন দশজন লোক কোমর বেঁধে ভগবানের নাম করে দীঁড়াইলে যে কিছুই 
হবে না এমন মনে করিও না। সাধু কার্য্যের ভার ভগবান আপনে গ্রহণ 
করেন। যতই দিন যাইতেছে, ততই কেরাণীর দুঃখ ভার বৃদ্ধি হইতেছে তাহা 
কি জানিতে পারিতেছেন না? আপনারা ত কোন ক্রমে দুবেলা আঁচাইয়া কাল 
কাটাইয়া গেলেন, কিন্তু ছেলেদের দশা কি হইবে, তাহা কি কিছু ভাবিলেন? 
তাহারা কি কেরাণীগিরি করে খেলে আর ভদ্র সমাজে থাকিতে পারিবে? না 
তাহাদের মধ্যে সকলে চাকরি পাবে? মরিবার সময় ধনের মধ্যে ত একটি 
বিধবা স্ত্রী, আর গুটীকতক নাবালক ছেলে, আর অবিবাহিত মেয়ে রেখে 


৩৯৭ 


দুত্প্রাপ্য বাংলা সাহিত্য 


আমার কথায় কান দিবেন না? বড়মানুষেরাও শুনিবেন না, দেশ 
সংক্কারকেরাও শুনিবেন নাঃ সংবাদপত্র লোকেরাও শুনিবেন না ভাল, দেশের 
এত ভদ্রলোক কেরাণীগিরি করে খায়, তাহাদের অবস্থা ক্রমেই মন্দ হইতেছে 
দুঃখ বাড়িতেছে; এ বিষয়ের একটা উপায় করিবার আবশ্যকতা বুঝাইয়া 
দেওয়া এবং সদুপায় উদ্ভাবন করা দেশসংক্কারক মহাশয়দের কি ভাবিবার ও 
বলিবার বিষয় নয়? সাধারণ জনসমাজকে শিক্ষা দিবার ভার যে সংবাদপত্রের 
হস্তে একথা তাহারা কেন ভুলিলেন£ অধিকাংশ কেরাণী, মেয়ের হদ্দ, তাহারা 
ত আপনাদের বিষয় আপনি ভাবিতে জানেন না ও ভাবিতে পারেন না এবং 
পারিলেও নিতান্ত নিরুপায়। “অন্ন চিন্তা চমতকারা, ঘরে ভাত নাই জীয়ন্তে 
মরা” মরা মানুষ কি আর ভাবতে পারে, না কিছু করিতে পারে? যাহারা 
দেশের দুঃখ মোচন করিবার ভার লইয়াছেন, তাঁহারা যদি আপনাদের কর্তব্য 
ভুলিয়া থাকেন তাহা হইলে আর উপায় কি? আমার মতন লোক কি করিতে 
পারে? একে মূর্খ মানুষ তায় নিতান্ত ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে যে 
এ বিষয়ে বিশেষ আন্দোলন করে, ধনী ও কৃতবিদ্যের দ্বারে গিয়া হাতে পায়ে 
ধরে কোন একটা উপায় করিব, তা ত আর আমি পারি না; আমার কথাই 
বা কে শুনিবেঃ আমার ভূঁড়ি নাই, ভাল চেহারা নাই, সোনার মোটা চেন 
নাই, গাড়ী নাই, ভেকে ভিক্ষা, তা ভেক নাই, কেবল হৃদয় আছে কীদিবার 
জন্য। কিন্তু দুঃখীর কান্না কে শোনে! যখন সুরেন্দ্রবাধু জেলে গেলেন, তাহার 
পরিবারের কামলা নিবারণের জন্য কত লোক কত সহানুভূতি প্রকাশ করিলেন 
কিন্ত একজন সিপাই যখন বীরম্ত্ব প্রকাশ করে আপনার দেশ রক্ষার্থ মরে, 
তার দুঃখিনী স্ত্রীকে কে সহানুভূতি করে পত্র লেখে? 

কেরাণী ভাই, ভাল আপনাদের বলি আপনারা ত নিতীত্ত নিবের্বাধ নন। 
আপনাদের মধ্যে কত কৃতবিদ্য বুদ্ধিমান সহৃদয় লোক আছেন। ভাই, 
আপনারা আপনাদের দুঃখ নিবারণের সময় একটা কিছু করুন। দেশ যে 
উচ্ছনে যায় আর কত দিন যাইবে? যার বে তার ঘুম নাই, পাড়া পোড়সির 
ঘুম নাই তা করিলে কি হয়? উদ্যোগী পুরুষসিংহকেই লক্ষী আশ্রয় করেন। 
দুজন দশজন লোক কোমর বেঁধে ভগবানের নাম করে দীঁড়াইলে যে কিছুই 
হবে না এমন মনে করিও না। সাধু কার্য্যের ভার ভগবান আপনে গ্রহণ 
করেন। যতই দিন যাইতেছে, ততই কেরাণীর দুঃখ ভার বৃদ্ধি হইতেছে তাহা 
কি জানিতে পারিতেছেন না? আপনারা ত কোন ক্রমে দুবেলা আঁচাইয়া কাল 
কাটাইয়া গেলেন, কিন্তু ছেলেদের দশা কি হইবে, তাহা কি কিছু ভাবিলেন? 
তাহারা কি কেরাণীগিরি করে খেলে আর ভদ্র সমাজে থাকিতে পারিবে? না 
তাহাদের মৃধ্যে সকলে চাকরি পাবে? মরিবার সময় ধনের মধ্যে ত একটি 
বিধবা স্ত্রী, আর গুটীকতক নাবালক ছেলে, আর অবিবাহিত মেয়ে রেখে 


৩৯৮ 


কেরানী পুরাণ 


আপনি যাইবেন, মাসকাবারের শেষাশেষি মরিলে পোড়াইবার কড়িও থাকিবে 
না। তবে কোন্‌ সাহসে চুপ করে বসে আছেন? হৃদয়কেই বা কি বলে 
প্রবোধ দিতেছেন? আর ভগবানকেই বা কি বলে জবাব দিবেন£ঃ আপনাদের 
মধ্যে যাহারা বেশী মাহিনা পান, তাহাদের কষ্ট নাই একথা সত্য বটে; কিন্ত. 
ভাই কয় জন আপনাদের মধ্যে এরূপ অবস্থার লোক? বড় কেরাণী ভাই, 
আপনাদের বলি আপনারা একটু মনোযোগ করুন, আপনাদের চরণে ধরে 
বিনয় করে বলিতেছি, আর ঘুমাইবেন না, আপনারা কেরাণীদিগের দলপতি; 
আপনারা মনে করিলে অনেক কাজ করিতে পারেন। সংকার্যের অল্প আরম্ভ 
ভাল, আরম্ভ করুন, ভগবান আশীব্বাদ করিবেন। আপনারা যদি একটু 
উৎসাহ দেন হৃদয় খুলে অনেক কথা বলতে পারি এবং আপনাদের চরণ 
তলে বসে কাটবিড়ালীর সাগর বাঁধার মতন কিছু কিছু সাহায্যও করিতে 
পারি। 

যতই কেরাণীদের কথা ভাবি ততই বুক ফাটে, আর কান্না ছোটে। ভাবী 
বংশীয় কেরাণীদের কি দশা হবে তাহা ভেবে উঠা যায় না। এখনি ত চাকরি 
জোটা ভার একটা কর্ম্ম, খালি হইলে দুইসত দরখাস্ত পড়ে, কত “বি এ” 
উপাধিকারী বড় বড় লোকের সই সুপারিশ লইয়া একটা ৩০ টাকার বেতনের 
চাকরি বাগাইতে পারিলে আপনাকে কৃতার্থ মনে করেন। “এল এ” বা “বি 
এ” উপাধিকারী না হইলে আপিসে এপ্েন্টিস হইয়া প্রবেশ করিতে পারিবার 
উপায় নাই। তাই কি আবার প্রবেশ করিলেই কর্্ম হয়? কত খোসামোদ 
করিতে হয়, কত ধমকানি খেতে হয়, এরূপ করে যদি দুই বা তিন বৎসর 
ঘরের পয়সায় খেয়ে পোরে এবং বাড়ী ভাড়া দিয়ে থাকিতে পারে, তবে 
অনেক কষ্টে ২৫/৩০ টাকার বেতনের চাকরি লাগিতে পারে। এই কটা 
টাকায় ন্যায্য খরচ চলাই ভার, তার উপর আবার মনের উচ্চ ভার এবং 
রুচির কিছু কিছু রক্ষা করিতে হয়। সংবাদপত্র খানি না পড়িলে চলে না, 
একটী ঘড়ি না রাখিলে সময়ের উপযুক্ত ব্যবহার করিতে পারা যায় না, 
নিদেন মাসের মধ্যে এক দিন করেও ইংরাজিতর খানা না খাইলেই নয়, 
নতুবা ইংরাজি পড়াই বৃথা হইয়া যায়। স্ত্রীকেও কারপেট বুনিবার জন্য উল 
এবং পড়িবার দুই এক খানা বই মাঝে কিনে দিতে হয় এবং অঙ্গ পরিষ্কার 
রাখিবার জন্য সাবান আ'ব্‌ চুল বাঁধিবার জন্য হেয়ার অয়েল, পিন্‌ এবং 
জীলও কিনে দিতে হয়, এত লেখা পড়া শিখে ও উন্নত ভাব উপার্জন করে 
এইরূপ না করিলে কেমন করেই বা একজন কৃতবিদ্য যুব করাণীর চলিতে 
পারে? কৃতবিদ্যেরত এই দশা অর্থ শিক্ষিতদের দুঃখে ত শিয়াল কুকুর কাদে, 
কাজ প্রায়ই জোটে না, বাপ পিতামহের যদি কিঞ্চিৎ সংস্থান থাকে সেই টাকা 
লইয়া কিন্বা স্ত্রীর গহনা বাধা দিয়া দরজির দোকান বা মণিহারির দোকান 


৩৯৯ 


দুষ্প্রাপ্য বাংল! সাহিত্য 


করে কম বেশী ১০/১৫ টাকা উপার্জন করিতে পারে; আর নয়ত বাংলা 
সংবাদপত্রের সম্পাদক হয়ে উদবান্ন উপার্জন করিতে চেষ্টা করে। সংবাদপত্রে 
যে কত লাভ এবং সুবিধা, কাগজওয়ালামাত্রেই মনে মনে জানেন, স্পষ্ট 
করে বলে হাটে হাঁড়ি ভাঙ্গিবার আবশ্যক নাই। কেরাণীগিরির এই তো দশা, 
তার উপর আবার ফি উনিভারসিটি হইতে বৎসর বৎসর প্রায় নানা প্রকারে 
দুই তিন হাজার যুবক বাহির হইতেছেন, ইহার মধ্যে প্রায় পনর আনা 
ছেলের কেরাণীগিরি লক্ষ্য; এক দিকে “মাস এডুকেশন” -_সামান্য লোককে 
শিক্ষা দান, অপর দিকে “ফিমেল হাই এডুকেশন”, চারি দিকে আরম্ভ 
হইয়াছে। অতি অল্প কাল মধোই এই দুই চাপ দুই দিক হইতে আসিয়া 
কেরাণীর সর্বনাশ করিবে। যেরূপভাবে মাস এডুকেশন দিবার কথা সংপ্রতি 
এডুকেশন কমিশন স্থির করিয়াছেন, তাহা কার্য্যে পরিণত হইলে অচিরাৎ 
সামান্য লোক অনেক ভদ্রলোক অপেক্ষা অধিক শিক্ষাও পাইতে পারিবে এবং 
অধিকতর সুখ স্বচ্ছন্দতায় কাল কাটাইতে পারিবে। কেরাণী ভদ্রলোক! যদি 
আপনাদের মর্য্যাদা রাখিতে চাও যদি সামান্য লোক অপেক্ষা সুখে থাকিতে 
চাও এবং তাহাদের অপেক্ষা ছেলেদের টচ্চ শিক্ষা দিতে চাও বা তাহাদের 
নেতা হইয়া থাকিতে চাও, তবে এই বেলা তার উপায় কর। কৃষি কার্য্য এবং 
শিল্প কার্য্য ও ব্যবসায় আপনাদের হস্তে গ্রহণ কর। আপনাদের পিতামহ বা 
প্রপিতামহের আমলে যেমন আপনাদের খাসে চাষ হইত এখন আবার 
সেইরূপ চাষ আরম্ভ কর. গ্রামের দশ জন মিলে উন্নত ভাবে এবং অধিকতর 
পরিমাণে ধান এবং অন্যান্য শস্যের চাষ কর, শাক সবজির বাগান কর, 
তেজারাৎ এবং ধান বাড়ি কর, দেশীয় কারিগরদের চাকর রাখিয়া মধ্যবিধ 
রকমের কারখানা কর। এই সকল কার্য্যের তত্বাবধারণের উপযুক্ত হবর জন্য 
নিজেরা কেহ কেহ ওয়ার্কশপে গিয়া কাজ শিক্ষা কর। কৃষিকার্য্য বিষয়ক 
পুস্তক পাঠ কর এবং কৃষি বিদ্যালয় স্থাপন করে ভদ্রলোকের ছেলেদের চাষ 
কার্য্য তত্বাবধারণ করিবার জন্য উপযুক্ত কর। সময় থাকিতে যদি এরাপ 
চেষ্টা না কর পরে অনেক দুঃখ পাইতে হইবে এবং যে সামান্য লোকেদের 
ছোট (লোক বলে ঘৃণা কর, তাহাদের কাছে তোমাদেরই ছেলেদের সরকাব বা 
কেরাণী হইয়া খাইতে হইবে। 


সম্পূর্ণ। 


৪০৩০